মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৬
Tahmina Akhter
মেঘালয় অতিদ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে ড্রইংরুম পেরিয়ে যাওয়ার আগে রিনির সামনে পরল। রিনিকে দেখে মেঘালয় হতদন্ত হয়ে বলল,
— আলোর জ্ঞান ফিরে আসছে। তুমি একটু আলোর খেয়াল রাখবে, রিনি?
— আমি কেন তোমার স্ত্রীর খেয়াল রাখব! এত বছর পর তোমাদের দেখা হলো আর তুমি কিনা…
রিনি কথাগুলো সম্পূর্ণ করার আগেই মেঘালয় রিনির চোখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো রিকুয়েষ্ট করে বলল,
— মাঝেমধ্যে ভালোবাসার তীব্রতা অনেক বেশি থাকলেও ভালোবাসা প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে না। হৃদয়ের কুঠিরে যাকে স্থান দিয়ে রেখেছি তাকে ভালোবাসা ঠিকঠাকমতো জাহির করতে ইচ্ছে করে না।
মেঘালয়ের কথার আগামাথা বুঝতে পারছে না রিনি। অথচ, এই মেঘালয় গত পাঁচবছর ধরে তাকে বারবার বলেছে, “আলোকে ঠিকঠাক মতো ভালোবাসা জাহির করে পারেনি বলে আলো তাকে ছেড়ে বহুদূর চলে গেছে।” এত বছর পর আলোকে ফিরে পাবার পর একই ভুল কেন করছে মেঘালয়?
রিনির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফাত মেঘালয়েক বলল,
— আপনি নিজেকে সময় দিন। রিনি অবশ্যই আপনার স্ত্রী’র খেয়াল রাখবে।
মেঘালয় চলে যাচ্ছিল কি মনে করে আবারও রিনির সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর, ফিসফিস করে বলল,
— খবরদার, আলোকে কিন্তু বলবে না আমি যে এতক্ষণ ওর পাশেই ছিলাম। ওকে কোলে তুলে আমি ঘরে নিয়ে গেছি।
— তুমি কি পাগলে হলে? ওর কাছ থেকে এসব গোপন রাখলে কোন ফয়দা হবে ; বলো?
রিনি মৃদুস্বরে বলল। মেঘালয় সেসবে খেয়াল না দিয়ে নিজের মতো করে আবারও বলতে শুরু করল,
— আর হ্যা আলো যদি আমার কথা জিজ্ঞেস করে বলবে, আমি বাড়িতে নেই।
— কেন আমি এই কথা বলব? তুমি কই যাচ্ছো আবার?
— নিজেকে বোঝাতে এবং সময় দিতে যাচ্ছি আমি।
কথাগুলো বলে আর দাঁড়ালো না মেঘালয়। একছুটে বের হয়ে গেলো বাড়ির বাইরে। কাব্য ভাই এর সঙ্গে কথা বলা এখন খুবই জরুরি। কাব্য ভাই অবশ্যই জানত আলো লন্ডনে আসবে। কিন্তু কাব্য ভাই সেই কথা গোপন করল কেন? এজন্যই কি মেঘালয়কে বারবার রিকুয়েষ্ট করছিল এয়ারপোর্টে গিয়ে তার স্টুডেন্টকে রিসিভ করতে। কাব্য ভাইয়ের সেই স্টুডেন্ট আর কেউ নয় আলো নিজেই। মেঘালয় নিজেও এয়ারপোর্টে যায়নি। যদি আরহামকে না পাঠাত তাহলে কি আলোকে আবারও হারিয়ে ফেলত? সব প্রশ্নের উত্তর চাই আজ। বাসা থেকে বের হয়ে মেঘালয় তৎক্ষনাৎ কল করলো কাব্য’র হোয়াইটঅ্যাপে।
লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস শহরের বুকে ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে।
গোধূলির মায়াবী আলোয় পশ্চিম আকাশে সূর্যটা আজ নরম লাগছে। যেন তার সমস্ত তীব্রতা কোথাও হারিয়ে ফেলেছে। অথচ, এই একই সূর্য দুপুরের প্রখর আলোয় যার দিকে তাকানোর সাহস হয় না কারো।
সময় কি তাহলে সবকিছুকেই এমন নরম করে দেয়? নাকি, কিছু তীব্রতা কেবল লুকিয়ে পড়ে অন্ধকারের অপেক্ষায়…
সূর্যের নরম আলোর সংস্পর্শে এসে আলোর চোখ খুলল। চোখ খোলার পর নিজেকে সম্পূর্ণ অচেনা একটা ঘরের ভেতরে আবিস্কার করার পর নিজের অস্তিত্বকে নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ভাবতে ভাবতেই জটিল সমীকরণ সহজ সমীকরণে পরিনত হয়। বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট থেকে রওনা হয়ে লন্ডনে আসা। এয়ারপোর্ট থেকে বের হবার পর কাব্য স্যারের কথা মাথায় রেখে আরহাম নামের সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে রওনা হওয়া। তারপর, সম্পূর্ণ অজানা এক গন্তব্য এসে পৌঁছানোর পর এমন একজনের সঙ্গে দেখা হলো যার সঙ্গে এখনই দেখা হবার কথা ছিল না। অথচ, সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনা অন্যকিছু ছিল কিনা! আজই তার দেখা হলো সেই মানুষটার সঙ্গে। যাকে ভালোবেসে আলোর জীবন একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলছে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আলোর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে বালিশে।
“কেন দেখা হলো তার সঙ্গে? এই দেখাটা হবার আগে কেন তার মৃত্যু হলো না? প্ল্যান ক্র্যাশ করে মরে যেত! নয়তো বাংলাদেশে রোড এক্সিডেন্টে! মানুষটাকে অন্যকারো হতে দেখার চেয়ে মৃত্যুকে সানন্দে গ্রহন করা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ বিষয় লাগছে তার কাছে!”
আলো ধীরে বিছানা থেকে নামল। পা দুটো যেন নিজের ভারই নিতে পারছে না। টলতে টলতে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ।
ফ্যাকাশে মুখ… লাল চোখ… ভেজা পাপড়ি…
— “এই তুমি…?”
ঠোঁট কাঁপল তার।
— “এই তুমি সেই আলো… যে এত বছর ধরে শুধু একটা মানুষকে ভালোবেসে বেঁচে ছিলে?”
হঠাৎই একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
— “কি পেলাম আমি…?”
চোখ বন্ধ করতেই ভেসে উঠল সেই কণ্ঠ….
“আমাকে ভালোবাসার কোনো কারণ খুজে পেলে না, মিথ্যাবতী!!”
সাথে সাথেই চোখ খুলে ফেলল আলো।
— “মিথ্যে…”
এবার আর নিজেকে থামাতে পারল না।
ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কেঁপে উঠছে তার শরীর।
কিন্তু শব্দ নেই… শুধু ভাঙা শ্বাস… আর থেমে থেমে কেঁপে ওঠা বুক।
— “আমি দেরি করে ফেলেছি… বড্ড দেরি করে ফেলেছি। তাই তো আপনাকে ভালোবাসার কারণগুলো প্রকাশ করার আগেই আপনি অন্য কারো হলেন!!!”
ফিসফিস করে বলল আলো। ঠিক তখনি আলো’র ওপর যেন কোনো অসুর ভর করলো। যেই আলো জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত নিজেকে কঠোরভাবে সামলে রেখেছে। জীবনের এত এত কঠিন পরিস্থিতিতে শক্ত মনোবল ভাঙেনি তার কখনোই। সেই আলো’র আজ ইচ্ছে করল নিজেকে শেষ করে ফেলার। মরে যাওয়ার কারণ কি…. ডাক্তার সাহেব আর তার নেই বলে? অথচ গত আটবছর ধরে সে নিজেই স্বইচ্ছায় ডাক্তার সাহেব এর কাছ থেকে দূরে সরে ছিল। মানুষ যদি এত বছরের অপেক্ষার পর নিজেকে, নিজের জীবনকে গুছিয়ে নিতে চায় তাহলে দোষের কি আছে? কিন্তু, আলো যে মানতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে যেই জীবনে ডাক্তার সাহেব নেই সেই জীবন রেখে কোন ফয়দা লুটবে সে?
পাগলের ন্যায় উঠে দাঁড়ায়। সম্পূর্ণ অপরিচিত ঘরটার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার টান দিয়ে খুলতেই একটা খাতা আর কলম খুঁজে পেল অনায়াসেই। তারপর, খাতা আর কলম নিয়ে মেঝেতে এলোমেলো হয়ে বসলো। লিখতে শুরু করল,
—দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষা এবং বিচ্ছেদ এর দুঃসময় কাটিয়ে ভিনদেশে এসে যদি দেখতে হয় আমার প্রিয়তম স্বামীটি অন্যকারো হয়ে গেছে তখন…
এতটুকু লিখতে লিখতে আলোর হাত কাঁপতে শুরু করল। চোখের জলে কাগজের পাতা ভিজে যাচ্ছে। তবুও থেমে যায় না সে। অনবরত কলম চলছে।
—একমাত্র আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কি উপায় আছে এমন দহনের জ্বালা থেকে মুক্তি পাবার? “সে আর আমার নেই!” এমন নিষ্ঠুরতম বাক্য শোনামাত্র আমার রুহের মৃত্যু হলো যেন। কেবল আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার দেহ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে।
এই কাগজে লেখা প্রত্যকেটি শব্দ আমার লেখা। কেউ আমার আত্মহত্যার প্ররোচনার পেছনে দায়ী নয়। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি আমার জীবনের ভার বইতে পারছি না আর।
এতটুকু লিখে আলো থেমে গেছে। লেখাগুলোতে চোখ বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর আবার কলম চালিয়ে যাচ্ছে,
—-আপনার সঙ্গে আমার বিবাহিত জীবনের নয়মাস দশদিনের সংসারে আমি বহুবার আপনাকে “ভালোবাসি” বলতে গিয়ে থেমে গিয়েছি। আপনাকে ছেড়ে আসার পরও আমি আপনাকে আমার অজান্তেই বারবার “ভালোবাসি” বলেছি। এমনও হয়েছে গলা শুকিয়ে গেছে কিন্তু আপনাকে বারবার “ভালোবাসি” বলতে আমার তৃষ্ণা কমার চেয়ে বরং বেড়েছে দিনকে দিন৷ এতদিন আমার বলা “ভালোবাসি” শব্দ আপনি শুনতে পাননি ডাক্তার সাহেব। আজ শেষবারের মতো আনুষ্ঠানিক ভাবে আপনাকে বলছি,
“I Love You, ডাক্তার সাহেব। আমাকে ভুলে যাওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ। আর কিছুই লিখতে পারছি না। বিদায় আমার ডাক্তার সাহেব❤️🩹🥺।”
শেষ শব্দটা লিখতেই কলমটা হাত থেকে পড়ে গেল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা ফাঁকা… একদম শূন্য।
— “বিদায়…”
শব্দটা ঠোঁট থেকে বের হতেই আচমকা থেমে গেল আলো। তার দৃষ্টি পড়ে রইল কাগজটার ওপর।
“বিদায়…”
সত্যিই কি এত সহজ?আট বছরের ভালোবাসা… একটা শব্দে শেষ করে দেওয়া যায়? হাতটা কাঁপতে লাগল।
— “না…”
খুব নিচু স্বরে বলল সে।
আলো হঠাৎ করেই কাগজটা বুকের সাথে চেপে ধরল। তার ভেতরের মৃত্যু ইচ্ছেটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
আলো যখন নিজের জীবন নিয়ে সংশয়ে ডুবে আছে, ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা ধীরে খুলে গেল। চমকে উঠল সে। তড়িঘড়ি করে খাতাটা ভাঁজ করে নিজের পাশে লুকিয়ে ফেলল। আঙুলের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে নিল দ্রুত।তারপর ধীরে মুখ তুলে তাকাতেই। নিঃশ্বাসটা আটকে গেল তার। লাল বেনারসি গায়ে, শরীর ভর্তি সাজে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। যে কিনা “না” শব্দটা সম্পূর্ণ করার আগেই নিজেকে থামিয়ে দিল আলো। তার মন সেই নিষ্ঠুর সত্যটা উচ্চারণ করতেই চাইছে….
“ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী!!”
কিন্তু আলো তা শুনতে চায় না। একদমই না।তার ভেতরের অবাধ্য, বেয়াদব মনটা বারবার সেই কথাটাই সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে। আর সে প্রাণপণে সেই সত্যটা অস্বীকার করে যেতে চাইছে। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে… কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।
রিনি ধীরে ধীরে ভেতরে এগিয়ে এলো। তার পায়ের নূপুরের ক্ষীণ শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতায় আরও স্পষ্ট শোনাল। আলো অজান্তেই নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে মুঠো করে ফেলেছে।রিনি কিছুটা কাছে এসে থামল। তার দৃষ্টিটা নরম, শান্ত। রিনির স্বভাবের উল্টোপিঠ। আজ বিয়ে হয়ে গেছে কিনা বলেই এত পরিবর্তন!!
রিনি আলোর কান্না ভেজা আঁখিজোড়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রশ্ন করলো,
— “আপনি এখন কেমন আছেন?”
আলো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ঠোঁট সামান্য নেড়ে বলল,
— “ভালো আছি।”
মিথ্যে। দু’জনেই জানে এটা মিথ্যে। আবারও নীরবতা নেমে এলো ঘরজুড়ে । রিনি একটু এগিয়ে এসে বিছানার পাশে দাঁড়াল।
— “হঠাৎ মেঘালয়কে দেখে এমন শক পেয়েছেন… তাই না? কাব্য ভাই একটু আগে আমাকে কল করে সবটা বলেছে। এই অংশটা। কাব্য ভাই এর প্ল্যান ছিল কিনা?”
কথাটা খুব সাধারণভাবে বলা হলেও, শব্দগুলো যেন আলোর বুকের ভেতর গিয়ে বিঁধল।
“কাব্য স্যার কি জানত না, মেঘালয়ের জীবন আজ কার সঙ্গে বাঁধা পড়বে?”
আলো এবার সরাসরি তাকাল রিনির দিকে। তার চোখে ক্লান্তি… কষ্ট… আর রূঢ়তা।
— “হ্যাঁ… কিছু কিছু জিনিস… হঠাৎ দেখলে সামলানো যায় না।”
কথাটা বলেই চোখ নামিয়ে নিল আলো। কথাটি শোনার পর রিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল
— “সবকিছু যেমন দেখা যায়… সবসময় তেমন হয় না।”
আলো কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে। কিন্তু বাইরে থেকে নিজেকে স্থির রাখল।
— “আমি যা দেখেছি… সেটা বোঝার জন্য যথেষ্ট।”
গলাটা এবার একটু শক্ত। রিনি মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কষ্ট আছে… কিন্তু অভিযোগ নেই।
— “হয়তো…”
এক সেকেন্ড থেমে আবারও বলল,
— “কিন্তু কখনো কখনো পুরো সত্যিটা জানার আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলাটা নিজের জন্যই বেশি কষ্টের হয়ে যায়।”
আলো এবার আর কিছু বলল না। শুধু চুপ করে রইল। তার বুকের ভেতরটা আবারও ভারী হয়ে উঠছে। রিনি আলোর সঙ্গে সহজ হবার চেষ্টা করছে। সেই চেষ্টা থেকেই রিনি আলোকে বলল,
— কান্নাকাটি করছেন কেন? এত দূর থেকে এসেছেন। ফ্রেশ হোন শরীরের ক্লান্তি কমে যাবে। আমি কফি বানিয়ে আনছি।
—-ডাক্তার সাহেব কোথায় আছে?
প্রশ্নটি করার সময় আলোর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। রিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। কারন, এতবছর অব্দি সে মেঘালয়ের কাছে আলো সম্পর্কে যা শুনেছে তারমধ্যে তন্মধ্যে প্রথম কথাটি হলো, “আলো ভীষণ শক্ত ধাঁচের মেয়ে। এত সহজে সে কান্না করে না।” কিন্তু এখন তো দেখছে সম্পূর্ণ উল্টো। ডাক্তার সাহেব এর কথা বলতে গিয়ে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলছে। রিনির ইচ্ছে করছে না পাষন্ড মেঘালয়ের বলা কথাগুলো আলোকে বলতে। কিন্তু বলতে যে হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিনি আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— সে বাড়িতে নেই।
— কেন?
— কারণটা আপনার বোঝার কথা।
ব্যস রিনির এই একটা উত্তরে আলো তার জবাব পেয়ে গেছে।
— নতুন বউ ফেলে কোনো নতুন বর বাড়ির বাইরে থাকতে পারে?
কথাটি বলতে বলতে আলো নিজের এলোমেলো চুলগুলো খোঁপা বাঁধল। নিজের কান্না এবং বিরহ লুকানোর বৃথা চেষ্টা মাত্র। রিনি ভ্রু কুঁচকে বলল,
— নতুন স্বামী মানে আমার বর আরাফাত রয়ে গেছে আমাদের বাড়িতে। তার পরিবার চলে গেছে। আপনি হঠাৎ এই প্রশ্ন করলেন কেন?
রিনির কথা সম্পূর্ণ হবার আগেই আলো নিজের ভুল বুঝতে পারল। ইচ্ছে করলো নিজের গালে দুটো থাপ্পড় মারতে। বারবার সে একই ভুল করে কেন? সামান্য শেরওয়ানির জের ধরে সে কিনা মস্ত বড়ো ভুল করতে যাচ্ছিল!!
রিনি ধীরে ধীরে আলোর পাশে গিয়ে বসল। আলোর হাতটা ধরে বলল,
—আমি এই ঘরে ঢোকার সময় খেয়াল করেছি, আপনি আমাকে দেখে কি যেন লুকিয়ে ফেলেছেন?
আলো হতভম্ব হয়ে যায় রিনির কথা শুনে। আলোর হতভম্বের রেশ কেটে যাওয়ার আগেই রিনি আলোর কোমড়ের পেছনে হাত রেখে লুকিয়ে রাখা খাতাটা বের করে আনল। আলো বাঁধা দিতে গিয়েও পারে না। রিনি তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ালো। তারপর, আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৫
— বাজে দুশ্চিন্তা বাদ দিন। সময়ের কালক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি ফ্রেশ হোন গিয়ে।
— খাতাটা দিয়ে যান?
আলোর কথা শুনে রিনি ভ্রু কুঁচকে বলল,
— খাতায় আবার কি এমন আছে?
কথাটি বলতে বলতে রিনি পৃষ্ঠা উল্টে পড়তে শুরু করল। লেখাগুলো পড়তে পড়তে রিনির চোখ বড় হয়ে যায়। আলোর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায়। আলো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। এবার লজ্জা লাগছে ভীষণ। কেন যে এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল!!
