Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

সপ্তাহখানেক হলো আদ্র একদম স্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল পরিবারের সবার সাথে। বাবার সাথে বিজন্যাসে জয়েন করল। চারদিন হলো সে বাবার সাথে অফিসেও যাচ্ছে। আদ্রর মা মনে মনে খুশিই হলো ছেলের এই পরিবর্তনে। আদ্র অবশ্য মায়ের খুশি দেখে হাসে। মাকে সে ভালোবাসে। ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসে। মুহুর বিষয়ে মায়ের সাথে অনেক রাগ অভিমান হয়েছে এটা যেমন ঠিক তেমনই রাগ অভিমান হলেও মায়ের প্রতি ভালোবাসা কমেনি এটাও ঠিক। আদ্র রাতে বাসায় ফিরে কফি নিল, মায়ের সাথে কথা বলল। অতঃপর নিজের রুমে গেল। চেয়ারে গা এলিয়ে কতোটা চোখ বুঝে থেকে সে তপ্তশ্বাস ফেলল। পকেট থেকে ফোনটা তুলে কিছুক্ষন আগের কল আসা নম্বরটাতেই কল করল। ওপাশ থেকে কল তুলল। অনেকটা সময় পর কেউ বলল,

“ মিস্টার আদ্র? এত রাতে কল দিলেন?দিনকাল ভালো গেল তো? ”
আদ্র কিছুটা সময় চুপ থাকে। এহসানের সাথে তার আজকেই একটা মিটিং হয়েছে। আদ্রদের কোম্পানি থেকেই একটা অফার দেওয়া হয়েছে এহসানের কোম্পানিকে। মূলত অফার তো শুধু আদ্রর চোখে সূচনার ইঙ্গিত। অতঃপর হুট করেই হাসল আদ্র। হেসে ঠোঁট গোল করে বলল,
“ মিস্টার এহসান, আপনার কি অবস্থা তা বলুন। দিনকাল তো আপনার ভালোই যাওয়ার কথা রাইট? ”
মিস্টার এহসান বিনিময়ে হাসলেন। আদ্রকে শুধাল,
“ আপনার কি খারাপ যাচ্ছে নাকি মিস্টার আদ্র? ”
আদ্র আপসোস করে হেসে উঠল। জানাল,
“ খুব খারাপ। আপনি মহাশয় তো আমার লাইফটাই লস করে দিলেন।”
“ বিজন্যাসম্যানদের শুধু বিজন্যাসে লস হওয়াকেই গুরুত্ব দিতে হয় মিস্টার আদ্র। বাকি সব লস তো বিজন্যাস লসের কাছে পানিভাত। ”
আদ্র মাথা দুলাল।ফোনটা কানে চেপে এক হাতে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিল। হেসে বলল,

“নতুন তো তাই এখনো পাকাপোক্ত হইনি।আপনি দেখছি খুব ভালো মানের বিজন্যাসম্যান। আশা করি আমি তার থেকে দশগুণ ভালো বিজন্যাসম্যান হয়ে যাব খুব অল্প সময়েই। ”
“ আমার চাইতে দশগুণ ভালো?”
আদ্র ভ্রু বাঁকিয়ে শুধাল,
” দশগুণ ভালো হওয়া বেটার না? অন্তত আপনার মতো নতুন এসেই শিকার ছিনিয়ে নেওয়ার দক্ষতা তো আমার নেই। আপসোস!”

আদ্রর আম্মু জানালার পাশেই বসা। চোখ টলমলে। আকাশপানে চেয়ে উনি হিসাব কষলেন উনার এই জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি। সেই অনেক কাল আগে পরিবার, আপনজন সব ছেড়ে ভালোবাসার জন্য ছুটে আসা। বিয়ে করা৷ অতঃপর একটা পুরুষের যত্নে, ভালোবাসায় এতগুলো বছর পার করা। অতঃপর? অতঃপর যে পুরুষের ভালোবাসায় সে এতগুলো বছর কাটাল, একটা সংসার সাজাল হুট করেই সেই পুরুষের ভালোবাসায় তার সন্দেহ জাগল। হুট করেই মনে হলো এই সম্পূর্ণ জীবনের প্রাপ্তি শূণ্য। কেবলই শূণ্য ! আদ্রর মা ছোটশ্বাস ফেলেন। ততক্ষনে ঘরে আদ্র এসেছে। একবার ছোট ছোট চোখ করে ঘরে তাকাল সে। একপাশে একটা ফুলদানি ভেঙ্গে গুড়িয়ে আছে। অপর পাশে আলমারির সব কাপড় ছুড়ে রাখা৷ আদ্র মায়ের পাশে গেল। ডাক দিল,

“ আম্মু? ”
আদ্রর মা শুনল। তৎক্ষনাৎ ছেলের ডাক শুনে ফিরল ও। অস্ফুট স্বরে জানাল,
“ হু? ”
আদ্র তাকাল। মায়ের কপালে খুব সূক্ষ্য এক আঘাতের চিহ্ণ। তবে রক্ত পড়ছে। বয়ে এসে তা ভ্রু তে যোগ দিয়েছে। আদ্র মুহুর্তেই বলল,
” তোমার কপালে আঘাত কেন আম্মু?”
আদ্রর মা মুহুর্তেই কপালে হাত রাখলেন। এপাশ ওপাশ হাঁতড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ো বলল,
”হু? কোথায়? ”
আদ্র হাত বাড়াল। মায়ের কপালের রক্তটা আঙ্গুলে ছুঁয়ে শুধায়,
“ রক্ত….”
আদ্রর মা এবারে আর কথা খুঁজে পেল না। একদম চুপ হয়ে থাকল। আদ্র হুট করেই ফ্যালফ্যাল করে চাইল। জিজ্ঞেস করল,

“ তোমার কি আব্বুর সাথে ঝামেলা হয়েছে আম্মু? ”
আদ্রর মায়ের এবার যেন কান্না পেয়ে গেল। আটকানো যায় না এমন কান্না। আমাদের যখনই হৃদয় ভেঙ্গে আসে ঠিক তখনই আশ্রয় পাওয়ার মতো একজোড়া হাত হলেই আমরা লোভী হয়ে উঠি। নিজের বয়স, পরিপক্বতা সব ভুলে আমরা ঐ আশ্রয়ে নরম মনটাকে প্রকাশ করেই ফেলি। আর তার দরুণই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অবাধ্য নোনাজল। আদ্রর মায়ের চোখেও পানি গড়াল। তবুও উত্তর করল,
“ নাহ। ”
আদ্র ছোটশ্বাস ফেলল। দরজার দিকে একবার চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
” আব্বু কোথায়? ”
“ বাইরে। বাইরে গেল আদ্র। কেন? তেমার কি কিছু প্রয়োজন? ”
আদ্র মায়ের কথা শুনে হাসে। ও ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে তারা মা-বাবা দুইজনই দুইজনকে অসম্ভব ভালোবাসে। অসম্ভব! তার বাবা যেমন তার মায়ের যত্ন করে দিনরাত্রি, ঠিক তেমনই তার মাও যত্ন করে। সে এই দুইজনকে দেখেই পার্ফেক্ট কাপল সম্বোধনটার অর্থ বুঝেছে।তাই হাসল ও। এরকম ঝগড়া ওর মা বাবা কত করেছে। আবার সকাল হলেই মিটে গিয়েছে। সকাল হলেই দেখা যাবে একজন আরেকজনকে ছাড়া কিছুই বুঝছে না। আদ্র হাসে। মাকে জিজ্ঞেস করে,

“ না, তোমরা কি নিয়ে ঝামেলা করলে? ”
“ কিছু নিয়ে নয়।”
আদ্র ভাবল প্রতিবারের ঝগড়ার মতো এই ঝগড়াটাও খুবই সামান্য কারণেই।খুবই সামান্য ঝগড়া। তাই অতো গুরুত্ব না দিয়ে মায়ের কপালে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে বলল,
“থাক বলা লাগবে না। আব্বু কোথায় গিয়েছে আমি বরং দেখি আসছি হু? ”
“ না।তুমি যাবে না আদ্র। ”
“ কেন? ”
আদ্রর মা এবারে অনেকটা কঠিন স্বরেই বলল,
“ আমি নিষেধ করেছি তাই। মা বাবার ভেতর তুমি কেন ডুকছো? বড় হয়েছো না তুমি? ”
” ওকে, ওকে। তোমার কপালটা কতটুকু কাটল। আমি শিওর তুমি নিজেই নিজের কপালের এই হাল করেছো তাই না আম্মু?ব্যাথা লাগছে নিশ্চয়? ”
আদ্র মা হাসল কেমন। ছেলের দিকে চেয়ে হুট করে হেসে বলল,

” মায়ের ব্যাথাটা যেমন তোমার কাছে ব্যাথা বলে মনে হচ্ছে না আদ্র? ঠিক সেভাবেই তোমার ঘরে থাকা মেয়েটার ব্যাথাও যদি তুমি ব্যাথা বলে মেনে নিতে তাহলে আজ তোমার আম্মু এই ব্যাথাটা পেতই না হয়তো। কথায় বলে না, মা বাবার পাপের ফল সন্তানরা পায়? আমি বলছি, কিছুক্ষেত্রে বোধহয় সন্তানদের করা পাপের অভিশাপ মা-বাবাদের উপর ও পড়ে।”
আদ্র বুঝল পুরো কথাটার অর্থ। প্রশ্ন করল,
“ হু? কি বললে আম্মু? সন্তানদের করা পাপের অভিশাপ মা বাবও পায় মানে? ”
” আম্মু..”
আদ্রর মা ভঙ্গুর এক মানুষের ন্যায় কেঁদে ফেলল। বলল,
“ আমি আমি বোধহয় তোমার পাপের শাস্তিটাই পেয়ে যাচ্ছি আদ্র। আমার তো এটা প্রাপ্য নয়। আমি তো এমন করিনি কারোর সাথে। আমিই কেন তাহলে? তুমি, তুমি যেমনটা মিথির সাথে করেছো কোনভাবে এর শাস্তি আমার উপর আসেনিতো আদ্র? ”
আদ্র হুট করেই সচেতন চোখে চাইল। ওর চোখ কেমন চকচকে করে উঠে যেন।ও তো মিথিকে মারত এভাবে। তাহলে কি তার আম্মুকেও এভাবে…ও দ্রুতই শুধাল,
“ আব্বু তোমায় মেরেছে আম্মু? ”

মিথির সেদিনকার চিনচিনে পেট ব্যাথাটা খুব সিরিয়াস ব্যাথা না হলেও সপ্তাহখানেক পরই এই মাঝরাত্রিতে এসে ওর আবারও মনে হলো ওর পেট ব্যাথা করছে অল্প অল্প। বরাবরের মতো বাচ্চার নড়চড়ের আভাস পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে যেমন বসে থাকে ঠিক সেভাবেই আজও বসে থাকল ঘন্টাখানেক।পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করর কথা বলছিল। তখন প্রায় রাত তিনটা। হিয়া ঘুমাচ্ছে। ওদিকে হৃদি ও ফিজাও ঘুমাচ্ছে।অতঃপর তার একটু পরই মিথি অনুভব করল ওর পেট টান পড়ে আছে।হালকা ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। মিথি মনে করল কিছু সময় পরই চলে যাবে। ও নিজেই নিজের পেটে হাত রাখে। পেটের চামড়া স্পষ্টই নড়ে। পেটের মাঝ বরাবর থেকে ডান পাশের চামড়াটা ফুলে উঠে। মিথি হাসে। শুধাল,

“ আম্মুর ঘুম হারাম করে কি মজা পান মিষ্টু? যখনই ঘুম ধরে তখনই আপনার হাডুডু খেলা শুরু হয়ে যায় হ্যাঁ? ”
মিথির হেসে বলা কথাটা ওর ছোট্ট প্রাণটা শুনতে পায়নি। তবে ওর নড়াচড়াও থামল না।মিথির মনে হচ্ছে ভেতরে সে আসলেই ফুটবল খেলছে। শুধু ফুটবল এবয় খেলোয়াড়ের অভাব। মিথির হালকা হালকা পেট ব্যাথাটা নিয়েই এসব কার্যকলাপ পরখ করে শুধাল,
“তুই জানিস বিষাদ? আর অল্প কয়েকটা দিন। অল্প কয়েকদিন পরই আমি তোকে ছুঁতে পারব। তোকে দেখতে পারব। তোকে আদর করতে পারব মিষ্টু। তুই আমার আদর। এত্ত এত্ত আদর। ”
ফের পরমুহুর্তেই মিথি মন খারাপ করল। মন খারাপি ভঙ্গিতে পেটের উপর ভেসে উঠা গোল বলের মতো তার ছোট্ট প্রাণের অংশটায় হাত বুলিয়ে সে মিষ্টি হাসল। বলল,

“ মা হতে গেলে অনেক দীর্ঘ অপেক্ষা করতে জানতে হয় মিষ্টু। এই যে রোজ অপেক্ষা করছি, রোজ মনে হচ্ছে তুমি কবে আসবে কবে আসবে। তোমাকে ছোঁয়ার, দেখার,আদর করার এই তীব্র ইচ্ছাকে বহু কষ্টে দমিয়ে রেখেছি প্রাণ। তোমার আম্মু রোজ রোজ তোমার জন্য অনেক অনেক আদর জমিয়ে রাখছে যাতে তুমি আসলেই তোমাকে আদরে ভরপুর করে দিতে পারি। তুমি শীঘ্রই চলে আসো হুহ? আম্মুকে এত অপেক্ষা করিয়ে লাভ কি হচ্ছে বলো?”
মিথির হালকা হালকা পেট ব্যাথাটা কিছুটা সময় পরই যেন একটু বাড়ল। মিথির কেমন হাঁসফাঁস হাসফাঁস লাগল। সারা শরীরে ঘাম দিল। নিঃশ্বাস নিতেও ওর অস্বস্তি হচ্ছে যেন। মিথি ধীর পায়ে উঠে একবার ওয়াশরুমে গিয়ে কয়েক পা হাঁটল। আগেরবার যেমন চিনচিনে ব্যাথা হয়েছিল ভাবল এবারও তেমনই। হয়তো এমনিই ব্যাথা করছে। অথচ ব্যাথার মাত্রা ঘন্টা দেড় পার হওয়ার পর বোধহয় আরো বাড়ল।শত যন্ত্রনাও সহ্য করতে পারা মিথির যেন এই ব্যাথাটা কেন জানি সহ্য হচ্ছিল না। কষ্ট হচ্ছে। মিথি বহু কষ্টেই বসে নিজের পেটে হাত রাখে আবারও। হিয়াকে বলবে বলবে বলেও সহ্য করে থাকার চেষ্টা চালাল। কারণ সবাই ঘুমোচ্চে, এবং এখন রাত। মিথি কিছুটা সময় পর বাচ্চার উপস্থিতি আবারও পেটের চামড়ার উপর দিয়ে বুঝেই ও দাঁতে দাঁত চাপল ব্যাথায়। ব্যাথা ক্রমশ বাড়ছে। সহ্যসীমারই বোধহয় বাইরে পৌঁছাচ্ছে। মিথি কিছুটা জোরে জোরে শ্বাস টেনর বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৫

“ মিষ্টি? তুমি কি আমায় ব্যাথা দিচ্ছো ?তোমার নড়চড়ের জন্যই কি এমন হচ্ছে? কিন্তু অন্যদিন নড়চড় করলে৷ তো একটু ব্যাথা হলেও আমি সহ্য করে নিই মিষ্টি। আজকের ব্যাথাটা… ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৭