মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২২
jannatul firdaus mithila
“ আমি কোনোদিন কারো কাছে কিচ্ছু চাইনি। বরাবরই মুখচোরা স্বভাবের মানুষ আমি। তবে আজ আপনার কাছে কিছু একটা চাইছি! দয়া করে আমায় একেবারে মে’রে ফেলুন। অনুরোধ করছি — শেষ করে ফেলুন আমায়।”
হু হু কান্নারা বাঁধ ভেঙেছে সপ্তদশীর! ফর্সা মসৃণ মুখখানা জুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছে রক্তিম আভা। সরু নাকের পাটাটা ফুলে গিয়ে, বরাবরের ন্যায় পাকা টমেটোর রঙ ধারণ করেছে আজ। তুলতুলে অধরজোড়া কাঁপছে তিরতির করে। সে আবারও নাক টানলো। সম্মুখে সটানভাবে দাঁড়িয়ে থাকা নির্দয় মানব এতোকিছু শুনেও ক্রুর হাসি টেনেছে ঠোঁটের কোণে। দু’হাটুঁ আলগোছে মেঝেতে ঠেকিয়ে ঝুঁকে এসেছে মেয়েটার দিকে।
মাহি চিবুক নামিয়েছে কন্ঠায়। হেঁচকি তুলে কাঁদতেই আচমকা এক শক্তপোক্ত হাতের থাবা এসে বসলো তার চুলের গোছায়। এমনিতেই বেচারীর ক্ষুদ্রকায় শরীরটা যন্ত্রণায় বুদ হয়ে আছে, তারওপর ওমন শক্তপোক্ত হাতের থাবা! মাহি ককিয়ে যাচ্ছে ব্যথায়। চোখমুখ কুঁচকে আর্তনাদ বেরুচ্ছে তার কন্ঠ ফুঁড়ে। বন্ধ চোখের কার্নিশ বেয়ে টুপ টুপ করে গড়িয়ে পড়ছে নোনাধরা। মুগ্ধ কেমন ক্রুর চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটার মুখপানে। তামাকে পোড়াঁ পিয়ার্সিং করা ঠোঁটটা বুঝি সামান্য পিষ্ট হলো দাঁতের সঙ্গে! বাদামী চোখজোড়ায় শ্লেষাত্মক ইঙ্গিত স্পষ্ট! সে এবার হাতের জোর বাড়ালো। শক্তপোক্ত হাতের তালুতে সজোরে পিষ্ট হলো মাহির নরম চুলগুলো। মাহি তৎক্ষনাৎ চেঁচিয়ে ওঠে। ব্যথাতুর শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে তার বদনখানি। তার এহেন আর্তনাদে বড্ড স্বস্তি পাচ্ছে মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে তার আচমকা ফুটে উঠল এক চিলতে পৈ*শাচিক হাসির রেশ। সে তৎক্ষনাৎ মাহি’র ছোট্ট মাথাটা মেঝের সঙ্গে চেপে ধরল। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকানোর সময় মিলেনি মাহি’র। মাথার একপাশে শক্তপোক্ত হাতের থাবা, বেচারির মাথাটা কেমন পিষে যাচ্ছে মার্বেলের মেঝের সঙ্গে। হাতের জোর বাড়াচ্ছে মুগ্ধ! মাহি গোঙাচ্ছে বেশ। হাত-পা ছুড়েঁ তড়পাচ্ছে গলা কা’টা মুরগীর ন্যায়। ওদিকে মুগ্ধের তাতে কিছুই যায় আসেনি বোধহয়। নির্দয় মানব নিজের নির্দয়তার কঠোর ছাপ ফোটালো কন্ঠে। দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ ইউ বি*চ! যেখানে আমি আমার বাপের কথাই কানে তুলিনা, সেখানে তুই কোন চ্যা’টের বা’ল? যার কথা আমি মানতে যাবো? এন্ড ইউ সেইড, ইউ ওয়ান্না ডায় রাইট?”
বলেই অট্টহাসিতে মাতলো যুবক। হাতের থাবার জোর বাড়িয়ে মাহির গালদুটো একপ্রকার থেঁতলে দেবার পায়তারা চালিয়ে ফের কঠিন গলায় শুধালো,
“ ইউ নো হোয়াট বান্দীর মেয়ে? তোর মর’ণ ওতো সহজে হবে না। এটলিস্ট আগামী ছ’মাসে তো হবেই না! ইউ নো না? ফর দ্যা নেক্সট সিক্স মান্থ, ইউ আর মা’ই ব্লা’ডি বেড পার্টনার, দ্যা ওয়ান আই ব্রট টু মেক মাই মিস্ট্রেস। নাথিং এলস। অবশ্য তোর মতো স্লা’টকে এরচেয়ে বেশি কিছু বানানোও যায় না। এইটুকু শরীরে তোর যা গরম! পুরুষ মানুষের সান্নিধ্য পেলে তো আর কথাই নেই!”
চোখ ফেটে অশ্রু গড়াচ্ছে মাহি’র। বুকটা খানখান করছে নির্দয় মানবের প্রতিটা তিরস্কারে। মুখ ফুটে চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে তার — আমি স্লা’ট নই! আমি মোটেও অপবিত্র নই! আপনার ধারণা সম্পূর্ন ভুল। বুক চিৎকার দিয়ে কথাটা বললেও কন্ঠরুদ্ধ মাহি’র। এদিকে মেঝেতে শুয়ে কাতরাতে থাকা মেয়েটার ঘাড় বরাবর আঙুল দাবিয়েছে মুগ্ধ! প্রবল জোরে হেঁচকা টানে মেয়েটাকে উঠিয়ে বসালো পরক্ষণে। মাহি চোখ কুঁচকে রেখেছে, এখন আর শব্দ তুলে কাঁদছে না সপ্তদশী। মুগ্ধের দৃঢ় চোয়াল শক্ত হচ্ছে ক্রমশঃ। চোখদুটোয় লেপ্টে গিয়েছে একপ্রকার আগুন। মাহির মুখপানে কটমট দৃষ্টি বজায় রেখে সে কেমন চিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ লিসেন জানোয়ারের বাচ্চা! এসব ফা*কিং মেলোড্রামাটিক কথাবার্তা তোর বাদবাকি পার্টনারদের শোনাবি, আমাকে নয়! আই জাস্ট হেট ইউ এন্ড ইউর ওয়ার্ডস! ঘৃণা করি আমি তোকে। শুনছিস? ঘৃণা করি তোকে। তুই যদি আমার শিকার না হতিস বান্দীর মেয়ে, তাহলে এতক্ষণে তোকে নিজ হাতে জ্যান্ত মাটিতে পু’তে ফেলতাম! বাট আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফর দ্যা নেক্সট সিক্স মান্থ, ইউ হেভ টু বি এলাইভড। এই ছ’মাসে রোজ আমার টর্চার গুলো সহ্য করতে হবে তোকে! তোর শরীরের সম্পূর্ণ আনাচে-কানাচেতে থাকবে আমার দেওয়া মা’রের দাগ। কজ, আই লাভ ইউর পেইন’স! বিশ্বাস কর, তোর তিলে তিলে পাওয়া কষ্ট গুলো দেখতে ভীষণ এনজয় করি আমি।”
হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে সপ্তদশী! চোখদুটো নিরবে অশ্রু ঝরাচ্ছে তার। মুখে তেমন রা নেই। একটা মানুষ ঠিক কতটা নির্দয় হলে এমন কথা বলতে পারে, তা জানা নেই তার। এদিকে মুগ্ধের চোখদুটোতে আজ কেবলই ঘৃণা। মেয়েটার দিকে তাকাতেও বোধহয় নাক-সিটকাচ্ছে যুবক। সে তৎক্ষনাৎ মাহি’র মাথাটা ঝাঁকিয়ে দূরে সরালো। এহেন অতর্কিত কান্ডের তাল সামলাতে না পেরে বেচারি ফের ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ছোট্ট মুখটা তার ঢেকে গেল চুলের ঝাপ্টায়। ওদিকে মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষ উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাহির দিকে একদফা তাকিয়ে থেকে এগিয়ে এলো এক-কদম। নির্দয়তার চরম সীমানায় পৌঁছে গিয়ে নিজের ভারী কদমের তলায় জোরপূর্বক পিষ্টে ধরল মাহির নরম পা। মাহি তৎক্ষনাৎ হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে। ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে চেপে ধরে মুগ্ধের পা। দু’হাতে ঠেলতে ঠেলতে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে বলে ওঠে,
“ ছাড়ুন! প্লিজ ছাড়ুন। ব্যথায় ম’রে যাচ্ছি! আল্লাহ… আর পারছিনা আমি!”
মুগ্ধ কানে তুলেনি কথাটা। নিজ পায়ের তলায় মাহির পা’টা পিষতে পিষতে কটমটিয়ে আওড়ায়,
“ ব্লা*ডি স্লাট! ছ’মাস আমার কাছে থাকার পর যদি বেঁচে ফিরিস, তাহলে দেশে গিয়ে শুধু একটা না, হাজারটা পার্টনার যুগিয়ে নিস। বাট এখানে… ভুলক্রমেও আমি বাদে অন্য কারো দিকে চোখ তুলে তাকালে, তোকে উত্তপ্ত সালফিউরিক এসিডে চোবাবো আমি। মাইন্ড ইট!”
ঝাঁঝ নিয়ে কথাটা বলেই পা সরায় মুগ্ধ। চোয়ালের পেশী শক্ত করে তক্ষুনি পা ঘোরালো উল্টোপথে। এদিকে মাহি দু’হাতে নিজের পা চেপে ধরে কাঁদছে। ছলছল চোখজোড়া উঁচিয়ে তাক করল নির্দয় মানবের চলে যাওয়ার পথে। কন্ঠে একরাশ অসহায়ত্ব ঢেলে উঁচু স্বরে আওড়াল,
“ আর কত মা’রবেন আমায়? আর কতো ধরনের অত্যাচার করা বাকি আছে নির্দয় মানব? আর কতো?”
মুগ্ধের চলন্ত পাদু’টো থমকায়! ঘাড় বাকিয়ে না তাকিয়ে যুবক দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। মাহি ফোঁপাচ্ছে। চোখদুটো তার ঝাপসা হয়ে গেছে অশ্রুর আনাগোনায়। ঠোঁট দুটো কেবল ভেঙে ভেঙে আসছে সপ্তদশীর। সে এবার অসহায়ত্ব বাদ দিয়ে নিষ্প্রাণ কন্ঠে শুধালো,
“ হ্যাঁ আমি মানছি — আমার বাবা দোষী। মানছি আমার বাবার ভুলের জন্য আপনি আপনার শৈশব হারিয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। তাই বলে এখানে আমার কী দোষ? আমি কী আদৌও কোনো ক্ষতি করেছি আপনার? করিনি তো! তাহলে? শুধুমাত্র তায়েফ এহসানের মেয়ে বলে এতোটা অত্যাচার করছেন তাইতো? আমার গায়ে তায়েফ এহসানের র*ক্ত থাকাটাই তো আসল সমস্যা তা-ই না? আচ্ছা ঠিক আছে… আমি যদি আমার গা থেকে নিজের সব র*ক্ত ঝরিয়ে ফেলি, তবে কি আপনি থামবেন বলুন? মা’রা বন্ধ করবেন আমায়?”
বাঁকা হাসল মুগ্ধ! তক্ষুনি শরীর বাঁকিয়ে পেছনে ফিরলো। চোখের চাহনিতে ক্রুরতা লেপ্টে গমগমে গলায় শুধালো,
“ তোর শরীর থেকে শেষ র*ক্তবিন্দু অব্ধি ঝরিয়ে ফেলার দায়িত্ব আমার। সেটাতে তুই হস্তক্ষেপ করার কে? সময় হলে আমি-ই মা’রব তোকে। আপাতত ওয়েট কর!”
আর দাঁড়ায়নি মুগ্ধ। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি দেখিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেল ঘর ছেড়ে। মাহি স্তম্ভিত নেত্রে তাকিয়ে রইল কেবল। হতবাক কন্ঠ ফুঁড়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ সত্যি আমায় মে’রে ফেলবে?”
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় দাপুটে গ্যাং — দ্যা রুশদী পেন্থার। যাকে বহিরাগত ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় আখ্যায়িত করা হয়। আন্ডারওয়ার্লডের বড় বড় গ্যাংস্টার, মাফিয়া যার একটিমাত্র হুকুমের জন্য চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করে থাকে সে আর কেউ নয় — দ্যা ডেমোন ওরফ শ্যাডো মনস্টার। অন্ধকার থেকে আলোতে যাকে এখন অব্দি দেখা যায়নি। যার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাধ্যি নেই কারো! দ্যা শ্যাডো মনস্টার, যার কাছে মানুষ মা’রা একদম ডাল-ভাতের সমান, সে-ই মনস্টার কি-না একটা সামান্য মেয়ের জন্য রাশিয়ার টপ লিস্টের ৩৫জন ডক্টরকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছে তার প্যালেসে? ইজ দিস রিয়েলি পসিবল? দামিয়ানের সামান্য একটা কথায় বিস্ফোরণ ঘটেছে পুরো কনফারেন্স লাউঞ্জে। উপস্থিত ডাক্তাররা কেমন হা করে তাকিয়ে আছে দামিয়ানের পানে। দামিয়ানের মুখাবয়বে যতটা উচ্ছ্বসিত ভাবস্রোত, বাদবাকিদের মুখাবয়বে তা অনুপস্থিত। কনফারেন্স টেবিলের একদম শেষের চেয়ারে গম্ভীর মুখে বসে আছেন ডক্টর মিয়ান। বাহাতের কনুই ঠেকানো টেবিলের ওপর, আঙুলে খেলছে পেন্সিল! নাকের ওপর ঝুলে থাকা চশমাটা খানিক ঠেলেঠুলে গম্ভীর পুরুষ গম্ভীর কন্ঠে আওড়ালেন,
“ সো ডক্টর দামিয়ান! আপনি বলতে চাইছেন, আমি সহ এখানে যারা যারা আছে আমরা সবাই গত দুদিন আগে দ্যা শ্যাডো মনস্টারের হিডেন প্যালেসে গিয়েছিলাম? লাইক সিরিয়াসলি? যে প্যালেসের ঠিকানাটাই কারোর ঠিকঠাক মতো জানার কথা নয়, সে-ই প্যালেসে কি-না আমরা গিয়েছি? তারপর আবার বেঁচেও ফিরেছি? ইজ নট ইট ফানি?”
দামিয়ান অতিষ্ঠ হলো ফের! মোটা পেটখানার দু’ধারে হাত ঠেকিয়ে বাজখাঁই কন্ঠে আওড়াল,
“ আ’ম সিরিয়াস ডক্টর!”
মিয়ান ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন এহেন কথায়। রয়েসয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বললেন,
“ আই থিংক ইউ আর ড্রাংক মিস্টার দামিয়ান। গো এন্ড টেক সাম হেঙ্গোবার।”
তেতেঁ উঠলেন দামিয়ান। গলায় ঝাঁঝ ঢেলে যেইনা কিছু বলতে যাবেন ওমনি খেয়াল করলেন, বাকিরাও একে একে উঠে যাচ্ছে চেয়ার ছেড়ে। ডক্টর মিয়ানের পিছুপিছু বেশ ক’জন চলে গিয়েছে ইতোমধ্যে। দামিয়ান বড্ড হতাশ হলো! উদাস মুখে হাত বাড়িয়ে চেয়ার টেনে বসে, দু’হাতে চোখদুটো চেপে ধরল কেমন। বেশকিছুক্ষন পর, কাঁধে কারো শীতল হাতের স্পর্শ অনুভূত হতেই হকচকিয়ে ঘাড় বাকায় দামিয়ান। চোখদুটো ওপরে তুলে দেখল — ডক্টর আন্দালিব কেমন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার পানে। দামিয়ান তক্ষুনি নড়েচড়ে বসলেন। জিজ্ঞাসু চোখে আন্দালিবের পানে তাকিয়ে থাকতেই আন্দালিব কেমন সন্দেহাকুল কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আই থিংক, ইউ আর রাইট দামিয়ান। কজ গতকাল ঘুম থেকে ওঠার পর আমার ওয়াইফ আমায় বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করছিল — আমি গত দু’ দিন কোথায় ছিলাম! বাট আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল না আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম! ইভেন এখনো মনে পড়ছে না এ বিষয়ে। তবে আমার ওয়াইফ তো আর মিথ্যে বলবেনা রাইট? এজ ইউ নো, আমি কখনোই বাইরে রাত কাটাই না। তাহলে আমি গত দু’টো দিন কোথায় ছিলাম? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে — তুমি সত্যি বলছো। কিন্তু ডাউটও হচ্ছে এ নিয়ে যে, যেখানে আমাদের কিচ্ছু মনে পরছে না সেখানে তুমি এতোকিছু মনে রাখলে কিভাবে?”
দামিয়ান উৎসাহিত হয়ে তৎক্ষনাৎ চেপে ধরে আন্দালিবের হাত। লোকটাকে বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে, নিজের পাশের আসনে বসিয়ে বিবৃতি দিলো তখনকার পুরো ঘটনা। যত শুনছে ততই যেন অবাক হচ্ছে আন্দালিব। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অবিশ্বাস্যের ছাপ। নিজ কানে এতকিছু শুনেও বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছেনা দামিয়ানের কথাগুলো। দামিয়ান হাঁপিয়ে উঠেছে বলতে বলতে। গলা শুকিয়ে কাঠ প্রায়! টেবিলের ওপর বেড়ে রাখা পানির গ্লাসটা তক্ষুনি হাতে উঠিয়ে চুমুক বসালেন দামিয়ান। লম্বা লম্বা নিশ্বাসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গিলে নিলেন সম্পূর্ণ গ্লাসের পানি। পাশ থেকে আন্দালিব কেমন শান্ত কন্ঠে আচমকা বলে ওঠে,
“ যদি মনস্টার কোনোদিন জানতে পারে তোমার কথা, তবে কী করবে দামিয়ান?”
দামিয়ান ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে মুঠোয় চেপে ধরেছে ধরেছে কাঁচের গ্লাসটা। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে নিয়ে, ঠোঁটের কোণে লেপ্টে দিলো এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। সময় নিয়ে শয়তানি বুদ্ধির কামাল দেখিয়ে জানালো,
“ তার আগে দ্যা মনস্টারের উইক পয়েন্টের কথাটা অন্তত একজনের কানে দিয়ে নেই! তারপর যা হবে, দেখা যাবে।”
ভড়কায় আন্দালিব! ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কাকে বলবে?”
সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় দামিয়ান। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি লেপ্টে কেবল আওড়ায়,
“ আছে একজন!”
বড়সড় কাঁচের তৈরী চেম্বারে বসে আছে মনস্টার! এ যেন চেম্বার নয় এক কথায় ব্যাডমিন্টন কোট! সম্পূর্ণ চেম্বারের প্রতিটি দেয়াল জুড়ে সাজিয়ে রাখা দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডের অ*স্ত্র! কোনোটা খুব দামী, তো আবার কোনোটা খুব রেয়ার। চেম্বারের একপাশে বিছিয়ে রাখা একখানা বড়সড় ডেস্ক। তার ঠিক পেছনের দেয়ালে সংরক্ষিত অবস্থায় আছে সল্টওয়াটার ক্রোকোডাইল। পানিতে পরিপূর্ণ কাঁচের তৈরী দেয়ালের কী সুন্দর করে ঝিমুচ্ছে হিংস্র কুমির! তার পাশেই স্তুপ জমেছে মানব শরীরের হাড়গোড়ের। বোধহয় বড্ড আয়েশ করে খাবার খেয়েছে কুমির বাবাজি, তাই এখন ঝিমাচ্ছেন তিনি। এদিকে তার সামনেই চেয়ার পেতে ডেস্কের ওপর পা তুলে বসে আছে মুগ্ধ! একহাতে ফাইল ঘাঁটছে, আরেকহাতের আঙুলের ভাঁজে জ্বলছে সিগার। গম্ভীর মুখো যুবকের কপালখানায় বেশ ক’টা ভাঁজ বিদ্যমান। ফাইল ঘাঁটার ফাঁকফোকরে বারকয়েক টান বসাচ্ছে সিগারে। এরইমধ্যে চেম্বারে দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ হলো খানিকটা। মনস্টার মোটেও পাত্তা দেয়নি তাতে। মিনিট দুয়েক যেতে না যেতেই চেম্বারের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এডউইন। মনস্টারের মুখে আদৌও কোনদিন অনুমতি পেয়েছে সে? যে আজ পাবে? গম্ভীর মুখো এডউইন রয়েসয়ে কদম বাড়াচ্ছে। ডেস্ক থেকে প্রায় পাঁচ হাত দুরত্বে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থেকে, হাতদুটো কোমরের পিঠে বেঁধেছে। গলায় ভারী গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে নিচু স্বরে বলে,
“ মনস্তার! মানি লন্ডারিংয়ের ক্লিন টাকা গতকালকেই রিফান্ড হওয়ার কথা ছিলো। বাট ইস্তাম্বুল থেকে এখনো তেমন কোনো রেসপন্স আসেনি। আমি কী তবে তাকে জানিয়ে দিব — এ টাকা কার?”
ব্যস্ত দৃষ্টিখানা থামল মুগ্ধের। ফাইলের ভেতর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে তাক করল এডউইনের ওপর। কিয়তক্ষন সরু চোখে তাকিয়ে রইলো মনস্টার অতঃপর ঠোঁটের কোণে তার আচমকা দেখা মিলল ক্রুর হাসির রেশ। সে চট করে হাত থেকে ফাইলটা ডেস্কের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। পাদু’টো আস্তেধীরে ডেস্ক থেকে নামিয়ে এনে গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ মাঝেমধ্যে শুধু নাম বলা উচিৎ না এডউইন, পাওয়ারও দেখাতে হয়! আজ নাহয় ওরাও দেখুক — দ্যা শ্যাডো মনস্টারের আনটোল্ড পাওয়ার। জেট রেডি কর, আ’ম কামিং!”
এডউইন নতমস্তকে ঠোঁট কামড়ে হাসলো বোধহয়। মনস্টার তার ফর্মে ফিরেছে! আহা! ঠিক কতদিন পর আগের দৃশ্য দেখবে সে। ভাবতে ভাবতেই মনটা কেমন আনন্দে নেচে-কুঁদে উঠছে তার।
ডিভানের ওপর পা গুটিয়ে বসে আছে মাহি। মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে অন্যত্র। পাশেই খাবারের প্লেট কোলে নিয়ে বসে আছে মিলা। লোকমা তুলে এগিয়ে রেখেছে মাহি’র দিকে। বারবার অনুনয় জুড়ে বলছে,
“ একটু খেয়ে নাও মুনলাইট। বেশি না মাত্র একটু খেলেই হবে।”
সপ্তদশী বেজার মুখখানা ঘুরিয়ে রেখেছে কেমন। মিলার ওমন অনুনয়ে গলছে না আজ, উল্টো ভাব ধরেছে কঠিন। মিলা হাঁপিয়ে উঠেছে বলতে বলতে। মাহি’র এহেন অপারগতা বড্ড পীড়া দিচ্ছে তাকে। মেয়েটা কেমন আহত চোখে তাকিয়ে রইলো মাহি’র পানে। কন্ঠ ধরে আসছে তার। একটু কাঁদতে পারলে বোধহয় ভালো লাগত। সে বহুকষ্টে ঢোক গিললো খানিকটা। রয়েসয়ে বলল,
“ মুনলাইট! আমি জানি তোমার বিশ্বাস একবার ভেঙেছে। এ নিয়ে আমি নিজেও বড্ড আফসোস করছি! তবে বিশ্বাস করো, এখানে আমার কোনো দোষ নেই। আমি বহুবার চেয়েছি তোমায় আটকাতে, একবার নিষেধও করেছিলাম কিন্তু…. ”
বাকিটা আর বলা হলোনা মিলার। তার আগেই ডুকরে উঠল যুবতী। মাহি’র মন গলল কি-না কে জানে! সে সময় নিয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো। কপাল কুঁচকে কিয়তক্ষন চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে শুধালো,
“ হয়েছে আর কাঁদতে হবে না। কই দেখি, কী এনেছো!”
থামল মিলা। কান্না ভুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মাহি’র পানে। অবোধের সুরে ফের জিজ্ঞেস করল,
“ সত্যি খাবে?”
মাহি প্রতিত্তোরে ছোট উত্তর দিয়ে জানালো,
“ হু।”
মিলার খুশি এবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মেয়েটা কেমন উচ্ছ্বসিত হয়ে ফের লোকমা তুলে এগিয়ে দিলো মাহির মুখের দিকে। মাহি এবার আর মুখ ঘোরায়নি। আলতো করে হা করে মুখে পুরে নিলো খাবার টুকু। আয়েশে চিবুতে চিবুতে আরেকবার লোকমা উঠল তার মুখের দিকে। এবারেও বিনাবাক্য ব্যয়ে হা করল মাহি। খাচ্ছে সে, অথচ আনন্দে চোখদুটো চিকচিক করছে মিলার। মাহি অবশ্য খেয়াল করেনি তা। আনমনে খাবার চিবুতে ব্যস্ত সপ্তদশী। পিনপতন নীরবতায় ছেয়ে থাকা পুরো কামরা জুড়ে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল এক বিকট গর্জনধ্বনি। মাহি আঁতকে উঠে এহেন গর্জনে। এই বুঝি ধরণীর আকাশ চিঁড়ে কিছু একটা নেমে আসবে এক্ষুণি! মাহি খাওয়া ফেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। ভয়ার্ত কন্ঠে মুখভর্তি খাবার নিয়েই অস্পষ্ট উচ্চারণে বলল,
“ এটা কিসের আওয়াজ?”
মিলা স্মিত হাসলো। বাহাতে মাহির হাতখানা দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে আশ্বস্ত করল ভয় না পেতে। মাহিও তা-ই করল! সময় যেতে যেতে আওয়াজটা মৃদু শোনাচ্ছে যেন। মিলা তখন নরম কন্ঠে বলে ওঠে,
“ এটা প্রাইভেট জেটের শব্দ! আই থিংক, মনস্টার কোথাও যাচ্ছে।”
তড়াক ঘাড় উঁচায় মাহি। সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ঠায় বজায় রেখে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ এতো শিওর হলে কিভাবে?”
হুটহাট কৌতুক শুনলে মানুষ যেভাবে হো হো করে হেসে ওঠে, ঠিক তেমনিভাবে মিলাও কেমন হেসে উঠল। হাসতে হাসতে গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ার দশা তার। মাহি অপমানিত বোধ করল এহেন কান্ডে। সে কী এমন বলল যার জন্য এভাবে হাসতে হবে? মাহি গাল ফুলিয়ে অন্যত্র তাকায়। তা দেখতে পেয়েই চট করে হাসি থামায় মিলা। রাগিণীর রাগ ভাঙানোর কায়দায় তক্ষুনি একহাতে চেপে ধরে নিজের কান। অপরাধী কন্ঠে বলে,
“ সরি সরি মুনলাইট! আর হাসব না। এই যে দেখো! কানে ধরেছি। এ্যাই তাকাও না।”
মাহি আড়দৃষ্টিতে তাকায় একপলক। কপট ভাব ধরে বলে ওঠে,
“ এতো হাসলে কি নিয়ে শুনি?”
মিলা মুচকি হাসলো ফের। প্লেটে খাবার মাখাতে মাখাতে জানালো,
“ মনস্টারের গুপ্ত প্যালেসের ওপর দিয়ে জেট উড়িয়ে নিয়ে যাবার ক্ষমতা অন্য কারো আছে বুঝি? তা ভেবেই হাসছিলাম।”
মাহি ঠোঁট গোল করে শব্দ তুলল সামান্য। মিলা আরেক লোকমা তুলে ধরতেই মুখে পুরলো খাবারটা। আয়েশ করে চিবুতে চিবুতে বিড়বিড় করে বলল,
“ তারমানে মনস্টার প্যালেসে নেই! গুড।”
“ হু? কিছু বললে মুনলাইট?”
মিলার অবোধ প্রশ্নে চটজলদি না বোধক মাথা নাড়ায় মাহি। মিলাও যেচে পড়ে জিজ্ঞেস করেনি কিছু। দুজন কিয়তক্ষন চুপ করে থাকতেই ঘরে এসে পা রাখল আরেক মেইড। যুবতী রাশিয়ান কন্যা ঘরে ঢুকেই ছুটে এলো মিলার নিকট। মিলা তাকে দেখতে পেয়ে ভ্রু কুঁচকায় কেমন। মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই শুনতে পায় মেইডের ব্যস্ত কন্ঠ!
“ মিলা ডিয়ার! আজ রাতে ট্রাক আসবে তো?”
মিলা বুঝল প্রসঙ্গ। কপালের কুঁচকে রাখা চামড়া খানিকটা শিথিল করে নিয়ে হাঁফ ছেড়ে জানালো,
“ ওহ ইয়েস! আজ রাত ৯-১০ টার দিকে চলে আসবে আশা করি।”
মেইড প্রসন্ন হাসলেন এরূপ উত্তরে। এদিকে মাহি কেমন হা করে তাকিয়ে আছে দু’জনের পানে। তাদের কথাবার্তা খুব একটা বোধগম্য হয়নি মানবীর। সে খানিক দোনোমোনো করে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কিসের ট্রাক আসবে মিলা?”
মিলা নজর ঘোরালো মাহির প্রতি। আলতো হেসে বলল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২১
“ মাসকাবারি বাজারের। প্রতি মাসেই একবার করে আসে। একসাথে ৪/৫ ট্রাক চলে আসে! তা দিয়েই চলে যায় সারা মাস।”
মাহি’র ছোট্ট মস্তিষ্ক আজ বড্ড প্রখরতায় ডুবেছে। মুখটা হয়েছে গম্ভীর। মানবী মনে মনে কি যেন ভাবছে। বোধহয় ছক কষছে কোনোকিছুর। সে আচমকা গম্ভীর মুখে প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কয়টার দিকে আসবে ট্রাক?”
“ এজ ইউজ্যুয়াল, রাত ৯-১০টার দিকে।”
সপ্তদশী রহস্যময় হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। মাথাটা খানিক নুইয়ে রেখে মনে মনে আওড়াল,
“ পয়েন্ট নোটেড!”

Next 2 ,3 ta part eksate dien
আপু পরের পর্ব দেন 😫💗👌🥰🫰😫💗🌹🌈🤭 অনেক সুন্দর উপন্যাস টা