Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৭

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৭
সাইদা মুন

তাহসান ক্লান্ত শরীর নিয়ে সবেমাত্র বাড়িতে প্রবেশ করেছে। বাগানে মেহরীনদের দেখে একপলক চেয়ে আবারও চোখ ফিরিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ভেতরে ঢুকতেই সালমা বেগমের মুখোমুখি পড়তেই তিনি এগিয়ে এলেন,
—কিরে, এতক্ষণে আসার সময় হলো? তোদের তো সেই কখন বলা হয়েছে!
তাহসান মৃদু হেসে বলল,
—আন্টি, একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং ছিল, তাই আসতে পারিনি। অনেক ক্লান্ত আমি।
সালমা বেগম চিন্তিত হয়ে উঠলেন,
—তুই একটু সোফায় বস, আমি এক্ষুনি এক গ্লাস শরবত পাঠাচ্ছি।
তিনি চলে যেতেই তাহসান গিয়ে সোফায় বসল। সকালেই কল গিয়েছিল, ফাইজাকে নাকি কারা দেখতে এসেছে। তালহারা, বাপ-চাচারা সবাই থাকবে, সেখানে সে থেকে কী করবে, এই ভেবেই আসেনি। গা এলিয়ে দিয়ে সোফায় বসতেই বাম পাশে চোখ গেল। সঙ্গে সঙ্গে তার ভ্রু কুঁচকে এলো,

—তুমি?
এতক্ষণ ধরে তাহসানকেই আড়চোখে দেখছিল তনিমা। তাহসানের চোখ তার ওপর পড়তেই দাঁত বের করে হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এক হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল,
—আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
—ওয়ালাইকুম আসসালাম।
—কেমন আছেন?
—ভালোই.. কিন্তু তুমি এখানে?
তাহসানের কথায় তনিমা আরও হেসে বলল,
—দেখতে এসেছি।
কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
—কাকে?
—আপনাকে।
কথাটা বলেই থতমত খেয়ে উঠল সে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল শুধরে নিয়ে বলল,
—মানে… ফাইজা আপুকে।
তাহসানের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে যেন হিসাব মিলাতেই তার ভ্রুযুগল আবার স্বাভাবিক হলো। আস্তে করে বলল,

—ওহ, তোমার বড় ভাই আরিয়ানের জন্য?
তনিমা মাথা ঘনঘন নাড়িয়ে বলল,
—জ্বি জ্বি।
—তা তোমার আব্বু-আম্মু আসেনি?
—এসেছে তো। আম্মু মেবি আন্টিদের সঙ্গে আছে, আর আব্বু বাইরে বাগানে বিল্লাল আংকেলের সাথে।
প্রতিউত্তরে তাহসান “ওহ” বলেই চুপ করে গেল। মনোযোগ দিল নিজের মোবাইলে। তনিমাও চুপচাপ বসে আছে। তবে তার চোখ স্থির নয়, বারবার তাহসানকে পরখ করছে। মনে মনে ভাবছে, দেখতে তো ঠিকঠাকই, তবে বিয়ে করে না কেন? ছোট বোনদেরও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, আর ইনি কিনা চিরকুমার হয়ে থাকবেন। ভাইয়ের বিয়ের কথা নিয়ে এসে যেন তার মনে এখন সকলের বিয়ে নিয়ে চিন্তা জমেছে।
ভাবনার মাঝেই তাহসানের মা শরবত হাতে এসে হাজির হলেন। ছেলের হাতে শরবতের গ্লাসটা দিয়েই শাড়ির আঁচল দিয়ে তার কপালের ঘাম মুছতে লাগলেন। চিন্তিত কণ্ঠে একের পর এক প্রশ্ন করছেন, আর তাহসানও শরবত খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মাকে উত্তর দিচ্ছে। তাদের কথার মাঝেই তনিমা ধীরে ধীরে নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে দিল।

—আচ্ছা আন্টি আপনি স্যারকে বিয়ে দিচ্ছেন না কেন?
তনিমার এহেন কথায় থামল তিনি। চোখ ফিরিয়ে তাকাল তার দিকে। পরপর হেসে বলল,
—ছেলে আপাতত রাজি নয় রাজি হলেই দিয়ে দিব।
এদিকে তনিমার কথায় তাহসান কড়া চোখে চেয়ে আছে। তার গম্ভীর চাহনি দেখে সে মিনমিনিয়ে বলল,
—জলদি দিয়ে দিন আন্টি, স্যার সমসময় কেমন গম্ভীর থাকে যেন হাসতেই পারে না। বিয়ে দিলে যদি একটু ম্যাম এর সাথে হাহা হিহি করে।
তাহসান সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে উঠল,
—শাট আপ তনিমা।
তনিমা কাচুমাচু হয়ে বসতেই তাহসানের মা শব্দ করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে ছেলের দিকে তাকালেন,
—ওভাবে বকছিস কেন, আমাদের বাড়ির মেহমান হয়। ফাইজার হবু শশুড় বাড়ির লোক। তাছাড়া ভুল কি বলেছে সে। তোর তো উচিত তোর স্টুডেন্ট থেকে শিক্ষা নেওয়ার। মেয়েটা ভালোই বলেছে আসলেই তোকে বিয়ে দিতে হবে। তবে যদি একটু হাসিখুশি থাকিস।
শেষের কথাটা বলতে বলতে উনার চোখ ধরে আসল। ছলছল করে উঠতেই সেখানে আর দাড়ালেন না। কাজের বাহান দিয়ে চলে গেলেন। মায়ের অবস্থা বুঝে তাহসান তপ্ত শ্বাস ফেলল। তবে তনিমা যেন মেহমান হওয়ার ফায়দা লুট করার সুযোগ পেয়ে গেল। দুষ্টু হেসে উঠল সে। নড়েচড়ে শক্ত হয়ে বসল।

—স্যার আপনি সিঙ্গেল..?
প্রশ্নটা শুনেই তাহসান থতমত খেল। এ কেমন ধরনের প্রশ্ন। পরমুহূর্তেই বিরক্তিতে দাঁত কিরমির করে তাকাল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুখের ভেতর জমে থাকা অসন্তোষ যেন কোনো মতে চেপে রাখছে। কিছু বলতেও পারছে না, বাড়ির মেহমান বলে কথা। নয়তো এখনি ধমক দিত এমন প্রশ্নের জন্য। দাঁতে দাঁত চেপে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল,
—হ্যাঁ…
তনিমা চোখ কপালে তুলে বিস্ময়ের ভান করে বলে উঠল,
—কিইই এত সুন্দর ছেলে সিঙ্গেল?
তার বিস্ময় যেন মুহূর্তেই দুঃখে রূপ নিল। এক গালে হাত রেখে খানিকটা মন খারাপের ভঙ্গিতে বলল,
—আমার মনে হয় কি জানেন?
তাহসান দাঁত খিচিয়েই জিজ্ঞেস করল করল,
—কি?
—আপনার এই কর্কশ গলার জন্য কেউ পছন্দ করে না। একটু মিষ্টি কথা বলবেন। হেসে হেসে কথা বলবেন এই যে এভাবে..
বলেই সে ঠোঁট ছড়িয়ে এক চওড়া হাসি দিয়ে তাকাল তাহসানের দিকে। কিন্তু তাকাতেই থমকে গেল। হাসি মিলিয়ে গেল। তাহসানের চোখের দৃষ্টিতে যেন আগুন ঝরছে। তীক্ষ্ণ চোখ দিয়েই যেন ভস্ম করে দিতে চাইছে তাকে। তনিমা মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেল। ঢোক গিলে ফেলল। দ্রুত কয়েকবার চোখের পাতা ফেলল। বুঝতে পারল, কথা একটু বেশিই বাজিয়ে ফেলেছে।
অস্বস্তি ঢাকতে বোকা বোকা হাসি হেসে আবার নিজেই বলল,

—না মানে আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম। যেখানে আমাদের স্যার দশ বারোটা ডিজার্ভ করে সেখানে একটাও জুটেনি। স্টুডেন্ট হিসেবে আমাদের তো দুক্কু লাগে না বলুন?
বলেই সে মিছিমিছি নাক টানতে শুরু করল, যেন একটু পরেই কেঁদে ফেলবে। তারপর চোখ মুছার ভান করে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। তাহসান তখনও একই দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বরং এখন কপালের রগগুলো স্পষ্ট ফুলে উঠেছে। তার ধৈর্যের শেষ সীমা যে শেষ প্রান্তে বুঝতে পারল তনিমা। মনে মনে ঠিক করে নিল, এখান থেকে ভেগে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাই সাতপাঁচ না ভেবে হঠাৎই চেচিয়ে বলে উঠল,
—হ্যা আসছি..
বলেই আবার তাহসানের দিকে তাকাল। জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে এনে বলল,
—আমার আম্মু ডাকছে আসি স্যার..।
বলেই একপ্রকার ছুট লাগাল বাইরে দিকে। মুহূর্তের মধ্যেই তার ওড়নার প্রান্তটা দরজা পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। তাহসান কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার পথে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। কারণ, কেউই তাকে ডাকেনি, এটা সে খুব ভালো করেই জানে। মেয়েটা নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলে দিব্যি পালিয়ে গেল। এতদিন তার ধারণা ছিল মেয়েটা দুষ্টু। কিন্তু আজকাল তার কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, এ তো সাংঘাতিক রকমের ফাজিল। মনে মনেই বিরবির করে দু’একটা ধমক দিল সে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। শরীরটাও ক্লান্ত লাগছে। নিজ ঘরে যেতে নিতেই পথিমধ্যে আরিয়ানের দেখা পেল। তার সাথে টুকটাক কথা বলেই সে চলে গেল ফ্রেশ হতে।

দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে কেবলই উঠেছে সবাই। গিন্নিরা ব্যস্ত খাবারদাবার গুছিয়ে রাখতে, সঙ্গে তাহিয়ারাও হাত লাগাচ্ছে। খাওয়ার পর সকলেই অলস হয়ে যায়। একা একা কাজ করতে কারোই ভালো লাগে না। সেই ভেবেই মা চাচিকে সাহায্য করতে আগ বাড়িয়েছে তারা। আর বাকিরা সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। সঙ্গে চলছে টুকটাক কথাবার্তা। চারপাশে এক শান্ত, অলস দুপুরের আবহ ছড়িয়ে আছে। সবাই যখন যে যার মতো ব্যস্ত, ঠিক সেই সুযোগেই রাফি, রাফাকে দেখতেই সবার চোখ এড়িয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—হাই..
হঠাৎ পাশে রাফিকে দেখে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেও ভদ্রতার খাতিরে রাফা বলল,
—জ্বি।
—নাম কী তোমার?
—রাফা..
রাফি অবাক হয়ে তাকাল,
—বলো কী, সেম সেম!
রাফা চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করল,
—কী সেম সেম?
রাফি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—আমাদের নাম, রাফা, রাফি। হাউ মিল!
—ওহহহ..
—হ্যাঁ। তা কত নাম্বার তুমি?
প্রশ্নটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল রাফা। তারপর কিছু একটা ভেবে লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে বলল,
—ত্রি…শ।
রাফি যেন একপ্রকার লাফিয়েই উঠল। চোখদুটো বিস্ফোরিত হওয়ার উপক্রম। স্তব্ধ চোখে কিছুক্ষণ রাফার দিকে তাকিয়ে থেকে অবাক স্বরেই প্রশ্ন ছুড়ল,

—এই, তোমার আব্বু-আম্মুর বিয়ের বয়স কত?
রাফার কপালে ভাঁজ পড়ল। কোন কথা থেকে কোন কথায় চলে গেল এই ছেলে। তবে নিজের রোলের কথা আড়াল হবে এই ভেবে খুশি হলো। একটু ভেবে উত্তর দিল,
—উম ত্রিশ বছর হয়েছে।
রাফি যেন আরও তাজ্জব বনে গেল। ঢোক গিলে বলল,
—এক গ্লাস পানি হবে?
রাফা “জ্বি” বলে পানি আনতে গেল। কিছুটা বিরক্ত। মনে মনে ভাবছে, এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল সে। পানি নিয়ে আসতেই রাফি ঢকঢক করে পুরো গ্লাস শেষ করল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—বলছি, তোমার আব্বু কি প্রতি বছরই একটা করে ডাউনলোড দিত?
রাফা রাগী চোখে তাকাল,
—এই, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?
রাফি মাথা চুলকে বলল,
—না মানে… ত্রিশ বছর বিয়ের বয়সে ত্রিশটা বাচ্চার বাপ! সেই হিসেবেই বললাম আরকি।
—কিইইইইই..!!
রাফি হকচকিয়ে উঠল,
—আরে চেঁচাচ্ছো কেন?
—এই মিয়া, আপনি কী যা তা বলছেন?
—ওমা, তুমিই তো বললে তুমি ত্রিশ নাম্বার। কেন তোমার ছোট আরও আছে নাকি?
রাফা কোমরে দু’হাত দিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে। যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে। যেকোনো মুহুর্তে হামলা করেই বসবে এমন অবস্থা। চেঁচিয়ে বলে উঠল,

—আমার রোল ক্লাসে ত্রিশ, এটাই বলেছি আমিইইইইইই..
এর জুড়ে চিৎকারে কানে হাত দিয়ে রাফি কিছুটা দূরে সরে এল। বুঝে গেল, ভুল জায়গায়, ভুল কথা বলে ফেলেছে। এই মেয়ে যেই চটেছে, এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। না হলে এ তো এখনই সবাইকে ডেকে আনবে। তখন কাকে বোঝাবে, সে বাপের কত নাম্বার সন্তান জিজ্ঞেস করায় তাদের মেয়ে ক্লাসরোল বলে বসেছে। আর সেও বেশি বুঝে নিয়েছে। ঢুক গিলে নিজেকে শক্ত করল। শরীর ঝারা দিয়ে ভাবভঙ্গি পাল্টে ফেলল মুহুর্তে। বিরক্ত মুখে বলল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৬

—এই মেয়ে, আমি কি তোমার ক্লাস রোল জানতে চেয়েছি? বাপের কত নাম্বার মেয়ে, সেটাই জিজ্ঞেস করেছিলাম। আজাইরা এক লাইন বেশি বুঝে। এখন যাও, যাও নিজের কাজে যাও। মেয়েমানুষ ধেইধেই করে ঘুরলে চলে?
বলতে বলতেই নিজেই সেখান থেকে সটকে পড়। নিচে নামতেই এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা নিশ্বাসটা একদমে ছেড়ে দিল। কি বিশাল ভুলটাই না করে ফেলেছে সে। যেই তেজি মেয়ে। একবার যদি গিয়ে তার বাপকে বলে দেয় পুরো ঘটনা, তাহলে পুরো পরিবারের কাছে গণপিটুনি খাওয়া একেবারে নিশ্চিত। না না বান্ধুবির বাড়ি এসে এতবড় অপমান সহ্য করা সম্ভব না। তাই নিজের জান বাঁচানোই এখন ফরজ। মনে মনে শপথ করে নিল৷ এই মেয়ের সামনে আর পড়বে না!

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬৮