ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৭
শানজানা আলম
ঐশি ক্লাশে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। এহসান এসে বের হবে অফিসে। ঐশিকে তৈরি হতে দেখে শাশুড়ী বললেন, আজকে না গেলে হয় না মা? সারাদিন একা থাকব, গত কয়েকদিন অথৈ ছিল, কিচ্ছু টের পাই নি। ঐশি বলল, না মা, যেতে হবে। আমার জরুরি ক্লাশ আছে।
এহসান এসে বলল, আজকের দিনটা স্কিপ করো, আমি কাল থাকব, পরশু তো মা চলেই যাবে।
বিকেলে তুমি মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে, আনি এসে জয়েন করলাম।
সরি, আমাকে আগে তো বলো নি এই প্ল্যান। আমি আজ থাকতে পারছি না। – ঐশি নট কম্প্রোমাইজিং মুডে বলল।
এহসান একটু রেগে গিয়ে বলল, আচ্ছা তুমি ঠিক কোন দায়িত্বটা পালন করো, আমাকে একটু বলবে?
দায়িত্ব পালন করতে হবে, এমন তো কোনো কথা ছিল না, আমার একটা জরুরি ক্লাশ আছে। সেটা তুমি বুঝবে না?- ঐশি বের হতে হতে বলল।
এহসান জিদ করে বলল, তুমি আজ বের হবে না। এটাই ফাইনাল। আমি বলেছি তাই বের হবে না।
ছেলে বৌমার এই রকম ঝামেলা দেখে আলেয়া বেগম বললেন, সমস্যা নাই, আমি এনায়েতকে বলছি, আমাকে নিয়ে যাবে। তোদের ঝামেলা করতে হবে না।
না, তোমাকে আমি নিয়ে এসেছি, আমার কাছেই থাকবে, বড় ভাইয়াকে জানাতে হবে না।- এহসান বলল।
ঐশি বের হতে গেল, এহসান ঐশির ব্যাগটা টেনে নিয়ে ফেলে দিলো।
ঘরে যাও, বাসায়ই থাকবে আজ-
মানে, এটা কেমন অসভ্য বর্বরের মতন ব্যবহার এহসান?
এহসান বলল, যা বলেছি, সেটাই। একদম চুপ, বাসায় থাকবে। আর কোথাও যেতে হবে না, এমবিএ বাদ, পরীক্ষা দিতে হবে না। আমি টাকা দিয়েছি তো, আমি বললাম, আমার টাকা নষ্ট হয় হোক, তুমি কোথাও বের হবে না।
এহসানের রাগ দেখে ঐশি একটু দমে গেল, তবে রাগ কমল না। এহসান বের হয়ে গেলেও দরজা বন্ধ করে বসে রইল নিজের ঘরে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে তুবা ফোন করল, কিরে আসবি না আজ, আজ না বললাম, ফুডকোর্টে যাব সবাই?
ঐশি বলল, না আসতে পারব না, তোরা চলে যাস।
ঐশির ভীষণ ডিপ্রেসড লাগল কান্নাকাটি করে করে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলল, আরো ঘন্টাখানেক পরে নাসির ফোন করল।
ঐশি পিক করল না। একটু সামলে নিয়ে নিজেই ফোন করল।
নাসির বলল, ক্লাশে নাকি?
না, বাসায়।- ঐশি সংক্ষিপ্ত করে বলল।
ক্লাশ ছিল না?
ছিল, যেতে পারি নি। বাসায় ইন লস গেস্ট আছে।
আচ্ছা, তাহলে তো বিজি!
না, এখন ফ্রি আছি।
হুম, কথা ছিল আবার দেখা হবে, কবে কোথায় জানিও।
আচ্ছা।
অপেক্ষায় থাকব। সত্যি বলতে জীবনের এত বেশি প্রেশার, চাপ, তোমার সাথে দেখা করলে বা কথা বললে খুবই ভালো লাগে৷ ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে তুমি!
সত্যিই তাই? নাকি মন ভোলাতে বলছেন?
আপনি করে বললে তো মনেই হবে মন ভোলাতে বলছি, তুমি করে বলো!
আচ্ছা বলব।
কি হয়েছে, কণ্ঠস্বর ভার ভার লাগছে কেন!
কিছু না!
আরে শেয়ার করো তো, হালকা লাগবে!
না তেমন কিছু নয়। এমবিএ এর পরে একটা জব খুজতে হবে, নিজেকে সেটল করতে।
আচ্ছা, খুব ভালো।
আলেয়া বেগম এসে দরজায় কড়া নাড়ছেন।
বৌমা, খাবে এসো।
আসছি, বলে ঐশি বলল এখন রাখছি।
ওকে, ফ্রি সময়ে ফোন করো তাহলে!
ওকেএএ…
এহসান বিকেলে এসে মাকে আর ঐশিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল। সেখানে ঐশি চুপচাপই থাকল, কিছুটা বিষণ্ন। তার ভালো লাগছে না একদম। দম বন্ধ লাগছে, কিভাবে বের হবে এই দম বন্ধ করা পরিবেশ থেকে!
মাকে ডাক্তার দেখিয়ে, টেস্ট গুলো দিয়ে, এহসান বিষয়টা একটু হালকা করার জন্য ঐশিকে বলল, চলো কোথাও থেকে ডিনার করে বাসায় ফিরি!
ঐশি হ্যা না কিছুই বলল না।
এহসান একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁয় ঢুকল। ঐশি একদম চুপ করে আছে। কোনো সাড়া শব্দ নেই, স্যুপটা নিলো, আর কিছু তেমন খেলো না, নাড়াচাড়া করে চলে গেল।
এহসান জিজ্ঞেস করল, অথৈ কখন পৌঁছেছে?
দুইটার দিকে।
আচ্ছা, সমস্যা হয় নি তো?
না।
ওর বিয়ের কথা হচ্ছে কোথায়, তুমি জানো?
না, আমি জিজ্ঞেস করিনি, ঠিক হলে মা জানবে।
কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পরে, রাতে এহসান বলল, ঐশি সরি, এত সিরিয়াস হওয়া ঠিক হয় নি।
ঐশি শান্ত ভাবে একটু হাসার চেষ্টা করল। কোথাও একটা সুর কেটে গেছে, কিন্তু ঐশি সেটা নিয়ে চেঁচামেচি করল না একদম।
অথৈ বাসায় পৌঁছেছে। বিকেলে চা খেতে খেতে মাকে বলল, আপু আর এহসান ভাইয়ের মনে হয় এডজাস্ট করতে সমস্যা হচ্ছে।
কেন, কি সমস্যা?
আছে কিছু সমস্যা, বলা যায় না, কিন্তু আছে। ওদের দেখে বিয়ে করতে ভয় লাগছে।
ঐশি তো চিরকাল একটু জেদি, একরোখা, নিজের মত চলতে পছন্দ করে। এহসান তো খারাপ ছেলে না। ঠিক হয়ে যাবে। বিয়ের পর এমন হয়, তারপর আবার ঠিকও হয়ে যায়।
তাহিরা বেগম সমস্যাটা পাত্তা দিলেন না।
বেশ কিছুদিন কেটে গেল। আলেয়া বেগম চলে গিয়েছেন। ঐশি একটু বাইরে ঘোরাঘুরি কমিয়েছে।
সত্যি বলতে এহসান এমবিএ এর টাকা দিবে না, এটা বলার পরে ঐশির মনটা কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে, ওর কোনো অনুভূতি হচ্ছে না, পড়তেও ইচ্ছে করছে না। একদম চুপচাপ বিষন্ন লাগছে। নিজেকে দুর্বল মনে হচ্ছে।
এহসান অবশ্য এর পরে আর একবারো বলে নি যে টাকা দেবে না। ওইদিন ওই বিষয়টা রাগের মাথায় বলা ছিল।
সুবহানা দুবাই ট্রিপ থেকে ফিরে এসেছে, এত ঘোরাঘুরি করেছে, এত শপিং, চোখ ঝলসে যাওয়ার মত অবস্থা।
-এত সুন্দর, জানিস, তোদের নিয়ে একবার যেতে পারলে খুব ভালো লাগতো।
ঐশি বলল, দুবাই! হুহ, কোথাও যাওয়া হবে না আমার।
-কেন হবে না, তার আগে চল একটা রিসোর্টে নাইট আউট করি!
আমি ম্যানেজ করব।
-এহসান রাজী হবে না।
-বলবি ফ্রেন্ডদের নিয়ে ট্যুর, এই তো শেষ হয়ে যাচ্ছে কোর্সের ক্লাশ। বাই দ্য ওয়ে, নাসির ভাইকে জানাবি?
উনি সময় দিতে পারলে তোর একটা কোয়ালিটি টাইম কাটত!
নাহ, কি যে বলিস, এরকম কিছু না ওনার সাথে।
আর দেখা করিস নি?
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৬
নাহ!
ধুর, তুই কিছুই বুঝিস না, ফোনটা দে তো!
ফোনটা নিয়ে নাসিরকে একটা টেক্সট করল সুবহানা!
মিট করতে চায়, কয়েকজন ফ্রেন্ড সহ, সমস্যা না থাকলে।
নাসির সময় দিলো দুদিন পরে। ঐশি, সুবহানা, মারিয়া তিনজন গেল নাসিরের সাথে দেখা করতে।
