Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৬

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৬
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

” কিছু বিষ পান করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় যে। নয়তো কেউ না কেউ কোন এক প্রান্তে জঘন্য ভাবে ছটফট করতে করতে মারা যায়। তুই নাহয় এই সামান্য বিষ টুকু পান করে তাকে বাঁচালি মিথি। ক্ষতি কি বল? ”
অতঃপর এই কথার পর আর উত্তর এল না। দুপুরের খাবারটা হিমেল নিজ হাতেই খাইয়ে দিল মিথিকে। মিথি পুরোটা সময় স্থির ছিল। নিরব, নিস্তব্ধ। যেন কিচ্ছু হয়নি। কিচ্ছু ঘটেনি। হিমেল শুধু দেখছিল তার নিস্তব্ধতা। তারপর ছোট নিঃশ্বাস ফেলে গুণে গুণে ঔষধ হাতে তুলল। বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ ঔষধ আছে তোর মিথি। হা কর। ”
মিথি এবারে আর প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ঔষুধ গুলো হিমেলের হাতে খাওয়ার জন্য মুখ ও হা করল না। নিরবে তাকিয়ে শুধু হাত বাড়াল। হিমেলের হাত থেকে ঔষধ গুলো নিয়েই বলল,
“ পানি দেন একটু। খেয়ে নিচ্ছি। ”
অতঃপর তাই হলো। হিমেল এগিয়ে ধরল পানির গ্লাসটা আর শুধু দেখল। মিথি নিজেই বলল এবারে,
“ আমার সুস্থ হতে কত দিন লাগবে হিমেল ভাই? ”
হিমেল শুনল। পানির গ্লাসটা রাখতে রাখতে বলল,
“ কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে, আবার কয়েক মাস ও। ”
“ এতদিন? ”
হিমেল চাইল। ফিরে তাকিয়ে বলল,

“ সুস্থ হওয়ার তাড়া অনেক? ”
“ হ্যাঁ। এভাবে অসুস্থতার বাহানা দিয়ে একটা সম্পর্ক বয়ে নিয়ে এক ছাদের নিচে থাকা তো সম্ভব নয়। আমি থাকতে চাইছি ও না। যেটা হয়ে গিয়েছে সেটা একটা দুর্ঘটনা হিসেবেই ভুলে যেতে চাইছি। কথা দিচ্ছি, আপনার সুস্থ জীবনে এর এইটুকুও ছায়া পড়বে না? ”
হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। মিথির কথা শুনে শুধাল,
“ আমি তো সমস্ত ছায়াটুকুই চেয়েছি। সে জায়গায় একটু ছায়া পড়বে না, বিষয়টা কি আমি মেনে নিব? ”
মিথি বলল,
“ আপনি, আমি দুইজনেই জানি এটা একটা দূর্ঘটনা। স্রেফ দূর্ঘটনা হিমেল ভাই।”
হিমেল ঝুঁকে এল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ দূর্ঘটনা? যদি দূর্ঘটনায় হয়, তো এটা আমার জীবনে সবচাইতে কাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনা টা ছিল মিথি। ”
“ এটা কোন ভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। বুঝেছেন? পারে না? আপনার পরিবার জানলে আমার সম্পর্ক সর্বপ্রথম কি ধারণা পোষণ করবে জানেন? আমি আপনাকে ফাঁসিয়েছি।ঠিক এই ধারণাটাই জন্মাবে তাদের মনে। ”
“ জন্মালে জন্মাক। তো? ”
মিথি ছোট শ্বাস ফেলল এবারে। হিমেলের কুঁচকানো ভ্রু, চোখ জোড়া আর কপালে ঝুঁকে আসা চুলগুলো পরখ করে নরম স্বরে বলল,

“ হিমেল ভাই, অনেক তে উপকার করলেন আমার। আরেকটা উপকার করবেন? দয়া করে আয়েশা খালাকে একটা খবর দেন। উনার নাম্বার মুখস্থ আমার। একটা কল দিন প্লিজ। আমার পা টা মচকেছে শুধু। ঠিকই উপরতলায় যেতে পারব। আর একটু সাহায্য করার জন্য উনাকে অবশ্যই প্রয়োজন যে। আমি চাইছি না আর এখানে থাকতে। যখনই ভাবছি আমার সাথে আপনার বিয়ে হয়েছে তখনই আমার কান্না আসছে, দমবন্ধ লাগছে, নিজের প্রতি অসহ্যকর একটা অনুভূতি জন্মাচ্ছে হিমেল ভাই। নিজেকে খুব স্বস্তা, ঠুনকো আর নিচ লাগছে আমার। ”
হিমেল শুনল সবটাই। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
“ আমার সাথে থাকতে হচ্ছে বলে? ”
“ না। এই যে একটু আগে যা হলো? তার জন্য। আমি চাইনি এমন কিছু হোক। ”
হিমেল এবারে বসল পাশাপাশি। বলল,
“ কিন্তু আমি চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম যেকোন মূল্যে তুই আমার হয়ে যা। ”
“ হয়ে গিয়েছি না? আপনার চাওয়া তো পূর্ণ হলো হিমেল ভাই। বিয়ে হলো। আপনার স্ত্রী বলে পরিচয় দেওয়াটাও স্বার্থক হলো। এবার বাকিটা ছেড়ে দিন। আমরা যে যার পথে চলি। আমি উপর তলায় যেতে চাচ্ছি। প্লিজ। এক বাসাতে থাকতে চাই না। ”

হিমেল তাকাল। গমগমে স্বরে উত্তর করল,
“ আমি তো কাপুরুষ নই মিথি। বিয়ে করেছি যখন বউ এর দায়িত্ব না নিয়ে হেলাফেলা ভাব নিয়ে থাকার মতো পুরুষ নই তো আমি। বিয়েই করেছি মূলত বউ এর প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করার জন্য,আগলে রাখার জন্য । সে জায়গায় বিয়ে করা স্ত্রীকে রেখে আলাদা অন্য বাসায় থাকাটা দায়িত্বহীন পুরুষের মতো কাজ হবে না?”
বিয়েই করেছে মূলত বউ এর প্রতি এই দায়িত্ব পালন করার জন্য। এই একটা লাইনই মিথির মাথাতে গেঁথে গেল। ইচ্ছাকৃত ছিল সবটা? হিমেল ভাই কি আগে থেকেই চেয়েছিল এমন একটা পরস্থিতি আসুক? বলল,
“ আপনি বরাবরই দায়িত্ববান পুরুষ হিমেল ভাই। ছোট থেকে দেখে আসছি। কিন্তু এই যে কথাটার মধ্যে আপনি স্বীকার করলেন যে ঘটনাটা আপনার ইচ্ছেতেই হয়েছে। তাই না? ”
হিমেল উত্তর করল না। হিমেল না চাইলে অবশ্যই ঘটনাটা ঘটত না এটাও ঠিক। এটক জোর পূর্বক একটা পরিস্থিতি ছিল না। বরং হিমেল নিজেই প্রস্তাবটা দিয়ে পরিস্থিতিটাকে টেনেছে। এটা তে সত্যি হিমেল মনে প্রাণে চেয়েছিল এই পরিস্থিতিটা। মিথি তখন আবারও বলল,

“ আপনি আমার অসুস্থতার সুযোগ নিলেন হিমেল ভাই। যেমনভাবে আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ ঠিক তেমন ভাবেই আপনার উপর নিরব এক রাগও জম্মাচ্ছে। আমার উপকারই করলেন অথচ আমার মনের মধ্যে আপনার জন্য তৈরি হওয়া ভালো ধারণাটা নষ্ট করে দিলেন হিমেল ভাই।”
“ যেমন? ”
“ আপনি আমার দুর্সময়ের সুযোগ নিলেন। আশা করিনি এমনটা। বিশ্বাস করতাম আপনাকে। দূরত্ব রাখলেও চোখ বুঝেই বিশ্বাস করা যেত হিমেল ভাইকে। আশা রাখিনি এমনটা। ”
হিমেলের মুখ গম্ভীর হলে। বলল,
“ কারোর ভালো থাকা নিশ্চিত করতে করলাম নাহয় আশার বাইরে কিছু। ”
আর দাঁড়াল না হিমেল। মিষ্টিকে ঘুম পাড়িয়েছিল। ওখানে এসেই ঘুমন্ত মিষ্টির মুখাবয়ব দেখছিল খুব মনেযোগ দিয়ে। বিড়বিড় করে বলছিল,
“ বাচ্চা মিথি ফুল? তোমার আম্মা আমায় কখনোই বুঝেনি। কখনোই না।”

মিথি ওয়াশরুমে যাবে। অথচ এইছোট্ট বাক্যটা বারবার হিমেল ভাইকে বলার ইচ্ছে হচ্ছে না। আবার এই ছাড়া সাহায্য চাওয়ার কেউ নেই ও৷ তাই নিজেই চেষ্টা করল। পা তো খালি মচকেচেই । এইটুকু ভেবেই বিছানা ছেড়ে পা ফেলতে নিল। পায়ের উপর ভরও রাখল। ব্যাথায় চিনচিন করে উঠল মুহুর্তেই। অতঃপর ব্যাথা হজম করে আরেক পা বাড়ানোর আগ মুহুর্তেই হিমেল এল। মিষ্টি তখন হিমেলের কোলেই ছিল। এক পাশে মিষ্টি আর অপর হাতে দ্রুতই ধরল মিথিকে। চলতে সাহায্য করে বলল,
“ আশ্চর্য! একটা ডাক দিলে কি তোর মুখ ব্যাথা হয়ে যেত মিথি? ”
মিথি শুধু ছোট ছোট চোখে চেয়ে থাকল। একটা মানুষের এতোটা যত্ন করা উচিত কি তার জন্য? উচিত নয় তো। তবুও কেন করছে? কেন এত যত্ন দেখাচ্ছে? মিথিকে দুর্বল করতে?

মিষ্টি দু পা ছড়িয়ে বসেছে ফ্লোরে। অতঃপর হিমেলের আনা নতুন কিছু খেলনা দিয়ে খেলতে লেগে গেল। হিমেল ও তার পাশেই ফ্লোরে বসে আছে। ছোট কড়াইয়ে কিছু চাল দিয়েছে। অতঃপর ছোট চামচটা দিয়ে নড়চড় করছে। আর একটু পর পরই হিমেলের দিকে ছোট প্লেটে তার বানানো খাবার দিয়ে বললে,
“ হিম, হিম। ”
হিমেল ও বেশ মজা করেই সেসব খাওয়ার অভিনয় করে দেখাচ্ছে।মিষ্টির চুল গুলো এলোমেলো কিছুটা। আঁচড়ালে ছোট ছোট দুটো ঝুটি হয়। খুবই ছোট হয় যদিও চুল ছোট হওয়ার কারণে। তবে সুন্দর দেখায়। হিমেল তাই চিরুনি নিয়ে আঁচড়ানোর চেষ্টা করল। খেলাতে মনোযোগ থাকাতে তেমন একটা বিরক্ত ও হলো না মিষ্টি। কিন্তু হিমেল বিপাকে পড়ল। ঐ ছোট্ট ছোট্ট রাবার ব্যান্ড গুলো ও পেঁচাতে
পারছেনা চুলে। ফলস্বরূপ জুটি বাঁধাও হচ্ছে না। উপায়ন্তর না পেয়ে হিমেল হতাশ হলো। ফ্লোরে বসে থেকেই খাটে বসে থাকা মিথির দিকে চাইল।

মিথি এতক্ষন ওদের কার্যকলাপই পরখ করছিল। কি মিষ্টি মুহুর্ত। যেন মনে হচ্ছে তার মেয়েটা কতকাল যাবৎ হিমেল ভাই এর সাথে পরিচিত। কতকাল যাবৎ যেন চেনে। মিষ্টি সাধারণত খুব সহজেই কারোর সাথে মিশে না। শান্ত হয়ে থাকে। অথচ এই বেলায় হিমেলের সাথে এত খুনসুটি দেখে সে সত্যিই অবাক হয়েছিল। অতঃপর হিমেলের হতাশ দৃষ্টির অর্থ বুঝে উঠে সে বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৫

“ ওকে এদিকে আনুন হিমেল ভাই। আমি বাম হাত দিয়ে ট্রাই করে দেখি জুটি করা যায় কিনা। ”
হিমেল চাইল, বলল,
“ আমি দুই হাতে পারছি না। তুই এক হাতে পারবি? ”
মিথি শুধু বলল,
“ আপনি সহ সাহায্য করলে পেরে যাব। ”
এই ছোট্ট বাক্যটা মিথি যদি সত্যিই বুঝত? যদি সত্যিই এই বাক্যটা সে তার সারা জীবনের জন্য ভাবত, কত ভালো হতো ।

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৭