বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
হিয়া যখন হোস্টেলের বারান্দায় উদাস মনে বসে ছিল ঠিক তখনই তার মা কল দিল। কথায় কথায় এটাই জানাল যে তার জন্য কোন এক সুপাত্র পাওয়া গেছে। ছেলেটা সুন্দর, ভদ্র, পরিবারও ভালো। হিয়া চুপচাপ শুনছিল। মায়ের বিবরণে এমন মনে হচ্ছিল যেন এই ছেলের থেকে উত্তম ছেলে দুনিয়ায় আর একটিও নেই। হিয়া ছোটশ্বাস ফেলে। অন্যবার এসব পাত্রী দেখার বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলেও এবার তেমন কিছুই বলল না। বরং মা কিছু বলে উঠার আগেই উত্তর করল,
“ কবে আসছেন উনারা? কাল নাকি পরশু? ”
হিয়ার মা ভাবল মেয়ে বুঝি রাজি নয়। জানাল,
“ এমন করছিস কেন? বিয়ে কি করতে হবে না তোকে? আশ্চর্য! আজ হলেও করবি, কাল হলেও তো করবি। কয়জনকেই বা না করব বল? ”
হিয়া হাসে। বলল,
“ আমি রাজি না তোমায় কখন বললাম? রাজি তো। কখন আসবে বলে দিও। বাড়ি যাব তার আগে দিয়ে।”
“ সত্যিই? মিথ্যে বলছিস না তো? ”
হিয়া ফের হাসল। চোখ টলমল করল কেমন। ফোন রেখেই আকাশপানে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করল,
” যার জন্য এতোটা অপেক্ষা ছিল, এতোটা অনুভূতি ছিল, যে মানুষটার আশায় আমি এতকাল বিভোর ছিলাম সে মানুষটাই তো আজ অন্য কারোর আম্মু। যে মানুষটার সাথে সংসার সাঁজানোর স্বপ্ন দেখেছিলাম সে অন্য কাউকে নিয়ে স্বপ্ন বুনে। আমি তো নেই, তার কোথাও নেই। তবে?কার আশায় নিষেধ আমি? ”
কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে বলতেই হিয়ার গাল গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি। বুক চিড়ে বেরিয়ে এল একমুঠো দীর্ঘশ্বাস। ইশশ! হিয়া কখনো ভেবেছিল কারোর জন্য তাকে এভাবে কাঁদতে হবে? অথচ বিধাতার কি নিয়ম! সে কাঁদছে। একটা ছেলের জন্য যে কিনা তারই সবচেয়ে কাছের বন্ধু, ভালোবাসার মানুষ।
তখন কিছুটা সন্ধ্যা গড়িয়েছে। বিকাশেলের শীতল বাতাসটা তখনও উপস্থিত থেকে বোধহয় অন্তিম মুহুর্তটা বুঝাচ্ছে। মিথি ধীর পায়ে হাঁটে। আজও পরীক্ষা ছিল তার। হিমেলেরও জব থাকাতে মিষ্টিকে রেখে এসেছিল আয়শা খালার কাছেই। তাই দ্রুতই যাওয়ার চেষ্টা করছিল। মাঝপথেই সেদিনের দুই দুটো ছেলের আবারও দেখা মিলল। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। বারবার নিজের থেকে কথা বলতে চাওয়ার অর্থ বোধহয় একটু হলেও বুঝে সে। তাই তো এড়িয়ে যেতে বলল,
“ আমার হাজব্যান্ড অপেক্ষা করছে বাইরে। একটু তাড়া আছে আসলে। ”
ছেলেগুলো মুখ চাওয়াচাওয়ি করতেই মিথি আবারও বলল,
“ তোমরা সরলে আমি যেতাম। বাসায় পিচ্চি মেয়ে রেখে এসেছি তো। যেতে হবে দ্রুত। ”
“ তোমার মেয়েও আছে? ”
“ হ্যাঁ। সেদিন যে এসেছিল? সে আমার হাজব্যান্ড। আর তার কোলে যে মেয়েটা ছিল সে আমার মেয়ে হয়। তোমরা বোধহয় সেদিন খেয়াল করোনি? ”
একটা ছেলে তখন মাথা দুলিয়েই বলল,
“ করেছি করেছি। কিন্তু ওটা তোমার মেয়ে কল্পনাতেও ভাবিনি। ”
মিথি এবারে সৌজন্যতাবোধক হেসে পা বাড়াল। অনেকদূর অব্দি এসে গেইট পেরিয়ে আসতেই এবারে চোখে পড়ল তীর্যক চাহনিতে তাকিয়ে থাকা হিমেলের দিকে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে আয়মানও। মিথি হাসল শুধু। মনে মনে বুঝে নিল যে, আজও বোধহয় হিমেল কথা বলতে দেখে নিয়েছে। নিশ্চয় রেগে আছে? মিথি বুঝে উঠে কিছু বলার আগেই হিমেল বিরক্ত আর দৃঢ় গলায় জানাল,
“ সমস্যা কি ঐ ছেলেগুলোর? তোর সাথেই এত কথা কিসের? তোরও বা ওদের সাথে এত কিসের কথা? পরীক্ষা দিতে এসেছিস, পরীক্ষা দিয়ে চলে যাবি না? ”
” যাচ্ছিলামই তো। ”
“ যেতে যেতে দাঁড়ালি কেন ওরা সামনে আসাতে? ”
” ওরা কথা বলার জন্যই তো দাঁড়াল। কিছু না বলে চলে আসতাম? এটা অভদ্রতা হতো না? ”
হিমেলের চোখমুখ কিছুটা গম্ভীর। আয়মান পাশ থেকে দেখে শুধু হাসছিল। আর হিয়া ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে আছে। হিমেল এবারে মুখ চোখ গম্ভীর রেখেই বলল,
“ ওরা দুদিন পর বলবে ওরা তোকে ভালোবাসে। তুই কি ভদ্রতা দেখিয়ে ওদের রিটার্ন ভালোবাসা গিফ্ট করবি?”
মিথি হতাশ যেন এমনভাবে তাকাল।বলল,
“ কি মনে হয় আপনার? ”
“ তুই যা ভদ্র করলেও করতে পারিস। ভদ্রতা দেখাতে হবে বলে কথা!”
মিথির এবার কিঞ্চিৎ রাগ হলো যেন। শোনাল,
“ হ্যাঁ, করব। তো? আপনার কি সমস্যা? ”
” সমস্যা এটাই যে শুধু হিমেলই ভালোবেসেও রিটার্ন ভালোবাসা পায় না। পায় শুধু অবহেলা আর নাক উঁচু রাখা কথা। কোনদিন দেখবি খুব আফসোস করবি এই ভালো মানুষের দাম দিতে না পেরে। ”
“আমি আপনাকে মোটেই অবহেলা দিই না হিমেল ভাই। নাক উঁচু কথা তে আরো নয়। ”
“ না, তুই কি করে অবহেলা দিতে পারিস? এটা চরম মিথ্যে কথা। ”
মিথি ফের হতাশ। চোখ ছোট ছোট করে দাঁড়িয়ে থেকে পরমুহুর্তে পা বাড়াল। কিন্তু যখন দেখল হিমেল একইভাবে দাঁড়িয়ে তখন ঘাড় বাঁকাল। বলল,
“ যাবেন না? আয়মান ভাই, আপনিও কি যাবেন না? ”
হিমেল চাইল। উত্তরে বলল,
” তুই পা এগো, আমরা আসছি। ”
মিথি তা শুনে সত্যিই পা এগোল। তবে ধীর কদমে। এর ঠিক কিছুটা সময় পরই পিছন থেকে আয়মান আর হিমেল জোরে পা চালিয়ে এল। মিথির পাশাপাশি হাঁটা ধরতেই মিথি জিজ্ঞেস করল,
“ কি করলেন এতোটা সময়? ”
হিমেল অত্যন্ত শান্ত শীতল গলায় বলল,
“ ছেলেগুলো তোর সাথে আর কখনো আগ বাড়িয়ে কথা বলবে কিনা তা শুধু জিজ্ঞেস করে এলাম। ”
মিথি পা চালাতে চালাতে শুধু ভ্রু কুঁচকে চাইল। সত্যি? শুধুমাত্র এই কথাটা জিজ্ঞেস করার জন্য হিমেল ভাই দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষন? আশ্চর্য!
মিথি হিমেল হলে হয়তো রিক্সায় উঠত হিমেল। কিন্তু আয়মান সহ থাকাতে আর আয়মান বলাতেই লোকাল বাসে উঠল তিনজনই৷ সাধারণত অন্যদিন লোকাল বাসে জায়গা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়লেও আজ বাস খালিই ছিল। দু দুটো সিটের জানালার পাশের সিটটায় মিথি বসল, তার পাশেই হিমেল। তার থেকে একটু দূরে আয়মান বসল।অতঃপর পুরোটা পথ হিমেল প্রায় নিশ্চুপই থাকল। মিথিও কথা বাড়াল না। কিন্তু বাসে উঠার অনেকটা সময় পরই টের পাওয়া গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। টের পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক মুহুর্তেই বাসটা গিয়ে ধাক্কা গেল একটা বড় ট্রাকের সাথে। দুটো গাড়িরই বেগ অনেক বেশি থাকাতে এক মুহুর্তেই ঠিক কি থেকে কি হয়ে গেল কেউই বুঝে উঠল না। তবে মিথি শুধু এইটুকু বুঝে উঠতে পারল যে যখন বাসের সামনের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে আসন্ন বিপদটা বুঝে উঠা গেল ঠিক তখনই হিমেল তাকে আঁকড়ে ধরেছিল।
কোনদিন বিনা অনুমতিতে এইটুকুও স্পর্শ না করা হিমেল এমনভাবে মিথিকে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে আগলে রাখতে চেয়েছিল যেন বিপদের একটক বিন্দুও তার প্রেয়সীকে ছুঁতে না পারুক। যেন সকল আঘাত তার প্রেয়সীকে না ছুঁয়ে নিজেকেই ছুঁয়ে যাক তার জন্যই এমন বুকেন ভেতর চেপে ধরল। যেন পারলে নিজের বুকের ভেতরই রেখে দিত। নিঃশব্দে, কোন কথোপকোতন ছাড়াই এই ভালোবাসার অনুভবটা ঐ মুহুর্তে কেই বা ভাবে? কেই বা নিজের কথা বাদ রেখে অন্য কারোর চিন্তা করে? অথচ হিমেল করল। প্রাণপন চেষ্টা কনে মিথিকে আঁকড়ে নির বুকের ভেতর। জানালার কাঁচগুলোও যাতে ভেঙ্গে কোনভাবে মিথির গায়ে না পড়ে তার জন্য হাত দিয়ে যতোটা সম্ভব ওদিক দিয়ে আচ্ছাদিত করল। অথচ শেষ রক্ষা হলো কি? এক মুহুর্তেই হিমেলের বুক থেকে ছিটকে গেল মিথি। প্রচন্ড সংঘর্ষে ঝাঁকি দিয়ে উঠতেই হিমেলও ছিটকে গেল অন্য কোথাও। মিথি যে মুহুর্ত অব্দি তার কাছে ছিল সেই মুহুর্তে হিমেলের মাথা থেকে টপাটপ রক্ত ঝরছিল। এক মুহুর্তেই, একটা অল্প কয়েক সেকেন্ডের ঘটনাতেই হিমেলের শরীর হয়ে গেল ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত! চোখজোড়া হয়ে এল মিনমিনে। যেন বুঝে আসছে। আশপাশ ঝাপসা, খুব ঝাপসা। মাথায় যে খুব যন্ত্রনা হচ্ছে। আচ্ছা, হিমেল কি মারা যাচ্ছে? মিথি? মিথিটা কোথায গেল? যদি মরেও যায়, মরার আগে একবার বিধাতা মিথিকে দেখতে দিবে না? মিষ্টিকে দেখতে দিবে না?
ঐ আকস্মিক দূর্ঘটনার পর ঠিক কতোটা সময় কেঁটেছে জানা নেই। তবে আয়মান জ্ঞান ফেরার পর থেকেই বাসের আশপাশ খুঁজছে। আয়মানের আঘাত খুব অল্প লেগেছেে।কপালে সামান্য চোট আর ডান হাতটা কেঁটেছে। কিন্তু আয়মান খুঁজছে তার বন্ধুকে, হিমেলকে। আর মিথি? মিথির ও বা কি অবস্থা? আয়মানের কেমন যেন কান্না আসে। পুরুষ মানুষ কাঁদে না। কিন্তু এই অবস্থায় বন্ধুর জন্যই তার কান্নাটা আসছে। আশপাশে কতশত মানুষ। কতশত মানুষের ছুটোছুটি। ব্যস্ত এক পরিবেশ। বাসের কোথাও কোথাও রক্ত, কোথাও কাঁচ ভাঙ্গা তো কোথাও মানুষ পড়ে আছে সিটে আটকা পড়ে। আয়মান এসব দেখেই উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক চাইল।হিমেলকে খুঁজমে খুঁজতেই ঠোঁট চেপে বলে বেড়াল,
“ আমার বন্ধু? আমার বন্ধু কোথায়? হিমেল… ”
অতঃপর হিমেলকে খুঁজতে খুঁজতেই একটা সময় পর আয়মান মিথির দেখা পেল। আড়াআড়ি ভাবে পড়ে থাকা দুটো সিটের মাঝখানে পড়ে আছে। শরীরে খুব একটা চোট না থাকলেও মাথার বাম দিকটা কালচে হয়ে আছে। একটু কেঁটেছেও। চোখজোড়া মিনমিন করে খুলে রাখা। যেন কোন আশার আলো দেখার জন্য চেয়ে আছে ঐটুকু! আয়মান দ্রুতই ছুটে গেল। আশপাশে অবস্থা দেখে যা বুঝল দূর্ঘটনার বেশি সময় হয়নি। আয়মানের বোধহয় খুব তাড়াতাড়িই জ্ঞান ফিরেছে। নয়তো এতোটা সময় সবাইকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হতো। দুয়েকজনকে অবশ্য দেখা যাচ্ছে আহতদের নিয়ে যেতে। বাকি সবাই যার যার মতো ছবি তুলছে, ভিডিও করছে আর রং তামাশা দেখছে। আয়মান ছুটে গেল মিথির কাছে।তখনও মিথির চোখ অল্প একটু খোলা। তবে বুঝে যাচ্ছে মেয়েটার চোখ। যেন আর চোখ খোলা রাখা সম্ভব হচ্ছে। আয়মান চেয়ে থেকে মাথাটা হাঁটুতে নিয়ে ডেকে বলল,
“ এই, এই মিথি! মিথি লেগেছে খুব তোমার? এই মিথি? চোখ বুঝে নিচ্ছো কেন? মিথি বোন আমার। চোখ বুঝো না। শোনো, শোনো মিথি। ”
মিথি পারল না। শরীরটা কেমন অসার হয়ে এসেছে।শরীরের ভার নেওয়ারও তার ক্ষমতা নেই৷ সামান্য কথা টুকু বলারই ক্ষমতা পাচ্ছে না সে। মিথি অসার শরীরটা এলিয়ে আছে যেন। আস্তে আস্তে খুলে রাখা চোখজোড়া ও বুঝে নিল মেয়েটা। কোনরকমে ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ হি হিমেল ভাই কোথায় আয়মান ভাই? একটু দেখুন না। উনি কোথায়..”
কন্ঠটা বারবার জড়িয়ে আসছিল যেন। গলা দিয়ে স্বর আসছে না যেন। তবুও বলল কোনরকমে। অথচ ঐটুকু বলার পরপরই মিথির আর কোন হুশ থাকল না। শরীর সম্পূর্ণ এলিয়ে দিয়ে মেয়েটা চোখ বুঝে নিয়ে জ্ঞান হারাল বোধহয়। আয়মান চেয়ে থাকে। অজানা ভয়ে মিথির এভাবে এলিয়ে পড়া দেখে নাকের সামনে হাত রাখল। না নাহ! মিথি বেঁচে আছে। আয়মান শুকনো ঢোক গিলে আবারও ডাকল,
“ এই মিথি। এই? ”
আয়মান কেঁদে ফেলবে যেন এবারে। আশপাশে নিজের বন্ধুকেও কোথাও না দেখতে পেয়ে এবারে সত্যিই কেঁদে ফেলল ছেলেটা। চ্যাক শার্টের হাতায় চোখের পানি গুলো মুঁছতে মুঁছতেই বলল,
“ কিসের মধ্যে ফেললা আল্লাহ! এটা কি বিপদ আনলা।”
ফের আবারও মিথির গালে চাপড় দিয়ে বলল,
“ মিথি, মিথি শুনছো? ”
আয়মানের অসহায় লাগে। এর আগে এমন মুহুর্ত সে কখনো পার করেনি। কখনো না। কিন্তু আজ পার করছের।একেকটা সেকেন্ড যেন একেকটা কঠিন ধাপ তার জন্য। আয়মান দিশেহারা হয়ে উপায় না পেয়েই জানালার বাইরে ছুটতে থাকা লোক দুটোকে বলল,
“ এই ভাই, এই, ওকে একটু বাঁচান না ভাই। ও আমার বন্ধুর প্রাণ। একটু বাঁচার ওকে। একটু জল দেন না ভাই। আমি ওর মুখে ছিটিয়ে দেই…”
লোকগুলো শুনল সত্যিই। আয়মানের কান্না আর আহাজারি দেখে ব্যস্ত হয়ে এগিয়েও এল। তারপর, তারপর কিছুটা সময় পর মিথিকে ওখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো। আয়মান তখনও হিমেলকে আশপাশে খুঁজছিল দিশেহারা হয়ে। বারবার স্বেচ্ছাসেবক ছেলেগুলোকে বলছিল,
“ ভাই, আমার বন্ধু? আমার বন্ধু ছিল আমার কয়েক সিট পেছনে। পাচ্ছি না কেন আমার বন্ধুকে আমি। হিমেল, নাম হিমেল ভাই। একটু খুঁজে দেন না। আমার বন্ধু কালো সাদা চ্যাক শার্ট পরেছে ভাই। লম্বা, আমার বন্ধু লম্বা মতো দেখতে। একটু খুঁজে দেন ভাই। দেন না…”
আয়মানের এমন আকুতি মিনতিতে ঐ ছেলেগুলোও সত্যিই আটকে যাচ্ছিল। কষ্ট হচ্ছিল। বন্ধুর জন্য কেউ এভাবে কাঁদে? এভাবে আহাজারি করে? মানুষ তো প্রেমিকার জন্যও এমন করে না। ছেলেগুলো আয়মানকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল কেবল। বলছিল যে খুঁজে দিবে । পেয়ে যাবে অবশ্যই। এর মধ্যেই বাসের এককোণে দেখা গেল হিমেল বাম হাতে থাকা ঘড়িটার মতোই হুবুহু একটা ঘড়ি। আয়মার ঐ ঘড়িটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিল। বাচ্চাদের মতো করে বলল,
“ ভাই দেখেন? এটা আমার বন্ধুর ঘড়ি ভাই। আমার বন্ধুর হাতে ছিল ভাই এই ঘড়িটা। কেউ একটু খুঁইজা দেন না হিমেলরে…”
ছেলেগুলো না পেরে বুঝিয়ে শুনিয়ে কোনভাবে আয়মানকে এক জায়গায় বসাল। শান্ত হতে বলল। বলল যে ওরা দেখছে। ঠিক তার মধ্যেই আয়মানের জিন্সের প্যান্টের পকেটে থাকা ফোনটা বেঁজে উঠল। আয়মান প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফোন বের করে কল রিসিভড করল। ফিজা নামটা দেখেই ফের কেঁদে ফেলল সে। হতাশ গলায় জানাল,
” ফিজা, ফিজা আমি, আমি বোধহয় মিথি আর হিমেলকে রাখতে পারলাম না ফিজা! ফিজা ওরা..”
আয়মানের গলা ভাঙা। কাঁপছে কেমন। কথাগুলোও খাপছাড়া। ফিজা বুঝে উঠে না। প্রশ্ন ছুড়ে,
“ আয়মান? কিসব বলছো? কাঁদছো কেন এভাবে তুমি? এই? কি হয়েছে? ”
আয়মান বহু কষ্টে ঠোঁট চেপে নিজের কান্না দমানোর চেষ্টা চালাল। বলল,
“ ফিজা, হিমেল টা কে পাচ্ছিনা। আমার বন্ধকে পাচ্ছি না। আমার বন্ধর নিঃশ্বাসটা যদি বন্ধ হয়ে যায়? ফিজা আমার বন্ধুকে খুঁজে দাও না.. ”
ফের আবারও বলল,
“ ফিজা মিথি না কেমন নুইয়ে গেছে। মিথিও চোখ খুলছে না। আমি এত করে ডাকলাম তাও মেয়েটা চোখ খুলছে না। কি করব আমি ফিজা? হিমেল জানলে তো আমি আজীবন খারাপ হয়ে যাব। ওর ভালোবাসার মানুষটাকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে তো ও নিজেই মরে যাবে বলো। ”
ফিজা আর শুনতে পারল না। আয়মান নিশ্চয় মজা করছে?কিসব বলছে। গলা শক্ত করে বলল এবারে,
“ আয়মান স্টপ। কিসব আজেবাজে বলছো। ওদের কি হবে হু?তুমি এসব কি বলছো? ”
আয়মান কি উত্তর দিবে? কি বলবে? ফের বলল সে,
” আমি তো বেঁচে গেলাম ফিজা। ওরা, ওরা বাঁচবে তো? আল্লাহ ওদের বাঁচাবে তো? বলো না।”
ফিজা কিয়ৎক্ষন চুপ থাকল এবারে। আয়মানের কন্ঠটা আজ অন্যরকম। যেন কাঁদছে। চাপা কান্না। ফিজা চোখ বুঝে। যেটা ভাবতে চাইছে না ঠিক সেটাই মাথাতেই আসছে। তাই তো দ্রুত প্রশ্ন ছুড়ল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৬
” কোনভাবে এক্সিডেন্ট করেছো তোমরা আয়মান? সত্যিটা বলো, এক্সিডেন্ট হয়েছে না? ”
আয়মান কথা বলে না। ফিজা আবারও ছটফট করতে করতে শুধাল,
“ আয়মান, এই এই আয়মান তুমি ঠিক আছো? ঠিক আছো তুমি? জায়গার নাম বলো। নাম বলো আমায়। আসছি আমি এক্ষুনি। ”
