ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৮
শানজানা আলম
এহসানের কথায় সম্বিত ফিরল ঐশির। চলে যাবে মানে কি, চলে গেলে তো হবে না। তার নিজের নাসিরের বিষয়টা বাসায় বাবা মা কিংবা অথৈ এর সামনে ওপেন করতে হবে। হুট করে এমন কোনো নিউজ হলে, বাবা মা সামলাতে পারবে না। তারপর ছাপড়ি সাংবাদিক আর ইউটিউবার গুলো ঝামেলা শুরু করবে। কত রকম খারাপ কথা ছড়াবে, তার আগেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আসলে নিজেকে কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না এহসানকে দেখে। কেন এত রাগ হচ্ছে ঐশি বুঝতে পারছে না।
এহসান অথৈ কে ধরে রুমে নিয়ে গেল। তাহিরা বেগম একবার এসে দেখে গেলেন শুধু। অথৈ এর প্রতি তার রাগ, ঘৃণা দুঃখ সব চেপে বসে আছে। সহজ হতে পারছেন না তিনি। ঐশির জীবনটা এলোমেলো করে দিয়ে নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে।
ডিনারের আগে ঐশি এসে দরজায় কড়া নাড়ল, আসব?
এহসান আঁধশোয়া হয়ে অথৈ এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। ঐশি উঁকি দিচ্ছে দেখে উঠে বসল।
অথৈ বলল, আয় আপু!
এখন কেমন লাগছে তোর? একটু বেটার?- ঐশি জানতে চাইলো।
হুম।
ঐশি বলল, আমার একটা কথা বলার আছে, এহসান আই এ্যাম সরি, সব কিছুর জন্য। আসলে রিয়্যাক্ট করা ঠিক হয় নি। সব ঠিক করতে তোমাদের ইনভাইট করে নিজের উপর কন্ট্রোল হারিয়ে রেগে যাচ্ছিলাম।
এহসান বলল, ইটস ওকে।
আচ্ছা তোমরা রেস্ট করো, আমি আসছি, মিনিট বিশেক পরে ডিনার দিয়ে দিব। – ঐশি অল্প কথা বলেই বের হয়ে গেল।
অথৈ এহসানকে বলল, আমার না কী ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে, আমি বোঝাতে পারব না তোমাকে।
এহসান বলল, অস্বস্তির কিছু নেই অথৈ। তোমাকে পেতে হলে আমাকে এই অস্বস্তি মেনে নিতে হবে। এখন ঐশি তোমার বোন, এটার জন্য তুমি আমি ঐশি কেউ দায়ী নয়। আর আমি তোমাকে ভালোবাসি অথৈ, এটার চাইতে সত্য আর কিছু নেই।
হ্যা, তুমি বলতে পারো, ঐশি আমার প্রথম স্ত্রী ছিল, ওকে কি ভালোবাসিনি?
এখানে আমার একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে, জানি না কেউ বিশ্বাস করবে কি না! একটা সেটেল্ড ম্যারেজ যখন হয়, তখন পাত্র পাত্রী সবাই ভান করে তারা প্রেমে পড়েছে, ভালোবাসা দেখায়, ঘুরতে যায়, গিফট করে। আমিও এই ফেজ পার করেছি! বিলিভ মি অথৈ, এখানে আমি এই অনুভূতি টের পাই নি, যেটা তোমার জন্য পাচ্ছি। বিশ্বাস করো, তোমাকে একটু সময় না দেখলে, সরি না দেখলে নয়, মানে ইন টাচ না হলে আমার দম বন্ধ লাগতে শুরু করে। যেদিন ঐশি রেস্টুরেন্টে সিন ক্রিয়েট করল, আমার মনে হচ্ছিল আমার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছিল। আমার জীবনের কোনো অনুভূতিতে এখন ঐশি নেই! ও আমাকে বলছিল, আমি ওর প্রতি প্রতিশোধ নিতে তোমাকে বিয়ে করেছি, দেখো, তুমি ঐশির বোন, এটা তো আমি বদল করতে পারব না। ওর প্রতি প্রতিশোধ আমি কি নিব, সময়ই নিয়ে নেবে ও যা করেছে!
আমি ভীষণ থ্যাংকফুল টু গড, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমার জীবনটা তিনি নিজ হাতে গুছিয়ে দিয়েছেন তোমাকে দিয়ে। আমি তো শুধু এটুকুই চেয়েছিলাম!
অথৈ এহসানের কাঁধে মাথা রাখল, এহসানকে নিয়ে তার দ্বিধা নেই, কিন্তু সম্পর্কের জটিলতা অতিক্রম করা সহজ নয়।
এহসান বলল, আমি ডিনার টেবিলে কথা বলছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমরা ফিরে যাব। ভেবেছিলাম, সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, কিন্তু তোমার মা বাবা তোমাকে দোষী মনে করছে, ঐশির সংসার ভাঙার পিছনে তোমাকে দায়ী করছে,
নিজের মেয়েকে তারা চিনতে পারল না, এটা দুঃখজনক! আমাদের মেনে নিতে হবে, এই সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হবে না। আর এটা নিয়ে স্ট্রেসও করা যাবে না। যে, আসছে, তাকে নিরাপদে আসতে দিতে হবে অথৈ। এটা আমাদের দায়িত্ব।
দেখো, আমরা যদি দেশের বাইরে থাকতাম,তাহলেও কিন্তু দূরত্ব থাকত, তাই না?
অথৈ এহসানের বুকে মাথা রাখল৷ এহসান অথৈকে চুমু খেলো, ওর কপালে গালে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
এহসান বলল, বোঝাতে পেরেছি?
অথৈ ঘাড় নাড়ল।
-এখন চলো, ডিনার টেবিলে যাই। তোমার বেশি খেতে হবে না। হালকা কিছু নিও, আমি খাওয়া শেষ করে তোমাকে খাইয়ে দিব রুমে নিয়ে এসে।
-এহসান, দরকার নেই। আমি পারব।
-না, দরকার আছে, তুমি বুঝবে না।
-এত ভালো বেসো না এহসান, ভয় লাগে, যদি মরে যাই!
এহসান বলল, মরার সময় হলে, সবাই তো মরে যাব তাই না, এসব কু চিন্তা করে আমার ছেলের মাথা গরম করে দিও না!
অথৈ বলল, ছেলে কিভাবে জানলে?
এহসান হেসে বলল, বলে ফেললাম, মুখ থেকে বের হয়ে গেছে।
ডিনার টেবিলে সবাই একসাথে বসল, তাহিরা বেগম ছাড়া। খাওয়া শেষের দিকে ঐশি বলল, বাবা মা, এহসান অথৈ, আমার একটা ডিক্লারেশন আছে, তোমরাই যেহেতু আমার ফ্যামিলি, তোমাদের বিষয়টা আর লুকিয়ে লাভ নেই। আমি বিয়ে করছি, খুব শীঘ্রই।
এহসান ঠোঁটে কোণা দিয়ে একটু হাসল, ঐশি নিশ্চয়ই কোনো নাটক সাজাচ্ছে।
তাহিরা বেগম জানতে চাইলেন, কাকে? আগে তো বলিস নি?
ঐশি বলল, আমার বিজনেস পার্টনার। তবে পার্টনার বলা ভুল, ওরই ইনভেস্ট, আমি সাথে আছি, আমাকে যথেষ্ট হেল্প করেছে, ও নিজেও বড় বিজনেসম্যান!
অথৈ কিছু বলল না, এহসান বলল, অভিনন্দন!
ঐশি বলল, কথাটা আরো কিছুদিন পরে বলতাম, কিন্তু মা বাবা অথৈকে সহজ ভাবে মানতে পারছে না। তসরা ভাবছে আমি কষ্টে আছি, কিন্তু সেটা তো সত্য নয়, আমি মুভ অন করেছি অনেক দিন হলো!
এহসান মনে মনে বলল, সেটা তোমার বাবা মা যদি বুঝত!
তবে আপাতত এহসান কোনো তর্কে জড়ালো না।
ঐশির বাবা বললেন, দেখো তোমরা দুই বোনই বড় হয়েছ, দুঃখজনক পরিস্থিতি আমাদের পরিবারে ঘটে গেছে, যেটা স্বাভাবিক কোনো ঘটনা না। আমি চাই তোমরা ভালো থাকো। বিয়ের বিষয়ে কি ভেবেছ?
ঐশি বলল, এখনো ফাইনাল করিনি, ঢাকায় ফিরে ওর সাথে বসব। ওর ফ্যামিলি হয়তো ডেট ঠিক করবে।
পাত্র কে, কোথায় কেউ কিছু জানতে চাইলো না। তবে বড় মেয়ের কথায় তাহিরা বেগম একটু শান্তি পেলেন। ঐশি সেটেল্ড হলে অথৈ এর প্রতি হয়তো হতাশা কমে যাবে।
ঐশি বেশ ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সবাইকে জানানো হয়ে গেলে, পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাদের মানিয়ে নিতে সুবিধা হবে। তবে এইরকম একটা বিষয় সত্য হলে, কত ভালো হতো! নাসির কি পারতো না তেমন কেউ হতে যে ঐশিকে বিয়ে করবে! কিন্তু নাসির সব কিছু করবে, টাকা পয়সা দেবে, ফ্ল্যাট গাড়ি সবই দেবে, দেবে না শুধু স্বীকৃতি!
অথৈ বেশি কিছু খেলো না। রাতে এহসান এলো পানি নিতে। ঐশি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল।
এহসানকে দেখে ঐশি বলল, এহসান, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। একটু সময় হবে তোমার?
এহসান বলল, বলো।
এখানে না, ছাদে যাচ্ছি আমি। চলে এসো।
এহসান বলল, তোমার সাথে আলাদা ছাদে কথা বলা শোভনীয় হবে না।
জানি, তবুও সম্ভব হলে এসো।
এহসান বলল, দেখি, অথৈ এর সাথে কথা বলে।
ঐশি হেসে বলল, বউয়ের পারমিশন ছাড়া কিছু করো না মনে হচ্ছে! অথৈ তোমাকে এত আঁচলের তলায় পুরলো কিভাবে!
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬৭
এহসান বলল, বউয়ের আঁচল তলায় থাকার একটা শান্তি আছে। যাদের আঁচলই নেই, তারা এসব বুঝবে না।
ঐশি বলল, নো মোর এট্যাকিং, আমার কিছু কথা আছে, আমি কাউকে বলতে চাই, মনে হলো তোমাকে বলি। দেখো, অথৈ রাজী হলে চলে এসো।
আমি ছাদে যাচ্ছি।
