Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৫

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৫
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

দুপুরের একটু পরপর সত্যিই সত্যিই কাজী সাহেব এবং দুই চারজন মহিলা উপস্থিত হলেন হাসিমুখে। হিমেল তখন মিষ্টিকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। উনারা যে আসবেই তা সে জানত। অতঃপর মিষ্টিকে ঘুম না পাড়িয়েই কোলে নিল। বলল,
“ চলে এসেছেন আন্টিরা? আমার বিয়ে দেখার আপনাদের এত তাড়া? ”
ঐ যে হিমেলের চাচীর পরিচিতা বেশ হাসলেন। বললেন,
“ আসতেই তো হতো। তুমি মিথ্যে বলছো কি সত্য বলছো তা তে জানতে হতো তাই না? তাছাড়া আমি তো ভেবেছি তুমি পালিয়ে যাবে, যাও নি দেখছি।
“ এইটুকু সৎসাহস আমার আছে আন্টি। কিন্তু পালালে বোধহয় আপনি খুব খুশি হতেন, তাই না আন্টি? ”
“ আমার খুশি হওয়ার ও কিছু নেই, অখুশি হওয়ারও কিছু নেই। ”
“ ওহ। ”
এবারে চশমা পরিহিত মহিলাটিই বলল,

“ তুমি মনে কষ্ট নিচ্ছো না তো বাবা? আসলে ভাবী বিশ্বাস করতে চাচ্ছিলেন না, এদিকে আমি শতভাগ নিশ্চিত তোমরা হাজব্যান্ড ওয়াইফ। তো এই নিয়েই চ্যালেঞ্জ নিয়েছি বলা চলে। যদি তোমরা বিশ্বাস না রাখতে তাহলে আমাকেও হারতে হতো ভাবীর কথায়।কিন্তু আমি বুঝলাম যে, আমিই ঠিক। তোমরা মিথ্যে বলোনি।”
হিমেল হাসল। বলল,
“ বিশ্বাস করেছেন জেনে খুশিই হলাম আন্টি। ”
অতঃপর এইটুকু বলেই হিমেল ছোট শ্বাস ফেলল। মিথি যে রুমে আছে সেখানে গিয়ে মিথির দিকে তাকাল। কাছাকাছি গিয়ে ঝুঁকল কিছুটা। কানের কাছে বিড়বিড় করে বলল,
“ আমায় মিথ্যুক প্রমাণিত করবি না তো মিথি? এতগুলো মানুষের সামনে হুট করেই সব বলে দিবি না তো? ”
মিথি আতঙ্ক নিয়ে চাইল। বলল,

“ ওরা সত্যি সত্যিই এসেছে? সত্যিই বিয়ে পড়িয়ে দিবে হিমেল ভাই? ছিহ ছিহ! এই পরিস্থিতি থেকে কিভাবে বাঁচব? ”
“ না বাঁচলে কি হয়? ”
“ অনেককিছু। হিমেল ভাই, আটকান না প্লিজ ঘটনাটা। ”
কথাটা মিথি অনেকটক আকুতি করেই বলল। অথচ হিমেল আজ ঘটনাটার পক্ষেই। বলল,
“ যা হয়, ভালোর জন্যই হয় মিথি। একটাই অনুরোধ, এইযে একটু পর বিয়েটা মেনে নিস। দয়া করে৷ আমার জন্য হলেও। প্লিজ আমার কথাটা মিথ্যে প্রমাণ করিস না। ”
এইটুকু বলেই হিমেল পুনরায় বের হলো। উনাদের কিছু একটা বলে ছোট নিঃশ্বাস ফেলল। অতঃপর তারা সহ মিথির সামনে হাজির হলো। মিথি শুধু শুকনো ঢোক গিলছিল আর মিষ্টির দিকে চাইছিল। কি পরিস্থিতিতে ফেঁসে গেল ও। পা ব্যাথায় টনটন করছে যে। হাতটাও নাড়ানো দায়। চলাফেরা করতে পারছে না বলে বিধাতা এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলে দিবে? মিথি কি করবে সত্যিই বুঝতে পারল না। বার কয়েক কথা বলে উনাদের থেকে সময়ও চাইলেন অসুস্থতার অযুহাত দিয়ে৷ অতঃপর সব অযুহাতের অবসান ঘটিয়ে একটা সময় এল যখন মিথিকে কবুল বলতে বলা হলো। একটা ছোট্ট শব্দ। কবুল! অথচ এই তিন অক্ষরের শব্দটা মিথি কোনভাবেই উচ্চারণ করতে চাইল না।কোনভাবেই গলা দিয়ে বের হলো না। গলা কাঁপছে তার। শরীর ও কাঁপছে ভয়ে, রাগে। মিথি অনেকটা সময়ই চুপ থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকবয়ে থাকল হিমেলের দিকে। হিমেল তখন ছোটশ্বাস ফেলে। ভ্রু বাঁকিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করে যে, “ কি হলো? বলবি না কবুল? ”মিথি বুঝল কিনা কে জানে। তবে তার একটু পরই এক ভদ্রমহিলা বলে বসল,

“ কি হলো মিথি, কবুল বলো। এটা তো তোমার প্রথম বিয়ে নয়। ভালোই অভিজ্ঞতা আছে তোমার। তাহলে এত আড়ষ্টতা কেন? ”
ভালোই অভিজ্ঞতা আছে বাক্যটা দিয়ে যে মিথিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে তা বুঝতর দেরি হলো না তার। অন্য একজন বললেন এবারে,
“ আরেহ বলে ফেলো কবুল। এত দেরি করে নাকি? ”
মিথি শুধু শুকনে ঢোক গিলছিল আর বিধাতাকে স্মরণ করছিল। কোন একটা মিরাক্যাল হতে পারে না এই পরিস্থিতিতে? যাতে মিথিও রেহাই পেল, হিমেলও রেহাই পেল। মিথি যখন ওভাবেই তাকিয়ে তখন আরেক
ভদ্রমহিলা পাশ থেকেই শান্ত গলায় বলল,
“ কি হলো বলো মিথি। স্বামীর জন্যই তো কবুল বলছো বলো। বলে পেলো মা।”
মিথি তবুও বলে উঠতে পারল না। গলা ধরে আসল৷ কান্না পাচ্ছে এহেন পরিণতিতে। এ কি পরিস্থিতিতে পড়ল সে? মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। হিমেলের দিকে চেয়ে কাঁপা গলায় বলার চেষ্টা করল,

“ হ্ হি…”
এইটুকু বলেই আর বলতে পারল না। আবারও মহিলাগুলোর তাড়া পেয়ে কেঁদে ফেলল সে। মহিলাগুলোর একের পর এক উক্তি শুনে চোখ টলমল হয়ে আসে ওর। অতঃপর টলমলে চোখে, কাঁপা স্বরেই বলতে বাধ্য হলো,
“ ক্ ক কবুল! ”
একটা পবিত্র শব্দ। অথচ শব্দটা উচ্চারন করার পরপরই মিথির চোখ গড়িয়ে জল পড়ল। হিমেল স্পষ্টই দেখল তা। অথচ কিছু বলল না। পরপর তিনবারই কবুল বলতে জোর দেওয়া হলো মিথিকে। এবং তিনবারই কাঁপা এবং কান্নারত গলায় কবুল শব্দটা ভেসে এল। হিমেল খুব মনোযোগ দিয়েই কান খাড়া করে শুনছিল। হৃদয়ে অদ্ভুত এক প্রশান্তিও অনুভব হলো।
অতঃপর হিমেলের পর্ব এল। বলা হলো কবুল বলতে। এক্ষেত্রে মিথির মতো অতো সময় নিল না হিমেল। ঠোঁটে মৃদু এক হাসি ঝুলিয়ো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“ কবুল! ”

অতঃপর তার একটু পরই বিয়ের সকল কার্যক্রম শেষ হলো। একটা ছোট্ট মুহুর্ত, একটা ছোট্ট ঘটনা! অথচ হিমেলই জানে এটা কার জীবনের কত গুলোর দিনের প্রার্থনা৷ কতদিনের ভালোবাসা। হিমেল চোখ বুঝল। মনে মনে নিজের হৃদয়ের অস্থিরতা, শান্তি শান্তি অনুভব সবকিছুই অনুভব করল নিরবে। অতঃপর চোখ খুলে শুধাল,
“ আর কোন প্রমাণ লাগবে? লাগলে বলুন। প্রমাণ দেই। ”
চশমা পরিহিত মহিলাটি হাসলেন। বললেন,
“ না না। আর কোন প্রমাণ না। তোমার যত্ন আর ভালোবাসাই তো সব প্রমাণ করে দেয় বুঝলে? সবসময় এভাবে ভালোবেসে আগলে রাখবে মেয়েটাকে। অভিমান, অভিযোগ রাখবে না, বুঝলে? ”
হিমেল মাথা দুলাল। বলল,

“ বুঝলাম। ”
পরপরই আবার তার চাচীর পরিচিত সে মহিলাকে বলল,
“ আপনি খুশি হলেন আন্টি? মুখটা কেমন অন্ধকার করে রেখেছেন যেন? ’
“ কোথায় অন্ধকার? চোখে বেশি দেখো নাকি? ”
এইটুকু মুখ ভেঙ্গিয়ে বলেই উনি পা বাড়ালেন। হিমেল হাসল শুধু। একে একে সবাই চলে যেতেই হিমেল পা বাড়িয়ে মিথির সামনে এল। শান্ত গলায় বলল,
“ তোকে কান্না করানোর জন্য সরি মিথি। কথা দিচ্ছি, এটাই আমি বেঁচে থাকাকালীন তোর জীবনে শেষ কান্না। শেষ অশ্রু। আমি বেঁচে থাকতে তোর চোখে পানি আসতে দিব না। ”
মিথি শুনল। অথচ একটা উত্তরও করল না। শুধু নিরবেই শুনল।

মিথির দুপুরে ঔষধ ছিল। অথচ এত কাহিনীর পর ঔষধ তো দূর মিথি দুপুরের খাবারও খায়নি। শুধু চোখ বুঝে আছে খাটে হেলান দিয়ে। হিমেল দূর থেকেই দেখল। বেশি আঘাত করে ফেলেছে কি? মিথি কি বেশি দুঃখ পেয়েছে? ভেবে ভেবেই খাবার নিয়ে হাজির হলো। গলা ঝেড়ে বলল,
“ দুপুরে মেডিসিন আছে তো। খালি পেটেই খাবি? ”
মিথি চাইল। বলল,
“ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ”
“ তোর ইচ্ছে অনিচ্ছে তে কি হবে? ঔষুধ খেতে তে হবেই। নয়তো সুস্থ হবি নাকি? ”
মিথি হাসল। মলিন হেসে বলল,
“ ঠিক বলেছেন, আমার ইচ্ছে অনিচ্ছেতে আর কি এসে যায়? ”

“যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে কি লাভ হবে? হয়েই তো গেছে তাই না? কিন্তু এখন যদি তুই মেডিসিন না নিস ক্ষতি তোরই। সুস্থ হবি না তুই। কাজেই আমার উপর রাগ করে নিজের ক্ষতি করিস না। মিষ্টির কিন্তু তুই-ই সব। ”
মিথি শুনল। সত্যিই তো,অসুস্থ হয়ে এই বাসায় পড়ে থেকে লাভ কি? এরচেয়ে যত দ্রুক সম্ভব সুস্থ হওয়া উচিত। বলল,
“ চামচ হবে? একটা চামচ এনে দিন। ”
মিথির ডান হাতে প্লাস্টার। যার কারণে বাম হাত দিয়ে খাওয়ার জন্য চামচই ঠিক আছে। হিমেল শুনল। আনল চামচ। অতঃপর মিথির পাশে বসল। মিথি সবে এক চামচ খাবার তুলেছে মুখে ঠিক তখনই হিমেল খাবারের প্লেটটা নিজের হাতেই নিল। তাকিয়ে বলল,
“ বাম হাতে ওভাবে চামচ দিয়ে কষ্ট করে খাওয়ার চাইতে আমব খাইয়ে দিলে অপরাধ হবে মিথি? ”
মিথি চাইল। এমনিতেই নিজের জীবনের হাজারটা সমস্যা নিয়ে বিরক্ত সে। মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে উঠছে।বলল
“ না৷ তেমন নয়। পারব আমি। ”
হিমেল গম্ভীর স্বরে বলল,

“ আমিও জানি তুই পারবি।এবার হা কর। ”
এইটুকু বলেই খাবার মাখিয়ে মিথির মুখের সামনে তুলল। অথচ মুখ না খুলে হিমেলের দিকে হতাশের ন্যায় চাইল। হিমেল সে দৃষ্টি পর্যবেক্ষন করেই বলল,
“ কি মনে হচ্ছে? বিষ খাইয়ে দিব আমি? ”
মিথি হেসে বলল,
” বিষ তো খাইয়ে দিলেনই। আপনি চাইলে এই বিষ খাওয়া থেকে আমায় বাঁচাতে পারতেন। পারতেন না? কিন্তু বাঁচাননি। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৪

হিমেল শুনল। মুখটা কাছাকাছি এনে গম্ভীর গলায় বলল,
” কিছু বিষ পান করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় যে। নয়তো কেউ না কেউ কোন এক প্রান্তে জঘন্য ভাবে ছটফট করতে করতে মারা যায়। তুই নাহয়এই সামান্য বিষ টুকু পান করে তাকে বাঁচালি মিথি। ক্ষতি কি বল? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৬