প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৬
নীতি জাহিদ
থমথমে গুমোট পরিস্থিতি। সোসাইটির রুমে বাতাসটাও বেশ গরম। গুরুজনেরা সামনে বসে আছে। কিভাবে বিচার করবে বুঝতে পারছেনা। কেউ কেউ ভীত কারণ একজন মেয়ের সাথে কিভাবে কথা বলা উচিত এমন অবস্থায় তা আন্দাজ করে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে সোসাইটির সভাপতি নিরব কারণ দোষ ছোকরা গুলোর। তবে এভাবে বেধড়ক পেটানোও যে ঠিক হয়নি তা এই ছেলে- মেয়ে দুটিকে কিভাবে বুঝাবে। ক্রোধে বিরক্ত হয়ে ইশান সামনে বসে থাকা একজনকে ধমকে বললো,
– চেয়ার ছাড়ুন। আপনাদের বিবেক দেখে আমি অবাক হচ্ছি। অপরাধীর মত দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। আমার মায়ের এই অবস্থায় যেখানে বসে থাকতেই বেশিক্ষন কষ্ট হয়, সেখানে পাক্কা পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষনে বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারতো। কি বিচার করবেন তাড়াতাড়ি করুন৷
কিশোরের মুখে এমন কথা শুনে উপস্থিত সকলে ঘাবড়ে গেলো। ভারী গলায় বেশ শক্ত পোক্ত পুরুষালী স্বর। ইশান চেয়ার টেনে মোনাকে দিতেই আরাম করে বসলো। একজন মুরুব্বি গলা ঝেড়ে কেশে বললো,
– কাজটা কি ঠিক করেছো তোমরা। আইন নিজের হাতে তুলে না নিলেও তো পারতে?
ইশান ভ্রু কুচকে বলে,
– আমি আপনার কথাটা বুঝতে পারিনি, কি বললেন আরেকবার বলবেন প্লিজ?
বৃদ্ধ ঘাবড়ে গেলো। পাশ থেকে আরেকজন পুনরায় একই বাক্য উচ্চারণ করতেই ইশান ক্ষেপে বললো,
– উনি বয়স্ক বলে দ্বিতীয় বার সুযোগ দিয়েছি বলার, আপনাকে তুলে একটা আছাড় দিলে কেমন হবে? আপনার কাছে জানতে চেয়েছি?
মোনা ইশানের দিকে তাকাতেই ইশান বললো,
– স্যরি মা। আমার ভীষণ বিরক্ত লাগছে। সেই সকালে বেরিয়েছি আমরা। তোমার মেডিসিন আছে। ফুফি চিন্তা করছে। অথচ এখানে যাত্রা পালা চলছে। উনারা এমন গাধার মত কথা বলছে কেনো?
সভাপতি বলে উঠলো,
– ছেলে তোমার মুখের ভাষা ব্যবহার যথেষ্ট খারাপ।
ইশান দাঁত খিচিয়ে বলে,
– দোয়া করি রাস্তায় কোনো বখাটে ছেলে যেন আপনার মা,বউ বা মেয়ের ওড়না ধরে টান দেয় এবং আপনাকে এভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় প্রতিবাদ করার জন্য। বাই দ্য ওয়ে, আমি কিন্তু চাইলে খোঁজ নিয়ে কাজটা ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে করাতে পারি, আপনার তাৎক্ষণিক অনুভূতি টা দেখার জন্য।
– ইশান…
– স্যরি মা।
মোনা সবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনারা প্রত্যেকে অভিজ্ঞ। আমার জানা মতে এই পাড়া এবং আমাদের পাড়া দুটোই বেশ নিরাপদ সকালে হাঁটার জন্য। যেহেতু আমার ডেলিভারির সময় কাছাকাছি নিয়ম করে একটু হাঁটতে হয়। নিজের পাড়াতেই হাঁটি। বেশ কিছুদিন শুনলাম আপনাদের পাড়াতে চমৎকার পার্ক হয়েছে। গাছও আছে কয়েকশ। তাই ছেলেকে নিয়ে এলাম। সেই হিসেবে আমরা আপনাদের অতিথি। সেখানে যদি এভাবে লাঞ্চিত হতে হয় আমাকে, বেশ লজ্জাজনক নয় কি?
বয়স্ক মানুষটা বললেন,
– কিন্তু মা এভাবে যে ছেলে দুটো মা/র খেলো, ওদের তো অবস্থা ভালোনা।
– চাচা আমি একটুও দুঃখ প্রকাশ করতে রাজি নই। ওরা যেভাবে ওড়না টান দিয়েছে যদি মাথায় হিজাব না থাকতো আমি সম্ভ্রম বাঁচাতে ওড়না ধরে রাখার চেষ্টা করতাম। দুইটা ছেলেই বাইকে ছিলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি ওড়না ছেড়ে দিয়েছিলাম। এরচেয়ে বড় বিপদ হলে দায়ভার কে নিতো? আপনারা নিতেন?
মধ্যবয়সী একজন বলে উঠলো,
– ওড়না নিয়ে তো চলেই গিয়েছে। ওদের ইট মেরে থামানোর কি দরকারই বা ছিলো আর মারারই বা কি দরকার ছিলো আপনার ছেলের?
মোনা মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রেখে বললো,
– আপনার কপাল ভালো ছেলে আমার লেহাজ করে আপনার মাথা টা এখন ফাটিয়ে দেয় নি।
– এতটুকু ছেলে এভাবে মারতে পারে বিশ্বাস ই হয়না।
ইশান দাঁত খিচিয়ে বললো,
– ওয়েট আ মিনিট, আপনাকে একটু ওদের মতো মেরে দেখাই…
ইশান ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই বসা থেকে সকলে উঠে ইশানকে ধরলো। মোনা থামিয়ে দিলো। ছেলেটার চোখে মুখে রাগের ছটা ভাসছে। যে কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যাবে। এরই মাঝে ওই পাড়ার সভাপতি এসে পড়েছে। বয়স্ক মানুষটা দরজা দিয়ে ঢুকতেই সকলে দাঁড়িয়ে পড়লো। মোনা দাঁড়িয়ে সালাম দিলো। ইশান গা ঝেড়ে সবাইকে সরিয়ে বৃদ্ধকে সালাম দিতেই মানুষ টা জবাব দিয়ে বললো,
– দাদুভাই তুমি এখানে?
প্রথমে না চিনলেও ক্ষনিকের মধ্যে চিনতে পেরে বললো,
– দাদুভাই কি একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থায় আমাদের পড়তে হয়েছে৷ আমি সকালে মাকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছি…
এখানকার সভাপতি ইশানকে থামিয়ে নিজে বলতে চাইলে বয়স্ক মানুষটা তাকে থামিয়ে ইশানের মুখ থেকে পুরো ব্যাপারটা শুনে ক্রোধে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– খবরদার আর একটা কথাও যেন না বাড়ে। বৌমা তুমি হয়তো আমাকে চিনতে পারোনি৷ আমি তোমাদের প্রতিবেশী এডভোকেট গণি মিয়া। সেদিন বাসায় গিয়েছিলাম। তোমার সাথে দেখা হয় নি।
মোনা হেসে বললো,
– চাচা আমি চিনতে পেরেছি। আপনাকে প্রায় ইমরান সাহেবের সাথে দেখি নামাজ পড়তে যান। সেদিনের জন্য দুঃখিত চাচা। শরীর বেশ খারাপ ছিলো তাই দেখা হয়নি।
– আরেহ নাহ বৌমা কি বলো এসব। অনেকক্ষণ হয়েছে এখানে এসেছো। বাসায় যাও। দাদুভাই মাকে নিয়ে যাও। আমি এদিক টা দেখছি। বাসায় পৌঁছে বাবা বা চাচাকে কিছু বলার দরকার নেই ঠিক আছে। দাদুভাই আছি তো সামলে নিব।
– জ্বি দাদুভাই।
ইশান মোনাকে নিয়ে বের হতেই গণি মিয়া ক্রোধান্বিত হয়ে সকলকে বকাঝকা শুরু করলেন। এক পর্যায়ে দুই সভাপতির মধ্যে তর্ক লাগলে গণি মিয়া বললেন,
– দোষ তোমাদের পাড়ার বখাটে গুলোর সেখানে তোমরা মা ছেলেকে কি হিসেবে অপরাধী বানাও। আর জানো এদের পরিচয়?
– কি পরিচয়?
– ইমরান শরীফের ছেলে এবং স্ত্রী। যদি ঘুনাক্ষরেও আজকের ঘটনা টের পায় বুঝতে পারছো কি হবে? আর পুলিশের ভয় কাকে দেখাও। যেই ছেলেকে পুলিশে দিতে চেয়েছো তার চাচাই পুলিশের এসপি। ঘরের মাঝেই এরা সব নিয়ে বসে থাকে, তোমাদের ওই সব বখাটে গুন্ডা মা রতে এদের আইন লাগেনা। এরা একাই তিন/ চারটাকে শুইয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আরেকটা ব্যাপার এত বড় ঘটনা ঘটেই যেহেতু গেছে আপাতত দুই বখাটে ছেলেকে পুলিশে দেয়ার ব্যবস্থা করো। নতুবা দেখবে কালকে সকালে অপরাধকে সমর্থন করার দায়ে তোমরা সবাই জেলে। আমি একজন আইনজীবী হয়ে অপরাধ সাপোর্ট করতে পারবোনা। ইমরান যথেষ্ট ভদ্র, কিন্তু পরিবারের ব্যাপারে বেশ কড়া, সেখানে তোমরা তার কলিজায় হাত দিয়েছো। ও এখানে আসা মানেই তোমাদের কপালে খারাপ আছে৷ ভেবে দেখো কি করবে?
ঘরজুড়ে পায়চারি করছে। অস্থির লাগছে। কিছুক্ষন বারান্দায় যায় তো কিছুক্ষন রুমে বসে৷ ফোন হাতে নিয়ে বাবার সাথে কিছুক্ষন কথা বললো। মনে হলো ভেতরটা শান্ত হলো। মেয়েদের কাছে বাবারা ঔষধের মত কাজ করে৷ সব সমস্যার সমাধান। নিজের বাবার কথাই ধরা যাক। কতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিয়েটা দিলো। দেখতে দেখতে সময় পেরোলো। মোনা মা হয়ে যাবে। সেদিন ইমরানকে দেখলো মন খারাপ করতে।প্রথমে ধারণা ছিলো প্রাক্তনের কথা ভেবে মন খারাপ হয়তো সাহেবের। পরে ধারনা ভুল প্রমানিত হলো যখন দেখলো কাঁকনকে নিয়ে মনে একরাশ আফসোস আর ঘৃনা। তবে মোনা চায়না ইমরান কাঁকনকে ঘৃনা করুক, ইমরানের মনে কোনো কিছু নিয়ে কোনো কষ্ট থাকুক। মানুষটা ভেতরেই সবটুকু কষ্ট লুকিয়ে রাখে। মোনার ভাবনায় ফোঁড়ন কাটলো দরজায় নব ঘোরানোর আওয়াজ। ইমরানকে দেখে মোনা হাসলো খানিকটা। ল্যাপটপ ব্যাগটা রেখে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে মোনার কাছে এসে বুকে টেনে নিলো। কপালে উষ্ণ পরশ দিলো। কিঞ্চিত হেসে প্রশ্ন করলো,
– কি ব্যাপার আজ পরিবেশ এত শান্ত কেনো?
– অস্থির লাগছে? মনে হচ্ছে আমি যদি না থাকি আর তখন আপনি কি আরেকটা বিয়ে করবেন?
অসহায় চোখে ইমরান তাকালো। আর কত অদ্ভুত প্রশ্ন করবে এই মেয়ে! প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত ইমরান। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ঘুরে প্রশ্নের বিষয় মাঝে মাঝে বিশ্বের হীরা,জহরত, আমাজনের বানর, এনাকোন্ডা, জাগুয়ার,চিতা নিয়ে করে। সেদিন বলে বসলো,
– আপনাকে আমি ব্ল্যাক ডায়মন্ড ডাকি কারন আপনি অনেক দামী। কালো মানিক বলতে অনেক দামী স্টোন বুঝায় বুঝতে পেরেছেন। কালো হীরাটা কালো বলেই এত দামী।
এতটুকু কথাকে অতি মূল্যবান ভেবে নিজেকে মনে মনে বোকা সাজিয়ে ইমরান উপর নিচ মাথা ঝাকিয়ে বললো,
– অত্যন্ত মূল্যবান কথা। কালো মানিকের এত গুরুত্ব!
ইমরানের কথা বলার ধরনের মোনা খুশি হয়ে বললো,
– এছাড়া আরো একটা নামেও ডাকি।
– কি সেটা?
– ব্ল্যাক প্যান্থার। আপনাকে চিতার মতো লাগে যখন রেগে যান। অন্ধকারে মনে হয় যেন চোখ গুলো জ্বলজ্বল করে। আমাজন জঙ্গলের কালো চিতা। ওদের চোখ গুলা হলুদ। তবে কালো বিড়াল দেখতে সুন্দর না। আয়নাল মিয়ার মত মিঁয়াও মিঁয়াও করে। অন্ধকারে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হলে চিতাই জিতার কথা কিন্তু জিতবে বিড়াল।
ইমরান হতভম্ব হয়ে বললো,
– কিহ! বিড়াল কিভাবে জিতবে?
– কারণ চিতা রাতে কম দেখে বিড়াল রাতে বেশি দেখে।
ইমরান কথা বলার ভাষা হারিয়ে বোকার মত চেয়ে আছে বুঝতে পারছেনা এমন উদ্ভট কথার প্রত্যুত্তরে কি বলা যায়। শুধু চারটে শব্দ উচ্চারণ করলো,
– ইয়্যু আর জিনিয়াস মোনালিসা।
হাতে ধাক্কা লাগাতে ধ্যান ভেঙে ইমরান নিজেকে প্যারালাল জগত থেকে বাস্তবতার জগতে ফিরিয়ে আনতেই পুনরায় আগের প্রশ্ন,
– কি হল বলুন? আরেকটা বিয়ে করবেন?
প্রতিটি হবু মায়ের একই প্রশ্ন স্বামীকে। বাংলার চিরাচরিত নারীরা সব ভাগাভাগি করবে, পারলে নিজের কলিজাটুকু দান করে দিবে পরোপকার করতে কিন্তু স্বামীকে অন্যের সাথে সইতে পারার চেয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়া তাদের কাছে সহজতর কাজ। ইমরান ঠোঁট চেপে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,
– ঔশান যেহেতু ছোট থাকবে, তার জন্য তো বিয়ে করা উচিত হওয়ার কথা?
ছলছল চোখে মোনা বললো,
– ইশানের জন্য তো করেন নি।
– তখন ব্যস্ততা কম ছিলো। এখন প্রায় প্রয়োজনে ফরেন ট্রিপ দিতে হয়।
অসহায় চোখে মোনা তাকিয়ে আছে। ইমরানের মাঝে কোনো ভাবাবেগ দেখতে পেলো না। চোখের পানিটুকু সামলে নিলেও অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছে। ইমরান পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– বিয়ে করা কি উচিত নয়? যতদূর জানি, তুমি অনেক বাস্তববাদী। বাস্তবতা খেয়াল করলে তো বিয়ে করা প্রয়োজন। সেই হিসেবে আরো দুটি বিয়ে করতে পারবো।
দীর্ঘশ্বাস মোনার। ঠোঁটের কোণে ইষৎ হাসি রেখে বললো,
– বউ মরে গেলে দুটির বেশিও করতে পারবেন।
– তাহলে তো প্রবলেম সলভ।
– পছন্দ আছে আপনার?
– তুমি কি নিশ্চিত তুমি ম/রে যাবে?
তব্দা খেলো মোনা। কি প্রশ্নের কি সমাধান? এভাবে কেউ প্রশ্ন করে? মোনা জবাবে বললো,
– আমাকে কি আল্লাহ বলে দিয়েছেন আমি কবে
ম/রবো?
– যখন জানোই না এত প্রশ্ন করছো কেনো?
– কেনো আপনি কি চান আমি ম*রে যাই?
দাঁতে দাঁত লাগিয়ে চোখগুলো ব্যাঘ্র ক্ষীপ্রতার ন্যায় ক্ষীণ করে এক বাক্যে উত্তর দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো,
– ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেয়া কি অতিশয় প্রয়োজন?
– এভাবে কাউকে এত কাছ থেকে মা হতে দেখিনি। একেক বার মনের অনুভূতি একেক রকম হয়৷ সবাই ভাবে আমি কত স্বাভাবিক। অথচ ভেতরের কষ্ট গুলো কাউকে দেখাতে পারিনা, বুঝাতে পারিনা। সবই তো আছে, কি নেই আমার! যা নেই তা হলো স্বস্তি। আমার মায়ের মত আমিও যদি ঔশানকে একা রেখে যাই।শুনেছি কাঁকন আপাও মা হবে। তাই তো আপনার কাল মন খারাপ হলো।
রুম থেকে বেরিয়ে যেত ইমরান, মোনার কথা শুনে সামনে এগিয়ে এলো। সযতনে দাঁড় করিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
– কাঁকন মা হওয়ার সাথে আমার মন খারাপের কি সম্পর্ক মোনালিসা?
মোনা নিশ্চুপ। মানুষ টার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে মোনা। চোখের গভীরতা পরিমাপ করছে। কি চাইছে মেয়েটা! অতি দ্রুত শ্বাস ফেলছে। ইমরান শক্ত করে ধরলো মোনাকে। বুকের কাছ টাতে এনে গালে হাত দিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে, কি দেখছো? তোমার হার্টবিট এত ফাস্ট কেনো?
নিরুত্তর মোনা। বুকে হাত দিতেই টের পেলো অত্যুগ্র গতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস উঠানামা করছে। মোনার অধরে আলতো স্পর্শ দিলো। নিজেই ভীত হয়ে বললো,
– স্বাভাবিক হও। তোমার কিছুই হবেনা ইনশাআল্লাহ। আবার আমার বুকে ফিরে আসবে।
কথা বলার আগে এত ভেবে চিনতে বলা মানুষটাও অযাচিত প্রশ্নে ধৈর্য্য হারিয়ে আপন মানুষকে আঘাত করে ফেলেছে। সামান্য কটা শব্দ নিতে পারছেনা এই মেয়ে। মনের অবস্থা ভিষণ নাজুক। ইমরান নিজেই খেই হারিয়ে ফেলে মাঝে মাঝে বউকে সামলাতে।
– কথা বলবেনা মোনালিসা?
মোনা দুপাশে মাথা নাড়ে৷ কাঁকনের কথা এখনী মনে চেপে বসে আছে। ব্যাপারটা খোলাসা করা উচিত বলে মনে করে বলে উঠলো,
– কাঁকন আমার একসময়ের ভালোবাসার একজন ছিলো। সম্মান এবং ভালোবাসা দুই হারিয়েছে। ভালোবাসা বদলায়। ইমরানের রক্ত ক্ষরণ হয়েছে বহুবার, বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিটি অঙ্গ জানে মোনালিসার গুরুত্ব। জ্বরের ঘোরে যখন মোনালিসাকে ডাকি আশপাশের মানুষ লজ্জা পেয়ে যায়। আইরিন আপা বলে, ইমন অসুস্থ হলে বাচ্চাদের মতো বিহেভ করে। তুশিও সেদিন তোমাকে বলতে শুনলাম, ভাইয়া তো ভাবী তোমাকে ছাড়া কিছুই বুঝেনা। মোনাশা ইকবাল ইমরান শরীফের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, প্রশ্নটা সেখানেই ঠেকে। ক্লিয়ার?
মোনাকে খোঁচা মেরে বললো,
– কাঁকন আপা, আপনার শ্রদ্ধেয় বড় আপা। দেখা হলে আমার অন্তরালে কাঁকন আপাকে প্রশ্ন করবেন, কখনো কি তাকে ডেকেছি অসুস্থতায়?
এত কথা বলার পরো মোনা মুখ দিয়ে টু শব্দ বের করছেনা। ইমরান মাথায় হাত বুলাতেই পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– আরেকটা বিয়ে করবেন?
নিম্নোষ্ঠো দাঁতে চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টায় আছে ইমরান। মোনালিসা তাকাতেই গাম্ভীর্য সত্তা টেনে মেয়েটাকে স্বাভাবিক করতে বললো,
– প্রত্যেক প্রাণীই ম রবে। কে আগে যাবে, কে পরে যাবে মহান আল্লাহই জানেন। তবে তুমি যেমনটা ভাবছো তার উত্তর হলো, যদি এমন কিছু হয় ইশানের সময় যেভাবে সবটুকু দিয়ে বড় করেছি, ঔশানকে নিজের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে বড় করবো ইনশাআল্লাহ। বাকি রইলো বিয়ে করার কথা। গত এক বছরে যা স্মৃতি দিয়েছো তা কি এক জীবন বাঁচার জন্য যথেষ্ট নয়? চেনো না তুমি ইমরান সাহেবকে? তার কি চাওয়া পাওয়া অনেক বেশি? আমার তো মনে হয় এই স্মৃতি নিয়েই আবার হাশরের ময়দানে উঠবো আর ইনশাআল্লাহ চাইবো যেন জান্নাতে মোনালিসাকেই পাই।
এতটুকু শুনে ইমরানকে নিজের ছোট্ট দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ইমরান হেসে উঠলো। ভাবে মেয়ে জাতির এত প্রকারভেদ কেনো? দুই মায়ের অনুভূতি দু রকম। এক মা ভাবছে সন্তানের ভবিষ্যৎ আর স্বামী হারানোর বেদনা আর অন্য মা ভেবেছিলো জন্ম দিয়েই কিভাবে ছবির শ্যুটিং এর জন্য প্রস্তুতি নেবে। রহস্যময়ী নারী৷ এক নারীতে পৌষমাস, অন্য নারী সর্বনাশ। নানান নারীর, নানান ধরণ।
মোনা হি হি করে হেসে বললো,
– বিয়ে করবেন না বললেই তো আমি খুশি হয়ে যেতাম। এত কঠিন কথা বলেন কেনো?
– হ্যাঁ আরেকটা বিয়ে করে নিজের কপালে শনি ডাকি। এমনি আমার বৃহস্পতির দশা কাটছেনা। উদ্ভট সব প্রশ্ন করে বেকায়দায় ফেলে দাও। তোমার কি বিবেকে ধরেনা বুড়ো বয়সে আমি কিসের আনন্দে বিয়ে করবো?
– করতেই পারেন। আপনার চেয়ে বেশি বয়সে করছেনা? আর আপনার তো অনেক প্রেয়সী।
– থাকতেই পারে। তবে মোনালিসা তো পাবোনা।
– পেতেই পারেন৷ আমি তো ভালো না, ভালো লইয়া থাকেন।
– এত নাটক কিভাবে পারো মোনালিসা!
মোনাকে বিছানায় বসিয়ে ইমরান টেবিলের উপরে থাকা জগ থেকে পানি ঢালছে। গ্লাস মোনার দিকে বাড়িয়ে বললো,
– পানিটা খেয়ে নাও। অহেতুক শক্তির অপচয় ঘটিয়েছো। শুনলাম মা ছেলে নাকি পাশের সোসাইটির বখাটে ছেলেদের মা/রার মত মহৎ কাজ করেছো?
মোনা পানি খেতে গিয়ে বিষম খেলো। নিজে নিজেই মাথার অগ্রভাগে হাত দিয়ে আলতো চাপড় দিয়ে শান্ত হলো ইমরান এগিয়ে এসে বললো,
– আস্তে৷
টিস্যু হোল্ডার থেকে টিস্যু নিয়ে মোনার নাক চেপে ধরে বললো,
– আল্লাহ আমার কন্যাকে রক্ষা করুন, তোমাদের দুই দস্যুর হাত থেকে। ওটাকে তো ডোজ দিয়ে এসেছি। তোমাকে কি ডোজ দিতে পারি বলো?
মোনার ফোন বাজছে। শুকনো ঢোক গিললো। ইমরান সেদিকে তাকিয়ে বললো,
– ফোনটা তোলো। তোমার গুণধর পুত্র ফোন দিয়েছে।
– পরে কথা বলবো।
– এখনি বলো, স্পিকারে রাখো?
চোরের মত মুখটা করে ফোন তুললো। ও পাশ থেকে ইশান বললো,
– মা তুমি ঠিক আছো? মিসাইল তোমার দিকে গিয়েছে আমাকে শাসিয়ে।
চক্ষুছানাবড়া ইমরানের। মটু, পাতলু, ব্ল্যাক ডায়মন্ড, প্যান্থার, শেষমেষ মা-ছেলে তাকে মিসাইল ডাকে! ভ্রু কুচকে এলো। মোনা কথা বলছেনা শুধু উত্তরে বললো,
– হুম
ইশান পুনরায় বললো,
– শোনো যাই বলুক না কেনো মুখ খুলবে না। শুধু জানে আমরা মে/রেছি। মুখটা কিউট করে রাখবে। বকা দিতে পারবেনা। ঠিক আছে?
– হুম।
– আমার উপর দিয়ে রোলার চালিয়েছে। আমি বাধ্য ছেলের মতো ছিলাম দেখে বেঁচে গিয়েছি। তুমিও সেরকম থাকবে। ঠিক আছে?
– হুম
– মা কি হলো বলো তো! শুধু হুম হুম করছো?
মোনার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ইমরান বললো,
– মিসাইল আপনার মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আসছে আপনার দিকে। দরজা খুলুন।
জিহবায় কামড় দিয়ে ইশান ফোন রেখে দিয়েছে। ইমরান ফোন হাতে নিয়ে মোনাকে সহ রুম থেকে বের হলো। এর মাঝে দেখলো ইশান ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। মোনাকে কোলে তুলে নামাতে চাইলে সে নামবেনা বলে বায়না ধরলো। এদিকে ইমরান চালাকি বুঝে গিয়েছে। মোনা ইচ্ছে করে দেরি করাচ্ছে যাতে ইশান পালাতে পারে। জোর করে মোনাকে কোলে তুলে সিড়ি বেয়ে ড্রইংয়ে নেমে এলো। সোফায় বসিয়ে খপ করে ছেলের হাত ধরে বললো,
– কি কথা লুকিয়েছো আমার কাছ থেকে বলো?
মোনা ইশারায় ছেলেকে বারণ করছে। ইশান মুখ খুলছেনা। এদিকে বাড়ির বাকিরা ছুটে এলো। ইমরান ছেলেকে ধমকে বললো,
– আজকে কিন্তু খুব বকবো। কি করেছো বলো?
ইশান মুখটা পেঁচার মত করে বললো,
– ছেলেগুলা হাসপাতালে ভর্তি।
ইমরান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে বললো,
– কিভাবে মে রেছো যে হাসপাতালে ভর্তি!
– হাত ভেঙে দিয়েছি।
– টিজ করেছে বলে হাত কেনো ভেঙেছো? চড়, থাপ্পড় অবধি সীমাবদ্ধ থাকলেই পারতে।
এবার দুজনই চুপ। আইরিন আশকারা দিয়ে যাচ্ছে, যা করেছে বেশ করেছে। আর কাউকে উত্যক্ত করবেনা ছেলে গুলা। ইমরান ইশানকে ধমকে বললো,
– কি হলো উত্তর দাও।
মোনার বারনের সত্ত্বেও ইশান মুখ খুললো,
– ওরা মায়ের শরীর থেকে ওড়না টান দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।
মোনা মাথায় হাত দিয়ে রেখেছে। মুখ খুলে ফেললো। ইশতিয়াক চেঁচিয়ে উঠলো। সোহান ও ক্ষেপে গেলো। ইমরান হাত দিয়ে ভাই এবং ভাগ্নেকে থামিয়ে ইশানের কাঁধে হাত রেখে বললো,
– গুড জব।
ইশান মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো চমকে গিয়ে। মোনা হতচকিত হলো। ইমরান সোফায় বসে সবাইকে বসার ইশারা দিয়ে বললো,
– মোনালিসা কটা দিন ভেতরে থাকো। ইশান মাকে নিয়ে বাগানে হাঁটবে অথবা আমাদের পাড়াতেই। ওদিকে যেওনা। ডেলিভারির আগে চাচ্ছিনা কোনো ঝামেলা হোক। ঠিক আছে?
– জ্বি পাপা।
তখনো বাকিরা বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইশান বাবার গুড জব শুনে চমকে আছে। মনটা আকুপাকু করছিলো বাবার কাছ থেকে আরেকটু কিছু শুনতে। ইশানকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইমরান বললো,
– ছেলে দুটোর হাত কি ভালো হবে?
বাবার পুনরায় প্রশ্নে উৎসাহী হয়ে বললো,
– জানিনা পাপা।
– কাউকে দিয়ে খোঁজ নেওয়াও। যদি না ভাঙ্গে গিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে আসবে। সেই হাত যেন আর কোনো মেয়ের সম্ভ্রমে আঘাত না হানে। ক্লিয়ার!
– ইয়েস পাপা।
মোনা আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি শেখাচ্ছেন ছেলেকে?
– হাউ টু বি আ রেসপন্সিবল জেন্টেল ম্যান।
ইশানের ঠোঁটের কোণে হাসি। ছুটে এসে বাবাকে ঝাপটে ধরে বললো,
– ইনশাআল্লাহ পাপা, আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট। আ’ম ব্লেসড টু হ্যাভ ইয়্যু ইন মাই লাইফ পাপা, আই লাভ ইয়্যু।
– লাভ ইয়্যু ঠু মাই জান।
মোনা অদ্ভুত চোখে দেখছে। কিছুক্ষণ আগেই মোনাকে রাগালো উপরে বিয়ে নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বলে, ইশানকে বকা দিলো মারপিটের জন্য কিন্তু যখনই শুনলো ব্যাপারটা সম্মান আর সম্ভ্রম রক্ষার, কতটা শক্তপোক্ত রায় ঘোষণা করলো। এর আগেও যতবার মোনার সম্মানে লাগার মত কাজ কেউ করেছে ততবারই আড়ালে কিছু না কিছু করেছে সেই খবর মোনা পেয়েছে। আজ তো সরাসরি হুকুম দিলো। হয়ত প্রকৃত বাবারা এমনই হয়। সন্তানকে এগিয়ে যেতে এভাবে ছায়ার মত পাশে থেকে উপদেশ দিয়ে যায়। একজন রুখে দাঁড়ালে আরো হাজারটা সন্তান শিখবে। এভাবে হয়তো ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসবে।
মোনা ভাবুক গলায় বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৫
– সেই তো ছেলেটাকে মারপিটই শেখালেন। এতে কি সমাজ পরিবর্তন হবে?
ইমরানের শেষ বাক্যে সকলে হেসে সায় দিলো,
– সমাজ পরিবর্তন আকস্মিকতায় হয়না, ধীরে ধীরে সেই পরিবর্তনে সকলের অংশগ্রহনের মুখ্য ভূমিকা থাকা জরুরি। তবে আগানোর সাহসটা কাউকে না কাউকে আগে দেখাতে হয়।
