ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১
তানিশা ভট্টাচার্য্য
২৯শে ডিসেম্বর সকাল ৬টার দিকে বন্ধ রুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে আদ্ভিক। এটা তার বাবা মায়ের রুম, সে নিয়ম করে রোজ আসে এই রুমে। আজ তার জন্মদিন বাবা মা কে অনেক মনে পড়ছিল তার তাই সকাল সকাল এল সে। আদ্ভিকের জন্মের দুই বছর পরই তার বাবা মা নাকি কাজের জন্য বিদেশে চলে যায়, এমনটাই বলেছিলেন আদ্ভিকের ঠাম্মি রাখী রায়চৌধুরী। কিন্তু এই ষোলো বছরে একটা বারও ছেলের কোনো খোঁজ নেয় নি তারা। আজ আদ্ভিকের ১৮তম জন্মদিন ।
আদ্ভিক তার বাবা মায়ের বিশাল বড় একটা ফোটোর সামনে এসে দাঁড়ায়, তারপর প্রনাম করল সে। আদ্ভিকের বাবা আর্ভিক রায়চৌধুরী আর মা তানভী রায়চৌধুরী। আদ্ভিক ফোটোটার দিকে তাকিয়ে অতি শান্ত কন্ঠে বলল
-“মাম্মা, পাপা অনেক বেশি মিস করি তোমাদের। এত গুলো বছরে একটা বারও খোঁজ নিলে না আমার। আমি কী এতটাই খারাপ।”
এই বলে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ করেই তার চোখ যায় বুকসেলফে রাখা একটা ডাইরির ওপর। আদ্ভিক এগিয়ে গিয়ে ডাইরিটা হাতে নিল,ওটার ওপর বড় বড় করে লেখা “তানভী ব্যানার্জী” । এটা আদ্ভিকের মায়ের ডাইরি সেটা বুঝতে তার বাকি রইল না। ওর মায়ের উপন্যাস পড়া, ও লেখালেখি করার অনেক শখ ছিল, রাখী রায়চৌধুরীর থেকে শুনেছিল সে।
আদ্ভিক ডাইরির পাতা গুলো একটা একটা করে উল্টে পড়তে লাগলো –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আগস্ট মাস, আজ সকাল থেকে “𝐁𝐚𝐧𝐞𝐫𝐣𝐞𝐞 𝐌𝐞𝐧𝐬𝐢𝐨𝐧” -এ নানা রকম পদের রান্না শুরু হয়ে গেছে, এমন সময় বাড়ির কর্তা অরফে রুদ্রপ্রতাপ ব্যানার্জী তার একমাত্র আদরের মেয়ে তানভী ব্যানার্জী কে ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে, বসার ঘরের সোফায় এসে বসেন, বাড়ির কর্ত্রী অরফে দোয়েল ব্যানার্জী রুদ্রবাবুর হাতে চায়ের কাপ দিতে দিতে বলেন-
-“তোমার আদুরে মেয়ে, সে তো এখনও ঘুমাচ্ছে, ডেকে ডেকে আমার গলা ধরে গেল তাও ওর উঠার নামমাত্র নেই”
-“এত বেলা হয়ে গেল এখন ওঠেনি, ঠিকআছে আমি ডেকে আনছি।”
বলামাত্রই ব্যানার্জী সাহেব সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গিয়ে
তানভীর রুমের দিকে গেলেন, রুমের দরজা খোলা মাত্রই রুদ্রবাবু থেমে গেলেন, তিনি দেখলেন টেবিলে থাকা এলার্ম ঘড়িটা দুখণ্ড হয়ে দরজার কাছে পড়ে আছে, আর চারিদিকে কাঁচ ছড়িয়ে আছে।
তিনি অতি সাবধানের সাথে সেগুলি পার হয়ে এসে তানভীর বিছানা বরাবর দাঁড়ালেন, তারপর অতি স্নেহের সহিত তানভীর মাথায় হাতবুলিয়ে ডাকলেন-
-“মামনি অনেক বেলা হয়েছে, এবার উঠে পর মা”
রুদ্র বাবুর কথা শুনে তানভী কিছুটা নড়াচড়া করল কিন্তু উঠল না, রুদ্র বাবু আবারও ডাকলেন-
-“তানভী উঠে পরো,তৈরী হয়ে নাও। অভিকরা আঙ্কেল এখনই চলে আসবে।”
এই বলে রুদ্রবাবু চলে গেলেন, তানভীর রুম থেকে বের হতেই রুদ্রবাবু দেখলেন তার একমাত্র ছেলে তৃষান সিঁড়ি থেকে দৌড়ে দৌড়ে উঠে তানভীর রুমের দিকে আসছে। তাকে এভাবে আসতে দেখে রুদ্রবাবু বলেন
-“তোজো আসতে দৌড়াও নইলে পড়ে যাবে!”
তৃষান তার বাবার দিকে এক গাল হেসে তানভীর রুমের দিকে চলে যায়, রুমের দরজা খোলাই ছিল তৃষান ঢুকতে নিলেই তানভী নিভুনিভু চোখে, ঘুম চড়োনো কণ্ঠে তার ভাইকে বলে উঠে
-“তোজো দাঁড়া ওখানে, আসিস না”
কথাটা শোনা মাত্রই ছোট্ট তোজো ভ্রু কুঁচকে বলল-
-“কেন দিভাই..!?”
তানভী বলে –
-“চোখে দেখতে পাচ্ছিস না..!! পায়ের কাছে কী পরে আছে। পায়ে কাঁচ ফুটলে আর দেখতে হবে না।”
তোজো এবার তার পায়ের দিকে তাকায় কিন্তু অবাক হয় না, সেদেখল গতকাল কিনে আনা এলার্ম ঘড়িটি দুখন্ড হয়ে পড়ে আছে, তার বুঝতে বাঁকি রইল না যে একাজটা তার দিভাইয়ের, এই নিয়ে ১৫-খানা ঘড়ি ভাঙল, কোনো ঘড়ি তার দিভাইয়ের কাছে তিন দিনের বেশী টেকে না। তানভী কে তোজো বলে-
-“দিভাই…এটাও ভেঙে ফেললে…!!”
“কিকরব বল… সকাল সকাল বেজেই যাচ্ছিল তাই একেবারের মতো বন্ধ করে দিয়েছি, তুই আসিসনা আমি এটা পরিস্কার করে নি..!!”
-“দিভাই তুমি দাঁড়াও আমি দীপা আন্টি কে ডাকছি, তোমায় পরিষ্কার করতে হবে না; তোমার হাতে কাঁচ ফুটলে ব্যাথা লাগবে।”
-“না দীপা আন্টিকে ডাকতে হবে না, আমি করে নেব। সবাই ব্যস্ত আছে, তুই নীচে যা”।
-“আচ্ছা, কিন্তু দিভাই তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নীচে আসো ঋষি ভাইয়ারা এখনই চলে আসবে।”
-“হুমম, যাচ্ছি যা।”
এরপর তোজো তানভীর রুম থেকে বেরিয়ে এসে নীচে চলে যায়। তোজো নীচে আসতে দেখে অভিক আঙ্কেলরা চলে এসেছে, আর তার বাবা তাদের সাথে বসে কথা বলছে, সে দৌড়ে গিয়ে তার বাবার পাশে বসে, সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল; এরমধ্যে তানভী তৈরী হয়ে নীচে এল,
উচ্চতায় ৫’৩-এর কাছাকাছি, ছিমছাম গড়ন, উজ্জ্বল ত্বকের অধিকারী, মাথার চুল ঘন কালো এবং তা কোমর পর্যন্ত। একেবারে জীবনানন্দ দাশের লেখা সেই কেশবতী কন্যা যেন।
আজ তার পরনে ছিল সাদা রঙের একটা থ্রি পিস, চুল গুলো ছাড়া কিন্তু পরিপাটি করে গোছানো, কানে সুন্দর ঝুমকো, হাত ভরতি চুরি, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক, তাকে দেখতে একদম শুভ্রপরীর মতো লাগছিল, তানভী এসে সবাই কে প্রণাম করে,তারপর অভিক আঙ্কেল কে জিজ্ঞাসা করে
-“কেমন আছেন আঙ্কেল..!?”
-“ভালো আছি মামনি, তুমি কেমন আছো? পড়াশোনা কেমন চলছে…?”
-“জী ভালোই চলছে সবকিছু আঙ্কেল।”
অভিক আহেব মুচকি হাসলেন।
অভিক অরফে অভিক রায়চৌধুরি, তিনি হলেন তানভীর বাবার ছেলেবেলার অনেক কাছের বন্ধু, বন্ধু বললে ভুল হবে তাদের মধ্যে মিল পুরো আপন ভাইয়ের মতো। রুদ্রসাহেবের ভাই ও বাবা-মায়ের যখন গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তখন তিনি মাত্র ২১ বছরের ছিলেন, তখন থেকেই রুদ্র সাহেবকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করেন অভিক সাহেবের বাবা-মা,
অভিক সাহেবেরা দুই ভাই বোন। বোনের নাম পর্না, ওনার বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি কলকাতার বাইরে থাকেন, ওনার একছেলে, একমেয়ে, ছেলের নাম পবিত্র ও মেয়ের নাম পেখম। অভিক সাহেবের দুই ছেলে, বড়ছেলে আর্ভিক রায়চৌধুরি, আর ছোট ছেলের নাম ঋষি রায়চৌধুরি, একটা মেয়েও ছিল। কিন্তু জন্মের একমাসের মধ্যেই সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
আর্ভিক পড়াশোনার জন্যে বর্তমানে ক্যালিফর্নিয়াতে রয়েছে।
ঋষি Final year-এর Student, আর এর পাশাপাশি তাদের পারিবারিক ব্যবসায় সাহায্য করে।
এরমধ্যে তানভীর মা টেবিলে হালকা কিছু নাস্তা আর নানা ধরনের মিষ্টি সাজিয়ে ফেললেন, তানভী এবার ঋষির কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল
-“কেমন আছো ভাইয়া…?”
ঋষি এবার মুখ তুলে তাকাল তানভীর দিকে, ঋষি উচ্চতায় ৫’৯ এর কাছাকাছি, সুঠামদেহী, তার পরনে ছিল নেভি ব্লু শার্ট আর ব্ল্যাক ফর্মাল প্যান্ট, শার্ট ইন করা ও হাতা গোটানো, হাতে ঘড়ি।বর্ণের রং খুব ধবধবে ফর্সা না হলেও ফর্সা বললে ভুল হবে না, ঋষি মৃদু হেসে উত্তর দিল
-“ভালো আছি বোনু; তুই কেমন আছিস…?”
এই বলে তানভীর হাতে অনেক গুলো চকলেট ধরিয়ে দিল।
-“ভালো আছি ভাইয়া, Thank you।”
তানভীর হাতে চকলেট দেখে তোজো অভিযোগের সুরে ঋষিকে বলে
-“ভাইয়া, দিভাই কে দিলে…. আমায় কিছু দিলেনা,”
তোজোর কথা শুনে উপস্থিত সবাই হেসে ফেলল।তানভী তোজো কে চকলেট দিতে গেলে ঋষি বলে-
-“এগুলো সব তোর বোনু, তোজোর জন্যে আলাদা আছে।”
“আলাদা আছে” কথাটা কানে যেতেই খুশিতে ভরে উঠে অভিমানী তোজো মনটা, সে এসে সঙ্গে সঙ্গে ঋষিকে জড়িয়ে ধরে বলে
-“Thank you ভাইয়া”
তারপর ঋষি তোজো কে অনেক গুলো চকলেট দেয়।কিছুক্ষন পর তানভীর মা সবাইকে খেতে ডাকে। খাওয়ার টেবিলে অভিক সাহেব বলেন –
“দোয়েল বোন, সামনের বুধবার আমার ছেলে আর্ভিক বিদেশ থেকে ফিরছে, আর তাছাড়া পরেরদিন রাখীবন্ধন; ছেলে যখন ৯ বছর পর ফিরছে আমি চাই, এবছরের রাখীটা একটু অন্যরকম ভাবে সেলিব্রেট করতে,তো তোমাদের সবার বুধবার ও বৃহস্পতিবার আমাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ রইল।”
তানভীর মা মৃদু হেসে বলল
-“অনুরোধ কেন বলছেন দাদা, আমরা অবশ্যই যাব, কিন্তু আর্ভিকের বুধবার কেন ওর তো কালকে ফেরার কথা ছিল,রাখী দিদি বলল।”
-“হুমম। ফ্লাইট নাকি ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল।”
-“ওওওও…”
সবাই এবার নিজ নিজ খাওয়ায় মনোযোগী হল।
কিন্তু ‘আর্ভিক’ নামটা কানে যেতেই তানভীর মুখ একরাশ বিরক্তিতে ভরে যায়, ‘চৌধুরি নিবাসের’- এই একজন কেই সে সহ্য করতে পারে না, আর্ভিক-এর প্রতি তার এক আকাশ পরিমাণ রাগ-অভিমান আর ঘৃণা কাজ করে।
ঋষির সাথে তানভীর যতটা মধুর সম্পর্ক ততটাই তিক্ত সম্পর্ক আর্ভিকের সাথে, আর্ভিক তানভীকে অনেক বকাবকি করত। একদুবার তো মেরেওছিল। সেই থেকে তানভী ওই বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেদিয়েছিল। আজ এত বছর পর যাবে শুনে আনন্দ হলেও ‘আর্ভিক’ নামটা কানে আসতেই ওবাড়িতে যাওয়ার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা নেই তার।
বিকালে সবার থেকে বিদায় নিয়ে ঋষিরা বেরিয়ে গেল; কিন্তু যাওয়ার আগে ঋষি তানভীকে অনেক করে বলেগেছে যেন সে অবশ্যই যায়।।
