Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৬

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৬

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৬
নীতি জাহিদ

ঘড়িতে ভোর সাড়ে পাঁচটা। মোনার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো মেয়েটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । মায়াবী স্নিগ্ধ বদন। গায়ের শাড়িটা কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। ভাবলো চেঞ্জ করে দিবে। মোনার আলমারি খুলে দেখে সব ঝামেলার কাপড় চোপড়। শাড়ি,থ্রিপিস,গাউন। মনে মনে হেসে বললো,
– এমন সব এলোমেলো কাপড় এনেছে এই মেয়ে? দু একটা সহজ কাপড় আনলেও পারতো।
আলমারি খুলে নিজের একটা টিশার্ট বের করলো। পরিয়ে দিবে ভেবেও সংকোচে আর পরাতে পারলোনা। ভালো ভাবে কম্ফর্টারে মুড়িয়ে দিলো। সময় ছুটছে। রুমে ব্রেড ছিলো গত রাতের। একপিছ ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে নিজে মুখে দিয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখেও পুরে দিলো। ইমরানের ধারনা মতে ঘুমাবে প্রায় বারোটা অবধি এর মাঝে খাওয়া হবেনা নিশ্চিত। খাবার মুখে দিতেই এই মেয়ে ঘুমের মাঝেই খাবার চিবাচ্ছে। ইমরানের এই প্রথম মনে হলো বেচারা মিনহাজ এই মেয়ে নিয়ে সত্যি অনেক কষ্টে ছিলো। ফ্রেশ হয়ে লেদার জ্যাকেট, ডেনিম প্যান্ট, মাথায় ক্যাপ, হাতে লেদার ঘড়ি। পকেটে মেটালের জিনিসটা নিলো। চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে পুরোপুরি রেডি। মোনার কপালে অধর ছুঁয়ে বললো,

– আমি আসছি মোনালিসা।
যেই আসি বললো, পেছন থেকে ঘুমের মধ্যে হাত ধরে ফেললো। ইমরান পেছন ফিরে তাকাতেই বলে,
– কোথায় যান, আমি আরো ঘুমাবো। আপনার কাছে ঘুমাবো।
– একটু কাজ আছে সুইটহার্ট । এসেই আপনার সেবায় নিয়োজিত থাকবো। ঠিক আছে? এখন ইকটু একা ঘুমান।
ঘুমের ঘোরেই বলছে,
– ওকে চকলেট আনবেন।
ইমরান মোনার হাতে আদর করে বললো,
– ঘুমের ঘোরেও চকলেট রে ভুলে না।
দম ফেলে বেরিয়ে গেলো রুম লক করে। ইশানের একটা এক্সট্রা চাবি নিজের কাছে রেখেছিলো। ছেলে অবগত সেই ব্যাপারে। রুমে ঢুকে জোর করে ঘুমের মাঝে এক পিছ কেক খাইয়ে দিলো। এরপর রুম লক করে সাথে করে কিইগুলো নিয়ে বেরিয়ে এলো। বের হতেই দেখতে পেলো রবিন এবং সজীব পুরো টিম নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে। সজীবকে বললো,

– রিসোর্ট থেকে শুরু করে এক কিলোমিটার এরিয়া যেন সেফ থাকে। তোমার কাছে আমি আমার দুটো জান রেখে যাচ্ছি সজীব।
– ইনশাআল্লাহ স্যার। আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে তৎপর থাকবো।
রবিন এবং একটা টিম নিয়ে কালো জিপ সহ বেরিয়ে গেলো। সজীব রিসোর্টে ঢুকে চারদিকটা ঘেরাও করে নিয়েছে। রিসোর্টের কুক থেকে ম্যানেজার, সার্ভিস ম্যান প্রত্যেকে এলার্ট আছে। সমুদ্রে গমন ইমরানের। এই খবর এতক্ষনে নিশ্চিত চলে যেতে পারে। নিরাপত্তা জোরদার করা বাধ্যতামূলক। ইমরান মাঝ সমুদ্রে পৌঁছেছে নয়টা নাগাদ। একসাথে সব কটা শিপ দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায়। ট্রলার থেকে মই বেয়ে সরাসরি শিপে উঠে গেলো। মার্সেন্ট নেভি এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করলো। ইমরানকে সরাসরি গোডাউনে নেয়া হলো। কাঠের বাক্স উলটে একেকটা প্রোডাক্ট বের করছে। ইমরান হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে, টেস্ট করছে টেস্টারে। প্রতিটি প্রোডাক্টের গুণগত মান দেখে তার মুখে তৃপ্তির হাসি। পাশ থেকে একজন অফিসার এগিয়ে এসে বললো,

– স্যার ফোন।
ইমরান ফোন হাতে নিতেই ও পাশ থেকে ভেসে এলো প্রিয় স্বর,
– আসসালামু আলাইকুম ইমরান দ্য হিট ম্যান ।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম কমান্ডার। এই নামে ডাকা বন্ধ করবিনা তুই?
ও পাশ থেকে হেসে বললো,
– শুকরিয়া আদায় কর ইমরান হাশমী ডাকিনি।
– তাও ভালো। যেভাবে হিট ম্যান ডাকিস ভয় লাগে মাঝে মাঝে। ভাগ্যিস ও পথে পা বাড়াই নি।
– তুই না থাকলে নাফিস সুস্থ থাকতোনা। আল্লাহ সেদিন বাঁচিয়েছেন তোর উছিলায়। ভাবিজি, আমাদের রাজপুত্র কেমন আছে?
– বাদ দে, সেই প্রসঙ্গে যেতে চাই না। ওরা দুজনই আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ভাবীসাহেবা আর আমাদের পরীটা কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো শুনেছি। আমি গত এক বছর তাদের দেখিনি। এখন বে অফ বেঙ্গলে আছে। কিছুদিনের মধ্যে ইনশাআল্লাহ ফিরবো হেডকোয়ার্টারে।
– তুই পারিস ও। কিভাবে যে দুইটা জান ছাড়া থাকিস। অবশ্য পারতেই হয় নয়তো তোর দ্বিতীয় বউ সমুদ্র তো তোর উপর ঘোসসা করে তোর ভাষ্যমতে।
– আল্লাহ দিন পার করছে তো। আরেহ চরম ঘোসসা করে। যেদিনই ভাবি কিছু মাসের জন্য ঘুরে আসবো সেদিনই তান্ডব তোলে। কোনো না কোনো সাসপিশাস সাবমেরিন আসে অথবা ঘূর্ণিবায়ু, জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়। কি প্রেম ভাবতে পারিস?
এতটুকুতেই দুজন হাসছে। পুনরায় কমান্ডার প্রশ্ন করলো,

– আচ্ছা প্রোডাক্ট ঠিকঠাক?
– হুম এতক্ষন যা টেস্ট করলাম সব ঠিকঠাক। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে পোর্টে ঢুকলে তো ঝামেলায় পড়বো। কারণ ওখানে বদি থাকবে। ও প্রোডাক্ট লিগ্যাল হলেও আটকায় বিভিন্ন বাহানায় আর সেখানে আমার হাজার কোটির প্রোডাক্ট।
– আমি কেনো আছি? গত তিনমাস ধরে বাড়ি না গিয়ে সমুদ্র পাহারা দিচ্ছি কি বদি প্রোডাক্ট আটকাতে। নিশ্চিন্তে ভাবিজীর সাথে ট্যুর এঞ্জয় কর। প্রয়োজনে পোর্টে আমি যাবো। সম্পূর্ণ লায়াবিলিটি আমার।
– দ্যাটস গ্রেট। থ্যাংকিউ সো মাচ দোস্ত।
– দোস্তি ম্যে নো স্যরি, নো থ্যাংকিউ।
– ওকে রাখছি। সাবধানে ফিরে যাস। আমার টিম নিয়ে বেক করবি। তোর টিম স্ট্রং হলেও আমি বিশ্বাস করিনা।
– তুই তো সবাইকেই সন্দেহ করিস।
– করতে হয় বস। পেশাটাই এমন।
হেসে উঠলো দুজন। ইমরান বললো,

– ঠিক আছে দোস্ত ভাবীসাহেবা আর শেহজা মামনীকে নিয়ে ঘুরে যাস ঢাকা আসলে।
– ইনশাআল্লাহ। ইশানকে দেখেছি সেই ছোট্টবেলায়। অনেক বড় হয়েছে সেদিন তোর সোস্যাল মিডিয়ায় দেখলাম। আসবো একদিন। রাখছি হ্যাভ আ সেফ জার্নি।
– সেম টু ইউ। আল্লাহ হাফেজ।
কথা শেষ করে ইমরান পুরোটা শিফ ঘুরে ঘুরে চেক করে। রবিনকে দায়িত্ব দিয়ে নেমে এলো। তীরে ট্রলার আসতেই ঘড়িতে দেখলো সাড়ে এগারোটা । মনে মনে ভাবলো, কি করছে এরা রুমে? যদিও চিরকুট রেখে এসেছে। সজীব ফোন দিয়ে জানালো একজন ও উঠেনি। আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করছে লোকজন।
রিসোর্টে পৌঁছেই ইমরান দ্রুত এসে সবার আগে ছেলের রুমে ঢুকলো। ছেলে চিপস খেতে খেতে টিভি দেখছে। বাবাকে দেখে বললো,

– গুড মর্নিং পাপা।
– গুড মর্নিং জান বাচ্চা। স্যরি পাপা আটকে রেখে গিয়েছিলাম।
ছেলেকে কপালে মুখে আদর দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ছেলে হেসে বলে,
– ইটস ওকে আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কাজে বেরিয়েছো। এখন কি আমি বাইরে যেতে পারি?
– অবশ্যই। বিকেলে দূরে ঘুরতে যাব। এখন যাও সজীব চাচ্চুকে নিয়ে আশেপাশে ঘুরে আসো।
ইশান লাফিয়ে উঠে গেলো। ইমরান নিজের রুমে ঢুকেই দেখতে পেলো ম্যাডাম এখনো ঘুমে। গায়ের জ্যাকেট খুলে দম ফেলে খাটে বসে নিজে নিজে হাসছে। আস্তে ডাকলো,
– মোনালিসা, বউ সোনা উঠবেনা?
আড়মোড়া ভেঙে বলে,
– উহু আরেকটু ঘুমাই।
ঘুম ঘুম আদো কথা শুনতেই ভালো লাগছে। ইমরান এগিয়ে এসে ললাটে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো। উষ্ণ আদর পেয়ে মোনা বেড়াল ছানার মত নিজের মাথা ইমরানের কোলে উঠিয়ে দিলো। ইমরান ধীরে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বললো,

– উঠো। অনেক সময় পেরিয়েছে তো।
– অল্প ঘুমাই। আমি একবার উঠেছিলাম। আপনাকে খুঁজেছিলাম। আপনি ছিলেন না তো।
– একটু কাজে গিয়েছিলাম ।
পুনরায় ইমরানকে আষ্টেপৃষ্টে ধরে বললো,
– আর যাবেন না আমাকে ফেলে।
ইমরান হাসছে মোনার বাচ্চামোতে। ঘুমের ঘোরে এই মেয়ে নিজ সত্ত্বায় ফিরে এসেছে। সকালে নামাজ পড়তে উঠে যা করেছে, রীতিমতো বাকযুদ্ধ পুলের পানিতে নামা নিয়ে। নিজেদের রুমের পাশেই ব্যক্তিগত পুল সাইড করা আছে। একান্তে দুজন সময় কাটাবে বলেই এই পুল সাইড করা। মোনাকে নিয়ে নামার ইচ্ছেটা এত তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে ভাবতে পারেনি। ইমরানের কোলে ছিলো বলে মোনা বুঝতেই পারেনি পানি এতটা ঠান্ডা। নামার পর দাঁতে দাঁত লেগে গেলো। রাগ করে ইমরানের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলো কিছুক্ষনের জন্য।
ইমরান প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে মাথায় এলো এই মেয়েটাকে প্রচুর প্যাম্পার করা প্রয়োজন হবে। এদিকে হাতে সময় খুবই কম। নিজের কপাল চাপড়ে মনে মনে বলে,

– আমার ইশান ও এর চেয়ে বেশি বুঝদার।
মোনা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো,
– জীবনেও আমি পুলে নামবোনা আপনার সাথে। এত ঠান্ডা পানি।
ইমরান হেসে বলেছিলো,
– আচ্ছা।
ফযরের সালাত আদায়ের পর জায়নামাজ থেকে উঠে মোনা বললো,
– কাছে আসবেন না আমার আর।
– ওকে ফাইন, ঢাকা গিয়ে ভেবে দেখবো। এখানে আই কান্ট ফলো ইউর রেস্ট্রিকশন।
– ঠান্ডা পানিতে আমার এলার্জি আছে।
ইমরান মুখ টিপে হেসে বলে,

– নোটেড। পুলের পানি গরম করে রাখতে বলবো এখন থেকে। তাহলে হবে?
মোনা কটমট করা দৃষ্টি ইমরান উপেক্ষা করে শুয়ে পড়লো। গাল ফুলিয়ে মোনা বায়না ধরলো সে ঘুমাবেনা। জোর করে শুইয়ে দিয়ে ইমরান চুলে বিলি কেটে দিতে থাকলো। উদ্দেশ্য মোনাকে ঘুম পাড়ানো। নতুবা আজ বেরুতে পারবেনা। হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
ভাবনা থেকে বের হয়ে বর্তমান মোনালিসাকে দেখছে। জোর করে উঠাতে গেলে ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরে ঘুম ঘুম চোখে বললো,

– চকলেট এনেছেন?
– আছে আমার কাছে। নাস্তা করেছো?
– উঁহু। চকলেট দিন আগে।
– আগে নাস্তা।
ওয়েটার ব্রেকফাস্ট দিয়ে গিয়েছে। মোনাকে খাটে বসিয়ে ওয়াশরুম থেকে পানি এনে মুখ ধুইয়ে দিলো। ইমরান ফুড ট্রলি টেনে একটু করে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছে। মোনা ইমরানের কাঁধে মাথা রেখে একটু করে খাচ্ছে। ইমরান মুখ টিপে হাসছে। এই মেয়ের ক্ষনিকের মাঝেই মন পরিবর্তন হয়। খাবার শেষে মোনা উঠে ওয়াশরুমে যাবে নিজের শাড়িতে নিজেই মুড়িয়ে পড়ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
– ইয়া আল্লাহ এই শাড়িটা এত আবোল তাবোল হলো কি করে?
ইমরানের দিকে তাকাতেই ইমরান বলে,

– এভাবে তাকাবেনা বলছি, আমি তোমার কাছেও যাইনি। নিজেই এমন হাল করেছো ঘুমের মাঝে। শাড়ির খুব কষ্ট হচ্ছে তোমাকে জড়িয়ে থাকতে। দেখেছো বেচারা কোনোমতে নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করে তোমার গায়ে ঝুলে আছে।
কি অদ্ভুত কথা শাড়ির নাকি আত্মসম্মান আছে? মানুষটা কি বোঝালো, মোনা শাড়ি সামলাতে পারেনা? শাড়ির সাথে যার সখ্যতা সেই অবুঝ বয়স থেকে সে নাকি শাড়ি সামলাতে পারবেনা। নেহাৎ সকালে কোনো রকম গায়ে জড়িয়েছিলো। অকস্মাৎ মাথায় খেললো, যার জন্য এত আয়োজন করে রাত থেকে শাড়ি পরে ছিলো, সকালে ও নতুন একটা শাড়ি পরলো সে কি শাড়ি নিয়ে তাকে অপমান করলো!
আবার মুখটা কালো করে ধপ করে ইমরানের কোলে বসলো। বেজার মুখে বললো,
– আমার কি নাইটি আনা উচিত ছিলো? আপনার কি আমাকে শাড়িতে পছন্দ হয় নি? কিন্তু আমি তো এসব পরিনা ইমরান সাহেব। আমার ছিঃ লাগে। দেখতে কি বিশ্রী।
ইমরান চোখ বড় করে ফেললো, কি সাংঘাতিক চিন্তা। শাড়ি থেকে নাইটিতে কি করে প্রসঙ্গ গেলো!
চমকে গিয়ে নাক মুখ কুচকে বললো,

– প্রয়োজন নেই ওসবের। মাথায় আসে কি করে এসব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা! তোমাকে হলিউডের নায়িকা হতে কে বলেছে? আমার মোনালিসা শাড়িতে অনন্য। শাড়ি আমার বেশ পছন্দের। অন্য সময় জানিনা। আমার কাছে আসলে শাড়িতেই আসবে। নিজেকে মনের মত সাজিয়ে।
মৃদু হেসে মোনা মাথা ঝাকালো। মেয়েটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে। ইমরান মোনার গায়ে হাত দিতেই বুঝতে পারলো শরীর গরম। মোনা উঠে একটা গাউন বের করে ওটা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। মোনা বেরিয়ে এলে ওয়েটার ডেকে রুম ক্লিন করিয়ে নেয়। কাল রাতের ফুল সব ছড়ানো ছিটানো। মোনা চুপচাপ ফোনের দিকে তাকিয়ে কার্টুন দেখছে আর নতুন খোলা চকলেট খাচ্ছে। জোর করে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে ইমরান। দুপুর হয়ে এলো। এই মেয়ে এত চকলেট কি করে খেতে পারে! ওয়েটার চলে গেলে মোনা এক পিছ চকলেট ইমরানের দিকে এগিয়ে দিলে ইমরান বলে উঠলো,

– তুমি যে হারে চকলেট খাও আমার চকলেট খাওয়ার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই ডায়াবেটিস তরতর করে বেড়ে যাবে।
– আমার খাওয়ার সাথে আপনার সম্পর্ক কি?
– কিছুনা।
ইমরান সোফায় বসে নতুন মডেল গুলো চেক করছে ল্যাপটপে। মোনা ক্ষেপে গিয়ে বলে,
– দূরে বসে আছেন কেনো? এখানে আসেন।
– আসছি।
ইমরানের উপহার হিসেবে কোম্পানি এবার পাঠিয়েছে পেলিকান ১২০০ মডেল কেইস এবং বেরেটা এম নাইন গান। মোনা উঠে আসছে দেখে ইন্টারফেজ অফ করে ল্যাপটপ শাট ডাউন দিলো। ইমরানের কোলে বসে বুকে মাথা দিয়ে চুপসে গিয়েছে। ইমরান মোনার গলায় আদুরে পরশ দিয়ে বললো,

– কি হয়েছে?
– ভালো লাগছেনা।
– কেনো?
– জানিনা।
– রাতে কি বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছিলাম?
মোনা দু পাশে মাথা নাড়াচ্ছে। হঠাৎ কেমন গুটিয়ে গেলো। মোনার থুতনি ধরে ইমরান মুখ তুলতেই মোনা পুনরায় মাথা নোয়ালো। ইমরান হেসে বলে,
– মোনালিসা ইউ আর ব্লাশিং।
– আপনি এভাবে লজ্জা দিচ্ছেন কেনো আমাকে?
– লজ্জা দিচ্ছিনা লিটল ফেইরী। স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। তুমি আমায় কেনো লজ্জা পাচ্ছো বলো তো? আমার মাঝেই তো নিজেকে মেলে ধরলে। রাতে তো অনেকটা আত্মবিশ্বাস ছিলো। আমি যতদূর জানি আমি নিজেকে সামলেছি অনেকক্ষানী, তবে বড্ড কষ্ট হয়েছিলো। মোনালিসা, ট্রাস্ট মি আমি পারিনি কাল রাতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে….

– উফফ আপনি চুপ করবেন। আমার লজ্জা বাড়াচ্ছেন কেনো?
– আচ্ছা তবে আজ এতবার কোলে উঠছেন কেনো,ম্যাডাম?
– আপনি এটেনশন দিচ্ছেন না৷
– এত এটেনশন দিয়ে কি হবে?
চোখ মুখ কুচকে মোনা উঠে দাঁড়ায়। ক্ষেপে বলে,
– আর যদি আপনার কাছে আসি…
এইযে আবার ক্ষেপেছে। ইমরান টেনে এনে কোলে বসিয়ে বললো,
– কেনো আমি আদর করিনা? যত্ন করিনা?
– খোঁটা দিচ্ছেন কেনো? আমার সত্যি ভালো লাগছেনা।
ইমরান বাচ্চাদের মতো করে আঙুলের অগ্রভাগ দেখিয়ে পরিমাপ করে বললো,
– এট্টু আদর করলে ভালো লাগবে?
মোনা ভাবনায় হারালো। ঘাড় ঘুরিয়ে আগের মত ইমরানের কোলে গুটিশুটি হয়ে বসে বললো,

– এট্টু,, বেশি না।
– কিভাবে করতে হবে বলে দিন?
– কোলে নিয়ে ব্যলকনিতে রোদের মধ্যে দোলনায় বসলে হবে।
– এতটুকুই।
– হুম।
কোলে নিয়ে দোলনায় বসতেই মিষ্টি রোদ গায়ে লাগলো। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনাকে ড্যাশিং লাগছে। একটু আদর করি।
ইমরান চমকে গিয়ে তাকিয়ে হাসি আড়াল করে বলে,
– কেনো নয় অবশ্যই।
মোনা ইমরানের বাম গালে ঠোঁট ছুইয়ে দিলো। অধর প্রশস্ত হাসি দিয়ে বললো,

– শেষ।
ইমরান বললো,
– এবার আমি ইট্টু করি?
– হুম
মোনার নমনীয় অধরে আলতো করে অধর ছোঁয়ালো। এরপর অধর ছেড়ে বললো,
– সবসময় এমন আদুরে হয়ে থাকো কেন? মারাত্মক বিপজ্জনক মেয়ে তুমি।
মোনা বলে,
– কি করেছি আমি?
– এই যে আর দুনিয়ার কিছুতে মন বসবেনা। সারাক্ষণ মন মোনালিসাতেই পড়ে থাকবে এর দায়ভার কার?
– আমি তো চাই এটাই।
ইমরান হাসছে আর ভাবছে, পাগলীটা আর বড় হলোনা। দূরন্তপনা কমেনি, সামলেছে কেবল।

বিকেলে মোনা এবং ইশানকে নিয়ে ইমরান পাটুয়ারটেক পাথর রানী সী বিচ, শ্যামলাপুর সী বিচ ঘুরে নিজেদের বীচে চলে এসেছে।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কক্সবাজার -টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে অবস্থিত পাটুয়ারটেক সী বীচ। শহর থেকে পাটুয়ারটেক সী বীচের দূরত্ব প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার। এক পাশে পাহাড়, অন্য পাশে সমুদ্র। এ যেন দুইয়ের মিশেলে এক অন্যরকম নৈসর্গিক সৌন্দর্য। সেন্টমার্টিনের মতো রয়েছে প্রচুর জীবন্ত কোরাল। যার কারণে এর চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে পর্যটকদের কাছে।
ইশান এবং মোনার উচ্ছ্বাস দেখছে ইমরান একপাশে দাঁড়িয়ে। ইমরানের অনেক বার আসা হলেও এই দুটি মানুষের জন্য এই প্রথম। শহর থেকে দূরে সমুদ্রের কাছাকাছি কয়েকটা দিন কাটানোর সিদ্ধান্তটা বেশ হয়েছে। নিজের মত করে ওদের পেয়েছে।

রাস্তায় ফেরার পথে মোনার ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে নামটা দেখে মোনা বিরক্ত হলেও অপ্রকাশিত রাখলো।
ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে জুয়েল বলে উঠলো,
– মোনাশা আমার জয়েনিং নেক্সট উইক তোমার সাথে দেখা করে শুভ কাজ শুরু করতে চাচ্ছি।
ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো নিজের কাজে মগ্ন। মোনা স্বাভাবিক গলায় বললো,
– ভাইয়া আমি ঢাকার বাইরে আছি এসে কথা বলবো।
মোনার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে ইমরান চোখ তুলে মোনার দিকে তাকাতেই মোনা হেসে উঠলো। এই ভাইয়া যে সেই ভাইয়া তা বুঝতে আর বাকি রইলো না। দুটো কথার মধ্যে মোনা বাক্য শেষ করে ইমরানের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। মোনা ইমরানের কাছে ঘেঁষে বললো,

– জুয়েল ভাই ছিলো…
– ঠিক আছে।
মোনা মুখ টিপে হাসছে। পুনরায় জবাব দিলো,
– ঢাকা গিয়ে সলভ করে নিব। আপনার টাও, আমার টাও।
– আমার কি প্রবলেম?
– ওই যে রিমি কেইস।
– মোনালিসা একটু বেশি হচ্ছেনা? ওকে আমি সরাসরি নিষেধ করেছি। এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই।
– আপনি জানেন না ও কত সিরিয়াস। এখন না অনেক বছর আগে থেকে।
– তুমি যখন জানতে তুমি দমাও নি কেনো?
– কিসের অধিকারে দমাবো? আপনি কে ছিলেন আমার?
– এখন তো পুরো ইমরান টাকেই নিজের আয়ত্ত্বে নিয়েছো। যেয়ে এসব উটকো ঝামেলা সলভ করে।
মোনা মনে মনে বলছে,
– করবো, এমন ডোজ দিব আপনার নামের সাথে নিজের নাম ও ভুলে যাবে। মনে রাখবে শুধু একটাই নাম, দ্য ওয়ান্ডার উইম্যান মোনালিসা।

রিসোর্টের বাইরে বন্ধুরা আড্ডা দিতে ব্যস্ত। দূর থেকে ইমরানদের আসতে দেখে এগিয়ে এলো। বেশ গুছালো, স্মার্ট একজন রমনী ইমরানকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করছে। ইমরান মোনাকে দেখিয়ে বললো,
– অনন্যা, আমার স্ত্রী মোনাশা ইকবাল। মোনালিসা, কাল জহির অনন্যার কথাই বলেছিলো। তোমরা আলাপ করো আমি একটু আসছি একটা কল এটেন্ড করে।
অনন্যা সরাসরি প্রশ্ন করলো,
– ভালো আছো মোনাশা?
– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ আপনি?
– ভালো। তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে।
– আপনাকেও।
নিজের মেয়েকে দেখিয়ে বললো,
– আমার মেয়ে, তোমার চেয়ে কিছু বছর কম হবে বয়স।
মোনার প্রথম থেকে মনে উপর নিচে ধারনা হতে শুরু হয়েছিলো, এই মহিলার কথার ধরন ভিন্ন। চট করে আন্দাজ বুঝে ইশানকে দেখিয়ে বললো,

– আমার ছেলে আপনার মেয়ের বয়সী। চেনেন তো নিশ্চয়ই।
– তোমার ছেলে হিসেবে চিনিনা তবে ইমরান এবং কাঁকনের ছেলে হিসেবে চিনি।
কথার প্যাঁচ বেড়েই চলেছে। অনন্যার ফিরতি প্রশ্ন,
– সংসার কেমন চলছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
– তা তো অবশ্যই। সব যে এখন তোমার। রাজাও তোমার, রাজ্য ও তোমার। ডোন্ট মাইন্ড জোক্স আ পার্ট।
মোনা হেসে বললো,
– নো ইটস ওকে। কিছু একটা মিসিং আপনার কথায় মিস অনন্যা।
এভাবে নাম ধরে ডাকাতে অনন্যা দৃষ্টি সুক্ষ্ম করে তাকিয়ে বললো,
– কি মিসিং?
– ক্ল্যারিটি।
– কি বিষয়ে?
– মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে আমাকে ইমরান সাহেবের সাথে।
– কষ্ট হচ্ছে তা ঠিক নয়, তবে বেমানান তোমরা। তুমি বেশ সুন্দরী। এরপর ও বয়সের এত ব্যবধানে কাউকে। স্যরি প্লিজ রাগ করোনা। আমি স্পষ্ট কথা বলতে পছন্দ করি৷
– ধন্যবাদ আমি স্পষ্টতা পছন্দ করি। তবে আমি এবং ইমরান সাহেব বেমানান নই, রাজযোটক। আমি যা চেয়েছি সব তার মাঝেই পেয়েছি। আর উনি না চাইতেই আমাকে স্বপ্নের মত পেয়ে গেলেন। ব্যাপারটা চমকপ্রদ। ডেসটিনি। অনেকের ভালো লাগেনা আমাদের একসাথে দেখলে। এক্সাইটিং ব্যাপার হচ্ছে, ইমরান সাহেবের যে এত পাণিপ্রার্থী ছিলো তা বিয়ে না হলে জানতেই পারতাম না। আপনাদের ক্যাম্পাসের অনেকের কথা শুনলাম গতকাল। আপনি ছাড়া কি আরো অনন্যা ছিলো আপনাদের ব্যাচমেট?
অনন্যা চোখ দুটো ক্ষীণ করে বললো,

– আমি ছাড়া ছিলোনা কেউ।
– ওহ তাহলে আপনার কথাই বোধ হয় শুনলাম হয়তো ভুল শুনেছি। কারণ ঠিক হলে তো আপনি ইমরান সাহেবের সাথেই থাকতেন। ডোন্ট মাইন্ড, জোকস আ পার্ট। উফস স্যরি, আরেকটা কথা ভুলে গিয়েছিলাম, ইমরান সাহেব তো সম্পর্কে জড়াতে চায়নি যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের যোগ্য কাউকে পেয়েছেন।
– তুমি নিজেকে খুব চালাক ভাবো?
– উঁহু, ভাববো কেনো, আমি ডেফিনিটলি চালাক। চালাক বলেই রাজা,রাজ্য এবং রাজপুত্র তিনটে নিজের নামে লিখে ফেললাম।
পেছন থেকে ইমরানের ডাক পেয়ে ঘাঁড় ঘুরিয়ে বললো,
– হ্যাঁ আসছি। আচ্ছা আসি, পরে কথা হবে। ভালো থাকবেন। বাসায় আসবেন। আমার রাজ্য দেখতে।
অনন্যা নিজের অপমান সহ্য করতে না পেরে বন্ধুদের মাঝে চলে গেলো। সকলের সামনে খানিকটা চেঁচিয়ে বললো,
– ইমরানের ওয়াইফ, যথেষ্ট বেয়াদপ একটা মেয়ে।
রয়া প্রতিবাদ করে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৫

– কি বলছেন, আমার তো বেশ ভালো ভদ্রই লেগেছে।
– কিসের ভদ্র, মুখে মুখে তর্ক করে।
তৌসিফ হেসে বলে,
– ওহ এই ব্যাপার। আসলে তর্ক করেনা। ঝামা ঘষে দেয়। তোর ও দিলো নাকিরে।
সকলে একসাথে হাসতে হাসতে অনন্যাকে নিয়ে খানিকটা প্রহসন করে নিলো।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৭