বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির গর্ভাবস্থার প্রায় আটমাস। আটমাসের ভরাপেটে ওকে গেলগাল মিষ্টিকুমড়োর মতোই লাগছিল। মুখটাও আগের থেকে কিছুটা গোলগাল হয়েছে। সপ্তাহখানেক হলো ও বাসাতেই আছে। এই অবস্থায় আসাযাওয়ায় সমস্যা হয় বলেই হসপিটালের ঐ জবটা ও ছেড়ে দিয়েছে। তাছাড়া উঠানামার সময়েই বিল্ডিং এর কতজন বাঁকা ভাবে তাকায়। হয়তো ওদের মনে প্রশ্ন এটাই যে, পড়ালেখার জন্য মেসে থাকা মেয়েটা প্র্যাগনেন্ট কেন হবে? এই নিয়ে বিল্ডিং এর মানুষজনের কানাঘেষাও কম নয়। মিথি অবশ্য ঐ জবটা ছাড়লেও থেমে নেই। হিয়া আর ও মিলে অনলাইনে একটা ছোটখাটো বিজন্যাস দাঁড় করিয়েছে এই কয়েক মাসে। জামা কাপড় এবং জ্যুয়েলারীর। প্রথম দিকে কিছুটা হতাশ হতে হলেও ধীরে ধীরে বিজন্যাস ঠিকই উন্নতি আসল।
এই যে আজও দুইটা পার্সেল রেডি করল । একটু আগেই ক্যুরিয়ারের রাইডার এসেছে। হিয়া সেগুলো দিতেই নিচে নেমেছে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। আজকাল ওর চলাফেরায় অনেকটাই সমস্যা হয়। একটুতেই হাঁপিয়ে উঠে।অনেক ধীরেই হাঁটাচলা করে। হিয়া বাড়ি চলে যাওয়ার ছিল মাস এক আগেই। এডমিশন টেস্ট শেষ হওয়ার পর আর কোন প্রয়োজন নেই বলেই চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু যায় নি কারণ মিথির এই অবস্থায় ওর পাশে কেউ একজন থাকা উচিত। স্বামী, ভাই-ভাবী কেউই যখন নেই তখন বন্ধু হিসেবে হিয়ার থাকাটা উচিত। হিয়া তো ওদের মতো ভাবে নি, ওদের মতো মনমানসিকতারও নয়। মিথি অবশ্য মনে প্রাণে হিয়ার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।ও মানে যে জীবনে চলার পথে সবাই সবসময় পাশে থাকে না।হিয়া আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে ওর পাশে। তবুও হিয়া, তার বন্ধু সম্পর্কের এই মেয়েটির উপকার ও কোনদিন ভুলতে পারবে না।
হিয়া ঢাবিতে ভর্তি হয়েছে। ঢাবিতে নাম এসেছিল ওর, ভালো সাবজেক্টও পেয়েছে ঢাবিতে। অপরদিকে চবিতে মিথির ভালো সাবজেক্ট এলেও ওর জন্য দূর বলেই ভর্তি হয়নি। জাবিতে নাম এলেও ভালো সাবজেক্ট পায়নি। চবিতে ভর্তি হওয়ার জন্য হিয়ার অনেক জোরাজুরি থাকলেও ভর্তি হয়নি। শেষমেষ নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে ন্যাশনালেই ভর্তি হলো। আর যায় হোক ও বাচ্চা নিয়ে কিভাবে সামলাবে? মিথি তবুও চিন্তায় থাকে।জীবনে এইটুকু পথ যে ও এগোতে পারবে ভাবেইনি। তবুও সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালো করেন। মিথি, হিয়া দুইজনেরই ক্লাস শুরু হয়নি। হলেও কিভাবে ম্যানেজ করবে মিথি চিন্তা করে মাঝেমাঝেই। কিভাবে সামলাবে ও?মিথি ছোট ছোট পা ফেলে এগোয়। বেলকনিতে টুল টেনে বসে। পেটে হাত রেখে কিছুটা সময় নিশ্চুপ থাকে। অনুভব করার চেষ্টা করে তার নিজস্ব সত্ত্বাকে। প্রায় মিনিট দুয়েক পরেই তার পিচ্চি প্রাণটা নড়চড় করে উঠল। মিথি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় নিজের পেটের দিকে।সন্ধ্যা থেকে কিছুটা টানটান হয়ে আছে পেটটা। চিনচিনে ব্যাথা লাগছে।মিথি জামার উপরই টের পায় তার ছোট্ট প্রাণটা নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করছে খুব করে। মিথি হাসে। বিড়বিড় করে বলে,
“ জীবন আমায় কোথায় থেকে কোথায় এনেছে বল তো বিষাদ? বিষাদ? জানিস? এই পৃথিবীতে কেউ বিষাদকে ভালোবাসে না। কেউই তার নিজস্ব জীবনে বিষাদ চায় না। তোর নাম বিষাদ রেখেছি কেন জানিস ছোটু? কারণ তুই আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষাদ।সবচেয়েএএএ! এই কারণেই তোর নাম বিষাদ রেখেছি। তোকে এই পৃথিবীতে আর কেউ না চাইলেও আমি চাই। খুব করে চাই। তুই আমার প্রিয় বিষাদ জানিস? অনেক প্রিয়! ”
পেছন থেকে রিধি শুনছিল এসব। এগিয়ে এসে এবারে মন খারাপ করে বলল,
“ বিষাদ কোন নাম আপুই? তুমি আমার বাচ্চার নাম বিষাদ কেন রাখবে হুহ?”
মিথি তাকাল। হেসে বলল,
“ রিধি, বিষাদ কেন ঠিক নাম নয়? ”
রিধি মুখ ফুলিয়ে শুধাল,
“ জানি না, তবে আমার বাচ্চা ফাচ্চাকে আমি দুঃখ বলে ডাকতে পারব না কিন্তু। ”
মিথি বাইরে তাকায়। নরম গলায় বলে,
“ ও আমার সুখই রিধি। আমার না বলা এক সুখ ও। কিন্তু সুখকে পেতে হলে অনেকগুলো বিষাদ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। বিষাদ ছাড়া সুখ মেলে নাকি? সুখ থেকে বিষাদই বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জীবনে। ”
রিধি নারাজ হয়ে বলল,
“ তোমার এত লজ্যিক দিয়ে কি করব আমি? ও বিষাদ নয় ব্যসসস!”
মিথি হাসে কেবল। অতঃপর অনেকটা সময় বসে থাকল ওভাবে। তারপর মনে হলে ওর পেটে চিনচিনে ব্যাথাটা সত্যিই যাচ্ছে না। এতোটা সময় পরও একটা ব্যাথা ব্যাথা অনুভব ক্রমশই হচ্ছে। মিথি সহ্য করে গেল প্রথম দিকে। কিন্তু কিছুক্ষন পরও যখন একইরকম মনে হলো তখনও ছোটশ্বাস ফেলে। ধীর পায়ে গিয়ে ঘড়িতে সময় দেখে। রাত নয়টা। রাতের শহর তখনও ব্যস্ত হলেও এত রাতে ও কাকে নিয়ে হসপিটালে যাবে? কাকেই বা বলবে কিছু হলে? মিথি হিয়াকেই ডাকল প্রথমে। ফিসফিস করে জানাল ওর পেটটা কিছুটা ব্যাথা করছে। হিয়া হুট করে কিছুই বুঝল না। ওর জন্য এসব প্রথম অভিজ্ঞতা৷মিথির জন্যও প্রথম। হিয়া চিন্তিত হয়ে তাকায়৷ যদি এই পেট ব্যাথাটা সিরিয়াস রকমের হয়? লেভার পেইন হয়? ও চিন্তিত হলেও মিথিকে খুব সুন্দরভাবেই আশ্বাস দিয়ে জানাল,
“ একটু অপেক্ষা কর। দেখছি আমি। ”
হিয়া ওর মাকেই কল দিল সর্বপ্রথম। কোনরকমে জানাল পুরোটা। অতঃপর মায়ের কথা অনুযায়ীই মিথিকে বলে,
“হয়তো নরমাল ব্যাথা মিথি।এইরকমটা হয় নাকি । তবুও বসে থেকে লাভ নেই। হসপিটালে গিয়ে দেখি কেমন? ”
মিথি তবুও বলল,
“ যদি এমনটা হয় তো যাওয়ার প্রয়োজন নেই। হয়তো চলে যাবে হিয়া৷”
“আরেহ বোকা যদি সত্যি সত্যিই সিরিয়াস ব্যাথা হয়? তখন অতো রাতে কিভাবে নিয়ে যাব? এর চেয়ে এখন ভালো নয়।”
মিথি মাথা নাড়াল। হিয়ার যুক্তিতে হার মেনে হিয়ার সাথে যেতে রাজি হলো৷ অতঃপর দুইজনে বেরও হলো একটু সময় পর। কিন্তু নামতেই দেখা হলো বিল্ডিং এর সেই পরিচিত আন্টির সাথে। হিয়া কিছুটা বিরক্তই হলো উনাকে দেখে। এড়িয়ে যেতে চাইলেও উনিই যেচে বললেন,
“ কি হলো? এতরাতে কই যাও দুই বান্ধবী? ”
হিয়া তাকায়। সরাসরি উত্তর দিয়ে বসে,
“ একটু হসপিটালে যাচ্ছি আন্টি।যাবেন?”
“ আমি কেন যাব? আমার কি দরকার লাগছে? ”
“তো জিজ্ঞেস করলেন কেন? ”
ভদ্রমহিলা খুবই কষ্ট পেলের যেন। নারাজ মনে বললেন,
“ এ কি হিয়া তুমি তো দেখছি খুব কথা বলো। তো কি জন্য যাচ্ছো? ”
এবারে হিয়াকে থামিয়ে মিথি নিজেই সামান্য হেসে উত্তর করল,
“ সামান্য পেট ব্যাথা হচ্ছিল আন্টি। এই কারণেই। ”
মহিলা কেমন করে যেন চাইলেন এবারে। অতঃপর আপসোস আর উপহাস উভয়ের মিশ্রনে বললেন,
“ এই অবস্থায় মেয়ে মানুষের স্বামী শ্বশুড় থাকলে তো সুবিধা৷ স্বামী থাকলে তো এই রাত বিরাতে মেয়ে মানুষ হিসেবে বান্ধবীকে নিয়ে ছুটতে হতো না। তোমরা মেয়েমানুষরা যে আজকাল কি মাথায় রাখো কিজানি। ”
মিথি এবারেও হাসল। ভদ্রতা নিয়ে শুধাল,
“ অনেকের স্বামী থাকলেও ওদের একাই বাঁচতে দেখেছি আন্টি। স্বামীকে একাই লড়তে হয় জীবনে। আপনি একটু দু পা এদিক ওদিক ঘুরে দেখবেন শহরটা আন্টি। কত মেয়েই রোজ স্বামী থাকা সত্ত্বেও একা লড়ে যাচ্ছে।”
কথাটা বলেই পা এগোল মিথি। সাথে হিয়াও। ভদ্রমহিলা মিথির শেষের ভদ্রতামূলক বাক্যগুলো শুনে
“ বাড়িওয়ালা কতগুলা বেয়াদব মেয়ে ভাড়া দিয়েছে এখানে। কথাবার্তার কোন ঠিক নাই। ”
আদ্র এই কয়েকদিনের অবস্থা খুবই বেহাল। বাসায় খুব একটা থাকেই না। যতোটা সময় ও বাইরে থাকে বিভিন্ন নেশাদ্রব্যতেই মত্ত থাকে। অতঃপর বাড়ি ফেরে কখনে মদ্যপ অবস্থায়, কখনো হুশজ্ঞান নেই এমন অবস্থাতেই। আদ্রর মা ছেলের এহেন দশায় খুবই চিন্তিত। সাংসারিক জটিলতায় উনি এই প্রথম টের পেলেন তার সংসারটা ভেঙ্গে গেছে বহু আগেই। আদ্রর মা সপ্তাহ খানেক হলো খুব অসুস্থ। সাথে ছেলের চিন্তা এবং স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের অবনতি। আদ্রর মা ছোটশ্বাস ফেলে। ছেলেকে মদ্যপ অবস্থায় বাসায় ফিরতে দেখে অত্যন্ত হতাশ দেখাল তাকে। নিরাশ হয়৷ বলল,
“ আদ্র, তুমি আজও? আজও এই অবস্থায় ফিরেছো? ”
আদ্র বিড়বিড় করছিল কিছু। নিজেই ধ্যানেই রুমে যেতে লাগল। আদ্রর মা শুধু শুনে গেল,
“ চিটার! আমি একটা চিটারকে ভালোবেসেছিলাম। ও আমার সাথে চিট করেছে৷ সাহস কত ওর? ও আমায় চেনে? আদ্রকে চেনে ও? ”
আদ্রর মা জানে না মুহু তাকে সত্যি সত্যিই চিট করেছে কিনা। সত্যি সত্যিই কি হয়েছে যার আদ্রর এই অবনতি।তবে ছোটশ্বাস ফেলে কেবল উনি।
হিমেল আর আয়মান বসেছে চা দোকানটায়। দুইজনের হাতেই প্লাস্টিকের চায়ের কাপ। ধোঁয়া উড়ছে তখনও চা থেকে। আয়মান চুমুক দিল চায়ের কাপ । হিমেল দুয়েকবার চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ফিজাদের বাসার দিকে তাকিয়েছে। তা দেখেই আয়মান হাসল। আয়মানই এতকাল তাকিয়েছে ফিজাকে দেখার জন্য।কাঁধে চাপড় দিয়ে আয়মান শুধাল,
“ কি ব্যাপার দোস্ত? দুয়েকবার বাঁকা চোখে ওদিকে তাকাচ্ছিস। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল। শুধাল,
” কোনদিকে? ”
“ ফিজাদের বেলকনির দিকে। ”
“ তোর মতো ফ্যালফ্যাল করে অলটাইম তাকিয়ে থাকিনি আমি।”
আয়মান বাঁকা চোখে তাকায়। বলল,
“ দোস্ত? আমার থেকে অন্তত কিছু লুকাস না। আমি ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছি। ”
হিমেল ভ্রু নাচায়। বলে,
”কি বুঝে গিয়েছিস তুই? ”
আয়মান এবার চকচকে চাহনিতে তাকায়। ওর এতদিনের ধারণা অবশেষে প্রকাশ করে বলল,
“ মিথি। মিথিই তোর সিক্রেট অনুভূতি রাইট? ”
হিমেল অত্যন্ত বিরক্তি ভঙ্গিতে এবার বলল,
“মিথি কেন আমার সিক্রেট অনুভূতি হবে আয়মান? ”
“এমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেই আমি থেমে যাব না। আমি জানি এটা। খুব কাছ থেকে অনেকদিন যাবৎ লক্ষ্য করেছি। অনেকবার লক্ষ্য করেছি।”
হিমেল ফের ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“ কি লক্ষ্য করেছিস? ”
আয়মান এবার শান্তস্বরেই জানাল,
“ তুই যে মিথিকে চুপচাপ ভালোবেসে নিরব আঘাতে মরে যাচ্ছিস তা। ”
“ আঘাতকে ভালোবাসলে আঘাতেই তো মরতে হয়। ”
আয়মান হুট করেই বন্ধুর দিকে শান্ত চাহনিতে তাকাল। এভাবে আঘাত পেয়ে লাভ কি? হিমেলের নিশ্চয় অনেক সময় আপসোস হয়? কষ্ট হয়? তবুও এই ছেলেটা কখনো কাউকে প্রকাশ করেনি। এটাই তে প্রকাশ করেনি যে সে আধো কাউকে ভালোবাসে। শান্ত স্বরে জানাল,
“ তুই চাইলে সে আঘাতকে সারাতে পারিস। সরে আসতে পারিস। মিথি তো তোকে সে চোখে দেখে না। ”
হিমেল হাসল মৃদু। বলল,
“ সরে আসার প্রসঙ্গ হলে আমি তখনই সরে আসতে পারতাম যখন সে আমাকে নয়, অন্য কাউকে চেয়েছিল। সরে আসার হলে তো সে অন্য কারোর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে জড়িয়ে গেছে শুনেই সরে আসতে পারতাম আমি। কিন্তু তার থেকে সরে আসার প্রসঙ্গ মাথাতেই আনতে পারি নি কখনো। আমি প্রাপ্তির আশা নিয়ে ভালোবাসিনি আয়মান। কিছু ভালোবাসা থাক না একপাক্ষিক, অপ্রকাশিত। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৪
“ তাই বলে এভাবে? জীবনকে আরেকবার সুযোগ দেওয়া যায় না দোস্ত? অন্তত বন্ধু হিসেবে আমি তোর এই অপ্রকাশিত ভালোবাসার লজিক মানতে পারছি না হিমেল। ”
হিমেল আকাশের দিকে তাকাল। ছোটশ্বাস ফেলে হেসে জানাল,
“ দুনিয়ার সবাই পূর্ণতা পায় আয়মান? আমি নাহয় অপূর্ণতা নিয়েই বাঁচলাম। অপূর্ণতা নিয়েই মরলাম। ”
