প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৩
Sadiya Jahan Simi
রাতের আকাশটা তখন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায় নিভু নিভু জ্বলতে থাকা চাঁদ।হালকা নীল থেকে মেঘলা ধূসর। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছে।যেন বৃষ্টি আসার আগে তার আগমনী সুর। দমকা হাওয়া এসে জানালার কাঁচে ধাক্কা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে পর্দাটা উড়ে উঠছে, আবার নরমভাবে পড়ে যাচ্ছে। শীত আসার আগ মুহূর্তের বৃষ্টি। এই বৃষ্টি শেষেই হালকা হালকা করে শীত পড়তে শুরু করবে।
জানালার পাশে রাখা পড়ার টেবিলটায় অগোছালো হয়ে দুই তিনেক বই পড়ে আছে। জানালা দিয়ে আসা হাওয়ার স্পর্শে খাতার পাতা নিজে থেকেই উল্টে যাচ্ছে।
এই সবকিছুর মাঝখানে বসে উদ্যান রাফসাকে অবলোকন করছে। অষ্টাদশী কন্যার মন সম্পূর্ণ ডুবে আছে বায়োলজি বইয়ে।ঘন পাপড়ি যুক্ত চোখজোড়া বার বার পলক ফেলছে। পড়তে পড়তে হঠাৎ চোখ ঝাপটে কপাল কুঁচকে। মাথায় টানা ঘোমটা সেই কখন দমকা হাওয়ায় পড়ে গিয়েছে।চুলগুলো হাওয়ায় একটু এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পড়ছে।
প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা যখন জানালায় পড়ল, টুপটাপ শব্দটা ঘরের নীরবতায় মিশে গেল। রাফসা হালকা করে চোখ বন্ধ করল, যেন এই শব্দটা অনুভব করছে। ঠান্ডা হাওয়া এসে তার গাল ছুঁয়ে গেল।একটা শীতল, নরম অনুভূতি। উদ্যান দৃষ্টি সরিয়ে আনলো।
গম্ভীর কন্ঠে বলল, “হয়েছে? আর কতক্ষন লাগবে মেডাম?”
রাফসা চোখ তুলে তাকায়। কত তর্কাতর্কির করল চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এই খচ্চর লোক কিছুতেই দিল না যেতে। জোর করে বসিয়ে একে একে টপিক বুঝিয়ে গিয়েছে। অবশ্য রাফসা পরে আর তাল বাহানা করেনি। পুরোটা সময় মনযোগ দিয়ে পড়া বুঝে নিয়েছে। উদ্যানের পড়ানোর স্টাইল এতো নিখুঁত! রাফসাকে মুগ্ধ করেছে। কঠিন টপিকস গুলো রাফসার কাছে নিমিষেই ইজি হয়ে গেল সব।
রাফসা নড়েচড়ে বসল।
উদ্যান হাতের কলমটা ঘুরাতে ঘুরাতে ঠান্ডা গলায় বলল,
“প্রশ্ন করি,ওকেহ?”
“হুঁ করুন।”
“ ক্রোমোজোম কত জোড়া? ও কি কি?”
এহেন প্রশ্নে রাফসা থতমত খায়। চোখ বড়বড় করে তাকালো উদ্যানের দিকে। উদ্যান কোনো পাওা না দিয়ে তাড়া দিল।রাফসা দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“অসভ্য লোক অসভ্যতামি করতে বসেছেন আপনি!”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলে, “এখানে অসভ্যতার কি আছে?নাকি সিম্পল একটা টপিকই জানিস না।”
রাফসা মুখ ঝামটা মেরে সরিয়ে আনল। চোখ বন্ধ করে গড়গড় করে বলে,
“ক্রোমোজোম তেইশ জোড়া। বাইশ জোড়া অটোসোম এবং এক জোড়া..
রাফসা থেমে যায়। অস্বস্তিতে বুক ধরফর করছে। উদ্যান তাকালো চোখ ঘুরিয়ে। তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকিয়ে ফিচলে হেসে বলল,
“And the only way to satisfy the pair of sex chromosomes that every man has is a wife.“
অস্বস্তিতে রাফসার হাত পা কাঁপতে লাগল। গোলাপি অধরযুগল তির তির করে কম্পিত হচ্ছে। হৃৎস্পন্দন তড়তড় করে বোধহয় বাড়ছে। মুহূর্তেই চোখজোড়া বন্ধ করে ঢলে পড়ল একপাশে। উদ্যান দক্ষ হাতে ধরে রাফসার অচেতন মুখপানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। ঠোঁট বাঁকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধায়,
“এতো অল্পতেই!”
রাফসা কেঁপে উঠলো উদ্যানের ভয়েস টোনে। টিচার জিজ্ঞেস করলেও এতো লজ্জা লাগতো না। উদ্যানের কথার ধরন ভিন্ন ধাঁচের ছিল।রাফসা তা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে।আর এখন কি বলল, পূরণ করার একমাত্র উপায়.. ছিঃ ছিঃ ভাবতেও শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে উল্টো পাল্টা কাজ করে বসলো। জ্ঞান হারানোর নাটক করতে হয়েছে। আজ পর্যন্ত একবারও জ্ঞান হারালো না। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল রাফসার কাঁপতে থাকা পাপড়ির দিকে। ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগলো না। ঠোঁট বাঁকিয়ে সূক্ষ্ম হাসে।
উদ্যান খসখসে বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা রাফসার নাক চেপে ধরল। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
“I am feeling negative Bleeding Heart..”
উদ্যানের কথা শুনেই তড়াক করে চোখ মেলে রাফসা। চোখ জোড়া বড়বড় করে তাকালো।রাফসার এমন বোকামি চাওয়া দেখে নাক ছেড়ে দিল উদ্যান।রাফসা সোজা হয়ে বসে নাক ফুলিয়ে বলল, “অসভ্য লোক আপনি আমাকে ধরেছেন কেন! আর এসব অসভ্য মার্কা কথা কোথা থেকে শিখেছেন?”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে বলে, “নিজেই তো ঢলে পড়লেন আমার বুকে। এখন চরিত্রে দোষ লাগিয়ে দিচ্ছেন!”
রাফসা বিদ্রুপ করে মুখ ঝামটা মেরে বলল, “দরকার হয় চেয়ার থেকে পড়ে কোমর ভেঙে ফেলব। হাত পায়ে ব্যথা পেয়ে কয়দিন বিছানায় পড়ে থাকব। তবুও ইচ্ছে করে আপনার শরীরে পড়ার রুচি নেই আমার। দশটা রুচির ফাইল খেলেও ওমন রুচি হবে না আমার। ইয়াক থুউউউ,কি জঘন্য অপবাদ আমার নামে।”
রাফসার অপমানজনক কথা শুনে উদ্যানের কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পরলো। থমথমে গলায় বাঁকা হেসে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন। এতো তাড়াতাড়ি নিজে নিজেই জ্ঞান ফিরল কি করে!”
উদ্যানের প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় রাফসা। কি ভুলটাই না করে ফেলল। মাথা টেবিলে এলিয়ে দিতে চেয়েছিল। কে জানতো, জনদরদী লোক বুকে নিবে। তবুও নিজেকে বড় দেখাতে বই খাতা গুছাতে গুছাতে বলল, “নতুন সায়েন্স । আপনি বুঝবেন না ভাইয়া। আমি বইয়ে পড়েছি।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকালো রাফসার কথায়।রাফসা উঠে কয়েক কদম সামনে গিয়ে সম্পূর্ণ পেছনে ঘুরে তাকালো। উদ্যান ওর পানেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ রাফসা প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“By the way, why did you call me a ‘bleeding heart’ ?”
উদ্যান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালো। ভ্রু কুঁচকে ঠান্ডা গলায় বলল, “My wish ”
রাফসা বিরক্ত হলো।কোনো কথার উত্তর পাওয়া যায় না এই লোকের কাছে। ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, “অসভ্য লোক একটা!”
গটগট করে পা ফেলে রুম ত্যাগ করে। রাফসার ঠোঁট নাড়ানো দেখেই উদ্যান বুঝতে পেরেছে এই মেয়ে আবার চরিত্রে দাগ লাগিয়ে গেল।
সকালের সূর্যটা ধীরে ধীরে পুর্ব আকাশে উঠেছে বেশ আগে। ফরাজী বাড়িতে নাস্তা বানানোর তোড়জোড় চলছে। রাফসা খেয়ে দেয়ে সেই অনেক আগেই বেরিয়েছে কোচিংয়ের উদ্দেশ্য। উদ্যান সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে। আজ ফাস্ট ডে হসপিটালের।ব্রেকফাস্ট করতে বসে পড়েছে সবাই। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে পুরো টেবিলটা একবার অবলোকন করে। জায়িন কে হঠাৎ করেই বলে উঠলো, “রোহান কোথায়? ওকে ডেকে আন।”
“ভাইয়া তো ঘুমে কাদা। এখন যাবো?”
উদ্যান হাতা ফোল্ড করতে করতে বলল, “হুঁ, ডেকে নিয়ে আয়।”
অগ্যতা উঠে দাঁড়ায় জায়িন। পা বাড়ায় রোহানের রুমের উদ্দেশ্য। রোহান কোমড় অবধি কমফোর্টার জড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। পুরো রুম অন্ধকারে ডুবে আছে। জায়িন আগে পর্দা সরিয়ে জানালাগুলো খুলে দিল। মুহুর্তেই পুরো রুমে দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ে। জায়িন এগিয়ে এসে রোহানের পিঠে মৃদু চাপড় মেরে হালকা চেঁচিয়ে ডাকে, “ভাইয়া উঠ। বড় ভাইয়া ডাকছে।”
তবুও ঘুম ভাঙ্গার নাম নেই। ঘুমে বিভোর রোহান। এতো এতো ডাক কানে পৌঁছায় না তার। জায়িন বিরক্ত হয়ে এবার কিছুটা জোরে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে ডাকল। রোহান ধড়ফড় করে উঠে বসে। বেচারা ভয় পেয়েছে। এতো ডাকাডাকির কারণে বিরক্ত হয়ে হয়ে বলল,
“ শীতকালে বেইন্না যে ঘুম ভাংগিদে, তারে মনে হদে দেনাতে বাতে চুওয়ারাই। কোন আলার পোয়া ঘুম ভাইংগি দে আর!”
জায়িন চোখ বড়বড় করে তাকালো। তওবা কি বলছে এসব।
“কি হদ্দে , আই তোর আলা ! মদ হাইওস না? নেশা গইরজ্জুস বাজি!”
রোহান বিরক্তিতে চোখ খুলে। কাল রাতের বৃষ্টিতে কি সুন্দর একটা ঘুম দিয়েছে। শীত শীত ভাইব।
“তোকে বড় ভাইয়া ডাকছে। জলদি নিচে আয়।”
“আমাকে কেন খুঁজছে! খুঁজবে তো অন্যজন কে।”
জায়িন ভ্রু কুঁচকে বলে, “কাকে খুঁজবে?”
রোহান বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। গায়ে কাপড় জড়াতে জড়াতে বলল, “আমাদের ভাবীকে।”
“ভাবী এলো কোথা থেকে!”
“আসবে কোনো একদিন।”
রাজনীতি আর ঝামেলা এই দুইটা যেন একে অপরের সাথে অনেক সময় জড়িয়ে থাকে।
শহরের বাতাসে আজ অদ্ভুত একটা টানটান উত্তেজনা। রাস্তায় রাস্তায় পোস্টার, ব্যানার,সবখানে ক্ষমতার লড়াইয়ের ছাপ স্পষ্ট। মাইকে ভেসে আসে স্লোগান।কেউ উন্নয়নের কথা বলছে, কেউ আবার অন্য দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
একদিকে সমর্থকদের মিছিল।হাত উঁচু করে তারা নিজেদের নেতার পক্ষে স্লোগান দিচ্ছে।অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকজনও চুপ করে নেই। তাদের চোখেমুখে রাগ, ক্ষোভ, আর প্রতিশোধের আগুন। ছোট একটা কথার ঝগড়া কখন যে বড় সংঘর্ষে রূপ নেয়, কেউ বুঝে উঠতে পারে না।
হঠাৎ করেই উত্তেজনা বেড়ে যায়। ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার, তারপর শুরু হয় ইট-পাটকেল ছোড়াছুড়ি। দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়, সাধারণ মানুষ আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ভয় আর বিশৃঙ্খলা।
এই সব কিছুর মাঝেই হারিয়ে যায় আসল উদ্দেশ্য।দেশের উন্নতি, মানুষের কল্যাণ। রাজনীতি তখন আর আদর্শের লড়াই থাকে না, হয়ে যায় ক্ষমতা আর প্রভাবের খেলা, যেখানে সাধারণ মানুষের শান্তি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
“আভিয়ান রাজীব কে সরিয়ে দাও রাস্তা থেকে।”
আভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কি মুসিবতে পরলো। যাকে কিনা কয়দিন পর শ্বশুর বানাবে তাকেই উড়িয়ে দিতে বলছে। শ্বশুর মরলে যে তার না হওয়া বউ কষ্ট পাবে। ঘুরেফিরে কেনো ওদের বিপক্ষ দল হতে হলো। আভিয়ানের এসব রাজনীতি মোটেও পছন্দ নয় এখন। এই রাজনৈতিক নামক দেয়ালের কারণেই রাফসাকে পেতে হাজার হাজার বাঁধা হাজির হবে। বাবার কারণে কিছু বলতে পারছে না।
পথ যতটা সহজ করতে চাইছে, তা আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। কি করে এতো এতো ঝামেলা পেরিয়ে তার মায়াবীকে নিজের করে পাবে।
“কি হলো কিছু বলছো না কেন বাবা?”
আভিয়ান ঠান্ডা গলায় থেমে থেমে বলল, “দেখো বাবা, এবার ইলেকশন সুষ্ঠু ভাবে হতে দাও। দেখো জনগণ কাকে বেঁছে নেয়। জোড় করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই বাবা।”
উনি বেশ চমকালেন। কি বলছে ওনার ছেলে। এখন ক্ষমতাই সব। ক্ষমতা ছাড়া কোনো মানুষ চলে নাকি?
“এসব কি কথা বলছো তুমি! পাগল হয়ে গিয়েছো?”
আভিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল, “বাবা প্লিজ এসব খুনখারাপি ভালো লাগে না।”
বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল ওনি। কি বলছে এই ছেলে। পাগল হলো নাকি!
“তুমি বলছো এই কথা! তোমার মুখে এসব মানায় না আভিয়ান।”
“আই ডোন্ট কেয়ার। তুমি রাজীব ফরাজীর কিছু করবে না। শএুকে এভাবে মেরে মজা নেই বাবা। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড।”
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২২ (৩)
ভ্রু কুঁচকে তাকালো ওনি। ছেলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। বাপ ছেলের মধ্যে এসব নিয়েই কথা কাটাকাটি হয়। আভিয়ান রেগে বেরিয়ে গেল। ভদ্রলোক নিজেও ক্ষেপেছে।পাশ থেকে মালেক নামের লোক বলে উঠলো,
“স্যার আপনার ছেলে রাজীব ফরাজীর মেয়ের প্রেমে পড়েছে।”
কথাটা শুনতেই তড়িৎ গতিতে তাকালো। মাথায় যেন বাজ পড়লো ওনার। বিড়বিড় করে বলল,
“আগুনে আগুনে যুদ্ধ!”
