বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৪
ইসরাত জাহান দ্যুতি
❝ফুটনোট চেক করবেন অবশ্যই৷ এবং কেউ কপি করবেন না কাইন্ডলি৷ শেয়ার করার অনুমতি আছে কেবল।❞
খোঁচাটা একদম সঠিক স্থানে দিতে পারল সৌভিক। অপরাধীর মতো দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে ফেলল মারিশা। আশফির চোখে আর চোখ রাখার সাহসটা হলো না ওর।
কিন্তু আশফি চেয়ে রইল নিষ্পলক। সৌভিকের কথাতেই বোধ হয় এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের পর্দায় ভেসে উঠল সেদিনের চিত্রটা—যেদিন মিরান এসেছিল এক বিধ্বস্ত প্রায় রূপে। টাই ঢিলে হয়ে ঝুলছিল‚ ইন করা শার্টের এক কোণা বেরিয়ে ছিল প্যান্টের বাইরে। চোখ-মুখ তার লাল টকটকে‚ আর ঢেউ খেলানো চুলগুলো ছিল অগোছাল। ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে এক বিরাট অপরাধীর বেশে। ও তখন ধৈর্যহীনভাবে মারিশাকে খুঁজছিল মিরানের পেছনে। ভেবেছিল‚ কোনো চমক দিতেই হয়তো বোনের কথাতে নাটক জুড়েছে মিরান। কিন্তু সে ভাবনা বেশিক্ষণ টিকেনি ওর। স্যুটের পকেট থেকে হঠাৎ একটা কাগজ বের করে মিরান বাড়িয়ে দিল ওকে। অবনত মস্তকে আর ভাঙা স্বরে তারপর জানাল‚ “চলে গেছে রে ও। ওর বাবার ডাকে… বাবার কাছে। কবে‚ কখন টিকিটটা কেটে রেখেছিল‚ টেরও পাইনি! পারলাম না‚ ভাই‚ ওকে আটকে রাখার ক্ষমতা আমার হলো না!”
হাস্যরসাত্মক পরিবেশেটা কেমন গুমট ধরে গেল মুহূর্তেই৷ আশফির দৃষ্টি সীমানা থেকে দূরে যেতে মারিশা নিজের তাঁবুতে গিয়ে ঢুকে পড়ল৷ বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশফিও আর দাঁড়াল না৷ চারপাশ থেকে জোগাড় করা শুকনো কাঠ আর ডালপালা দিয়ে তাঁবু থেকে সামান্য দূরে‚ মাটিতে ছোটো একটা গর্ত খুঁড়ে ফায়ার ক্যাম্প তৈরি করতে লাগল। কাঠগুলো হালকা জ্বলে উঠতেই আগুনটা বড়ো হলো‚ আর সে আলোয় চারপাশের ঘন বন আরও রহস্যময় লাগতে শুরু করল যেন।
রান্না শেষ করে পরাগ‚ দিব্য আর সৌভিক তাঁবুর কাছে ফিরে এল। কিন্তু হৃদয়কে যেতে দিল না দিলিশা৷ খুব উতলা হয়ে জিজ্ঞেস করল‚ “কী বলছিলে তোমরা এসব? মজা করছিলে বোলো না। সৌভিক কথাটা বলার পরই মারিশা কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল‚ আর আশফিকেও দেখাচ্ছে কেমন বিষণ্ণ…!”
কথাটা বলে আগুন জ্বালতে থাকা আশফির দিকে তাকাল সে৷ তারপর জিজ্ঞেস করল‚ “ওদের মাঝে কিসের সম্পর্ক‚ হৃদয়?”
“সিরিয়াসলি! তুমি তো বুদ্ধিমতী জানতাম…”‚ হৃদয় বিদ্রূপ সুরে বলল‚ “এখনো টের পাওনি কী সম্পর্ক থাকতে পারে?”
“তার মানে কি মিরানের বোনই ছিল আশফির সেই মানুষটা?” খুবই অবাক হলো দিলিশা।
বছর তিন আগে আশফিকে সে নানাভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সবটা বুঝেও আশফি কখনো গুরুত্ব দিত না তাকে৷ তাই একদিন সরাসরি ব্যক্ত করেছিল নিজের ভালোবাসা। আর সেদিন আশফি বেশ রূঢ় হয়ে না করে দিয়েছিল৷ তাই কষ্ট পেয়েছিল দিলিশা খুব। তারপর দিব্যর কাছ থেকে সেদিন কেবল এতটুকুই জানতে পেরেছিল‚ কোনো এক বিদেশিনীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটেছে আশফির। যাকে ও ভুলতে পারেনি। সেই বিদেশিনী কে‚ কতটা গাঢ় সম্পর্ক ছিল মেয়েটার সঙ্গে‚ এসব কিছুই জানার আগ্রহ হয়নি তার। শুধু গুরুত্ব দিয়েছিল নিজের ভালোবাসাকে—যে ভালোবাসা কতখানি তীব্র করলে আশফি ওই মেয়েটাকে ভুলে তার ভালোবাসাকে গ্রহণ করবে‚ শুধু সেটাই ভেবেছিল।
কিন্তু তারপরই একদিন বিনা নোটিশে হারিয়ে গেল আশফি। কোথায় গেল তার হদিসও জানতে পারল না কেউ। মাঝেমধ্যে দিশানকে ফোন করে জানাত‚ সে ভালো আছে। খোঁজ নিলে দেখা যেত‚ কোনো এক টেলিফোন বুথ থেকে ফোনটা করেছিল৷ এভাবেই দুটো বছর চলে গেল৷ তারপর একদিন হঠাৎ করে দেশে ফিরল সে। রিসোর্টের ব্যবসা করবে বলে ব্যবসার জন্য একদিন দিলিশার বাবার কাছে ফোন করে নানারকম পরামর্শ চাইলো। কারণ‚ ছেলে আলাদা ব্যবসা করবে শুনে মাহবুব সাহেব বাড়িতেই আর জায়গা দেননি ওকে। দিশানও ভারি বিরক্ত ছিল ভাইয়ের প্রতি৷ বড়ো ভাইয়ের অফিসের দায়িত্ব তখন তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিনা! তাই চাচাকে ফোন করে বলত‚ কোনোভাবেই যেন আর্থিক সহায়তা না দেওয়া হয় ভাইকে। এমনকি মাহবুব সাহেবও কড়া গলায় বলেছিলেন‚ “ওকে এক পয়সা দিয়ে যদি আদর দেখাস‚ আমার বাড়িতে আর জীবনে পা দিবি না।”
কিন্তু চাচা বরাবরই আশফিকে ভালোবাসেন খুব৷ ভাইয়ের হুমকি-ধমকিকে ভয় না করে নিজেই আশফিকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেন ব্যবসার জন্য৷ সে থেকেই দিলিশা আরও বেশি সুযোগ পেয়ে যায় আশফির কাছাকাছি আসতে। যেহেতু চাচার থেকে এত বড়ো সাহায্য নিয়েছিল সে‚ সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে আশফিও খু্ব একটা এড়িয়ে চলতে পারেনি তাকে৷ তবে ধীরে ধীরে একটা সময়ে দুজনের মাঝে সম্পর্কটা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ‚ দিলিশা নিজের অনুভূতি ওর কাছে আর জাহির করতে যায়নি‚ জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করেনি৷ তবে পারিবারিকভাবে সম্পর্কটা স্থাপন করার চেষ্টা করেছে সে অবিচলভাবে। তার সেই প্রচেষ্টা সফলও হয়েছে। বাবার তো সম্মতি ছিলই, এবার মাকেও সে রাজি করিয়েছে। মাহবুব সাহেবও ভাইয়ের থেকে প্রস্তাব পেয়ে সম্মতি দিয়েছেন। এ সুখবরটা এখন অবধি তারা চারটি মানুষ ছাড়া আর কেউ জানে না। এবার আশফিকে জানাতেই সে এতটা পাগলের মতো ছুটে এসেছে তার কাছে।
হৃদয়কে শয়তানি হাসি হাসতে দেখে দিলিশা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ল‚ “প্লিজ‚ হৃদয়‚ খুলে বলো আমাকে। ওরা কি তাহলে প্যাচআপ করে নিয়েছে? আশফি মেনে নিল এত সহজেই?”
“সে আমি জানি না‚ ওদের মাঝে ঠিক কী চলছে। সব তো তোমার চোখের সামনেই ঘটছে। তুমিই বুঝে নাও‚ ওরা প্যাচআপ করে নিয়েছে কি-না!”
“হৃদয়‚ প্লিজ! কথা পেঁচিয়ো না৷ আমার লাইফটা জড়িয়ে এখানে৷ আমাকে ঠিক করে বলো সবটা। সৌভিক বাসর ঘরে বিচ্ছেদের চিঠির কথাটা দিয়ে কী বোঝাল আসলে?”
“আমি এত কিছু বলতে পারব না রে‚ বোন। যার বিষয় তার থেকেই জেনে নিয়ো”‚ কথাটা বলেই হৃদয় উঠে চলে এল পরাগদের কাছে।
খাবারের আয়োজন শেষে সৌভিক আশফিকে ডাকল। আর দিব্য ডেকে আনল মারিশাকে। কিন্তু খেতে বসে তখনো সহজ হতে পারছিল না মারিশা। ওর অস্বস্তিটা টের পেল সবাই-ই৷ দিলিশা বাদে ওরা সবাই তাই চেষ্টা করল পরিবেশটাকে উপভোগ্য করতে৷ আশফিই শুরু করল গল্পগুজব। গল্পের এক পর্যায়ে বন্য জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ল ওর৷ ও সেবার প্রথম পা রেখেছিল আফ্রিকার সেরেনগেটি তৃণভূমিতে। অ্যাডভেঞ্চারের পূর্ণ স্বাদ নিতে গিয়ে লাভ করেছিল এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুহূর্ত৷ যে মুহূর্ত ক্যামেরাতে বন্দি হলেও ও পারেনি পৃথিবীর কাছে তা প্রকাশ করতে।
গল্পটা বলার আগে ঢকঢক করে পানিটা গিলে নিল আশফি। তারপর শুরু করল‚ “বিল আর লিলিয়ান‚ ওরা দুজনই ছিল আমার সাথে৷ আমার দেখা অন্যতম ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার ছিল ওরা দু ভাই বোন। আর বিল ছিল আমার অসাধারণ একজন বন্ধু। সেরেনগেটির ওই রাতটা আমাদের জন্য যে বিভীষিকাময় রাত হবে‚ তা একবারও টের পাইনি কেউ। অথচ সেরেনগেটি ছিল যেন এক অনন্ত সবুজ চাদর— দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। সূর্য যখন ওঠে‚ তখন ওই তৃণভূমির ঘাসগুলো সোনালী হয়ে জ্বলে ওঠে‚ আর শিশির যেন লক্ষ লক্ষ হীরার কণার মতো ছড়িয়ে থাকে ঘাসগুলোর ডগায়। দিনের বেলায় আকাশটা থাকে নীল কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তার নিচে ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায় বুনো বিস্ট‚ জেব্রা‚ জিরাফ আর হাতিদের দল। সন্ধ্যা নামলে সেই বিশাল আকাশের রং হয়ে যায় কমলা-রক্তবর্ণ‚ আর একটু পরেই মাথার ওপরে জ্বলে ওঠে কোটি কোটি তারা। সেগুলো এত কাছে মনে হত‚ যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। আর দূরে মাঝে মাঝে শোনা যেত সিংহের গর্জন‚ রাতে হায়েনাদের ভয়ঙ্কর হাসি। আমাদের ক্যাম্প ছিল একদম প্রকৃতির কোলে‚ তাই তাঁবুর বাইরে পা দিলেই বন্যপ্রাণীর অবাধ রাজত্ব।
রাত নটা নাগাদ ক্যামেরার কাজ শেষ করে বনের গহিন থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের তাঁবুতে ফিরি আমরা। ক্যাম্পফায়ার জ্বালিয়ে রাত প্রায় একটা অবধি আমি বাইরে বসে পাহাড়া দিই৷ তারপর বিল আসে। ও আবার বরাবরই একটু পানীয়প্রিয় ছিল। ক্যাম্পফায়ার নিভে যাওয়ায় সেদিন রাতের হিমেল ঠান্ডায় সে হয়তো উষ্ণতার জন্যই কিছুটা বেশিই ব্র্যান্ডি খেয়ে ফেলেছিল। আর বসে থাকতে পারছিল না সম্ভবত। তখন সে তাঁবুতে ঢুকে ঢুলুঢুলু চোখেই তলিয়ে গিয়েছিল গভীর ঘুমে। লিলিয়ানও ওর তাঁবুতে ঘুমে একদম আচ্ছন্ন ছিল। ছিলাম না কেবল আমিই। মাঝেমধ্যে উঠে ফুটেজ চেক করছিলাম৷ বন্যপ্রাণীর জীবন কাছ থেকে দেখতে গিয়েছি। একেবারে ঘুমিয়ে পড়লে হয়! হালকা ঘুমের ঘোরে হঠাৎ কানে এল একটা চাপা শব্দ। ঠিক যেন পলিথিন ছেঁড়ার মতো। আমি ভাবলাম কোনো শিয়াল-টিয়াল হবে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই যে গর্জনটা নিস্তব্ধতা চিরে এল‚ তা শুনেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। ওটা কোনো হায়েনা ছিল না‚ কোনো বুনো শুয়োরও নয়। ছিল সিংহের হুঙ্কার। আমার হাত-পা যেন কাজ করছিল না। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল মৃত্যুর আতঙ্কে। ওটাই প্রথমবার ছিল কিনা! তাও দ্রুত তাঁবুর জিপার টেনে বাইরে বেরিয়ে আসি। চাঁদনি রাতের আলোয় দেখি লিলির তাবুটা আক্ষরিক অর্থে কাঁপছে। বিশাল এক ছায়া—একটি সিংহী। পুরো তাঁবুর ওপরে চেপে বসেছে ওটা। ধারাল থাবা দিয়ে কাপড় ছিঁড়ছে‚ আর ভেতর থেকে ভেসে আসছে লিলির কণ্ঠনালীতে আটকে যাওয়া তীব্র চিৎকার। আমার তখন শুধু মনে হলো‚ একটা মুহূর্তের দেরি মানেই চিরতরে সব শেষ।
আমার হাতে কোনো বন্দুক ছিল না। আমাদের ক্যাম্পে অস্ত্র রাখা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আশেপাশে ছিল শুধু ক্যামেরার ট্রাইপডটা আর একটা পুরোনো জ্বলন্ত লণ্ঠন। এক মুহূর্তও নষ্ট করলাম না। ট্রাইপডটা লাঠির মতো চেপে ধরে, আর লণ্ঠনটা হাতে নিয়ে আমি দৌড়ালাম। চিৎকার করে গর্জন ছাড়লাম শুধু‚ ‘লিলি‚ ডোন্ট মুভ অ্যান ইঞ্চ! লাই ডাউন লো!’
সিংহীটা ততক্ষণে তাঁবুর একটা অংশ প্রায় ছিঁড়ে ফেলেছে। আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। কী হিংস্র আর নির্দয়! এক ঝলকে লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে আমি ছুড়ে মারলাম তার সামনে। আগুনের শিখা দেখে সিংহীটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। কিন্তু থামেনি। ওর চোখ দুটো লাগছিল তখন অগ্নিগোলা। ক্রোধে জলছিল। আমি ট্রাইপডটা সজোরে উঁচিয়ে ওর দিকে ধাক্কা দিলাম আর চিৎকার করে বললাম‚ ’এইদিকে আয়! আমাকে ধর!’
আমি কেবল ভাবছিলাম‚ ওকে যে করেই হোক‚ বিভ্রান্ত করতে হবে। হলোও তাই৷ আমার চিৎকারে মুহূর্তের জন্য ও ঘুরল আমার দিকে। আগুনের আলোয় ওর চকচকে দাঁতগুলো দেখে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো‚ যেন মৃত্যুর বার্তা দিচ্ছিল ওই দাঁতগুলো। ও গর্জন করে আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি তখন আমার জীবনের সেরা অ্যাক্রোব্যাটিকটা দেখালাম। দ্রুত পাশ কাটিয়ে লাঠির মতো ট্রাইপডটা সজোরে ঘোরালাম। ধাতব অংশটা গিয়ে লাগল ওর নাকের ঠিক ওপরে। আঘাতটা কাজ করল। ব্যথায় সে পিছিয়ে গেল৷ কিন্তু ওর হুঙ্কার আরও তীব্র‚ আরও ভয়ংকর হলো তাতে। ওদিকে তাঁবুর ভেতর থেকে লিলির কান্না আর ওর দম বন্ধ হয়ে আসা চিৎকার যেন আমার কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু তখন আমাকে আরও কিছু করতে হবে। দ্রুত পকেট হাতড়ে বের করলাম ফ্লেয়ারগান। ক্যাম্পে বিপদে সংকেত দেওয়ার জন্য রাখা ছিল। আকাশের দিকে তাক করে টিপে দিলাম ট্রিগার। এক মুহূর্তে আকাশ ভরে গেল উজ্জ্বল‚ জ্বলন্ত আলোয়। বিকট শব্দ আর সেই তীব্র আলোয় সিংহীটা মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হলেও ও তখনো সম্পূর্ণ পালায়নি। ওর চোখগুলো তখনো ক্রোধে জ্বলছিল। আর ঠিক তখনই সেই বিকট গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বিল ঢুলতে ঢুলতে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এল অর্ধ-নগ্ন অবস্থায়‚ চোখে তখনো ওর ব্র্যান্ডির ঘোর। ওর ওই অসতর্কতায় আমার সব হিসেব মুহূর্তে পালটে দিল। চোখের পলকে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল আরও একটা ভয়ঙ্কর গর্জন। ওটা ছিল নরসিংহ। সিংহীটার গর্জন শুনেই ও হয়তো ছুটে এসেছিল। ওটাকে দেখা মাত্রই আমি সর্বোচ্চ জোরে চিৎকার করে উঠলাম‚ ‘বিল! ভেতরে যাও!’
কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এক লাফে বিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সিংহটা। সম্ভবত বিলের মাতাল শরীরের গন্ধ আর সহজ লক্ষ্য তাকে এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধাবোধ করতে দেয়নি। বিলের ঘুম‚ ঘোর‚ সবই ভেঙে গেল এক বীভৎস আর্তনাদে। চোখের সামনে সিংহটা ওর ঘাড় কামড়ে ধরে একটা পুতুলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো নিয়ে চলে গেল। সে সময় লিলির চিৎকার যেন আমার চারপাশের সমস্ত শব্দকে ছাপিয়ে গেল। আমি তখন ওর কাছেই যাব‚ না-কি বিলকে বাঁচাতে যাব‚ আমার মাথা কাজ করছিল না৷ লিলির কাছেই ছুটে গেলাম আগে৷ ওকে কোনোভাবেই শান্ত করা গেল না৷ ভেতর থেকে ভেঙে পড়লেও ও ছিল ভীষণ দুঃসাহসী। আমি আর ওকে আটকাতে পারলাম না। হাতে লণ্ঠন আর ট্রাইপড নিয়ে আমরা দু’জনই বিলের রক্তের দাগ ধরে পিছু ছুটলাম। তারপর কিছু দূর যেতেই আমরা দেখলাম সেই বীভৎস দৃশ্যটা। নরসিংহ আর সিংহী দু’জনে মিলে বিলকে ছিঁড়ে খাচ্ছে। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে লিলির মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। ওর একটু আগের সেই তীব্র কান্না‚ সেই আর্তনাদ‚ সব যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। ও সেখানেই মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। আমি দ্রুত ওর হাত ধরে টেনে তুলে ওকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনলাম। বেচারি কোনো প্রতিরোধ করল না। ফিরে আসার পর ও শুধু একবারই কথা বলেছিল‚ ‘ওকে… ওকে ওর বোন বাঁচাতে পারল না‚ অ্যাশ। আমি ওর শেষ নিঃশ্বাসও শুনতে পেলাম না। আমাকে একা করে ও-ও চলে গেল চিরকালের জন্য।’ সেদিন রাতে বিলের বলিদান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল প্রকৃতির নির্মমতা…”
থামল আশফি এরপর৷ কথা বলতে বলতে কখন যেন কণ্ঠটা ওর ভেঙে এল। দীর্ঘশ্বাস মাখা স্বরে শেষে বলল‚ “সিংহের আক্রমণ থেকে আমি হয়তো লিলিকে বাঁচিয়েছিলাম। কিন্তু ওর ভাইয়ের মৃত্যুর শোক থেকে ওকে বাঁচানোর শক্তি আমার ছিল না। সেই রাতে ও যেন ওর ভাইয়ের সঙ্গে ওর ভেতরের অনেকটা অংশও হারিয়ে ফেলেছিল।”
গল্পটা শেষেও কারও মুখে কোনো কথা ফুটল না৷ পরিবেশটাকে উপভোগ্য করতে গিয়ে আরও নিস্তব্ধ করে দিল আশফি৷ জমাট বাঁধা এক স্তব্ধতা। সেই নীরবতা এত ভারী হলো যে‚ কেউ সাহস করে নিঃশ্বাসও নিতে পারল না। সবার প্লেটে থাকা চিজ আর সসেজগুলো হঠাৎ করেই যেন স্বাদহীন লাগল ওদের।
আশফি তাকিয়ে ছিল বনের আঁধারে‚ শূন্য দৃষ্টিতে৷ ঘটনাটা মারিশা ওকে ছেড়ে যাওয়ার বছরখানিক পরের। কিন্তু চোখের সামনে যেন এখনো জীবন্ত দেখতে পাচ্ছে সেই রাতটাকে৷ কতগুলো রাত ওকে ঘুমাতে দেয়নি বিলের মৃত্যুর আর্তনাদ আর লিলিয়ানের আহাজারি। আজ অনেকদিন পর লিলিয়ানের কথাও মনে পড়ে মনটা আরও ভারী হয়ে উঠল ওর৷ মারিশার পর আজ অবধি যত মেয়ের সান্নিধ্যে গিয়েছে‚ তাদের কাউকেই ছেড়ে আসার মুহূর্তে অপরাধী লাগেনি নিজেকে। কেবল লিলিয়ানের বেলাতেই নিজেকে ওর খুব বড়ো অপরাধী লেগেছিল৷ এই জীবনে এই একটা মেয়েকেই ভালোবাসতে না পারার জন্য তীব্রভাবে অপরাধবোধ হয় ওর। কারণ‚ কেউ না জানলেও ও নিজে তো জানে‚ বিলের মৃত্যুর দায়ভারটা ওরই৷ মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ওকে সঙ্গ দিতেই তো বিল সেবার গিয়েছিল ওর সাথে।
ভাইকে হারিয়ে লিলিয়ান ছিল তখন পৃথিবীতে নিঃস্ব। তাকে তাই একা ছেড়ে আসতে পারেনি আশফি। অনেকটা দিন মেয়েটাকে আগলে রেখেছিল সে৷ হয়তো ওর সান্নিধ্যেই মেয়েটা স্বাভাবিকও হতে পেরেছিল দ্রুত। স্বল্প মুহূর্তের জন্য আশফিও মায়াতে পড়েছিল তার৷ কিন্তু যে রাতে ওকে আপন করে নেওয়ার আহ্বান জানাল মেয়েটা‚ ওর বাঙালি সাধারণ মনটা তখনই বুঝল‚ তাকে ভালোবাসতে পারেনি ও৷ হয়তো ক্ষণিকের দুর্বলতার কারণে সে রাতে তাকে ও গ্রহণ করেই নিত। কিন্তু তার পূর্বেই ও স্বীকারোক্তি দিয়েছিল‚ তাকে কখনো ভালো না বাসতে পারার অপারগতা৷ ও চায়নি‚ নিজেকে সঁপে দেওয়ার পর মেয়েটা আত্মগ্লানিতে ভুগুক।
আর সেই স্বীকারোক্তির পর লিলিয়ান থমকে পড়েছিল মুহূর্তেই৷ কারণ‚ সে ভাবেইনি আশফি কখনোই তাকে ভালোবাসতে পারেনি৷ নিজেকে নিয়ে ভীষণ হীনম্মন্যতায় ভুগতে আরম্ভ করে সে। প্রেমে ভেজা কোমল মনের স্কটিশ মেয়েটা জিজ্ঞেসও করেছিল‚ “আমি কি কোনোভাবে তোমার ভীষণ অযোগ্য‚ অ্যাশ?”
তখন মেয়েটাকে মারিশার কথা বলতেই হয়েছিল৷ যার ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণাটা তখনো তাজা ছিল ওর বুকের ভেতর৷ সেই যন্ত্রণা ভুলতেই তো একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযানে বেরিয়ে পড়ছিল ও৷
মারিশার কথাটা জানার পরই বোধ হয় লিলিয়ান উপলব্ধি করেছিল‚ তার সহস্রগুণ ভালোবাসাতেও আশফির হৃদয়ে কখনো ভালোবাসার বীজ জন্মাবে না তার জন্য। আর সে তো ক্ষণিকের জন্য পেতে চায়নি আশফিকে৷ তাই ভালোবাসা ছাড়া আশফির থেকে আর কোনো দয়া‚ সহানুভূতি সে চায়নি৷ পরদিনই বিদায় নিয়েছিল আশফি। আজ অবধিও মেয়েটার মুখোমুখি আর হতে পারেনি সে৷ তবে খবর রেখেছে সব সময়ই৷ বিশ্বের কাছে একজন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রকর হিসেবে পরিচিত হতে চেয়েছিল বিল। ভাইয়ের সেই অপূরণীয় স্বপ্নটাকেই পূরণ করার চেষ্টা করছে মেয়েটা।
আশফি দূরে থেকেই তার জন্য আজও প্রার্থনা রাখল‚ যেন তার নিঃস্ব জীবনে কেউ একজন এসে তাকে পৃথিবীর সেরা ভালোবাসাটুকু উপহার দেয়।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মারিশা কাতর‚ স্থির চাউনিতে দেখছিল আশফিকেই৷ ও কি ওর চোখের ভাষায় প্রার্থনাটুকু পড়তে পারল কিনা কে জানে! নীরবতার জাল ছিদ্র করে হঠাৎ ও জিজ্ঞেস করল আশফিকে‚ “লিলির কী হলো তারপর? ওকে ছেড়ে চলে এসেছিলে?”
চমকেই উঠল যেন আশফি৷ বিল আর লিলিয়ানের মাঝে ডুবে ছিল কিনা! মারিশার প্রশ্নটার পর সবাই-ই আগ্রহী দৃষ্টিতে চাইলো তার দিকে। অর্থাৎ সবাই-ই জানতে চায় লিলিয়ানের কী হলো! কিন্তু থমকে রইল আশফি৷ কেন যেন তার মনে হলো‚ মারিশা কিছু টের পেয়ে গেছে। আর নিশ্চয়ই মনে মনে কষ্টও পাচ্ছে ইতোমধ্যে? তাই ভুল করেও লিলিয়ানের নামটা আর মুখে আনল না সে৷ গম্ভীরমুখে বলল‚ “আর ভালো লাগছে না কথা বলতে৷ ক্লান্ত লাগছে খুব৷ ঘুমাতে যাচ্ছি আমি।”
সত্যিই আর বসল না আশফি৷ চলে গেল নিজের তাঁবুতে। পরিবেশটা এতখানিই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল‚ কেউ-ই আর বসে আড্ডা দেওয়ার মতো আগ্রহটুকু পেল না৷
অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যাওয়া জঙ্গলটা ফায়ারক্যাম্পের আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওরা সবাই নিজ নিজ তাঁবুতে ঘুমিয়ে গেলেও দূরে কোনো এক নিশাচর পাখির তীক্ষ্ণ ডাক‚ ঝিঁঝিপোকার অবিরাম শব্দ আর শুকনো পাতার ওপর দিয়ে কোনো ছোটো প্রাণীর হেঁটে যাওয়ার শব্দে বনের ভেতরকার নীরবতা ভাঙছিল। মাঝেমধ্যে দূর থেকে শেয়ালের ডাকও শোনা যাচ্ছিল‚ যা রাতের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলছিল।
কিন্তু কেউ জানল না‚ আশফি‚ দিলিশা আর লিলিয়ানকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমহীন মারিশা নিজের মস্তিষ্ককে ঠান্ডা করতে রিসোর্ট থেকে আনা রাম পেটে চালান করে সে এখন ঘুমাতে পারছে না কোনোভাবেই৷ পেটে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় প্রকৃতি তাকে ডাকছে যেন প্রেতাত্মার মতো। ডায়বেটিকসের রোগী হওয়ায় সেই চাপ চাপিয়ে রাখার ক্ষমতাও নেই বেচারির। কিন্তু এই বনের মধ্যে একা একা কোথায় গিয়ে মূত্রত্যাগ করে আসবে সে? মাতাল হলেও এই বোধটুকু কাজ করল ওর ঠিক ঠিক। না পারতেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে ফোন লাগাল সে আশফিকে।
রাতের খাবারটা কম হয়ে যাওয়ায় ক্ষুধা মেটেনি আশফির৷ আর ক্ষুধা পেটে কড়া ঘুম হওয়া তো মুশকিলই৷ তাই শিথানের পাশে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠতেই চমকে উঠল সে। স্ক্রিনে মারিশার নম্বরটা দেখে আরও বেশি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল সে। রাত বাজে প্রায় চারটার মতো। এই সময়ে কেন ফোন করেছে ও? সারা রাত উলটা-পালটা চিন্তা করে রাগ-ক্ষোভ থেকে আবার কোথাও বেরিয়ে পড়ল না তো? এই শঙ্কা থেকে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল সে। পাশেই পরাগ ঘুমিয়ে। তাই চাপাস্বরে বলল‚ “কী ব্যাপার? ঘুমাওনি তুমি?”
প্রশ্নটা করে সে বসে রইল না মোটেও৷ মারিশার তাঁবু চেক করতে বেরিয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। তখনই দেখল‚ এক হাতে তলপেট চেপে ধরে আরেক হাতে ফোন কানে চেপে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মারিশা নিজ তাঁবুর সামনেই৷
“কী হয়েছে?” ফোনটা পকেটে পুরে চিন্তিত মুখভঙ্গিতে এগিয়ে এল আশফি।
মারিশা তখন চোখ-মুখ কুঁচকে ব্যথাতুর ভঙ্গিতে একদম নিঃশঙ্কোচে জানাল‚ “আই’ম ব়াস্টিং ফ’ দ্য লু। জাস্ট গেট মি সামহোওয়া সেইফ‚ কুইক!”
“হোয়াট!” তাজ্জব বনে গেল আশফি‚ যেন এমন ধরনের কথা সে জীবনে শোনেনি। তবে মারিশার মুখে সে সত্যিই এমন কথা আজকের আগে শোনেনি।
আর তার প্রতিক্রিয়া দেখে মারিশা অধৈর্য হয়ে রেগেমেগে উঠল‚ “হোয়াট জু মিন‚ হোয়াট? ইংরেজি বোঝো না? বাংলাতে বলব? আমার হিসু চেপেছে… আমাকে হিসু করতে…”
‘নিয়ে চলো’ কথাটা বের হওয়ার আগেই আশফি দ্রুত এসে ওর মুখ চেপে ধরল। মারিশার চিৎকার স্বরের কথাটা তখন চাপা পড়ল তার হাতের নিচে।
“কত্ত বড়ো ইডিয়েট! চেঁচিয়ে বলবে তাই?” ফিসফিসিয়ে ধমকাল আশফি‚ “ওরা শুনলে কী ভাববে‚ হ্যাঁ? মাথার ভেতরের ঘিলুটা কাকে ডোনেট করে এসেছ?”
মুখের ওপর থেকে হাতটা টেনে সরিয়ে মারিশা পালটা ধমক দিল‚ “তুমি কি লেকচার না দিয়ে আমাকে নিয়ে যাবে? না-কি দিব্যকে ডাকব?”
“কীহ্! কাকে ডাকবে?” বিস্ময় আর রাগ দুটোই প্রকাশ পেল আশফির কণ্ঠে।
তবে মারিশাকে আর জবাব দিতে দিল না। ওর তাঁবুর ভেতর থেকে পানির বোতল আর টর্চটা আনতে গেল সে। তখনই আবিষ্কার করল রামের বোতল৷ মেজাজটা এত বেশি খিঁচড়ে গেল আশফির! তবে আপাতত কিছু বলল না। আশপাশ থেকে কুড়িয়ে আনা মোটা একটা ডাল হাতে তুলে নিয়ে মারিশাকে তারপর পাঠিয়ে দিল ঝোপের আড়ালে। আর সে পায়চারি করতে লাগল কিছুটা দূরে। সেই সাথে ভাবতে লাগল‚ একবার যদি কেউ টের পায়‚ তাহলে কী খেপানোটাই খেপাবে তাকে!
আশফির এই চিন্তার মাঝেই মারিশা কাজ সেরে চলে এল৷ কিন্তু দেখা গেল‚ সে তাঁবুর দিকে না এগিয়ে চলে যাচ্ছে ছোটো পাহাড়টার দিকে। ওর লক্ষ্য‚ ঢাল বেয়ে সে পাহাড়ের চূড়াতে উঠবে এখনই৷ তা দেখে আশফি পেছন থেকে জলদি ডেকে উঠল ওকে৷ কিন্তু কানেই শুনল না মারিশা৷ নেশায় একদম টাল হয়ে গেছে না-কি? এটা ভেবেই আশফি এবার ডেকে উঠল‚ “ওই‚ তার কাটা‚ ওই… ক্যাম্প এদিকে। ওদিকে কই যাও?”
দাঁড়াল মারিশা৷ ফিরে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলল‚ “তোমার কাজ শেষ। ইউ ক্যান হেড অফ নাউ।”
আশফি বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে এল। তিরস্কার করে বলল‚ “আচ্ছা? তা আপনি ওদিকে কোন মুল্লুকে যাচ্ছেন? সেটা একটু বলে যেতেন। তারপর ফিরে যেতাম।”
মারিশা কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিমায় আকাশপানে মুখ তুলল। আকাশটা দেখতে দেখতে কবিদের মতো আবৃত্তির ঢঙে বলল‚ “আমাকে ডাকছে ওই বুনো মেঘগুলো৷ আমি এখন ওদের সঙ্গে গল্প করব ওই পাহাড় চূড়াতে ভেজা ঘাসে গা এলিয়ে।”
নেশা যে কতটা চড়েছে‚ তা বুঝতে পেরে যতটা না রাগ হলো আশফির‚ তার চেয়ে বেশি হাসি পেল মারিশার কবি কবি ভাব দেখে৷ মাথায় একটা গাট্টা দিতে গিয়েও শেষে থামল৷ পাছে দেখা গেল ছিটিয়ালটা চিৎকার করে সবাইকে ডেকে নালিশ দেবে‚ “এই শালার ঘরে শালা আমাকে মেরেছে। ওকে ধর!”
তারপর কী যেন ভাবল সে৷ মাথার উপর তাকিয়ে দেখল‚ রাতের আকাশটা সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত। আকাশে ঝলমল করছে অসংখ্য তারা৷ পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ তখন সবে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। চাঁদের আলোয় দূরের পাহাড়ের আবছা রূপরেখাগুলো বোঝা যাচ্ছিল৷ সেই আলোয় বনের গাছপালাগুলোও কালো ছায়ার মতো দেখাচ্ছিল। রাত তো প্রায় শেষের দিকেই। ঘুমটা আর ধরা দেবে না নিজেরও৷ কিন্তু ঠান্ডার মধ্যে পাগলটাকে নিয়ে বাইরে বসে থাকার চিন্তাটাও খুব একটা বুদ্ধিমানের মতো হবে না। তার অভ্যাস থাকলেও এই ননির পুতুলের অভ্যাস নেই ঠান্ডা সইবার। তাই কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই সে অকস্মাৎ কোলে তুলে নিল মারিশাকে। ও চিৎকার-চেঁচামেচি করার আগেই দ্রুতবেগে হেঁটে গিয়ে ঢুকে পড়ল ওর তাঁবুতে। ঠাস করে ওকে স্লিপিং ব্যাগের ওপর ফেলে দিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করল‚ “আর এক পা বাইরে বের হলে মিরানকে কল করে নালিশ করব বলে দিলাম!”
ড্যাবডেবিয়ে কতক্ষণ আশফিকে চেয়ে দেখল মারিশা৷ তারপর নীরবেই ফোনটা পকেট থেকে বের করে কল লাগাল মিরানকে। ওপাশে রিং হতেই ফোনটা আশফিকে এগিয়ে দিল সে‚ “এই তো‚ রিং হচ্ছে৷ ধরো।”
আশফি হতবুদ্ধি বনে ছুটে এসেই ফোনটা দ্রুত কেটে দিল। ঠোঁট কামড়ে চোখ গরম করে তাকাল মারিশার দিকে৷ তখনই মারিশা সরল গলায় আচমকা এক প্রশ্ন করে বসল‚ “তুমি কি লিলিয়ানের সঙ্গে ঘুমিয়েছ?”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১৩
এই মুহূর্তেই এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে‚ তা ভাবতেই পারেনি আশফি। তাই ঝটকা খেল ভালোই৷ আর বুঝতে পারল‚ সে তাহলে ঠিকই আন্দাজ করেছিল৷ সারা রাত না ঘুমিয়ে এটাই চিন্তা করেছে মিরানের স্ক্রু ঢিলা বোনটা।
কটাক্ষ সুরে বিড়বিড়াল সে‚ “এক্কেরে জাতে মাতাল তালে ঠিক! শালার ত্যারাবাঁকা মেয়ে জাত! কবরে গিয়েও টেনশন করা ছাড়বে না‚ বর কার সাথে গিয়ে ঘুমাচ্ছে। ছেড়ে যাওয়ার সময় মনে ছিল না? হুহ্!”
