ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৬
নওরিন কবির তিশা
সময়েরর বিরামহীন আবর্তনে পিষ্ট হয়ে তিনটি সপ্তাহ কালের গর্ভে চিরতরে লীন হয়েছে; অন্তহীন এই নিস্তরঙ্গ দিবসগুলো একে একে স্মৃতিবদ্ধ হচ্ছে অথচ তৃষার বিশ্রামের অবকাশ নেই;আর মাত্র দুই দিন পরেই উচ্চ মাধ্যমিকের রণসজ্জা। বইয়ের পাতায় নিমগ্ন তৃষার প্রতিটি প্রহর এখন কাটে নিবিড় ব্যস্ততায়।
এরই মাঝে ছোট্ট টুইংকেলকে রাজধানীর নামকরা এক কিন্ডারগার্ডেনের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়েছে।তার সেই বিদ্যাভ্যাসের প্রারম্ভিক ব্যস্ততা আর স্কুলের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব এখন তৃষার প্রাত্যহিক কর্মযজ্ঞের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই কর্মমুখর দিনলিপিতে তৃষার সঙ্গী হয়েছেন আর্যের বাবা-মা। তাঁদের স্নেহচ্ছায়ায় আর্যের অনুপস্থিতি যেন কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে আসে। তৃষার এই নিরন্তর পথচলায় তাঁরাই এখন পরম ভরসা আর ব্যস্ততার ভাগীদার।
আজ সকালটা শুরু হয়েছে তুমুল ব্যস্ততায়।আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত নোট সংগ্রহের তাগিদে তৃষাকে আজ পা বাড়াতে হবে লাইব্রেরির অভিমুখে। স্বাভাবিক দিনগুলোতে আর্যর বাবা টুইংকেলকে পৌঁছে দিয়ে এলেও, আজ তৃষা নিজেই সেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। প্রাতরাশ সেরেই ও এক হাতে নিজের প্রয়োজনীয় নথিপত্র আর অন্য হাতে ছোট্ট টুইংকেলের নরম আঙুল মুঠোয় পুরে সবে প্রস্থান প্রস্তুতি নিচ্ছে হঠাৎ ভেসে আসলো আফজাল সাহেবের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর,
-‘ যেতে পারবে তো মা? বললাম আমিই যাই তোমাদের সাথে।
তৃষা ঘুরে দাঁড়ালো,-‘ কাল রাতে প্রেসার ফল করেছিল আপনার বাবা। রেস্ট নিন এখন।
আফজাল সাহেব দোনামোনা করে বললেন,-‘ তবুও। এমনিতে ট্রাফিকের যা অবস্থা।
তৃষা স্ফিত হেসে বলল,-‘ আমি এই শহরে বহুদিন ধরে আছি বাবা। অভ্যাস আছে আমার।
আফজাল সাহেব তবুও যেন আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তিনি চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে সস্নেহে তৃষার দিকে চাইলেন। তাঁর দৃষ্টিতে একরাশ পিতৃসুলভ দুশ্চিন্তা,
-‘ কিন্তু..।
তৃষা আর ওনাকে কথা বাড়াতে দিল না, টুইংকেলকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল ,
-‘ কিন্তু কিছু না। আল্লাহ হাফেজ বাবা আসি।
টুইংকেলও দাদার উদ্দেশ্যে বলল,-‘ আল্লাহ হাফেজ দাদুন গ্যুড বাই।
-‘ গ্যুড বাই দাদু।সাবধানে যেও মা!
তপ্ত রোদ্দুরে হাঁসফাঁস করছে মহানগরী। আকাশে মেঘের ঘনঘটা হলেও বৃষ্টির দেখা নেই। ভ্যাপসা গরম বিরাজমান; গাড়ির পেছনের সিটে বসে আছে তৃষা, মনোযোগ নিবদ্ধ বইয়ের পাতায়। পাশেই নিজের ওয়াটারপট নিয়ে খেলা করছে টুইংকেল। হঠাৎ ও তৃষার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,
-‘ বানি?
তৃষার মনোযোগ সরলো; ও মৃদুৎস্বরে বলল,-‘ হুম, প্রিন্সেস?
-‘ একটা কথা বলব?
তৃষা একপলক ওর দিকে চেয়ে ওর কপালে লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে সস্নেহে বলল,
-‘ হুম বলো মাম্মাম, কী বলবে?
টুইংকেলের ডাগর চক্ষুদ্বয় এক মুহূর্তের জন্য গভীর কোনো ভাবনায় স্থির হয়ে হলো অতঃপর ও তৃষার কামিজের হাতাটা টেনে ধরে খুব নরম গলায় শুধাল,
-‘ তুমি পাপাকে মিস করো না বানি?
আর্যর কথা মনে পড়তেই মনের গহীনে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হলো তৃষার, কিন্তু টুইংকেলের সামনে সেটা অতি সন্তর্পণে আড়াল করে দিয়ে কোমল স্বরে বলল,
-‘ হু..!
-‘ পাপা কবে আসবে বানি?
-‘ পাপা তো অনেক বড় কাজ করে সুইটহার্ট। কাজ শেষ হলেই দ্রুত ফিরবে।
-‘ কাজ কবে শেষ হবে বানি?
টুইংকেলের বাচ্চাসুলভ প্রশ্নে মৃদু হাসলো তৃষা,-‘শীঘ্রই।
টুইংকেলের সেই চিরাচরিত প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই গাড়ি এসে থামল বিদ্যালয়ের সুদৃশ্য তোরণের সম্মুখে। তৃষা আর বিন্দুমাত্র সময় ব্যয় না করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। এক হাতে টুইংকেলের ছোট্ট স্কুলব্যাগ আর অন্য হাতে ওর নরম আঙুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ও ভেতরে প্রবেশ করল।
স্কুলের করিডোর এখন কচিকাঁচাদের পদচারণায় মুখর। তৃষা টুইংকেলকে ওর নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষে নিয়ে এসে কাঙ্ক্ষিত বেঞ্চটিতে বসিয়ে ওর কপালে একটি স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে মাতৃসুলভ কন্ঠে বলল,
-‘ একদম দুষ্টুমি করবে না কিন্তু মাম্মাম! ছুটি হলেই বানি চলে আসবে তোমাকে নিতে। লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো।
টুইংকেল হাসিমুখে মাথা নাড়ল। ওর সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে তৃষার বুকের ওপর জেঁকে বসা আর্যের অভাববোধটুকু এক মুহূর্তের জন্য যেন স্থবির হয়ে গেল। ও ধীর পায়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় গাড়িতে গিয়ে বসল।
গাড়ি যখন লাইব্রেরির অভিমুখে পুনরায় যাত্রা শুরু করল, তৃষা জানালার বাইরে নির্নিমেষ চেয়ে রইল। মহানগরীর এই ব্যস্ততম রাজপথ, ট্রাফিক জ্যাম আর মানুষের হাহাকার সবই যেন আজ ওর কাছে বড্ড অর্থহীন ঠেকছে। মনের গহীনে কেবল একটি মুখই বারবার ভেসে উঠছে। ও অবচেতন মনেই নিজের ফোনটা হাতে নিলো, গ্যালারিতে প্রবেশ করেই প্রথম ছবিটা মেলল ও। ভেসে উঠল আর্যর পেশাদারিত্ব গাম্ভীর্যে আবৃত তীক্ষ্ণ চৌকষ মুখাবয়ব। তৃষা ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে চোখ বুঁজে মনে মনে গান ধরল,
🎶 একদিন তোমায় ঘিরে…
হবে উতলা এত…
ভাবিনি জীবনে…
ভাবনা যতো….🎶
নীল জলরাশির অতলান্ত বিস্তার আর লোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে মুখরিত চারপাশ। সকাল দশটা বেজে পাঁচ মিনিট।।বানৌজা বঙ্গবন্ধু এখন মাঝ সমুদ্রে তার নিয়মিত টহলে ব্যস্ত। জাহাজের দোতলায় ব্রিজের বাইরের খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে আর্য;চোখে কালো রোদচশমা, সমুদ্রের নোনা সমীরণ ওর চুলগুলোকে অবাধ্য করে দিচ্ছে বারবার।
চারপাশ এখন নিথর, প্রশান্ত। দিগন্তবিস্তৃত সেই নীল জলরাশির অতলান্ত নির্জনতা চিরে দিয়ে সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউগুলো জাহাজের ইস্পাত-কঠিন গায়ে অবলীলায় আছড়ে পড়ছে; সৃষ্টি করছে ফেনীল শুভ্রতা।আর্যর হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি। সমুদ্রের এই বিশালতার মাঝেও ক্যাপ্টেনের দায়িত্বের কোনো বিরতি নেই।পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নেভিগেশন অফিসারকে আর্য নিচু স্বরে প্রশ্ন করল,
-‘ আমাদের বর্তমান পজিশন কত?
অফিসার চার্ট দেখে উত্তর দিলেন,
-‘ স্যার, আমরা এখন স্যান্ডউইপ থেকে দশ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। সবকিছু স্বাভাবিক।
আর্য একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে এক পলক ব্রিজের ভেতরে তাকিয়ে দেখল সবাই নিজ নিজ কাজে নিমগ্ন। কেউ রাডারের ডটগুলো পর্যবেক্ষণ করছে, কেউবা কম্পাস চেক করছে। ও এবার ইন্টারকম হাতে নিয়ে মৃদু-গম্ভীর কন্ঠে ঘোষণা করল,
-‘ অ্যাটেনশন অল হ্যান্ডস। সমুদ্র এখন শান্ত। পরবর্তী এক ঘণ্টা সবাই ফ্রি-ওয়াচ এনজয় করতে পারো, তবে সজাগ থেকো। ক্যারি অন।
-‘ ক্যাপ্টেন কে মিস করছিস তৃষা?
মেহেসানার কণ্ঠস্বরের আকস্মিকতায় তৃষার হাতের কলমটা কাগজের বুকে এক দীর্ঘ রেখা টেনে থেমে গেল। ও তড়িঘড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বইয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ার বৃথা চেষ্টা করল, কিন্তু ওর আরক্তিম কপোলদ্বয় আর চোখের কোণের অস্থিরতা মেহসানার অভিজ্ঞ দৃষ্টি এড়াতে পারল না।
তৃষা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বিরক্তিমাখা স্বরে বলল,
-‘ তোর কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই মেহু? লাইব্রেরিতে মানুষ পড়াশোনা করতে আসে, কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পিএনপিসি করতে না।
মেহেসানা সামনের চেয়ারটা টেনে আয়েশ করে বসল। কোল্ড কফির ক্যানে একটা চুমুক দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-‘ উফ্! কী লেভেলের অ্যাটিটিউড! পড়াশোনার দোহাই দিয়ে লাভ নেই ডার্লিং। আমি গত দশ মিনিট ধরে নোটিস করছি তুই বইয়ের একই পাতা উল্টেপাল্টে যাচ্ছিস। সত্যি করে বল তো, ক্যাপ্টেনের জন্য কি হার্টটা একটু বেশিই পাম্প করছে?
তৃষা এবার বইটা সশব্দে বন্ধ করে মেহেসানার চোখের দিকে চেয়ে ত্যাড়াভাবে বলল,
-‘ পাম্প তো করবেই, বেঁচে থাকতে হলে তো হার্টবিট দরকার। আর শোন, উনি গিয়েছেন নিজের ডিউটি সামলাতে, কোনো ভীনগ্রহে হারিয়ে যাননি যে সারাক্ষণ হাহুতাশ করতে হবে। আই অ্যাম আ ম্যাচিওরড গার্ল, ওকে?
মেহেসানা এবার সশব্দে হেসে উঠল। তৃষার হাতটা খানিক টেনে নিয়ে রসালো ভঙ্গিতে বলল,
-‘ ম্যাচিওরড? মাই ফুট! যে মেয়ে বাঘের মতো গর্জন করে বরকে ধরতে গিয়ে নিজেই প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে ফিরে আসে, তার মুখে ম্যাচিওরিটি মানায় না।
মেহেসানার অহেতুক ঠাট্টায় তৃষা মোক্ষম কোনো জবাব দেওয়ার জন্য ওষ্ঠাধর উন্মুক্ত করতে যাবে ঠিক তক্ষুনি নীরব লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা চিরে ওর ব্যাগাভ্যন্তরে থাকা যান্ত্রিক যন্ত্রটি মৃদু কম্পনে সশব্দ হয়ে উঠল। তৃষা ভ্রু কুঁচকে ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করতেই ওর হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকালো; স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বহুল কাঙ্ক্ষিত নাম ‘My Captain’❤️
তৃষার বাদামি অক্ষীমণি মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ঠোঁটের কোণে ফুটে বেরুলো এক অনাবিল প্রশান্তির রেখা। মেহেসানা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনে উঁকি দিয়ে আর্যর নামটা দেখামাত্রই এক চিলতে বাঁকা হেসে কোল্ড কফির ক্যানটা টেবিলে রেখে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে তৃষার দিকে ঝুঁকে এসে অতি নিচু স্বরে টিপ্পনী কাটল,
-‘ পার্ফেক্ট টাইমিং,হাউ এভার ক্যারি অন বেবজ! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে তোমার ম্যাচিওরিটি আসলে এই একটা ভাইব্রেশনেই সীমাবদ্ধ। লাইব্রেরিতে সাইলেন্স মেইনটেইন করতে হয়, এটা জানো তো? নাকি বরের কণ্ঠ শোনার উত্তেজনায় সেটাও ভুলে গেছো?
মেহেসানার এই সূক্ষ্ম খোঁচায় তৃষা লজ্জিত হলেও পরক্ষণেই একরাশ কটমটে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ওর দিকে। ও ঝটপট বইখাতাগুলো ব্যাগে পুরে নিয়ে কোনো কথা না বলে আসন ত্যাগ করল। মেহেসানার সেই হাসিমাখা বাই বাই অগ্রাহ্য করে ও হন্তদন্ত হয়ে লাইব্রেরির করিডোর দিয়ে দ্রুত প্রস্থান করল।
বাইরের খোলা বারান্দায় এসে তপ্ত বাতাসের ঝাপটায় তৃষা যেন একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই অতি পরিচিত, ভরাট কণ্ঠস্বর,
-‘ হ্যালো তৃষা? শুনতে পাচ্ছো?
সমুদ্রের লোনা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ফোনের ওপাশ থেকে স্পষ্ট শ্রুত হচ্ছে। তৃষা রেলিংয়ে হাত রেখে চোখ বুঁজে এক দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করল। ওর সমস্ত অভিমান আর বিরহ যেন ওই একটি ডাকেই বাষ্পীভূত হয়ে গেল। ও ম্রিয়মাণ স্বরে উত্তর দিল,
-‘ হুম, শুনতে পাচ্ছি।
-‘ ডিস্টার্ব করলাম?
-‘ এই না না।
তড়িৎ বেগে কথাটা বলেই জিভ কাটলো তৃষা। ইস নির্লজ্জতা করে ফেলল তো। এদিকে ওরা এমন কান্ডে খানিক মুচকি হাসলো আর্য, ও জাহাজের রেলিংয়ে একটু ভর দিয়ে দাঁড়াল। সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে ও অতি মৃদু স্বরে বলল,
-‘ বাহ্! ম্যাম তো বেশ রেডিই ছিলেন দেখছি। তা পড়ালেখার কী খবর? আর মাত্র দু-দিন বাকি, সিলেবাসের না কি আপনার নার্ভের কার অবস্থা বেশি শোচনীয়?
তৃষা চুলে আঙুল জড়িয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
-‘ সিলেবাস তো শেষ, কিন্তু আমার নার্ভের অবস্থা এখন আর্য এহসানের রাডারের মতো… সিগন্যাল ধরতে গিয়ে বারবার ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যাচ্ছে। ভীষণ টেনশন হচ্ছে ক্যাপ্টেন!
আর্যর কণ্ঠস্বর এবার বড্ড গভীর হলো;ও দায়িত্বশীল স্বামীর মতো বুঝিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-‘ রিল্যাক্স তৃষা। শোনো, পরীক্ষার হলটা মাঝসমুদ্রের ঝড়ের মতো। তুমি যদি ভয় পাও, তবে ঢেউ তোমাকে ডুবিয়ে দেবে। আর যদি শান্ত থাকো, তবে তুমিই হবে বিজয়ী। তুমি যথেষ্ট পরিশ্রম করেছ, এখন শুধু নিজেকে বিশ্বাস করো। আন্ডারস্ট্যান্ড?
তৃষা এক মুহূর্ত নীরব থেকে ভীষণ আদুরে গলায় বলল,
-‘ হুম। কিন্তু আপনি পাশে থাকলে হয়তো কনফিডেন্সটা একটু বেশি থাকত।
আর্যর চোখে এক পলক বিষণ্ণতা খেলে গেলেও ও সেটা কণ্ঠে প্রকাশ পেতে দিল না। ও বেশ যত্নবান ভঙ্গিতে বলল,
-‘ আমি ফিরব তৃষা, খুব শীঘ্রই। আর শোনো, পরীক্ষার এই কদিন রাত জাগা একদম বারণ। ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া করছ তো? আর কাল রাতে খাওনি কেন? এসব অনিয়ম কিন্তু আর চলবে না।
তৃষা ফিক করে হেসে ফেলল। লোকটা দূরে থেকেও কীভাবে সব খবর রাখে কে জানে! ও রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
-‘ সব খবরই তো রাখেন! এমন ভাবে বলছেন মনে হচ্ছে অনিয়ম ভঙ্গ করতে আপনি জাহাজ থেকে এক্ষুনি ছুটে আসবেন!
আর্য নিচু স্বরে হাসলো,,
-‘ আসতে পারলে মন্দ হতো না।
-‘ থাক থাক আর ঢং করতে হবে না। আসতে তো পারবেন না।
-‘ কি বলতে চাইছো? চলে আসব?
তৃষা প্রতুত্তরে এবার কিছুই বলল না। আর্য আনমনে এক ঝলক হেসে পরক্ষণে বলল,,
-‘ শুনেন ম্যাডাম, কালকের দিনটা শুধু রিভিশন দিবেন। আর পরশু সকালে নামাজের পর আরেকবার চোখ বুলালেই যথেষ্ট। চিন্তার কোনো কারণ নেই, আর দুশ্চিন্তায় চোখের নিচে কালি বসানোর তো মানেই হয় না। আমি ইনশাআল্লাহ্ পরীক্ষার শেষে কল দেব। তুমি শুধু নিজের সেরাটা দিও, বাকিটা আমি দেখে নেব।
তৃষা রেলিংয়ে আঙুল ঘষতে ঘষতে বেশ নরম গলায় বলল,
-‘ হুম বুঝলাম।
-‘ শুধু বুঝলেই হবে না, মেনে চলতে হবে।
-‘ উম? আচ্ছা।
আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। ও কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক অফিসারের উচ্চকণ্ঠ ভেসে এল,
-‘ স্যার! সরি টু ইন্টারাপ্ট। অ্যাডমিরাল ইজ অন দ্য লাইন, আপনাকে এখনই ব্রিজে ডাকছেন। ইটস আর্জেন্ট স্যার।
আর্যর চেহারায় মুহূর্তেই পেশাদারিত্বের সেই কঠিন গাম্ভীর্য ফিরে এল। ও ফোনের রিসিভারটা একটু শক্ত করে ধরে শান্ত স্বরে অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘ কপি দ্যাট। টেল হিম আই’ল বি দেয়ার ইন টু মিনিটস।
অফিসার স্যালুট দিয়ে প্রস্থান করতেই আর্য পুনরায় তৃষার দিকে মনোযোগ দিল। দ্রুতলয়ে বলল,
-‘ স্যরি তৃষা, ডিউটি কলস। আমাকে এখনই যেতে হচ্ছে। আই হ্যাভ টু অ্যাটেন্ড দ্য অ্যাডমিরাল। তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করো। নিজের ওপর ভরসা রেখো, ইউ উইল শাইন। আর শোনো… ডোন্ট লেট এনিথিং ডিস্ট্রাক্ট ইউ ফ্রম ইওর গোল। টেক কেয়ার অফ ইওরসেলফ মাই ডিয়ার। গ্যুড লাক ফর দ্য এক্সাম।
তৃষা কিছু বলার আগেই আর্যর ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কিছু শব্দ ভেসে এল। আর্য শেষবার অতি সংক্ষেপে কিন্তু গভীর মমতায় বলল,
-‘ যেতে হচ্ছে… আল্লাহ হাফেজ।
কলটা কেটে যেতেই তৃষা স্তব্ধ হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার জীবনটা ঠিক কতটা ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা, তা ও আজ আবারও নতুন করে উপলব্ধি করল। একদিকে দেশ আর কর্তব্যের আহ্বান, অন্যদিকে এক চিলতে ব্যক্তিগত আবেগ। তৃষা ফোনটা ব্যাগে রাখতে রাখতে একটা লম্বা শ্বাস নিল।
পুনর্বার হাত ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে দেখলো বারোটা বেজে ত্রিশ। টুইংকেলের ছুটির সময় হয়েছে। ও আর কালক্ষেপন না করে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নিচের দিকে নেমে গেল।
লাইব্রেরির গাম্ভীর্যপূর্ণ স্তব্ধতা কাটিয়ে মেহেসানা বাইরে বেরোল, বিকেলের রোদেলা আকাশটা কিঞ্চিৎ ম্লান হতে শুরু করেছে। গেটের কাছেই ওর দেখা হয়ে গেল ডক্টর ফারহানের সাথে ওর পুরোনো পরিচিত হওয়ার বেশ কিছুক্ষণ হাসিমুখে কুশল বিনিময় আর পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন শেষে ফারহান বিদায় নিল। মেহেসানা ওর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল, কিন্তু পরক্ষণেই ওর নজর কাড়লো গেটের ঠিক পাশে পার্ক করা একটা গাড়ির দিকে।
গাড়িটার গায়ে বেশ আয়েশ করে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিয়ান। চোখে সানগ্লাস, দুই হাত পকেটে গুঁজে ও এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন কোনো এক গভীর রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যস্ত। মেহেসানা অবাক হয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ বিস্ময় নিয়ে শুধাল,
-: আরে! আপনি এখানে কী করছেন?
আদ্রিয়ান সানগ্লাসটা নামিয়ে কপালের ওপর তুলল। ফারহান যে রাস্তা দিয়ে চলে গিয়েছে, সেদিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
-‘ রাস্তার ধারটা কি আপনার পৈত্রিক সম্পত্তি মিস সাউন্ডবক্স? আমি দাঁড়িয়ে আছি কারণ আমার ইচ্ছে হয়েছে। তবে কথা সেটা নয়, কথা হলো ওই যে একটু আগে আপনার সাথে দাঁত কেলিয়ে কথা বলছিল, ওই ছেলেটা কে?
আদ্রিয়ানের গলায় ঈর্ষার কিঞ্চিৎ আভাস পেয়ে মেহেসানার মনে দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। ও নিজের ওড়নাটা কাঁধের ওপর টেনে নিয়ে একটু ভাব ধরে বলল,
-‘ কেন বলুন তো? চিনে রাখবেন নাকি? ও হচ্ছে ডক্টর ফারহান। আর খুব শিগগিরই ও আমার ফিওন্সে হতে যাচ্ছে। কেন, পছন্দ হয়েছে আপনার?
মেহেসানার মুখে ফিওন্সে শব্দটা শুনে আদ্রিয়ানের চোয়াল এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মেহেসানার খুব কাছে এসে থমকাল। ওর কণ্ঠস্বর এবার বড্ড গম্ভীর, শোনালো,,
-‘ ফিওন্সে? সিরিয়াসলি? আপনার মতো সাউন্ড বক্সেরও ফিওন্সে!
মেহেসানা মুখ বাঁকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই;আদ্রিয়ান এবার এক পা পিছিয়ে গিয়ে গাড়ির ডোর খুলে বসার উপক্রম করে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৫
-‘ ফিওন্সে বানানোর আগে একটু খোঁজখবর নেবেন, লোকটার দাঁতগুলো সব আসল কি না। যা হাসছিল, আমার তো ডাউট হচ্ছে!
বলেই আদ্রিয়ান গাড়িতে স্টার্ট দিল। মেহেসানা ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসল।
