Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

একটা হলদেটে আলো ছড়ানো রুম। দেওয়ালটা বেশ পুরাতন। কিছু কিছু জায়গায় প্রাচীরে ফাটল। মেঝেটাও শক্ত,খসখসে। আদ্র এই ইট পাথরের ঘরটায় আছে বেশ সময় ধরে। গায়ে কয়েদীদের মতো পোশাক। তাও ময়লা জমা। আদ্র ছোটশ্বাস ফেলে।চোখ ভেজা। সুদর্শন পুরুষটার শরীরে ধূলোধূলো ছাপ। ময়লা জমেছে শরীরেও। যেন মলিন হয়ে যাওয়া সুদর্শন এক পুরুষ। দেওয়ালে হেলান দিয়ে উপর দিকে চাইল আদ্র। আপসোসের স্বরে শুধাল,
“ বিধাতা, সম্ভবত পৃথিবীতে আমিই সবচেয়ে হতভাগা সন্তান যে কিনা নিজের মায়ের জানাজাতেই উপস্থিত থাকতে পারেনি। সম্ভবত আমি সবচেয়ে খারাপ স্বামী যে নিজের স্ত্রীর মূল্য বুঝে নি। সম্ভবত আমিই সবচেয়ে নিকৃষ্ট বাবা যে নিজের সন্তানকে পৃথিবীতে আসার আগেই শেষ করে ফেলতে চেয়েছিল। খারাপ, নিকৃষ্ট, জঘন্য আমি। ”

এইটুকু বলেই হৃদয় ভার হয়ে উঠল আদ্রর। আম্মুর মুখটা সে কতদিন দেখে না। কতদিন হলো সে আম্মুকে আম্মু বলে ডাকতে পারে না। একটারবার উপলব্ধি করতে পারে না যে এই পৃথিবীতে তার আম্মু আছে। নেই তো। চোখ বুঝলেই আম্মুর শেষবারের চোখ বুঝে রাখা মুখটাই ভেসে উঠে। কতোটা মায়া তার মায়ের মুখটায়। কতোটা সুন্দর! অথচ তার আম্মুকে এক নর’পিশাচের জন্য দুনিয়া ছাড়তে হয়েছিল। এক জা’নোয়ারের জন্য আদ্র তার মাকে হারিয়েছে, পরিবারকে হারিয়েছে। আর সে নর’পিশাচটার জন্যই আদ্র আজ এই চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি। ভয়ে বন্দি করে রেখেছে। এতোটাই ভয়. নিজের ছেলেকেই? আদ্র কান্নার সাথে সাথে হাসেও। ঠিক পরমুহুর্তেই আবার অনুশোচনায়, অপরাধবোধে বুক ভার হয়ে এল তার। মিথি! একটা ছোট্ট নাম। অথচ এই ছোট্ট নামটাকে নিয়েই সে আজ কতগুলো দিন হলো অপরাধবোধ বয়ে বেড়াচ্ছে। বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে,

“ মিথি, ক্ষমা করবি তো আমায় কোনদিন? কোনদিন ভুলবি না আমার অপরাধগুলো? আমি, আমি তে আমার আম্মুকে হারালাম মিথি। সব হারালাম। সববব!আমার বাচ্চাটাকে অন্তত একবার দেখতে দিস মিথি। একটাবার। বেশিকিছু না, শুধু একবার কোলে তুলব মিথি। আমার,..আমার বাচ্চাটাকে আমি একবার শুধু দেখব মিথি। আমার তো কেউ নেই, কেউ না। একবারও কি দিবি না দেখতে?”

মিথির বাসাটা সাদামাটা। আসবাবপত্র বলতে একটা খাট, একটা টেবিল, দুটো চেয়ার আর একটা ছোটখাটো কেবিনেট। এইটুকুতেই তার আর তার প্রাণের ছোট্ট সংসার দিব্যি সাজিয়ে গুঁছিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু হিমেল আসাতে এই মুহুর্তে মিথিকে ভাবতে হলো।ভেবেচিন্তেই হিমেলকে বলল,
“ হিমেল ভাই, এখানে থাকলে ঘুমাবেন কোথায়? আপনি আমায় যে আতিথেয়তা দিয়েছেন তা দিতে তো আমি ব্যর্থ হবো। আপনি বরং নিজ বাসায়..”
বাকিটুকু বলতে হলো না মিথিকে। হিমেল বুঝে গেল। এক পর্যায়ে ঠোঁট এলিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। মিথির দিকে চেয়ে বলল,

“ মিথি, ভালোবাসলে নাকি মানুষ বেহায়া হয়। এই বাক্যটা হাস্যকর লাগত আগে। নিজের ব্যাক্তিত্ব বজায় রেখেই দূর থেকে এ যাবৎকাল ভালোবেসে এসেছি একজনকে, বাসবও। কিন্তু তুই যে আঙ্গুল তাক করে আমাকে এভাবে বেহায়া প্রমাণ করছিস? এটা সত্যিই আঘাত করছে। ভালোবাসলে সত্যিই বেহায়া হতে হয়? এতোটা? আমার সাথে যায় এই বেহায়াপনা ? তাও করছি। কিরকম স্টেজে এসে দাঁড়ালাম আমি। ”
মিথি শুনল পুরোটাই। অতঃপর নিরব দৃষ্টিতে কিছুটা সময় হিমেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। সত্যিই তো। হিমেল ভাই এর ব্যাক্তিত্বের সাথে এই বেহায়াপনাটা যায়না তো। সত্যিই যায় না। তবুও করছে কিসের জন্য তার উত্তরটা মিথি জানে। খুব ভালোভাবে উপলব্ধিএ করে এই উত্তরটা। কিন্তু..কোথাও একটা কিন্তু অবশ্যই থেকে যায়। মিথি মুখ কাচুমাচু করে বলল এবারে,

“ আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকলে সরি। আসলে অন্য রুমটা সেভাবে ব্যবহার করা হয়না, আসবাবপত্র ও নেই তাই।আপনার কষ্ট হবে বলে। ”
হিমেলের মুখ টানটান। গম্ভীর। জবাবে বলল,
“ বাহ! অনেক ভেবে ফেলেছিস আমার কষ্ট নিয়ে। ”
মিথি স্পষ্টই বুঝল কথাটায় রাগ ছিল। এবং এভাবে বলাটাও বোধহয় উচিত হয়নি। কিন্তু কি বলত আসলে বিনিময়ে? মিথি কিছু বলার আগেই হিমেল আবারও কাটকাট গলায়
বলল যে,

” এতোটাই আমার কষ্ট নিয়ে ভেবেছিস যে একপাক্ষিক ভালোবাসার যন্ত্রনায় পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। এই কষ্টটা শুধু সেই বুঝে যে কখনো কাউকে ভুল করে হলেও একপাক্ষিক ভাবে ভালোবেসেছে। ”
মিথি এবার চুপ থাকল। হিমেল শান্ত স্বরেই কথা গুলো বললেও বুঝতে কষ্ট হলো না এই মানুষটা কতোটা অবহেলা, কতোটা যন্ত্রনা সয়ে এসেছে। কে বলেছিল এতোটা ভালোবাসতে? কেনই বা এত ভালোবাসল হিমেল ভাই? তার মতো একটা সাধারণ মেয়ের কি এই ভালোবাসাটুকু প্রাপ্য ছিল? ছিল না তো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়াল,
“ এতোটা ভালোবাসলেন কেন হিমেল ভাই? যদি আরো সময় আগে আমার জীবনে আসতেন যখন আমার জীবনে কোন দাগ ছিল না.. ”
এইটুকু ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তাকাল হিমেলের দিকে। অতঃপর হুট করেই চোখ গেল চেয়ারে বসে থাকা হিমেল ভাইয়ের হাতের দিকে। পোড়ার মতোই মনে হচ্ছে। চামড়া উড়ে গিয়ে বিচ্ছিরি দেখাচ্ছেে।হিমেলের হাতের ক্ষতটা এতোটা সময় যাবৎ খেয়াল না করলেও এখন চোখে পড়ল৷ অতঃপর ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞেস করল,

“ হাতে কি হয়েছে হিমেল ভাই? ”
হিমেলের তখন মুখচোখ শক্ত। রাগ হচ্ছিল নিজের প্রতি, মিথির প্রতি। ঠিক এই রাগের মাঝেই এই প্রশ্নটা আরো সহ্য হলো না তার। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
“ কোথায়? ”
মিথি ভালোভাবে পরখ করেই বলল,
“ পুড়ে গিয়েছে তো। চামড়া ও উঠে গিয়েছে অনেকটা। কাল রাতে মাছ ভাজতে গিয়েই এমনটা করেছেন? ”
হিমেলের মনে পড়ল এবারে। হ্যাঁ, মাছ ভাজতে গিয়েই তো গরম তেল পড়েছিল। এর পর বোধহয় ফোস্কার মতো কিছু হয়ে চামড়া উঠে গিয়েছিল।হিমেলের মনে পড়লেও খুব গুরুত্ব না দিয়ে বলল,
“ খেয়াল নেই। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। বাম হাত দিয়ে খাটের পাশের টেবিলের ড্রয়ারটা থেকে পোড়ার মলমটা হাতড়ে নিল। বলল,

“ হাতটা এদিকে ধরুন। ”
ত্যাড়া স্বরে উত্তর এল,
“ লাগবে না। ব্যাথা করছে না৷ ”
“ লাগবে। হাত দিন হিমেল ভাই। ”
হিমেল বসা ছেড়ে এবার উঠেই দাঁড়াল। মিথির কপাল কুঁচকে এল। বলল,
“ কি আশ্চর্য! অন্যের যত্ন করছেন অথচ নিজের দিকে নজরই রাখছেন না। এটা কেমন যত্ন করার উদাহরণ? ”
“ কেমন উদাহরণ তা আমি বুঝব। ”
মিথি মুখ আর বাম হাত দিয়েই কোন ভাবে ঔষুধটা খুলল। হিমেলের হাতটা নিজ থেকেই টেনে ধরে লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ যত্ন কেবল পুরুষরাই নয়, নারীরাও করতে পারে হিমেল ভাই। নারীরা নির্দয় হয় না। ”
“ অথচ তুই আসলেই নির্দয়। ”
মিথি শান্ত স্বরে এবার বলল,
“ যদি ঠিক সময়ে আমার জীবনে আসতেন তাহলে হয়তো নির্দয় হতাম না হিমেল ভাই। ঠিকই আপনাকে গুরুত্ব দিতাম। ”
হিমেল দ্রুতই হাত সরিয়ে নিল। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“ আমার হাত ধরলি যে? এটাও তো আমার পরিবার মানার কথা নয়। তাহলে? ”
“ হাত ধরলেই কেউ কারোর হয়ে যায় নাকি? আপনার পরিবার এইটুকু বুঝবে অবশ্য। ”
হিমেল দাঁড়াল না আর একটুও। রাগ, জেদ, অবহেলা সবকিছুর মিশ্রনে একটা অনুভূতি হচ্ছে। যেতে যেতে বিড়বিড় করল,
“ অথচ হাত না ধরেও কতকাল ধরে আমি তোর হয়েই আছি মিথিফুল। তুই তা খেয়ালই করিসনি। ”

এর মাঝে প্রায় সপ্তাহখানেক পার হলো। হিমেল মিথির বাসাতেই জিনিসপত্র শিফট করিয়ে থাকা শুরু করল। ততদিনে মিথির পা টা ঠিক হয়েছে। ব্যাথা সেরেছে। মাথার ব্যান্ডেজটাও খোলা হয়েছে। শুধু হাতে প্লাসাটার ই আছে। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। হিয়াকে তিনদিন থেকেই চলে যেতে হয়েছিল। এর মধ্যে আয়েশা খালা আর হিমেলই তাকে সাহায্য করেছে। মিথি মাঝেমাঝে ভাবে একটা পুরুষ এভাবে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে কি পায়? আসলেই কি পায়? একটা মানুষ এতোটা ভালোবাসা দেখিয়ে তার মনে মায়া জাগাচ্ছে? অভ্যাসে পরিণত করছে তাকে? মিথি আসলেই বুঝে না। বেলকনিতে বসে বসে ভাবতেই তার ফোন বাজল। হিমেলের ভাবী কল দিয়েছে। এই নিয়ে তিনদিন কল করেছে সে। কথাবার্তাতে এটাই বুঝিয়েছেন যে মিথি নিজের সেইফ জোন খুঁজে নিয়েছে। ফাঁসিয়ে নিজের ফিউচারটাও গুঁছিয়ে নিয়েছে। নিজের সন্তানের জন্য বাবাও খুঁজে নিয়েছে। আর কি? চিন্তা আছে? মিথি জানে, আজও নিশ্চয়ই এই কথাগুলোই বলবে। অবশ্য সমাজের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এটাই সবার মাথায় আসবে যে, মেয়েটাই ছেলেটাকে ফাঁসিয়েছে। অথচ সে সত্যিই চায়নি হিমেলের সাথে এমন হোক। কিভাবে বুঝাবে?

বুঝানোর উপায় আছে? মিথি তো চেয়ে ও ছিল যে হিমেল আর মিথির এই বিয়েটা নিয়ে আর না ভাবা হোক। অথচ হিমেলকে মানানো কঠিন। বলেও কোন লাভ হলো? হলো না তো। বিপরীত দিকে এই একটা মানুষের সাথে থেকে সে এই মানুষটার প্রতি মুগ্ধই হয়। এতোটা যত্ন, খারাপ সময়ে এভাবে পাশে থাকা, এতোটা ভালোবাসা সত্যিই তার ভাগ্যে থাকার কথা ছিল? এই মুগ্ধতা, এই অভ্যস্ততা কি উচিত? এইটুকু ভেবেই পা জোড়া এগিয়ে রুমে এল সে। মিষ্টি তখনই আধো আধো পা ফেলে রুমে আসছিল।পরনে একটা সাদা রং এর গোল জামা। ঘাড় অব্দি চুলগুলো ছেড়ে রাখা। আর কানে একটা ছোট্ট গাঁধা ফুল গুঁজে রাখা। মিথি নিজের ঐটুকু মেয়েকে দেখে নিজেই মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মেয়েটা কি মিষ্টি! কি সুন্দর! কানে ফুল গুঁজে দেওয়াতে আরো মিষ্টি দেখাচ্ছে তার প্রাণটাকে।মিথি বাম হাত দিয়ে এগিয়ে ধরেই চুমু দিল মেয়ের কপালে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ কানে ফুল কে দিয়েছে মা? কি দারুণ লাগছে তোমায় ফুলে জানো প্রাণ? আমার প্রাণের কানে ফুল খুব মানিয়েছে। একদম যেন ফুলের কানে ফুল। ”
এইটুকু বলেই পরপর মিষ্টির দুই গালে চুমু দিল। শেষে নাকে চুমু দিয়ে হাসি দিয়ে বলল,
“ আমার আদুরে বুড়িটা সত্যিই ফুলের মতোই সুন্দর।! ”
মিষ্টি তখন খিলখিলিয়েই হেসে উঠল মায়ের আদর পেয়ে। মা কে ঝাপটে ধরেই পরমুহুর্তে নিজের হাতের মুঠোয় থাকা ফুল উঁচু করে ধরল। মিথি এতক্ষনেই দেখল ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুলের ভাজে আরো একটা গাঁধা ফুল। যেটা সে খুব চেষ্টা করছে মায়ের চুলে গুঁজে দিতে। অথচ পারছে না। প্রথমবার দিতেই তা পড়ে গেল। ফের আবারও ফুলটা তুলে নিয়ে চেষ্টা চালাল গুঁজে দিতে। এবারেও ব্যর্থ হতেই হাসি হাসি মুখটা তার কেমন মিইয়ে এল। যেন কেঁদে দিবে। মিথির বুঝতে কষ্ট হলো না বিষয়টা। বাম হাতে ফুলটা নিয়ে নিজের কানে গুঁজতে গুঁজতে বলল,

“ আম্মুও দিয়েছে। ম্যাচিং ম্যাচিং হুহ?”
এইটুকু বলেই হেসে ফেলল সে। মিষ্টি ততক্ষনে মাকে জড়িয়ে ধরেছে। মিথি আবারও হেসে দিয়ে বলল,
“ আমার মিষ্টিটা আসলেই খুব মিষ্টি।”
এই ছোট্ট মুহুর্তটুকু এতোটা সময় দরজায় দাঁড়িয়েই দেখছিল হিমেল। মা মেয়ের সুন্দর মুহুর্ত। মূলত মিষ্টির কানে ফুলটা সে গুঁজে দিয়েছিল। অতঃপর হিমের সাথে অনেকটা সময় কাটিয়ে যখন বাসায় ঠিক তখনি হিম তার হাতে আরো একটা ফুল দিয়ে মাকে দিতে বলেছিল। পুঁচকে মিষ্টি বুঝল কিনা পুরোটা কে জানে তবে এসেই সে নিজের মতো মাকেও ফুল পরিয়ে দিতে চাইল। অতঃপর মা মেয়ে দুইজনের কানেই ফুল ভীষণ মানিয়েছে। স্নিগ্ধ, সুন্দর ফুলেদের কানে ফুল!

হিমেল এক সপ্তাহ ছুটি নিলেও অফিসে গেল তার আরো কয়েকটা দিন পরই। অতঃপর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরেই সর্বপ্রথম কোলে তুলল মিষ্টিকে। অতঃপর পরখ করে দেখল মিষ্টির মুখের কোণে হলুদ লাগানে। তাকিয়ে হাসল সে। কপালে চুমু এঁকে বলল,
“ মিষ্টি আম্মুজান,গালে কি মেখেছেন?”
মিষ্টি শুধু গালেই নয় এবার হাতটাও দেখাল। হলুতের গুড়িতে মাখামাখি করেছে। হিমেল হতাশ চোখে চাইতেই মিষ্টি জানাল,
“ হিম.. আম্ আম্মু।”
“ হু, আম্মু কি? ”
“ আন্না কয়ে। ”
মিষ্টি বোধহয় রান্না করেই বুঝাতে চাইল। অতঃপর পা ফেলে রান্না ঘরে গিয়ে দেখল মিথি আলু সিদ্ধ বসিয়েছে। হিমেল তাকাল। বলল,

“ খালা রান্না করেনি আজ? ”
“ খালা মেয়ের বাসায় গিয়েছেন আজ৷ কাল আসবেন বলেছেন। ”
“ তো তোকে রান্না করতে কে বলেছে?”
“ কেউ বলেনি। আমি পারব রান্না করে নিতে তাই এলাম। ”
হিমের ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
” তাই নাকি? একহাতে ভাতের মাড় ফেলতে পারতি? ”
মিথি উত্তর করল না এবারে। পারত না? তবুও চেষ্টা করত দরকার হলে। ক্ষতি কি? হিমেল তাকিয়ে বলল এবারে,
“ যা এখান থেকে। আমি আর মিষ্টি রান্না করে নিব। তুই সুস্থ হলে তখন রান্নার দায়িত্ব তোর কেমন? ”
মিথি শুনে। বলল,

“ এখনও পারব। যেটা পারব না তা নাহয় আপনি করে দিবেন। ”
” লাগবে না। আমি আর মিষ্টি করে নিব। মিষ্টি? আম্মুকে বলো তো চলে যেতে। ”
শেষ বাক্যটা হিমেল মিষ্টির উদ্দেশ্যেই বলল। মিথি শুনে কপাল কুঁচকায়।পাশের চুলায় কড়াইটায় জল, হলুদ আর ছোট চামচটা দেখিয়ে বলল,
“ হিমেল ভাই, আপনার মিষ্টি রান্নার হাল এইই! অলরেডি একবার রেঁধে ফেলেছে। ”
হিমেল তাকাল। এতক্ষনে মিষ্টির হাতে আর মুখের হলুদের রহস্য বুঝে গেল সে। তাকিয়ে বাহ বাহ দিয়ে বলল,
“ খুব ভালো । দেখেই তো মনে হচ্ছে খুব টেস্ট হবে। ”
মিথি চোখ ছোট ছোট করে চাইল। হিমেল হেসে ফেলল। মিথির কোলে মিষ্টিকে তুলে দিয়ে বলল,
“ ওকে নিয়ে রুমে যা। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে রান্না করব। ”
মিথি তখনও দাঁড়িয়ে। হিমেল তখন আবারও বলল,
” কথা কানে শুনিস না নাকি? নাকি রান্না করতে গিয়ে হাত টাত পুড়িয়ে ফেলে আবার অসুস্থ হয়ে থাকতে মন চাচ্ছে তোর? কোনটা? ”

অতঃপর হিমেল ফ্রেশ হয়ে এসেই টুকটাক যা পারল রান্না করল। খাবার রান্না শেষেই মিথি আর মিষ্টিকে ডাকতে যেতেই দেখা গেল বিছানায় মিষ্টিকে নিয়ে বসে আছে। চুলোগুলো কিছুটা এলোমেলো। হিমেল এই এলোমেলো চুল সকালেও দেখছে। মিথির ডানহাতের কারণেই বোধহয় আঁচড়াতে পারেনি। এতদিন হয়তো আয়েশা খালা এসেই আঁচড়িয়ে দিতেন। আজ আসেনি। তাই হয়তো চুল ও এলোমেলো। ছোটশ্বাস ফেলে হিমেল। পা এগিয়ে মিথিদের পাশে গিয়ে বলল,
“ মিষ্টির চুল গুলো আঁচড়ানো হয়নি। আঁচড়িয়ে দেই। চিরুনি কোথায় রেখেছিস? ”
এইটুকু বলেই মিথির কথা মতো চিরনি নিয়ে চুল আঁচড়াল। অতঃপর এতদিনে মিষ্টির চুল আঁচড়ে দেওয়ার একটু হলেও অভিজ্ঞতা তার হয়েছে বলে ঝুটি বাঁধতে কষ্ট হলো না। হিমেল ফের তাকিয়ে বলল,
“ ছিহ! তোর মাথার এই অবস্থা কেন? মিষ্টিকে দেখ। ”
মিথি তাকাল। অস্ফুট স্বরে জানাল,

“ কি? ”
“ তোর চুলগুলো দেখে কাকের বাসা মনে হচ্ছে। আমার অসুবিধা হচ্ছে। ”
মিথি কপাল কুঁচকায়। বলল,
“ আপনার কেন অসুবিধা হবে? ”
“ তোর কাকের বাসার মতো চুল থেকে যদি কাক এসে আমার রান্না করা খাবারে এসে ময়লা ফেলে যায়? খেতে পারব নাকি? ”
মিথির চোখ ছোট ছোট হয়ে এল। হিমেল ভাই অদ্ভুত! বলল,
“ আপনি খেয়ে নিন তাহলে গিয়ে। ”
“ তোর সাথে কি মজা করছি আমি? ওয়েট, আমিই আঁচড়ে দিচ্ছি। ”
অতঃপর বলতে দেরি কিন্তু চিরুনিটা মিথির চুলে পৌঁছাতে দেরি হলো না। হিমেল চুল আঁচড়ানো শেষ হতেই বেনুনি করতে নিল। অথচ বেচারা জানেই না কিভাবে বেনুনি করে। মিথিকে জিজ্ঞেস করল

“ মিথি, বেনুনী কিভাবে গাঁথে? ”
“ আপনি পারবেন? পারবেন না হিমেল ভাই। ”
হিমেল মানল না। নিজেই মোবাইল চালিয়ে মিষ্টির হাতে দিল। মিষ্টি করে বলল,
“ এটা ধরে রাখেন আম্মুজান। কেমন?”
মিষ্টি ধরে রাখল। একই সাথে উদ্গ্রীব হয়ে চেয়েও থাকল। হাত বিড়বিড় করছে তার। হিম তার মায়ের চুল আঁছড়ে দিচ্ছে, তাকেও চুল আঁছড়াতে হবে। এই জন্য মোবাইলটা একপাশে রেখে দিয়েই চিরুনি নিয়ে নিজের সদ্য বেঁধে দেওয়া চুলেই এলোমেলো করে চালাল। অপরদিকে হিমেল মোবাইলটা সাইডে হেলান দিয়ে রেখেই বহুকষ্টে বেনুনী বেঁধেছে। এর মাঝে মিথি কতবার যে বলল হিমেল পারবে না, ছেড়ে দিতে। চুল অগোছাল থাকলে সমস্যা হবে না। কিন্তু হিমেল শেষ অব্দি বেনুনী করলই। যদিও পার্ফেক্ট হয়নি। অতঃপর বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে মিষ্টিকে উদ্দেশ্যে করে বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৭

“ আম্মুজান? সুন্দর হয়েছে না? হিম পেরেছে না বলো? ”
মিষ্টি উত্তর দিল কি বুঝা গেল না তবে মাথা নাড়িয়ে হা হু বুলি আওড়াল। অতঃপর চিরুনি দিয়ে নিজের চুলের বারোটা বাজিয়ে সে মায়ের চুল দেখছিল। হিমেল তখনই খেয়াল করল যে মিষ্টি নিজের চুলের কি পরিণতি করেছে। বলল,
” এটা কি হলো? কত কষ্ট করে জুটি বেঁধে দিলাম। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৯