রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৬
ইয়ুশরা রিমু
অফিস রুমের ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠলো। রুম জুড়ে এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা, অথচ সেই নীরবতার ভেতর দিয়েও বাইরে করিডোরে জড়ো হয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা গুঞ্জন স্পষ্ট ভেসে আসছে। কৌতূহলী অসংখ্য চোখ দরজার দিকেই নিবদ্ধ কখন বের হবে, কী সিদ্ধান্ত হবে, সেই অপেক্ষায়। কারণ সবাই জানে, আজকের ঘটনাটা আর পাঁচটা সাধারণ ঝগড়া বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা নয়। বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে শেষ পর্যন্ত তা কলেজের প্রিন্সিপালের কক্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছে। পুরো কলেজজুড়ে এখন একটাই আলোচনা শেষ পর্যন্ত কী হতে চলেছে?
সায়র চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। মুখটা আগের মতোই কঠোর। তবে তার দৃষ্টি মাঝে মাঝে অজান্তেই বেলার দিকে চলে যাচ্ছে। বেলা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো এখনও লাল। আর তানিয়া বারবার নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করছে। মুখে ভীতসন্ত্রস্ত ভাব ফুটিয়ে রাখলেও ভেতরে ভেতরে এখনও নিজেকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করছে।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান।রুমের সবাই সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।তিনি ধীর পায়ে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন। সামনে রাখা ফাইলের ওপর হাত রেখে একবার সবার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত কিন্তু রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৬কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,
— কী হয়েছে এখানে?
সায়র সংক্ষেপে পুরো বিষয়টা জানিয়ে দিলো।সব শুনে অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর দৃষ্টি স্থির করলেন তানিয়ার দিকে।
— তানিয়া, তুমি আগে বলো। কী হয়েছে?
তানিয়া সঙ্গে সঙ্গে চোখে পানি এনে কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল,
— স্যার আমি কিছুই করিনি। আমি শুধু ওর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলাম। হঠাৎ করেই বেলা আমাকে থা’প্পড় মে’রে দিলো। তারপর কোনো কথা না শুনেই আমার চুল ধরে টানাটানি শুরু করলো। আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।
অধ্যক্ষ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
—কোনো কারণ ছাড়াই একজন মানুষ আরেকজনকে থা’প্পড় মে’রে বসবে?
— জি স্যার ও খুব রাগী। আমাকে সহ্য করতে পারেনা ক্লাসের ফাস্ট গার্ল দেখে। সবাই জানে ও কেমন।
বেলা আর চুপ থাকতে পারল না চিৎকার করে বললো,
— মিথ্যা কথা বলবি না।
অধ্যক্ষ সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় বললেন,
— বেলা, এখন তুমি চুপ থাকবে। ওর কথা শেষ হোক।
বেলা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
তানিয়া আবার বলতে শুরু করলো,
— স্যার, আমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, আজ এত চুপচাপ কেন। সবসময় তো কলেজে চিল্লাপাল্লা করিস।এইটুকু বলতেই ও আমার গায়ে হাত তোলে।
কথা শেষ করেই সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল যেন সমস্ত দোষ একাই বেলার।অধ্যক্ষ এবার ধীরে ধীরে বেলার দিকে তাকালেন।
—এবার তুমি বলো বেলা।
বেলা গভীর শ্বাস নিল।তারপর শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললো,
—স্যার, ও যা বলছে তার অর্ধেকও সত্যি না। আমি প্রথমে কোনো উত্তরই দিইনি। পাশ কা’টিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ও বারবার আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমি সরে গেলে আবার সামনে এসেছে। আমি চুপ থাকলে আরও বেশি করে কথা বলেছে।
—কী বলেছে?
—প্রথমে বলেছে, আমার নাকি সব তেজ ফেল করে শেষ হয়ে গেছে।
বেলা থামলো একটু।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে আবার বললো,
—একবার না স্যার। বারবার বলেছে ফেলটুস ছাত্রী । তোর মতো ছাত্রীর পড়াশোনা দিয়ে কিছু হবে না। তুই আবার কীসের বড় বড় কথা বলিস।
একই কথা বারবার বলছিলো। আমাকে শুধু উসকানি দিয়েছে।তানিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,
—স্যার, ও মিথ্যা বলছে!
বেলাও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—আমি একটাও মিথ্যা বলছি না। তুই মিথ্যা বলছিস!
— তুই বলছিস!
দুজন আবার তর্কে জড়িয়ে পড়তেই অধ্যক্ষ টেবিলে হাত চাপড়ে বললেন,
— চুপ!
এক মুহূর্তেই পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।অধ্যক্ষ কঠোর গলায় বললেন,
— এটা আমার অফিস। মাছের বাজার না। এখানে একজন কথা বলবে, বাকিরা শুনবে।
তারপর সায়রের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— করিডোরে তো অনেক শিক্ষার্থী ছিল। যারা ঘটনাটা শুরু থেকে দেখেছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনকে নিয়ে আসুন।
— জি স্যার।
সায়র দ্রুত বাইরে চলে গেলো।কয়েক মিনিট পর চারজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ফিরে এলো।অধ্যক্ষ তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তোমরা কেউ ভ’য় পাবে না। সত্যিটাই বলবে। কারও পক্ষ নেবে না। যা দেখেছ, শুধু সেটাই বলবে।
প্রথম শিক্ষার্থী বললো,
—স্যার, বেলা প্রথমে কোনো ঝামেলা করেনি। ও চলে যাচ্ছিলো। তানিয়াই বারবার সামনে এসে কথা বলছিল।
—কী কথা?
—স্যার বারবার বলছিলো ফেল করেছে, ফেল করেছে… তোর রেজাল্টের এই অবস্থা, আবার এত ভাব!
অধ্যক্ষ মাথা নাড়লেন। তারপর বাকি তিনজন শিক্ষার্থীও বললো,
— জি স্যার। আমি নিজেও শুনেছি। তানিয়া একই কথা অনেকবার বলেছে। বেলা প্রথমে কোনো উত্তর দেয়নি।বেলা অনেকক্ষণ চুপ ছিল। পরে রেগে গিয়ে থা’প্পড় মারে।স্যার, ঝগড়াটা শুরু করেছে তানিয়া। আর বারবার ফেল করার কথা বলেই ওকে উসকাচ্ছিলো।
চারজনের বক্তব্য শেষ হতেই তানিয়ার মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল।সে বুঝতে পারলো, এবার আর নিজের দোষ লুকিয়ে লাভ হবে না।
অধ্যক্ষ ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।তার গলায় এবার স্পষ্ট কঠোরতা,
— তানিয়া, একজন শিক্ষার্থীকে তার ফলাফল নিয়ে অপমান করা, একই কথা বারবার বলে তাকে মানসিকভাবে উসকে দেওয়া, তাকে ছোট করার চেষ্টা করা। এসবও গুরুতর অসদাচরণ। তুমি কি ভেবেছ, হাতে আ’ঘাত না করলেই অন্যায় হয় না? কথার আ’ঘাত অনেক সময় হাতের আ’ঘাতের চেয়েও বেশি কষ্ট দেয়।
তানিয়া মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
—স্যার আমি ভুল করেছি।
— ভুল করেছ, সেটা এখন বুঝেছ। কিন্তু যখন একই কথা বারবার বলে একজন মানুষকে অপমান করছিলে, তখন মনে ছিল না?
তানিয়া কোনো উত্তর দিতে পারলোনা।এবার সায়র ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।তার চোখে হতাশা স্পষ্ট।তিনি তানিয়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
—তানিয়া, কলেজে পড়তে এসেছেন। মানুষের আত্মসম্মান নিয়ে খেলা করতে নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি পড়াশোনায় দুর্বলও হয়, তাকে উৎসাহ দেওয়া আপনার দায়িত্ব না হলেও তাকে অপমান করার কোনো অধিকার আপনার নেই। আপনি বারবার একই কথা বলে ইচ্ছাকৃতভাবে ওকে উ’ত্তেজিত করেছেন। তারপর যখন ও নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে, তখন সমস্ত দোষ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। এই মানসিকতা একজন শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।মনে রাখবেন, মানুষের চরিত্র নম্বর দিয়ে বিচার করা যায় না। কিন্তু ব্যবহার দিয়ে খুব সহজেই বিচার করা যায়।
তানিয়া মাথা নিচু করে কাঁদতেই থাকলো
এরপর তিনি ধীরে ধীরে বেলার দিকে তাকালো।তার কণ্ঠ আগের তুলনায় কিছুটা নরম হলেও শিক্ষকসুলভ কঠোরতা একটুও কমেনি।সে বেলাকে বললো,
—আর বেলা, আপনার ওপর অন্যায় হয়েছে, সেটা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু তাই বলে হাত তোলা কখনোই ঠিক হয়নি। আপনি চাইলে শিক্ষকদের জানাতে পারতেন। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা খুব জরুরি। কারণ এক মুহূর্তের রাগ অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করে।
বেলা মাথা নিচু রেখেই আস্তে করে বললো,
—জি স্যার।
অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান দুজনের দিকে তাকিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন,
—-আজকের জন্য তোমাদের দুজনকেই লিখিত মুচলেকা দিতে হবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলছি। এই ঘটনার সূচনা করেছে তানিয়া, আর সেটার পরিণতি টেনেছে বেলা। একজন উসকানি দিয়েছে, অন্যজন নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তাই দোষ দুজনেরই আছে।
তিনি কয়েক মুহূর্ত থেমে আরও কঠোর স্বরে বললেন,
—আজ আমি তোমাদের শেষবারের মতো সতর্ক করছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো ঘটনা আর একবারও ঘটলে কাউকেই কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না। তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। মনে রেখো, এই প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। আশা করি, আজকের ঘটনার পর তোমরা নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে এবং এমন পরিস্থিতি আর কখনো সৃষ্টি করবে না। বিশেষ করে তানিয়া আমার কথাগুলো মস্তিষ্কে গেঁথে নেও।
অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমানের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পর কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললো না।করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা কৌতূহলী চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। সবাই শুধু বুঝতে পারল, বিষয়টা শেষ হয়েছে।সায়র শেষবারের মতো দুজনের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
— ক্লাসে যান। আর আমি আশা করি, আজকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কখনো হবে না।
বেলা ও তানিয়া দুজনেই একসঙ্গে উত্তর দিলো,
— জি স্যার।
তারপর দুজন দুইদিকে হাঁটতে শুরু করলো।বেলা একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না।অন্যদিকে তানিয়া কয়েক কদম এগিয়েই থেমে গেলো।তার চোখে তখন আর কান্না নেই।বরং সেখানে জমাট বেঁধে আছে অপমান, ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুন।সে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বললো,
—আজ সবাই আমার দোষ দেখলো। সবাই আমাকে ছোট করল। এমনকি সায়র স্যারও সবার সামনে আমাকে অপমান করলেন। বেলা আজ তুই জিতে গেছিস। কিন্তু এই জয় বেশিদিন থাকবে না। আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকবো। এমন একটা সময় আমারো আসবে।আজকের প্রতিটা হিসাব আমি সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেব।
নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে ধীরে ধীরে ক্লাসরুমের দিকে চলে গেল তানিয়া।তার চোখের সেই দৃষ্টি বলে দিচ্ছিলো বিষয়টা এখানেই শেষ হয়নি।বরং আজ থেকেই শুরু হলো নতুন এক শ’ত্রুতার।
অন্যদিকে বেলা ধীর পায়ে ক্লাসরুমে ঢুকতেই ইরা উঠে দাঁড়ালো।উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
—-কী হলো? খুব বকা দিল?
বেলা নিজের ব্যাগটা বেঞ্চে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ,
—পরে বলবো।
ইরা আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।সে বুঝতে পারছিলো বেলার মন এখনও ভারী হয়ে আছে।বাকি ক্লাসগুলোও আজ তেমন কথা না বলেই কে’টে গেলো।তবে শেষ ক্লাসের ঘণ্টা বাজতেই ইরা আবার আগের মতো হয়ে গেলো।সে হেসে বললো,
— চল, এত মুখ গোমড়া করে থাকলে চলবে না। আজকে আইসক্রিম খাওয়াবি।
বেলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমি কেন?
—কারণ তুই আজ কলেজে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিস।
বেলা হেসে বলে,
— এক থা’প্পড়ের ইতিহাস?
— আরে হ্যাঁ! পুরো কলেজ তো আজ শুধু তোর কথাই বলছে।
বেলা বিরক্ত মুখে বললো,
— চুপ কর।
ইরা হো হো করে হেসে উঠে,
—আচ্ছা ঠিক আছে, আইসক্রিম না খাওয়ালে ফুচকা খাওয়াস।
— এক টাকাও নাই আমার কাছে।
— তাহলে ঝালমুড়ি।
—সেটাও না।
— আচ্ছা, অন্তত একটা চকলেট?
বেলা এবার হেসে ফেললো। তারপর বললো,
— তুই না একদম নির্লজ্জ।
— ধন্যবাদ।
দুজন একসঙ্গে হেসে উঠলো।অনেকক্ষণ পর বেলার মুখে হাসি ফুটতে দেখে ইরারও ভালো লাগলো।কলেজ গেট থেকে বেরিয়ে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশের এক দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনলো।ইরা এক মুঠো ঝালমুড়ি মুখে দিয়ে বললো,
—জানিস, তুই যখন তানিয়ার চুল ধরে টানছিলি, আমি তো ভাবছিলাম আজকে ওর মাথায় চুলই থাকবে না।
বেলা হেসে বললো,
— আমার নিজেরও মনে নেই কীভাবে এত রেগে গিয়েছিলাম।
হাসতে হাসতে দুজন রাস্তার অনেকটা পথ পার করে ফেললো।মনের ভেতরের ভারটাও যেন একটু একটু করে হালকা হয়ে আসছিলো বেলার।
বিকেলের দিকে বেলা বাসায় ফিরলো।গেট খুলেই ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক হাসির শব্দ।বেলা থমকে দাঁড়ালো।পরের মুহূর্তেই বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল। চিৎকার করে বলে উঠলো,
— ভাইয়া!
সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল লম্বা, সুদর্শন এক যুবক।মুখভরা হাসি।দু’হাত ছড়িয়ে বলল,
— আমার পিচ্চিটা আমাকে ভুলেই গেছে নাকি?
বেলা আনন্দে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
—বিহান ভাইয়া! তুমি কবে এলে?
বিহান হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
—এই তো একটু আগেই। কাজ শেষ হয়েছে, তাই সরাসরি চলে এলাম।
—তুমি তো বলেছিলে আরও চার-পাঁচ দিন লাগবে!
— কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে।
বেলা মুখ ফুলিয়ে বললো,
—একবার ফোনও দিলে না!
— তাহলে কি আর তোকে সারপ্রাইজ দিতে পারতাম?
ঠিক তখনই নাজনীন সুলতানা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসতে হাসতে বললেন,
— দেখেছো? ভাইকে দেখে মেয়ের মুখের সব রাগ, অভিমান এক মিনিটেই উধাও।
বাশার খান পত্রিকা নামিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
—এই বাড়িতে বিহান এলেই যেন ঈদ লেগে যায়।
বিহান হেসে বললো,
— বাহ সবাই আমার কতো সুনাম করছে দেখছি।আমি কিন্তু পারমানেন্ট এখানে ট্রান্সফার হয়েছি। নিজের বাড়ি ছেড়ে আর কোথাও যাচ্ছি না।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে বললো,
— ওয়াও সত্যি? তাহলে তো ভালই হবে। তুমি সবসময় থাকবে।
—তাহলে এখন থেকে আমার সব কাপড় তুই ধুবি। আর প্রতিদিন আমার জন্য চা বানাবি।
বেলা দুই হাত কোমরে রেখে বললো,
— স্বপ্ন দেখো!
বিহান দুষ্টুমি করে বললো,
—তাহলে কিন্তু তোর ছোটবেলার সব কীর্তি সায়রকে বলে দিব।
বেলা চোখ বড় বড় করে বললো,
—ভাইয়া! একদম না!
ড্রয়িংরুমজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেলো।অনেকদিন পর বাড়ির পরিবেশটা আবার প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠলো।
আর এতক্ষণে বেলার মুখে যে প্রাণখোলা হাসিটা ফুটে উঠেছে, সেটা দেখে নাজনীন সুলতানা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
সন্ধ্যা নেমেছে ধরনীতে। বেলাদের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম খিচুড়ির ঘ্রাণ, ড্রয়িংরুমে বসে বাশার খান, সারোয়ার খান আর বিহান গল্প করছেন, আর নাজনীন সুলতানা মাঝেমধ্যে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে সবার জন্য চা-নাশতার ব্যবস্থা করছেন।বেলা নিজের রুমে এসে আলমারি খুলতেই হঠাৎ কপালে হাত চাপড়ে উঠলো।
—আরে!
গতকাল রাগের মাথায় সায়রের রুম থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার কালো রঙের প্রিয় হেয়ার ব্যান্ডটা খুলে টেবিলের ওপর রেখেছিলো। তারপর এত কাঁদাকাঁদি আর আজকের কলেজের ঘটনার মধ্যে সেটার কথা একেবারেই মাথায় ছিলো না।সে বিড়বিড় করে বলল,
— ইশ ! ওই হিটলার বেটা আবার রেগে ফেলে দিয়েছে নাকি আমার প্রিয় ব্যান্ডটা।
এক মুহূর্তও দেরি না করে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়লো ।করিডোরটা তখন প্রায় ফাঁকা।সায়রকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বেলা মনে মনে বললো,
—-এখনই ভালো সুযোগ। কেউ দেখার আগেই নিয়ে চলে আসি।
চারপাশে একবার তাকিয়ে খুব আস্তে করে সায়রের রুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।রুমে কেউ নেই।মৃদু একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে।তারপর দ্রুত টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।কিন্তু হেয়ার ব্যান্ডটা সেখানে নেই।বেলা ভ্রু কুঁচকে চারদিকে তাকালো।টেবিলের একপাশে বইয়ের সারিতে,চেয়ারের নিচে, বিছানার ওপর কোথাও নেই।
সে নিচু হয়ে বিছানার তলাও দেখে নিল।তারপর আবার টেবিলের ড্রয়ারটাও একটু খুলে উঁকি দিল।গেল কোথায়?
নিজের সঙ্গেই ফিসফিস করে বলল সে,
—- আমি তো এখানেই রেখেছিলাম!
মুখে স্পষ্ট অস্থিরতা ফুটে উঠলো।
—-তাহলে কি কেউ নিয়ে গেছে? নাকি সায়র ভাই পেয়েছে?
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকেও যখন কিছু খুঁজে পেলো না, তখন হতাশ হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।ঠিক দরজার বাইরে পা রাখতেই,
—ধপ!
কারও শক্ত বুকের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেলো বেলা।বেলা ভারসাম্য হারিয়ে পিছলে যেতে নিলো।ঠিক সেই মুহূর্তে একজোড়া শক্ত হাত বেলার কোমর আলতো করে ধরে ফেললো।মুহূর্তের জন্য সময় যেন স্থির হয়ে রইলো।বেলা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।সামনেই দাঁড়িয়ে সায়র।খুব কাছাকাছি।এতটাই কাছে যে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের গায়ে এসে লাগছে।সায়রের হাত এখনও বেলার কোমড়ে রাখা।আর বেলা বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেলো একে অপরের চোখে।পরের মুহূর্তেই সায়র ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিলো।তারপর আগের মতোই শান্ত, গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— দেখে শুনে হাঁটতে শিখিসনি এখনো? আর এখানে কী করছিস?
বেলা যেন প্রশ্নটাই শুনতে পায়নি।সে এখনও কিছুটা অপ্রস্তুত।সায়র আবার বললো,
—আমার রুমে কেন এসেছিলি?
বেলা তড়িঘড়ি করে চোখ নামিয়ে বললো,
— আমি…আমি
— পড়তে এসেছিলি?
বেলা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বললো,
— না।
—তাহলে?
এক মুহূর্তের মধ্যে একটা মিথ্যা বানিয়ে ফেলল সে,
—বিহান ভাইয়াকে খুঁজছিলাম।
সায়রের ভ্রু সামান্য উঁচু করে বলে,
—বিহানকে?
— হ্যাঁ।
—- আমার রুমে?
বেলা এবার পুরোপুরি আটকে গেল।কিছু বলার মতো উত্তর খুঁজে পেল না।তারপর কোনোমতে বললো,
—আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া হয়তো আপনার সঙ্গে গল্প করছে।
সায়র কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।তার সেই গভীর দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যেন সে বুঝে গেছেন বেলা সত্যি বলছে না।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।শুধু খুব আস্তে বললেন,
—-বিহান ড্রয়িংরুমে আছে।
—ওহ আচ্ছা।
এই বলে দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো।কিন্তু করিডোরটা সরু হওয়ায় আবারও তার ওড়নার একপাশ সায়রের হাতঘড়িতে হালকা আটকে গেলো।বেলা থমকে দাঁড়ায়।সে ঘুরে তাকাতেই দেখলো, সায়রও নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন।এক মুহূর্তের জন্য আবারো দুজনেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।বেলা তাড়াতাড়ি ওড়নাটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।কিন্তু যত টানছে, ততই কাপড়টা ঘড়ির ধাতব অংশে জড়িয়ে যাচ্ছে।
সে ল’জ্জায় প্রায় মিনমিন করে বললো,
— আমি ছাড়াচ্ছি ।
সায়র শান্ত গলায় বললো,
— নড়িস না।ওড়নাটা ছিঁড়ে যাবে।
বেলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
সায়র খুব সাবধানে ঘড়ির সঙ্গে আটকে থাকা ওড়নার অংশটা খুলে দিলেন, যেন সামান্য টানেও কাপড় ছিঁ’ড়ে না যায়।ওড়নাটা ছাড়িয়ে দিয়ে তিনি ধীরে বললো,
—হয়ে গেছে।
বেলা ওড়নার প্রান্তটা আঁকড়ে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।কেন জানি আজ তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে।গতকাল এই মানুষটার কথায় সে সারারাত কেঁদেছিলো।আজ আবার সেই মানুষটাই খুব যত্ন করে তার ওড়না ছাড়িয়ে দিলো।দুজনের মাঝখানে আবারও নীরবতা নেমে এলো।শেষ পর্যন্ত বেলাই আস্তে করে বললো,
— আমি যাই।
সায়র শুধু মাথা নাড়লো।
—হুম।
বেলা দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। একবারের জন্যও পেছন ফিরে তাকালো না। মুহূর্তের মধ্যেই করিডোরের বাঁক পেরিয়ে সে চোখের আড়াল হয়ে গেল।
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৫
সায়র কয়েক মুহূর্ত করিডোরেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুঠোবদ্ধ হাতটা খুললো। তার তালুর ভেতর তখনও আটকে আছে বেলার সাদা ওড়নার একটু’করো ছেঁড়া অংশ। তাড়াহুড়োয় বেলার ওড়না হাতঘড়ি থেকে ছাড়ানোর সময় অজান্তেই ওড়নার কিছু অংশটা তার ঘড়িতেই রয়ে গিয়েছিলো।কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দৃষ্টিতে কাপড়ের ছোট্ট টুকরোটার দিকে তাকিয়ে রইলো সে। কেন যেন সেটি ফেলে দেওয়ার কথা একবারও মনে হলো না। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অচেনা অনুভূতি নিয়ে নিঃশব্দে কাপড়ের টুকরোটা যত্ন করে নিজের শার্টের পকেটে রেখে ধীর পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলো।
