Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১১

রুহ এ ইশক পর্ব ১১

রুহ এ ইশক পর্ব ১১
আনান রোজ

প্রফেসর সাহেবের মন ইনশিরাকে শাড়িতে দেখে বেসামাল হয়ে উঠলেও সে, তার পিচ্চি বউটা কে পুরোপুরি ইগনোর করছে। ইনশিরা আড়চোখে উযাইনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—’তার মানে… উনি এই ৩ বছরে একবারও উমাইরের সামনে আমার কথা বলেননি? উমায়ের আমাকে পুরোপুরি ভুলে গেছে?!’
উযাইন কোনো কথা না বাড়িয়ে লিভিং রুমে চলে গেল। সেখানে জাহির আর ইরা।যাহির উযাইনকে জড়িয়ে ধরে, তারা ৩ বছরের পুরোনো স্মৃতি আর লন্ডনে শিফট হওয়ার গল্প নিয়ে মেতে উঠল। উযাইনও সবার সাথে খুব হাসিমুখে কথা বলছিল, শুধু ইনশিরার দিকে সে ভুলেও তাকাচ্ছিল না।
রাত সাড়ে ৯টায় সবাই ডাইনিং টেবিলে বসল। ইরা উযাইনের প্লেটে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বেশ গর্বের সাথে বলল—

—”জানো উযাইন, আজকের এই পোলাও, রোস্ট আর বাকি সব কিন্তু ইনশিরা নিজে একহাতে রান্না করেছে! ও রান্নাবান্নায় এখন ভীষণ পারদর্শী।”
উযাইন আড়চোখে খেয়াল করল—আজও এই ১৯ বছরের মেয়েটার মধ্যে ঠিক ৩ বছর আগের মতোই এক নিখুঁত ‘বউ বউ ভাব’ ফুটে উঠেছে। সে নিজেই পুরো টেবিল তদারকি করছে, সবাইকে স্বযত্নে খাবার তুলে দিচ্ছে। কিন্তু এই সুন্দর মুহূর্তের মাঝেই একটা বড় বিপদ দেখা দিল।
উমায়ের বাঙালি খাবার খেতে খুব একটা অভ্যস্ত নয়। সে প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বসে রইল।
উযাইন উমাইরের মাথায় হাত বুলিয়ে, বলে—
—”Try it, বাবা। ভালো লাগবে। খেয়ে দেখো একটু…”
— “No, i don’t want to eat this.”
উমায়ের মাথা নেড়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিল। ইনশিরা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে উমাইরের পাশে এসে বাটি থেকে একটু পোলাও আর মাংস মেখে আলতো করে উমাইরের মুখের সামনে চামচটা ধরল। তার চোখ দুটো মায়ায় ভরা। ইনশিরা খুব আদুরে গলায়—
—”আমি খাইয়ে দিই … সোনা আমার, একটা লোকমা খাও…”
উমায়ের এবার আরও কড়াভাবে মুখটা ঘুরিয়ে নিল এবং ইনশিরার হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল—

—”No! I said no!”
উযাইন পরিস্থিতি সামাল দিতে উমাইরের প্লেটটা নিজের দিকে টেনে নিল। তারপর ইনশিরার দিকে না তাকিয়েই খুব ক্যাজুয়াল কিন্তু ঠান্ডা গলায় জাহির আর ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলল—
—”আসলে ও তো একদম অপরিচিত তাই একটু আনকমফোর্টেবল ফিল করছে। ঠিক হয়ে যাবে।”
বলেই উযাইন নিজে উমায়েরকে গল্প বলতে বলতে স্পুন দিয়ে খাইয়ে দিতে লাগল। বাবার মুখে গল্প শুনে উমায়ের আস্তে আস্তে ফ্রি হয়ে গেল এবং খেতে লাগল। পুরো টেবিলে আবার হাসির রোল উঠল।
কিন্তু ইনশিরা ডাইনিং টেবিলের এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দুটো জলে টলমল করছে, গলাটা কান্নায় বুজে আসছে। উযাইনের মুখের ওই একটা শব্দ তার বুকে তীরের মতো বিঁধেছে
‘অপরিচিত’! সে মনে মনে ডুকরে কেঁদে উঠে ভাবল—’আমি ওর জন্য অপরিচিতা? যার বুকে আমি মাথা রেখেছিলাম, যাকে আমি নিজের স্বামী মেনেছি, যার সন্তানকে আমি নিজের কোল দিয়েছি… আজ তাদের কাছেই আমি স্রেফ একজন অপরিচিতা?!’

ডিনারের পর ড্রয়িংরুমে সবার সাথে কথা বলার মাঝেই উযাইনের ফোনে একটা কল এল। সে কথা বলতে বলতে জাহিরদের অন্ধকার বারান্দাটার দিকে এগিয়ে গেল।
সুযোগটা হাতছাড়া করল না ইনশিরা। সে উযাইনের পেছন পেছন যাওয়ার আগে ডাইনিং রুমের আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিল। সে তার মেরুন শাড়ির আঁচলটা সুন্দর করে ভাঁজ করে কাঁধের ওপর তুলে পিন করে নিল। তারপর হাতের ক্লিপটা দিয়ে চুলগুলো উঁচু করে একটা আলগা খোঁপা বাঁধল—যার ফলে তার ফর্সা পিঠ আর কোমরের অংশটুকু উন্মুক্ত হয়ে উঠল।
উযাইন ফোনে কথা শেষ করে মাত্রই পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই ইনশিরা পেছন থেকে এসে দু-হাতে উযাইনের চওড়া পিঠ জড়িয়ে ধরল। উযাইন চমকে উঠল। এই চেনা সুবাস আর নরম ছোঁয়া চিনতে তার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। সে ছটফট করে নিজেকে ছাড়াতে চাইল, কিন্তু ইনশিরা নিজেই এক কদম পিছিয়ে গেল।
উযাইন যেমনই রাগী চোখে ঘোরার চেষ্টা করল, ইনশিরা আর তাকে সুযোগ না দিয়ে সরাসরি উযাইনের শক্ত বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে উযাইনের শার্টের কলারটা খামচে ধরে ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। ৩ বছর ধরে জমে থাকা সব কষ্ট যেন অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগল। উযাইনের বুকের ভেতর আবার সেই পরিচিত তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়ে গেল, তার শ্বাস ভারী হয়ে এল, হাত দুটো কাঁপতে লাগল।
ইনশিরা কান্নাভেজা মুখটা উযাইনের বুকের ওপর তুলে, ছলছল চোখে বলে—

—”উমায়ের আমাকে ভুলে গেছে উযাইন! ও তো আমাকে ‘আম্মু’ ডেকেছিল… আপনি কেন ওর মন থেকে আমার নামটা মুছে দিলেন?”
—’আমি প্রতিটা মুহূর্ত তোমায় বড্ড বেশি মিস করেছি লিটল বার্ড!’
তার তীব্র ইচ্ছে হলো ইনশিরাকে শক্ত করে নিজের বুকের ভেতর পিষে ফেলে কথা গুলো বলতে। ইনশিরার এই চোখভরা জল আর অভিমান দেখে উযাইনের ভেতর টা চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু তার ভেতরের সেই চিরশত্রু ‘অপরাধবোধ’ আবার দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। সে ইনশিরার কাঁধ ধরে নিজেকে সরাতে চাইল। উযাইন কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কঠোর করে—
—”ইনশিরা, তুমি উমাইরের কেউ না! ও তোমাকে ভুলে গেছে কারণ এটাই রিয়ালিটি। ওসব পুরোনো নাটক এখন বন্ধ করো। আগের মতো বাচ্চাদের মতো একগুঁয়েমি কোরো না। তুমি এখন বড় হয়েছ…”
ইনশিরা উযাইনের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে,
—”হ্যাঁ, বড় হয়েছি তো। এখন তো ১৯ বছর আমার। এবার কি তবে আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিবেন প্রফেসর সাহেব?”

—”Don’t be ridiculous, ইনশিরা! জেদ কোরো না। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। ওসব তখনো পসিবল ছিল না, এখনো পসিবল না!”
উযাইনের এই ‘অসম্ভব’ শব্দটা শুনে ইনশিরার ভেতরের জেদ যেন মাথায় চড়ে বসল। সে কোনো কথা না বলে হঠাৎ উযাইনের গলার দিকে এগিয়ে তার গলায় নিজের ঠোঁট জোড়া দিয়ে এক তীব্র চুমু খেল!
উযাইন যেন এক সেকেন্ডে পাথরের মতো জমে গেল! তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।
উযাইন কাঁপানো, নেশাতুর গলায়—
—”ইনশিরা… হোয়াট আর ইউ ডুইং…? ছাড়ো…!”
উযাইনের কথা শেষ হওয়ার আগেই ইনশিরা তার উন্মুক্ত গলায় আবার নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল এবং হুট করে উযাইনের অ্যাডামস অ্যাপল কাছে নিজের দাঁত দিয়ে এক তীব্র, কামড় বসিয়ে দিল!
উযাইন যন্ত্রণায় আর এক আদিম কামনার তীব্রতায় হালকা কুঁকড়ে উঠে, মুখে একটা চাপা শব্দ করল—
— ‘আহ’

সে নিজের সব আত্মনিয়ন্ত্রণ, সমাজের ভয়,গাম্ভীর্য সব এক সেকেন্ডে ভুলে গেল। নিজের অজান্তেই তার হাত দুটো ইনশিরার সেই উন্মুক্ত, মসৃণ কোমরের ওপর গিয়ে পড়ল এবং সে ইনশিরার কোমরটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় খামচে ধরল! সে যেন আনমনেই ইনশিরাকে কিছু টা কাছে টেনে নিল। ইনশিরা আরও কয়েকটা চুম দিল। সে উযাইনের ঠোঁট জোড়ার দিকে এগিয়ে আসে, উযাইনও অজান্তেই কিছু টা ঝুকে আসে তার নিজের হার্টবিটও তখন অস্বাভাবিক দ্রুত চলছিল। তীব্র এক নেশায়, ওদের ঠোঁটের দূরত্ব এক ইঞ্চিরও কম। উযাইনের ঘন নিঃশ্বাস ইনশিরার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে আছড়ে পড়ছিল। আরও এক চুল পরিমাণ এগিয়ে এলো, তাদের ঠোঁট জোড়া প্রায় ছুঁইছুঁই…
যখন তারা আরও গভীরে এগোতে যাবে… ঠিক তখনই লিভিং রুম থেকে উমাইরের গলার আওয়াজ ভেসে এল—
—”পাপা…! হোয়ার আর ইউ? চলো, বাড়ি যাব!”
উমাইরের ডাকে দুই জনেই যেন এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এল। তারা করে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে গেল। উযাইন বড় বড় করে শ্বাস নিতে নিতে, নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করে প্রায় দৌড়ে বারান্দা থেকে লিভিং রুমের দিকে চলে গেল। ইনশিরা বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ঠোঁট কামড়ে লজ্জায় আর ভালো লাগায় হাসতে লাগল।
উযাইন যখন উমাইরের হাত ধরে লিভিং রুমে এসে দাঁড়াল, তখন সে এখনো জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, তার চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে গেছে। জাহির উযাইনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হলেন।
জাহির উযাইনের গলার দিকে তাকিয়ে, ভ্রু কুঁচকে বলে—

—”কিরে উযাইন… তুই হুট করে কই গেলি?
—”তোর মেয়ের সাথে বাসর করতে গিয়েছিলাম, শয়তান শ্বশুর!”
উযাইন তখন নিজের মনে মনে চরম বিরক্ত আর সস্তি নিয়ে বলে, কিন্তু মুখে বলে—
—”কল এসেছিল ইউনিভার্সিটির অথরিটি থেকে”।
জাহির হটাৎ দেখল, আর সরল মনে উযাইন কে আবার প্রশ্ন করে—
— তোর গলার একপাশে ওটা কী রে? লাল হয়ে আছে কেন? কোনো পোকা-টাকা কামড় দিল নাকি রে? নাকি কোনো অ্যালার্জি হলো হঠাৎ?”
—”কোনো পোকা কামড়ায়নি। তোর ওই ডাইনি মেয়েটা কামড় বসিয়ে দিয়ে গেছে!”
এই কথা গুলো উযাইন মনে মনে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। তবে মুখে সে খুব ভদ্র সেজে, গলার কলারটা আরও একটু টেনে হাত দিয়ে ঢেকে বলল—
—”হ্যাঁ রে জাহির, মনে হয় বারান্দায় কোনো বিষাক্ত পোকা ছিল। হঠাৎ কামড়ে দিল। চলি রে, উমাইরের আবার সকালে স্কুল আছে, আজ আমরা আসি।”
বলেই উযাইন আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, জাহির আর ইরাকে বিদায় জানিয়ে উমায়েরকে নিয়ে প্রায় ঝড়ো গতিতে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

রাত প্রায় ২টা উমায়ের পড়ে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু উযাইন মিররের সামনে দাঁড়িয়ে। রুমের আবছা আলোতেও গলায় দাগ টা ঝলমলে উঠছে, এই প্রথম কোনো নারীর এমন ছোয়া, যে কি না তার সেই পিচ্ছি বউ টা, তার প্রেয়শী। উযাইন তার গলায় হাত দিয়ে লাভ বাইটের যায়গা টায় স্পর্শ করলো অজান্তেই মুচকি হেসে উঠে সে বুঝতে পারছে তার মন তার মস্তিষ্ক রুহ সব সেই নারী গ্রাস করেছে।
উযাইন বারান্দায় গেল, কেন জানি তার দম বন্ধ লাগছে, মাঝ রাতে Uk দেখতে ভালোই লাগে চার পাশে হাল্কা বাতাসের শা শা শব্দ, ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। কিছুদিন পরেই স্নো ফল শুরু হবে, বেশি সময় নেই। উযাইন আবার লাভ বাইট টা স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে উঠে—
—”প্রেয়সীর দেওয়া দাগ!!! উফফ আমার পিচ্ছি বউ টা এখন ওয়াইল্ড হয়ে গেছে। উযাইন তোর ধংস নিশ্চিত!!!”
আটত্রিশ বছর নিজেকে নারী কল্কক থেকে দূরে রাখা উযাইন আবরার হয়তো এবার আত্মসমর্পন করেই ফেলবে, প্রেয়সীর কাছে। সে আবার মুচকি হাসল, মনে পড়ল ওইদিন টা যেদিন প্রথম সে বিডিতে গিয়েছিল, অফিসিয়াল কাজে। এর আগে সে বিডিতে আসেনি কখনোই….

🔴 #ফ্ল্যাশব্যাক 🥀
ঢাকার এক মেঘলা সকাল। সকাল থেকেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর সাথে মৃদু বৃষ্টি। ইনশিরা ক্লাসরুমে জানলার পাশে বসে খাতার পাতায় আনমনে কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করছিল। সুদূর লন্ডন থেকে কেউ একজন বাংলাদেশে আসছে—এই খবরটা সে দিন দুয়েক আগে নিজের মা-বাবার মুখে শুনেছিল। শুধু তা-ই নয়, দাদির কাছে সে প্রায়শই শোনে যে ছোটবেলায় নাকি যখন লন্ডনে থাকতে ওই লোকটার জন্য এক্কেবারে পাগল ছিল, সারাক্ষণ তাকেই নিজের ‘বর’ বলে দাবি করত!
এমনকি ফুপি আর চাচুও সুযোগ পেলেই উযাইনের নাম নিয়ে ইনশিরাকে এখনো ব্যাপক ক্ষ্যাপায়। এই ১৬ বছর বয়সে এসে নিজের ছোটবেলার ওইসব অবুঝ পাগলামির কথা ভাবলে ইনশিরার এখন ভীষণ অকওয়ার্ড লাগে। সে ভাবছে—একটা মানুষ প্রথম বার বিডিতে আসছে বলে, বাড়ির সবাই কেন তাকে নিয়ে ওমন আদিখ্যেতা করছে!
সুমি ইনশিরার কানের কাছে মুখ এনে, চোখ টিপে বলল—
—”কী রে ইনশি? জানলার বাইরে তাকিয়ে কার কথা এত ভাবছিস রে? লন্ডন থেকে কে যেন আসছে শুনলাম তোদের বাসায়?”
শিফা পাশ থেকে হেসে বলে উঠে—

—”হ্যাঁ রে! সুমি একদম ঠিক বলেছে। আমাদের ইনশির মন আজকে ক্লাসে নেই, ও কোনো এক বিশেষ অতিথির চিন্তায় মগ্ন!”
ইনশিরা বান্ধবীদের এই রসিকতায় পাত্তা না দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,—
—”ধুর! তোরা একদম চুপ করবি? কোনো বিশেষ অতিথি না, বাবার এক পুরোনো বন্ধু আসছে ব্যস! তোরা সব কিছুতেই বেশি নাটক করিস।”
দেখতে দেখতে ঘড়িতে দুপুর ২টা বেজে গেল। কিন্তু ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ কমে আসার বদলে ঝমঝম করে তীব্র আকার ধারণ করল। তাড়াহুড়ো করে কলেজ ছুটি হয়ে গেলেও ইনশিরা আজ জেদ করে ছাতাটা আনল না। সুমি আর শিফা অন্য গাড়িতে চলে যাওয়ার পর ইনশিরা একা এয়ারপোর্ট রোডের এক কোণে দাঁড়িয়ে ভিজতে ভিজতে অনেক কষ্টে একটা খালি রিকশা পেল। কিন্তু ঝড়ের মতো বৃষ্টির কারণে কিছু দূর আসার পরই রিকশার চাকা ড্রেনে আটকে গেল। ইনশিরা নিরুপায় হয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়ল এবং বাকি কিছুটা পথ কনকনে ঠান্ডা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই হাঁটতে শুরু করল। মাঝে মধ্যে রাস্তার শেডের নিচে,আর দোকানের কোণে থেমেও সে শেষ রক্ষা করতে পারল না। পুরো ভিজে একসা হয়ে গেল।

ধকল সামলাতে সামলাতে ইনশিরা যখন বাড়ির গেটের সামনে এসে পৌঁছাল, ঘড়িতে তখন বিকেল প্রায় ৪টা বেজে গেছে। কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সে যেই নিজের বাড়ির সুদৃশ্য সবুজ বাগানের ঘাসের ওপর পা রাখল, বৃষ্টির কারণে কাদামাটি পিচ্ছিল হয়ে থাকায় ইনশিরা নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা পা পিছলে ধপাস করে খসখসে রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেল! তার হাতের কলেজ ব্যাগটা একদিকে ছিটকে গেল, আর ছিলে যাওয়া পা থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হতে লাগল।
ইনশিরা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে, কাঁদো কাঁদো স্বরে—
—”আব্বু…! আম্মু…! তোমরা কোথায়?”
বলতে বলতে কোনোমতে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মেইন দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
ওদিকে, উযাইন আজ সকালেই বাংলাদেশে এসে জাহিরদের বাসায় এসে উঠেছে । পুচকে উমায়েরও তার সাথে এসেছে এবং সে ওপরের গেস্ট রুমে ঘুমাচ্ছে। উযাইন উমাইরের ওষুধের জন্য কিচেন থেকে একটা মগে করে গরম পানি নিয়ে ড্রয়িংরুম দিয়ে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটা মেয়ের আর্তনাদ আর ডাক শুনে উযাইনের পা দুটো মাঝপথেই থমকে গেল। সে হাতের মগটা শক্ত করে ধরে কৌতূহল ও বিস্ময় নিয়ে মেইন দরজার দিকে তাকাল।
একটা কিশোরী মেয়ে ভেতরে আসছে,কলেজ ড্রেসটা পুরো ভিজে কাদা দিয়ে এক্কেবারে মাখামাখি হয়ে আছে। একহাতে তার কলেজ ব্যাগটা কোনোমতে ঝুলছে, আর তার পা বেয়ে লাল টকটকে রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় ফ্লোরের ঝরে পড়ছে!

উযাইন নিজের হাতের মগটা টেবিলের ওপর রেখে ধীর পায়ে ওদিকে দু-পা এগিয়ে গেল।তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত কিশোরী মেয়েটাই হলো তার সেই “লিটল বার্ড”
সেই ৫ বছরের পুচকে ইনশিরা, যে তার গলায় কামড় বসিয়েছিল , সে আজ ১৬ বছরের এক ডানা কাটা পরীর মতো তরুণীতে রূপ নিয়েছে—যদিও এই মুহূর্তে তার রূপ কাদা আর রক্তে বিধ্বস্ত! উযাইনের বুকের ভেতর এক অজানা অধিকারবোধের ঝড় আছড়ে পড়ল।
উযাইন আর এক মুহূর্তও নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না। সে হাতের মগটা টেবিলের ওপর রেখেই অত্যন্ত চিন্তিত মুখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইনশিরার একদম সামনে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ইনশিরার রক্তাক্ত পায়ের দিকে তাকিয়ে, অত্যন্ত আকুল ও নরম গলায় বলল—

—”আরেহ… লিটল বার্ড! এ কী অবস্থা করেছ নিজের? ব্যথা পেলে কীভাবে? এত ব্লিডিং হচ্ছে?!”
সম্পূর্ণ অপরিচিত, অসম্ভব সুদর্শন আর তীব্র রাজকীয় পার্সোনালিটির এক পুরুষ হুট করে নিজের সামনে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসছে তা দেখে ইনশিরা আক্ষরিক অর্থেই এক বড়সড় টাসকি খেল! সে তীব্র বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল, কারণ সে লোকটাকে বিন্দুমাত্র চিনতেই পারল না।
উযাইন ইনশিরার কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে চট করে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়াল। ওর হাতটা নিজের শক্ত বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় জড়িয়ে ধরে ওকে আলতো করে টেনে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফার ওপর বসিয়ে দিল। ইনশিরা সোফায় বসেও হা করে পাথরের মতো অচেনা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
উযাইন চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে, খুব চিন্তিত ও কড়া গলায় বলল—

—”ইনশিরা! তোমাদের ফার্স্ট এইড বক্সটা কোথায় রাখা আছে?
ইনশিরা তখনো ঘোরের মধ্যে ডুব দিয়ে সম্পূর্ণ চুপ করে রইল। উযাইন আবার একটু কড়া গলায় ওর নাম ধরে ডাকতেই ইনশিরা ধড়ফড়িয়ে বাস্তবে ফিরে এলো। সে চরম আমতা আমতা করে, কাঁপানো গলায় বলল—

রুহ এ ইশক পর্ব ১০

—”ওটা…ওটা ওই ক…কর্নারের ড্র…ড্রয়ারে আছে…”
উযাইন দ্রুত ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে এলো,এবং বক্স খুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে তুলো আর এন্টিসেপ্টিক ওষুধ বের করতে লাগল।
[ If their hearts are bound by the Rooh, age is just a number]

রুহ এ ইশক পর্ব ১২