ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৫
নওরিন কবির তিশা
পড়ন্ত বিকেলের মিঠে রোদ্দুর কিঞ্চিৎ মৃতপ্রায় হয়ে ঝুলে আছে দ্যুলোক গাত্রে। সূর্য্যমনির ডুবি ডুবি ভাব। হামিদা বেগমরা এসে পৌঁছেছে কিছুক্ষণ হলো। এসেই তিনি আগে শুনেছেন তৃষার গোসলের ব্যাপারে কিন্তু আর্য নিজেই সেইদিকটা সামলেছে শুনে বর্তমানে নিশ্চিন্ত তিনি।
দুপুরের জন্য হামিদা বেগম নিজেই রান্না করে রেখে গিয়েছিলেন।তাই খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে আর জিজ্ঞাসাবাদ না করে ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিতে তিনি প্রবেশ করেছেন কক্ষে।
টুইঙ্কলের পিছু পিছু একপ্রকার ছোটে চলছে তৃষা।
বামহাতে টুইঙ্কলের বিকালের খাবার। কোমর ছড়ানো কেশরাজ এখনও জলসিক্ত, বাঁধনহারা সেগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে অবাধ্য বাতাসে। নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছে টুইংকেলের প্রাণবন্ত রিনরিনে হাসির ধ্বনি আর তৃষার কথার কলতান।
—‘অমন করেন না সোনা।একটু খেয়ে নাও,জাস্ট ওয়ান কিউটি।
টুইংকেল ওভাবেই ছুটতে ছুটতে বলল,,—‘ক্যাচ ম্যি বানি..ক্যাচ ম্যি ইফ ইউ ক্যান….!
খিলখিলিয়ে হেসে কথাগুলো বলতে বলতে ও ফের ছুট লাগাল।অসহায় তৃষা সামান্য সঞ্চালনে ব্যাথাতুর হাতটা নাড়িয়ে পুনরায় ছুটলো ওর পিছু পিছু।কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই এইবার তৃষা নিজের ব্যথার কথা সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়ে পূর্বের ন্যায় চঞ্চল ভঙ্গিমায় দৌড় দিল টুইংকেল কে ধরতে।বেমালুম ভুলে গেলো নিজের ভঙ্গুর হাতখানার কথা।
তবে ঐযে কথায় আছে না অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়। তৃষার সাথে ঠিক তেমনটাই হলো।তৃষা টুইংকেল কে ধরেই ফেলেছিল প্রায় কিন্তু তখনই ঘটলো বিপত্তি। ঈষৎ পিচ্ছিলতায় পা ফোঁসকে পড়তে গেলো সে, সামান্য আর্তনাদ সূচক শব্দ বেরিয়ে আসছিল কন্ঠস্বর থেকে।
তবে তার ক্ষীণ কায়া ভূমি স্পর্শ করার ঠিক আগমুহূর্তে একজোড়া শক্ত হাতের বাহুবন্ধনে নিজেকে আবিষ্কার করলো তৃষা।ভয়ে খিঁচে রাখা আঁখিদ্বয় মেলল পিটপিটিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে সম্মুখে দৃশ্যমান হলো আর্যর রাগী মুখাবয়ব।সে তপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চেয়ে আছে তার দিকে।তৃষা পড়া থেকে বেঁচে গিয়ে শুকরিয়া আদায় করতে যাওয়ার পরিবর্তে আর্যর সেই অগ্নি দৃষ্টিতে শুকনো ঢোক গিলল।
আর্য ওকে অতি সন্তর্পণে দাঁড় করিয়ে পরমুহূর্তেই অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,,
—‘আর ইউ্য ক্রেজি!
আর্যর কঠোর কন্ঠে ভয়ে কিঞ্চিৎ কম্পিত হলো তৃষার কায়া। ও আমতা আমতা করে কিছু বলবে তার আগেই আর্য ওর কোমল বাহুদ্বয় বেশ বেগে নাড়িয়ে বলল,,
—-‘আন্সার ম্যি স্টুপিড গার্ল! এইভাবে ছোট-ছুটি করছিলে কেনো?
তৃষা শুকনো ঢোক গিলে বলল,,—‘আ-আমার লাগছে!
আর্য না থেমে আরো দ্বিগুন তেজে চিৎকার বলল,,—‘এখন ব্যথা লাগছে? যদি আবার পড়ে যেতে তখন?তখন কি হতো একবারও ভেবে দেখেছো ইডিয়েট!
রাগের তোপে সম্বোধন হারিয়ে ফেলেছে আর্য।তবে সেদিকে জন্য ভ্রুক্ষেপ নেই ওর।এ দিকে আর্যর কণ্ঠের সেই তপ্ত গর্জন যেন তৃষার কর্ণকুহরে সজোরে আঘাত করল। ওর সারা শরীর এক অজানা আশঙ্কায় রি রি করে উঠল। আর্যর দুচোখে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা। সেই আগুনের আঁচ তৃষার কোমল মুখশ্রীতে এসে লাগছে।
—‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? নিজেকে কি এখনও সেই ছোট্ট বাচ্চা ভাবো যে যখন খুশি যেখানে খুশি হুটোপুটি করবে? একবারও কি ওই ড্যামেজড হাতটার কথা মাথায় আসেনি তোমার? আর ইউ্য ইভেন রিয়েল?’ষ
আর্যর এই রুদ্রমূর্তি তৃষার সম্পুর্ন অচেনা। স্বভাবতই ওর দুচোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা গড়িয়ে নামল টপটপ করে। ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে ব্যথায়। আর্য যেন আজ সব হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। ও তৃষার অতি নিকটে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বলতে লাগল,,
—‘তোমাকে কি চব্বিশ ঘণ্টা চোখে চোখে রাখতে হবে? এই যে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলে কিছুক্ষণ আগে, সেই হুঁশ কোথায় গেল? ইডিয়েসি আর কাকে বলে! তুমি কি বোঝো না তোমার একটু এদিক-সেদিক হলে বাকিদের ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যায়? স্রেফ নিজের কেয়ারলেসনেসের জন্য তুমি আজ আবার একটা বড় ইনজুরির মুখে ছিলে। হাউ কুড ইউ বি সো ইরেসপন্সিবল!
আর্যর রাগের আড়ালে যে গভীর উৎকণ্ঠা আর এক বুক হাহাকার লুকানো ছিল, তা তৃষার অবুঝ মন ধরতে পারল না। ও শুধু দেখল অপর প্রান্তের মানুষটির কঠোর রূপ। ততক্ষণে তৃষার কান্নার বেগ বেড়ে গিয়েছে। ঠিক এই সময়েই ড্রয়িংরুমে হইচই শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন হামিদা বেগম। তাঁর পিছু পিছু আতঙ্কিত মুখে সাবরিনা আর মৃত্তিকাকেও দেখা গেল।
হামিদা বেগম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন,,
—- ‘কী হয়েছে আর্য? এভাবে চেঁচানি দিচ্ছো কেন বাবা?
কিন্তু আর্য যেন তখন ঘোরের মধ্যে। ও তৃষাকে শাসন করতে করতে একপ্রকার নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়েছিল অজান্তেই। ওর বলিষ্ঠ বাহুবন্ধনে তৃষার ক্ষীণ কায়া তখনও থরথর করে কাঁপছে। ওর বিরামহীন অশ্রুধারা আর্যর শার্টের উপরিভাগ সিক্ত করে দিচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ছোট্ট টুইংকেল তার দুই ক্ষুদে হাত কোমরে রেখে, ভ্রু কুঁচকে বীরদর্পে এগিয়ে এল আর্যর দিকে। ওর বাবার এই রণচণ্ডী রূপ দেখে ও বিন্দুমাত্র না দমে বেশ জোর গলায় বলল,
—‘স্টপ ইট পাপা! তুমি কেন বানিকে এভাবে বকছ? বানি তো আমার সাথে খেলছিল। তুমি খুব পচা! তুমি বানিকে স্যরি বলো এখনই।
হামিদা বেগম এগিয়ে এসে আর্যর হাত থেকে তৃষাকে একপ্রকার ছাড়িয়ে নিলেন। তৃষা তখন ডুকরে কেঁদে উঠে হামিদা বেগমের আঁচল আঁকড়ে ধরল। হামিদা বেগম আর্যর দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,,
—- ‘আহ্ আর্য! মেয়েটা এমনিতেই ব্যথায় কাহিল, তার ওপর ও তো বাচ্চা মানুষ। তুমি এভাবে ওকে সবার সামনে বকছো কেন? একটু তো বিবেচনা করবে।
আর্য এবার যেন সম্বিত ফিরে পেল। ওর বুকটা তখনো ধুকপুক করছে সেই ভয়াবহ পতনের দৃশ্য কল্পনা করে। ও সবার দিকে একবার শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। অতঃপর কোনো উত্তর না দিয়ে একঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিল। তারপর কারো কোনো কথার তোয়াক্কা না করে ধুপধাপ পা ফেলে ওখান থেকে চলে গেল। ওর চলে যাওয়ার শব্দে যেন ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হলো।
হামিদা বেগম তৃষার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,,
—-‘কাঁদিস না মা। ও তোকে আগলে রাখতে চায় বলেই হয়তো রাগের মাথায় ওরকম করে ফেলেছে। ও তো চিরকালই একটু খ্যাপাটে।
তৃষা চোখের জল মুছে ধরা গলায় হামিদা বেগমের দিকে চাইল। ওর কম্পিত ওষ্ঠাধর থেকে কেবল এটুকুই নির্গত হলো,,
—‘চাচিমা, আমি তো কেবল টুইঙ্কেলকে খাওয়াতে চেয়েছিলাম।
হামিদা বেগম ওর চিবুক ছুঁয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,,
—‘বুঝেছি রে মা। তুমি ঘরে চলো, একটু বিশ্রাম নিলে মনটা শান্ত হবে।
অতঃপর সাবরিনা আর মৃত্তিকা দুপাশ থেকে তৃষাকে আগলে ধরল। ড্রয়িংরুমের আধুনিক অন্দরসজ্জা পেরিয়ে ওরা ওকে নিয়ে চলল শোবার ঘরের দিকে। মেঝের পালিশ করা ইতালিয়ান মার্বেল পাথরে বিকেলের ম্লান আলো পড়ে এক মায়াবী আভা তৈরি করেছে।
ওরা তৃষাকে ওর শয়নকক্ষে নিয়ে বসাল। সাবরিনা আলতো করে তৃষার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বলল,,,
—‘ভাবি, তুমি আর্য ভাইয়ের ওপর রাগ করো না।উনি তোমাকে ওভাবে পড়তে দেখে একদম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন।
ওদের জোরাজুরিতে তৃষা বিছানায় শুলো থেকে তবে ওর মন পড়ে রইলো অন্য কোথাও।ও সিলিং ফ্যানের মৃদু ঘূর্ণনের দিকে চেয়ে রইল নিষ্পলক, ওর কানে তখনও আর্যর সেই তপ্ত শাসনের সুরটা অনুরণিত হচ্ছিল।
সাবরিনা কক্ষের গুমোট ভাব কাটাতে বলল,,
—‘উফ ভাবি! আর্য ভাইয়ের চিল্লাচিল্লি শুনে মনে হচ্ছিল ড্রয়িংরুমে বুঝি কোনো সাইক্লোন ঢুকেছে। লোকটা যেমন কেয়ারিং, তেমনি একটা আস্ত এংরি বার্ড। তুমি একটুও মন খারাপ করো না তো।
মৃত্তিকা পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,,
—‘একদম! ভাইয়ার ওই ক্যাপ্টেনগিরি শুধু জাহাজে দেখালে হয়, বাড়ির ভেতর দেখালে কার ভালো লাগে বলো? ভাবি, তুমি বরং ভাবো ভাইয়া তোমাকে কোলে তুলে ধরার জন্য ওভাবে দৌড়ে এসেছিল, রোমান্টিক না ব্যাপারটা?
তৃষা ফ্যাকাশে হেসেই মুখ ফিরিয়ে নিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সাবরিনার পাশে থাকা ফোনটা সজোরে কেঁপে উঠল। ভাইব্রেশনের শব্দে ঘরটা যেন একটু কেঁপে উঠল। সাবরিনা তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে নিতেই ওর চোখের মণি দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই ও কেমন যেন কুঁকড়ে গেল।
মৃত্তিকা কৌতূহলী হয়ে ঘাড় কাত করে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতেই সাবরিনা এক ঝটকায় ফোনটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। ওর চেহারায় এক লহমায় রাজ্যের অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল।
—‘আরে… উমম… একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল। আমি জাস্ট বাইরে থেকে আসছি!
কথাটা শেষ করেই সাবরিনা উত্তরের অপেক্ষা না করে রুম থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল। মৃত্তিকা ভ্রু কুঁচকে সাবরিনার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল। তৃষাও একটু অবাক হলো সাবরিনার এমন হন্তদন্ত ভাব দেখে।
মিনিট পাঁচেক পর সাবরিনা রুমে ফিরে এল। ওর গাল দুটো একটু লালচে হয়ে আছে, আর চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তবে ও সেটা ঢাকার চেষ্টা করে বেশ গম্ভীর হয়ে বসল। মৃত্তিকা ওর দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বাঁকা হাসল।
—‘কিরে আপু? এতক্ষণ কার সাথে ফুসুর-ফাসুর চলছিল করিডোরে? আমি কি খুব ভুল দেখছি নাকি ফোনের স্ক্রিনে ‘R’ দিয়ে একটা নাম জ্বলজ্বল করছিল?
সাবরিনা থতমত খেয়ে চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
—‘কী যা-তা বলছিস? ধ্যাত! কলেজের এক ফ্রেন্ড কল করেছিল, নোটস নিয়ে কথা বলছিল।
মৃত্তিকা এবার আরও একধাপ এগিয়ে এল। সে তৃষার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে সাবরিনাকে বলল,,
—‘নোটস নাকি রায়াদ ভাই কল করেছিল? ওই যে, যার কথা তুমি কাল রাতে ডায়েরিতে লিখছিলে?
সাবরিনা এবার রীতিমতো ধমক দিয়ে উঠল,,
—‘মৃত্তিকা! একদম ফালতু কথা বলবি না। রায়াদ ভাই তো কেবলই কানাডা থেকে ফিরল। উনি কলেজের সিনিয়র, আর কালকের ফাংশনে স্রেফ দেখা হয়েছিল।
তৃষা এবার বিস্ময়ভরা চোখে সাবরিনার দিকে তাকিয়ে বলল, —‘রায়াদ মানে?
মৃত্তিকা হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল, —‘আরে ভাবি রায়য়াদ ভাই হচ্ছে আমার আপুর আহাআহা।মানে ওই সিনিয়র ছিল আর কি! এখন তো পুরো কানাডিয়ান হিরো হয়ে ফিরেছে। তার উপর আমাদের ইংলিশ টিচারের ছেলে তো আজকে আমাদের স্কুলের ফাংশনে এসেছিল। সাবরিনা আপু তো উনার কথা বলতে গিয়ে লজ্জায় লাল আপেল হয়ে যাচ্ছিল বারবার।
সাবরিনা লজ্জিত হয়ে মৃত্তিকাকে একটা চিমটি কেটে বলল,,
—‘তুই একদম থামবি মৃত্তিকা! ওনার সাথে আমার স্রেফ কালকের গেট-টুগেদারে পরিচয় হয়েছে আবার। উনি একটু হেল্প চেয়েছেন লাইব্রেরি নিয়ে, ব্যস! এর মধ্যে রোমান্স খোঁজা তোর স্কুলের বাচ্চাদের কাজ, আমাদের কলেজের লেভেলে না।
তৃষা ওদের এই খুনসুটি দেখে নিজের কষ্টটা কিছুটা ভুলে গেল। সে মুচকি হেসে বলল,
—‘তা ননদিনী আমার কার সাথে এত গোপন আলাপ করে সেটা জানার অধিকার তো ভাবি হিসেবে আমার আছেই!
সাবরিনা তৃষার হাত জড়িয়ে ধরে আদুরে স্বরে বলল,,
—‘আরে না ভাবি, এখন কিছুই হয়নি। সময় হলে সব জানাব। আপাতত আর্য ভাইয়ের ওই খ্যাপাটে মেজাজ থেকে তুমি কি করে বাঁচবে সেটা নিয়ে ভাবো তো!
ওদের তিনজনের হাসাহাসিতে শয়নকক্ষের পরিবেশটা আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। কক্ষের মায়াবী আলোয় ভাবি-ননদের এই হৃদ্যতা এক অন্যরকম ছবি ফুটিয়ে তুলল সুখনীড়ের অন্তরালে। তিন মূর্তির আড্ডায় হঠাৎই এক ক্ষুদে ঝড়ের প্রবেশ ঘটল। দরজার পর্দা ঠেলে টুইংকেল ভেতরে ঢুকল, ওর ছোট ছোট হাতে একটা বড় চকোলেট বারের প্যাকেট। ওর গোলুমলু মুখটা এখনো আর্যর ওপর রাগে থমথমে। সাবরিনা আর মৃত্তিকার হাসাহাসি থামিয়ে টুইংকেল সোজা গিয়ে তৃষার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
—‘বানি! তুমি পচাপাপার কথা শুনে আর কাঁদবে না তো? দেখো, আমি পাপার ড্রয়ার থেকে তোমার জন্য সবচেয়ে বড় চকোলেটটা চুরি করে এনেছি!
টুইংকেলের এই চৌর্যবৃত্তির কথা শুনে সাবরিনা আর মৃত্তিকা হোহো করে হেসে উঠল। তৃষা টুইংকেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল,,
—‘পাপা দেখলে তো বকবে সোনা। তুমি এটা ওনার ড্রয়ারে রেখে আসো।
টুইংকেল নাক কুঁচকে জেদি গলায় বলল,,
—‘একদম না! পাপা তোমাকে বকেছে, তাই এখন পাপার সব পচা জিনিস আমাদের। জানো বানি, আমি না পাপাকে একটা পানিশমেন্ট দিয়েছি। পাপা যখন সোফায় বসে ফাইল দেখছিল, আমি পাপার ল্যাপটপের ওপর আমার স্টিকার লাগিয়ে দিয়েছি। এখন পাপাকে দেখতে পুরো একটা বিড়ালছানা লাগছে!
মৃত্তিকা হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল,,
—‘ওরে খোদা! আর্য ভাইয়ের চার লাখ টাকার ল্যাপটপে স্টিকার? টুইংকেল, তুই তো দেখি আমাদের হয়ে সব প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছিস!
টুইংকেল গর্বিত ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে বলল,,
—‘আমি তো আরও বড় পানিশমেন্ট দেব। পাপা যখন রাতে ঘুমাবে, আমি পাপার শার্টের ভেতর পানি ঢেলে দেব। দেখবে কেমন মজা হয়!
টুইঙ্কালের এমন প্রতিশোধ পরায়ণ কথাবার্তায় হেসে কুটিকুটি হলে সকলে। না চাই তো হাসলে তৃষা। আর তৃষাকে হাসতে দেখে হাসি ফুটল টুইংকেলের গম্ভীর হয়ে থাকা তুলতুলে মুখাবয়বেও। ও তৃষার চোয়ালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,,
—‘তুমি কখনো কাঁদবে না তো বানি। তোমাকে হাসলে অন্নেক সুন্দর লাগে। কিন্তু কাঁদলে পচা মেয়েদের মত লাগে।
তৃষাও টুইংকেলের চুমু খেয়ে বলল,,—‘আচ্ছা কিউটি পাই! বানি আর কক্ষনো কাঁদবে না।
টুইংকেল ওর কনিষ্ঠ আঙ্গুলটা তৃষার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,—‘প্রমিস তো?
তৃষাও ওর কনিষ্ঠ আঙুল বাঁকিয়ে টুইঙ্কলের এগিয়ে রাখা তুলতুলে আঙুলটায় ছুঁয়ে বলল,,–‘পিঙ্কি প্রমিস।
সুখনীড়ের ওপর দিয়ে সন্ধ্যার মায়াবী আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। নীলাকাশের বুক চিরে তখন কেবলই দু-একটি তারার ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে আজ সেই পরিচিত প্রাণবন্ত আড্ডার সুরটা বড্ড অনুপস্থিত। নৈশভোজের সময় টেবিলে এক রাশ নীরবতা জেঁকে বসেছে। ঝাড়লণ্ঠনের হলদেটে আলোয় ডাইনিং টেবিলের রুপালি বাসনগুলোয় বিকেলের সেই বিষণ্ণতার ছাপ লেগে আছে।
টেবিলে সবার উপস্থিতি থাকলেও কেবল একটি চেয়ার শূন্য। তৃষার সেই শূন্য আসনটি যেন আর্যর চোখের সামনে এক মস্ত বড় প্রশ্নবোধক হয়ে বিঁধছে। সাবরিনা আর মৃত্তিকাও আজ বড্ড চুপচাপ। টুইংকেল তার প্লেটে ভাতের দানাগুলো নিয়ে কেবল খুঁচিয়ে চলছে, ওর গোল গোল চোখ দুটো এখনো অভিমানে লাল।
আর্য নিজের প্লেটে খাবার তুলে নিলেও এক লোকমা মুখে তোলার সাহস পেল না। তার অবচেতন মন বারবার সেই বিকেলের দৃশ্যটার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে। তৃষার কান্নাসিক্ত মুখ আর কম্পিত ওষ্ঠাধর যেন তার বুকের বাঁ পাশে এক বিচিত্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। আর্য নিরবতা ভেঙে হামিদা বেগমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
—‘চাচিমা?তৃষা কোথায়?
হামিদা বেগম ভাতের লোকমা মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। তার মুখাবয়বে এক রাশ গাম্ভীর্য। তিনি বেশ রুক্ষ স্বরে উত্তর দিলেন,
—‘মেয়েটা ঘরে দরজা দিয়ে শুয়ে আছে। আমি ডেকেছিলাম, ও বলল ওর নাকি খিদে নেই। শরীরেও নাকি যুৎ লাগছে না। খাবেই বা কী করে? যে শাসনের তোড়ে ওর মনটাই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, সেখানে পেটের খিদের কথা মনে থাকে?
চাচিমার এই কড়া কথাগুলো তীরের মতো আর্যর বুকে বিঁধল। সে এবার টুইংকেলের দিকে চাইল। টুইংকেল ওর দিকে একঝলক তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল। আর্য ওর গাল ছুঁতে যেতেই টুইংকেল কাঁধ ঝিকিয়ে সরে বসল,
—‘পাপা, তুমি আমাকে ডাকবে না! তুমি বানিকে কাঁদিয়েছ, তুমি ভেরি ভেরি ব্যাড। আমি তোমার সাথে কোনো কথা বলব না।
আর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারছে আজ এই বাড়িতে সে একঘরে হয়ে পড়েছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হামিদা বেগমকে বলল,,
—‘চাচিমা, তৃষার খাবারটা একটা প্লেটে বেড়ে দিন। আমি নিয়ে যাচ্ছি।
হামিদা বেগম কথা না বলে গজগজ করতে করতে প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। তবে প্লেটটা আর্যর হাতে দেওয়ার সময় তিনি একবারও ওর দিকে তাকালেন না। আর্য নিজের প্লেটটা ডাইনিংয়েই ফেলে রেখে তৃষার খাবারের প্লেটটি হাতে নিয়ে ধীর পায়ে দোতলার করিডোরের দিকে এগোতে লাগল। উপস্থিত সকলে এক মনে চেয়ে রইল ওর প্রস্থান পথের দিকে।
তৃষার ঘরের দরজার সামনে এসে সে থামল। ঘরের ভেতর কোনো আলো জ্বলছে না, কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো মেঝেতে একফালি সাদা কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। আর্যর হাতটা দরজার কপাটে উঠতে গিয়েও থমকে গেল। এককালের অকুতোভয় ক্যাপ্টেন আজ এক চিলতে মেয়েলি অভিমানের কাছে নিজেকে বড্ড অসহায় বোধ করছে।
সে মৃদু শব্দে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। আর্য পুনরায় নক করে শান্ত গলায় ডাকল,,
—‘তৃষা? দরজাটা খুলুন। আমি খাবার নিয়ে এসেছি।
মিনিট খানেক পর ভেতর থেকে এক ক্ষীণ আর ভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
—‘আমি খাব না। আপনি যান এখান থেকে।
আর্যর চোয়ালটা শক্ত হলো। সে দরজার হাতলে চাপ দিতেই দেখল ওটা লক করা নেই। সে সন্তর্পণে ভেতরে প্রবেশ করল। বিছানায় এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তৃষা। আর্য সুইচ অন করে আলো জ্বালালো। মুহূর্তেই উজ্জ্বল আলো উদ্ভাসিত হল কক্ষ জুড়ে। হঠাৎ তীব্র আলোক ঝলকানিতে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল তৃষা। আর্য তৃষার একদম কাছে গিয়ে বসল। ওর মাথায় হাত দিতে গিয়েও সে হাতটা গুটিয়ে নিল। সে অত্যন্ত সংবেদনশীল স্বরে বলল,,
—‘এভাবে না খেয়ে থাকলে ওষুধগুলো কাজ করবে না। উঠে বসুন।
অপর পাশ থেকে কোন জবাব না আসায় আর্য ফের ধিরস্থির কন্ঠে বললো,,
—‘তৃষা, এভাবে দেয়ালের সাথে অভিমান করে কি ক্যালরি লস করা সম্ভব? আপনার বডি এখন হিলিং মোডে আছে, এই সময় স্টার্ভিং আপনার জন্য একটা লাক্সারি ছাড়া আর কিছু নয়।
তৃষা চট করে উঠে বসল না, তবে ওপাশ থেকেই নাক টেনে উত্তর দিল,,
—‘আপনিই তো বলেছিলেন আমি ইডিয়েট, আমি কেয়ারলেস। তো একজন ইডিয়েটের সাথে খাবার নিয়ে এত সময় নষ্ট করার কী দরকার?
—‘কজ আপনার এই সেলফ-ডিস্ট্রাকশন মোডটা আমি সহ্য করতে পারছি না। লজিক্যালি চিন্তা করুন, বিকেলের ওই ইন্সিডেন্টে আপনার হাড়টা যদি আবার ডিসপ্লেসড হতো, তবে আমাকেই আপনাকে হাসপাতালে বয়ে নিয়ে যেতে হতো। আমি কি সেই এক্সট্রা খাটুনিটা চাইব?
তৃষা এবার একঝটকায় উঠে বসল। ওর চোখের কোণগুলো লাল, আর বিক্ষিপ্ত চুলগুলো কপালে এসে লেপ্টে আছে। ও আর্যর চোখের দিকে তাকিয়ে অভিমানী গলায় বলল,,
—“আপনার কাছে কি সবকিছুই লজিক আর খাটুনি? আপনি তো আমাকে বকা দেওয়ার সময় একবারও ভাবেননি যে সবার সামনে আমার কেমন লাগছে! আপনি তো কেবল আপনার ক্যাপ্টেনগিরিটাই বোঝেন। আমি যে টুইংকেলকে খাওয়াতে গিয়েছিলাম, ওটা আপনার লজিকে পড়ে না?
আর্য এবার কিছুটা নরম হলো। সে তৃষার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল,,
—‘আপনি যখন ফ্লোরের ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছিলেন, তখন আমার লজিক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল তৃষা। ওই কয়েক সেকেন্ডে আমার হার্টবিট কত ছিল…..!
ও মাঝপথে থামতেই তৃষা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,,—‘মানে?
—‘নাথিং!
ব্যাস ক্যাপ্টেন আর্য এহসান ফের তার পেশাদারী গাম্ভীর যে ফিরে গিয়েছে দেখতেই তৃষা মুখ ফেরালো, ক্ষণিকের ব্যবধানে বলল,,
—‘তবুও ওভাবে কেউ বকে? টুইংকেল পর্যন্ত আপনাকে পচা বলছে।
আর্য খাবারের প্লেটটা তুলে তৃষার সামনে এগিয়ে দিল,,
—‘পচাপাপাকে যদি আবার ভালোপাপার লিস্টে আনতে হয়, তবে বানিকে আগে এই খাবারটুকু শেষ করতে হবে। আমি নিজে খাইয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু আপনি তো আবার সেলফ-ডিপেন্ডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন। সো, এই চামচটা ধরুন আর অন্তত অর্ধেকটা ফিনিশ করুন। এটা আমার কোনো অর্ডার নয়, স্রেফ একটা রিকোয়েস্ট বলতে পারেন।
তৃষা আর্যর এগিয়ে দেওয়া প্লেটের দিকে তাকাল। তবে দৃষ্টির অনুভূতি বুঝতে অক্ষম হলো। অতঃপর বাম হাত দিয়ে চামচটা ধরল ঠিকই, কিন্তু মুখটা এখনো ভার করে রাখল,,
—‘অনুরোধ করছেন নাকি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল?
আর্য জানলার বাইরের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৪
—‘যেটা আপনার ডিনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে, সেটাই। এখন কথা কম আর প্রোটিন ইনটেক বেশি করুন। আমি ওপাশে বসে বই পড়ছি, এক লোকমা কম হলে কিন্তু কাল সকালে ব্রেকফাস্টের বদলে প্রকাণ্ড একখানা ইনজেকশন আপনার অপেক্ষায় থাকবে। চয়েস ইজ ইওরস।
তৃষা চট করে আর্যর দিকে একবার তাকাল। লোকটার মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, যেন সে সত্যিই ইনজেকশন পুশ করার প্রফেশনাল নার্স নিয়োগ করে রেখেছে। তৃষা মনে মনে গাল ফুলিয়ে ভাবল,,
—‘আস্ত একটা হনুমান! না না, হনুমান তো লেজ উঁচিয়ে লাফায়, এটা তো তার চেয়েও অধম। একদম কলার খোসার ওপর বসে থাকা ওভার সাইজ রাগী গরিলা!
