Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৪

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৪

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৪
Tahmina Akhter

আলো রাগে ফুঁসছে! এত রাগ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে এখুনি গিয়ে ডাক্তার সাহেব এর গলা চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতে, মিলি না বিলিটা কে? এই মেয়ের কত বড় স্পর্ধা! ডাক্তার সাহেব এর বুকের তিল…. ছিহ্ বলতেও লজ্জা লাগছে তার!
আলোর অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে কোনো এক ম্যাজিকের সাহায্য নিয়ে সুদূর লন্ডনে গিয়ে তার ডাক্তার সাহেব এর সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে,
“এটা আপনি কি করলেন? আপনার নগ্ন শরীর আমি ব্যতিত অন্যকেউ দেখে ফেলেছে! এর চেয়ে ভয়ানক কথা আমি কিনা জানতে পারলাম মজার ছলে! অথচ, আমাকে দেখুন না! এই আমিটাকে আপনি ব্যতিত অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। না বিয়ের আগে আর না পরে। বিয়ের আগে হয়তো নিজেকে নিজের জন্য শুদ্ধ রাখতে চেয়েছি। কিন্তু আপনি আমার জীবনে আসার পর থেকে আপনি যেন আমার সব হয়ে গেলেন। আপনার হাসি-কান্না, আপনার স্পর্শে আমার শরীরের বেঁচে থাকার কারন হয়ে উঠল। আপনি আমাকে যেভাবে ভালোবাসলেন, আদর করেছেন আমি তো সেই আদরের স্পর্শ থেকে নিজেকে টেনে তুলতে পারলাম না! কেন পারলাম না? আর সেই আপনি কি করলেন!!!!”
আলো যখন মেঘালয়ের ওপর হাজারটা অভিমান অভিযোগ করছিল ঠিক তখনি তার দরজায় নক হচ্ছে। আলো নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

“এসো আম্মা”
সিতারা বেগম মলিন মুখে মেয়ের ঘরে প্রবেশ করলেন। আলো ভুল করেও মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। কারণ, মমতাময়ীর মুখের দিকে তাকালে সে আজ নিজেকে সামলাতে পারবে না। কেঁদে ফেলবে। অথচ, এখন কান্নার সময় না। এখন সময় নিজের জীবনের অগোছালো অধ্যায়কে গুছিয়ে নেয়ার। যেই অগোছালো জীবনের একমাত্র সে নিজেই।
সিতারা আলোর পাশে গিয়ে বসলেন নীরবে। মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন মেয়ে মাথা নীচু করে রেখেছে। সিতারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরে সন্ধ্যা নামা আকাশের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

— এতগুলো বছর মনে হয়নি তোর বিয়ে হয়েছে!! মনে হচ্ছিল তুই এখনও আমার একারই মেয়ে রয়ে গেছিস। তোকে যে কোনো এককালে বিয়ে দিয়েছি তাও ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু, আজ এই গোধুলি লগ্নে এসে মনে হচ্ছে তুই সত্যি সত্যি আমার পর হয়ে গেছিস! অথচ, তোকে যেদিন বউ বেশে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে বিদায় দিয়েছিলাম সেদিনও মনে হয়নি তোকে আমি বিদায় দিয়েছি সেই কবে? আজ তোকে আমি বিদায় জানাব কেমন করে? আমার যে বুকটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে!
কথাগুলো বলতে বলতে সিতারা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। আলোর চোখের জল টুপটাপ করে গড়িয়ে পড়ছে। সিতারার কান্নার আওয়াজ শুনে ড্রইংরুমে থাকা ইতি, কাব্য এবং তীব্র প্রথমে অবাক হয়। পরক্ষণেই তারা বুঝতে পারে মেয়ের বিদেশ যাত্রার জন্যই হয়তো এই কান্না? মা-মেয়ের মাঝে গিয়ে তাদের একান্ত বোঝাপড়ার সময়কে নষ্ট করা যাবে না ভেবেই তারা অপেক্ষা করছিল সিতারা বেগম এবং আলোর ফিরে আসার।
সিতারা বেগম কাঁদতে কাঁদতে আলোর মাথায় হাত রাখল। আলো চোখ বন্ধ করে মায়ের স্পর্শটুকু অনুভব করলো। তারপর, টের পাচ্ছে তার মা বিড়বিড় করে কি যেন পড়ছে! বিড়বিড় করে পড়া শেষ হলে আলোর গায়ে ফুঁ দিয়ে সরে গেলেন সিতারা। এবার আলো বুঝতে পারলো যে তার মা তাকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়েছে।
সিতারা চোখের জল মুছে আলোর ডানহাত ধরে বলল,

— চলেই তো যাবি। একবার আমার মুখের দিকে তাকাবি না? নাকি আমি তো সৎ মা বলে আমার জন্য কোনো কষ্ট অনুভব করছিস না?
শেষের বাক্যটি শুনে আলো বিস্মিত হয়ে যায়। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিষন্ন স্বরে বলে,
— তুমি সৎ নাকি আপন আমি কোনোদিন তোমার কাছে কৈফিয়ত চেয়েছি, আম্মা? তুমি যদি আমাকে পেলেপুষে বড় না করতে তাহলে আমার বোধহয় এই সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখার সৌভাগ্য হতো না! তুমি যদি গত আটবছর আগে আমাট হাতটা শক্ত করে না ধরতে তাহলে আজকের ডাক্তার আলোকে কেউ চিনতো না? তুমি আমার পাশে ছিলে বলে আজকের আলো আমি।
কথাগুলো বলতে বলতে আলো মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নরম সুরে বলল,

— আম্মা?
— হুম?
— কোনোদিন তোমার কাছে কিছুই চাইনি। আজ দোয়া চাইছি তোমার কাছে। দোয়া করো যাতে তোমার আলোর একটা সুন্দর সংসার হয়।
সিতারা বেগম মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে মাথায় একহাত দিয়ে বুলাতে বুলাতে বলল,
— আমার আল্লাহ তোর মনের সকল নেক আশা পূরন করুক।
— আমিন
আলো মায়ের কপালে চুমু দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর, মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। ড্রইংরুমে বসে কাব্য’র সামনে গিয়ে বলল,
— ভাইয়া, আমার মায়ের খেয়াল রাখবেন। মা’কে যেমন করে রেখে যাচ্ছি এসে যেন ঠিক তেমনি পাই।
কথাগুলো বলার সময় আলোর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। সবাই আলোর মনের অবস্থা বুঝতে পারছে। সিতারা বেগম মেয়ের পিঠে হাতে বুলাতে বুলাতে বললেন,

— নাতি-নাতনিদের মুখ দেখার আগে আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুই আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। আল্লাহ ভরসা।
মায়ের কথা শুনে আলো স্বস্তি ফিরে পায়। সেদিন রাত নয়টা বাজে সিতারা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম এর উদ্দেশ্য রওনা হলো কাব্য-ইতি। আর আলো রাত বারোটা বাজে এয়ারপোর্টে এর উদ্দেশ্য বের হয়ে যায়। ফ্ল্যাট থেকে বের হবার সময় কেবল শান্ত’র দাদাজান এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। শান্ত আলোর চলে যাওয়ার কথা শুনেও দেখা করতে আসেনি। আলো যেন এবার স্বস্তি পেলো। যাক মানুষটা তাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে ; এটাও বা কম কিসের?

রাত বারোটার সিলেট এর নিস্তব্ধতা শহরটাকে এক অজানা শূন্যতায় ঢেকে রেখেছে। গাড়ির জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে আলো। রাস্তার লাইটগুলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন তার জীবনের স্মৃতিগুলোও ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার মাঝেমধ্যে রিয়ারভিউ মিররে তাকাচ্ছে। হয়তো বুঝতে পারছে। পেছনের সিটে বসা মেয়েটার ভেতরে ঝড় চলছে।
আলো চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে সেই মুখটা… “ডাক্তার সাহেব…” তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। যার জন্য এত আয়োজন করছে সে মেনে নেবে তো?
হঠাৎ মনে হলো, এই শহরের প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা বাতাস, প্রতিটা দেয়াল—সবকিছুতেই যেন বিগত জীবনের স্মৃতি, অস্তিত্ব লেগে আছে। সে কি সত্যিই পারবে এগুলো ছেড়ে চলে যেতে?
না… তাকে পারতেই হবে। কারণ, কিছু ভালোবাসা ধরে রাখতে গেলে নিজেকেই ভেঙে ফেলতে হয়।
সিলেট এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর আলো ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। চারপাশে মানুষজনের ভিড়, কোলাহল। তবুও তার কাছে সবকিছুই নিরব মনে হচ্ছে। চেক-ইন শেষ করে বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে এক কোণে গিয়ে বসল। মোবাইলটা হাতে নিল। ইমেইল এর স্ক্রিনে একটা নাম বারবার চোখে পড়ছে…
“ডাক্তার সাহেব ❤️”
আঙুলটা থেমে আছে সেন্ড বাটনের ওপর। ইমেইল সেন্ড করবে কি? করবে না? না… করবে না। ইমেইল এ কি বলবে সে?

“আমি আসছি”? নাকি “ মিলি কে”? জিজ্ঞেস করবে। ব্যাপারটা টাটালি হাস্যকর…
যে মানুষটা তাকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তাকে আবার কি বলার আছে?
আলোর ফোনের স্ক্রিনটা ধীরে ধীরে নিভে গেল।
ঠিক তখনই তার পাশে কেউ এসে বসল।
আলো তাকিয়ে দেখল, একজন বয়স্ক মহিলা, মায়াবী মুখ। তিনি মৃদু হেসে বললেন,
— মা, তুমি কি প্রথমবার বিদেশ যাচ্ছ?
আলো হালকা মাথা নাড়ল।
— জ্বি…
— ভয় লাগছে?
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— একটু…
মহিলাটি তার হাতটা আলতো করে ধরলেন।
— ভয় পেও না। নতুন পথ মানেই নতুন গল্প।
আলো হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল। “নতুন গল্প…”
তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো সত্যিই! এই বিদায়টা শেষ নয়, বরং নতুন কিছুর শুরু।
আর ঠিক তখনই…

এয়ারপোর্টের অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কেউ একজন গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে।
চোখ দুটো লাল… ক্লান্ত… ভীষণ অস্থির।
সে এক পা এগোতে চাইল… কিন্তু থেমে গেল।
নিজের মুঠোটা শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল—
“ আমাকে প্রত্যাখান করে যদি তুমি সুখে থাকো তাহলে আমি দূর থেকেই ভালোবাসবো তোমায়…”
এর কিছুই টের পায় না আলো। কোনোদিন কিছু জানবেও না। সে শুধু জানে, তার ফ্লাইটের ঘোষণা হয়ে গেছে।
“Passengers for London… please proceed to boarding gate…”
আলো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। শেষবারের মতো চারপাশে তাকাল… তারপর এগিয়ে গেল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে কারো বুকের ভেতরটা নিঃশব্দে ভেঙে গেল।
“Passengers for London… final call for boarding…”
ঘোষণাটা কানে আসতেই আলোর বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। যেন এই একটা ডাকই তার পুরো জীবনটাকে দুই ভাগে ভাগ করে দিচ্ছে—একটা অতীত, আরেকটা অজানা ভবিষ্যৎ।
আলো গভীর শ্বাস নিল।
তারপর ধীরে ধীরে বোর্ডিং গেটের দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটা পা ফেলার সাথে সাথে মনে হচ্ছিল, সে নিজের পরিচিত পৃথিবীটাকে পেছনে ফেলে যাচ্ছে। বোর্ডিং ব্রিজ পার হয়ে প্লেনে ঢুকতেই একধরনের ঠাণ্ডা গন্ধ তার নাকে লাগল। সবকিছুই নতুন, অপরিচিত।
এয়ার হোস্টেস মিষ্টি হেসে বলল,

— Welcome, ma’am.
আলো হালকা হাসি দিল। তারপর নিজের সিট খুঁজে বসে পড়ল জানালার পাশে। জানালার বাইরে তাকাতেই দেখতে পেল, অন্ধকার রানওয়ে, ছড়িয়ে থাকা আলো। ঠিক যেন তার জীবনের মতো। অন্ধকারের মাঝে কিছু আলোর বিন্দু।
সিটবেল্ট বেঁধে নিল। হাতটা কাঁপছে হালকা।
প্লেন ধীরে ধীরে রানওয়েতে এগোতে শুরু করল।
আলো চোখ বন্ধ করল। মনে মনে শুধু একটা কথাই বলল—
“আল্লাহ… আমাকে শক্তি দাও…”
হঠাৎ একটা জোর ধাক্কা, তারপর গতি বাড়তে লাগল। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই প্লেনটা মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে, আলোর চোখের কোণ দিয়ে একটা জলবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
নিচে পড়ে রইল তার শহর… তার স্মৃতি… তার ভালোবাসার আপনজন, তার মা, তার অনাগত সন্তানের কবর, তার বাবার কবর।

ফ্লাইটের ভেতরে সময় যেন থেমে আছে।
চারপাশে হালকা আলো, যাত্রীরা কেউ ঘুমিয়ে, কেউ সিনেমা দেখছে, কেউবা চুপচাপ বসে আছে।
কিন্তু আলোর চোখে ঘুম নেই।সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। অন্ধকার আকাশে ভাসছে প্লেন… আর নিচে অসংখ্য ছোট ছোট আলোর বিন্দু। যেন দূরের শহরগুলো।
হঠাৎ পাশ থেকে একটা কণ্ঠ
— ঘুমাচ্ছেন না?
আলো তাকিয়ে দেখল, পাশের সিটে বসা সেই বয়স্ক মহিলা। আলো মৃদু হাসল,
— না… ঘুম আসছে না।
— প্রথমবার সবকিছুই এমন লাগে।
আলো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
— কিছু কিছু জিনিস পেছনে ফেলে আসা খুব কঠিন…
মহিলাটা বুঝে ফেললেন।
— কিন্তু মা, কখনো কখনো ছেড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় সাহস।
আলো আর কিছু বলল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরের ঝড়টা একটু একটু করে শান্ত হচ্ছে…

কয়েক ঘণ্টা পর—
“Ladies and gentlemen, we are now approaching London…”
ঘোষণাটা শুনে আলোর বুকটা আবার ধক করে উঠল। সে জানালার দিকে ঝুঁকে তাকাল।
নিচে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে এক বিশাল শহর।
আকাশ এখন হালকা ধূসর… ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। নিচে অসংখ্য বিল্ডিং, সোজা সোজা রাস্তা, গাড়ির সারি… সবকিছু এত গুছানো… এত ভিন্ন! আলো মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, সে সত্যিই একটা নতুন পৃথিবীতে পা রাখতে যাচ্ছে। প্লেনটা ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল। একসময় চাকা মাটিতে ছুঁলো। একটা হালকা ঝাঁকুনি… তারপর ধীরে ধীরে গতি কমে এলো।
“Welcome to London.”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে আলো গভীর শ্বাস নিল। তার ঠোঁট কাঁপছে… চোখে জল চিকচিক করছে… কিন্তু সেই জলটা আজ কষ্টের না, এটা এক নতুন শুরুর।
প্লেন থেমে গেল। যাত্রীরা একে একে উঠে দাঁড়াচ্ছে। আলোও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার ব্যাগটা হাতে নিল। একবার চোখ বন্ধ করে নিজেকে বলল—
“আলো… এখন থেকে তুই একা না। তুই তোর ডাক্তার সাহেব এর শহরে আছিস।”
তারপর, সে প্লেনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই— সে পা রাখবে এক নতুন দেশে, এক নতুন জীবনে, তার ডাক্তার সাহেব এর কাছে …
লন্ডনের ঠাণ্ডা বাতাস তার গায়ে লাগতেই
আলো হালকা কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে হাসল। তারপর, চোখের পর্দায় ভেসে ওঠা ☁ হাসোজ্জল মুখটা কল্পনায় এঁকে বলল,

“এই শহর… এখন থেকে আমাদের…”
আলো ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশন লাইনের দিকে এগিয়ে গেল। লাইনটা বেশ লম্বা। সামনে-পেছনে নানা দেশের মানুষ দাঁড়িয়ে। কেউ হাসছে, কেউ ফোনে কথা বলছে… আর সে? সে শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নিজের পাসপোর্টটা শক্ত করে ধরে। কিছুক্ষণ পর তার সিরিয়াল এলো।
অফিসার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে তাকাল
— Purpose of visit?
আলো একটু থেমে বলল,
— Work… and study.
অফিসার মাথা নাড়ল। স্ট্যাম্প পড়ল পাসপোর্টে।
“Welcome to the UK.”

আলো লাগেজ নিয়ে বাইরে বের হতেই,
এক ঝাঁক ঠাণ্ডা হাওয়া তার গায়ে এসে লাগল।
আলো নিজের শালটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিল। চারপাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে—কারো হাতে ফুল, কারো হাতে প্ল্যাকার্ড। কারো জন্য কেউ এসেছে। কিন্তু তার জন্য? কেউ নেই।
আলো একবার চারপাশে তাকাল… হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তারপর মনে মনে বলল,
“স্বাভাবিক… তুই একাই এসেছিস…”
পরক্ষণেই কাব্য’র বলা কথাগুলো মনে পরল। কারণ, কাব্য স্যার বলেছিল তাদের পরিচিত কেউ আলোকে রিসিভ করতে আসবে। সেই পরিচিত মানুষটা কি আসেনি এখনো এয়ারপোর্টে?
আলো যখন আকাশকুসুম ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনই কেউ বলে উঠলো,
— Excuse me… are you Dr. Tamanna?
আলো চমকে উঠে তাকাল।
একজন লম্বা, স্মার্ট যুবক দাঁড়িয়ে আছে সামনে। হাতে একটা ছোট প্ল্যাকার্ড—

“Dr. Tamanna”
আলো একটু অবাক হয়ে বলল,
— জি… আমি ডাক্তার তামান্না ইসলাম আলো ।
ছেলেটা হালকা হেসে হাত বাড়াল,
— I’m Arham. I was sent to pick you up.
আলো ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
— Sent? কে পাঠিয়েছেন?
ছেলেটা এক সেকেন্ড থেমে বলল,
— You’ll know soon.
আলোর ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল।
“কে হতে পারে?
সে কি…?
না… না… অসম্ভব!”

গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে আলো। লন্ডনের রাস্তা… লাল বাস… আলো ঝলমলে সাইনবোর্ড… সবকিছু যেন সিনেমার মতো লাগছে। কিন্তু তার মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে
“কে পাঠিয়েছে?”
হঠাৎ আরহাম বলল,
— Long flight, huh?
— হুম…
— Don’t worry. You’re safe here.
আলো কিছু বলল না। তার দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে থামল আরহামের হাতে থাকা ঘড়ির দিকে… ঘড়িটা খুব চেনা লাগছে। অদ্ভুতভাবে চেনা। তার বুকটা ধক করে উঠল।
“এটা… এই ঘড়ি তো…!”
ঠিক তখনি আরহাম এর কল এলো মোবাইলে। কল রিসিভ করে আরহাম কলে থাকা ব্যক্তিকে বলল,
— জি জি ভাই। তোমার বলা মতোই মানুষটাকে আমি রিসিভ করেছি। ডোন্ট ওয়ারি। তুমি রিনির বিয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাংশানে ব্যস্ত আছো আমি তো জানি। তুমি তোমার ভাইকে বলে দিও দুশ্চিন্তা না করতে। আর হ্যা তাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে আসছি আমি।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি একটা বড়, সুন্দর বাড়ির সামনে থামল। আরহাম দরজা খুলে বলল,
— We’re here.
আলো নামল। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
এত সুন্দর… এত শান্ত…। হঠাৎই তার মনে অদ্ভুত অশান্তি বয়ে যাচ্ছে।
— Come.

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৩

আরহাম তাকে ভেতরে নিয়ে গেল। ডোর খুলতেই
আলো জমে গেল। তার চোখ বড় হয়ে গেল বিস্ময়ে… কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন… যাকে সে কখনো এখানে আশা করেনি। তার ঠোঁট কাঁপছে… শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু ফিসফিস করে বলতে পারল,
“আপনি…?”
আর আলোকে দেখে সেই মানুষটা দূর্বল হয়ে যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৫