Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

হিমেলের সে জ্বরজ্বর মুহুর্তে মিথি সত্যি সত্যিই হিমেলের মাথায় হাত বুলিয়েছে দিয়েছে। হিমেলের পাশেই বসে অনেকটা সময় চুলে হাত বুলিয়েছে। হিমেল চোখ বুঝার পরও কতোটা সময় বোকার মতো চেয়েও ছিল হিমেলের দিকে। একদম সাধারণ একটা পুরুষ।শ্যামবর্ণের গম্ভীর, ভদ্রসভ্য এক পুরুষের মায়া মায়া চেহারা যেন।মিথি চোখ বুঝে রাখা সে মুখপানে তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল ভাবল যে, এই সাধারণ পুরুষটিই কি অসম্ভব যত্নে রাখতে পারে, সম্মান করতে পারে। মিথি কিছুটা সময় পরই ভাবল হিমেল ঘুমিয়ে গিয়েছেে।সাড়াশব্দ তো নেই। কিছুটা সময় তাকিয়েই এও বুঝতে পারল হিমেল ভাই এর চেহারাটা আসলেই মায়া-মায়া।চোখ বুঝে রাখা অবস্থায় বোধহয় আরো বেশি। এইটুকু ভাবতে দেরি অথচ হিমেলের আকস্মিক চোখ মেলে তাকাতে দেরি হলো না। তাও মিথির দিকেই। চোখ মেলে চেয়েই মিথিকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই সর্বপ্রথম বলে উঠল,

“কি আশ্চর্য! মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি বলে হাত বুলানো থামিয়ে দিয়ে কি দেখছিলি মিথি? ”
আকস্মিক কথাটায় মিথি নজর সরাল দ্রুতই। সে যে তাকিয়ে ছিল বুঝে গেছে নাকি? কি আশ্চর্য! কিভাবে? সে তো ভাবল হিমেল ভাই ঘুমিয়ে গিয়েছে। অথচ ঘুমোয়নি। আর এইদিকে বেচারা মিথি আনমনে কখন যে মাথায় হাত বুলানো থামিয়ে দিয়েছিল নিজেই বুঝে উঠে নি । হিমেল এরমধ্যে আবারও বলল,
“ আমায় দেখছিলি নাকি? ”
মিথি এবারে ছোট শ্বাস ফেলে বলল,
“ না। ”
“ তাহলে? ”
“ এমনিই তাকিয়েছিলাম! ”
হিমেল ভ্রু বাঁকায়। শুধাল,
“ এমনিই? ”
এই পর্যায়ে মিথি চোখ মিনমিনে করে তাকাল। একটু তাকানোতে এভাবে জিজ্ঞেস করার কি আছে? মিথি অপ্রস্তুত হলো। উত্তরে হুট করে বলল,

“ আপনার চুল অনেক ঘন তাই দেখছিলাম। ”
মিথি উত্তরটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতেই দিল। উত্তরটা ও কি দিয়েছে হয়তো নিজেই বুঝে উঠেনি। নয়তো কেউ চুল ঘন তা দেখে? হিমেল তাকিয়েই কপাল কুঁচকাল। বলল,
“ ঘন চুল? রিয়েলি? তুই তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলি। চোখাচোখি হলো স্পষ্টই। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। বলল,
“ ঐ আপনার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চোখ গিয়েছে মুখের দিকে। হতেই তো পারে এমনটা। ”
“ হ্যাঁ, হতেই পারে। ”
মিথি নিজের দিকটা আরো পরিষ্কার রাখতে বলল,
” সত্যি ভুলেই আপনার মুখের দিকে চোখ গিয়েছে।আপনি এত জিজ্ঞাসাবাদ করবেন জানলে ভুলেও তাকাতাম না।”
হিমেল ভ্রু কুঁচকায়। তাকিয়ে বলল,

“ আমি কি তোকে বলেছি যে ইচ্ছেকৃত ভাবে তোর চোখ আমার মুখের দিকে এসেছে? ”
“ না। ”
“ তাহলে? ”
মিথি আর উত্তর করল না। কিছুটা সময় চুপ থাকার পর হিমেল আবার প্রশ্ন ছুড়ল,
“ চুপ হয়ে গেলি কেন? ”
মিথি তাকাল। হিমেলের চোখে তাকিয়ে প্রসঙ্গ বদলাতে বলল,
“ আপনার ঘুম হবে না বোধহয়। মাথা ব্যাথা কমাতে চা আনব? চায়ে হয়তো মাথা ব্যাথা কমবে। ”
হিমেল উত্তর করল না। তবে চোখ বুঝল এবারে। মিথি যখন উঠতে নিবে ঠিক তখনই গম্ভীর গলায় বলল,
“ চা করতে হবে না। সমস্যা না হলে এভাবেই থাক আরেকটু। মাথা ব্যাথা কমে আসছে। ”
“ আচ্ছা, ঘুমান তাহলে। ”
হিমেল চোখ বুঝেই মৃদু হাসল। বলল,
“ মাথা ব্যাথা কমলেও ঘুম আসবে না আমার আর বোধহয়।”
“ কেন? ”
“ বহুদিনের না পাওয়া কিছু পাওয়ার আনন্দে। ”
“ হু?”

এবারে হিমেল আর কিছুই বলল না। নিশ্চুপ হয়ে চোখ বুঝে ছিল আর তার প্রিয় মিথিফুলের ছোঁয়া অনুভব করছিল। সে কখনো ভেবেছিল মিথিফুল তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে? এতোটা কাছে বসে সেবাযত্ন করবে? কি আশ্চর্য! হিমেল সত্যিই সংসার করছে তার মিথিফুলের সাথে? বিশ্বাসই হয় না যেন।
আরো অনেকটা সময় কাঁটল ওভাবেই। মিথি এর মাঝেই দুয়েকবার মিষ্টির কাছেও গিয়েছিল। আবার হিমেলের কাছে এসেও কপাল ছুঁয়ে জ্বর পরখ করছিল। হিমেল পুরোটা সময়ই জেগে ছিল, তবে চোখ বুঝে রেখে। এবার ও যখন এল হিমেল তাকাল। প্রশ্ন ছুড়ে জিজ্ঞেস করল,
“ ঘুমাবি না? আমার জন্য রাত জেগে লাভ কি তোর? ”
মিথি একটু আগেই হিমেলের কপাল ছুঁয়েছে। তখনও উত্তপ্ত। জ্বর কমেনি।মিথি ভেবেছিল হিমেল ভাই ঘুমোচ্ছে। অথচ এখন দেখা গেল জেগেই আছে। বলল,

“ আপনি অসুস্থ। ”
হিমেল আড়ালে হাসল মৃদু। জ্বরে চোখ জ্বলছে কিছুটা, মাথা ব্যাথাটাও আছে এখনও। তবুও তার ভালো লাগছে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি কাজ করছে আজ। কেন তা বোধহয় নিজেও জানে না। তবে এইটুকু জানে, তার মন আজ ফুরফুরে। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ আমায় নিয়ে ভাবছিস এত? সব ঠিকঠাক মিথি? ”
“ হু। ”
“ তাহলে ঘরে গিয়ে চোখ বুঝে ঘুম দে।”
তখন প্রায় মধ্যরাত। এতোটা সময় জেগে থেকে মিথির আর ঘুম আসতও না বোধহয়। তাই বলল,
“ এখন আর ঘুম হবে না। আপনি থাকুন, আমি মিষ্টিকে দেখে আসি। ”
মিথি যাওয়ার পথেই হিমেল গম্ভীর শান্তর স্বরে বলল,
“শোন, মিষ্টিকে এখানে আনবি? তোকে তাহলে একবার এঘর, একবার ও ঘর করতে হবে না। ”
মিথি পিছন ঘুরে চাইল। হিমেল ফের বলল,

“ আনবি? ”
“ আনছি। ”
অতঃপর মিথি মিষ্টিকে নিয়ে এসে হিমেলের পাশেই সুন্দর ভাবে রাখল একপাশটায়। এক পর্যায়ে কখন যেন হিমেলের চোখ লেগে এল। মিথি একপাশে বসে দেখছিল দুইজনকেই।

মিথির ও পাশে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে বোধহয় বুঝেনি। মুখটা হাতের উপর ভর দিয়েই চোখ বুজে রাখা। হিমেলের ঘুম ভাঙ্গার পর সর্বপ্রথম এই দৃশ্যটা দেখে সে তাকাল কিয়ৎক্ষন। হয়তো সারারাতই জেগে ছিল। কিভাবে হাতে ভর দিয়ে আছের।ঘাড় ব্যাথা করবে না? এইটুকু ভেবেই ছোট শ্বাস ফেলল। পরমুহুর্তেই ভাবল এমন জ্বর তার রোজ হওয়া দরকার। রোজ রোজ জ্বর হলে রোজ রোজ মিথিও তার জন্য চিন্তা করবে। এইটুকু ভেবেই ঠোঁট এলিয়ে হেসে বিড়বিড় করল,
“ এমন জানলে আমি রোজ রোজ জ্বর নিয়ে বসে থাকতাম মিথিফুল। রোজ রোজ তোর মায়া মহব্বত উপভোগ করতাম।ভালো না? শুধুমাত্র তোর জন্য হলেও আজ থেকে আমার পছন্দের অসুখের নাম হলো জ্বর। ”
এইটুকু বলতে বলতেই মনে হলো মিথি এক্ষুনিই চোখ মেলে তাকাবে। হিমেল সঙ্গে সঙ্গেই চোখ বুঝল। মিথি ততক্ষনে চোখ মেলেছে। এভাবে হাতে ভর দিয়ে থাকার কারণে হাত এবং ঘাড় উভয়ই ধরে আছে যেন। কিয়ৎক্ষন সময় নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই মিষ্টিকে দেখল। তখনও ঘুমোচ্ছে। মিষ্টির পাশে বালিশ দিয়ে খাটের অন্য পাশে এসে হিমেলের কপালে হাত রাখল। জ্বর নেই এখন। ছোটশ্বাস ফেলে হাত সরাতে নিতেই হিমেল চোখ মেলল। বলে উঠল,

“ একটা পুরুষ মানুষের কপালে হাত রাখছিস। একটু পরপর তার ঘরে আসছিস, তাকে দেখছিস। কি আশ্চর্য! তোর কি অবনতি ঘটেছে দেখতে পেয়েছিস মিথি? ”
মিথি বুঝে না। হিমেল ভাই প্রতিবার জেগে যায় কিভাবে? কি আশ্চর্য! উত্তর করল
“ না। ”
“ অথচ আমি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি। ”
মিথি যে পরের সময়টা এই ঘরেই ছিল তা আর বলল না। বলল,
“ আপনি অসুস্থ তাই, আর মিষ্টিকে দেখতে এসেছি। ”
“ শিওর? ”
“ হ্যাঁ।”
হিমেল হাসে মৃদু। বলল,
“ আমিও শিওর। ”

মিথি রান্নাঘরে গিয়ে নাস্তা বানাল। সারারাত জেগে থাকার দরুন মাথাটাও চিনচিন করছিল। চোখ জোড়াও ব্যাথা করছিল বোধহয়। ভাবল গোসল করলে ভালো লাগবের।তাই মিষ্টিকে একবার দেখে গোসল করতেই গেল। গোসল সেরে ফিরে এসে দেখা গেল মিষ্টি ঘুম থেকে উঠেছে। হিমেলের সাথেই বিছানায় বসে এই সেই আওড়াচ্ছে। হিমেল হাসছিল। নিজের গালে ব্রাশটা এককোণে ফেলে রেখে ছোটমতো ব্রাশটা দিয়ে মিষ্টির দাঁত ব্রাশ করাচ্ছিল। মুখে ব্রাশ নিয়েই মিষ্টিকে বোধহয় কিছু বলছিল তবে বুঝা গেল না। হিমেল উপায় না পেয়ে পরমুহুর্তে নিজের ব্রাশটা মুখ থেকে নিয়ে মুখভর্তি ফেনা ফেলে এল। এসেই দাঁত দেখিয়ে বলল,
“ ইইই করো আম্মু। ”

মিষ্টি বুঝল এবারে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই মুখ খুলল।হিমেল হাসে ছোট্ট পুতুলটাকে দেখে। আস্তে আস্তে দাঁত ব্রাশ করিয়ে তারপর কোলে নিয়ে বেসিনের দিকে পা বাড়াতেই মিথি সরে গেল দরজার দিক থেকে। হিমেল ততক্ষনে বেসিনের সামনে দাঁড়াল।এসেই আয়নায় দেখল দুইজনের ঠোঁটের কোণেই সাদা ফেনা। অতঃপর দুইজনেরই মুখ ধুঁয়ে পা এগোল। যেতে যেতে মিষ্টির চুলগুলো হাতের আঙ্গুল দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিতে দিতে বলছিল,
“ তোমার চুল ঘন নাকি হিমের? বলো তো? ”
মিষ্টি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে হিম হিম করতে করতে হিমের চুল আঁকড়ে ধরল। হিমেল হাসে। মিষ্টিকে ফিসফিস করে বলে,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫০

“ আপনি জানেন? আপনার আম্মাজান একটা পাগল। মাথায় সম্ভবত কোন সমস্যা আছে। তাই না? ”
মিষ্টি বুঝল না বোধহয় কথাটা। তবে তাঁকিয়ে থাকল। পরমুহুর্তেই মাথা দুলাল। হিমেল হাসে। অন্যদিকে মিথি তাদের থেকে কিছুটা দূরত্বেই ছিল। স্পষ্টই শুনল তাকে পাগল বলেছে। অথচ উত্তর করল না। পেছন থেকে বলল,
“ হিমেল ভাই, ওকে নিয়ে একসাথে আসুন নাস্তা করতে। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫২