Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৩

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৩
সাইদা মুন

প্রথম দু’টো ক্লাস শেষ হতেই, তৃতীয় ক্লাসে তাহসানকে দেখে তাহিয়া ও মেহরীন দুজনেই অবাক। একে অপরের দিকে তাকায়; সে এখানে কী করছে, কেউই বোঝে পায় না। সঙ্গে প্রিন্সিপাল স্যারও ক্লাসে প্রবেশ করেন। তাদের দেখার পর সবাই উঠে দাঁড়ায়, মেহরীনরাও কনফিউজ হয়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রিন্সিপাল স্যার সবাইকে বসতে বলে তিনি বলতে লাগেন,

–উনি হচ্ছেন মিঃ তাহসান আহমেদ, আজ থেকে তোমাদের নিউ ইংলিশ টিচার।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই সালাম জানায় তাহসানকে। তবে তাহিয়ারা আরও অবাক হয়,
–তাহসান ভাই যে আমাদের কলেজে জয়েন করবে আগে বলেনি তো।
ফারিন পাশ থেকে বলল,
–চিনো নাকি উনাকে?
–হু আমার মামাতো ভাই..
তা শুনে রাফি খুশিতে বলে উঠে,
–তাইলে তো ইংলিশ নিয়ে চিন্তা নাই, তোর ভাইকে দিয়া পাশ মার্ক উঠাই নিবো।
মেহরীন পেছন থেকে গুতা মেরে বলল,
–তোকে লাথি দিয়ে পাশ করাই দিবে।
তাদের ফুসফুস ফুসফুসের মধ্যে হেডমাস্টার চলে যায়। তাহসান বলতে লাগে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

–গুড ইভিনিং এভরিওয়ান, ফ্রম টু’ডে আই উইল বি ইউর ইংলিশ টিচার। আই হোপ উই অল এঞ্জয় লার্নিং টুগেদার এন্ড….
কথার মাঝে থেমে যায় পেছনের কয়েকজনের ফিসফিস করে কথার আওয়াজে। অ্যাটেনশন পেতে হাতে থাকা কলম দিয়ে সামনের কাঠের টেবিলে দুই বার শব্দ করে,
–হেই লাস্ট টু ব্রেঞ্চ, সেই প্রথম থেকে দেখছি আপনারা কথা বলছেন। নিশ্চয় কোনো শিক্ষনীয় কিছু নিয়েই গবেষণা করছেন। সো প্লিজ সামনে এসে বলুন, আমাদের বাকিদের ও রাইটস আছে শিক্ষনীয় ফুসুরফুসুরে শামিল হওয়ার।
তাহসানের কথাটা যে তাদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অপমানমাত্রায় বলা হয়েছে বুঝতে পেরে, চারজনই ফটাফট সোজা হয়ে বসে যায়। ক্লাসের সবাই এই মুহূর্তে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেহরীন সবার দিকে তাকিয়ে হালকা বোকা হেসে মাথা নুইয়ে বলে,

–সরি স্যার আর হবে না।
মেহরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে সকলের আড়ালে তাহসান হালকা করে হেসে ওঠে। এরপর ক্লাস শুরু করে টানা পঁইত্রিশ মিনিট পড়িয়ে চলে যায়। তাহসান ক্লাস থেকে বের হতেই সবার মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে “এই কলেজে সব বুড়ো স্যারদের ভিতরে তাহসানই একমাত্র ইয়াং টিচার, আর জারা ম্যাম।” মেয়েরা তো এখনই তার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। এভাবেই গবেষণার মধ্য দিয়ে বাকি ক্লাস যায়।
ছুটির পর কলেজ গেট পেরিয়ে বের হচ্ছে সবাই। এরমধ্যে রাফি চিল্লিয়ে উঠে,

–দুস্ত আমি তো কবি হইগেছি।
ফারিন বিরক্ত হয়ে বলল,
–তুই কবি হলে শব্দরা লজ্জায় আত্মহত্যা করবে।
পাশ থেকে মেহরীন বলল,
–তার চেয়ে বড় কথা কলম ও ইয়েএ করা বন্ধ করে দিবে।
তার কথায় তাহিয়াসহ বাকিরা ফট করে তাকায়। তাহিয়া নাক তুলে বলল,
–কলম আবার ইয়ে করে কেমনে।
–আরে কলম ইয়ে করে বলেই তো কালি বের হয়, কলমের ইয়ে দিয়েই তো লিখি আমরা।
তার কথাতে সবারই ছি ছি করে ওঠে। তা দেখে মেহরীন চোখ ছোট করে বলল,

–আজব তোরা লাগে ইয়ে করিস না, কলম করলেই দোষ।
তার কথায় রাফি থামিয়ে দেয়,
–এই চুপ খাটাশনি কথা বাদ দে। আগে আমার ছন্দ শুন।
বলেই ভাব নিয়ে গলার কাঁপুনি সহ বলে উঠে,
–পানির অপর নাম জীবন,
সেই পানিতে একটু বিষ মিশিয়ে দিলে হয় মরণ।
তার ছন্দ শুনে প্রতিউত্তরে মেহরীন ফটাফট বলে উঠল,
–ভাষার অপর নাম মনের ভাব প্রকাশ,
সেই প্রকাশ ভুলভাল হলে তা হয় বা*লের প্রকাশ।

তাদের আজগুবি ছন্দে মুহুর্তেই হাসির রোল পড়ে যায়। এভাবেই একজন আর এক জনের সাথে দুষ্টুমি করতে করতে বের হয়। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ মেহরীনের পা আটকে যায়। সে জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, কেউ যেন তার হাত-পা টেনে ধরে রেখেছে। শান্ত বুক হঠাৎ অশান্ত হয়ে ওঠে।
সামনেই গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তালহা, ফোনে ব্যস্ত। তার পড়নে সাদা শার্টের সঙ্গে কালো কোর্ট, সাথে কালো প্যান্ট, ঘন কালো চুলগুলো কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। কিছুটা অগোছালো হলেও চোখ ধাঁধানো লাগছে। রোদ থেকে চোখ রক্ষা করতে রোদ চশমা পরেছে। এক কথায়, তাকে কোনো হিরো থেকে কম লাগছে না।
মনে মনে প্রশ্ন জাগে, বাকিদের কাছেও এমন সুন্দর লাগছে নাকি শুধু তার কাছে। আশপাশে তাকাতেই দেখে অনেক মেয়েই লজ্জায়-উচ্ছ্বাসে তালহার দিকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মুহূর্তেই মেহরীনের মনে বেশ রাগ জাগে। কিন্তু ফের তালহার দিকে দৃষ্টি দিতেই সেসব চিন্তা কেটে যায়। আজ যেন মেহরীন আবারও নতুনভাবে তার শ্যামপুরুষের নিকট মন বিলিয়ে দিয়েছে।
তার এসব ভাবনার মাঝে তাহিয়া ধাক্কা দিয়ে বলে,

–কিরে চল ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে।
তাহিয়ার কথায় যেন হুশ ফিরে আসে মেহরীনের। চোখ সরিয়ে তাহিয়াকে দেখে ফের সামনে তাকাতেই চোখ পড়ে তালহার দিকে। তার সেই বিড়ালচোখ এখন গাঢ় দৃষ্টিতে স্থির, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ঠিক মেহরীনের দিকে। মেহরীন থতমত খেয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, এভাবে তাকিয়ে থাকা নিশ্চয়ই তালহার নজর এড়াবে না। ভাবতেই মুখ লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, নিজেকেই নিজে নির্লজ্জ বলে কটূক্তি করে কয়েকবার। দ্রুত চোখ সরিয়ে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলে,

–ওহ হে চল..
বাকিদের বিদায় দিয়ে গাড়িতে বসতেই তালহাও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। গাড়ি স্টার্ট দিতে যাওয়া মাত্রই হঠাৎ ফ্রন্ট সিটের দরজাটা খুলে কেউ বসে পড়ে। তালহা কিছুটা চমকে তাকায়। তাহসানকে দেখতেই কপাল কুঁচকে যায় তার,
–তুই এখানে?
তাহসান সিট বেল্ট বাধতে বাধতে বলল,
–হু ফাস্ট স্টার্ট দে অনেক টায়ার্ড একটানা ক্লাস নিয়ে।
কথার আগামাথা কিছুই না বুঝে তালহা জিজ্ঞেস করল,
–কিসের ক্লাস নিয়েছিস? আর তুই অফিস রেখে এখানে কি করছিস?
তাহসান সিটে মাথা এলিয়ে দেওয়ার আগে একবার পেছন ঘুরে মেহরীনের দিকে তাকায়। অতঃপর বলতে লাগলো,
–প্রফেসর হিসেবে জয়েন করেছি।
মুহুর্তেই তালহার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তালহা আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। এর মধ্যে তাহিয়া প্রশ্ন করল,

–কিন্তু তাহসান ভাই তুমি তো তোমার বিজনেস নিয়ে বেশ সিরিয়াস ছিলে। মামা-মামি ছেড়ে ঢাকা চলে এলে। হুট করে তা ছেড়ে এই প্রফেশনে কি কারণে?
তার প্রতিউত্তরে মুচকি হেসে বলল,
–দুদিকই সামলে নিতে পারবো। কিছু অর্জন করতে হলে কিছুটা সেক্রিফাইস করতে হয়।
তাহসানের আড়চোখে মেহরীনের দিকে তাকানোটা তালহার নজর এড়ায়নি। হঠাৎই কেমন এক অজানা উত্তেজনা কাজ করে তার মধ্যে, রাগ আবির্ভূত হয়, কিন্তু কারণটি ঠিক ধরতে পারে না। তবু নিজেকে স্বাভাবিক রাখে সে। কারণ হুট করে রেগে ওঠা তার কাছে নিছক অমূল্য বোকামি মনে হয়। এতে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সারাদিনের সব কাজ বিঘ্নিত হবে। তাই নিজেকে সামলে নেয় তালহা। তবু মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে “রাগটা ঠিক কেন উঠল আমার?”

বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তালহা অফিসে ফিরে যায়। তালহার মা অনেকবার অনুরোধ করেছিলেন, ড্রাইভার দিয়ে ওদের কলেজ যাতায়াত করানো হোক। কিন্তু তালহা রাজি হয়নি। ছোটবেলা থেকেই তাহিয়াকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আনার দায়িত্ব সে নিজে নিয়েছে। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও এইটুকু সময় বের করে নেয়। হয়তো বোনটার প্রতি ভালোবাসাটা একটু বেশিই, আর হয়তো সে চায় না তাহিয়া কোনোদিন বাবার অভাবটাকে অনুভব করুক।
বিকেলে মেহরীন তাহিয়াকে নিয়ে ছাদে ওঠে। ছাদের একপাশ জুড়ে নানান রঙের ফুলে ভরা বাগান, চারপাশে হালকা হাওয়ার সুবাস ভাসে। ফুলের গাছের মাঝখানে রাখা একটি দুলনা, যেন শান্ত বিকেলের নীরব সাক্ষী। দুজনই গিয়ে তাতে বসে পড়ে। মেহরীন চোখ বন্ধ করে গভীর এক নিশ্বাস নেয়; মনে হয় চারপাশের সব রং, ঘ্রাণ আর নীরবতা একসাথে মিশে যাচ্ছে তার মনে।

–আহা, এই জায়গায় এলেই মনটা আরও ফুরফুরে হয়ে ওঠে। এতো সুন্দর এই বাগানটা করেছে কে রে তাহিয়া?
তাহিয়া ডান দিক উঁকিঝুঁকি দিয়ে বলল,
–শুনেছি আব্বু করেছিলো, বাগানের শখ ছিলো উনার। এখন এটা চাচ্চুরা যত্ন করে রাখে।
তার কথায় মেহরীনের মুখে হালকা একটা হাসি ফুটে ওঠে। এই পরিবারের বন্ধনগুলো তার মন ছুঁয়ে যায়, অদ্ভুত এক উষ্ণতা আছে তাদের সম্পর্কে। যত দেখে, তত মুগ্ধ হয় সে। কিন্তু পরের মুহূর্তে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। ভাবতে থাকে, এরাও তো ভাই, আর তার চাচাও তো তার বাবার ভাই। তবু পার্থক্যটা এত গভীর কেন? তাহিয়ার চাচারা তার ভাইয়ের পরিবার, শখ, আহ্লাদ সব আগলে রেখেছে। তাদের ভালোবাসায় দায়িত্ব-মিশ্রিত মায়া আছে।
আর তার চাচা? সে তো নিজের ভাইয়ের একমাত্র মেয়েকেও রক্ষা করতে পারেনি।
হঠাৎ তার ভাবনা কাটে তাহিয়ার টানে। তাহিয়া তার হাত ধরে টেনে ছাদের সাইডে নিয়ে যায়,

–চল চল বুড়িটা গেছে এই সুযোগ।
বলতে বলতে দু’জনই ছাদের একেবারে কিনারে চলে আসে। সেখান থেকে অনায়াসে পাশের বাড়ির ছাদে উঠা যায়। দুই বাড়ি খুব কাছাকাছি, মাঝের ফাঁকটা এক হাতের চেয়েও কম। ছাদের রেলিংয়ের ওপর চারটা আচারের বয়াম মুখ খোলা করে রাখা, সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে তাদের তেলতেলে আভায়। পাশের বাসার কেউ নিশ্চয় রোদে দিয়েছে শুকোতে।
তাহিয়া চারপাশে একবার তাকিয়ে, দুষ্টুমি মাখা চোখে হেসে, নিঃশব্দে আমের আচারের বয়ামটা হাত বাড়িয়ে আনে। দ্রুত নিজের হাতে একটু তুলে নেয়, আর কিছুটা মেহরীনের হাতেও তুলে দিয়ে আবার বয়ামটা জায়গায় রেখে দেয় নিপুণ ভঙ্গিতে। তার এই কাণ্ড দেখে মেহরীন খানিকটা চমকে ওঠে। যখনই বুঝলো ঘটনা সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল,

–আরে করছিস কি, যদি কেউ দেখে কেস খাবি।
তাহিয়া বিশ্বজয়ী হাসি দিয়ে বলল,
–আরে কেউ দেখেনি, খা আর চিল ক…
বলার মাঝেই পুরুষ কণ্ঠে কেউ বলে ওঠে,
–কিন্তু আমি তো দেখে ফেলেছি…
হঠাৎ সেই কণ্ঠ শুনে দু’জনই চমকে উঠে। ভয়ে অপরাধীর মতো ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকায়। পাশের ছাদে এক ছেলে দাঁড়িয়ে। মেহরীনের অনুমানে, তালহার বয়সি হবে। লম্বা, ফর্সা, চোখে একরকম দুষ্টুমি ঝুলে আছে। তাহিয়া তো ভয়ে তড়িঘড়ি করে হাত পেছনে নিক্ষেপ করে আচারের অংশ লুকায়। তা দেখে মেহরীনও তেমনি করে হাত গুটিয়ে নেয়, যেন তারা নির্দোষ। ওদের এই কাণ্ড দেখে ছেলেটা হেসে ফেলে, উম্মুক্ত, নির্লজ্জ হাসি।
হাসতে হাসতেই সে এগিয়ে এসে রেলিংয়ের ওপর দুই হাত রেখে হালকা ঝুঁকে বলে,

–লুকিয়ে লাভ নেই, আমি তো দেখে ফেলেছি। এবার বুঝলাম আমার দাদি প্রতিদিন আচার কমে যায় বলে এত চিল্লায় কেন। আচার যে যায় সিকদার বাড়ির ছোট বিচ্ছুর পেটে। তা তো জানেনা।
তাহিয়া মাথা নিচু করে ঠোঁট উলটে মিনমিনিয়ে বলল,
–স..সরি আর করবো না।
তা দেখে ফারিস ছেলেটি শব্দ করে হেসে ওঠে। তার হাসির শব্দে তাহিয়া মাথা তুলে অসহায় চোখে তাকায়। তা দেখে সে নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল,
–তা মিসেস লিলিপুট, তালহাকে বলবো নাকি তার ছোট বোন এমন চুন্নি হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
লিলিপুট ডাকটিতে নাক ফুলিয়ে তাকালেও পরের কথায় তাহিয়া ভয়ে দ্রুত বলে,
–না না প্লিজ ফারিস ভাইয়া আমি আর করবোনা এমন৷ ভাইয়াকে বলবেন না, খুব বকবে।
তার কথায় মেহরীনও পাশে থেকে সমানে মাথা নেড়ে তাহিয়ার জন্য সাফাই গায়,
–হ্যা হ্যা প্লিজ ভাইয়া ভুল করে ফেলেছে, আর করবে না।
মেহরীনের কথায় ফারিস এবার পাশে লক্ষ্য করে। তাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

–এইটা কে লিলিপুট?
তাহিয়া দান্তে-পিষে বলল,
–মেহরীন, আমার ফ্রেন্ড আর আমি তাহিয়া.. তাহিয়া সিকদার, নট লিলিপুট।
–ওহ তুমি লিলিপুটের ফ্রেন্ড, নতুন নিশ্চয়?
মেহরীন মুখ টিপে হেসে মাথা নাড়ায়। তা দেখে ফারিস একবার তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
–সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে, সাবধানে থেকো বোন।
মেহরীন জুড়েই হেসে ফেললো। ছেলেটির ভঙ্গিমা এমন করছে যে সবাই হাসবে। তাদের হাসি দেখে তাহিয়া মুখ ফুলিয়ে রাখে। আমের আচারের বয়ামটা লাগিয়ে এগিয়ে দেয় তাহিয়ার দিকে। তাহিয়া প্রশ্নাত্মক চোখে তাকালে ফারিস ইশারায় হাতে নিতে বলল। তাহিয়া হাতে নিতেই ফারিস বলে,

–নাও, পুরোটাই তোমার।
তাহিয়া অবাক হয়ে বলল,
–না না, আপনার দাদি যদি দেখে এক বয়াম উধাও খবর করে ছাড়বে।
–সমস্যা নেই, দাদুকে আমি সামলাবো। এটা মনে করো আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য গিফট।
কথাটা শুনে তাহিয়া কিছুটা বিব্রত হলেও মুহূর্তেই খুশি হয়। আসলেই আচারটা মজাদার, তাই তো চুরি করে খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনি। খুশি মনে মাথা নেড়ে তা নিয়ে যাওয়ার আগে ফারিস ডেকে উঠে,

–আরে এই, ওয়েট..
তার ডাকে দু’জন ফের পেছনে তাকালে সে বলে,
–যাহ বাবা, রিটর্ন গিফট তো দূর ধন্যবাদ ও দিলে না। ছিহ্! তালহা তো খুব ভালো মানুষ, ওর বোনটা এমন হলো কী করে?
তাহিয়া মনে মনে ভীষণ রেগে যায়, তবে নিজেকে সামলে নেয়। আসলেই আচার দিয়েছে একটু ধন্যবাদ তো ডিজার্ভ করে। তাই দ্রুত বলে উঠল,
–ওহ সরি, ধন্যবাদ ভাইয়া।
ফারিস এবার দুই হাত গুঁজে ভাব করে দাঁড়ায়,
–কিন্তু এবার ধন্যবাদ এক্সেপ্ট করবো না।
তাহিয়া অবুঝ কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
–কেনো?
–কারণ ইউ আর লেট, এখন আমার রিটার্ন গিফট চাই।
–এহ মগের মুলুক নাকি? আমি কেনো রিটার্ন গিফট দিব?
ফারিস চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকে,
–এহ নয় হ্যাঁ, আর দিবেনা মানে। তোমাকে আমি গিফট দিয়েছি, তোমারও আমাকে দেওয়া উচিত, কি বলো ছোট আপু?

লাস্টের কথাটা মেহরীনকে লক্ষ্য করে বলে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
–হ্যা হ্যা ঠিক, তোরও কিছু দেওয়া উচিত।
তাদের কথার জালে বেচারি তাহিয়া থতমত খায়। তার ছোট্ট মনে ভাব আসে, আসলেই তারও কিছু দেওয়া উচিত। আমতাআমতা করে বলল,
–কিন্তু আমার কাছে তো কিছু নেই এখন। কি দিবো?
ফারিস কিছুটা অভিনয় করে, ভাবের ভঙ্গি করে। অতঃপর সোজা হয়ে পেছনে ফিরে যেতে যেতে বলল,
–আপাতত সময় থাকলে আমিই নাহয় আমার গিফট নিয়ে নিবো। আপাতত নিচে নামো, দাদি আসবে একটু পরেই আচার নিতে।
বলেই সে চলে যায়। তাহিয়া-রাও আর মাথা না ঘামিয়ে দ্রুত নেমে পড়ে। বলা যায় না, বুড়িটার কাছে ধরা পড়লে যদি আবার বিচার বসে।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে, ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছে। তাহসান সকলকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, প্রফেসর হয়ে জয়েন হওয়ার খুশিতে।

–তা বলছিলাম, যেহেতু একই কলেজ, তাই তাহিয়ারা নাহয় আমার সাথেই যাবে। তালহার হুদাই কষ্ট করার কি দরকার।
তার কথা শুনে তিতলি বেগমসহ বাকুরাও একমত প্রকাশ করল। তা দেখে তালহা বলল,
–আমি একবারও বলিনি আমার কষ্ট হচ্ছে।
তিতলি বেগম ছেলেকে থামিয়ে দেন,
–তুই মুখ ফুটে বলিস না, কিন্তু আমরা বুঝি।
তাহসান উনার সুর ধরে বলল,
–হ্যা, সেজন্যই বলছিলাম।
তাদের কথাগুলো শুনে মেহরীনের বুক যেন চেপে বসে। মনে মনে বারবার দোয়া করছে, “আল্লাহ, প্লিজ উনি যেন রাজি না হন.. আমি তো উনার সাথেই যেতে চাই।”
কাকতালীয়ভাবে তালহাও যেন তার মনের আর্তি শুনতে পেল। সব কথার বাইরে গিয়ে, নির্লিপ্ত ও সোজাসাপ্টা স্বরে বলল,

–তুই হলি টিচার আর ওরা স্টুডেন্ট, কলেজের সকলে যদি দেখে টিচারের সাথে যাওয়া-আসা, সহজেই বুঝে যাবে পরিবারের লোক। তখন তাদের প্রতি নেগেটিভ ধারনা ইজিলি আসবে। সবাই অন্য চোখে দেখবে।
একটু থেমে, নিঃশব্দে যোগ করল,
–সো আমি চাইনা তাদের উপর এই ইফেক্টগুলো পরুক। তারা যেন বাকি স্টুডেন্টস এর মতো স্বাভাবিকভাবে পড়ালেখা করে।
কথাটা বলে আর কারো দিক শোনার আশা না করেই সিড়ির দিকে হাটা ধরে। যেতে যেতে তাহিয়াদের উদ্দেশ্যে বলল,

–দুই মিনিটের মধ্যে পড়ার টেবিলে যেনো পাই।
তার কথা শুনে তারা দুজন ভয়ে সুরসুরিয়ে তার পেছন পেছন হাঁটা দেয়। করিডোরে আসতেই তাহসান মেহরীনকে ডাক দেন। তাহিয়া তখন রুমে চলে গেছে।
–জি ভাইয়া, কিছু বলবেন?
তাহসান হাতে থাকা একটি প্যাকেট তার হাতে দেয়। সেটি দেখে কৌতুহলবশত মেহরীন জিজ্ঞেস করল,
–এটা কি?
–খুলেই দেখো।
বলেই হাসি দিয়ে চলে যায়। মেহরীন কনফিউশন নিয়ে সামনে এগোতে গিয়ে তালহার ডাকে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে তালহা রুমের দরজার সামনে মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় তার সামনে। হাইটে তালহা তার চেয়ে লম্বা হওয়ায় মুখটা উপরে তুলে তাকায়। তা দেখে তালহা রুমে ঢুকে যায়, সাথে মেহরীনও প্রবেশ করে।

–হাতে কি?
–প্যাকেট।
–কে দিয়েছে?
–তাহসান ভাইয়া।
–কি আছে এতে?
–জানিনা।
–কাম হেয়ার…
তালহার কথামতো মেহরীন সামনে যেতেই, এক ঝটকায় তালহা তার হাত থেকে প্যাকেট ছিনিয়ে নিল। তারপর কোনো কথা না বলেই টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলল। মেহরীন থমথমে মুখে চেয়ে রইল, মনের ভেতর হালকা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল, “এভাবে ছিঁড়ার কি আছে? সুন্দর করেও তো খোলা যেত।” তবুও সে চুপ রইল, নিজের ভাবনা নিজের মধ্যেই রাখল।

তালহা প্যাকেট খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো অনেকগুলো চকোলেট, কয়েকটা নিচেও পড়েছে। তা দেখে তালহার চোখ মুহূর্তে লাল হয়ে গেল, যেন রক্তিম আগুন জ্বলে উঠল দৃষ্টিতে। এদিকে মাটিতে পড়া চকোলেট তুলতে হাত বাড়াতেই মেহরীনকে ধমক দিয়ে উঠল,
–একটা চকোলেটও যদি টাচ করেছো, হাত ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দিবো।
হঠাৎ এমন হুমকিতে মেহরীন চমকে উঠে, যেন শরীরটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে লাফিয়ে উঠল। ভয় পেয়ে দ্রুত নিজেকে আটকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, একদম যেন রোবট।
তালহা চকোলেটগুলো ডাস্টবিনে ফেলতে গিয়েও থেমে যায়। মুখ গম্ভীর করে গলা ছেড়ে ডাকল,

–খালা! খালা!
দুই-তিনবার ডাকতেই খালা তড়িঘড়ি করে এসে হাজির। মেহরীন হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে, এমন আচরণ কেন করছে বোঝে পায় না। তালহা খালার হাতে চকোলেটগুলো তুলে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
–তোমার ছেলে মেয়ে পছন্দ করেনা?
খালা খুশি মনে মাথা ঝাকিয়ে বলল,
–হো বাজান হো।
তালহা গম্ভীর কন্ঠে বলল,
–এগুলো ওদের দিয়ে দিও।
কথাটা বলতেই খালা খুশি হয়ে চকোলেটগুলো নিয়ে চলে যায়। এদিকে মেহরীন বেক্কলের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে। যখনি দেখলো খালা চকোলেট নিয়ে চলে যাচ্ছে, তার মন খারাপ হয়ে যায়। সেদিকে তাকাতে তাকাতে বলল,
–ওগুলো তো আমাকে দিয়েছিলো, উনাকে দিলেন কেনো?
কথাটা বলতেই সঙ্গে সঙ্গে ঝারি পড়ে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১২

–চুপ… চকোলেট খেয়ে দাঁত খারাপ করার ধান্দা। যাও, পড়তে বসো স্টুপিড।
তার ধমকে মেহরীন ফের কেঁপে উঠে দ্রুত পা বাড়িয়ে হাঁটা ধরে রুমের দিকে। এখানে থাকাই যেন এখন ভয়ংকর ব্যাপার। যেতে যেতে বিরবির করে বলল,
–আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি, যে দাঁতে পোকা ধরবে। উনার যে কি হয়, হুটহাট আল্লাহ জানে। ইশ, কতোগুলো চকোলেট। কয়েকটা আমাকে দিয়ে বাকিগুলো দিয়ে দিতো..
সে বিরবিরিয়ে চলে যায়। তবে কেউ একজন তার বলা প্রত্যেকটা কথা হাতে মুষ্ঠিবদ্ধ করে নিয়েছে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১৪