Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৪

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৪

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

হিমেল আয়মানকে কল করেছিল অনেকটা সময় পেরিয়েছে। আয়মান তার কিছুটা সময় পর ফিরলেও বন্ধুকে না দেখে কল দিয়েছিল। ফলাফল শূণ্য। কল তোলেনি। হতাশ হয়ে আয়মান সিঁড়ি বেয়ে হিমেলদের বাসাতেই গেল। অথচ ওখানেও নেই। অন্যদিকে হিমেল মিথিকে পৌঁছেই আবারও একই জায়গায় দাঁড়াল। ফোন তুলে দেখল আয়মান বার কয়েক কল দিয়েছিল। অথচ সে খেয়াল করেনি তখন ঐ ছুটোছুটিতে। ছোটশ্বাস ফেলে ও আয়মানকে কল ব্যাক করল। ওপাশ থেকে আয়মানই শুধাল,

“ শালা আমায় তাড়া দিয়ে নিজেই হাওয়া হয়ে গেলি। আমি মারপিট জুটঝামেলা সব পেরিয়ে চলে এলাম, অথচ হিমেল ভাই নেই। ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে। জানার,
“ একটু সামনে গিয়েছিলাম। তুই কই?”
আয়মান তখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। নামতে নামতেই বলল,
“ আরো কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাক। তাহলে বুঝবি অপেক্ষা কাকে বলে। ”
হিমেল হাসে মৃদু কথাটা শুনে। অপেক্ষা কাকে বলে ও জানে না? অবশ্য ও কোন প্রাপ্তির আশায় অপেক্ষা করেনি। ও অপেক্ষা করেছে শূণ্য আশায়।হিমেল ছোটশ্বাস টেনে শুধাল,
“ অপেক্ষা কাকে বলে আমায় শেখানো লাগবে না। অলরেডি এক জীবন অপেক্ষা করে কাঁটিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করে বসে আছি আমি।”
আয়মান নিচে নেমে এল ততক্ষনে। কল রেখে বন্ধুর পিঠে চাপড় মেরে শুধাল,

“ কার জন্য? কে সে ভাগ্যবতী নারী? ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোখজোড়ার দৃষ্টি এমন করল যে আয়মানকে ঐটুকুতেই থেমে যেতে হলো। বেচারা ঐ আলোচনা থামিয়ে হিমেল ঘামে ভেজা শার্টটা খেয়াল করে শুধাল,
” এই ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ায় তোর শার্ট তো ঘামে ভিজে গেছে।দৌড়াদৌড়ি করছিলি নাকি?”
হিমেল এবারে কেমন করে চাইল। এতকিছু থাকতে ওকে ঘামে ভেজা শার্ট খেয়াল করতে হয়েছে? বলল,
“ বকবক করছিস খুব আয়মান। পা বাড়া। ”
আয়মান পা বাড়াল হিমেলের সাথেই। যেতে যেতে বলল,
“ কত ঝামেলা পোহানোর পর বাসায় পৌঁছেছি জানস? আরেকটু হলে নিজেই মরে যেতাম টেতাম। ভাগ্যিস প্রাণটা হাতে নিয়ে বাসায় ফিরতে পেরেছি। আমার সামনেই তো লাঠি নিয়ে তেড়ে এসেছিল।”
হিমেল ভ্রু বাঁকায়। আয়মান সেটা দেখে আবারও বলল,
“ বিশ্বাস হচ্ছে না? আমার সামনেই তো একটা মানুষরে ধরে আঁছাড় মারল চিংড়ি মাছের মতো। ভাগ্যিস আমায় মারেনি। যে ঝামেলা হলো। ভয় পাইছিলাম একটু আধটু।গাড়িও ভাংচুর হইল। ”
“ জানি,তবে যেভাবে তুই বলছিস তোর চোখের সামনে হয়েছে ওটা বিশ্বাস করলাম না। ”
“ আমার সামনেই হইছে। তোর দিব্যি। কিন্তু তুই জানিস কিভাবে? ”
হিমেল এবার ছোটশ্বাস ফেলল। নিজে যে ঘটনাস্থলে ছিল তা আড়াল করে গিয়ে জানাল,
“ সামনে একজন বলছি শুনলাম। ”

মিথির সাথে হিমেলের দেখা হলো না প্রায় সপ্তাহখানেকের উপরে। অথচ মিথি ভেবেছিল দেখা হবে। দেখা হলেই একটা ধন্যবাদ জানাবে সেদিন এভাবে এত ঝামেলার মধ্যে তাকে নিয়ে আসার জন্য। অথচ দেখা হয়নি। মিথির নিজের ভর্তিপরীক্ষা, পড়াশোনা, কাজকর্ম ফেলে খেয়াল করা হয়নি হিমেল ভাই আশেপাশে কোথাও ছিল কিনা। মিথি তখন বাসায় ফিরছিল। রিক্সা থেকে নেমে বাসার উদ্দেশ্যে যেতেই চোখে পড়ল কিছুটা দূরে দোকানটায় আয়মান আর হিমেল বসা। হাতে চায়ের কাপ।দুইজনেই কথা বলতে বলতে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। পাশাপাশি আরো কয়েকটা ছেলেপেলেও ওখানে ছিল। মিথির এতগুলো ছেলেপেলের মাঝে চা দোকানটায় যেতে মন না চাইলেও পরমুহুর্তেই মনে হলো হিমেলকে এখানেই ধন্যবাদটা দিয়ে দেওয়া উচিত। আর যায় হোক মানুষের উপকার স্বীকার করতে ও কার্পন্য করে না৷ ও পা বাড়াল। কয়েক পা বাড়িয়েই ডেকে উঠল,

“ হিমেল ভাই। ”
মুহুর্তেই চা দোকানে উপস্থিত প্রায় প্রত্যেকটা ছেলের চোখই এদিকে এল। হিমেল ও তাকাল। মিথি বোধহয় অপ্রস্তুত হলো এভাবে সবাই তাকানোতে। ওড়নাটা দিয়ে ভালো করে শরীর ডাকা থাকা থাকলেও ও ব্যস্ত হলো ওড়না ঠিক করতে। হিমেল প্রথমে স্বাভাবিক ভাবে চাইলেও এবার নজরটা তীক্ষ্ণ হলো কেমন। একনজর চায়ের দোকানে উপস্থিত সেই ছেলেগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকাতেই একজন বিদ্ঘুটে হাসল। শুধাল,
“ ভাই, ভাবী নাকি এটা? মানাবে। সুন্দর আছে। ”
আরেকজন পাশ থেকে হেসে বলল,
“ ভাই বোধহয় বিয়ে ও করে ফেলেছে চুপিচুপি।”
আগের দুইজন ছেলের মিথির উপর নজর ভদ্রতাময় হলেও শেষের ছেলেটা মিথিকে প্রায় পা থেকে মাথা অব্দিই স্ক্যান করে ফেলেছে। নজরও খুব একটা সুবিধার নয়। অতঃপর ঐ নজরেই মিথিকে দেখতে নিয়ে সে শুধাল,
“ ভাই একধাপ এগিয়ে গেছেন জীবনে। ভাবী তো প্রেগন্যান্ট মনে হচ্ছে। ”
হিমেলের মেজাজটা বোধহয় খারাপ লাগল। আগের দুইজন হাসি তামাশা করে কথাগুলো বলেছিল ঠিক, তবে শেষের জনের কথা এবং নজর দুটোই ওর রাগ জম্মানোর জন্য যথেষ্ট। বিরক্ত হলো ও। মিথিকে কে বলেছিল এতগুলো ছেলের মাঝখানে আসতে? এসেছেই বা কেন? হিমেল দাঁতে দাঁতে চাপে। ছেলেগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ চাহনি ফেলে কিছু একটা বিড়বিড় করল। অতঃপর শেষের কথাটা বলা ছেলেটার দিকে এগোল। পিঠে একটা শক্তপোক্ত চাপড় বসিয়ে শুধাল,

“ ভাই,তোর চোখের প্রতি তো আমার নজর রাখতে হবে দেখছি। চোখ কি শুধু মেয়েদের শরীর দেখার জন্যই রাখিস নাকি?”
এইটুকু মুখে হাসি রেখে শুধালেও শেষের দিকে হিমশীতল গলায় বলল,
“ চোখ নামা সাব্বির। নয়তো দ্বিতীয়বার কোন মেয়ে প্র্যাগন্যান্ট, কোন প্র্যাগনেন্ট নয় এসব দেখার জন্য চোখ থাকবে না আর। ”
হিমেলের কন্ঠটা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতেই চোখ নামাল ছেলেটা। সাব্বির হিমেলের থেকে জুনিয়র। হিমেলের ধমক শুনে চোখ নামালেও অপ্রস্তুত ভাব কাঁটাতে সে দাঁত জোড়া মেলে হেসে বলার চেষ্টা করল,
“ আরেহ ভাই মজাই করছি। আর দেবর হিসেবে তো ভাবীর দিকে এইটুকু তাকানো যায়। আপনি বললে তাও তাকাব না যান। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল। শান্ত ভঙ্গিতেই তাকাল সাব্বিরের দিকে।অতঃপর হেসে বলল,
“ আমিও মজাই করেছি। ”
এইটুকু বলেই ঘাড় চাপড়াল ছেলেটার। ফের শীতল স্বরে শুধাল,
“ মেয়েদের প্রথমে মেয়ে হিসেবেই রেসপ্যাক্ট করতে শিখতে হয় সাব্বির। তুই বরং আগামীকাল আমার সাথে দেখা করিস। সময় নিয়ে ভাবীর নজরে কিভাবে তাকায়,বোনের নজরে কিভাবে তাকায়,মায়ের নজরে কিভাবে তাকায় সব শিখিয়ে দিব তোকে। ”

এইটুকু বলেই হিমেল পা বাড়াল।আয়মানও উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গেই। যেতে যেতে বলে গেল,
“ তোরা আসলে মানুষ হইলি না। হিমেলরে দেখে কি লাগে তোদের বিবাহিত? ছাগল কোথাকার। ”
হিমেল ততক্ষনে গিয়ে দাঁড়াল মিথির সামনেই। নজরটা তখনও তীক্ষ্ণ। পকেটে হাত গুঁজে নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে হিমের প্রথমেই শুধাল,
“ কি সমস্যা?”
মিথি এই প্রশ্নেও অপ্রস্তুত হলো বোধহয়৷ এসেছিল ধন্যবাদ জানাতে। অথচ ঐ ধন্যবাদের প্রসঙ্গটা মাথা থেকে ছুটে গেল। হিমেলের কথায় ও রাগ রাগ ভাব স্পষ্ট। মিথি উত্তর করল,
“ কিছু না।”
“ তো এখানে কেন এসেছিলি? ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। কিছুটা সময় চুপ হুট করে ধন্যবাদ জানানোর বিষয়টা সাজিয়ে নিল মনে মনে। শুধাল,
“ ধন্যবাদ জানানোর জন্য এসেছিলাম হিমেল ভাই।আপনি বিরক্ত হবেন জানলে আসতাম না। দুঃখিত। ”
হিমেল এবারেও গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞেস করল,

“ কিসের জন্য ধন্যবাদ? ”
“ সেদিন এত ঝামেলার মধ্যেও আমায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য।আমি সত্যিই সেদিন ভয় পেয়েছিলাম এতসব ঝামেলা চোখের সামনে দেখে। এত মানুষের শোরগোলে কি করব নিজেই বুঝে উঠছিলাম না। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ এটাতে ধন্যবাদ জানিয়ে কি মহান সাজছিস নাকি? তোর জায়গায় যে কেউ থাকলেই করতাম এটা।”
মিথি জানে, যে কেউ থাকলে করত। হিমেল ভাইকে ও ছোট থেকেই দেখে এসেছে। তাই বলল,
“ জানি আমার জায়গায় যে কেউ থাকলেই করতেন। তবুও ধন্যবাদটা আপনার প্রাপ্য তাই। না জানালে আমার খারাপ লাগত। ”
হিমেল শান্ত চাহনিতে তাকাল। ছোট করে জানাল,
“ ওহ। ”

মিথি মাথা নাড়াল৷ ওর জায়গায় যে কেউ থাকলেই হিমেল এমনটা করত এই স্বাভাবিক চিন্তাটা তার মাথায় থাকলেও সে বোধহয় ভাবে নি ওখানে জড়োসড়ো হয়ে তার সাথে আরও অনেক লোকও দাঁড়িয়ে ছিল। আরও অনেক মেয়েও দাঁড়িয়ে ছিল। হিমেল ওদের সাহায্য করে নি। করেছে ওকে। ছুটে গিয়েছিল ওর জন্য। বোকা মিথি এটা বুঝবে না। অবশ্য হিমেলের গম্ভীরতা, এবং কথাবার্তা তা বুঝতেও দিবে না। অন্যদিকে আয়মান ভ্রু কুঁচকায়। এতক্ষন চুপ থাকলেও এবারে বলে,
“ কিন্তু এতোটা সময় কোন ঝামেলা নিয়ে কথা হচ্ছে সেটাই বুঝলাম না মিথি।কোন ঝামেলা? ”
উত্তর এল,
“ কয়েকদিন আগে রাস্তায় কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল ভাইয়া। সম্ভবত রাজনীতি সংক্রান্ত ঝামেলা। হিমেল ভাই ও সম্ভবত ওখান দিয়ে যাচ্ছিল। ”
আয়মান সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়াল। মনে পড়ল কয়েকদিন আগের ঝামেলার কথা। কিন্তু হিমেল তো তখন বাসার সামনে ছিল। ওকে কল করেছিল। ফেরার পর বলেছিল কিছুটা সামনে গিয়েছিল। ও ভ্রু কুঁচকে একবার হিমেলের দিকে তাকায়। পরমুহুর্তে মিথির দিকে চেয়ে শুধায়,
“ ওহ ওহ। আমিও ছিলাম জ্যামে আটকে।তো তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে মিথি? ফিজার কাছে শুনেছিলাম তোমার আর হিয়ার পরীক্ষা নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। ”

“ মোটামুটি ভাইয়া। ”
আয়মান ফের প্রশ্ন ছুড়ে,
“ সব ইউনিটে দিয়েছো? ”
“ না না, হিয়া সব ইউনিটে দিয়েছে অবশ্য।”
“ ওহ। আচ্ছা ভালো কিছুই হবে আশা রাখি। ”
হিমেল এতক্ষন চুপ ছিল। এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা এবারে কেমন বিচ্ছিরি ঠেকল ফের চা দোকানটায় তাকিয়ে। জুনিয়র গুলো আলোচনা করছে বোধহয়। আয়মানকে জিজ্ঞেস করে ও,
“ আর কিছু বলবি? নয়তো পা চালা। দেরি হচ্ছে আমার। ”
এইটুকু বলে মিথিকে রেখেই পা চালাতে লাগল। মিথি বোকার মতো হিমেলের যাওয়ার দিকে তাকাল। ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল ও। অথচ এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছে।হিমেল ভাই সবসময়ই তার প্রতি কেমন বিরক্তি দেখায়।এই বিরক্তির কারণটাই আজ পর্যন্ত বুঝতে পারল না মিথি৷ হিমেল কয়েক পা বাড়িয়ে ফের ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল মিথির দিকে। ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,

“ তুই কি এখানে দাঁড়িয়েই থাকবি মিথি ? ধন্যবাদ জানানো শেষ তো তোর? ”
“ হ্যাঁ, শেষ। ”
ফের ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল হিমেল,
“ তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন কি? ”
“ যাচ্ছি। ”
মিথি পা এগোল। যাওয়ার সময় আয়মান বলল,
“ সাবধানে যেও মিথি। ”
মিথি কিছুটা এগোতেই এবার আয়মান সুযোগ ফেল। হিমেলের দিকে চেয়েই বলে উঠল,
“ তুই না ওই দিন একটু সামনেই গিয়েছিলি কেবল? ”
হিমেল বুঝেও না বুঝার মতো বলল,
“ কোনদিন? ”
“ যেদিন ঝামেলা হলো রাস্তায়। ফিরে আমাকে সামনে গিয়েছিলি বলেছিলি। স্পষ্ট মনে আছে আমার। ”
হিমেল পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ায়। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মানুষের ন্যায় দাঁড়িয়ে সুকৌশলে আয়মানকে অতটুকুতেই থামিয়ে দিতে বলল,
“ তো হসপিটালের দিকের রাস্তাটা কি সামনে নয়? নাকি পেছনে?”
আয়মান বেচারা আর কি বলবে খুঁজে পেল না। হতাশ, ও হতাশ। হিমেলটাকে তার আসলেই চালাক চালাক লাগে।

কাঁটল আরো কয়েকমাস। সময়ের গতি সময় এগিয়ে যাচ্ছি। মুহুর সাথে আদ্রর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে অনেকটাই। আবার দুইজনে মিটিয়েও নেয় ঝামেলা গুলো। মুহুর সাথে আদ্রর সম্পর্কটা আজকের দিনেই শুরু হয়েছিল। একটা সুন্দর মুহুর্তে, সুন্দর দিনে আদ্র রূপবতী এক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল। মনের মধ্যে তখন তুলোর মতো কোমল অনুভূতির বিচরণ কেবল৷ মেয়েটাকে দেখলেই ওর হৃদয়ে একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতির জ্বালাপোড়ন। আদ্র চোখ বুঝে। ঠিক আজকের দিনেই ও মুহুর সাথে ওর পথচলা শুরু হয়েছিল। অথচ এত বছর পর আদ্রর মনে ঐ তুলো তুলো অনুভূতিটা আর নেই যেন। আজকাল মুহুকে নিয়ে কেবল সন্দেহই কাজ করে মনে। কোথাও গিয়ে মনে হয় মুহু ঠকাচ্ছে, বিশ্রীভাবে ঠকাচ্ছে তাকে। আবার কোথাও মনে হয় এসব শুধুই তার মনের ভুল। মুহু এখনও তাকে আগের মতোই ভালোবাসে। আদ্র ছোটশ্বাস ফেলে। সবকিছু ভেবে নিজের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়ন ভুলে ও আজকের দিনটা সুন্দর করতে চাইল। মুহুর সাথে ঝামেলা হয় প্রায় প্রতিদিনই, আবার মুহুই মিটিয়ে নেয় এটা ওটা বলে। আদ্রর মস্তিষ্ক কখনো তা বিশ্বাস করে, কখনো বা করে না।

আদ্র মনে মনে দিনটা সুন্দর করারই প্রস্তুতি নিল। মুহুকে বিয়ের প্রোপোজাল দিবে খুব সুন্দরভাবেই। এখন মিথিও নেই। তার জীবনে খুব একটা সমস্যাও নেই। আদ্র মুহুর বাসাতে পৌঁছাল প্রায় রাত দশটায়। অথচ মুহু নেই তখনও। এমনকি আজকের দিনটা নিয়ে মুহুর সাথে কথা বলে মুহুর মধ্যে কোন প্ল্যানও দেখা গেল না। অথচ অন্য বার হলে আদ্রর থেকর মুহুই বেশি আবেগপ্রবন থাকে। আদ্র পুরো রুমে মোমবাতি দিয়ে সাঁজাল। মাঝখানে একটা কেক রাখল।রুমের আলো নিভার। অতঃপর মোমবাতি গুলোই জ্বালানো রাখল।আদ্রর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুহু ফিরল প্রায় রাত দেড়টায়। বাসায় ফিরেই সর্বপ্রথম রুমে মোমবাতি দেখে ও ভ্রু কুঁচকাল। দুয়েক পা বাড়িয়ে রুমের আলো জ্বালাল ও।সোফায় আদ্রকে বসে থাকতে দেখা গেল৷ মুহু ছোট ছোট চোখে তাকাল। মুহু ঠিক সময়ে ফিরলে হয়তো আদ্র এতক্ষনে মুহুকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরত পেছন থেকে। কিছুটা কোমল অনুভূতি আর প্রেম প্রেম স্পর্শ নিয়ে চুমু আঁকত মুহুর ঘাড়ে। তার কিছুই হলো না মুহুকে রাত দেড়টায় বাসায় ফিরতে দেখে।আদ্র হাতের সিগারেটটা ফেলল। কিছুটা সময় থম মেরে বসে রইল। মুহুই এসে জিজ্ঞেস করল,

“ আদ্র তুমি? মিস করছিলাম তোমায় খুব। দুইদিন হলো দেখা করোনি আদ্র।”
মুহু এতোটা যত্ন করে কথা গুলো বলল যেন সে সত্যিই আদ্রকে চোখে হারাচ্ছিল। আদ্রও হয়তো এই নরম নরম কথায় গলে যেত। কিন্তু আজ গলতে মন চাইল না ওর আর। শক্ত গলায় শুধাল,
“ কোথায় ছিলে এতক্ষন? আজও কি অফিসের দরকারি মিটিং ছিল? ”
মুহু ঘাবড়াল কিছুটা। ও এতোটা সময় এহসানের সাথেই ছিল। এমনকি বাসায় পৌঁছেও দিয়ে গেল এহসানই৷ মুহু বড়লোকি কায়দায় বড় হয়েছে ছোট থেকেই। মা বাবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর ও নিজের মতো জীবন কাঁটিয়েছে।বংশানুক্রমে পাওয়া সম্পত্তি, বিজন্যাসে সবকিছুতে ওর অধিকার থাকায় ওর খুব একটা কষ্ট হয়নি কোনকিছুতেই।এবং সে সফলও সবকিছুতে। ওর কাছে এত রাত বিরাতে বাসায় ফেরাটা ম্যাটার করে না। তবে আদ্রর কাছে করে। ও স্পষ্ট দেখেছে একটা গাড়ি মুহুকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। ভুল না হলে ওটা এহসান। আদ্র আবারও রেগে বলল,

“মুহু? সমস্যা কি তোমার? উত্তর দিচ্ছো না কেন? কেন নামিয়ে দিয়ে গেল তোমায়?”
মুহু এতোটা সময় ভালোই কাঁটিয়েছে। মন ফুরফুরে ছিল। অথচ বাসায় ফিরে আদ্রর এই ঝামেলায় ওর স্রেফ বিরক্ত লাগল। এবারে মিথ্যে ভালোবাসা না দেখিয়ে বিরক্ত গলাতেই বলল,
“তোমার সমস্যা কি আদ্র? প্রতিনিয়ত এসব ঝামেলা আর ভালো লাগছে না আমার। ”
আদ্র ভ্রু বাঁকাল। জানাল,
“ কেমন ঝামেলা? ”
“ তুমি অতিরিক্ত সন্দেহ করছো। আমায় কন্ট্রোলে রাখার চেষ্টা করছো আদ্র। আমি যেভাবে থাকতে ওভাবে মেনে নিতে পারলেই সম্পর্কটা কন্টিনিউ করো। অন্যথায় ছেড়ে দাও আমায়। আমি এসব ঝামেলা সহ্য করতে পারছি না। ”
এতগুলা কথা বলতে বলতেই মুহু রেগে নিজের রুমে যেতে নিচ্ছিল। আদ্র ঠিক তখনই ওর গলার দিকে ঘাড় নজরে তাকাল। কিছুটা সময় মনোযোগ দিয়ে তাকিয়েই ও মুহুর হাতটা চেপে ধরল। বলল,

“ মুহু। স্টপ। ”
মুহু থামল। আদ্রর চাহনি লক্ষ্য করে সঙ্গে সঙ্গেই গলায় কি হয়েছে ভাবতে লাগল। আদ্র দেখল আরো এগিয়ে। লালচে দাগ। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ওটা কামড়! ভদ্রভাবে আধুনিক ভাষায় বললে লাভবাইট। আদ্র হাত এগোতে নিল। পরমুহুর্তেই ঘৃণায় হাত সরিয়ে নিল। কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করতে নিল,
“ ও ওটা কিসের দাগ..”
পুরো বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই মুহু গলায় হাত দিল। মনে পড়ল একটু আগে এহসানের কথা। ও থতমত খেল যেন। আদ্র আবারও বলল,
” ওটা কি ছিল মুহু? আন্সার মি। ”
আদ্রর চোখ লাল হয়ে উঠে। এই প্রথম বোধহয় ও ঠকে যাওয়ার অনুভূতি টের পেল। এতদিন মুহুর প্রতি তীব্র সন্দেহ থাকলেও আজকের অনুভূতিটা ভিন্ন। ওর যন্ত্রনা হচ্ছে৷চোখ এতটাই লাল হয়ে এসেছে যে চোখ ফেটে যেন পানি পড়বে। আদ্র আবারও ধরা গলায় বলল,

“ আমি স্পষ্ট দেখেছি মুহু। হাত সরাও, হাত সরাও মুহু। ”
মুহৃ উত্তর করতে পারে না। ধরে পড়ে যাওয়া চোরের ন্যায় ও কি বলবে তা খুঁজতে থাকে। মাথাশূণ্য লাগছে ওর। অপর দিকে আদ্র আহত শেরের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। ভঙ্গুর লাগছে ওর নিজেকে। ও ভেবেছিল আজ মুহুকে বিয়ের প্রোপোজাল দিবে আবারও। এতোটা প্রেম নিয়ে বলবে যে মুহু কিছুতেই না করতে পারবে না। অথচ হলো কি? আদ্র আবারও মুহুকে ঝাঁকিয়ে বলে,
“ কি এটা? বলো কি এটা মুহু। ”
মুহু থতমত খেয়ে কোন ভাবে কাঁপা গলায় বলল,
“ এ ্ এল্ এলার্জি আদ্র। ”

আদ্র তাচ্ছিল্য নিয়ে হাসল। ভালো করে তাকাতেই দেখা গেল মুহুর গলার নিচে জামার দিকেও একইভাবে দাগ বসে আছে। ওর রাগ লাগছে। জেদ লাগছে। ঠিক একইভাবে কান্নাও পাচ্ছে। মুহুকে ধরতেও ঘৃণা হচ্ছে কেন জানি না ওর এই মুহুর্তেই। রাগে জেদ আহত হয়ে আদ্র প্রথমেই সশব্দে চড় বসাল মুহুর গালে। বলল
“ আমি ছোট? ছোটবাচ্চ আমি? কি এটা তা আমি বুঝব না?আমার সাথে এতদিন থাকার পর ও আমি তোর এলার্জির প্রবলেম কোনদিন দেখলাম না। অথচ এখন তোর এলার্জির প্রবলেম হয়ে গেল? ”
এইটুকু বলেই আরো একটা চড় বসাল ও মুহুর গালে। মুহু এবারে কেঁদে ফেলল চড়ের আঘাত সহ্য করতে না পেরে। ঠোঁটের কিনারায় কেঁটে গিয়েছে। ও কাঁদতে কাঁদতেই পিছিয়ে গিয়ে বলল

” আদ্র, থামো। পা থামাও আদ্র। ”
আদ্র ফের আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
” বলেছিলাম না আমায় না ঠকাতে? বলেছিলাম কিনা?কেন ঠকালি? কি অভাব ছিল আমার? কি অভাব ছিল বল? ”
ফের আবারও হাত তুলতে নিতে মুহু সরে গেল। কোনভাবে বলল,
“আদ্র, তুমি গায়ে হাত তুলছো। ”
আদ্র রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতে একটা ফুলদানি নিয়ে ছুড়ে ফেলল মুহুর পাশেই। মেয়েটা কেঁপে উঠল ভয়ে। আদ্র চেঁচিয়ে বলল,
“ আমার ইচ্ছে হচ্ছে তোকে মেরে ফেলি গলা টিপে। তোকে, তোকে আমি ভালোবাসতাম মুহু। পাগলের মতো ভালোবাসতাম। তোর জন্য আমি আম্মুকে কষ্ট দিয়েছি, আব্বুকে কষ্ট দিয়েছি। মিথিকে, মিথিকে অব্দি দিনের পর দিন কষ্ট দিয়েছি। আমার, আমার নিজের বাচ্চা অব্দি রাখতে চাইনি তোর জন্য আমি। শুধু তুই ছেড়ে যাবি ভেবে। অথচ হলো ফলাফল? তুই তো ঠকালিই আমাকে। ছেড়ে গেলি আমাকে। ”
মুহু তবুও ক্লান্ত স্বরে বলার চেষ্টা করছিল,
“ আদ্…”
“ চুপ, একদম চুপ। তুই ঐ এহসানের সাথে..।আমায় দিয়ে পোষাচ্ছিল না তোর? একজনে হচ্ছিল না? তুই, তুই এতোটা নিষ্ঠুর।জা’নোয়ার! ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৩

আদ্র সেই রাতে বাড়ি ফিরল না। তবে সকালে ওকে বাড়ি ফিরতে দেখা গেল মদ্যপ অবস্থায়। আদ্রর মায়ের শরীরটা বেশ কয়েকদিন যাবৎই খারাপ। অসুস্থ লাগছিল। তার উপর বাড়ির বর্তমান চিত্র নিয়েও মনক্ষুন্ন। আদ্রর মা খুব সকালেই ছেলেকে এইভাবে মদ্যপ অবস্থ্য় দেখে ভ্রু কুঁচকাল। ছেলেকে ধমকে কিছু বলার আগেই আদ্র আচমকাই মাকে জড়িয়ে ধরল। অতঃপর বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠল ও। মদ্যপ থাকা অবস্থাতেই নিজের হুশজ্ঞান ভুলে ও মাকে অভিযোগ করল,
“ আমি ঠকে গেছি আম্মু। আমি ঠকে গেছি। আমার জীবনে আমি বিশ্রীভাবে ঠকে গেলাম আম্মু….”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৫