ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১
শানজানা আলম
আজও কিছু রান্না করো নি ঐশি, এরকম হলে চলে? – এহসান কিছুটা রূঢ় ভাবেই বলল।
ঐশির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, সে নেইল এক্সটেনশন করিয়েছে, সেটাই মুগ্ধ হয়ে হাত নাড়িয়ে দেখছে।
কি হলো, এভাবে কত দিন?- এহসান রেগে যায়।
দেখো এহসান, আমি তো বলেছিলাম, আমি সংসারী
নই। এভাবে রান্না ঘরে আমি আটকে থাকতে পারব না। আমার একটা লাইফ আছে। আর দুদিন পরে লামিসার রিসিপশন। দেখো আর্ট করিয়েছি!
এহসান বিরক্ত হলো চূড়ান্ত, টাকার শ্রাদ্ধ দুদিন পর পর।
বাইরে থেকে এনে খেতে খেতে এসিডিটি হয়ে গেছে।
ঐশির কোনো চিন্তাই নেই। উপরন্তু ওর চাহিদা পূরণ করতে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে এহসানের।
আজ এই শাড়ি, কাল ওই গয়না, জামাকাপড় কিনতেই আছে, ফ্যাশন এক্সেসারিজের অভাব নেই।
এহসান বলে ফেলল, এভাবে তো চলতে পারে না ঐশি। তোমার সব চাহিদা আমি পূর্ণ করি, আমার জন্য তুমি কি করো?
ঐশি বলল, বিয়ের সময় বলেছিলে তুমি আমাকে সুখে রাখবে।
সুখ কি শপিং আর সাজগোজ, সংসার সাজিয়ে গুছিয়ে করা যায় না? পড়তে চেয়েছ, ভর্তি করে দিয়েছি এমবিএ তে, একগাদা বন্ধুবান্ধব জোগাড় করে সারাদিন উড়ে বেড়াচ্ছ।
ঐশি বলল, আমি তো এমনি! বুয়ার রান্না তুমি খেতে পারো না। সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে খাবার আনা ছাড়া উপায় কি!
এহসান বুঝলো, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আজ বাইরে থেকে খাবে না। ভাতটা নিজেই চড়িয়ে দিয়ে বসল ড্রয়িংরুমে। কিন্তু ভুলে গেল বেমালুম। শেষ অবধি ভাত পুড়ে লেগে গেল! রাতে খাওয়াই হলো না আর!!
কোন কুক্ষণে যে এমন একটা মেয়ে পছন্দ করে এনেছিল মা!
এহসান পরদিন সকালে উঠে কিছু না বলেই অফিসে চলে গেল।
ঐশির ঘুম ভাঙল বেলা করে। ঘুম ভাঙতেই মনে হলো, তার কিছু টাকার দরকার, একটা ড্রেস আসবে আজ। এহসান তো চলে গেছে। কিভাবে টাকা চাওয়া যায়!
ব্যাগে আট হাজার টাকা হবে না সব মিলিয়ে।
এহসানকে ফোন করল ঐশি, এহসান ফোন পিক করল না। বাধ্য হয়ে মাকে ফোন করল ঐশি।
মা, আমার কিছু টাকা লাগবে। বিকাশ করতে বলো তো বাবাকে?
ঐশির মা বিরক্ত হয়ে বললেন, পনের দিন আগে না তোকে দশ হাজার টাকা পাঠালো বাবা? তোর বাবা রিটায়ার করেছে, হুটহাট এভাবে টাকা পাঠানো সম্ভব?
ঐশির পরিবার ঢাকার বাইরে জেলা সদরে থাকে।
বাবা ব্যাংকার ছিলেন, রিটায়ার করেছেন। দুই বোনের মধ্যে ঐশি বড়৷
মা, এহসানের সাথে একটু ঝামেলা হয়েছে, আমি তো রান্না বান্না তেমন পারি না৷ আর ও তো একটু ঘরে খেতে পছন্দ করে।
ঐশির মা বললেন, অথৈকে নিয়ে যা, রান্না বান্না শিখে নে মা। সংসার তো করতে হবে নাকি!
ঐশি বুঝলো এভাবে মাকে ম্যানেজ করা যাবে না। তাই বোনকে ফোন করল।
ঐশি আর অথৈ তেরো মাসে ছোট বড় দুই বোন, ঐশি বড়। দুজন একই ক্লাশে পড়েছে। দুই বোন হলেও দুজনের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। ঐশি কিছুটা উজ্জ্বল, স্টাইলিশ, রূপচর্চায় মনোযোগী, উচ্চাভিলাষী আর মোটামুটি মানের ছাত্রী।
অথৈ একটু চুপচাপ, ঘরোয়া, পড়াশোনা করে, সংসারী ধরনের মেয়ে। এতে দুই বোনের সম্পর্কে কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয় নি কখনো। বছর দেড়েক আগে ঐশি আর অথৈ কে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে দেখে এহসানের মা। বড় বোন হিসেবে ঐশির বিয়ের কথাই আগে হয়। তাছাড়া ঝকঝকে ঐশি বেশ কিছুটা উজ্জ্বলও।
ঐশি বিয়েতে রাজী ছিল না। অনার্স শেষ করে সে চাইছিল এমবিএ ভর্তি হবে। তারপর নিজের পায়ে দাঁড়ানো, ইচ্ছে মতন চলাফেরা, সবটাই নিজের করে পাওয়া। বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ঐশির ইচ্ছে পূরনে সমস্যা হলো না, ঢাকায় চলে এলো, কিন্তু সংসারে মন বসল না। ঝকঝকে চকচকে শহুরে জীবন কত উজ্জ্বল, সে কিনা রান্নাঘরে দিন পার করবে, হতেই পারে না।
অথৈ মাকে বুঝিয়ে টাকাটা ম্যানেজ করে দিলো বোনকে। ঐশির মনে হলো, অথৈকে নিয়ে এলে ঝামেলা কিছুটা কমবে। তাই সে অথৈকে ঢাকায় আসার প্রস্তাব দিলো।
অথৈ এর মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ফ্রি ছিল, তাই সে ভাবল কিছুদিন ঘুরে আসা যাক।
যেদিন অথৈ ঢাকা এলো, আসার পরে ঐশির ঘরের চেহারা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল! সব চাইতে অবাক হলো, এহসানকে দেখে, বেচারা সারাদিন অফিস করে এসে ড্রয়িংরুমে ঘুমিয়ে যাচ্ছে, তাও বাইরের খাবার খেয়ে!
অথৈ সকাল সকাল উঠে বুয়াকে সাথে নিয়ে রুটি আলুভাজি, ডিমপোচ, সেমাই করে ফেলল।
ঐশি ওঠেই নি, এহসান খুশি মনে ব্রেকফাস্ট করতে পারল বাসায়।
-থ্যাংকস অথৈ, পাউরুটি আর জ্যাম খেতে খেতে মুখ পুরো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল!
-বুয়া তো পারে, কেন করান না?
– বুয়া একা কিছু পারে না, বুয়াকে চালাতে হয়, ঐশি তে ওঠেই লেট করে।
-আচ্ছা, আমি যে কদিন আছি, চেষ্টা করব বুয়াকে শিখিয়ে দিতে।
-হ্যা সেটাই করো, তোমার বোন তো আর কিচেনে ঢুকবে না!
অথৈ হাসল এহসানের আক্ষেপ হালকা করার জন্য।
