Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১২

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১২
সাইদা মুন

দরজা দিয়ে কলেজ ইউনিফর্মে ঢুকছে লম্বা, চওড়া, চিকন চাকন বডির এক ছেলে। মেহরীন তাকে দেখে ভয়ে ঢুক গিলে কয়েকবার। ছেলেটি আর কেউ না, চেয়ারম্যানের ছোট ছেলে রাফি তালুকদার। আগে প্রায়শই তার বড় ভাই তাকে বিরক্ত করত, রাস্তায় ছেলেপেলে নিয়ে আটকে দিতো, ভয় দেখাতো যেন পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। অবশ্য এসবের পেছনে তার চাচীরই হাত ছিল। কিন্তু এখন একে এখানে দেখে ভয় হচ্ছে, সেদিন গ্রামে সবার সামনে তালহা বড় গলায় বলে এসেছিল, “মেহরীন তার বউ”। এখন যদি সে সবার সামনে মুখফসকে বলে দেয়, তাহিয়াও তো আছে শুনে ফেললে বিপদ।

রাফি কেবল ক্লাসে ঢুকে, দু’কদম এগোতেই সামনে মেহরীনকে তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চমকে যায়। কয়েকবার চোখের পলক ফেলে বোঝার চেষ্টা করে এটা কি মেহরীন? যখনই বুঝল,এ তো সত্যি মেহরীন, সাথে সাথে তেড়ে আসে তার দিকে। রেগে ধাক্কা মারতে হাত বাড়াতে বাড়াতে চিল্লিয়ে উঠল,
–তুই গ্রাম ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলি, তোকে তো আমি…

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বলতে বলতে যেই না মারতে যাবে, অমনি মেহরীনের সামনের বেঞ্চে একা বসা এক মেয়ে হুট করে উঠে দাঁড়ায়। রাফিকে এভাবে তেড়ে যেতে দেখে দু’হাত দিয়ে শরীরের সব শক্তি জোগ করে তার বুক বরাবর সজোরে ধাক্কা মারে।
হঠাৎ আক্রমণে রাফি পিছিয়ে গিয়ে ধপ করে নিচে পড়ে যায়। এদিকে মেহরীন ভাবেনি যে ভড়া ক্লাসে এভাবে মারতে আসবে। তবে যেই দেখল একটা মেয়ে রাফিকে ঠেলে ফেলেছে, সে আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। দ্রুত পা এগিয়ে গিয়ে খপ করে তার চুল টেনে ধরে। সাথে ওই মেয়েটিও যোগ হিয়ে রাফিকে কিল-ঘুষি দিতে লাগে। তাহিয়া আকস্মিক ঘটনায় কিছুই বোঝে উঠতে পারছে না। তার মাথায় একটাই কথা হচ্ছেটা কি।
তবে ছেলেটিকে দুজন মিলে মারছে দেখে তাহিয়া ভড়কে যায়। কলেজের প্রথম দিনেই কি তাদের নাম ব্যাড লিস্টে চলে যাবে, ভাবতেই ভয়ে দ্রুত গিয়ে মেহরীনকে আটকায়। পাশের কয়েকজন মেয়েও এগিয়ে এসে সেই ফারিন নামের মেয়েটিকে থামায়।

রাফিকে কয়েকটা ছেলে তুলে বেঞ্চে বসাতেই সে ব্যথায় “আহহ” করে উঠে। আবারও ফারিন এগিয়ে আসে মারতে তবে তাকে আটকে দেয় কয়েকজন, বজ্রকণ্ঠে সে বলল,
–সাহস তো কম না মেয়েদের গায়ে হাত তুলতে আসিস। এই সাহস দ্বিতীয়বার দেখালে হাত ভেঙে দিবো।
তার কথার মাঝেই রাফি গালের ঘুষি খাওয়ার জায়গায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে থাকে,
–এই মহিলা আক্তার বেডি আমি কি তোকে মারতে গিয়েছি। শা*লি মেহরীনের বাচ্চা তোর জন্য মাইর খেতে হয়েছে, আহহহ। তোর কপালে বান্দর জুটুক কথায় কথায় ঠাস ঠাসস দিবে।
পাশে থাকা মেয়েটি রাগী কন্ঠে বলল,

–তো ওই মেয়েটাকে মারতে যাবে কোন সাহসে?
–ও আমার পরিচিতরে বইন। আম্মা দেখো প্রথম দিনেই তোমার ছেলের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে গো।
রাফির বিলাপ শুনে মেহরীন এগিয়ে এসে বলল,
–ভালো হয়েছে, এইটের ফাইনাল এরপর কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলি। তোর ভাই কি পরিমান জ্বালিয়েছে জানিস।
রাফি থেমে পিটপিট চোখে তাকিয়ে বলল,
–আব্বা আমাকে হুট করে এখানে আপার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছিলো। পরে এখানেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। আর যাওয়া হয়নি।
মেহরীন সন্দিহান চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

–সেদিন যে গ্রামে গেলাম তখন ছিলিনা?
রাফি কপাল কুচকে বলল,
–কোনদিন? আমি তো সেই রেজাল্টের সময় গেছিলাম। এরপর আর যাইনি গ্রামে।
কথাটা শুনতেই মেহরীন বুঝে যায় তাহলে সে এসব কিছুই জানেনা। যাক তাহলে আর ভয় নেই ভেবে পানির বোতল রাফিকে এগিয়ে দেয়। পাশে থেকে ফারিন কৌতুহল নিয়ে বলল,
–এই ছেলে কি তোমার পরিচিত?
–হ্যা, আমার ফ্রেন্ড।

মেহরীনের কথা শুনে ফারিন কিছুটা থতমত খেয়ে যায়। ভুল জায়গায় সাহসিকতা দেখিয়ে ফেলেছে সে, এজন্যই তার মা পইপই করে বলে পাঠিয়েছিলো “স্কুলের কাহিনি যেনো রিপিট না হয়”। এখন তার গিল্টি ফিল হচ্ছে ভীষণ হুদাই মারলো। আমতা-আমতা করে বলে,
–আসলে সরি আমি…
আর কিছু বলার আগে মেহরীন থামিয়ে দেয় হেসে বলল,
–একদম সরি বলতে হবে না, ভালো করেছো, একে এমনিই মারতাম আমি। আমার বদলে নাহয় তুমি মেরে দিলে। যাই হোক এসব বাদ দাও, তোমার নাম কি?
তার কথায় ফারিনও হেসে উঠে,

–আমার নাম ফারিন চৌধুরী, তোমার?
–আমার নাম মেহরীন মাহা।
পাশ থেকে তাহিয়া উঠে বলল,
–আর আমি তাহিয়া সিকদার।
তাদের সাথে সাথে রাফিও বলল,
–আর আমি রাফি তালুকদার।
তার কথায় তিনজনই তার দিকে তাকায়। মেহরীন ব্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,
–তোকে কেউ জিজ্ঞেস করেছে?

রাফি বেচারা মুখ ভোতাঁ করে বসে থাকে। তা দেখে তিনজনই হেসে উঠে। একটু আগের ঘটনায় ক্লাসের অনেকেই উৎসুক নয়নে তাকিয়ে ছিল, তা দেখে মেহরীন মেকি হেসে সবাইকে বলে তারা সবাই ফ্রেন্ডস সিরিয়াস কিছুনা।
ফারিনের সাথে তাহিয়া মেহরীন বেশ মিশে গেছে, মেয়েটি ধারুণ মিশুক প্রকৃতির। সব দিক থেকেই যেনো তাদের সবার ভাইব মিলে গেছে। প্রথম দিনেই সবাই ফ্রেন্ড হয়ে গেছে। রাফিকেও তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এক কথায় প্রথম দিনেই তাদের চারজনের একটা গ্যাং গড়ে উঠেছে।

বেশ ভাল লাগা, আনন্দ, ফুর্তি নিয়েই কলেজের প্রথম দিনটা কাটে। ছুটির সময় তালহা এসেছে তাদের নিতে। দুজনকেই খুশি খুশি দেখে সে বুঝে নেয়, ভালোই কেটেছে তাদের। বাড়ি ফিরতে একে একে সকলেই জিজ্ঞেস করে কেমন কেটেছে প্রথম দিন। তারাও এক্সাইটেড হয়ে কলেজ নিয়ে বলতে লাগে।
সন্ধ্যাবেলা পড়তে বসেছে। তবে একসঙ্গে বসে পড়া কম, গল্প করা বেশি হচ্ছে তাদের। এভাবেই প্রায় এক ঘণ্টা চলে যায়। তারা একইভাবে একটু পড়ছে তো গল্প হাসাহাসি করছে। তবে হঠাৎ তালহার আগমনে দুজনই থেমে যায়। তালহা গম্ভীর কন্ঠে বলল,

–পড়া রেখে গল্প করা হচ্ছে? আলাদা করে দিবো দুজনকে?
দুজনই ভয়ে হালকা চিৎকার করে ওঠে,
–না না…
তালহা গায়ের কোট খুলে এক হাতে নিয়ে এগিয়ে এসে ফিজিক্স বই খুলে। নিউটনের সূত্র বের করে তাদের সামনে রেখে বেড়িয়ে যেতে যেতে বলল,
–পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। এসে সূত্রগুলো ধরাবো। না পারলে…
শেষের টুকু কিছুটা গরম ভঙ্গিতে বলে চলে যায় নিজের রুমে। মেহরীন তার যাবার দিকে তাকিয়ে, মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছে সে। চুল অগোছালো, শার্টের উপরের বোতামও খুলা কয়েকটা। বেশ লাগছিল তাকে। এই লোকটাকে তার সবভাবেই ভালো লাগে। তবে তার ভাবনা কাটলো তাহিয়ার গুতায়,

–পরে দেখিস, আগে সূত্র মুখস্ত কর। নয়তো ভাইয়া কানে ধরাবে।
কানে ধরাবে কথাটা শুনেই মেহরীন চোখ বড় করে তাকায়,
–কি বলিস, এতো বড় মেয়েদের কানে ধরাবে? হুর না।
তাহিয়া বই বের করতে করতে বলল,
–আমার ভাইকে আমি চিনি, চুপচাপ পড়। আর বিশ্বাস না হলে শিখিস না প্র্যাকটিক্যাল প্রমাণ পাবি।
তার কথায় মেহরীন মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না না’ করে উঠে। বাপরে, তালহার সামনে কানে ধরলে তার মান-সম্মান কোথায় যাবে। এর থেকে পড়া শেখাই ভালো। অতঃপর দুজনে মন দেয় পড়ায়।
প্রায় দশ মিনিট পর দরজায় কারো উপস্থিতি টের পেয়ে দুজনেই সেদিকে তাকায়। তারা ভেবেছে তালহা হয়তো। তবে তাহসানকে দেখে তাহিয়া জিজ্ঞেস করল,

–ভাইয়া কিছু লাগবে?
তাহসান তাহিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে এগিয়ে গিয়ে মেহরীনের দিকে মুখ করে বলল,
–আমাকে এক কাপ কফি বানিয়ে দিবে মেহরীন?
মেহরীন হাসিমুখে কিছু বলতে গেলে তার আগেই পেছন থেকে কেউ কর্কশ কণ্ঠে বলল,
–সে পড়ছে চোখে লাগছে না?
তাহসান পেছনে ঘুরে দেখল তালহা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। সে ভেবেই পায় না, যখনই মেহরীনের সঙ্গে কথা বলতে আসে, কোথা থেকে যেন তালহা এসে হাজির হয়। মেহরীনের ব্যাপারে তালহার এতটা নাক গলানো সহ্য হয় না তার।
তাহসান শান্ত কণ্ঠে বলল,

–কফি বানাতে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট লাগে।
তালহা দুই হাত গুঁজে দরজায় হেলান দিয়ে বলল,
–তোহ, তুই বানা, নয়তো খালা আছে, খালাকে বল।
তাহসানের চোখমুখ শক্ত হয়ে আসে। কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলল,
–তুই যখন মেহরীনকে কফি বানাতে পাঠাস, তখন তো কেউ কিছু বলে না। এখন এতো কথা কিসের?
–মেহরীন নিজ থেকে আমার জন্য করে আনে, আমি তো কোনোদিন বলিনি আমার জন্য কফি বানাতে।
কথাটা বলেই মেহরীনের দিকে তাকাল, তা দেখে মেহরীন ফরফরিয়ে বলতে লাগল,
–হ্যা হ্যা, উনি আমাকে বলেনা তো আমিই নিজ থেকে বানাই। আচ্ছা দাড়ান, আপনাকে বানিয়ে দিচ্ছি।
যেই না মেহরীন উঠে যেতে চাইল, তালহা ধমক দিয়ে বলল,

–স্টপ, তোমাকে বলেছি উঠতে? না পড়ার ধান্দা করছো?
মেহরীন হালকা কেঁপে বসল। মুহুর্তে মন খারাপ হয়ে যায়। এই প্রথমবার তালহার ধমক খেয়েছে। যদিও খুব জোরে ছিল না, তবু কণ্ঠে ছিল রাগ। আর বড় কথা ভালোবাসার মানুষের থেকে ধমক খেয়ে বুঝি মন খারাপ হবেনা। মেহরীনের মুখ চুপসে আছে, ঠিক যেমনটা হয় যখন খুব কাছের কেউ হুট করে বকা দেয়। এর মাঝে তালহা বড় গলায় খালাকে ডাক দিল কয়েকবার।
তিনি আসতেই বলল,

–খালা, একটু কষ্ট করে দুই কাপ কফি বানিয়ে দিও। এক কাপ তাহসানের রুমে, আরেক কাপ এখানে।
বলতে বলতেই সে টেবিলের মাঝের চেয়ারে বসে পড়ে। দুই পাশে তারা দু’জন, আর মাঝে তালহা। এবার সে দুজনের সামনের ফিজিক্স বইটা বন্ধ করে দেয়। প্রথমেই তাহিয়াকে জিজ্ঞেস করল,
–প্রথম সুত্রটা বল।
ভাইয়ের প্রশ্নে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়,
–কোনো বস্তুর উপর বাইরে থেকে কোনো বল প্রয়োগ না করা পর্যন্ত, বস্তু তার স্থির অবস্থা বা সমবেগে সরলপথে চলার অবস্থা বজায় রাখে।

–যেমন?
ভাইয়ের প্রশ্ন বুঝতে না পেয়ে তাহিয়া ভয়ে ভয়ে তাকায়। তাকানো দেখে তালহা ফের বলল,
–একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝা।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে কলম হাতে নিল। এটা তালহার পড়ানোর নিয়ম, ছোট থেকেই তার ভাই পড়ানোর সময় বাস্তব উদাহরণসহ পড়াতো। তার ধারণা, বাস্তব উদাহরণ সহ পড়লে মনে থাকবে জীবনভর। কলমটি টেবিলে রাখল তাহিয়া,
–যেমন, এই কলমটা ধাক্কা না দেওয়া পর্যন্ত একই অবস্থায় থাকবে…।
তাহিয়ার হতেই এবার মেহরীনের দিকে তাকাল। মেহরীনের এমনি গলা শুকিয়ে আসছিল। তালহার তাকানোতে যেন আরও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তালহা গম্ভীর গলায় বলল,
–তুমি তৃতীয় সুত্রের ব্যাখ্যা দাও।
প্রশ্ন শোনার সঙ্গে সঙ্গে মেহরীন শুকনো ঢুক গিলে ফরফরিয়ে বলতে লাগে,

–যখন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করে, তখন দ্বিতীয় বস্তুটিও প্রথম বস্তুর ওপর ঠিক ততটা এবং বিপরীত দিকে একটি বল প্রয়োগ করে।
টানা বলার পর জুড়ে একটা শ্বাস ফেলে। বুক ধরফর করছে, তালহার সামনে কেমন জানি জড়তা কাজ করে। সে এতো কাছে বসে থাকায় অনুভূতিগুলো যেনো আরও জাগ্রত হচ্ছে।
তালহা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শুনে বলল,
–উদাহরণ?
মেহরীন বিপদে পরে। সে বলের উদাহরণ জানে, কিন্তু বল কই পাবে, ভাবনায় পড়ে যায়। তাকে চুপ থাকতে দেখে তালহা কলম দিয়ে টেবিলে হালকা শব্দ করল। মেহরীন কিছুটা চমকে তাকায়। তালহা তার দিকে প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে। পরমুহূর্তেই কিছু একটা ভেবে হাত বাড়িয়ে তালহাকে বেশ জুড়েই একটা চিমটি মেরে দিল। তার হঠাৎ আচরণে তালহা অবাক। নড়েচড়ে উঠে ঝারি মারল,

–স্টুপিড, কি করছো।
মেহরীন মাথা নিচু করে ফেলে, ভয়ে মিনমিনিয়ে বলল,
–এই যে আপনাকে আমি চিমটি দিলাম, তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবে আপনি একটা ঝারি দিলেন। এটাই নিউটনের তৃতীয় সুত্র।
তালহা যেনো তাজ্জব বনে গেল। উদাহরণ দিতে আর কিছু পেল না, তাই বলে চিমটি। তাহিয়া তো রীতিমতো মুখ টিপে হাসছে। তা দেখে তালহা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে আবার পড়ায় মন দিল। এভাবেই প্রায় দুই ঘন্টা পড়াল।
তালহা উঠে যেতেই দুজনে শান্তির নিশ্বাস ফেলে। মেহরীন তো একদম ঘেমেই গেছে ভয়ে,
–তোর ভাই যদি আমাদের কলেজে টিচার হয়, সব স্টুডেন্ট একদম সোজা হয়ে যাবে। বাপরে, এমনিতেই দেখতে গম্ভীর রাগী, পড়ানোর সময় তার থেকেও বেশি রাগী।
তার কথায় তাহিয়া হেসে উঠল,

–ভাইয়া পড়ালেখার সময় খুব সিরিয়াস।
–দেখলামই, মনে হচ্ছিলো কোনো রাগী টিচারের ক্লাসে বসে আছি, মাথা এদিক-সেদিক করলেই ধমক।
তাহিয়া আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
–ভাইয়ার রাগ দেখেই হাওয়া ফুস হয়ে গেল নাকি?
তাহিয়ার ইঙ্গিত বুঝে বলল,
–এহহহ হুর, এতো সহজ নাকি।
উঠে দাঁড়িয়ে জানালার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
–আমি উনাকে ভালোবাসি, মানে পুরো উনিটাকেই ভালোবাসি। সেই উনিতে যা যা আছে সবই নিয়েই ভালোবাসি।
–বইন, ভাইয়ার প্রতি তোর পাগলামি তো দেখছি দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে।
মেহরীন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

–হয়তো, তবে দিনকে দিন অনুভূতিগুলো বেড়ে চলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এতো এতো সব জমে থাকা অনুভূতিগুলো কোনদিন না ব্লাস্ট মেরে আমাকেই উড়িয়ে দেয়।
তাহিয়া হেসে উঠে। তবে তার মাথায় একটাই চিন্তা, তার ভাই কি মেহরীনকে মেনে নেবে? দুজন দুই মেরুর, আর বড় কথা ভাই যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে থাকে? মেহরীন কি মেনে নিতে পারবে। ভাবতেই সে মেহরীনকে বলল,
–কারো প্রতি এতো আসক্ত হতে নেই মেহু। ঠিকাছে ভালোবাস তবে নিজেকে শক্ত রেখে। ভাইয়ার দিক তো তুই জানিস না, তাই সেই অব্দি নিজেকে সামলে রাখ।

মেহরীন তপ্ত শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ে। সেও এই কথাগুলো ভাবে তবে মন তো সেই কথা শুনে না। দিবানিশি স্বপ্নে তাকে নিয়ে কল্পনা করতে ভীষণ ভালো লাগে। কল্পনাতে নিজেদের ছোট্ট সংসার সাজাতে ভালোই তো লাগে। এগুলো তাকে সুখ দেয়, আনন্দ দেয়। মাঝে মাঝে ভাবে মানুষটা কি জাদুকর। তাকে নিয়ে ভাবলেই সে হ্যাপি হয়ে যায়।
সেই রাতে খাওয়া শেষ করে মেহরীন তালহার জন্য কফি বানাতে রান্নাঘরে যায়। দুধ গরম বসাতেই তাহসানের আগমন ঘটে। মেহরীনকে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
–কি করছো, ঘুমাওনি এখনো?
–ওই আরকি, কফি বানাচ্ছিলাম ভাইয়া।
–কার জন্য?
মেহরীন হাসিমুখে বলল,
–উনার জন্য।
–উনি কে?
মেহরীন কিছুটা থতমত খেয়ে যায়। উনি বলতে তো সে তালহাকে বুঝায়। তবে এখন সে কি বলবে তালহা? নাকি সাথে ভাইয়া লাগাবে। কিন্ত তালহাকে তো সে ভাইয়া বলে ডাকেনি কোনোদিন। ভাবনার মাঝেই আমতা-আমতা করে বলল,

–ত..তালহা ভ…
বাকিটুকু বলার আগে তাহসান চোখমুখ কুচকে প্রশ্ন করল,
–তালহা বলেছে করতে?
মেহরীন মাথা ডানে-বামে নেড়ে বলল,
–না, প্রতিদিন এই টাইমে উনি কফি খান, তাই নিজে থেকেই বানাচ্ছিলাম।
তাহসানের মনে প্রশ্ন জাগে মেহরীন কেনো তালহার এতো খেয়াল রাখে। তবে পরমুহূর্তেই মাথায় আসে যে তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে ভালো একটা লাইফ দিলো। তার জন্য করবেই তো স্বাভাবিক। তাহসান হালকা হেসে বলল,
–আমাকে এক কাপ দিতে পারবে?
–কেনো নয়, বসুন, বানিয়ে দিচ্ছি।

–না, এখানেই থাকি। তোমার বানানো হতে হতে আমরাও টুকটাক গল্প করি।
মেহরীন সরল মনে মাথা নাড়ে, তা দেখে তাহসান খুশি হয়ে যায়। তাহসান একের পর এক প্রশ্ন করছে, মেহরীনও নির্দ্বিধায় উত্তর দিচ্ছে। আর কেউ একজন কড়া চোখে করিডোর থেকে এসব কাহিনি দেখছে।
তালহা করিডোরে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে তার চোখ। হঠাৎ ভীষণ গরম লাগছে, কেনো বুঝতে পারছে না। অসুস্থি হচ্ছে, কিছুটা নড়েচড়ে টিশার্ট টেনে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।
মেহরীন কফি এক কাপ তাহসানের হাতে দিয়ে আরেক কাপ নিয়ে বেরোতে দেখে তালহা করিডোর থেকে সরে নিজের রুমে চলে যায়। মেহরীন দরজায় দু’বার টুকা দিতেই ভেতর থেকে বলল,

–আসতে পারো…
মেহরীন কিছুটা চমকে ভেতরে ঢুকল। তালহার কন্ঠস্বর কিছুটা চেঞ্জ লাগছে। তালহা সোফায় বসে আছে, হাতে ল্যাপটপ বা ফোন নেই ফ্রি হয়তো। ভেবে নিল, অন্যদিন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে স্বর অমন হতো। তবে তার সেই কন্ঠটাই ভালো লাগত। সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে কফি এগিয়ে দিলে তালহা তা হাতে নিল। এক চুমুক কফি নিতেই মেহরীন বেড়িয়ে যেতে নেয়। কিন্তু তালহার কণ্ঠে থেমে যায়।
–কাল থেকে কফি বানাতে হবে না।
মেহরীন একটু চিন্তিত মুখে বলল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১১

–কেনো? আমার হাতের কফি ভালো হয়নি?
তালহা স্বাভাবিক শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল,
–রাতে কফি খেলে ঘুমাতে দেরি হয়।
মেহরীনের মনটা একবারে খারাপ হয়ে গেল। সারাদিনে এই এক উছিলায় তার সাথে দেখা করার সুযোগ ছিলো। এটাও যেন হাতছাড়া হলো। কিন্তু তখনি মনে পড়ল, এখন থেকে তো প্রতিদিনই তালহা তাদের পড়াবে। পড়ানোর এই সুযোগেই তো আবার কথা হবে। ভাবতেই খুশি মনে মেহরীন অল্প হেসে মাথা নেড়ে চলে যায়।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৩