Home প্রেয়সীর অনুরাগ প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৮

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৮

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৮
Sadiya Jahan Simi

”ছুবেন না আমায়। আপনার ছোঁয়া বিষের মতো লাগে।”
রাফসার কথায় উদ্যানের হাত আলগা হয় খানিকটা। রাফসা তা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালো। অ্যাশ সেই কখনো কোল থেকে নেমে পড়েছে। খাটের উপর এক কোণে চুপটি করে বসে আছে। উদ্যান ঠান্ডা চোখে তাকায় রাফসার দিকে। ভাসা ভাসা চোখের চাহনিতে হতচকিত হয়ে পড়ে রাফসা। অ্যাশকে কোলে তুলে জড়তা নিয়ে বলল,

”খেতে আসুন নিচে।”
”যাবো না।” উদ্যানের কন্ঠ বেশ রাগি শোনালো। রাফসা তা বুঝতে পারে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
”কেন? কি হয়েছে!”
”কিছু না। বের হ রুম থেকে। গো ফাস্ট।”
রাফসা খানিক সামনে এগিয়ে এলো। তখন ছাড়া পেয়েই একলাফে দূরে সরে গিয়েছিল। ”তো খাবেন না! নাকি গার্লফ্রেন্ডের সাথে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে গিয়ে খেয়ে এসেছেন?”
উদ্যান তেতে উঠল আরও। হাত নিশপিশ করছে। কখন যেন গায়ে হাত উঠে যায়। নিজেকে যথাসম্ভব কন্ট্রোল রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
”বেরিয়ে যেতে বলেছিনা। উল্টো পাল্টা কথা বললে থাপড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব। যা বলছি।”
উদ্যান কে রাগতে দেখে যেন ভারী মজা পেল রাফসা। যা করেছে তার ছোট খাট একটা প্রতিশোধ নেওয়াই যায়। যতই নির্দোষ থাকুক না কেন। বাজে সিচুয়েশনে পড়ুক তাতে কি। রাফসা সংসার করবে না এই লোকের সাথে।

”আমি একটা কথা জানতে চাই।”
উদ্যান কিছুই বলল না। সে নিজেকে দমাতে ফোনে ডুব দিয়েছে। নয়তো দেখা গেল রাফসা ঠাশ ঠাশ করে কয়েকটা থাপ্পর খেয়ে ফেলবে। উদ্যানের কোন হেলদোল না দেখে রাফসা ফের বলল,
” রেজিস্ট্রি করলে কি ডিভোর্স দিতে হয়?”
রাফসার এহেন কথায় তৎক্ষণাৎ ফোন হতে চোখ তুলে উদ্যান। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে নিষ্প্রভ কন্ঠে শুধায়,
”আমি একবার রুমের দরজা বন্ধ করলে সকাল ছাড়া খুলব না। আই নো ইচ্ছে করে রাগিয়ে দিতে চাইছিস। ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। নিজের ভালো চাইলে মুখটা অফ রাখ।”
রাফসা বেশ গম্ভীরভাবে বলল, ” আমি কাজের কথা বলছি। এভাবে এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন? যে কাজটা করেছেন আপনার কি আদো একটু রিগ্ৰেট ফিল হচ্ছে না!”
” কিসের জন্য! কি করেছি আমি? রিগ্ৰেটের কথা আসছে কোথা থেকে!”

উদ্যানের কথায় এবার দিশেহারা হয়ে পড়ে রাফসা। ওর সেই অতীত গুলো মানসপটে যেন ভাসতে লাগল। সে বিকেলের অপমান,অবহেলা। এমনকি গায়ে হাত তোলা অবধি বাদ যায়নি। কথাগুলো সেদিন সবচেয়ে নীরব সংবেদনশীল জায়গায় আঘাত করেছিল। কত রাতের কান্না। আজও মনে হলে রাফসার বুক কেঁপে উঠে। কেমন করে পদে পদে অপমান করেছিল। রাস্তায় গায়ে হাত তোলা অবধি বাদ রাখেনি। মাহিনের হাতে খাওয়ার ফলে যে কটু কথা গুলো বলেছিল তা এখনো মনে আছে। যেদিন এই দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল সদূর সুইজারল্যান্ডে, সে রাতের হাহাকার, আর্তনাদ এতোটা করুন দশা দেখেনি লোকটা। বিদায় নেয়নি ওর থেকে। অতীতের কথা গুলো স্মরণ করে রাফসা আর শান্ত থাকতে পারল না। কিছুটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

” নাটক করেন আমার সাথে? আমার অজানায় আপনি রেজিস্ট্রি করিয়েছেন কোন সাহসে! সমস্যা কি আপনার? যখন মন চায় অপমান করবেন। কমতি নিয়ে খোটা দিবেন। গাঁয়ের রং, পড়াশোনা এভরিথিং কোনোটাই আপনি ছাড়েননি। গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাজে কথা বলতে একটাবার ভাবেননি। আপনার কি মনে হয়, আমি আপনাকে মেনে নেবো? শুনুন মিস্টার রাওদ আমি রাফসা এতোটাও ফেলনা নই।
আপনার মনে আছে সে রাতটা? যে রাতে আপনি আমায় ছেড়ে গিয়েছিলেন। আপনি দেখেছিলেন আমার হাহাকার? আমার আর্তনাদ গুলো শুনেছেন, শুনেননি। কাঁদতে কাঁদতে যখন আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল সেদিন আমি পাশে পাইনি আপনাকে। রাতের পর রাত কেঁদে কেঁদে তাহাজ্জুদে আপনাকে চেয়েছি। আমাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে আপনি ক্যারিয়ার গড়তে গিয়েছিলেন।

আমি আপনার বোনের কাছে কিভাবে চেয়েছি আপনাকে জানেন? আপনি পাষাণ পুরুষ একটাবার আমার খবর নেননি। কথা বলেননি কখনো। তিলে তিলে মরেছি প্রতিটি রাত। শুধু আপনার অনুপস্থিতিতে। আপনি যখন চলে গেলেন না, যেন মনে হচ্ছিল আমার হৃদয়টা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আপনার বোন সেই রাতে আমায় একা ছাড়েনি। যদি আমি তার ভাইয়ের জন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলি সেই ভয়ে। আপনি কখনো আমায় বুঝতেই পারেননি। আপনার অনুপস্থিতিতেও পুড়িয়ে মেরেছেন আমায়। আমার এই ছোট্ট মনটায় কষ্ট দিতে আপনার বুক কাপল না? একটাবার মনে হয়নি মেয়েটার কি অবস্থা হবে। মিম আপুর সাথে এতো মেলামেশা করতে একটা বার মনে হয়নি আমার মনের অবস্থাটা কি হতে পারে! হুট করেই রেজিস্ট্রি করিয়ে ফেললেন,আর আমি মেনে নেবো তা ভাবলেন কি করে আপনি? আমি সেদিন রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করেছি কেন জানেন? অবশ্যই প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়নায়। ভালোবাসার মানুষের থেকে অবহেলা, অপমানিত হতে হলে কেমন লাগে সেটা বুঝাতে চেয়েছি।
আপনি ভাবলেন কি করে আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নেবো? রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করেছি এতো টুকু কি যথেষ্ট নয় আপনার!”

রাফসার কথায় স্তব্ধ হয়ে গেল উদ্যান। ওর জন্য মেয়েটা এতো সাফার করবে সেটা কখনো ভাবেনি। ওকে এতোটাই ভালোবাসতো যে তাহাজ্জুদের মোনাজাতে চেয়েছে প্রতিনিয়ত। ও চলে যাওয়ার পর মেয়েটা দম আটকে মরতে নিয়েছিল। ছোট্ট রাফসা কবে এতোটা পাগল হলো তার জন্য! উদ্যানের বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হলো। এই ব্যথা প্রশান্তির। যে মেয়েটাকে পাওয়ার জন্য এতো লড়াই,সে মেয়েটাই তাকে এতো ভালোবাসে। উদ্যান আসলেই সেদিন রাফসার কথা আমলে নেয়নি। ভেবেছিল বাচ্চা মেয়ে আবেগে পড়ে এমন করছে। কিন্তু এতোটা সাফার করবে জানলে উদ্যান কখনোই ওকে এতোটা কষ্ট দিতো না।
রাফসা কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রায় কেঁদে দিয়েছে। কাঁদবে নাই বা কেন। অতীতটা এতো সহজ ছিল না। প্রতিনিয়ত দুমড়ে মুচড়ে উঠতো এই মানুষটির অভাবে। উদ্যান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। রাফসার সামনে দাঁড়িয়ে ওর একগালে হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল, ”তুই এতোটা ভালোবাসিস আমায়!”
রাফসা হাতটা সরিয়ে নিল সজোরে। চোখজোড়ায় ঘৃণা বিরাজমান। তাচ্ছিল্যে হেসে বলল, ” উঁহু, ভালোবাসতাম। এখন আর বাসি না।”
উদ্যান খসখসে বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে রাফসার গাল স্লাইড করে চোখে চোখ রেখে নিষ্প্রভ কন্ঠে বলল,

” কিন্তু আমি ভালোবাসা দেখি প্রতিনিয়ত। ঘৃণা করতে পারবিনা আমায়। তোর মনের কোণে আমার জন্য কেবল ভালোবাসা থাকবে। এই ব্যতীত অন্যকিছু নয়।”
” একদিন ছাদে বিকেলে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে! একজন মানুষের প্রতি অভিযোগ গুলো শেয়ার করেছিলাম। তার জন্য আমার মনের রাজ্যে কেবল ঘৃনা জমিয়ে রেখেছি। সে ঘৃনা কখনো শেষ হওয়ার নয়। সে ফিরে আসতে চাইলেও ফেরাবো না বলেছিলাম না? তাকে আমি কখনোই মেনে নেবো না।”
উদ্যান আহত চোখে তাকিয়ে রইল। ওর বুকের বা পাশটায় কি তান্ডব চালাচ্ছে সেটা কি এই রমনি বুঝবে!
” আমায় এভাবে ভেঙ্গে দিয়ো না জান।”
রাফসা মুখ ফিরিয়ে নেয়। উদ্যান এই আহ্লাদ যেন বিষের মতো লাগছে কানে। রাফসার এমন মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে বুকটা কেঁপে উঠল তার। কি করে বুঝাতে এই রমনি কে। উদ্যান কে অবাক করে দিয়ে রাফসা ধীর গতিতে বলে উঠলো,

“ আমি সত্যিই আপনাকে স্বামী হিসেবে চাই না। মানতে পারবে না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। শান্তিতে একটু বাঁচতে দিন। আর কত পোড়াবেন আমায়! এতো পুড়িয়েও শান্তি হচ্ছে না আপনার? মায়া লাগে আমার প্রতি একটুও! আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত। আর পারছিনা তালে তাল মেলাতে। রেজিস্ট্রি হলে ডিভোর্স করতে হয় কিনা জানা নেই আমার। আপনি প্লিজ আমাকে ছেড়ে দূরে থাকুন। আপনার উপস্থিতি, ছোঁয়া আমার শরীরে কাটার মতো বিঁধে।”
উদ্যানের যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি লোপ পাচ্ছে। প্রেয়সীর অনুরাগ যে এতোটা হবে সেটা কখনো ভাবেনি।

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৭

” রুহি লেট মি এক্সপ্লেন। আমি পরিস্থিতির স্বীকার, প্লিজ বোঝার চেষ্টা কর জান। তুই আমায় এভাবে ভেঙ্গে দিস না আমায়। আমি কার কাছে যাবো বল! তুই না বুঝলে কে বুঝবে আমায়? তুই আমার বউ তো। তাহলে কেন ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছিস! এই কথা বলিস না রুহি। তোকে ছাড়া বেঁচে থাকার শক্তি যে আমার নেই জান। পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমি তোর পায়ে এনে ফেলবো। তবুও ছেড়ে যাওয়ার কথা আর বলিস না জান। আমি বাঁচবো না তোকে ছাড়া। প্লিজ জান আমার।”

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২৯