প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩১
নীতি জাহিদ
ফ্রেশ না হয়ে, না খেয়েই শুয়ে পড়লো ব্লেইজার খুলে। মোনা কথা বলতে চাইলে বলে উঠলো,
– আমি কিছু শুনতে চাচ্ছিনা।
নিজেকে শান্ত করতে পারছেনা আজ ইমরান। বিয়ের পর থেকে টানা অকারেন্স ঘটছে। অফিস থেকে বের হওয়ার পর সবচেয়ে বড় অকারেন্স ঘটেছে গাড়িতে যখন কাবিরের ফোন এলো। মোনা ইমরানের মাঝে তেমন সখ্যতা গড়ে উঠনি ঠিকই তবে সম্মান করতো একে অপরকে। ঘটনা মোনার কানে গেলে মেয়েটা পুনরায় কষ্ট পাবে যা এবার আর ইমরানের সহ্য হবে না। ইমরান শোয়া থেকে উঠে রুম জুড়ে পায়চারি করছে। বুকে ব্যাথা করছে। মানবতা দেখিয়ে কি ভুল করলো আজ! আবেগ হলে ঠিকই মুখ দেখতে মন চাইতো। হসপিটাল রিসেপশন থেকে চলে আসতো না।
– আমার কাছে খবর অনেক আগেই এসেছে ইমরান সাহেব৷ আমি কিছু মনে করিনি। শুধু কষ্ট হয়েছে এই ভেবে যে পেয়ে মানুষটাকে ও হারিয়ে ফেলবো নাতো?
– আগলে রাখতে না জানলে হারিয়ে যাওয়াই ভালো।
এত কঠিন শব্দ হয়তো শুনতে ছোট্ট মোনা অভ্যস্ত নয়। তবুও শুনলো। কাঁকন সুইসাইড এটেম্পট করেছে। ইমরানকে ফোনে জানিয়েছে কাঁকনের ভাই। অফিস থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছে। প্রথমে ইমরানকে না পেয়ে বাসার ইন্টারকমে ফোন দিয়েছিলো তখনই মোনা রিসিভ করেছে। ডাক্তার স্ট্রেস দিতে বারণ করেছে।
ইমরানের দুশ্চিন্তায় এখন নতুন ভাবনা এই খবর কিভাবে কে পাঠিয়েছে মোনাকে ? হঠাৎ ইমরানের ফোন বেজে উঠলো। কাঁকনের ভাইয়ের নাম্বার দেখে রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে নারী কন্ঠ ভেসে এলো,
– ইমরান তোমার বুকে ঘুমাবো। আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যাও। নতুবা আমি আবার ম/রে যাব।
ক্রোধ কন্ট্রোল করতে না পেরে প্রথমবারের মতো চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
– ম*রে যাওনা কেনো? শান্তি পাচ্ছি না আমি তোমার জন্য। আমাকে রাগিয়ে তুমি আমার কঠিন রূপ টা কেনো দেখতে চাচ্ছো? যেদিন আমার সীমা অতিক্রম হবে আমি একদম মে*রে ফেলবো বলে দিলাম। স্লাট একটা।
ইমরানের চিৎকারে রুম জুড়ে প্রতিধ্বনি। মোনা নিজেও আঁৎকে উঠেছে। সুনসান রাতের নিরবতা ফোনের বিপরীত পাশের প্রতিটি শব্দের ঝংকার তুলছে। মোনার কানে স্পষ্ট আসছে সেসব।
দরজা ধাক্কানোর আওয়াজে মোনা ছুটে গিয়ে দরজা খুললো। ইমরান দরজার দিকে তাকাতেই দেখে ইশান। খাটে বসে মোনাকে জড়িয়ে ধরলো। আইরিন ছুটে এলো উপরে। পিছনে এলো ইশতিয়াক, তুশি,সোহান। ইশান বাবার দিকে না তাকিয়ে মোনাকে বললো,
– মা তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। পাপা কথা রাখেনি৷
ইমরান বিস্মিত হয়ে বললো,
– কি কথা রাখিনি ইশান?
ইশান মোনাকে জড়িয়ে ধরে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। আইরিন ইশানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কাঁকন ও পাশ থেকে বলছে,
– তুমি আমাকে কিছুই করতে পারবেনা। রাগ করে বলছো এসব। এক্ষুনি ওই মোনাকে বাড়ি থেকে বের করো আমি কালই আসছি আমার সংসারে। আপাকে ফোন দিয়ে জানিয়েছি।
ইমরানের সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো। শুকনো ঢোক গিলে ইমরান ফোন কেটে দিয়ে আইরিনকে বললো,
– আপা কি বলেছে কাঁকন ফোনে?
আইরিন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
– এই যে তুই ওকে ঘরে তুলবি। আজ ওকে দেখে এসেছিস হাসপাতালে। ও আবদার করেছে মোনা যেন বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
ইশান কেঁদে বলছে,
– তুমি মাকে ঠকালে পাপা।
মোনা ইশানকে থামিয়ে কম্পিত গলায় বললো,
– বাবা কথা বাড়িয়ো না। সকালে কি হবে দেখা যাবে।
নিজেকে শক্ত খোলসে আবদ্ধ করে ইমরান বললো,
– তোমার মা যাই পাবে নিজের যোগ্যতা বলে পাবে। আমি কি একবারো বলেছি কাউকে বের করে দিব? কোনো বদ্ধ উন্মাদ যদি বলে আমি ভালো মানুষ তোমরা বিশ্বাস করবে? তবে এইক্ষেত্রে ভিন্ন কেনো হলো? আমাকে কাবির ফোন দিয়ে বললো ওর বোন সুইসাইড এটেম্পট করেছে। হাসপাতাল কতৃপক্ষ নিতে চাইছেনা মিডিয়া নিউজের ভয়ে। নয়ন ও জানে ব্যাপারটা। আমি ও নয়ন গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে উপকার করার চেষ্টা করেছি। একা যাইনি পরে দোষ আমার ঘাড়ে দিবে তোমরা শুনলে। এখন দেখি তাই হলো। আমি তার দিকে ফিরেও তাকাই নি। জারিফ নাকি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। চিকিৎসার অভাবে কেউ ম/রে যাবে? এখন সেই পাগল সেন্সে ফিরে তোমাদের যা তা বললো আর তোমরা তাকে পীর ভেবে উপাসনা শুরু করে দিলে। আমার অবদান সব ভুলে গেলে। আমার জীবনটা পাগলে ভরে উঠেছে। অফিস থেকে আসার পর এই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছি। তা বেড়ে এখন প্রখর রূপ ধারণ করেছে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে এই ভেবে যে ছেলে বলে, আমি নাকি তার মাকে ঠকাচ্ছি। এত বড় অবিশ্বাস করলি কি করে বাবা?
ইশান চিৎকার দিয়ে বললো,
– ঐ মহিলা ফোনে আমার মাকে তোমার রক্ষিতা বলেছে, গালি দিয়েছে। সে কাল এসে তাঁড়াবে বলেছে। কেনো বললো এমন কথা? আমার মা তোমার রক্ষিতা? তোমার এই বয়সের পুরুষত্বের ক্ষুধা মেটায়? আমার মায়ের প্রয়োজন এক মাসে তোমার জীবনে ফুরিয়ে গিয়েছে? আমি ছেলে হয়ে এসব কথা শুনলাম বাবাকে নিয়ে। আমার ম*রে যেতে ইচ্ছে করছে। এটাও বলেছে তোমার চাহিদা যদি মা মেটাতো পারতো তুমি ছুটে যেতে না ওই মহিলার কাছে।
এসব শুনতে হলো অবশেষে। বাড়ির প্রত্যেকের মাথা নত। ইমরান বাক হারিয়ে ফেলেছে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে মোনা। শুধুমাত্র হাসপাতালে সাহায্য করতে ছুটে যাওয়াতে আজ তার মাশুল গুনছে দুইটা নিষ্পাপ প্রাণ। ইমরান খাটে বসে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে মাথা নুইয়ে রেখেছে। ইশতিয়াক এগিয়ে গিয়ে ভাইয়ের কাঁধে হাত দিলো।
ইমরান ইশানকে শান্ত করতে এগিয়ে এলো। ছেলেকে নিজের দিকে ফেরাতে চাইলে মুখ ফিরিয়ে নিলো। ছেলের একহাত ধরে ভেজা গলায় ভারী স্বরে বললো,
– তোমার পাপা, তোমাকে অনেক ভালোবাসে। তোমাকে কখনো মিথ্যে বলেনি। আমার কাছে আমার স্ত্রী স্বচ্ছ জলের মতো পবিত্র। এত সহজে আমি তাকে অপমান করবো বলে ভাবো তুমি, বাচ্চা! কাঁকন এত কষ্ট দেয়ার পর ও আজ অবধি খারাপ কথা বলিনি তোমার দিকে তাকিয়ে। আজ বাধ্য হয়েছি দুটো কথা বলতে। তোমার মা মোনালিসা আমার অনেক প্রিয় ইশান। চার বছর ধরে তাকে ভালোবেসে আসছি তাকে অসম্মান করবো বলে! ভালোবেসে প্রকাশ করিনি যেন তা গায়ে দাগ না লাগে। তুমি বড় হয়েছো। অনেক কিছু বুঝো, সব কি পাপাকে বুঝিয়ে দিতে হবে এখনো? নিজেকে দূরে রেখেছি তোমার মা থেকে, আজকের দিনটা দেখার জন্য? নিজের কাছেই ছোট হয়ে গেলাম আমি।
সবার থেকে দূরে গিয়ে সোফায় বসলো। ইশান মাকে ছেড়ে বাবার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– আমার কষ্ট হচ্ছে পাপা। অনেক কষ্ট হচ্ছে। কেনো মহিলা তোমাকে অপমান করলো?
আইরিন শান্ত পরিবেশে বলে উঠলো,
– ইমরান কাল কি যাবি থাইল্যান্ড?
– হুম।
আইরিন জানে মিনহাজের অবস্থা। চাইলেও বাঁধা দিতে পারবেনা ইমরানকে।
– তুই সাবধানে যা ভাই। ইশান মোনার দায়িত্ব আমার।
ইমরান নিশ্চুপ। ছেলে বার বার স্যরি বলছে। মোনা জমে আছে। একটি কথাও বলছেনা। সোহান ইশানকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। সবাই কামরা খালি করে দিলো। বিরান কামরায় নিজেদের হতাশাজনক নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাবে রাত বাড়লে। মোনা দুহাতে মুখ ঢেকে খাটে বসে উচ্চশব্দে কেঁদে দিলো। এত বড় অসম্মান কিভাবে করলো কাঁকন!
ইন্টারকমে ফোন এসেছে। নয়ন এসেছে মিনহাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ নিয়ে। কাল লাগবে। নিজেকে সামলে নিচে নেমে এলো। নয়ন ইমরানকে দেখে অবাক হয়ে গেলো।
– কিরে এলি সেই কখন চেঞ্জ করিস নি।
– পেপার গুলো দেয়।
ভালো ভাবে প্রতিটি পেপার পরোখ করে বললো,
– আচ্ছা আমি কাল না গিয়ে দুদিন পর গেলে কি খুব ক্ষতি হবে?
– কি হয়েছে ইমরান?
ইমরান নিশ্চুপ। সোহান রুম থেকে বেরিয়ে ইমরানের পাশে বসে বললো,
– মামা এক কাজ করেন, থাইল্যান্ড কয়েক দিন পরে যান। আগামী কাল মামীকে নিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসেন। এসব ঝক্কি ঝামেলায় পড়ে একেবারে ডিপ্রেশনে চলে যাবে।
নয়ন জানতো এমন কিছু হবে। ভেবেছিলো ইমরান সামলে নেবে। তবে কি মোনা জেনে গেলো! চমকে বললো,
– কি হয়েছে রে সোহান?
ইমরান সামনে থেকে উঠে চলে এসেছে। কিছু শুনতে ভালো লাগছেনা। ইশানের রুমে চলে এলো। ছেলের পাশে বসে ছেলের মনের ধারনা সামলাতে ব্যস্ত।
সোহান সব খুলে বললো। নয়ন প্রথমে কাঁকনের উপর রাগ করলেও মোনাকে ডাকতে বললো। রেগে গিয়ে লাভ নেই। পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সাথে হ্যান্ডেল করতে হবে। মোনা মামাকে দেখে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলো। মোনাকে পাশে বসিয়ে বললো,
– মোনা ইমরান তোকে ঠকায় নি মা। ও নিজের জায়গায় সবসময় সৎ ছিলো। সাক্ষী আমি। চার বছর ওকে কষ্ট পেতে দেখেছি। শুধু তোকে ভালোবেসে কষ্ট পেয়েছে। মুখে স্বীকার করেনা। তোর জানায় অনেক ভুল আছে। তুই ভাবিস তুই শুধু একাই ভালোবাসিস। অথচ ওর আড়াল থেকে করা প্রতিটা কেয়ারের কথা ভাবলেই উত্তর পেয়ে যাবি।
নয়ন চলে যাওয়ার পর পুরো পরিবেশ কেমন থমথমে হয়ে আছে। ইশানকে নয়ন বুঝিয়ে গিয়েছে। সব পড়া শেষ করে ইশান বাবা মায়ের রুমে এসে বললো,
– তোমরা কি আমার কথা শুনবে? তবে আমার মন ভালো হবে।
দুজনই ইশানের দিকে চেয়ে আছে। ইশান গম্ভীরমুখে বললো,
– কাল থাইল্যান্ড যাওয়া লাগবেনা। আমাকে কাল দুজন মিলে স্কুল থেকে নিয়ে আসবে কাল আমার শেষ পরীক্ষা। বন্ধুদের, মাকে দেখাবো। কলেজে তো এই বন্ধুদের নাও পেতে পারি। এরপর তুমি আমি আর মা মিলে একটা ট্যুর দিব তিন/ চারদিনের জন্য। রাজি?
ইমরান খানিকটা হাসলো। মাথা নেড়ে সায় দিলো। সব কিছু থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতে চাচ্ছে। মোনার সাথে সব কিছু গুছানো প্রয়োজন। সব এলোমেলো হয়ে আছে। এভাবে থাকতে দেয়া যায়না। এই দূরত্ব বলেই কাঁকন সুযোগ পাচ্ছে। তবে এর আগে কাঁকনকে বুঝানো প্রয়োজন। অতিরিক্ত বেড়েছে।
ইশান মোনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়েছে এখানেই। সারা রাত ইমরানের চোখে ঘুম নেই। মোনা হেডবোর্ডে হেলান দিয়েই কিছুক্ষন ঘুমালো। ইমরান সোফায় বসেই রাত কাটিয়েছে। ফযরের সালাত আদায় করতেই মাথা ঘুরে উঠলো। ঘুমিয়ে পড়লো সোফায়। ঘড়িতে আটটা বাজতেই তড়িঘড়ি করে উঠে ইশানকে রেডি করে পাঠিয়ে দিলো মোনা। রুমে এসে দেখলো ইমরান উঠে গিয়েছে। কালকের পোশাক ছেড়ে নতুন পোশাকে নিজেকে সাজিয়েছে। শান্ত স্বরে বললো,
– অফিস যাবে আমার সাথে?
মোনা খানিকটা হাসলো। মাথা ঝেঁকে বললো,
– যাব। আপনি খেতে আসুন। আমি তৈরি হয়ে নিই।
রাতের ঘটনা মনে পড়তেই ইমরানের ঠোঁটের কোনে হাসি। ইশান ঘুমানোর পর আড়াইটার দিকে মোনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। কাঁকনের পাগলামি বেড়ে যাওয়াতে ডাক্তার এবং কাবিরের সামনে কষে চড় মারে ইমরান। ডাক্তার বারণ করতে এগিয়ে এলেও কাবির বাঁধা দেয়। বোনের এই উচ্ছৃঙ্খল চালচলন সোজা করতে এই চড় টা ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। পুনরায় পাগলামি শুরু করলে ইমরান ডাক্তারকে স্পষ্ট ভাষায় বলে,
– যতক্ষণ পাগলামি করবে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে রাখবেন এতে যদি ম রেও যায় তার দায়ভার আমি নিব। মরে আমাকে শান্তি দিক। কাবির তোমার আপত্তি আছে?
কাবির দুপাশে মাথা নেড়ে বললো,
– ভাইয়া এত বুঝিয়েছে, বুঝতেই চায়না। আমার আবার কিসের আপত্তি। ওর জন্য আমার বাসায় অশান্তি। সানিয়া ওরে দুই চোখে সহ্য করেনা। মায়ের পেটের বোন বলে সহ্য করি।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বেশ কিছুক্ষন মাঝ রাস্তায় মোনার হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। কেনো যেনো আজ মোনার মন জুড়ে প্রশান্তি। হয়তো এই শান্তির খোঁজ করছিলো এতদিন। মোনা প্রশ্ন করেছিলো,
– বাসায় যাবেন না? রাত হলো তো।
– চড় টা আরো অনেক আগে দেয়া উচিত ছিলো তাই না?
– তা ছিলো, তবে উনার মধ্যে প্রায়শ্চিত্ত বোধ আসবে কিনা আল্লাহ জানে।
– বাদ দাও, তোমার সন্দেহ দূর হয়েছে?
– করিনি তো।
ইমরান রেগে বলে,
– মিথ্যা বলবেনা, তোমার একমাত্র কাজ শুধু আমাকে সন্দেহ করা। তুমি আমাকে যে পরিমাণ সন্দেহ করো আমি যদি নিরব বান্দা না হয়ে তর্ক করা পুরুষ মানুষ হতাম একটা রাত ও বিছানায় জায়গা দিতেনা। রাস্তায় রাস্তায় জায়গা হতো। মায়া হয় বলে আবার ডেকে নিয়েছো। কোনো একদিন কোনো এক প্রেসের লোক দেখে পেপারে লিখে দিলো ইমরান শরীফ বউয়ের মাইর খেয়ে ফুটপাতে আশ্রয় নিয়েছে।
ইমরানের কথা শুনে মোনার মুখে তালা লেগে গেলো। কি বললো! চাপা হাসি বেরিয়ে আসছে। হাসি চেপে বললো,
– আমি আপনাকে মা*রতাম?
– কার কপালে কখন শনি ঘুরে বলা তো যায় না। আমার জীবনে শনি মঙ্গল ই ঘুরতেছে। শুক্রবার আর আসেনা।
মোনা চোখের পলক ঝাপটে বললো,
– এই সিচুয়েশনে ও আপনি মজা করতে পারেন?
– আমার দুঃখ তোমার মজা মনে হলো?
– এটা দুঃখ ছিলো?
ইমরান মোনার দিকে তাকাতেই দুজনের চোখে চোখে মিলে গেলো। মোনা অবাক চোখে চেয়ে আছে। ইমরান হঠাৎ অট্টহাসি দিলো। ফাঁকা রাস্তায় স্পষ্ট ওর হাসি শোনা যাচ্ছে। মোনা হাসি আটকাতে না পেরে বলেছিলো,
– ইউ আর রিয়েলি আ লিটারেচার সউল। কিভাবে মুহুর্তে ঘটনা বদলে দিলেন।
ইমরান চোখ মে রে বলে,
– আমি আরো অনেক কিছু পারি দেখবে?
– বাসায় যাব। নতুবা এত রাতে পুলিশ দেখলে ভাব্বে প্রেমিকা নিয়ে স্যুগার ডেডি রাস্তায়।
– ইশ! এত সহজ। বিয়ে করা হালাল বউ। এনিওয়ে তোমরা মামা ভাগ্নি কি হিসেবে আমাকে স্যুগার ডেডি বলো?
– আচ্ছা স্যরি আপনি হৃত্তিক রওশন।
ইমরান চোখ দুটো ছোট করে বললো,
– হৃত্তিকের বর্তমান প্রেমিকার বয়স কত?
মোনা মুখে হাত দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। দুষ্টুমিষ্টি কথার মাঝেই দুজন গাড়িতে চেপে বসলো বাড়ির উদ্দেশ্য। ইমরান মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো কোনো কিছুই আর ফেলে রাখবেনা। সব সমাধান তাৎক্ষণিকভাবে করে ফেলবে আজকের মত। এতে সম্পর্ক দৃঢ় হবে। নতুবা কাঠিন্যের জালে জড়িয়ে পড়তে পারে যেকোনো ভুল পদক্ষেপে।
ইমরান চুপচাপ খেতে এসেছে। টেবিলে নিরবতা। ইতু হাত বাড়ালে ইতুকে কোলে নিলো। একটা ব্রেডের একটু অংশ খাবলে তুলে নিলো, ইমরানের দিকে বাড়ালো পুচকে ইতু। তুশি চেচাতে পারছেনা, শুধু হাত দিয়ে ইশারা দিচ্ছে মেয়ে যেন না জ্বালায়। এক পর্যায়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ভাইয়া দিয়ে দিন, আপনার ড্রেস নষ্ট করে দিবে।
ইমরান কালকের পর কেবল এখন হাসলো। ভাস্তিকে আদরে যত্নে ধরলো। আদর করতে করতে বললো,
– তুশি এমন করোনা তো। একটা নষ্ট করলে আরেকটা পরবো। কি করতে চায় করতে দাও। মেয়েরা সত্যি রহমত।
মোনা রেডি হয়ে উপর থেকে নামছে। খুব সুন্দর একটা লাইলাক জামদানী পরলো। আইরিন তা দেখে মহল গরম করতে বললো,
– এখন আমাদের আরেকটা পরী লাগবে এই বাড়িতে। দুইটা পাখি বাড়িতে উড়বে দেখতে কি সুন্দর লাগবে। ইমন একটা বাবু নেয় এবার।
ইমরান খেতে খেতে মোনাকে দেখছিলো। ইতুকে কোলে নিয়ে বসে খাচ্ছে। এমন না যে পানি, চা বা কফি খাচ্ছে। বোনের এমন কথায় শুকনো খাবার নাকে মুখে উঠে বিষম খেলো। নাক মুখ কুচকে বললো,
– আপা কখন কি বলতে হয় বুঝোনা।
– ঠিকই তো বলছি। সব বাদ দিয়ে যা হানিমুন করে আয়।
বোনের দিকে আড়চোখে তাকাতেই মুখ ভেঙচি দিয়ে আইরিন খেতে বসে বললো,
– এখন তো বোনের কথা ভাল্লাগবে না। ভাই গুলা সব পর হয়ে গেলো রে।
খাওয়া শেষ করে ইতুকে তুশির কোলে দিয়ে উঠে এলো ইমরান। ভাসুরকে লজ্জা পেতে দেখে তুশি ননাশের দিকে তাকালো। ইশতিয়াক, সোহান মুখ চেপে হাসছে। মোনাও পিছু পিছু বেরিয়ে এলো। একসাথে গাড়ি করে রওয়ানা হয় টিউলিপের উদ্দেশ্যে। আজ মোনাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। ইমরান লিফটের সামনে এসে হাত ধরে লিফটে উঠালো। লিফট চালু হলে মোনাকে বুকে টেনে নিয়ে শক্ত করে ধরলো। খানিকটা হেসে বলে,
– আহা! লিফট। এই লিফট প্রেমের কাব্য রচনা করলো।
মোনা হেসে বলে,
– কই আর প্রেমের কাব্য। বন্ধ হলেই বিপদ।
– চুপ করে আমার ভালোবাসা এঞ্জয় করো। নতুবা যেকোনো সময় তুমি সেন্সলেস হবে। লিফট আর তোমার দুইয়ের কোনো বিশ্বাস নেই। এদের যতই ঠিক করে একটা রগ ত্যাড়া।
মোনা হাসে। ইচ্ছে হলো এভাবেই সারাজীবন এই বুকে থেকে যেতে। সময়টা আটকে যাক। পরে মনে হলো না যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে বের হওয়া যায়!লিফট আজ অন্য ফ্লোরে থামে নি। সরাসরি তেরো তলাতেই থেমেছে। অফিসে একসাথে ঢোকাতে অনেকে তাকিয়ে আছে। মোনা মিনহাজের চেম্বারে চলে গেলো। ইমরান নিজের চেম্বারে বসলো। রহমতকে ফোন দিয়ে দু কাপ কফি দিতে বললো। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে মোনাকে ফোন দিয়ে কেবিনে আসতে বললো। মোনা আসতেই কফি এগিয়ে দিয়ে বললো,
– বসো কথা আছে।
মোনা চুপচাপ বসে কফিতে চুমুক দিলো। মোনার টা ক্যাপেচিনো ছিলো। ইমরানের টা অ্যামেরিকানো।
মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– কাজের কি অবস্থা?
– সব সাজানো আছে। চাইলে আজ ফটোশ্যুট করানো যাবে। অনলাইনে অর্ডার আসছে ইনডোর শ্যুটের ছবি দেখে। বাকি শাড়ি সব প্রোডাকশনে আছে। আশা করছি আগামী মাসের শুরুতে শো রুমে শাড়ি উঠানো যাবে।
– বেশ তবে মডেল নিয়ে আউটডোর শ্যুটিং করা শুরু করো।
– আগে ইনডোর করি এরপর আউটডোর। আমি তামান্না আপুকে বলেছি মডেলকে জানাতে। আসবে বলেছে আজ।
– ওকে।
মোনার মন হঠাৎ সকাল থেকে ভালো। গত কাল রাতে মস্তিষ্ক অনেক কিছু ভাবিয়েছে। নিজেকে সামলে মোনা একবার সুযোগ চায় জীবন গুছানোর। তাই হাসিখুশি থাকার প্রতিজ্ঞা করলো নিজেকে। আজ ইশান বলেছে স্কুলের সামনে ফুচকা খাওয়াবে। মোনা একটু উঠে ইমরানের কাপের দিকে তাকালো ইমরান মোনার গতিবিধি বুঝার চেষ্টা করছে। অকস্মাৎ মোনা ইমরানের কাপ নিয়ে কফিতে চুমুক দিলো। মুখটাকে যে কেমন করলো! আগের মতো। ইমরানের চক্ষু ছানা বড়া। অনেক বছর আগের কথা মনে পড়ে গেলো। হো হো করে হেসে দিলো। মোনা সাথে সাথে নিজের কফি মুখে দিয়ে তিতা ভাব কাটানোর চেষ্টায় আছে। এক পর্যায়ে বলে ফেললো,
– সেই তেতো কফিটা? এজন্যই মিষ্টি কথা কখনো বের হয় না।
ইমরান মোনার এঁটো কফিতে চুমুক দিয়ে হাসছে। গত চার বছর আগেও মোনার রেখে যাওয়া এঁটো কফিই খেয়েছিলো। যা আজো গোপন। মুচকি হেসে বললো,
– মিষ্টি কথা বের করানোর জন্য তো তুমি আছো ম্যাডাম মোনালিসা, তবে পারছোনা কেনো?
মোনা লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়ালো। এভাবে তো ইমরান কথা বলে না। সোজা কথার মানেও বুঝে না, তবে আজ কি হলো! ইমরান তাকিয়ে বললো,
– সময় আছে লিটল ফেইরী। ইমরানের টেস্টবাডে চাইলেই পরিবর্তন আনার দায়িত্ব নিতে পারেন। পারবেন কিনা তাই প্রশ্ন?
মোনা উঠে ইমরানের অনেকটা কাছে ঝুঁকে এলো। ইমরান পেছনে হেলে গেলো। এতটাই কাছে যে নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। কাছে এসে বললো,
– চ্যালেঞ্জ করতে চাইছেন?
ইমরান চোখ ছোট করে ফিসফিস করে বললো,
– আই এম গেম। ইফ ইউ আর রেডি।
ইমরানের গলা জড়িয়ে আরো কাছে এলো মোনা। ইমরান শ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছে। মোনার শরীরের মিষ্টি সুবাসে চোখ বুজে ফেললো ইমরান। একদম কাছে এসে ইমরানের কানের কাছে আলতো নরম মেয়েলী ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে বললো,
– চ্যালেঞ্জ এক্সেপ্টেড। আপনি বলেছেন আপনি স্যুগার খান না। কিছুদিন পর আপনি ডেইরিমিল্কের ফ্যান হয়ে যাবেন। চ্যালেঞ্জ।
মোনা সরে এসে নিজের জায়গায় বসলো। ইমরান চোখ খুলে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। গালে খাদ সৃষ্টি হলো। যখনই এই ঠোঁট কামড়ে চাপা হাসি দেয় তখনি খাদ গভীর হয়ে এই মানুষটার হাসিটাকে সর্বনাশে পরিণত করে। এই হাসি কখনোই ইমরান হাসেনা। মোনা নিজেই খুব কম দেখেছে। হাসতে হাসতে মোনাকে বললো,
– আই লাইক ইউর জেসচার সুইটহার্ট।
– ওকে তাহলে আমরা কিছুক্ষন পর ইশানের স্কুলে যাচ্ছি এরপর বাড়ি। ইশান তো দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছেনা তবে যাচ্ছি কোথায়?
– কক্সবাজার ফ্লাইট রাত আটটায়।
– হোটেল?
– সারপ্রাইজ।
মোনা আঁচল ঘুরিয়ে চলে যাবে, পেছন থেকে ইমরান বলে উঠলো,
– ডেইরিমিল্ক যদি মোনালিসা হয় দেন আই ওয়া না টেস্ট ইট উইলিংলি উইদ ফুল রিদম এন্ড এনার্জি।
মোনা অবাক হবার ভান ধরে ঢং করে টেনে টেনে বললো,
– উফফফ! ইমরান সাহেব আপনি এত্ত রোমান্টিক কিভাবে হলেন? হাউ সুইট।
– আয় হায়য়য়! মেরি জান-ই-আজিজ। আপ কো তো মেরি শোকর গুজার না চাহিয়্যে…
– মেরি দিল কি বাদশাহ, ক্যেয়া লাজিজ আলফাজ ম্যে মুজছে পুকারা আপন্যে। বহুত খুব। একদম কালিজ্যে মে যাকে লাগি।
ইমরান বুকে হাত দিয়ে বলে উঠলো,
– উফফফফ! ম্যে তো কুরবান।
– আমি আপনাকে আমিষ বানাতে পারছি তাহলে ধীরে ধীরে।
ইমরান সরাসরি চেয়ার থেকে উঠে ব্লেইজার খুলে চেয়ারে রাখলো। টাই এর নট ঢিলে করে টাই টেবিলের উপর রাখলো। সাদা শার্টের উপরের দুটো বাটন খুলতে খুলতে এগিয়ে আসছে, মোনার কোমড় টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে বললো,
– আমি তো বরাবরই আমিষ ছিলাম সোনা, তুমি বুঝতে পারো নি। কাছে আসো।
মোনা ঘটনার আকস্মিকতায় লজ্জা পেয়ে গেলো। বুকে ধুকপুক সৃষ্টি হলো। মোনাকে নিজের সাথে একেবারে মিশিয়ে নিলো। ইমরান মোনার ডান গালে নিজের খসখসে খোচা দাঁড়ি চোয়াল ছোঁয়াতেই শিউরে উঠলো মোনা। কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– আ’ম ইগারলি ওয়েটিং টু টেস্ট মাই পারসোনাল ডেইরি মিল্ক।
অকস্মাৎ দরজার কড়া নড়ল। ইমরান রাগে মোনাকে ছেড়ে বলে উঠলো,
– আসার আর সময় পেলো না।
মোনা হেসে উঠলো। ততক্ষণে ইমরান শার্টের বাটন লাগিয়ে টাই পরে নিলো। স্লিভের হাতা খুলে গুটিয়ে নিলো। মুখটা পেঁচার মত করে চেয়ারে বসলো। মোনা চোখ ঝাপটে বললো,
– আসছি…
– জ্বি আসুন। এত খুশী হওয়ার মত কিছু হয়নি। একটু সামনে তাকিয়ে হাঁটুন। না হয় হোঁচড় খেয়ে পড়বেন।
– তাতো আপনি পড়েছেন অলরেডি…
ইমরান নিরুত্তর হাসছে। মোনা দরজা খুলতেই দেখলো রিমি দরজার সামনে। মোনার রাগ হলো। ভাবছে যাবেনা। কি কথা হয় শুনে যাবে। মুহুর্তেই মত বদলে চলে যাওয়ার জন্য কদম বাড়ালো। মনে মনে ভাবলো, তোর ব্যবস্থা করছি। সন্দেহ চোখে রিমি বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩০
– কিছু বলবে? আমার স্যারের সাথে একটু কথা ছিলো।
মোনা কিছু না বলেই বেরিয়ে গেলো। মোনা প্রোডাকশন হাউজ থেকে ঘুরে এসেছে অফিসে। অলরেডি অনেক শাড়ি চলে এসেছে মডেলের জন্য। ফটো স্টুডিও রেডি। মোনার তদারকিতে গ্রামীন ভাব এনে বেশ সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে প্রতিটি কোণা, গ্রাম্য ছোঁয়া স্টুডিওতে। ইশানের পরীক্ষা আধঘন্টার মাঝে শেষ হবে। ইমরানের রুমে আসতেই দেখলো ইমরান তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ফোন নিয়ে বেরিয়ে এলো। দুজন একসাথে অফিস থেকে বের হলো ছেলের স্কুলের উদ্দেশ্যে।
