Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৮
সাইদা মুন

—এবার বিশ্বাস হলো তো, এই আরিয়ান এক কথার লোক।
একথায় ফাইজার নেত্রপল্লব কড়া হয়ে উঠল। দু হাত কোমড়ে রেখে এক পা এগিয়ে গিয়ে ঝেরে উঠল,
—এই, আপনি এত অসভ্য কেন?
আরিয়ানের ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকালো,
—অসভ্য না হলে তোমার আব্বুকে নানা আর আমার আব্বুকে তাড়াতাড়ি দাদা বানাবো কী করে?
—ছিঃ! আবারও! চুপ করবেন? ভালো কথা মুখে নেই আপনার?
আরিয়ান ভাবলেশহীনভাবে বলল,
—আপাতত নেই। এখন তো চোখ, মুখ, মন, সবই বউ বউ করছে।
ফাইজা রাগী চোখে তাকাতেই আরিয়ান ফুস করে উঠল,
—আহা, রাগছো কেন? বউ কথায় কথায় রাগলে চলে? মেহরীনকে দেখে তো একটু শিখতে পারো নাকি। বর ডাকতে না ডাকতেই লাইন করে বরের পিছে পিছে ছুটেছে। আর তুমি কিনা এতক্ষণে একান্তে একটু কথা বলারও লাইন করতে পারোনি। ভাগ্যিস তনিমাকে দিয়ে লাইন করলাম, নয়তো তুমি তো পুরো আবুল।
ফাইজার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁত পিষে আওড়াল,

—আমি আবুল?
—না মানে.. সুন্দরী আবুল।
তেতে উঠে বলল,
—কথা বলবেন না।
বলেই ছাদ থেকে নেমে যেতে উদ্যত হতেই আরিয়ান হেসে তার ডান হাতটা আকড়ে ধরল। পরপর একটা হেঁচকা টানে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল ফাইজাকে। বুকের সঙ্গে ফাইজার পিঠ ঠেকতেই দুহাতে কোমড়ে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে ঝুঁকে নরম স্বরে বলল,
—এত রাগ কোথা থেকে আসে, হুমম?
ফাইজা কেঁপে উঠছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বলল,
—ছা..ছাড়ুন, কেউ দেখবে।
আরিয়ান শীতল স্বরে শুধাল,
—দেখুক।
ফাইজা আরও মিইয়ে গেল। শরীরের কম্পন আর বুকের দ্রুত হৃদস্পন্দন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কোনো রকমে বলল,

—আ..আমাদের এখনো বিয়ে হয়নি। পাগলামি করবেন না। লোকে খা..খারাপ বলবে।
কথাটা বলতে বলতেই আরিয়ানের মুখ এসে ঠেকল ফাইজার কানের কাছে। কানের লতিতে আলতো ঠোঁয়াছুঁইয়ে গেয়ে উঠল,
“আমার জড়সড় এই শরীরে,
তোমার হাওয়া লাগছে ফুরফুরে…
প্রেম নাকি পাগলামি বলতে পারবো না,
লোকে পাগল বলুক, মাতাল বলুক আমি,
তোমার পিছু ছাড়বো না…”
ঠিক তখনই ছাদের দরজায় শব্দ হলো। কেউ গলা ঝেড়ে বলল,
—দুলাভাই, আপনাদের নিচে ডাকছে সবাই।
তাহিয়ার গলা শুনতেই তড়িৎ বেগে দুজনে সরে দাঁড়াল। আরিয়ান দ্রুত চুল ঠিক করতে করতে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাল বলল,
—তাহিয়া, তুমি যাও। আসছি আমরা।
কথাটা শুনেই তাহিয়া ছুট লাগাল নিচের দিকে। এদিকে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে থাকা ফাইজা ঝট করে একটা চাপড় বসাল আরিয়ানের বাহুতে,
—দেখলেন তো! ছোট বোনের সামনে অস্বস্তিতে পড়তে হলো। এখন কী ভাববে ও?
—আরে, ও কিছু না। তোমার বোন বাবু না, বেশ বুঝদার। কিছু মনে করবে না।
ফাইজা গরম চোখে তাকিয়ে গটগট পায়ে নিচে নামতে লাগল। পিছু পিছু মাথা চুলকাতে চুলকাতে আরিয়ানও নেমে গেল।

মেহরীনের সঙ্গে কথা বলবে বলে রাফা সেই তখন থেকেই তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে রাফি। যেতেই দিচ্ছে না দুজনকে একান্তে।
—বন্ধু, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমার বাপ মানে তোর বাপ, আমার মা মানে তোরও মা, আমার বোন মানে তোরও বোন, আমার ভাই মানে তোরও ভাই, আমার চাচা মানে তোরও চাচা, আমার খালা মানে তোরও খালা…
রাফির একের পর এক আজাইরা বকবক শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মেহরীন। একপর্যায়ে চেচিয়ে উঠল,
—চুপপপ! একদম চুপপপ। আর একটা কথাও না।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। মেহরীন এবার রাফার দিকে ফিরে বলল,
—ঘটনা কি, এখানেই বল দেখি। কিছু একটা তো হয়েছে তোদের মধ্যেই, এটা তো শিওর। কি হয়েছে?
রাফা রাফিকে গরম চোখ দেখিয়ে বলতে লাগল,

—তোমার এই বন্ধু আমাকে কি বলেছে জানো?
—কি?
—আমার আব্বু প্রতি বছরে কয়টা..
বাকিটা বলার আগেই রাফি হড়বড় করে বলে উঠল,
—বন্ধু, মাই শত্রু মানে ইউর শত্রু। আর শত্রুর কথায় কান দেওয়া হারাম ব্রো, হারাম।
তার কথায় রাফা রেগে উঠল,
—মেহরীন আপু, আগে তুমি আমার কথা শোনো, উনি আমাকে কি বলেছে।
রাফিও সমান তালে বলে উঠল,
—বান্ধবী, আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। মনে রাখবি, বন্ধুই বন্ধুর সব। তাই তুই আমার কথা শুনবি। আমি যারে দেখতে পারি না, তুই তারে ব্লক মারবি। ব্লক মার একে।
বলেই রাফার দিকে তাকাল ক্ষোভ নিয়ে। লেগে গেল দুজনের তর্কাতর্কি। থামাথামি নেই দেখে দু’কান চেপে ধরল মেহরীন। ধমক দিয়ে থামাল দুটোকে।
—মাথা ব্যথা উঠিয়ে দিয়েছিস। চুপ কর দুটো। কি হয়েছে সেটা একে একে বলবি?
রাফা তিড়িঘড়ি বলতে লাগল,
—তোমার ফ্রেন্ড আমাকে জিজ্ঞেস করেছে আমার আব্বু কি প্রতি বছরে বছরে ডাউনলোড দেয় কিনা। তারপর আবার আমাকে অপমান করে কেটে পড়েছে।

—কিইইই! রাফিইই, এসব কি ধরনের কথা রাফি?
রাফি কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ-মুখের অবস্থা দেখে বোঝাই যাচ্ছে তার হাওয়া ফুস। মেহরীনের রাগী মুখ দেখে জোরপূর্বক হাসল। বলে উঠল,
—বন্ধু, টিয়া পাখির ঠোঁট লাল আর শরীর সবুজ, তাও দোয়েল পাখি কেন জাতীয় পাখি জানিস?
মেহরীন আরও গম্ভীর মুখে বলল,
—আমার প্রশ্নের উত্তর এটা না।
রাফি থমথমে কণ্ঠে ফের নিজেই বলল,
—কারণ দোয়েল একটু বলদ পাখি, আর বলদের বাস বাংলাদেশে বেশি। আর এই মেয়ে হচ্ছে সবচেয়ে বড় বলদ।
বলতে বলতেই সে সিরিয়াস হয়ে গেল। ঠোঁট-মুখ অসহায় বানিয়ে বলতে লাগল,
—বিশ্বাস কর, আমি জিজ্ঞেস করেছি সে বাপের কত নাম্বার সন্তান। ও উঠে বলল ত্রিশ। তা শুনে তো মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তুই-ই বল, এমন শুনলে তোর রিঅ্যাকশন কি আসত?
—এইই! আমি ক্লাস রোল বলেছি।
রাফার কথায় রাফি ঝাড়ি মেরে বলল,

—এইই! আমি কি ক্লাস রোল জিজ্ঞেস করেছি? দুই লাইন বেশি বলতে কে বলেছে?
—আপনাকে দুই লাইন বেশি বুঝতে কে বলেছে?
তাদের ফের ঝগড়া লাগতে দেখে মেহরীন বিরক্ত হয়ে উঠল।
—থাম ভাই, তোরা যা ইচ্ছে কর, খালি আমার পিছু ছাড়।
বলতে বলতেই মেহরীন চলল সেখান থেকে। এমনিতেই সারাদিন ধরে দৌড়ঝাঁপ আর চেঁচামেচির মাঝ দিয়ে যাচ্ছে। এখন আবার এদের বকবক। মাথা একদম ধরে গেছে। এখন একটু শান্তি দরকার। এই ভেবেই চলল ছাদের দিকে। পথিমধ্যে আরিয়ান আর ফাইজাকে নামতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। ছাদ এখন খালি, সে একা একটু নিরিবিলি বসতে পারবে। নিচে আপাতত কাজ নেই, সব বড়রা বিয়ে নিয়েই আলোচনা করবে। সবাই তাতেই মনোযোগী।
সকলের উপস্থিতির মাঝে মেহরীনকে দেখতে না পেয়ে তালহা তাহিয়াকে ডাকল। পাশে এসে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করল,

—মেহরীন কোথায়?
তাহিয়া এদিক-সেদিক চোখ বুলাল। সে নিজেও খেয়াল করেনি।
—জানি না তো ভাইয়া। আমি তো খেয়ালই করিনি মেহু এখানে নেই। দাঁড়াও, আমি দেখে আসছি।
—থাক, আমিই যাচ্ছি।
তাহিয়াকে থামিয়ে উঠে দাঁড়াল তালহা। দোতলায় গিয়ে রুম চেক দিয়েও মেহরীনকে না পেয়ে বেশ চিন্তিত হলো। কোথায় গেল সে? এরপর ছাদের দিকে পা বাড়াল। ছাদে আসতেই তপ্ত শ্বাস ফেলল। যাকে নিয়ে সে চিন্তায় পড়েছে, সে কিনা মনের সুখে দোলনা চড়ছে।
সোজা গিয়ে দাঁড়াল মেহরীনের সামনে। তালহাকে দেখতেই মেহরীন দোলনা থামাল। সঙ্গে সঙ্গে একপাশ খালি করে দিল। তালহাও নিঃশব্দে বসে পড়ল তার পাশে।
—একা একা কি করছো?
—এমনিই বসেছিলাম। আপনি এলেন যে, কোনো দরকার কি? কাউকে দিয়ে ডেকে দিতেন।
—দরকার পড়লেই বুঝি তোমাকে মনে পড়ে?
মেহরীন কিছুটা থতমত খেল। চুপ থেকে মিনমিনিয়ে বলল,

—না মানে, এভাবে বলতে চাইনি…
তালহা গলার বোতাম দুটো খুলতে খুলতে বলল,
—সবসময় চোখের সামনে ঘুরঘুর করা মানুষটাকে সামনে না দেখে অস্বস্তি লাগছিল। তাই খুঁজতে এলাম।
মেহরীন মুঁচকি হেসে ফেলল। মাথা রাখল তালহার কাঁধে। বাহু জড়িয়ে ধরে বলল,
—আসলে একটু মাথা ব্যথা করছিল। নিচে সবাই কথাবার্তা বলছে। এখানটা নিরিবিলি, তাই একটু বসতে এলাম।
তালহার কপালে আরও চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তৎক্ষণাৎ বিচলিত কণ্ঠে বলল,
—বেশি মাথা ব্যথা?
মেহরীন ছোট্ট করে বলল,
—হুম…
মেহরীনের থুতনি ধরে মাথাটা তুলতে তুলতে তালহা বলল,

—দেখি, মাথা উঠাও। আস্তে করে টিপে দিব।
মেহরীন তার হাতটা ধরে ফেলল। তাকে থামিয়ে বলল,
—উহু, আপনার কাঁধে মাথা রাখতে ভালো লাগছে। এমনিই কমে যাবে।
একথায় তালহা আর নড়ল না। বরং মেহরীনের কপাল সেভাবেই আলতো করে টিপে দিতে লাগল। মেহরীনের মুখেও প্রাপ্তির এক হাসি ফুটল। পড়ন্ত বিকেলে সে আর তালহা বসে আছে খোলা আকাশের নিচে। তার উপর আবার তালহা তার যত্ন নিচ্ছে। স্বপ্নগুলো এত তাড়াতাড়ি বাস্তবে রূপ নিল তার! ভাবতেই হাসি আরও গাঢ় হলো।
কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটতেই হঠাৎ তালহা শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল,
—চা খাবে? এনে দেব?

মেহরীন এবার মাথাটা তুলল। হাসিমুখে তাকাল তালহার দিকে। দুহাতে তার বাহু এখনো আঁকড়ে ধরে আছে। লোকটা তাকে নিয়ে বড্ড বেশিই চিন্তা করে। কথাটা ভাবতেই নিজেই নিজেকে ফের বলল, চিন্তা করবেই না কেন একমাত্র বউ হয় সে। নিজে নিজেই হেসে ফেলল। তালহার চুলে হালকা হাত বুলিয়ে বলল,
—এত চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আমি আমার মাথা ব্যথার ওষুধের সাথেই আছি, কমে যাবে।
বলেই ফের মাথা ফেলল কাঁধে। তালহা ফিক করে হেসে ফেলল। মুখজুড়ে তার প্রশান্তির হাসি। সামান্য কথাতেও মানুষের মন এত ভালো হয়ে যায়। তা সে যেন গভীরভাবে উপলব্ধি করল। এই যে তালহার মনের ভেতর দিয়ে হিমশীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে মেহরীনের কথায়। আসলেই মানুষ কথাতেই মরে, কথাতেই বাঁচে। কিছু সামান্য কথাও অসামান্য ভাবে হৃদয়জুড়িয়ে দেয়। সেও ধীরে ধীরে মাথাটা ঠেকাল মেহরীনের মাথায়।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৭

সেভাবেই কেটে গেল আধাঘণ্টার মতো। অতঃপর দুজনেই নেমে গেল ছাদ থেজে। মেহমান যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। একে একে সবাই চলে যেতেই বাড়িটা হয়ে গেল শান্ত। তনিমাদের সাথেই রাফি, ফারিনও চলে গেছে। যদিও তালহা বলেছিল তাদের পৌঁছে দেবে। তবে তনিমার আব্বুই দিয়ে আসবেন বললেন। এখন যে যার রুমে রেস্ট নিচ্ছে। সারাদিন ধরেই অনেক ধকল গেল সকলের উপর দিয়ে।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৯