Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৮

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৮
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মিথি খুব বেশি আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও মাথায় চোট পাওয়ার কারণে কপালের অংশটা কালচে হয়ে আছে। আরো অল্পকয়েক আঘাত পেলে গুরুতর কোন ক্ষতি হয়নি তার। যার কারণে হসপিটালে নেওয়ার পরপরই জ্ঞান ফিরেছে তার। আর ঠিক এর পর থেকেই মিথি দিশেহারা হয়ে পাগলের মতো কেঁদেই যাচ্ছে। আশপাশে কাউকেই পায়নি সে জ্ঞান ফেরার পর থেকে। শুধু এইটুকু মনে আছে, একটা আকস্মিক দূর্ঘটনা, একটা জোরে ধাক্কা আর তার হিমেল ভাই এর তাকে আগলে নেওয়া। আর এরপরপই ছিটকে সরে যাওয়া। এর পরের টুকুতে শুধু আয়মানের তখনকার ডাকার কিছুটা মুহুর্ত মনে আছে। জ্ঞান ফেরার পর থেকেই মিথি কাঁদতে কাঁদতেই উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হসপিটালের প্রতিটা জায়গায় খুঁজল। অসহায়ের মতো এদিক ওদিক চেয়ে ভাবল, এই বুঝি সে হিমেল ভাইকে খুঁজে পাবে। এই বুঝি হিমেল ভাই সামনে দাঁড়াবে। অথচ পেল না। যে মানুষটা দূর্ঘটনার আঁচ বুঝতে পেরেও শেষ মুহুর্ত অব্দি তাকে আগলে রেখেছিল সে মানুষটাকে মিথি পুরো হসপিটাল খুঁজেও যখন ফেল না তখন চিন্তায়, অস্থিরতায় মিথির কান্নারা দ্বিগুণ হয়। হাত পা কেমন কাঁপছে মেয়েটার।গলা ইতো মধ্যেই শুঁকিয়ে এসেছে। মিথি অসহায়ের মতো ছুটে ছটেই এবারে নার্সদেরকে জিজ্ঞেস করল,

” শুনুন, শুনুন না?হিমেল নামের কেউ আছে এখানে? ঐ যে ঐ বাসেই ছিল। ঐ এক্সিডেন্টরর আগ মুহুর্ত অব্দিও আমার সাথে ছিল। দেখেছেন উনাকে? বলুন না, উনি কোথায়? কোন ওয়ার্ডে আছেন? একটু বলুন না? ”
দুয়েকজন নার্স খুব ব্যস্ততার কারণেই মিথিকে একপ্রকার অবহেলায় ছুড়ে রেখে চলে গেল। মিথি তখন পাগলপ্রায়। হিমেল ভাই এর কিছু হয়নি তো? কোথায় হিমেল ভাই? যে হিমেল ভাইকে মিথি এতগুলো দিনে চিনে সে হিমেল ভাই সজাগ থাকলে তো অবশ্যই এতক্ষনে মিথির কাছে ছুটে আসত। আসত তো! কিন্তু আজ এল না। মিথি খোঁজা সত্ত্বেও পেল না। মিথি অসহায়ের মতো হসপিটালের ঐটুকু ফ্লোরেই বসে পড়ল। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় বিড়বিড় করল,
“ আল্লাহ, আল্লাহ হিমেল ভাই এর কিছ করো না। কিছু করো না আল্লাহ। এই শেষবার তোমার কাছে কিছু চাইছি আল্লাহ। তাকে সুস্থ রাখো, তাকে বাঁচিয়ে রাখো আল্লাহ। তার এত এত ভালোবাসার বিনিময়ে যে আমি তাকে এখনো সামান্য এই কথাটাও জানিয়ে উঠতে পারিনি যে মনের অজান্তে আমিও তাকে ভালোবেসেছি। আমিও তার মাঝে ধীরে ধীরে জড়িয়ে গিয়েছি! আমি তো এইটুকু জানিয়ে তাকে খুশি করতে পারলাম না আল্লাহ। আমার হিমেল ভাইকে আরেকবার, আরেকবার তুমি আমার জীবনে দিও আল্লাহ। আমি একটুও অবহেলা করব না। একটুও না। ”
মিথি এইটুকু বিড়বিড় করেই দেওয়ালে এলিয়ে পড়ল। যেন উঠার মতো বিন্দুমাত্র শক্তিটুকুও নেই মেয়েটার। চেষ্টাও নেই। এক ক্লান্ত, জরাজীর্ণ দেহ কেবল।

আয়মান বহু খোঁজাখুঁজির পর হিমেলকে পেয়েছে। হিমেলের মাথায় বেশ গুরুতর আঘাতই পেয়েছে। বাস থেকে প্রথম দিকে যে যাত্রী গুলোকে আনা হয়েছিল হসপিটালে হিমেলও তাদের মধ্যেরই একজন। কারণ ঘটনাস্থলেই তাদের অবস্থা ছিল ভয়ানক। এরপর সরকারি হসপিটালে আনার পরই যাদের যাদের অবস্থা খুব বেশি খারাপ তাদের শিফ্ট করা হলো অন্য একটা হসপিটালের।যার মধ্যে হিমেলও আছে। এমনকি তাদের মধ্যে থেকে ইতোমধ্যে চারজন মারা ও গিয়েছে। আয়মান শুধু মনে মনে উপরওয়ালাকে ডাকছিল। যেন তার বন্ধুকে বাঁচিয়ে দেয়। যেন তার বন্ধুকে সুস্থ করে দেয়। এই যে বন্ধুত্বে এত মজা, হৈ- হুল্লোড় সব এখন আয়মানের কান্নায় পরিণত হয়েছে। ঠিক এই মুহুর্তেই এসেই আয়মানের অনুভব হলো হিমেল তার জীবনের কতোটা অংশ। কতোটা জুড়ে আছে। হিমেলকে ছাড়া সে অর্থহীন! আয়মানের অবস্থা বিধ্বস্ত। এলোমেলো চুল। শার্টটা ঘামে চুপসে লেপ্টে আছে শরীরে। চোখজোড়াও এতোটা সময়ে মারাত্মক লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আয়মানের পা চালাতে ইচ্ছে হয় না। তবুও পা চালাতে হচ্ছে। এক হসপিটালে বন্ধুকে শনাক্ত করে, নাম -ঠিকানা সব জানিয়ে এসে এখন অন্য হসপিটালে যাচ্ছে বন্ধুর ভালোবাসার মানুষের খোঁজ নিতে। হিমেলকে সে হসপিটালে রাখা হয়েছে সে হসপিটালে এক ডক্টর তার চেনা। আসার সময় বলে এসেছে হিমেলের প্রতি খেয়াল রাখতে, ঘটনার আপডেট যাতে সঙ্গে সঙ্গেই জানায়। এইটুকু বলেই সে রওনা হলো। অল্প সময় পরই এল মিথিকে যেখানে আনা হয়েছিল সেখানেই। তারপর এসেই খোঁজ করেও যখন মিথিকে পেল না তখন কপাল কুঁচকাল আয়মান। ক্লান্ত পায়ে পা বাড়াতেই দেখা গেল হসপিটালের এত এত মানুষের ব্যস্ততার মাঝে দেখা গেল একটা মেয়েলি প্রতিচ্ছবি। দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে কেমন এলোমেলো, বিধ্বস্ত হয়ে বসা। চোখ মুখ ফুলে আছে মেয়েটার। চোখে তখনও অশ্রু। এলোমেলো চুলগুলো মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেন অগোছাল একটা বিধ্বস্ত রূপ মেয়েটার। ক্লান্তি, অবসন্নতা, মলিনতা আর বিষাদরা এসে ভর করেছে তার মুখের সবটুকুতে। আয়মান এগোল। মিথির সামনে গিয়েই নরম করে ডাক দিল,

“ মিথি? ”
মিথি এই পর্যায়ে আশা হারানোর মধ্যেও একটুকরো আলো এলে যেভাবে তাকায় ঠিক সেভাবেই চাইল। বসা থেকে হুট করেই মেয়েটা উঠে দাঁড়াল এক মুহুর্তেই। আবারও প্রলাপের ন্যায় বলল,
“ আয়মান ভাই, আয়মান ভাই বলুন না হিমেল ভাই কোথায়? উনাকে পাচ্ছি না কেন আমি? একটু বলুন না কোথায়? আমার উনার সাথে কথা আছে আয়মান ভাই। উনাকে বলুন না একবার আসতে, একবার আমার সামনে দাঁড়াতে বলুন না। এতোটা সময় খুঁজলাম, কোথাও তো পেলাম না উনাকে। ”
আয়মান দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কাঁমড়ে ধরল। মিথিকে এই অবস্থায় সে কখনো দেখেনি। স্বভাবতই মিথিকে দেখে এসেছে এক শক্ত মনোভাবের মেয়ে হিসেবে। কিন্তু এই মেয়েটাও এভাবে ভেঙ্গেচূড়ে চূড়মার হতে পারে কে জানত? আয়মান চোখ বুঝে। সঙ্গে সঙ্গেই গড়িয়ে গেল চোখের পানি। তারপরই চোখ খুলে শান্ত কন্ঠে জানাল,
“ হিমেল কে অন্য একটা হসপিটালে এডমিট করা হয়েছে মিথি। কান্না করো না, শান্ত হও। ”
মিথি শুনল। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ঠিক এর পরের মুহুর্তেই বলল,

“ ভালো আছে হিমেল ভাই? ভালো আছে তো হিমেল ভাই? বলুন না আয়মান ভাই। ভালো আছেন উনি? ”
আয়মান শুকনো ঢোক গিলল। এর পরের মুহুর্তে ঠান্ডা গলায় বলল,
“ ভালো নেই, তবে ভালো হয়ে যাবে মিথি। প্রার্থনা করো যাতে ঠিক হয়ে যায় ও। ”
“ আয়মান ভাই, আমাকে নিয়ে যাবেন একটাবার? আমি হিমেল ভাই এর কাছে যাব। আমি যাব আয়মান ভাই। উনাকে যে অনো কিছুই বলা হয়নি আমার। অনেককিছু জানানো হয়নি। ”
আয়মান তখনও সোজা হয়ে দাঁড়ানো। উত্তর করে না। আধৌ তার বন্ধুটা থাকবে সবটুকু জানার জন্য? থাকবে তো? আয়মানের মুখচোখ কেমন গম্ভীর। শেষটুকুতে শুধু বলল,
“ চলো। ”

মিথি সঙ্গে সঙ্গেই পা চালাল। বুকের ভেতর চাপা এক অস্থিরতা তাকে খুব যত্ন করে ভাঙছিল। ঠুকরে ঠুকরে করে শেষ করছিল যেন। মিথির তখনকার ধ্যান- জ্ঞান শুধু এইটুকুই ছিল যে একবার হিমেল ভাই এর কাছে পৌঁছানো। একবার, একবার অন্তত হিমেল ভাইকে জানাবে যে সেও হিমেল ভাইকে ভালোবাসে৷ এইটুকু ভাবনা নিয়েই যখন মিথি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো, আয়মানের সাথে রিক্সায় উঠল ঠিক তখনই আয়মানের একটা কল এল। আয়মান কল তুলতেই ওপাশ থেকে জানাল,
“ ভাইয়া, আপনার পেশেন্টের অবস্থা গুরুতর। দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি আসুন ভাইয়া। আল্লাহকে ডাকেন। উনার অবস্থা খুব একটা ভালো না। ”
লাউড স্পিকারে না থাকলেও পাশাপাশি বসে থাকার কারণে কথাগুলো মিথিও শুনল। আয়মানের দিকে মুহুর্তেই ফিরে চাইতেই আয়মান কাতর স্বরে বলে উঠল,
“ প্লিজ প্লিজ সাইমুন একটু চেষ্টা করো ওকে বাঁচানোর। আমার বন্ধু হয়। আমার বন্ধুকে ছাড়া আমি নিজেকে ভাবতেই তো পারি না। প্লিজ সাইমুন একটু চেষ্টা করো না। তুমি তো ডক্টর। প্লিজ। ”
মিথি সবটাই শুনল। ওপাশ থেকে যখন কল রেখে দেওয়া হলো মিথি তখন শান্ত ভাবে তাকানো। এতোটা সময় উদ্ভ্রান্তের ন্যায় পাগলামো করলেও এবার সে শান্ত, স্থির হয়ে চেয়ে থাকল।অভিমান, অভিযোগ সব মুখভঙ্গিতে এনে বলল,

“ আয়মান ভাই, রিক্সাটা আরেকটু জোরে চালাতে বলুন না প্লিজ। আমি হিমেল ভাই এর কাছে পৌঁছাতে চাই। আরেকটু জোরে চালান না মামা। হিমেল ভাই খুব যন্ত্রনা পাচ্ছে। চলুন না। ”
শেষ কথাগুলো রিক্সাওয়ালা মামাকেই বলল মিথি। আয়মান শুধু দেখল। এ মিথিকে সে নতুন দেখছে। সত্যিই! মিথি যে হিমেলকে ভালোবাসে এই দিনটা না এলে বোধহয় কখনো সে বিশ্বাসও করত না। মিথি ফের আবারও আয়মানের দিকে টলমল চোখে চেয়ে অভিমানী সুরে বলল,

” আমি খুব অপরাধী তাই না বলুন? যে পুরুষটি আমায় এতোটা ভালোবেসেছে,আমায় এতোটা আগলে রেখেছে, যত্ন করেছে আমি তাকে কখনো ভালোবাসা প্রকাশই করলাম না। ভালোবাসলামই না! খুব বড় অপরাধ বলুন? এই অপরাধের শাস্তি কি উনি আমাকে এভাবে দিবেন? ছেড়ে চলে যাবেন আমায়? উনাকে বলুন না থাকতে। আমাকে সারাজীবন আগলে নিতে। চলেই যদি যাওয়ার হয় তাহলে এইটুকু সময়ে যত্নের অভ্যাসে অভ্যস্ত করলেন কেন? ”
আয়মান উত্তর করে না। বোধহয় মিথির অবস্থাটা সে টের পাচ্ছে! ঐ যে ভালোবেসেও জীবিত অবস্থায় কখনে ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার অপরাধবোধ। মিথি যে হিমেলকে ভালোবাসে তা তো স্পষ্টই৷ শুধু এতকাল প্রকাশ করেনি। মিথি ফের আবারও বলল,
“ আমি খুব বড় অপরাধ করেছি। এই অপরাধের শাস্তিটুকু উনি চাইলে মওকুফ করতেই তো পারে আয়মান ভাই?মওকুফের বিনিময়ে দরকার হলে আমি আজীবন তার কথা শুনব, ভালোবাসায় বন্দি হবো। আমার, আমার তো উনাকে আরো আগেই ভালোবাসা কথা জানানো উচিত ছিল। কেন জানালাম না? ”
মিথি যখন এইটুকু বলে ফুফিয়ে কেঁদে উঠল ঠিক তখনই আয়মানের ফোনে দ্বিতীয়বার কল এল। এবারে, এবারে ওপাশ থেকে খবর এল,

“ ভাই, হি ইজ নো মোর। আমরা, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি ভাই। পারিনি। তাকে রাখতে আর পারলাম না ভাই৷ ”
আয়মান শুনল অবিশ্বাস নিয়েই। মিথিও শুনল পাথরের ন্যায় বসে থেকেই। রোবটের ন্যায় ঘাড় বাঁকিয়ে দ্রুত বলল,
“ কিসব বলছে উনি আয়মান ভাই?কার কথা বলছে? আমার হিমেল ভাই, আমার হিমেল ভাই কেমন আছে? হিমেল ভাই এর কথা জিজ্ঞেস করুন না একবার। ”
আয়মান তখনও চুপ। মিথি আবারও পাগলামো করে বলল,
” আপনি কিছু বলছেন না কেন হুহ? বলছেন না কেন আয়মান ভাই?হিমেল ভাই এর কথা জিজ্ঞেন করছেন না কেন একটাবারও। আপনি না উনার বন্ধু হুহ? তাহলে? কার কথা শুনছেন আপনি? ”
আয়মান ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল শুধু। পরমুহুর্তেই শান্ত স্থির কন্ঠে বলল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৭

“ মিথি, ওটা হিমেলই। হি্‌ হিমেল আর নেই মিথি। আমার বন্ধুটা আর নেই আমার জন্য। ”
এইটুকু বলে এবারে আয়মানও কেঁদে উঠল। মিথি শুধু টলমলে কান্নারত চোখে দেখে গেল এক বন্ধুর আর্তনাদ, কান্না আর বন্ধু হারানোর যন্ত্রনা। হিমেল ভাই এটা করতে পারল? কি করে?কেন করল হুহ?কিসের শাস্তি দিয়ে গেল তাকে? ঠিক সময়ে ভালো না বাসার শাস্তি?

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৯