ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৭
শানজানা আলম
অথৈ আর এহসান এলো অবশেষে নন্দীপুরে। আসবে না এমনটাই ভেবেছিল। অথৈ এর আসার ইচ্ছে ছিল। এরকম একটা সময়, বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক একটু স্বাভাবিক না হলে অথৈ ডিপ্রেশনে থাকবে, তাই এহসান অথৈকে নিয়ে এলো। কোনো প্রোগ্রাম হবে না। এহসানের মামার বাসায় একদিন এহসান ঘুরে আসবে। অথৈ কে নিয়ে এত ঘোরাঘুরি করবে না। আর ওর কাজিনরা যদি আসে, তাহলে এসে অথৈ কে দেখে যেতে পারে। তবে ঐশি আছে বাসায়, তাই এই একই বাসায় এহসানের রিলেটিভ সবাই আসবে কিনা সেটাও একটা বিষয়।
এহসান সকল জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে ফেলল। তার জীবনে অথৈ বর্তমান, অথৈ সত্য। কয়েকদিন পরেই তাদের মাঝে যৌথ প্রাণের আগমন হবে, তাই এত জটিলতা নিয়ে ভেবে মাথায় স্ট্রেস তৈরি করা নিতান্ত বোকামি। অস্বাভাবিক বিষয়টা তারা দুজনে একসেপ্ট করে কাছাকাছি এসেছে, এটাই মানতে হবে।
এহসান অথৈকে পৌঁছে দিয়ে গেল ওর আরেক কাজিন। সৌজন্য সাক্ষাতের পরে
তাহিরা বেগম শীতল কন্ঠে অথৈকে জিজ্ঞেস করলেন, শরীর কেমন? খেতে পারছিস?
অথৈ ঘাড় নাড়ল।
রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও তোমরা, এহসানকে বলল তাহিরা বেগম।
অথৈকে রুমে রেখে এহসান জামা কাপড় লাগেজ থেকে বের করে দিলো।
এহসান, আমি পারব- অথৈ বলল।
ঠিক আছে। তুমি ফ্রেশ হও তাহলে।
এহসান বের হয়ে এলো। ঐশি ডাইনিংয়ে খাবার গুছিয়ে দিচ্ছিল। এহসান ঐশির সাথে কথা না বলে তাহিরা বেগমকে ডাকল।
আম্মা-
তাহিরা বেগম কিচেন থেকে বের হয়ে এলেন।
এহসান ঐশির সামনেই চাপা স্বরে বলল, অথৈ এর সাথে ভালো ব্যবহার করতে না পারলেও এই সময়ে খারাপ কিছু না বলার অনুরোধ মা। আমাকে কথাটা বলতে হলো, কারন, মা মেয়ের সম্পর্কে সব সময় আমি থাকব না। অথৈ এর এই সময়ে কোনো ডিপ্রেশন বা মানসিক চাপ যেন তৈরি না হয়৷
তাহিরা বেগম উত্তর দিলেন না। তবে এহসানের একবার চোখ চলে গেল ঐশির দিকে। ঐশির মুখটা শুকনো, তার স্বাভাবিক থাকার চেষ্টাটা ভীষণ স্পষ্ট। এহসান পৃথিবীতে একজনকে অপছন্দ করলে, সেই মানুষটা ঐশি। ঐশির জন্য তার এত স্ট্রেস, ক্ষতি হয়েছে, কখনো কোনো ভাবে সে ঐশিকে ক্ষমা করতে পারবে না। তবে কেন যেন মনে হচ্ছে, ঐশি ভালো নেই।
হোয়াটএভার, ঐশি যেমন থাকে থাকুক,সেটা এহসানের দেখার বিষয় না৷
তাহিরা বেগম আবার কিচেনে ঢুকলেন।
ঐশি একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, কেমন আছ তোমরা?
হ্যা, ভালো। তুমি?
ভালো আছি। অথৈকে জুসটা দিয়ে আসি।
এহসানের মনে হলো, সে অথৈকে ঐশির হাত দিয়ে কিছু খাওয়াবে না।
এহসান বলল, অথৈ এখন জুস খাবে না। আমি ওর টেক কেয়ার করছি, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না।
ঐশি নিজে জুসটা নিয়ে টেবিলে বসে পড়ল।
-বসো, এহসান।
কি মনে করে এহসান বসে পড়ল। টেবিলে হালকা নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে।
এহসান কিছু নিলো না।
ঐশি বলল, তোমার নিজের আচরনও স্বাভাবিক করা উচিৎ এহসান। কেউ তো তোমাকে কিছু চাপিয়ে দেয় নি। অথৈকে কনভিন্স করে ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তও তোমার।
এহসান বলল, আমি অস্বাভাবিক কি করেছি? এখানে নিয়ে এসেছি অথৈকে, সেটাই তো যথেষ্ট স্বাভাবিক আচরন।
-নিজের অস্বাভাবিকতা মানুষ বুঝতে পারে না। তুমি আমার হাতে অথৈকে খেতে দিলে না। এটা না বোঝার মতন বোকা আমি নই-
এহসান বলল, হ্যা সত্যিই তাই। তোমার পক্ষে সবই সম্ভব।
ঐশি বলল, আমার সহজ সরল বোনটাকে তুমি ট্রাপ করেছ, ওর একটা স্বাভাবিক জীবন হতে পারতো, ওর বিয়ে, স্বামী সংসার সব স্বাভাবিক হতে পারত৷ তুমি সেটা হতে দাও নি, আমার উপর প্রতিশোধ নিতে ওকে বিয়ে করেছ,সেখানে আমি রিয়্যাক্ট করব না?
-ভুল ধারনা তোমার, তোমার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার কিছু নেই। আমার মনে হয়েছে, আমি যেমন লাইফ পার্টনার চেয়েছি, অথৈ সেই মানুষ!
-এহসান, তুমি প্রচন্ড নার্সিস্টিক একটা মানুষ! সেলফিস, নিজে ভালো থাকার জন্য অথৈ এর মত একটা সরল মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিট্রে করেছ!
এহসান বলল, আমি যেমনই হই, অথৈ আমার কাছে ভালো আছে। আর ওকে আমি ভালো রাখার চেষ্টা করব। সরি, ভালো রাখব।
-বিষয়টা মাথায় রেখো, অথৈ এর সাথে খারাপ কিছু হলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব না!
এহসান বলল, টেক কেয়ার অফ ইওরসেলফ, আমার আর অথৈ এর মাঝে ঢুকতে আসবে না।
ঐশি বলল, এহসান, তোমার বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, আমি শুধু ভাবছি অথৈ এর কথা। আমার জন্য ওর লাইফে এত বড় ডিজাস্টার হলো। তোমার মত একটা ধূর্ত শেয়ালের সাথে ওর সারা জীবন থাকতে হবে।
এহসান বলল, প্লিজ প্রে ফর ইট, আমি অথৈকে সারা আজীবন আগলে রাখতে চাই। আর এখন এই তর্ক প্লিজ বন্ধ করো।
অথৈ রুম থেকে বের হয়ে এসেছে, ডাইনিংয়ে এহসানকে ঐশির সাথে কথা বলতে দেখে কেমন অস্বস্তি হলো। আগে ছিল এহসান আর ঐশি, অথৈ মাঝখানে ঢুকে পড়েছে, আর এখন এহসানের সন্তানের মা হতে যাচ্ছে। কেমন এলোমেলো লাগছে সবকিছু, অথৈ এর বমি এলো, মাথা ঘুরতে শুরু করল। অথৈ টলছে দেখে এহসান দ্রুত উঠে গেল। মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার আগেই এহসান অথৈকে ধরে ফেলল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৬
ঐশি ছুটে এলো, অথৈয়ের চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিলো ঐশি বসে।
এহসান বলল, সরি অথৈ, আমার এত বড় রিস্ক নেওয়া ঠিক হয় নি। আমরা রাতেই রওনা করে ঢাকায় ব্যাক করব।
