বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথির কোলে ছোট্ট ফুটফুটে একটা প্রাণ। একটা ছোট্ট হৃদয়। মিথি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ফুলোফুলো মুখ। গাল গুলো নরম তুলতুলে তুলোর ন্যায়। মিথি তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে গাল ছুঁয়ে দেয়। অতঃপর মুখটা ফ্যালফ্যাল করে দেখে। এতটুকু মুখ! মিথির চোখ ভিজে উঠে। কান্নারা গাল বয়ে যেতে নিতেই ও শুধাল,
“ তুমি জানো? তুমি আমার প্রাণ। আমি আমার জীবনে কোন প্রাপ্তিতে এতোটা খুশি হইনি আম্মু। এতোটা আপ্লুত৷ ও হইনি। আমার জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি তুমি মা। ”
মিথি প্রথমবার মা হয়েছে। প্রথমবারের মা হওয়ার অনুভূতিটা যেমন একটা নতুন অনুভূতি তেমনই অদ্ভুত আনন্দের, শান্তির, সুখের। মিথির জানা নেই সদ্য জম্মানো বাচ্চাকে কিভাবে সে আদর করবে, কিভাবে সেবা করবে। তার পাশে মা-মাসি এমন কোন বয়োজ্যাষ্ঠ ব্যাক্তিও নেই যে তাকে শিখিয়ে দিবে একটা ছোট্ট বাচ্চাকে কিভাবে কি করবে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে তার মায়ের কথা ভেবে। চাপা দুঃখ বুকে চেপে সে শুধাল,
“ আম্মু? তুমি যাওয়ার পর আমার পথটা খুব সুগম ছিল না। খুব ভালোভাবে আমি জীবন কাঁটাইনি তুমি যাওয়ার পর। তবুও দেখো? বিধাতা কতোটা ভালোবাসে আমায়। আমার জন্য, আমার আরেকটা আম্মুকে পাঠিয়েছে আম্মু। আচ্ছা আম্মু? আজ যদি তুমি থাকতে? আজ যদি তুমি বেঁচে থাকতে তাহলে নিশ্চয় নানু হওয়ার সুখে হাসতে আম্মু? ওকে কোলে তুলতে তাই না? অথচ আজ দেখো? আমি একা। খুব একা আম্মু! আমার আশপাশে কেউ নেই। তুমি নেই, আব্বু নেই, ভাইয়াও নেই। আমার প্রাণটার জন্য শুধু আমিই আছি আম্মু। বিধাতা এদিক থেকে বোধহয় আমার সাথে নিষ্ঠুরতায় করল বলো? ”
কথাগুলো বিড়বিড় স্বরে বলেই মিথি চোখ মুঁছল। তোয়ালে তে জড়ানো ছোট্ট মুখটার দিকে বারকয়েক তাকিয়ে বোধগম্য হলো তার বাচ্চাকে খাওয়ানো হয়নি।
মিথির সংকোচ হচ্ছিল এভাবে বাচ্চার জম্মের পর বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে উঠা। হিয়াকে বলেকয়েও লাভ হলো না। ও যা বুঝেছে তাই। মিথির মাঝেমাঝে মনে হয় হিয়া তার বোন। কিংবা বোন থেকেও বেশি। যেখানে মেয়েদের বন্ধুত্বে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিংসা, চাপা শত্রুতা এসব নিয়ে ভরপুর থাকে সেখানে হিয়া তার জন্য নিঃস্বার্থভাবে সবটা ভেবেছে। মিথি বার কয়েক বাসাতেই যেতে বলেছিল। হিয়া শুনে নি। বাইরে গিয়েছে গাড়ি ভাড়া করতে। মিথি ততক্ষনে একজন নতুন অপরিপক্ব মায়ের মতো বাচ্চাকে দুগ্ধপান করায়। অতঃপর হিয়া আসে। বাচ্চাকে ভালো করে তোয়ালে জড়িয়ে কোলে তুলে বলে,
“ আমরা আজ নানুবাড়ি যাচ্ছি সোনা। তুমি নিশ্চয় নানুবাড়ি গিয়ে খুব খুশি হবে হুহ? ”
মিথি হাসে অল্প। একটু পর দীপ্রও আসল। হিয়া ওর হাতে ছোট্ট প্রাণটাকে তুলে দিতে নিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
“ পারবি পাক্কা? দেখিস আবার আমার বাচ্চাটাকে ফেলে টেলে দিবি। ”
দীপ্র ভ্রু কুঁচকে তাকায়। উত্তর করর,
“ তোর মতো গরু আমি যে ফেলে দিব? বাচ্চা সম্পর্কিত জ্ঞান আমার আছে খুব হ্যাঁ? সো কিভাবে কোলে নিতে হয় তাও জানব। ”
হিয়া মুখ ভেঙ্গিয়েই বলল,
“ এসেছে সবজান্তা দীপ্র দ্যা ভন্ড। ”
দীপ্র ততক্ষনে ছোট ছোট চোখে তাকায়৷ বাচ্চাকে ভালো করে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ ওর৷ ভাবভঙ্গিতেই স্পষ্ট যে ও এতটুকু ছোট বাচ্চাকে কিভাবে কোলে নিবে তা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। হিয়া হাসে। বলে,
“ বলেছিলাম না তোর কাজ না এসব। নির্ঘাত তোর হাত গলিয়ে আমার বাচ্চাটা পড়ে যাবে বেআক্কেল! ”
দীপ্র তবুও মানতে নারাজ। বলল,
“ কে বেআক্কেল? ”
” অবশ্যই তুই। কোন না কোন মেয়ের জন্য শুকানোর জন্য যুদ্ধ লাগিয়ে দিস অথচ একটা বাচ্চা কোলে নিতে পারিস না। ছিহ! যা গাড়িতে যা। আমি ওকে কোলে করর আনছি৷ গাড়িতে গিয়ে চুপচাপ কোলে নিয়ে বসে থাকবি। ”
দীপ্র আর কথা বাড়াল না৷ গেল ওখান থেকে চুপচাপ। মিথি ওদের কথা শুনে এতোটা সময় হাসছিল অল্পঅল্প। হিয়া মিথিকে বসতে বলে দীপ্রর সাথে পা বাড়াল। অতঃপর ওখানেই গাড়িতে দীপ্রর কোলে ভালো মতো দিয়ে এসে আবার আসল মিথির কাছে। বলল,
“ তোর তো যেতে কষ্ট হবে মিথি। যেতে পারবি তো হুহ? একটু সহ্য করে নিতে হবে। আমি সাহায্য করব যেতে। ”
মিথি মাথা নাড়াল। হিয়ার কথা শুনে ভরসাও পেল। কে বলেছে রক্তের সম্পর্কের মানুষই কেবল আপন হয়? এই যে হিয়া ওর রক্তের সম্পর্কের নয়। তবুও কতোটা আপন!মিথি সত্যি সত্যিই ভরসা পেল।
আদ্রর মায়ের হাতে দুটো ছবি। একটায় এক হাস্যোজ্জ্বল রমনীর সাথে সমুদ্রের দ্বারে ঘুরতে থাকা এক পুরুষ। অপরটায় একটা রেস্টুরেন্টে দুইজনের ছবি। আদ্রর মা চুপ থাকে। কিয়ৎক্ষন তাকিয়ে থেকে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অতঃপর বিড়বিড় করে শুধাল,
“ এই দীর্ঘ সংসার জীবনে আমার মধ্যে কি কমতি ছিল? কি? কম ভালোবেসেছিলাম আমি? তোমাকে ভালোবেসেই তো পরিবার, মা বাবা সব ছেড়ে এসেছিলাম। সবব! তবুও? তবুও তুমি ঠকালে। এই এতকাল পর এসে আমার বিশ্বাস ভাঙ্গলে। এইযে তোমার এক্সিডেন্ট হলো? বিশ্বাস করো। আমি একটুও বিচলিত হচ্ছি না। আমার তোমার জন্য চিন্তা হচ্ছে না, কান্না পাচ্ছে না। বরং…
বরং আমি মনেপ্রাণে চাই এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তোমার মৃত্যু হোক। মৃত্যু হোক তোমার প্রিয়!”
আদ্র কিছুটা তাড়াহুড়ো নিয়েই হমপিটালে ডুকতে যাচ্ছিল। অতঃপর ঠিক ডুকার সময়ই ওর মনে হলো ও ঠিক কিছু একটা দেখল। পরিচিত কিছু! আদ্রর মস্তিষ্কে এই সংকেত পৌঁছাতেই আদ্র আবারও ঘুরে তাকাল। আবারও সেই পরিচিত দৃশ্যকে অবলোকন করে আদ্রর ভ্রু কুঁচকে আসে সর্বপ্রথম। ও স্থির ভঙ্গিতেই তাকাল এবারে। মিথি? ওটা মিথি? ক্লান্ত, অবসন্ন মুখটা মিথিরই তো। কোন একটা মেয়ের সাহায্য নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। আদ্রর এক মুহুর্তের জন্য বোধহয় মিথির উপর রাগ হলো। ওর সাথে ভাব দেখিয়েছিল এই মেয়ে। ওর সাথে? যে ছেলেকে সমস্ত মেয়ে পাত্তা দেয় তাকে দাম দেখিয়েছে। আদ্র পা বাড়াতে নিল। পা বাড়িয়ে পেছন থেকেই ডাক দিল,
“ মিথি, এই মিথি…. ”
মিথি প্রথমবার শুনতে পেল না। তবে দ্বিতীয়বার শুনে যখন ঘাড় বাকাল তখনই চোখে পড়ল আদ্রকে। ও কপাল কুঁচকায়। আদ্র? আদ্র এখানে কেন? ওর দিকেই বা কেন আসছে হুহ? কিজন্য? আদ্র কোনভাবে জেনে যায়নি তো? কোনভাবে কি আদ্র এখন তার বাচ্চার অংশ চাইতে এসেছে? এইজন্যই এভাবে ছুটে আসছে? মিথির মনে মনে অজানা ভয় ঝেকে ধরলেও উপরে দেখাল দৃঢ় শক্ত এক রূপ। আদ্র যখন সামনে এসে দাঁড়াল ঠিক তখনই রূক্ষ স্বরে বলল,
“ পথ ছাড়ুন, এভাবে পথ আটকে দাঁড়িয়েছেন কেন? ”
আদ্র স্বভাবতই উগ্রমেজাজী। তার উপর কেউ তার সাথে রুডলি কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায়। এখনও তাই হলো। মিথির প্রতি রাগটা আরো বাড়ল। মিথি পুণরায় বিরক্ত নিয় বলল
“ আমায় এভাবে পাব্লিক প্লেসে ডাকছিলেন কেন? ”
আদ্রর কপাল কুঁচকে আসে। হসপিটালে আসার উদ্দেশ্য ভুলে দাঁতে দাঁত চেপে মিথিকে শুধাল,
“ তুই কোথাকার কি হয়ে গিয়েছিস যে তোকে ডাকা যাবে না? দাম দেখাচ্ছিস তুই? তাও আমার সাথে? এই আদ্রর সাথে হুহ? তোর মতো মেয়ের দাম দেখানো মানায় না। ”
আদ্র মানুষটা যে এখনও আগের মতোই রূঢ় আছে তা বুঝতে যেন মিথির এক মুহুর্তও সময় লাগে না। অবশ্য মানুষের বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস, চরিত্র এসব বদলানো কঠিন। খুব কঠিন। সেদিক থেকে আদ্রর আচারণ বদলে যাবে কিংবা আদ্র সুন্দর ব্যবহার করবে এই আশা রাখাটাই তো বৃথা। মিথি কিছুটা বিরক্তই হলো। পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রকে বিরক্তি নিয়েই নিয়েই বলল,
” পথ ছাড়ুন। পথে এসে দাঁড়িয়েছেন কেন? ”
আদ্রর রাগটা আরেকটু বাড়ল। শুধাল,
“ তোর মনে হচ্ছে না তুই একটু অতিরিক্ত সাহস দেখাচ্ছিস মিথি? আমি চাইলে তোকে এখনও জোর করে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারি। তুই নিশ্চয়ই ভুলে যাস নি আমি কতোটা ভালো তাই না? ”
মিথি তাচ্ছিল্য করে হাসল। আদ্রর দিকে চেয়ে উত্তর করল,
” আপনি নিয়ে গেলেই যে আমি যাব তা ভাবলেন কি করে? ”
আদ্র বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানাল,
” কারণ দিনশেষে বাঙালি মেয়েদের ভরসা তাদের স্বামীই। ডিভোর্সী মেয়েদের এই সমাজ দুই পয়সারও দাম দেয় না জানিস তো? কাজেই তোকে তো আমার কাছেই ফিরতে হবে মিথি। আমি তোকে ফিরাইনি, ফিরাব না। কারণ আমার তোর প্রতি কোন টান নেই।তবে আমি জানি তুই ফিরবি। এবং সেদিন তোর কপালে অনেকগুলো দুঃখ থাকবে। ”
হিয়া এতক্ষন চুপচাপ দেখছিল। এবারে আর চুপ থাকল না। কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“ কে ভাই আপনি? ওর সাথে এভাবে কথা বলার সাহস কি করে হলো? ”
আদ্রর হিয়াকে চেনে না, জানে না৷ তবুও এবারে কথায় হিয়াকে টেনেও বলল,
” তো এসব দাম দেখানো কি এর থেকেই শিখছিস তুই মিথি? এই মেয়ে কে? ”
“ ও এই মেয়ে না। ওর একটা নাম আছে। ”
এইটুকু বলেই ফের আবারও ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ আমি আপনার মুখও দেখতে চাই না আদ্র। সরুন, সামনে থেকে সরুন। আমার জন্য আজকের দিনটা খুবই আনন্দের। দয়া করে নষ্ট করবেন না। ”
আদ্রর রাগ হয় এই মেয়ের তেজ দেখে। যে মেয়েটা একসময় ভিজেবিড়াল হয়ে থাকত, যে মেয়েটা তাকে ভয় পেত আজ তার চোখে ওর জন্য ভয় নেই। ওকে ভয় পাচ্ছে না। বরং ঘৃণা করছে। তাচ্ছিল্য দেখাচ্ছে। আদ্র ভেতরে ভেতরেই রাগ ফুসে। আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,
“ আমাকে আব্বুর কাছে যেতে হবে। নয়তো তোকে বুঝাতাম যে আমায় অপমান করার শাস্তি কেমন হয়৷ তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে এই জনসম্মুখে আমি এখনো থাপ্পড় মারিনি মিথি। ”৷
এইটুকু বলেই প্রায় তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে আবার পা বাড়াল। মিথি সেদিকে একবার তাকিয়ে ছোটশ্বাস ফেলল। হিয়া ততক্ষনে বোকার মতোই প্রকাশ করল,
“ কে সে? এত হম্বিতম্বি দেখাল কেন তোর সাথে? এত অধিকার পায় কি করে? ”
মিথি উত্তর করে না। হিয়া আবারও জিজ্ঞেস করল,
“ কি হলো বল। কে? ”
মিথি কিছটা সময় চুপ থাকল। অতঃপর উত্তর করল,
“ আদ্র।”
হিয়া আদ্র নামটা শুনল। অতঃপর রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ ঐ জা’নোয়ার টা? একবার বললি না কেন হুহ? আমি এই পিশা’চকে জুতো দিয়ে মারতাম জানলে। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ২৭
মিথি আর হিয়া দুইজনেই গাড়িতে পৌঁছাল। দীপ্র বেশ সুন্দর করেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোলে তুলে বসে আছে। তবে মুখখানা তার নিরাশ। যেন তার বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। হিয়া তা লক্ষ্য করেই শুধাল,
“ কি হয়েছে? এমন ভোতা মুখ করে বসে আছিস কেন দীপ্র? ”
দীপ্র মুখ তুলে চাইল। বলল,
“কারণ তোদের এই পুচকো আমার কোল ভিজিয়ে দিয়েছে হিয়া। মনে হচ্ছে এই পুচকোও তোর মতোই বাঁধর হবে। মুখটা মিথির মতো হলেও স্বভাব চরিত্রে নির্ঘাত তোর মতো হবে।”
