ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ২০
শানজানা আলম
আশেপাশে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট হয়েছে। অথৈ একটা ছিমছাম রেস্টুরেন্ট খুঁজে বসল। খাবারের অর্ডার সাদিক এলে দেওয়া যাবে। আপাতত একটা লেমনেড নিয়ে নিলো। চারপাশে কলাবতী লাল হলুদ ফুলেরগাছ,
ভালো লাগছিল পরিবেশটা। অথৈ টেনশন ফ্রি হতে পারছে না। কেন যেন মনটা বিষন্ন ভাব কাটিয়ে উঠতে পারছিল না।
সাদিক আসতে একটু দেরী হবে জানালো।
আর্লি লাঞ্চ করে অথৈ এসেছে, সাদিক আসবে অন্য উপজেলা থেকে, রাতে আবার ফিরে যাবে,এই সময়টাই ভালো হবে।
অথৈ এতক্ষণ বসে না থেকে কিছু খাবার অর্ডার করে দিলো, তৈরি হোক, সাদিক এলে সার্ভ করে দিবে।
দূর থেকে দেখে একজনকে এহসান মনে হলো। অথৈ বুঝতে পারল না এহসান কিনা। অফহোয়াইট শার্ট আর ব্লু জিন্স পরে আছে। এই মানুষটার কোনো খারাপ দিক অথৈয়ের চোখে পড়ে নি কখনো, আপু থাকতে পারল না।
কয়েকদিন আগে হলেও অথৈ আন্তরিকতা নিয়ে হাসি দিয়ে এগিয়ে যেত। অথবা এহসানের যত্ন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে যেত, আজ কেমন অস্বস্তি লাগছে। না এহসান বিয়ের কথা তুলেছে
সেজন্য নয়, ওটা একটা অস্থির সময়ের আলাপ। সেটা ধরে রাখার কোনো মানে নেই।
আপু নাকি ব্যাংকক যাচ্ছে বন্ধুদের সাথে। একটা শোরুম করবে ঠিক করেছে, লোন ম্যানেজ করছে, আপু হয়তো এই লাইফটাই এক্সপেক্ট করে বা ডিসার্ভ করে।
এহসান এখানে এসেছে একটা কাজে। মামাতো ভাই বিদেশ থেকে দেশে এসেছে, একটা বিজনেসের বিষয়ে একটু আলাপ ছিল, এহসান নিজেও ক্লান্ত হয়ে গেছে, কয়েকদিনের ছুটি নিয়েছে, এখান থেকে ফিরে কক্সবাজার গিয়ে একা কয়েকটা দিন থেকে আসবে।
ঐশির টাকা দেওয়া প্রায় শেষ করে ফেলেছে। আর একবার দিতে হবে। জীবনটা তো গোছাতে হবে, একেবারে নতুন করে শুরু করা যাকে বলে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে এত একা হয়ে যাবে, কখনো ভাবে নি, এহসানের বয়স একত্রিশ। এই সময়ে তার সংসার, বাচ্চা, বউ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। ভাই বোন সবাই বড়। যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। মায়ের বয়স হয়েছে, বেশিরভাগ দিন অসুস্থই থাকেন। বন্ধুরা যে যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত। নিজের কথা বলার মতন কেউ পাশে নেই, থাকে না। তারও সুন্দর একটা জীবন হতে পারত, হয় নি। টাইম পাসের জন্য দুয়েকটা ডেট করা যায়, তসতে শান্তি মেলে না। নতুন করে শুরু করা সহজ কাজ নয়।
এহসান এই রেস্টুরেন্টেই এসে ঢুকলো। সাথে আরো দুজন ভদ্রলোক।
অথৈ কে দেখে এহসান এসে কথা বলল, হ্যালো, কেমন আছো?
অথৈ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।
হ্যা ভালো আছি এহসান ভাই, আপনি?
কেমন আর থাকব, যেমন দেখছ তেমনি!
অথৈ আগের মতন মজা করে বলল, আপনাকে কিন্তু ফ্রেশ লাগছে।
এহসান হেসে বলল, হ্যা, আমরা তো মুখোশ পরে ক্লান্তি ঢেকে রাখি, নাগরিক ক্লান্তি! কারো জন্য অপেক্ষা করছ?
হ্যা, সাদিক সাহেব আসবেন।
সাদিক মানে যার সাথে বিয়ের কথা হচ্ছিল?
হ্যা।
এহসান সচেতন ভাবে বাদবাকি সব কথা এড়িয়ে গিয়প বলল, বেস্ট অফ লাক।
অথৈও চোখে মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল।
সাদিক এসে পড়ল। অথৈকে ফোন করার পরে অথৈ পেছনে তাকিয়ে ইশারা দিলো। সাদিক এসে বসতে বসতে বলল, এত বাজে জায়গা, অটোওয়ালার বিশ টাকার ভাড়া ত্রিশ টাকা বলে বসে আছে, আমিও ছাড়ি নাই, বিশ টাকাই দিয়ে আসছি, যা তা মুখ খারাপ করল।
এহসান বলল, বসো তাহলে, আমি উঠলাম।
অথৈ বিব্রত বোধ করে বলল, ওকে ভাইয়া।
সাদিককে এহসান বলল,আসছি ব্রো।
সাদিক বলল, উনি কে, ওনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
অথৈ কিছু বলার আগে এহসান বলল আগে হলে আপনার সাথে আমার একটা ঠাট্টার সম্পর্ক তৈরি হতে পারত, আমার আপাতত পরিচয় অথৈয়ের একজন শুভাকাঙ্খী। তো ভাইয়া উঠি।
সাদিক বলল, ওকে!
হ্যান্ডশেক করে বিদায় নিলো এহসান।
সাদিক সন্দিহান চোখে বলল, কে উনি?
অথৈ বলল, দুলাভাই!
মানে তোমার বোনের এক্স হাজবেন্ড, তো তোমার সাথে কি, নাকি শালীর সাথে খাতির জমাতে এসেছে!
যোগাযোগ আছে নাকি তোমার সাথে?
অথৈ বলল, সাদিক, এমন কিছু নয়, এখানে এসে দেখা হলো।
ওহ, এসব লোক থেকে দূরে থাকবে।
অথৈ মৃদু প্রতিবাদ করে বলল, উনি যথেষ্ট ভালো মানুষ আপুর সাথে এডজাস্ট হয় নি। আপুরও কিছু সমস্যা ছিল।
আরেব্বাস, তোমার তো দেখি বোনের চাইতে বোনের এক্স হাজবেন্ডের উপর দরদ বেশি।
তা কোনো চক্কর ছিল না তো, যে কারনে ডিভোর্স টা হলো, আমি ভাই মনে চাপা কথা রাখতে পারি না। সরাসরি বলে দিই, ভালো লাগলে ভালো, না লাগলে না লাগুক।
অথৈ বলল, সরাসরি কথা বলা ভালো,তবে এতটাও ভালো না যা মিথ্যা সন্দেহ বশত আরেকজনের উপর দোষারোপ করা হয়।
সাদিক খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, এত রিয়াক্ট করার মতন কি বললাম!
ওয়েটার এসে বলল, আপু খাবারটা দিয়ে দিব?
সাদিক বলল, আপু কেন বলছ, ম্যাম বলো!
ওয়েটার বলল, সরি, স্যার। ম্যাম বলা উচিৎ ছিল।
অথৈ বলল, না ঠিক আছে, এখানে আসলে স্যার ম্যাম প্রচলিত না। আমি মাঝে মাঝে আসি, ওরা আমার পরিচিত, দিয়ে দিন ভাইয়া।
সাদিক বলল, ওহ, আচ্ছা, কি কি খাবার অর্ডার করেছ?
অথৈ বলল, একটা হোয়াইট পাস্তা, মোমো, সালাদ আর ফিসফ্রাই, ক্লিয়ার স্যুপ।
এত কিছু, মেনু কার্ড দেখি, দামও তো কম নয়।
দুজন খেয়ে শেষ করতে পারব?
অথৈ বলল, এমন কিছুও বেশি নয়। কোয়ান্টিটি খুবই অল্প, ওদের পে ফাস্ট, আমি পে করে দিয়েছি। না পারলে পার্সেল করে দিবে।
সাদিক বলল, ওহ, পেমেন্ট করে দিয়েছ, তা অপেক্ষা করলে না কেন, আমি এসে অর্ডার দিতাম।
সাদিকের সাথে অথৈয়ের কথা বলতে ভালো লাগছে না। অথৈ এবার ভদ্রতা রাখল না, আপুর মতন বোকামি সে করবে না।
অথৈ বলল, সাদিক আপনি পেশায় ডাক্তার, মেধাবী এটাই স্বাভাবিক কিন্তু আপনার আচরনে সম্ভবত একটু সমস্যা আছে।৷
কেমন সমস্যা?
এই যে আসার পর থেকে আপনি যেভাবে কথা বলছেন, কোনো কথায়ই শিষ্টাচার নেই। আমার এটা ভালো লাগে নি।
বলে অথৈ ভাবল ঠিক হলো না, এই কথার রেশ বহুদূর যাবে। বিয়ে ভেঙেও যেতে পারে।
সাদিক একটু ইতস্তত করে বলল, তুমি তো বেশ চটাং চটাং কথা বলো, দেখে নরম মনে হলেও নরম নয়,এজন্যই বোধহয় তোমার বোন সংসার করতে পারে নি। তোমাকে পোষ মানাতে আমারও কষ্ট হবে!
অথৈ বলল, আমাকে কি গৃহপালিত পশুপাখি মনে হচ্ছে আপনার? যে পোষ মানাতে হবে?
অথৈ উঠে দাড়ালো।
এনিওয়ে, সাদিক আমি উঠব। আপনি যেমন সরাসরি কথা বলেন, আমিও বলি, আপনার আচরন আমারও ভালো লাগে নি, বিয়ের বিষয়টা নিয়ে আমিও ভাবব আবার। আপনিও না করতে পারেন। আপুর যে এক্সিডেন্ট হয়েছে, তারপরে আমার নতুন কোনো ভুল সম্পর্কে যাওয়া ঠিক হবে না। ভালো থাকুন।
সাদিক বলল, ওয়েট, এত মাথা গরম করছ কেন, বসো। এত সিরিয়াসও কিছু হয় নি। আমরা এসেছি নিজেদের জানব বলে, তৃতীয় পক্ষ নিয়ে এত কথা বাড়ানো ঠিক হয় নি।
অথৈ একবার ভাবল, ভেবে বসে পড়লো।
খাবারটা দিয়ে গেছে।
অথৈ পাস্তা নিলো, সাদিক স্যুপ মুখে দিয়ে বলল, জঘন্য। এই ওয়েটার…
ওয়েটার এগিয়ে এলো,
এটা কি বানিয়েছেন, খান তো, খেয়ে দেখেন, কোনো মানুষ এত লবন খেতে পারে, তিতা করে ফেলসে।
এক গাদা টাকা নিয়ে অখাদ্য গছিয়ে দিচ্ছে।
অথৈ মুখে দিয়ে দেখল, ঠিকঠাক তবে লেমন ফ্লেভারড লাগছে।
অথৈ বলল, ওরা তো আসলে প্রফেশনাল শেফ না।
ঠিক আছে, আপনি এটা বদলে দিন।
না বদলে দিবে মানে, টাকা রিফান্ড করবে।
অথৈ ওয়েটারকে বলল, আপনি নিয়ে যান ভাইয়া, আমি দেখছি।
সাদিক গজ গজ করতে করতে বলল, টাকা কি গাছে হয় নাকি!!
শেষে অথৈকে টাকা রিফান্ড করতে এলে সাদিক বলল, দেখছ, সুর সুর করে টাকা নিয়ে এসেছে। নরম হলেই পেয়ে বসে।
অথৈ একশ টাকা নিয়ে বলল, ভাইয়া, বাকিটা রেখে দিন, টিপস। পরে কখনো এলে ভালো করে তৈরি করে দিয়েন।
তারপর উঠে পড়ল। সাদিকও চলে যাবে। সাদিক বলল, রাতে ফোন করবে, অথৈ কিছু বলল না।
এত বিরক্ত লাগছে, অথৈ কাউকে বোঝাতে পারবে না। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
সাদিক বলল, অথৈকে ড্রপ করে দিবে, অথৈয়ের ইচ্ছে করল না। কাজ আছে বলে মার্কেটের দিকে যাবে বলল। সাদিক চলে গেল।
অথৈয়ের সামনে দিয়ে একটার পরে একটা রিক্সা চলে যাচ্ছে, অথৈ অন্যমনস্ক হয়ে আছে। সন্ধ্যা হতে বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে। লাঞ্চের পরপর এসেছিল এখানে। বিকেল এখন।
এহসান পাশে এসে দাঁড়ালো হঠাৎ, কি হলো, অটো নিচ্ছ না যে?
অথৈ চমকে উঠল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ১৯
অন্যমনস্ক লাগছে, কোনো সমস্যা?
অথৈ হাসার চেষ্টা করে বলল, না ঠিক আছে।
আলাপ জমে নি?- এহসান মজা করে বলল!
অথৈ বলে ফেলল, ওই আছে, খারুজ টাইপ আর কি! পড়াশোনা ছাড়া কিছু করে নি মনে হলো!
এহসান হেসে বলল, ফ্রি আছ? চলো নদীর পার থেকে হেঁটে আসি। অবশ্য মফস্বল শহর, কে কী ভাবে নেয়!
যাবে?
অথৈ কিছু না ভেবে বলল, চলুন যাই।
