Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৫

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৫
নওরিন কবির তিশা

নৈশরাত্রির নিবিড় তিমির ক্রমশ গাঢ় হয়ে ধরণীর বক্ষ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। গোধূলির সেই ম্লান রক্তিম আভা বিদায় নিয়ে মহানগরীর আকাশে এখন রুপোলি চন্দ্রের ‌রাজত্ব। আর্যর গাড়িটা সুখনীড়ের প্রবেশদ্বারের সামনে এসে থামল। ধীরলয়ে নামলো ওরা।
তৃষা গভীর একটা শ্বাস নিয়ে পরক্ষণেই তড়িৎ বেগে হাঁটতে শুরু করবে রাতের স্নিগ্ধ বাতাস ওর হিজাব ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর্য লক করার শব্দ শুনে ওর দিকে তাকিয়ে শুধালো,,

-‘ আরে আরে এত দ্রুত হাঁটছেন কেন?
তৃষা একঝলক পিছে চাইলো, বেশ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,,-‘ টুইংকেল।
আর্য পা চালিয়ে তৃষার সমান্তরালে এসে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
-‘ ডোন্ট ওয়ারি। ও ঘুমিয়েছিল একটু আগে উঠলো।
তৃষা বিস্মিত বলল,-‘ আপনি কিভাবে জানলেন?
আর্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় বলল,-‘ কল করেছিলাম।
-‘ কখন?
আর্যর এমন নির্লিপ্ত অথচ দায়িত্বশীল আচরণের সামনে তৃষা এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। মানুষটা কী অদ্ভুত কৌশলে নিজের চোখের আড়ালে থাকা মানুষগুলোরও প্রতি মুহূর্তের খবর রাখে! তৃষা একদৃষ্টে আর্যর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে রইল। হৃদয়ের নিভৃত কোনে দোলা দিল কিছু কথা,
-‘ একটা মানুষ ঠিক কতটা কেয়ারিং হতে পারে, মিস্টার নাথিং সাহেবকে না দেখলে হয়তো বোঝা যাবে না। পারফেক্ট বাবা;উহু শুধু বাবা নয় পারফেক্ট হাজবেন্ডও বটে।
পরোক্ষনেই ওর মস্তিষ্ক ওর হৃদয়ের সাথে এক তুমুল বিরোধিতা ঘোষণা করল। আদেও পারফেক্ট হাসবেন্ড আর্য এহসান? মস্তিষ্ক বলছে না অথচ হৃদয় চিৎকার করে বলছে হ্যাঁ স্বামী হতে হলে ক্যাপ্টেন আর্য এহসানের মতই হওয়া উচিত।

অন্দরমহলের পরিবেশ আজ বড্ড উত্তপ্ত। ড্রয়িংরুমের সোফায় ছোট ছোট দু-পা ঝুলিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে টুইংকেল।তৃষা দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসল।
-‘ কী হয়েছে আমার মাম্মামটার? ওভাবে মুখ ভার করে বসে আছো কেন সোনা?
টুইংকেল তৃষার দিকে না তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। অভিমানী স্বরে বলল,
-‘ তোমরা পচা! আমাকে একা ফেলে অনেক ঘুরেছো,তাই না?
তৃষা হাসল। পাশে রাখা ছোট শপিং ব্যাগটা দেখিয়ে বলল,
-‘ আরে না সুইটহার্ট! দেখো বানি তোমার জন্য কী এনেছে। তোমার প্রিয় কিটক্যাট আর তোমার মতোই সুইট একটা ডল। এখন রাগ কমবে?
টুইংকেলের বাচ্চাসুলভ হৃদয় এবার খানিকটা নরম হলো, কিন্তু আর্যর দিকে তাকাতেই ফের কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনল। আর্য ওর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর ছোট্ট নাকটা টিপে দিয়ে বলল,

-‘ সরি মাম্মাম। বানিকে একটু সময় দিতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। নেক্সট টাইম তোমাকে নিয়েই যাব, প্রমিস। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো পাপার কোলে এসো দেখি।
টুইংকেলের মিষ্টি ক্রোধ দীর্ঘস্থায়ী হলো না মোটেও। আর্য ওকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলো। তৃষার দিকে একপলক তাকিয়ে বলল,
-‘ আপনিও ফ্রেশ হয়ে নিন তৃষা। আমি টুইংকেলকে রুমে নিয়ে যাচ্ছি।
আর্য টুইংকেলকে নিয়ে ওর শোবার ঘরের দিকে অগ্রসর হলো। তৃষা এক পলক ওদের প্রস্থান পথের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো অতঃপর ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে।

কিছুক্ষণ বাদে শুভ্র বসনে সিক্ততা কাটিয়ে তৃষা নৈশভোজের থালা হাতে আর্যর কক্ষের সন্নিকটে পৌঁছাল, হঠাৎ ওর কর্ণগোচর হলো টুইংকেল আর আর্যর কথোপকথনের গুঞ্জন। দরজার ঈষৎ ফাঁক দিয়ে আসা আলোকছটায় দৃশ্যমান হলো, আর্য বিছানায় হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে আর ওর বুকের ওপর পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে টুইংকেল ওর পাঞ্জাবির বোতাম নিয়ে খেলা করছে।
আর্যর সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর এখন বড্ড কোমল, ও টুইংকেলের কপালে আলতো চুমু খেয়ে কি যেনো বলছিল,আর টুইংকেলও হেসে হেসে সায় মিলাচ্ছিল ওর সঙ্গে।তৃষা স্নিগ্ধ হেঁসে দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বলল,,
-‘ কি হচ্ছে এখানে? আমাকে রেখে কি এত সলাপরামর্শ হচ্ছে শুনি?
তৃষার উপস্থিতি টের পাবামাত্র তরিৎবেগে আর্যর কোল হতে নামলো ছোট্ট টুইংকেল,মিষ্টি স্বরে বলল,
-‘ কিছু না বানি। আসলে পাপা কাল শিপে চলে যাবে তো তাই,বলছিলাম আমি পাপা কে ভীষণ মিস করব।তুমি করবানা বানি?

টুইংকেল প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তৃষার পানে চাইলো।তৃষা একপলক আর্যর নির্লিপ্ত মুখোশ্রীতে চেয়েই ততক্ষণাৎ দৃষ্টি ঘোরালো,বুকের মাঝে কেনো জানি চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে ওর। আর আর্যর দিকে তাকালেই সেটা বড্ড প্রকট রূপে হানা দিচ্ছে। তৃষা মনোযোগ সরাতে টুইংকেলের দিকে চেয়ে জোরপূর্বক হেঁসে বলল,,
-‘ ওসব কথা পরে হবে। তুমি আগে ডিনারটা কমপ্লিট করো তো মাম্মাম। দেখো কত রাত হয়েছে।
টুইংকেল ফের কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার পূর্বমুহূর্তে তৃষার কথায় ও থমকায়;মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলে,,
-‘ ওকে বানি।
তৃষা আর কথা না বাড়িয়ে একে একে টুইংকেলকে খাওয়াতে তৎপর হয়।মাঝে মাঝে ওর আড়দৃষ্টি আর্যর দিকে ধাবিত হচ্ছে;তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিচ্ছে তৃষা।নিজের অপ্রকাশিত মনোভাব দমানোর এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে টুইংকেল কে নিয়ে ব্যস্ততা দেখানোর মিথ্যা নাটকীয়তায় মগ্ন সে।

টুইংকেলকে খাওয়ানো শেষ করে তৃষা সামান্য সময়ের জন্য কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল; মুঠোফোনে মেহেসানার জরুরি আহ্বানে সাড়া দিতেই ওর এই ক্ষণিক অনুপস্থিতি। কথা শেষ করে ও যখন পুনরায় আর্যর শয়নকক্ষে পদার্পণ করল, সঙ্গে সঙ্গে ওর দৃষ্টিগোচর হলো বিছানার মাঝখানে ছোট্ট টুইংকেল গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
অবিন্যস্ত হয়ে সে শুয়ে আছে ও। আর্য কাল ফিরে যাবে তাই আজ টুইংকেল ওর সঙ্গেই থাকবে এটা পূর্বজ্ঞাত হওয়ায় তৃষা অত্যন্ত সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে অতি যত্নে টুইংকেলের এলোমেলো দেহখানি বিছানায় সোজা করে শুইয়ে দিল। ওর গায়ের ওপর চাদরটা টেনে দিতে দিতে তৃষার চোখ জোড়া একবার আর্যকে খুঁজে ফিরল। কিন্তু ঘরটা খাঁ খাঁ করছে; দীর্ঘদেহী সেই মানুষটার কোনো চিহ্ন সেখানে নেই।
তৃষা ঘরের এদিক-ওদিক একবার দৃষ্টি সঞ্চালন করল। হঠাৎ পূর্ব পার্শ্বে কারো উপস্থিতি অনুভূত হতেই তৃষা ধীর পায়ে ঘরের সংলগ্ন প্রশস্ত করিডোরটার দিকে এগিয়ে গেল। তবে করিডরের সামনে এসেই থমকালো ও; আর এগোবে কিনা ভেবে ও যখন দ্বিধান্বিত, ঠিক তখনই ভেসে এলো গভীর পৌরুষ এক কন্ঠস্বর,

-‘ এদিকে আসুন তৃষা।
করিডরের রেলিংয়ে দু-হাত রেখে জোৎস্নালোকিত আকাশের পানে একদৃষ্টে চেয়ে আছে আর্য। তৃষা ধীর পায়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মৃদু মন্দ পবন রুদ্রতপ্ত প্রকৃতিকে শীতল করতে ব্যস্ত।তৃষা কিছুক্ষণ নীরব থেকে আলতো স্বরে শুধাল,
-‘ কাল ঠিক কখন বেরোবেন?
আর্য দৃষ্টি না ঘুরিয়েই উত্তর দিল,
-‘ ভোর পাঁচটায়।
তৃষা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,
-‘ টুইংকেল কিন্তু খুব কষ্ট পাবে।
আর্য এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তৃষার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় ওর তীক্ষ্ণ মুখাবয়ব আজ যেন একটু বেশিই নমনীয় ঠেকছে। ও কেমন অদ্ভুত প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি নিক্ষেপপূর্বক ব্যগ্র কন্ঠে শুধাল,,
-‘ শুধু টুইংকেল?
আকস্মিক আর্যর এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে উঠল তৃষা। কিঞ্চিৎ সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিল ও। ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়াতে জড়াতে চঞ্চলা হরিণীর মতো একপলক আর্যর দিকে তাকিয়ে ফের নজর সরিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অভিমানী হাসি ফুটিয়ে বলল,

-‘ তৃষা নেওয়াজের কষ্ট পাওয়া বা না পাওয়াতে মিস্টার রোবটের কী আসে যায়? আপনার তো শিপে গিয়েই সব ভুলে যাওয়ার পুরোনো অভ্যাস আছে। সেখানে তো নিশ্চয়ই আপনার ম্যামদের অভাব হবে না!
আর্য এবার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘ ছায়াটা তৃষার ওপর আছড়ে পড়ছে। ও এক পা এগিয়ে এসে তৃষার খুব সন্নিকটে দাঁড়াতেই তৃষার নিশ্বাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসতে লাগল। আর্য নিচু স্বরে, এক মদিরাচ্ছন্ন হাসিতে বলল,
-‘ ম্যাম সংখ্যা হাজারটা কেন লক্ষকোটি হতে পারে কিন্তু নেভির ‌এই আর্য এহসানের স্বপ্নবিলাসী ম্যাম একজনই।
তৃষা থমকালো ক্ষনকাল; আর্য হতে সরাসরি এমন প্রত্যুত্তর হয়তো কক্ষনো স্বপ্নেও ভাবেনি। ওর সমস্ত সত্তায় এক বিচিত্র শিহরণ খেলে গেল, যেন বসন্তের প্রথম দখিনা বাতাস ওর তপ্ত হৃদয়ে এসে হানা দিয়েছে।লজ্জায় ওর ফর্সা কপোলদ্বয় আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল; লোকটা কি তবে শব্দের মায়াজালে এভাবেই ওর প্রতিটি আবেগ বন্দি করে নেবে? তৃষা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। আর্যর ওই তীব্র দহনমাখা চাউনি ওকে যেন নিঃশেষ করে দিচ্ছিল।
ও তড়িঘড়ি করে ওড়নাটা সামলে নিয়ে কম্পিত পদক্ষেপে প্রস্থান করতে চাইল। কিন্তু ওর অবাধ্য পা দুটো কক্ষের প্রবেশদ্বারের চৌকাঠে পৌঁছানোর পূর্বেই পেছন থেকে আর্যর ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,

-‘ তৃষা?
তৃষা মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে। ও ধীর লয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল, জোৎস্নার আলোয় আর্যর চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং এক অনাস্বাদিত অধিকারের ছাপ। তৃষা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইল, যেন উত্তরটা পেতে ওর সমস্ত জীবন ব্যয় করতেও রাজি আছে ও। তবে আর্য যেন প্রতীক্ষার পাল্লা ভারী করতে চাইলো না, বড্ড আবদারি কণ্ঠে বললো,
-‘ আজ রাতটা এই রুমে থাকবেন?
তৃষা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতেই আর্য ওকে নিশ্চিন্ত করতে বলল,,
-‘ শুধু একটা রাতই আর কখনও বলবো না প্রমিস।
তৃষা স্ফীত হাসলো, ও নিজেও এটাই চাচ্ছিল তবে লজ্জাপূর্বক প্রকাশ্যে ব্যর্থ হচ্ছিল,
-‘ আচ্ছা থাকবো না। আচ্ছা ক্যাপ্টেন?
প্রথমবারের মতো তৃষার মুখে ক্যাপ্টেন সম্বোধনে আর্য অদ্ভুত ঘোরলাগা দৃষ্টিতে চাইল ওর পানে,
-‘ হুম?
তৃষা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আসতে চাইলে কাঁচুমাচু ভঙ্গিমায় বলল -‘ একটু তুমি করে বলবেন ‌প্লিজ? অন্তত আজকে রাতটার জন্য।
আর্যর বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই শান্ত হয়ে আসা সমুদ্রের ন্যায় শীতল হয়ে গেল। শত প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো আজ ওর; ও এটাই চেয়েছিল যেদিন তৃষা মন থেকে চাইবে,আবদার করে ওকে বলবে তুমি বলে সম্বোধন করতে সেদিনই ও তুমি বলবে এর আগে নয়। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান আর্যর ওষ্ঠাধরে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। ও সম্মতির সুরে খুব নরম গলায় বলল,

-‘ হুম? আচ্ছা।
ছোট্ট এক সম্মতিসূচক বাক্য আর তাতেই তৃষার মনে হলো ওর হৃৎপিণ্ডটা খুশিতে এক লাফে কয়েকশ ফিট উপরে উঠে গেছে। ও আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ আসলে… আমি ফোনটা রুমে ফেলে এসেছি। ওটা নিয়ে আসি? এক মিনিট!
বলেই তৃষা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হতে উদ্যত হলো। দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই পেছন থেকে আর্যর সেই ভরাট কণ্ঠস্বর আবারও প্রতিধ্বনিত হলো,
-‘ তৃষা?
তৃষা থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ওর কৌতুহলী নেত্রে একরাশ প্রশ্নের মেলা,
-‘ কিছু বলবেন?
আর্য কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে ওর মুখশ্রীর দিকে চেয়ে রইল। ওর মনে তখন কথার পাহাড় জমেছে, কত কিছু বলার ছিল, কত সহস্র না বলা অধিকারের দাবি। কিন্তু সবটুকু গিলে নিয়ে ও কেবল আলতো করে মাথা নেড়ে বলল,
-‘ না… কিছুই না। যাও, আর দ্রুত এসো।
তৃষা প্রস্থান করতেই আর্য করিডরের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ভরাট সুরে গেয়ে উঠল,
🎶 কিতনা কুছ কেহনা হ্যায়…
ফির ভি হ্যায় দিল মে সওয়াল ক্যাহে…
স্বপ্নো মে জো রোজ কাহা হ্যায়…
ও ফির সে ক্যাহু ইয়া নহি…🎶

নিশীথিনী এখন মধ্যগগন অতিক্রান্ত করে ভোরের প্রতীক্ষায় মগ্ন। মহানগরীর কৃত্রিম আলোকছটা ম্রিয়মাণ হয়ে এসেছে, অন্দরমহলের নিস্তব্ধতা এখন এতটাই গভীর যে ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি কম্পনও যেন স্পষ্ট শ্রুত হচ্ছে। শয়নকক্ষের প্রশস্ত বিছানায় অবিন্যস্তভাবে শুয়ে আছে এক পূর্ণাঙ্গ পৃথিবী; মাঝখানে টুইংকেল তার ছোট্ট নিষ্পাপ হাত দুটি ছড়িয়ে দিয়ে স্বপ্নপুরীর রাজ্যে বিচরণ করছে, আর তার দুই পাশে দুটি অতৃপ্ত হৃদয়ের স্পন্দন।
তৃষা তন্দ্রাচ্ছন্ন; দীর্ঘক্ষণের প্রতীক্ষা আর মনের ভেতরের তোলপাড় শেষে শ্রান্ত দেহখানি ঘুমের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। ওর অবাধ্য অলকগুচ্ছ কপালে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। পাশে শুয়ে থাকা আর্যর চোখে ঘুমের লেশমাত্র অনুপস্থিত। ও পাশ ফিরে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ওর সেই বোকা মানবীর পানে। চাঁদের আবছা আলোয় তৃষার স্নিগ্ধ মুখশ্রী আর্যর পৌরুষত্বকে এক মায়াবী আকর্ষণে বারবার দিশেহারা করে দিচ্ছে।

হঠাৎ আর্য নিঃশব্দে উঠে বসল। করিডর থেকে আসা হিমেল হাওয়া তৃষার চুলে এক চঞ্চল হিল্লোল তুলে দিয়ে গেল। আর্য নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না; এক অদম্য অনুরাগের বশবর্তী হয়ে ও অতি সন্তর্পণে তৃষার দিকে ঝুঁকে এল। ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস তৃষার কপোলে আছড়ে পড়ল। আর্য ধীরলয়ে ওর কম্পিত ওষ্ঠাধর তৃষার শুভ্র ললাটে ছোঁয়াল। এক পলকের সেই পবিত্র স্পর্শে আর্যর সমস্ত সত্তা শিউরে উঠল, যেন বহু জন্মের তৃষ্ণা এক নিমেষে মিটে গেল।
পরক্ষণেই আর্য নিজেকে সরিয়ে নিল। একরাশ অপরাধবোধ আর তীব্র অধিকারের দ্বন্দ্বে ওর কণ্ঠনালী শুকিয়ে এল। ও তৃষার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে অতি নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল,
-‘ আ’ম স্যরি মিসেস এহসান,তোমার অনুমতি ছাড়া তোমায় স্পর্শ করার জন্য। বাট ট্রাস্ট মি, নেভির এই কঠোর মানুষটা আজ নিজের হৃদয়ের কাছে বড্ড অসহায়। আ’ম রিয়েলি স্যরি মাই লাভ।
বলেই আর্য পুনরায় বালিশে মাথা রাখল। ওর দৃষ্টি তখন সিলিংয়ের দিকে নিবদ্ধ, কিন্তু মনের কোণে তখন প্রশান্তির এক বিশাল সমুদ্র উত্তাল ঢেউ তুলছে। এদিকে আর্যর এমন সরাসরি স্বীকারোক্তিতে আধারাচ্ছনতার মাঝেই বিস্ফোরিত নয়নে চাইলো তৃষা। পুরোপুরি নিদ্রাচ্ছন্ন না হওয়ার দরুন সবটা স্পষ্ট শ্রবনগোচর হয়েছে ওর। ও যেনো কোনো রূপ আবেগ প্রকাশেও ব্যর্থ হয়ে গেলো কিছুক্ষণের তরে।

প্রভাতের আগমণ আজ কেনো একটু বেশিই দ্রুত হয়েছে।ঘড়ির কাঁটা ভোর পাঁচটার ঘরে।আর মাত্র কিছুক্ষণ তারপরই আর্য চলে যাবে। তৃষার ডাগর নেত্রের কার্নিশে জল জমেছে। আর তা লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ও।পাশেই টুইংকেল আর্যর কোলে আহ্লাদে মগ্ন। আর্য মেয়ের সঙ্গে খুনসুটির ফাঁকেই তৃষার মলিন মুখশ্রীর দিকে আড়দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে।
ও বুঝল এখন ওর বাচ্চা বউটাকে বোঝানো অতীব জরুরি নতুবা সে কেঁদে রীতিমতো বন্যার সূচনা করবে।ও টুইংকেলকে চকলেট আনতে বলে তৃষার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৪

-‘ তৃষা?
তৃষার অবাধ্য অশ্রুকণারা এবার বাঁধন ছিন্ন হয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়ল,আর্য দেখলো তবে তৎক্ষণাৎ কিছু না বলে নিশ্চুপ রইলো। তৃষা ফুপাতো ফুপাতে শুধালো,
-‘ কবে ফিরবেন।
-‘ শীঘ্রই।
-‘ অপেক্ষা করব,ভীষণ করে,বাজে ভাবে।
আর্য ঈষৎ হেসে তৃষার অশ্রুকণা সযত্নে মুছে দিতে দিতে বলল,,-‘ আমিও।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩৬

1 COMMENT

Comments are closed.