মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫
jannatul firdaus mithila
গাল ফুলিয়ে দাঁত কিড়মিড় করছে মাহি। দুপা মেঝের দিকে ঝুলিয়ে বসে আছে বিছানায়। যখন-তখন লোকটা ধমকায়, উড়ে এসে জুড়ে বসে একপ্রকার! কেনো? সে ওকে নিজ আস্তানায় নিয়ে এসেছে বলে মাথা কিনে নিয়েছে না-কি? মাহির এহেন অতর্কিত ভাবনার মাঝেই ঘরে সার্ভিং রেক নিয়ে প্রবেশ করলেন মেইডেন ইরা। মাহিকে বিছানার এককোণে ওমন গাল ফুলিয়ে বসে থাকতে দেখে, তিনি কেমন ভ্রু কুঁচকালেন। সার্ভিং রেকটা ঠেলতে ঠেলতে এসে দাঁড়ালেন বিছানার অন্যপাশে। অতঃপর রেকটা ঠায় দাড়ঁ করিয়ে রেখে দু-কদম বাড়িয়ে এসে বসলেন মাহির একদম গা ঘেঁষে। মাহি নড়ল-চড়ল না। মেইডেন তখন আলতো করে একহাতে জড়িয়ে ধরলেন মাহিকে। নরম কন্ঠে জানতে চাইলেন,
“ কি হয়েছে তোমার? হুট করে এতো রেগে গেলে যে?”
মাহির ফর্সা মুখখানায় ছেয়ে আছে লাল আভা! সরু নাকের পাটাটা লাল টুকটুকে রঙ ধরেছে যেন। সে প্রতিত্তোরে গাল ফুলিয়ে নিজের ভাঙা কন্ঠেই জবাব দিল,
“ না রেগে নেই!”
মেয়েটার কথায় স্পষ্ট রাগ! নরম সরম মেয়েটা তবে রাগতেও জানে? মেইডেন স্মিত হাসলেন। মাহিকে ছেড়ে দিয়ে কপট তাড়া দেখিয়ে বললেন,
“ খাবারটা খেয়ে নাও। শুনলাম, তোমার না-কি খুব ক্ষুধা পেয়েছে!”
মাহি খাবার খেতে নারাজ। তক্ষুনি বুকের কাছে দু-হাত বেঁধে মুখ ঘোরালো অন্যত্র। ভাঙা কন্ঠে বেশ ঝাঁঝ ঢেলে বলল,
“ খাবো না আমি, নিয়ে যান এসব!”
মেইডেন অবাক হলেন এহেন উত্তরে। চোখেমুখে একরাশ হতবাকতা লেপ্টে নিয়ে শুধালেন,
“ ওমা! তা কেন? তুমি না বললে তোমার খুব ক্ষুধা লেগেছে? তাহলে এখন খাবেনা কেনো?”
মাহি তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করেনি। সবটা কেমন যেন ভীষণ বিষাক্ত লাগছে তার কাছে। এই আলিশান প্রাসাদের ন্যায় বাড়ি, রক্ষী-প্রহরী আর সবশেষে ঐ মনস্টার! সবাইকে এতো বিরক্ত লাগছেনা! মেয়েটা নিজের বিরক্তি নিয়েই জানালো,
“ প্লিজ কৈফিয়ত শুনতে চাইবেন না। আমার ভালো লাগছেনা কিছু! খাবার নিয়ে যান, আমার ক্ষুধা পেটেই মরে গেছে।”
মেইডেন অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। মুখ খুলে কিছু বলতেই যাবেন ওমনি কক্ষের দুয়ারের দ্বার থেকে ভেসে এলো এক পুরুষালী গুরুগম্ভীর কন্ঠ!
“ বাংলার শেষ নবাবের বংশধর ওরফে শ্রেষ্ঠ নাকে কাঁদুনি, কথায় কথায় গাল ফুলানি! খাবার খাচ্ছিস না কেনো?”
এহেন কথায় তক্ষুনি বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মেইডেন। মাথাটা ত্রস্ত নুইয়ে সরে দাঁড়ালেন কয়েককদম। এদিকে মুগ্ধের ওমন ঠেস দেওয়া কথা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই মাহি কেমন বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল। মুখটা আগের ন্যায় অন্যদিকে ঠায় ঘুরিয়ে রেখে ফটাফট বলল,
“ খাবোনা আমি! তাতে আপনার কী? দেখি আমি না খেয়ে থেকে মরতে পারি কি-না!”
গম্ভীর পুরুষ বাঁকা হাসলো এহেন কথায়। দু’হাত পকেটে গুঁজে রেখে পা বাড়ালো সম্মুখে। গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ঁল,
“ আউট!”
মেইডেন তক্ষুনি মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলেন ঘর ছেড়ে। মুগ্ধ তখন এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহির মুখোমুখি। মাহি এখনো মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে। তা দেখে গম্ভীর পুরুষ কেমন ভ্রু কুঁচকায়, তক্ষুনি শক্ত হাতে মাহির মাথার পেছনের চুলগুলো চেপে ধরে! মাহি ককিয়ে ওঠে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে ব্যাথায়। মুগ্ধ তখন শক্ত হাতে মেয়েটার মাথা ঝাঁকিয়ে কটমট করতে করতে বলে,
“ ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু ইগনোর মি চাশমিস! নেক্সট টাইম থেকে আমি কথা বলার সময় তোর সম্পূর্ণ মনোযোগ যেন অলওয়েজ আমার ওপরেই থাকে, আদারওয়াইজ তোর ঐ ছোট্ট কানদুটো কিন্তু সারাজীবনের জন্য কথা শোনা বন্ধ করে দিবে!”
মাহি নাক টানল সামান্য। চোখদুটো তার এখনো কুঁচকে থাকায় মুগ্ধ তুলল আরেক গর্জন!
“ চোখ খোল বেয়াদবের বাচ্চা!”
তক্ষুনি সপ্তদশী নিজের ছলছল চোখজোড়া খুলল। মুহুর্তেই থমকালো চারপাশ! মাহির ছোট্ট মুখখানার বেশ নিকটে সুদর্শন যুবকের মুখ। ঘন-কালো পল্লবিত বাদামী চোখদুটো যেন নিখাঁদ ঘনজঙ্গল। লম্বাটে মুখ তার, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত তীক্ষ্ণ চোয়াল। একদম তীরের ফলার ন্যায় খাঁড়া নাক! তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটোর ডানপাশে খানিকটা ক্ষত জাতীয় কিছু। লোকটা সে-কি মারাত্মক ফর্সা! তার ফর্সাটে ললাটে মাথাভর্তি উষ্কখুষ্ক চুলগুলো খানিক আছঁড়ে পড়ছে যেন। বাম কানের লতিতে আটকিয়ে রাখা একখানা প্লাটিনামের গোল রিং জাতীয় দুল। মানুষটার গা থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণ! মাহি জানে না এ পারফিউমের নাম। জানে না হঠাৎ তার হৃদয় থমকানোর কারণ! এর আগে থোড়াই এতো কাছ থেকে কোনো পুরুষ মানুষকে দেখেছে সে! সপ্তদশীর পেটে হঠাৎ করেই গুড়গুড় শুরু হলো কেন যেন। তার নিখাঁদ সৌন্দর্যমন্ডিত গোলাপি অধরজোড়া কাঁপছে তিরতির করে। যেন বলতে চাইছে কিছু! মুগ্ধ নামক সুদর্শন যুবক ক্রুর হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। পরমুহূর্তেই সে হাসি গায়েব হয়ে গেল কোথায় যেন। মাহির চোখে চোখ রেখে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলল,
“ আই নো আ’ম ঠু হেন্ডসাম! তাই বলে এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খেতে হবে আমায়? এর আগে কখনো সুন্দর পুরুষ মানুষ দেখিসনি নির্লজ্জ মেয়েছেলে? ছিহঃ ছিহঃ কিভাবে হা করে তাকিয়ে আছিস! যা একগ্লাস পানিতে ডুবে মর! যাহ!”
মাহি বুঝি নিজ কান্ডে নিজেই লজ্জিত এবার। তক্ষুনি নয়ন নামালো নিচে। ভীষণ অস্বস্তিতে নড়চড় করতেই তার চুলগুলোয় আরেকবার টান বসায় মুগ্ধ। অন্যহাতে তক্ষুনি মাহির চোয়াল চেপে মুখটা খানিক উঁচু করে চোখাচোখি করল ফের। মাহির এবার আর সাহসে কুলচ্ছেনা মুগ্ধের চোখে চোখ রাখতে। তবুও মেয়েটা বেশ করে নিজেকে সামলে তাকাল মুগ্ধের মুখপানে। কটমটিয়ে তাকিয়ে আছে মুগ্ধ। দাঁত খিঁচে হিসহিসিয়ে বলে,
“ না খেয়ে কেউ মরে না বান্দীর মেয়ে! মানুষ মরে যন্ত্রণায়, একাকীত্বে এবং কষ্টে। তোকে আমি সবগুলো দেব, জাস্ট একটু সময় নিয়ে, রয়েসয়ে! কিন্তু দিবই!”
মাহি ঢোক গিলল সামান্য। এহেন মোটা মোটা কথা কোনোকালেই ঘটে ঢুকেনা তার। আজও ঢুকলো না বৈকি! সে কেমন অবোধের ন্যায় তাকিয়ে থাকতেই মুগ্ধ তাকে ছেড়ে দিল। কাঠকাঠ কন্ঠে আদেশ ছুড়ঁল,
“ এক্ষুণি খাবার খাবি!”
মাহি চুলের ব্যাথায় এখনো কুঁচকে রেখেছে মুখ। তারওপর চোয়ালের ব্যাথা নতুন করে যোগ হলো বলে! এরমধ্যে মুগ্ধের ওমন আদেশ যেন জ্বলা আগুনে ঘি ঢাললো একপ্রকার। মাহি কেমন তেতেঁ গিয়ে বলল,
“ না খাব না।”
অবাধ্য বুলিটা ঠোঁট গলিয়ে অস্ফুটে বের হতেই মেয়েটার নরম-সরম ডানগালটায় সপাটে বসল এক থাপ্পড়। তৎক্ষনাৎ হতভম্ব বনে গেল মাহি। কানের পাশ দিয়ে এইমাত্র বুঝি ভোঁ শব্দ তুলে উড়ে গেল এক বিশাল কিছু! সময় নিয়ে একহাত তার উঠে গেল ব্যাথায় জ্বলতে থাকা গালের ওপর। মেয়েটা কেমন নাক টানছে এবার। খানিক ফোপাঁতে ফোপাঁতে আলতো করে হাতের উল্টো পিঠে চোখদুটো মুছে নিয়ে, আধো আধো বুলিতে আওড়ায়,
“ এভাবে যখন-তখন না মেরে, আপনি আমায় একেবারে মেরে ফেলুন। তাও…”
বাকিটা শেষ হবার পূর্বে তাঁর বাম গালটাতেও একইরকমভাবে বসল মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ। মাহি এবার ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে। দুগালে হাত চেপে ভীষণ কষ্ট নিয়ে আচমকা চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“ কথায় কথায় গায়ে হাত তুলেন কেনো আপনি?”
মুগ্ধ দাঁত চিবোয়। শক্ত চোয়ালে কটমট করতে করতে বলে,
“ গলার স্বর নামিয়ে কথা বল বান্দীর মেয়ে!”
মাহির শরীর জ্বলছে রাগে, গাল জ্বলছে থাপ্পড়ের রেশে। তবুও মেয়েটার সে-কি তেজ! সে আবারও অবাধ্যতা দেখিয়ে বলে,
“ বলব না কি করবেন?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই ওমনি মাহির গলা চেপে ধরে মুগ্ধ। মাহি হকচকায়। গলা ছাড়ানোর ব্যর্থ প্রয়াসে মত্ত থাকতেই মুগ্ধ নিজের মুখটা নামিয়ে আনলো মাহির মুখ বরাবর। দাঁতে দাঁত চেপে অগ্নি দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে গভীর অথচ ঝাঁঝাল কন্ঠে আওড়ায়,
“ একদম কাঁচা খেয়ে ফেলব! আই রিপিট, একদম কাঁচা! যদিও আমি এপর্যন্ত হিউম্যান মি**ট ট্রায় করিনি, বাট তোর বাড়াবাড়ি বেড়ে গেলে আমি নাহয় শুরুটা তোকে দিয়েই করব!”
নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে মাহির। কাশছে অনবরত! মুগ্ধ দেখল, বাঁকা হেসে তক্ষুনি ছেড়ে দিল মাহির কন্ঠা। ছাড়া পেতেই অস্থির মাহি পাগলের ন্যায় বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল। মুগ্ধ তাকিয়ে আছে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে, মনের মধ্যে মায়ার লেশমাত্র নেই! সে উল্টো মেয়েটাকে আদেশ ছুড়েঁ বলে,
“ লাস্টবার বলছি! খাবি কি-না বল?”
মাহি নিশ্বাস ফেলছে ঘনঘন। উত্তর দেবার পরিস্থিতিতে নেই সে। মুগ্ধ ধরে নিলো মেয়েটা বোধহয় আবারও অবাধ্যতা করছে তার। তাইতো সে কেমন একহাত উঁচিয়ে ঘাড় ডলতে ডলতে মেজাজ খিঁচে বলল,
“ ফাইন! খেতে হবে না তোর । এমনিতেও গতরাত থেকে আমার প্রাডা যথেষ্ট ক্ষুধার্ত, চল তাহলে.. তোকে ওর পেটে চালান করে দিয়ে আসি। ওঠ!”
প্রাডার কথা শুনতেই এতক্ষণের বীরাঙ্গনা ভাবস্রোত এক নিমিষেই পালালো মাহির। মেয়েটা তক্ষুনি দিনদুনিয়া ভুলে লাফ দিয়ে নামল বিছানা হতে। ভয়ার্ত ঢোক গিলে বলতে লাগল,
“ এই না না না… খাচ্ছি আমি, এই দেখুন খাচ্ছি আমি। তবুও আপনার প্রাডাকে ডাকবেন না প্লিজ!”
বলেই মাহি এক লাফে চলে গেল সার্ভিং রেকের কাছে। ওপর থেকে যা-ই পেল তা হাতভরে মুখে পুরে, গপাগপ গিলতে লাগল কোনমতে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টিতে দেখছে মেয়েটার কান্ড। দু’হাতে খাবার নিয়ে মুখে পুরছে, গালদুটো ভরে গিয়ে মুখটা দেখা যাচ্ছে পটকা মাছের মত। মুগ্ধ বিরক্ত হয়ে চোখ সরাতে গেলেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকালো মাহির গায়ে। আশ্চর্য হলেও সত্যি, এতক্ষণে একবারও মুগ্ধের দৃষ্টি পড়েনি মাহির গায়ে। পড়লে হয়তো আরও আগেই মেয়েটার কপালে শনি লাগত। মুগ্ধ কেমন শক্ত চোখে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে এলো এক-কদম। তক্ষুনি পেছন থেকে একহাতে শক্ত করে মাহির কনুই চেপে, মেয়েটাকে হেঁচকা টানে ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে। এহেন কান্ডে মুখভর্তি খাবার নিয়ে হা করে ভ্যাবলার ন্যায় তাকিয়ে রইলো মাহি। সেকেন্ড খানেক পেরুতেই মুগ্ধের হাত চলে গেল তার পরনের গাউনটার কাঁধের অংশে। যেথায় শক্ত হাতে টেনে ধরেছে মুগ্ধ, চোখমুখ লাল করে ছেলেটা কেমন গর্জন তুলে বলতে লাগল,
“ এগুলো কি পরেছিস তুই? কে দিলো তোকে মেইডদের কাপড়? আন্সার মি!”
এহেন বজ্র কন্ঠে আঁতকে উঠে মাহি। মুখভর্তি খাবার নিয়ে কিচ্ছুটি বলতে পারলোনা বেচারি। মুগ্ধের মেজাজ এবার তুঙ্গে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা ছিঁড়ে ফেলল মাহির পরনের জামাটার কাঁধের অংশ। মাহি তৎক্ষনাৎ দু’হাতে চেপে ধরে নিজের সম্ভ্রম। ভয়ে অস্বস্তিতে পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল কেমন। তার ছোট্ট মাথায় এখনো ঢুকছেনা মুগ্ধের হঠাৎ রেগে যাবার কারণ। এদিকে মুগ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটার মুখপানে। তার মনে এবার কি চলছে কে জানে! সে কিয়তক্ষন একইভাবে তাকিয়ে থেকে তক্ষুনি গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। ওদিকে তার প্রস্থান ঘটতেই জামার ছেঁড়া অংশ চেপে ধরে ধপ করে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মাহি। চোখদুটো বোধহয় শুকিয়ে গিয়েছে তার। নাহলে তো এতক্ষণে এক-দু ফোঁটা অশ্রু ঠিকই ঝরতো সপ্তদশীর কাজলদিঘী চোখদুটো থেকে।
বিকেল নেমেছে বেশ কিছুক্ষণ হবে। বাড়ির পেছনের চেরি ব্লসম ট্রি বাগানে হাঁটাহাঁটি করছে সিদ্ধার্থ। বিকেলের সময়টা এ বাগানে বেশ ভালো কাটে তার। চারিদিকের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যেন বরাবরই মুগ্ধ করে তাকে। সে টানে আজও ছটে এলো ছেলেটা। তবে তার মুখটা আজ গম্ভীর, কপালে একরাশ চিন্তার ছাপ। সে একবার কি মনে করে হাটাঁর মাঝপথে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল প্যালেসের দোতলার দিকে। তক্ষুনি তার নজরে পড়ল মাহি। মেয়েটা জানালার পাশে কাউচে বসে দূর আকাশপটে তাকিয়ে আছে। সিদ্ধার্থের হঠাৎ কি হলো কে জানে! তার সারা শরীর কেমন ঝাঁকিয়ে উঠল দেখো। ছেলেটা তড়িঘড়ি করে নিজের নজর লুকালো এদিক ওদিক। চোরের মতো কাচুমাচু করতেই হঠাৎ টের পেল নিজ কাঁধে কারো হাতের শীতল স্পর্শ। তক্ষুনি হকচকিয়ে পেছনে ফিরে সিদ্ধার্থ। সম্মুখে চিরচেনা এক গম্ভীর মানুষকে দেখে ভড়কে গিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,
“ এডউইন!”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর মুখো বিদেশী পুরুষ হাসলো ঠোঁট পিষে। গোলগাল মুখ তার, কপাল থেকে ডানগাল বরাবর আড়াআড়িভাবে বসে আছে একখানা গভীর দাগ। সে-কি বিভৎস রুপ তার। ডানচোখ ঠিক থাকলেও বামচোখে পরে আছে সফেদ রঙা লেন্স। পরনের কালো ফর্মাল প্যান্টে দু’হাত ঢুকিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ কি ব্যাপার সিড? আমায় দেখে হঠাৎ করে এতো ভড়কে গেলে কেনো?”
সিদ্ধার্থ আমতা আমতা করছে। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে কোনমতে বলছে,
“ ক-কই না-নাতো।”
এডউইন বিচক্ষণ মস্তিষ্কের মানুষ। মিথ্যে গুলো খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারেন তিনি, শত হলেও মনস্টারের রাইট হ্যান্ড বলে কথা। মনস্টারের মতো একটু-আধটু ভয়ংকর নাহলে কি আর হয়? এডউইন ক্রমশ এগিয়ে আসে সিদ্ধার্থের দিকে। সিদ্ধার্থ ভয়ে ভয়ে কদম পেছাচ্ছে বেশ। তবে খুব বেশি পেছাতে পারলোনা বেচারা। তার আগেই তাঁকে আটকে ফেলে এডউইন। খুবই সুক্ষ্মতার সাথে কোমর থেকে বন্দুক বের করে এনে ঠেকিয়েছে সিদ্ধার্থের গোপনাঙ্গ বরাবর। তা টের পেতেই ভয়ে তটস্থ সিদ্ধার্থ। হকচকিয়ে মুখ খোলার আগেই শোনা গেল এডউইনের গম্ভীর কন্ঠ!
“ কি লুকাচ্ছো?
সিদ্ধার্থ তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়ায় দু’দিকে। ভয়ার্ত কন্ঠে বারকয়েক ঢোক গিলে বলে,
“ বিশ্বাস করুন এডউইন! আমি কিচ্ছু লুকাচ্ছি না।”
এডউইনের চোখেমুখে স্পষ্ট অবিশ্বাসের ছাপ। সে আবারও সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ তাহলে তোমার মুখটা এমন চোরের মতো কাচুমাচু করছে কেনো?”
“ আসলে এডউইন… আমি ভুল করে মনস্টারের…! ”
“ মনস্টারের? কি করেছ মনস্টারের?”
এডউইনের কন্ঠে স্পষ্ট বিচলিত ভাব। চোখেমুখে একপ্রকার আগুন। সিদ্ধার্থ ভয়ে গুটিয়ে গেল আবারও। তক্ষুনি নিজেকে শুধরে বলল,
“ না মানে বলছিলাম কী, আমি ভুল করে মনস্টারের নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে তাকিয়েছি। তাই এভাবে কাচুমাচু করছিলাম। বিশ্বাস করুন এডউইন, আমি এমনটা ইচ্ছে করে করিনি।”
এডউইন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে কেমন। সিদ্ধার্থের বলা কথাটায় একপ্রকার টুক ধরে পরক্ষণেই পাল্টা প্রশ্ন করল,
“ নিষিদ্ধ জিনিস বলতে?”
সিদ্ধার্থ মাথা নুয়ায়। জড়সড়ভাব ধরে রয়েসয়ে জবাব দেয়,
“ প্যালেসের দোতলার দিকে তাকাবেন না এডউইন। সেখানে আপাতত মনস্টারের নিষিদ্ধ জিনিস আছে।”
এডউইন মাথা তুলে তাকায়নি একবারও। তবে তার কৌতুহল যেন ক্রমশ বাড়ছে “ নিষিদ্ধ জিনিসটা ” কী তা জানার জন্য। সে নিজের বন্দুকটা আরেকটু চেপে ধরল সিদ্ধার্থের গায়ে। দাঁত খিঁচে জিজ্ঞেস করল,
“ সোজাসাপ্টা উত্তর দাও। এই নিষিদ্ধ জিনিসটা কী?”
সিদ্ধার্থ আর চুপ করে থাকলো না। তক্ষুনি গড়গড়িয়ে বলে দিলো সব। সবটা শুনে এডউইন যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার চোখেমুখে একরাশ হতবাকতা লেপ্টে গিয়েছে ইতোমধ্যে। তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অস্ফুটে কেবল বেরুলো,
“ বাংলাদেশ থেকে মেয়ে এনেছে? সিরিয়াসলি? রাশিয়ায় কি মেয়েদের অভাব পড়েছিল?”
❝ মনস্টার প্যারাডাইস ❞ এর ঠিক পেছনে রয়েছে বেশ পুরনো মাউন্টেন। মাউন্টেনের চুড়ায় নির্মিত — “ দি এশেস হাউজ” যা শ্যাডো মনস্টারের পেন্ট হাউজ নামে পরিচিত। সম্পূর্ণ কাচঁ দিয়ে তৈরী এ বাড়ি বাইরে থেকে দেখতে যতটা সুন্দর, ভেতর থেকে ঠিক ততোটাই ভয়ংকর। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ওপরে উঠছে এডউইন। বসের সাথে দেখা হয়না তার আজ কতগুলো দিন হলো! পেটের মধ্যে গোছানো আছে বেশকিছু কথা, সবগুলো একে একে বলতে হবে মনস্টারকে।
পেন্ট হাউজের বক্সিং ক্লাব! পাঞ্চিং ব্যাগের ধুপধাপ শব্দে মুখরিত চারপাশ। এডউইন সগৌরবে হেঁটে যাচ্ছে বক্সিং ক্লাবের দিকে। ক্লাবের দরজার সামনে দাড়িঁয়ে আছেন দু’জন দেহরক্ষী। তারা এডউইনকে দেখতে পেয়েই হালকা কুর্নিশ জানিয়ে পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন। এডউইন গম্ভীর মুখে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। অদূরে তাকাতেই দেখল, মনস্টার নামক বলিষ্ঠ দেহি পুরুষ একসাথে দু’টো পাঞ্চিং বক্সে একের পর এক পাঞ্চ মেরে যাচ্ছে। কখনো দু’হাত দিয়ে, তো আবার কখনো পা দিয়ে। পরনে কেবল কালো রঙের ঢিলেঢালা ট্রাউজার, পুরো গা উম্মুক্ত! দু’হাতে দু’টো বক্সিং গ্লাভস, একের পর এক পাঞ্চে শব্দ হচ্ছে বেশ। যুবকের সর্বাঙ্গ ঘামে জবজবে অবস্থা! এডউইন চুপচাপ কদম বাড়িয়ে এগিয়ে গেল খানিকটা সামনে। মনস্টারের কাছ থেকে বেশ দুরত্ব বজায় রেখে মাথা নুইয়ে বলতে লাগল,
“ দোব্রি ভিয়েচের, মনস্তর!”
[গুড ইভিনিং মনস্টার।]
মনস্টার জবাব দিলেন না। নিজ ওয়ার্ক আউটে মত্ত থাকলেন কেমন। এডউইন খানিকক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলতে লাগল,
“ আপনার ধারণা সঠিক ছিল মনস্টার। বার্গান্ডি আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
মুহুর্তেই হাতদুটো থেমে গেল মুগ্ধের। বলিষ্ঠকায় চওড়া বুকটা উঠানামা করছে ঘনঘন। কপালের ওপর লেপ্টে থাকা ঘামে ভেজা চুলগুলো হতে চুইয়ে পড়ছে ঘাম। বাদামী চোখদুটো ক্রমশ রক্তবর্ণ ধারণ করছে। চোয়াল হয়েছে শক্ত। মুগ্ধ হাত থেকে গ্লাভস দুটো খুলতে খুলতে আদেশ ছুড়ঁল,
“ ভিভেদি মাশিনু!”
(গাড়ি বের কর।)
এডউইন চুপচাপ মাথা ঝাঁকায়। গম্ভীর মুখেই সেখান থেকে পা বাড়িয়ে হাঁটা ধরলো বাইরে। মনে মনে ক্রুর হেসে আওড়ায়,
“ মনস্টারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পার পেয়ে যাবে এমন কোনো বাপের ব্যাটা এখনো জন্মায়নি।”
ইন করা কালো রঙা শার্ট, পরনে দামী প্যান্ট। কোমরে বাঁধা বেল্টের গায়ে আকাঁ একখানা রাক্ষসের ছবি। গায়ে লম্বা ওভারকোট, যার দৈর্ঘ্য হাঁটুর বেশ নিচ অব্ধি। মাথার ওপর সেজেছে একখানা কালো রঙা গোলাকার ফেডোরা টুপি। টুপির দৈর্ঘ্য এতোটাই বড় যার উপস্থিতিতে প্রথম দর্শনে যুবকের মুখাবয়ব খুব একটা পরিলক্ষিত হবেনা। দেখা যাবে কেবল তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটদুটো। যুবকের নিচের ঠোঁটের ডানপাশে লিপ পিয়ার্সিং করা। ঝুলছে প্লাটিনাম রিং! একইভাবে বামপাশের ভ্রুয়ের একপাশেও পিয়ার্সিং করা। সদ্য শেভ করা লম্বাটে চোয়ালখানা দৃঢ় হয়েছে আরও। যুবকের বামহাতের কব্জিতে ঝুলছে ❝ মনস্টার সিগনেচার ব্রেসলেট ❞ যা প্রমাণ করছে — এ আর কেউ নয় দি শ্যাডো মনস্টার, তার চিরচেনা রুপে আবর্তিত হয়েছে আজ। ঠোঁটের ভাঁজে জ্বলছে সিগার, মনস্টার সগৌরবে দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে হেঁটে আসছে বাগানের পথ দিয়ে। তার পিছুপিছু আসছে এডউইন। হাতে ব্রিফকেস জাতীয় কিছু একটা। মনস্টার বাগান থেকে বেরিয়ে খানিকটা এগুতেই হঠাৎ কি মনে করে থামল যেন। ধীরে ধীরে নিজের ফেডোরা টুপির আড়ালে লুকায়িত বাদামী চোখজোড়া ওপরে তুলে প্যালেসের টাওয়ারে তাকাতেই হঠাৎ দেখল — কেউ একজন তাকে দেখা মাত্রই লুকিয়েছে সন্তর্পণে। মনস্টার ঠোঁট পিষে হাসল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওপরে তাক করে রেখেই গমগমে গলায় ডাকল,
“ সিড!”
বেচারা সিড চেরি ব্লসম ট্রিয়ের আড়ালে লুকিয়েছিল এতক্ষণ। তবে মনস্টারের বাড়িতে থেকে তারই চোখ ফাঁকি দেওয়া কি আর এত সহজ? সিড ধরা পড়ে যাওয়ায় কেমন কাচুমাচু মুখ নিয়ে এগিয়ে এলো চুপচাপ। মাথাটা নুইয়ে রেখে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,
“ জ্বি মনস্টার!”
মুগ্ধের চোখ নেমেছে সিদ্ধার্থের ওপর। সে ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁটের ফাঁক থেকে সিগারটা সরিয়ে নিলো একহাতে। অতঃপর শান্ত অথচ ভয়ানক কন্ঠে শুধাল,
“ খেয়াল রাখবি আমার অপছন্দের জিনিসের আশেপাশে যেন একটা মাছিও ভনভন না করে। আর ভুলক্রমেও যদি এই মাছি তুই হয়ে যাস, তাহলে নো প্রবলেম! ফিরে এসে তোকে আমার হাঙরদের খাবার বানাবো। হোপ ইউ গট মাই পয়েন্ট কিডো!”
পুরো শরীর জুড়ে ঝংকার বয়ে গেল সিদ্ধার্থের। গলায় নামলো অনাকাঙ্ক্ষিত শুষ্কতা। বেচারা মুখ ফুটে বলতে অব্ধি পারলোনা কিছু, স্রেফ মাথা নাড়ালো ওপর নিচ। মুগ্ধ আর বললো না কিছু। সিদ্ধার্থ তৎক্ষনাৎ পথ থেকে সরে দাঁড়াতেই মুগ্ধ গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেল। এদিকে সে যেতেই বুকের ওপর হাত ঠেকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে লাগল সিদ্ধার্থ। বাইরে এতো বাতাস, তবুও কপালটা কেমন ঘামছে তার! বেচারা দুরুদুরু বুকে পকেট হাতড়ে রুমালটা যেইনা বের করবে ওমনি প্যালেসের দোতলা থেকে ভেসে এলো মাহির ভাঙা কন্ঠ!
“ এই যে শুনছেন!”
এবার বুঝি ভয়ে হার্টবিট বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম সিদ্ধার্থের। বেচারার হাত-পা কাঁপছে অনবরত। মেয়েটা তাকে ডাকছে কেন? সে কি-না জানে না? তার দিকে চোখ তুলে তাকানোটাও সবার জন্য নিষিদ্ধ! সবচেয়ে বেশি নিষিদ্ধ সিদ্ধার্থের জন্য! সিদ্ধার্থের এহেন ভাবনার মাঝেই আবারও ভেসে এলো মাহির কন্ঠ!
“ কি ব্যাপার? আপনাকে ডাকছি শুনছেন না?”
সিদ্ধার্থ তৎক্ষনাৎ দু-কদম এগিয়ে এসে দেখে নিল মনস্টার এখনো ওয়াকওয়েতে আছে কি-না। যে-ই দেখল মনস্টার প্রস্থান ঘটিয়েছে বেশ আগে ওমনি বেচারা উল্টো ঘুরে এসে দাঁড়ালো আগের জায়গায়। ভুলেও মাথাটা না তুলেই জবাব দিল,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪
“ কি বলবে?”
মাহি ভ্রু গোটায়। লোকটা ওমন মাথা নুইয়ে রাখল কেন? কি হয়েছে তার? মাহির অবচেতন মন একবার চাইলো গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করতে তবে পরক্ষণেই ভাবল — থাকগে, যার যার ইচ্ছা। তাই মাহি আর প্রসঙ্গ বড় করল না, সোজাসাপটা জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ এই মনস্টার এমন সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছে?”
সিদ্ধার্থ কেমন অদ্ভুত হাসল মেয়েটার কথায়। নজর ঝুঁকিয়ে রেখে কন্ঠ উঁচিয়ে কেবল জানালো,
“ কোথায় আবার? যার শ্মশানে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাকে শ্মশানে পাঠাতে যাচ্ছে!”
