ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৭
নওরিন কবির তিশা
অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত। দেওয়ালপঞ্জিকার পাতায় এখন ইংরেজি মে মাসের দিনলিপি চলছে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রণদামামা বেজে উঠেছে ইতোমধ্যেই।সময়টা ফজরের কিছুটা পর। সময়টা সদ্য অতিক্রান্ত ফজর; ঊষালগ্নের সদ্য উদিত অরুনের লালিমার বিচ্ছুরণ ঘটছে সমগ্র অন্তরীক্ষ জুড়ে।স্নিগ্ধ সমীরণের মৃদু হিল্লোলে শীতল ধরনী।
কিছুক্ষন পূর্বে তন্দ্রা টুটেছে তৃষার। নামাজ শেষে সে এখন নিবিষ্টচিত্তে পাঠ্যবইয়ের পাতায় নিমগ্ন। সহসা পার্শ্বে অবহেলায় পড়ে থাকা যান্ত্রিক যন্ত্রটা তড়িৎ বেগে দ্বিকবিদ্বিক প্রকম্পিত করে গর্জে উঠে শান্ত পরিবেশকে বিদীর্ণ করল। অপ্রত্যাশিত এই শব্দের ঝংকারে তৃষা কিঞ্চিৎ সচকিত হলো; পরক্ষণেই ক্ষিপ্রহস্তে যন্ত্রটিকে করায়ত্ত করে সেটির উচ্চকিত নাদ স্তিমিত করলো।অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নিরীক্ষন করলো; সঙ্গে সঙ্গে বাদামি রঙা চক্ষু মনিদ্বয় আনন্দাবেশে চিকচিক করে উঠল ওর।
তৎক্ষণাৎ ফোনটা রিসিভ করেই ও তড়িৎ বেগে বলল,-‘ হ-হ-হ্যালো। কেমন আছেন স্যরি আসসালামুয়ালাইকুম।
তৃষার কন্ঠে ফুটে ওঠা সেই ব্যাকুলতা আর ভুলের সংমিশ্রণ ফোনের ওপাশে আর্যর কর্ণগোচর হতেই ওর ওষ্ঠাধরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল;ও কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে অত্যন্ত ধীর, ভরাট কণ্ঠে উত্তর দিল,
-‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম। পরীক্ষার দিন সকালে এত উত্তেজিত থাকলে তো চলবে না মিসেস আর্য এহসান। মাথা ঠান্ডা রাখুন।
তৃষা লজ্জায় নিজের ওষ্ঠাধর দংশন করল; কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
-‘ আসলে আপনার ফোন আসবে ভাবিনি… মানে এত সকালে …. আপনি বোধহয় খুব ব্যস্ত ছিলেন?
আর্য এবার কিঞ্চিৎ হালকা মেজাজে বলল,
-‘ ব্যস্ততা তো থাকবেই। কিন্তু আজ আমার স্বপ্নবিলাসী ম্যামের জীবনের বড় একটা যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, তাই সব ফাইল আপাতত ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রেখেছি। সো, আর ইউ্য রেডি ফর দ্য ব্যাটল?
তৃষা জানালার বাইরের রাঙা আসমানের পানে চেয়ে মৃদু হাসল। আর্যর এই তুমি সম্বোধনটা ওর বড্ড মধুর লাগে। ও বলল,
-‘ প্রিপারেশন তো মোটামুটি ভালো। কিন্তু ভয় লাগছে। যদি সব ভুলে যাই?
-‘ ভুলে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তুমি যতটা মেধাবী, তার চেয়েও বেশি পরিশ্রমী। জাস্ট রিলেক্স। আর হ্যাঁ, সাথে করে সব ডকুমেন্ট নিয়েছ তো? অ্যাডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন?
তৃষা ফোনের এপাশেই মাথা নাড়ল, যেন আর্য ওকে দেখতে পাচ্ছে। ও গুছিয়ে রাখা ফাইলটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
-‘ হ্যাঁ, সব চেক করেছি। সব ঠিক আছে।
-‘ গ্যুড। আর শোনো, পরীক্ষার হলে গিয়ে কারো দিকে তাকানোর দরকার নেই। আর বকবকানির স্বভাব, ওটা অন্তত তিন ঘণ্টা বন্ধ রেখো। কিছুদিন পর আমি আসলে সবকথা আমার সঙ্গেই বলো না হয়।কোশ্চেন পেপার হাতে পেলে আগে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করবে। মনে রেখো, তোমার ক্যাপ্টেন সবসময় তোমার পাশে আছে।
তৃষার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল;ও নরম গলায় শুধাল,
-‘ আপনি কবে ফিরবেন?
আর্যর ওপাশে ইঞ্জিনের মৃদু গর্জন কর্ণগোচর হচ্ছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-‘ এখনও অনেক পথ বাকি তৃষা। তবে তোমার পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই আমি ফেরার চেষ্টা করব। আপাতত নিজের ওপর ফোকাস করো। আর হ্যাঁ, পরীক্ষা দিয়ে এসে আমাকে ডিটেইলস ফিডব্যাক দেবে। আই’ল বি ওয়েটিং ফর ইয়োর টেক্সট।
তৃষা কিঞ্চিৎ দুষ্টুমি করে বলল,
-‘ ও আচ্ছা! তার মানে মিস্টার সিলিং কিং আবারও অ্যাক্টিভ হচ্ছেন? আমি তো ভেবেছিলাম পরকীয়া ছেড়ে আপনি এখন সাধু হয়ে গিয়েছেন!
আর্য এবার অস্ফুট স্বরে হাসল। ওর সেই হাসিটাই তৃষার হৃদস্পন্দন কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল যেন;আর্য মৃদুযোগে বলল,
-‘ নিজের বউয়ের সাথে পরকীয়া করার মজাটাই আলাদা। যাই হোক, খেয়ে বেরিও। আর সাবধানে যাতায়াত করবে। অল দ্য বেস্ট ফর টুডে।
তৃষা অস্ফুট স্বরে বলল,-‘ ধন্যবাদ।
আর্য কলটা কাটার আগে শেষবারের মতো বলল, ‘ ডোন্ট ওয়ারি মাই লেডি আই ট্রাস্ট ইউ। তুমি পারবেই।
ঘড়ির কাঁটা এখন একটা বেজে দশের ঘর স্পর্শ করেছে। উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে ঢাকা কলেজের বিশাল ফটক দিয়ে যখন পরীক্ষার্থীদের জনস্রোত বের হতে শুরু করল, ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝে দেখা মিলল তৃষা আর মেহেসানার। দীর্ঘ তিন ঘণ্টার স্নায়ুযুদ্ধের ক্লান্তি দুজনের মুখাবয়বে স্পষ্ট।
মেহেসানা তৃষার কাঁধে হাত দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-‘ উফ তৃষা! ওই চার নম্বর সৃজনশীলটা যা প্যাঁচানো ছিল না! আমি তো ভেবেছিলাম আর মেলাতেই পারব না। তোর কী অবস্থা বল তো? সব শেষ করতে পেরেছিস?
তৃষা ব্যাগের চেইনটা টেনে অ্যাডমিট কার্ডটা সযত্নে ভেতরে রাখতে রাখতে হাসিমুখে জবাব দিল,
-‘ আলহামদুলিল্লাহ্ মেহু, পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। আসলে ওই প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভাবতেই উত্তরটা মাথায় চলে আসছিল।
দুজনে গল্প করতে করতে মূল ফটকের কাছাকাছি আসতেই তৃষার নজর পড়ল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চেনা মুখগুলোর দিকে। আর্যর বাবা-মা আর ছোট্ট টুইংকেল লজেন্স হাতে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে তৃষারই অপেক্ষা করছিলো। ওপাশে আর্যর ড্রাইভারও গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত। তৃষাকে দেখামাত্রই আর্যর বাবা একগাল হেসে হাত নাড়লেন।
মেহেসানা ফিসফিস করে বলল,
-‘ তোর তো জবরদস্ত কারবার দোস্ত! পুরা ফ্যামিলি দেখি তোকে রিসিভ করতে চলে এসেছে। যা, এখন একটু আদর-যত্ন খেয়ে নে!
তৃষা এগিয়ে যেতেই জাহানারা বেগম পরম মমতায় ওর কপালে হাত দিয়ে শুধালেন,
-‘ কেমন হলো রে মা পরীক্ষা? শরীর ঠিক আছে তো? রোদে মুখটা একদম লাল হয়ে গিয়েছে।
তৃষা উনার হাত জড়িয়ে ধরে শান্ত স্বরে বলল,
-‘ খুব ভালো হয়েছে মা। তোমরা এত কষ্ট করে কেন এলে এই রোদে? আমি তো একাই যেতে পারতাম।
আর্যর বাবা চশমাটা ঠিক করে স্নেহমাখা স্বরে বললেন,
-‘ ক্যাপ্টেন সাহেব তো বারবার ফোন করে আমাদের অস্থির করে দিচ্ছিলো! ওদিকে সাগরের মাঝখানে বসেই ওর দুশ্চিন্তার শেষ নেই। আর আমরা আসব না, তা কি হয়?
আর্যর বাবার এই কথায় তৃষার হৃদয়ে এক শীতল পরশ অনুভূত হলো। এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটে উঠল ওষ্ঠাধরে। আর্যর এই দূরবর্তী ব্যাকুলতা যেন তপ্ত রোদেও ওকে শীতল ছায়া মেলে আগলে রাখল। হঠাৎ পাশ থেকে টুইংকেল ওর কামিজের কোণা টেনে ধরে আধো-আধো গলায় করল,
-‘ ও বানি! পাপা বলেছে তোমাকে নিয়ে আইসক্রিম খেতে। চলো না, আমার খুব গরম লাগছে। আমার গাল দুটো দেখো কত্তো লাল হয়ে গিয়েছে!
টুইংকেলের সেই আদুরে ভঙ্গিতে উপস্থিত সবাই হেসে উঠল। তৃষা ঝুঁকে পড়ে ওকে কোলে তুলে নিয়ে ওর লাল হয়ে যাওয়া গালে আলতো চুমু খেয়ে বলল,
-‘ আচ্ছা আমার লক্ষ্মী মাম্মাম, চলো! আমরা সবাই মিলে বড় এক কাপ আইসক্রিম খাব,ডিল?
টুইংকেল বিস্তর হেসে সম্মতিসূচক মাথা ঝাকালো।আর্যর বাবা এবার সবাইকে তাড়া দিয়ে বললেন,
-‘ চলো চলো, রোদে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না।
সবাই মিলে গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো। গাড়িতে উঠেই তৃষা একঝলক ফোনের নোটিফিকেশন চেক করল; সেখানে শুধুমাত্র আর্যর-ই একটি খুদে বার্তা জ্বলজ্বল করছে,
“মিসেস ক্যাপ্টেন, এক্সাম ডান? নাও টেক আ ডিপ ব্রেথ অ্যান্ড স্টে হ্যাপি।মাই….”❤️
অসমাপ্ত হলেও আর্যর এই ছোট্ট বার্তাখানিই যেন তপ্ত মরুর বুকে এক পশলা শ্রাবণধারা হয়ে নেমে এলো তৃষার হৃদয়ে। ফোনের কাঁচের পাতায় ভেসে ওঠা অক্ষরগুলো ওষ্ঠাধরে লেপে দিল এক চিলতে লাজুক হাসির প্রলেপ;আনন্দাশ্রুতে ভিজে উঠল নেত্রপল্লব।এক নিবিড় আবেশে ও নিজের অজান্তেই বিড়বিড়িয়ে বলল,,
-‘ মিস ইউ্য ব্যাডলি ক্যাপ্টেন।
তৃষারা চলে যাওয়ার পর মেহেসানা নিজের ওড়নাটা সামলে নিল। তপ্ত মধ্যাহ্নে চারপাশ খাঁ খাঁ করছে, মাথার ওপর সূর্যটা যেন আগুনের পিণ্ড হয়ে বসে আছে। ও যখন কলেজের গেট পেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে ধীরপায়ে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই কানফাঁটিয়ে প্রচন্ড শব্দে ব্রেক কষে একটি ধবধবে সাদা রঙের বিলাসবহুল গাড়ি ওর ঠিক সামনে এসে থামল।
আকস্মিক এই ঘটনায় মেহেসানা থতমত খেয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেল। ধুলোবালির ঝাপটায় ওর চোখদুটো কিঞ্চিৎ সংকুচিত হলো। ও অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে পাশ কাটিয়ে যেতে উদ্যত হতেই গাড়ির দরজা খুলে গেল।গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। পরনে নেভি ব্লু পোলো শার্ট আর খাকি রঙের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, চোখে কালো রোদচশমা, যার কাঁচের আড়ালে ওর চাউনিটা ঠিক বোঝা না গেলেও সেই চিরচেনা ত্যাড়া মেজাজের উপস্থিতি টের পেতে মেহেসানার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। আদ্রিয়ান নিজের চশমাটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে তেরছাভাবে মেহেসানার দিকে তাকাল।
সূর্যের আলো ওর চুলে পড়ে এক অদ্ভুত দ্যুতির সৃষ্টি করেছে। আদ্রিয়ান আলস্যভরে গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে চাবির রিংটা ঘোরাতে ঘোরাতে খুব গম্ভীর স্বরে বলল,
-‘ কী হলো মিস সাউন্ডবক্স? রোদে পুড়তে পুড়তে কি চোখের পাওয়ার একদম জিরো হয়ে গেল? সামনে জলজ্যান্ত একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, আর আপনি অন্ধের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন!
মেহেসানা ও দাঁত কিড়মিড় করে নিজের ওড়নার খুঁটটা শক্ত করে চেপে ধরল; তবে রণচন্ডী রূপটা ধারণ করল না আজ,গজগজ করতে করতে বলল,
-‘ আপনি এখানে? মাঝদুপুরে কি রাস্তাঘাটে মানুষের অ্যা’ক্সিডেন্ট করানোর কন্টাক্ট নিয়েছেন নাকি? আর আমার চোখের পাওয়ার নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট!
আদ্রিয়ান এবার বাঁকা হাসল। চশমাটা পুরোপুরি খুলে শার্টের কলারে ঝুলিয়ে রেখে ও এক কদম এগিয়ে এল মেহেসানার দিকে। ওর সেই তীক্ষ্ণ আর গভীর চাউনি দেখে মেহেসানা অবচেতনভাবেই এক পা পিছিয়ে গেল। আদ্রিয়ান নিচু স্বরে বলল,
-‘ সেটা তো ঠিক আপনার চোখের পাওয়ার নিয়ে ভাবার জন্য তো এখন আপনার ফিওন্সে আছেই। তা কোথায় সে? তাকে তো দেখছে না? সে কি আপনাকে নিতে আসেনি মিস?
মেহেসানা ভালোভাবেই বুঝলো আদ্রিয়ানের খোঁচাটা।ও মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-‘ তারা তো ফালতু টাইম নাই।
মেহেসানার তাচ্ছিল্যভরা কথা শুনে আদ্রিয়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল, তারপর এক পা এগিয়ে এসে ওর খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর দীর্ঘ ছায়াটা মেহেসানার ওপর আছড়ে পড়তেই মেহেসানা কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে চাইল। আদ্রিয়ান পকেটে হাত গুঁজে খুব শান্ত অথচ বিদ্রূপাত্মক গলায় বলল,
-‘ বাহ! প্রিয় মানুষের জন্য একটু সময় বের করাটা যার কাছে ফালতু টাইম! তা এইরকম একপিস বিজি পাবলিককে খুঁজে পেলেন কই? গুগল ম্যাপে মোস্ট কেয়ারলেস পারসন লিখে সার্চ দিয়েছিলেন না কি?
মেহেসানা দমে না গিয়ে ততোধিক ত্যাড়া স্বরে পাল্টা জবাব দিল,
-‘ সবাই তো আর আপনার মতো বেকার বসে থাকে না যে মাঝদুপুরে গাড়ি নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ডিউটি দেবে! উনি প্রফেশনাল, উনার কাজের ভ্যালু আছে।
আদ্রিয়ান এবার এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে মেহেসানার দিকে গভীর চোখে তাকাল। ওর কণ্ঠে এবার পরিহাসের বদলে এক অদ্ভুত শাসন কাজ করছে,
-‘ কাজের ভ্যালু তো আমারও আছে মিস সাউন্ডবক্স। কিন্তু আই গেস, এই কাঠফাটা রোদে আমার ফিউচার পেশেন্টকে স্ট্রোক করে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখার চেয়ে আমার ফালতু সময়টা গাড়ির এসিতে ইনভেস্ট করা অনেক বেশি লজিক্যাল। চুপচাপ ভেতরে এসে বসুন, নাকি ওই বিজি পারসনের ওয়েট করতে করতে রোস্টেড চিকেন হওয়ার ইচ্ছা আছে?
মেহেসানা ভ্রু কুঁচকে জেদ দেখাতে চাইলেও আদ্রিয়ানের চাউনির সম্মুখে কেন জানি আজ সব কথা গুলিয়ে গেল। ও গজগজ করতে করতে বলল,
-‘ আপনার গাড়িতে চড়া মানেই তো..! তা সিট বেল্ট কি শক্ত তো? নাকি আবার মাঝপথে ব্রেক ফেল হবে?
আদ্রিয়ান বাঁকা হেসে ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলল,
-‘ আমার ব্রেক ফেল হয় না ম্যাডাম, তবে আপনার এই বিরতিহীন ক্যাসেট প্লেয়ারের ব্রেক যে খুব দরকার সেটা আমি কনফার্ম। কুইক, চড়ুন!
মেহেসানা মুখ ভেঙচিয়ে গাড়িতে উঠে সজোরে দরজাটা লাগালো। এসি-র শীতল হাওয়া গায়ে লাগতেই ও মনে মনে স্বস্তি পেলেও মুখে সেটা প্রকাশ করল না। আদ্রিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গ্লাসে মেহেসানার প্রতিবিম্ব দেখে মনে মনে বলল,
-‘ একাই তো বেশ ছিলেন মিস সাউন্ডবক্স, অযথা ভুল মানুষের পাল্লায় পড়ার শখ জাগল কেন আপনার?
বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির বুকে এখন দ্বিপ্রহরের প্রখর ভাস্বরতা। অন্তহীন নীলিমার নিচে জাহাজের ইস্পাত-কঠিন শরীরটা ঢেউয়ের মস্তকে আঘাত হেনে ধীরলয়ে এগিয়ে চলেছে। চারিদিকের এই নিবিড় নিস্তব্ধতা আর সাগরের লোনা বাতাসের ঝাপটায় এক অদ্ভুত একাকিত্ব বিদ্যমান। আর্য এহসান এখন তার কর্মস্থলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান নেভিগেশন ব্রিজে দাঁড়িয়ে।
ক্যাপ্টেনের এই সংরক্ষিত এলাকাটি থেকে বাইরের দিগন্তরেখা পর্যন্ত স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়। আর্য ব্রিজের সামনের রেলিংয়ে দু-হাত রেখে সাগরের ফেনিল উর্মিমালার দিকে চেয়ে ছিল। পরনে ওর সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম, কাঁধের ওপর জ্বলজ্বল করছে ওর অর্জিত সম্মানের পদচিহ্ন। প্রখর সূর্যালোকে ওর উন্নত নাসিকা আর তীক্ষ্ণ চিবুক নিপুণ ভাস্করের তৈরি আস্ত এক শ্বেতপাথরের ভাস্কর্যের ন্যায় দীপ্তিমান।
হঠাৎ আর্য ওর পকেট থেকে চামড়ার কালো ওয়ালেটটা বের করল। সযত্নে ভাঁজ খোলা মাত্রই উন্মোচিত হলো এক চিলতে মায়ার জগৎ। ওয়ালেটের এক কোণে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আড়ালে একটি স্থিরচিত্র; সেখানে তৃষা অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে অন্যদিকে তাকিয়ে হাসছে। হাসির তোড়ে ওর গালে সেই কাঙ্ক্ষিত টোলটি বড্ড স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
আর্যর দৃষ্টি ওই একটি বিন্দুতে স্থির। ওর সেই কঠিন, ভাবলেশহীন চোখে এখন এক সমুদ্র সমান মুগ্ধতা আর অব্যক্ত অনুরাগ। ও আঙুলের ডগা দিয়ে ছবির ওপর তৃষার সেই টোল পড়া গালটি আলতো করে স্পর্শ করল।
আকস্মিক কাঁধে এক বলিষ্ঠ স্পর্শ অনুভূত হতেই আর্যর নিমগ্নতা ভঙ্গ হলো।ওর দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফারহান পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। আর্য দ্রুত ওয়ালেটটা বন্ধ করার চেষ্টা করলেও ফারহানের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে যেতে পারেনি। ফারহান এক চিলতে কৌতুকমাখা হাসি নিয়ে আর্যর দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে শুধাল,
-‘ হ্যু ইজ্য দিস লাকি গার্ল আর্য?
আর্য নিজের ওয়ালেটে বিদ্যমান সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীর পানে শেষবারের মতো তাকিয়ে আনমনে বলল,,
-‘ মাই লাইফলাইন, মাই হার্টবিট; দ্য রিজন অফ মাই এক্সিস্টেন্স।
ফারহান কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়ে ভ্রু উঁচাল। ও আর্যর মুখে এমন নিরেট এবং অকপট স্বীকারোক্তি আগে কখনও শোনেনি। ও মুগ্ধ হয়ে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৬
-‘ বাব্বা এত ভালবাসা! রাখুম কই?
ফারহানের বিস্ময়মাখা প্রশ্নের উত্তরে আর্য সাগরের দিগন্তবিস্তৃত নীলিমার দিকে তাকিয়ে ওয়ালেটটা পকেটে রাখতে রাখতে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,,
-‘ ভালোবাসা শব্দটা তো আজকাল বড্ড এক্সপায়ারড শোনায় ফারহান। তৃষা ইজ্য’ন্ট জাস্ট অ্যান ইমোশন টু ম্যি শ্যি ইজ লাইক মাই সোল রিদম। ভালোবাসা হয়তো সিচুয়েশন অনুযায়ী চেঞ্জ হয়, বাট ও আমার এমন এক অ্যাডিকশন, যা আমার অস্তিত্বের সাথে মার্জ হয়ে গেছে। ট্রাস্ট মি, ভালোবাসা হারানো পসিবল, কিন্তু এই প্যাশনটা কখনো নিঃশেষ হওয়ার নয়।
