মিহি পর্ব ৯+১০
রুপন্তী সরকার
রিদ কাজে গেছে আর অভ্র মিহির সাথে খেলছে ওকে সময় দিচ্ছে।
রিদের উপর দিয়ে ভালোই চাপ যাচ্ছে, রিদকে ডেলিভারির কাজ দিয়েছে। আবার খাবার ডেলিভারি দিয়ে এসে রেস্টুরেন্টের কাজ ও দেখতে হচ্ছে বারবার মানুষ জন আসা যাওয়া করছে!ওদের খাবার দেওয়া আবার টেবিল পরিস্কার করা, সব মিলিয়ে হিমসিম খাচ্ছে বেচারা। যদিও আরো অনেক ওয়েটার আছে কিন্তু ওরা কাজে হাত লাগাচ্ছে না রিদ নতুন তাই ওকে দিয়েই সব করিয়ে নিচ্ছে…
রিদের বাবা আরাফ রায়ান চৌধুরী দেশের টপ বিজনেসম্যানদের মধ্যে একজন! উনাকে সবাই এক নামে চিনে! আরাফ রায়ান চৌধুরীর একমাত্র ছেলে রিদ রায়ান চৌধুরী! ও কখনো স্বপ্নেও ভাবে নি ওকে একদিন এমন ওয়েটারের কাজ করতে হবে! রিদের মা মারা যাওয়ার পর থেকে আরাফ রায়ান চৌধুরী কোনোদিনও রিদ কে “কষ্ট” কি জিনিষ সেটা বুঝতে দেই নি, কোনো জিনিস না চাওয়ার আগেই ওর সামনে এনে হাজির করিয়েছে! যদিও পৃথিবীতে কোনো কাজই ছোট না , তবে রিদ এই কয়েকদিনে হারে হারে বুজতে পারছে যে এই দুনিয়ায় টিকতে গেলে অনেক “টাকার” প্রয়োজন!
রিদ নিজেই খুব অবাক হচ্ছে এসব ভেবে! রিদের ভাবনার মাঝেই ম্যানেজারের ডাক আসলো! রিদ এগিয়ে গেলো
ম্যানেজার বললো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
_” এখন নয়টা টা বাজে তুমি সাড়ে নয়টার দিকে চলে যেও! আর কালকে সকাল সাতটার দিকে চলে আসবে! আর শোনো সব কাজ ঠিক করে করো ,যেহেতু তুমি নতুন! তাই তোমাকে হয়তো বেশি কাজ করতে হচ্ছে! করো বাবা করো পরিশ্রম ছাড়া কখনো বড়ো হতে পারবে না তুমি এখনো অনেকটাই ছোট! তোমার কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলো কেমন?”
_”আচ্ছা”
_” আচ্ছা ওইদিকে যাও কাস্টোমার এসেছে”
রিদ চলে গেলো..!
একটা ছেলে আর একটা মেয়ে এসেছে ওরা রিদের বয়সীই হবে!
রিদ ওদের কাছে এগিয়ে গিয়ে সালাম দিলো তারপর বললো
_” স্যার কি লাগবে?”
ছেলেটা মেনু কার্ড দেখে বললো
“আপাতত একটা হট কফি আর একটা কোল্ড কফি দাও
“ওকে স্যার”
রিদ ওদের কথা মতো কফি আনতে গেলো!
কফি নিয়ে আসার সময় একটা টেবিলের সাথে ধাক্কা খায় যার কারণে ওর হাত পিছলে যায় আর কফি টা গিয়ে ছেলেটার শার্টের উপর পড়ে!
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা দাঁড়িয়ে যায়! রেগে রিদের দিকে তেড়ে আসে! গাল বরাবর টেনে একটা থাপ্পড় দিয়ে দেই! আর চিল্লিয়ে বলতে থাকে
_”ছোটলোকের বাচ্চা কি করলি এটা? কোনো কাজ ঠিক মতো করতে পারিস না আমার এত দামী শার্টে কফি ফেলে দিলি, চোখে দেখেছিস কখনো এমন দামী কাপড়? তোর একমাসের বেতনের থেকেও দামী এটা!এমন শার্ট কেনার যোগ্যতা আছে? কই থেকে আসে এসব ছোটলোক”
সেই মুহুর্তে রেস্টুরেন্টের সবাই জড়ো হয়ে যায়! রেস্টুরেন্টের ভেতরে আরো মানুষ ছিলো ওরা সবাই দেখে ভালোই মজা নিচ্ছে! ম্যানেজার দৌড়ে আসে!
রিদ মাথা নিচু করে বলে
_”সরি স্যার আমি বুজতে পারি নি”
ছেলেটার সাথে আসা মেয়ে টা বলে
_”বেবি প্লিজ রাগ করো না ও বুজতে পারে নি”
ছেলে টা আরো রেগে গিয়ে বলে
_” ও ইচ্ছে করেই এমন করেছে! তোর মতো ছোটলোক কে কি আর বলবো”
হঠাৎ ছেলেটার গালে একটা শক্ত হাতের থাপ্পড় পরে! ছেলেটা হকচকিয়ে যায়! রেস্টুরেন্টের সবাই লোকটার দিকে তাকায়! লোকটা আর কেউ না রিদের বাবা আরাফ রায়ান চৌধুরী! উনি উনার বিজনেস পার্টনারের সাথে ডিল ফাইনাল করার জন্য এই রেস্টুরেন্ট এসেছিল! যার সাথে ডিল করবে উনার আবার রাত এগারোটায় আমেরিকা যাওয়ার ফ্লাইট আছে! তাই এইখানেই বাধ্য হয়ে আসতেই ! কিন্তু আসার পর এইসব দেখে উনি আর নিজেকে আটকাতে পারে না!
উনি রেগে গিয়ে ছেলেটাকে বলে
_”তোর বাপ তো আমার কোম্পানিতে কাজ করে! তুই ওর ছেলে হয়ে আমার ছেলে কে এতো কথা কিভাবে শুনাস? আর ছোটলোক কে ওই নাকি তুই? রাতের বেলা মেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াস আবার আমার ছেলেকেই ছোটলোক বলিস? আর কি যেন বললি তোর এই শার্ট কেনার যোগ্যতা নেই ওর? ওই তোর মতো এমন ১০০ টাকার শার্ট পরেও না! বাপের বেতন কেড়ে নিয়ে এমন ফুটানি করিস আবার বড়ো বড়ো কথা?
ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে! রেস্টুরেন্টের সবাই অবাক হয়ে যায়!
ছেলেটা বলে
_”আসলে আঙ্কেল তখন মাথাটা অনেক গরম হয়ে গিয়েছিল আমি বুজতে পারি নি দুঃখিত!”
_”তোকে আমি দেখে নিবো! তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি তুই আরাফ রায়ান চৌধুরীর ছেলেকে থাপ্পড় মারিস! ছোটলোকের বাচ্চা বলিস! শালা তুই নিজে কি? ঘরে নেই নুন ছেলে আমার মিঠুন”
ছেলেটা লজ্জায় পরে যায় ওর সাথে থাকা! রিদের বাবার শেষের লাইন টা শুনে সবাই হাসতে থাকে! ওরা মুখ কাচুমাচু করে চলে যায়!
রিদ এতক্ষন সব কিছু চুপচাপ দেখে যাচ্ছে!
ম্যানেজার এসে রিদের বাবা কে সালাম দিলো!
রিদের বাবা রিদের কাছে এসে বলে
_”রিদ আমি তোমাকে দেখে অবাক হচ্ছি! তুমি শেষে কিনা ওয়েটারের কাজ করছো? কি পাচ্ছো এসব করে? ওই মেয়ের জন্য তুমি নিজে হাতে নিজের ক্যারিয়ার টা নষ্ট করছো তুমি আমার ছেলে হয়ে কেমন করে এসব করছো?”
_” আমি আপনার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিবো না! আপনি আসতে পারেন!”
উনি কিছু না বলেই চলে যায়!
এইদিকে ম্যানেজার এসে রিদ কে বলে
_”উনি তোমার বাবা? তুমি উনার ছেলে হয়ে কেনো এই জব টা করছো?”
_”আমার ঘরে আমার ছোট্ট একটা বউ আছে স্যার ওকে বড়ো করতে হবে আমার! ওকে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে!”
_”ছোট বউ মানে? তুমি বিবাহিত? এই বয়সে? ক্যামনে কি?”
রিদ উনাকে সব কিছু শুরু থেকে বলে! সব কিছু শুনে ম্যানেজারের মাথায় হাত!উনি রিদের মাথায় হাত রেখে বলে
_”বাবা তুমি অনেক বড়ো হবে একদিন! তুমি বাচ্চাটাকে বড়ো করো! সৎ ভাবে কাজ করো ইনশাআল্লাহ একদিন এর ফল নিশ্চয় পাবে ! আর ওকে একদিন নিয়ে এসো”
_”আচ্ছা”
_”আচ্ছা বাসায় যাও”
রিদ অভ্রর মেসে যায় মিহি কে নিতে! মিহি রিদের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছে!
রিদ গিয়ে দেখে মিহি ঘুমিয়ে আছে আর অভ্র ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে! রিদ কে দেখেই অভ্র উঠে দাড়াই!
_”কিরে কেমন কাটলো প্রথমদিন?”
_”সেই”
_”তোর মিহি তোর অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে! বেচারী সন্ধ্যা থেকে বলছে পঁচালোক কই! ওকে খুব মিস করেছে ”
এই কথা শোনা মাত্র রিদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো!মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল এগিয়ে গেলো ঘুমন্ত মিহির কাছে! কপালে একটা চুমু দিলো!
রিদের গলার আওয়াজ পেয়ে মিহি ও উঠে গেলো
_”পঁচালোক তুমি এসেছো? আমার জন্য কি নিয়ে এসেছো?”
রিদ পকেট থেকে একটা চকলেট আর একটা গোলাপ ফুল বের করে মিহির হাতে দিলো! ফুল আর চকলেট পেয়ে মিহির খুশি দেখে কে!
_”তুমি কত্ত ভালো অভ পঁচা”
অভ্র মিহির কাছে এসে কোমরে দুই হাত রেখে বললো
_”এটা কিন্তু ঠিক না টুইংকেল আমিও তোমাকে চকলেট কিনে দেই আর এখন তুমি ওকে ভালো বলছো? ওকে ভালো বলো না ওই কিন্তু পঁচা”
রিদ কপাল ঘসতে ঘসতে বললো
_”ভাগ বোকাচন্দ্র দেখছিস না আমার টেডিবিয়ার আমাকে ভালো বলছে! এর মধ্যে ওকে উস্কাচ্ছিস কেনো কানের নিচে দিবো”
মিহি রিদ কে জড়িয়ে ধরে অভ্র কে মুখ ভাঙায়
রিদ মিহি কে কোলে নিয়ে চলে যায়! মিহি যাওয়ার সময় অভ্র কে টাটা দেই…!
রিদ মিহি কে নিয়ে বাড়ি চলে আসে!
আজকে বাড়িটা ফাঁকা কারণ রামপ্রসাদ বাবু বাসায় নেই উনার স্ত্রী কে নিয়ে উনার শশুর বাড়ী গিয়েছে বাড়িতে শুধু মিষ্টি আছে!
রিদ বারান্দার দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলো
মিষ্টি সন্ধ্যা থেকে মিহি আর রিদের জন্য অপেক্ষা করছিলো! রিদ আর মিহি কে আসতে দেখে মিষ্টি ওদের ঘরে আসলো!
মিষ্টি মিহি কে বললো
_”বুনু এতো দেরি করলা কেনো তোমরা? আজকে বাবা বাড়িতে নেই আমি সন্ধ্যা থেকে একা আছি! ভয় করছিলো আমার”
মিহি বললো
_”মিহি তো অভর কাছে ছিলো”
রিদ প্রশ্ন করলো
_”আপনি একা মানে? আঙ্কেল কই?”
_”বাবা তো মামার বাড়ি গেছে মা কে নিয়ে!”
রিদ বিব্রত হয়ে বললো
_”তো আপনিও যেতে পারতেন”
_”আসলে আমার ওইখানে যেতে ভালো লাগে না”
_”ওহ”
মিষ্টি বলে
_”আপনি ফ্রেশ হন আমি খাবার নিয়ে আসছি”
_”মানে?”
_”মানে আপনি আর মিহি ফ্রেশ হন আজকে আমি আপনাদের জন্য রান্না করেছি”
_”আপনি এতো কষ্ট কেনো করতে গেলেন আমরা তো খাবার বানাতামই”
_”ছি ছি এতে কষ্টের কি আছে মিহি তো আমার বোনের মতো আর আপনি আমার”
রিদ বললো
_”জি?”
_”থাকুন খাবার নিয়ে আসি”
এই বলেই মিষ্টি দৌড়ে চলে গেলো!
মিষ্টি মেয়ে টা দেখতে খুব সুন্দর কথা গুলো ও খুব সুন্দর! মেয়েটার অনেক গুণ! গান, নাচ, আবৃত্তি, আর্ট, পড়াশোনা সব কিছুতেই সে পারদর্শী!
রিদ মিহি কে ফ্রেশ করিয়ে দিলো! নিজেও ফ্রেশ হলো!
এর মধ্যেই মিষ্টি ৩ জনার খাবার নিয়ে রিদের ঘরে আসলো! রিদের কাছে কেমন যেনো ভালো লাগছে না! বাড়িতে প্রাপ্ত বয়স্ক ২ টা ছেলে মেয়ে বিষয় টা কেমন দেখায়!
রিদ মুখের উপর কিছু বলতে পারছে না!
মিষ্টি মিহি কে বললো
_”আমি তোমাকে খাইয়ে দিবো বনু?”
মিহি বললো
_”মিহি তো পঁচা লোকের তাছে খাই”
_”আজকে আমার কাছে খাও”
মিহি রাজি হয়ে গেলেও রিদের কেমন যেনো হিংসে হচ্ছে! ওর টেডিবিয়ার কে ওই খাওয়াবে!
রিদ মিষ্টি কে বললো
_”আপনি খান ওকে আমি খাইয়ে দিচ্ছি”
মিষ্টি আর কিছু বলে না!
খাওয়া দাওয়া শেষ করে মিষ্টি রিদের বিছানায় বসে! রিদ এবার খুব বিরক্ত হচ্ছে!
মিহি ওর চুড়ি নিয়ে একা একা খেলছে!
মিষ্টি রিদ কে বললো
_”আচ্ছা একটা কথা বলি?”
_”জি বলেন”
_”আপনার কি কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে?”
_”না! তবে আমার একটা ছোট্টো বউ আছে!”
মিষ্টি চোখ ছলছল করে জিজ্ঞেস করলো
_”মা মানে?”
_”মানে যা শুনছেন তাই , আমার একটা ছোট্টো পিঁপড়ার মতো বউ আছে”
_”সে কোথায়?”
_”আছে তবে আপনাকে বলবো কেনো?”
মিষ্টি বললো
_”জানি না”
মিষ্টি আবারো বললো
_”আচ্ছা আপনি কি ওকে ভালোবাসেন?”
_”কি আজব ভাই বউ কে ভালবাসবো না? বউ ছাড়া কি জীবনে কিছু আছে?”
মিষ্টি মুখ ফুলিয়ে বললো
_”ওহ আচ্ছা আমি যাই”
এই বলেই মিষ্টি দৌড়ে চলে গেলো
রিদ দেখে মিহি একা একাই খেলছে আর খিলখিল করে হাসছে!
রিদ গিয়ে মিহির কোলের উপর ঠাস করে শুয়ে পড়লো
মিহি ওর ছোট ছোট হাত রিদের মাথায় রাখলো,
_”পঁচা লোক তুমি মোতা হয়ে গেছো!”
রিদ ওর কথা শুনে হাসবে নাকি কাঁদবে বুজতে পারছে না !
রিদ মিহির হাতে চুমু খেয়ে বললো
_”আদর করো প্রিন্সেস ভালো লাগছে না”
মিহি রিদের কপালে চুমু দিলো
রিদ বললো
_”ঘুমাতে হবে না ? চলো চলো ঘুমাবো”
এর মধ্যেই অভ্র ফোন দিয়েছে!
রিদ বিরবিরিয়ে বললো
_”হালাই এখন আমার বউডারে উস্কাবে! কতো কষ্ট কইরা চকলেট দিয়া পটাইয়া রাখছি! এখন আমার ভালো বউডারে পটাবে আর এই মাইয়া অভ যাবো অভ যাবো করবে ! ধুর বাল!
রিদ কল কেটে দিলো
মিহি কোমরে হাত দিয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে আছে!
অভ্র আবারো কল দিলো
রিদ বিরক্ত হয়ে কল ধরলো,
অভ্র বলে উঠলো
_”এই তো আমার টুইংকেল সোনা কি করছে”
অভ্র কে কিছু বলতে না দিয়েই রিদ বললো
_”শোন তোরে আমি লাত্থি দিয়া মুখ ভাইঙ্গা দিমু! আগে আমার বউ রে টুইংকেল টুইংকেল মারাতি এখন আবার সোনা এ্যাড করছস জা*উরা! আর একবার শুধু বলিস”
_”আরে তুই কল ধরেছিস কেনো রে? আমার টুইংকেল কে দে হালা”
মিহি বললো
মিহি পর্ব ৭+৮
_”দাও দাও আমাকে দাও অভর সাথে কথা বলি”
রিদ অভ্র কে গালি দিতে দিতে মিহির কাছে ফোন টা দিলো! মিহি অভ্রর সাথে কথা বললো,
এরপর রিদ মিহি কে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো….
