Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১২

রুহ এ ইশক পর্ব ১২

রুহ এ ইশক পর্ব ১২
আনান রোজ

উযাইন ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে কোনো রকম দ্বিধা সংকোচ ছাড়াই, খুব সাবধানে ইনশিরার কাদা আর রক্তে ভেজা ফরসা পা-টা তুলে নিজের হাঁটুর ওপর রাখল। ইনশিরার শরীরটা যেন লজ্জায় আর এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল।
ইনশিরা সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে, তখনো স্তব্ধ হয়েই অচেনা লোকটার এই অতি-আদুরে ও প্রটেক্টিভ রূপটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। উযাইনের পরনে তখন একটা শুভ্র, সাদা রঙের লুজ টিশার্ট। টিশার্টের আলগা নেক আর স্লিভসের ফাঁক দিয়ে উযাইনের কালো রঙের ট্যাটুটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল—যা তার পুরুষালী আকর্ষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইনশিরা আরও খেয়াল করল, লোকটার চোখে চোখের মণি জোড়া সাধারণ কালো বা ব্রাউন নয়, বরং বিরল এক মায়াবী নীলচে রঙের আভা—যাকে আইস ব্লু চোখ বলা চলে! লোকটাকে দেখতে একদমই বাঙালি মনে না হলেও, সে যে এক্কেবারে স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলছে।
এদিকে উযাইন খুব আলতো করে, ইনশিরার পায়ের রূপোর নূপুরটা খুলে ফ্লোরের কার্পেটের ওপর রাখল—যাতে ওষুধ লাগাতে সুবিধা হয়। সে তুলোয় এন্টিসেপ্টিক নিয়ে ইনশিরার ছিলে যাওয়া রক্তাক্ত ক্ষতের ওপর ছোঁয়াতেই ইনশিরা ব্যথায় একটু কঁকিয়ে উঠল। উযাইন সাথে সাথে ইনশিরার পায়ের ওপর নিজের মুখটা ঝুঁকিয়ে নিয়ে, হাল্কা ফুঁ দিতে দিতে ওষুধটা লাগাতে লাগল। উযাইন খুব আদুরে ও নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—

—”ব্যথা পেলে কী করে? একটা ছাতা পর্যন্ত আনোনি কলেজ থেকে? পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলে?”
ইনশিরা কোনো জবাব দিল না, সে এক অপার্থিব মোহের মধ্যে তলিয়ে গেছে। উযাইন ইনশিরার এই গভীর নীরবতা দেখে আলতো করে নিজের মুখটা ওপরের দিকে তুলল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ইনশিরার ডাগর চোখ জোড়া সরাসরি গিয়ে নিবদ্ধ হলো উযাইনের সেই মায়াবী আইস ব্লু চোখের একদম ভেতর!
দুজনের চোখ এক হওয়ামাত্রই ড্রয়িংরুমের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস যেন এক সেকেন্ডে উধাও হয়ে গেল। ইনশিরার উযাইনের ওই শান্ত অথচ তীব্র গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো—যেন এক বিশাল নীল আকাশ আর অনন্ত গভীর সমুদ্র একসাথে এসে এই পুরুষটার চোখের মাঝে মিশে গেছে!
এই প্রথম দেখাতেই ইনশিরার কিশোরী মন এই আইস ব্লু চোখের মায়ায় চিরকালের জন্য আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি হয়ে গেল, যা সে তখনই বুঝতে পারেনি।
উযাইন আবার বলল—

—”কিভাবে ব্যাথা পেয়েছ? এত কেয়ারলেস কেন তুমি?”
—”বা…বাগানে হটাৎ পা পিছলে পর…পরে গিয়…গিয়েছিলাম।”
অনেক কষ্টে ইনশিরা এই টুকুনি কথা বলল। লোকটার এই হাল্কা রাগ আর বকুনি কেন যেন তার ভালো লাগলো। অন্য কেউ হলে হয়তো একচুলও ছার দিত না ইনশিরা।
উযাইন ওর পায়ে ব্যান্ডেজ বেধে দিচ্ছিল। ইনশিরা ভাবলো কিছু জিজ্ঞেস করা যাক—
—”আ…আপনি কে? আর আমাদের বাসায় এভাবে….”
—”ও উযাইন, তোর আংকেল। জাহিরের বন্ধু, লন্ডন থেকে আসছে।”
উযাইন কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে, এই কথা গুলো বলতে বলতে এগিয়ে আসে ইনশিরার দাদি। ইনশিরা একবার দাদির দিকে তাকিয়ে আবার উযাইনের দিকে তাকালো। ততক্ষনে ব্যান্ডেজ করা হয়েগেছে। সে নিজের পা টা সরিয়ে উঠে দাড়ালো, দাদি এসে ওর হাত টা ধরে, আর বলে—
—”কিভাবে ব্যাথা পেলি? চল রুমে দিয়ে আসি। আর উযাইন তুমি রুমে গিয়ে রেস্ট নাও।”
বলে দাদি ইনশিরা কে নিয়ে এগিয়ে গেল, ইনশিরা আবার একপলক তাকাল, উযাইন ফাস্ট এইড বক্সটা লাগাচ্ছে। ইনশিরা আপন মনে ভাবল, এত সুদর্শন পুরুষ আবার আংকেল হয়।
ওদিকে উযাইন খেয়াল করল, ইনশিরার নুপুর টা ফ্লোরেই রয়েগেছে, সে ডাক দেওয়ার জন্য সামনে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই, তারা চলে গেছে। সে আবার নিচু হয়ে নুপুর টা তুলে নিল। নুপুর টায় ইনশিরার পায়ের রক্ত হাল্কা লেগে আছে….

🔴[#বর্তমান_লন্ডন ]🥀
পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে প্রফেসর উযাইন আবরার যখন পা রাখল, চারপাশের ছাত্রীদের নজর যেন তার ওপর গিয়েই আটকে গেল। আজকেও তার সেই পরিচিত আগুন লাগানো স্টাইল —ওল্ফ কাট চুলগুলো কপালে আর ঘাড়ে কিছুটা এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে আছে, পরনে একটা হাই নেক উলেন সোয়েটার যার ফলে তার অ্যাডামস অ্যাপলের পাশে দাগ টা ঢেকে আছে। হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। তবে গলার আর হাতের উন্মুক্ত অংশ দিয়ে তার ট্যাটুর একাংশ উঁকি দিচ্ছে।
উযাইন ক্লাসরুমে ঢুকে ডেস্কে ল্যাপটপটা রাখল। তার তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া এক সেকেন্ডের জন্য প্রথম বেঞ্চের মাঝখানে বসা ইনশিরার ওপর গিয়ে থমকে গেল। ইনশিরা ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল। উযাইন চট করে চোখ সরিয়ে পুরো ক্লাসের উদ্দেশ্যে খুব চমৎকার ও
গম্ভীর ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে কথা বলে উঠল।

—”Good morning, everyone. So students, today we will do a quick and interesting activity. আমি তোমাদের জীবনের লক্ষ্য টা খুব সংক্ষেপ এ জানতে চাই।
Write down just two or three lines about, যে তুমি নিজেকে নেক্সট পাচ বছরের কোথায় দেখতে চাও, তোমার গ্রেজুয়েশনের পর, লিখে আমাকে দেখাও And yes, যারা ইন্টারেস্টেড না, তারা অবশ্যই স্কিপ করতে পারো।
উযাইনের কথা শুনে ক্লাসের অনেকেই খুব মন দিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে খাতায় লিখতে শুরু করল। ইনশিরাও আর দেরি করল না। সে কলমটা হাতে নিয়ে খাতায় খুব সুন্দর করে গোটা গোটা অক্ষরে নিজের ভবিষ্যৎ লিখে ফেলল—
—পরবর্তী ৫ বছর না, আজ থেকে সারা জীবন….

I want to see myself in your bed, আর সাথে অনেকগুলো বেবি।
কিছুক্ষণ পর একে একে সব স্টুডেন্টরা তাদের খাতা নিয়ে প্রফেসরের ডেস্কে এসে দেখাতে লাগল। উযাইন খুব পেশাদার শিক্ষকের মতো সবার খাতা দেখে চমৎকার রিভিউ ও প্রশংসা করছিল। অবশেষে লাইনের শেষ মাথায় এসে দাঁড়াল ইনশিরা। সে তার খাতাটা উযাইনের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।
উযাইন ইনশিরার খাতার ওই বোল্ড লাইনগুলোর ওপর চোখ রাখামাত্রই তার মুখের কথা মাঝপথেই আটকে গেল! তার কানের দুপাশ দিয়ে যেন একঝাঁক গরম হাওয়া বয়ে গেল, হাতের কলমটা কেপে উঠে উঠে হালকা । এই মেয়ে এত বড় কথা ক্লাসের খাতায় লিখে এনেছে?
উযাইন চশমাটা ঠিক করে ইনশিরার দিকে তাকাল। ইনশিরার চোখে এক চরম উস্কানিমূলক বিজয়ের হাসি।
উযাইন নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে কলমটা চেপে ধরল। সে ইনশিরার খাতার লেখাটার ঠিক নিচেই খুব ধারালো হাতের লেখায় লিখে দিল—

—”Really? এত বেবি নিলে তো, তুমি খালি পেটে থাকারই সময় পাবে না?
ইনশিরা খাতাটা হাতে নিয়ে উযাইনের সেই লেখাটা পড়ামাত্রই থতমত খেল, ‘খালি পেটে’ কথার মানে টা বুঝতে পারল।
সে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে বসল। কিন্তু তার দুষ্টুমি তখনও শেষ হয়নি। সে বেঞ্চের নিচ থেকে নিজের ফোনটা বের করে খটখট করে উযাইনের নাম্বারে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল।
—”উমায়ের তো আছেই আরো অনেক গুলো বেবি নিব,আমরা। প্রফেসর সাহেব!”
পকেটে ফোন ভাইব্রেট করতেই উযাইন আড়চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মেসেজটা দেখল এবং তার বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় তোলপাড় হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল—বাহ! এই মেয়েটা এই ৩ বছরে সত্যিই অনেক বদলে গেছে! আগের সেই ১৬ বছরের ভয়ার্ত বাচ্চা মেয়েটা এখন পুরো বাঘিনী হয়ে উঠেছে! একে সোজা করতে হলে এবার ডিরেক্ট হিট করতে হবে।
উযাইন পকেটে হাত গুঁজে টাইপিং প্যাড চেপে এক চরম বোল্ড পাল্টা মেসেজ টাইপ করে ইনশিরাকে সেন্ট করে দিল।

—”বেবির জন্য হাজব্যান্ড-ওয়াইফকে যে ‘হার্ডওয়ার্ক’ করতে হয়, সেটা জানো?? হার্ডওয়ার্ক প্রতিদিন করতে হবে । এনি টাইম এনি হোয়ার!!
মেসেজটা স্ক্রিনে দেখামাত্রই ইনশিরা এক নিমেষে চরম থতমত খেয়ে গেল! তার ফর্সা গাল আর কান লজ্জায় এক সেকেন্ডে টকটকে লাল হয়ে উঠল। উযাইনের এইরকম পাল্টা অ্যাটাক সে আশা করেনি। সে একটা শুকনো ঢোক গিলে তাড়াহুড়ো করে ফোনটা ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রেখে মাথা নিচু করে বসে রইল।
উযাইন ডেস্কে দাঁড়িয়ে ইনশিরার এই ভয়ার্ত আর লজ্জাবনত চেহারা দেখে নিজের মনের ভেতরের চওড়া জয়ী হাসিটা আড়াল করল। তারপর ক্লাস শেষ করে গম্ভীর মুখে ক্লাস থেকে বেরিয়ে সোজা করিডোর দিয়ে নিজের পার্সোনাল কেবিনের দিকে রওনা হলো।
উযাইন নিজের কেবিনে ঢুকেই তার অফিশিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টকে ডেকে পাঠাল। সে অ্যাসিস্ট্যান্টকে খুব ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল—
—”ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট ইনশিরা কায়নাতকে এখনই আমার কেবিনে নিয়ে এসো।”
মিনিট পাঁচেক পর অ্যাসিস্ট্যান্ট চলে গেল এবং ইনশিরা খুব ধীর পায়ে উযাইনের কেবিনের ভেতর এসে ঢুকল। ইনশিরা আসতেই উযাইন অ্যাসিস্ট্যান্টকে বাইরে পাঠিয়ে কেবিনের ভারী কাঠের দরজাটা লক করে দিল।
উযাইন রাগে আর তীব্র আকর্ষণে ফুঁসতে ফুঁসতে। সে তার সোয়েটারের নেক টা একহাতে সামান্য নামিয়ে নিজের গলার সেই লাল হয়ে থাকা কামড়ের দাগটা দেখাল ইনশিরাকে। উযাইন খুব নিচু কিন্তু তীব্র ও কড়া গলায় ইনশিরাকে বলে—

—”Don’t play games with me, ইনশিরা! কাল রাতে বারান্দার পাগলামির মানে কী? How dare you bite me? তুমি জানো আজ সকালে ইউনিভার্সিটিতে আসার পর থেকে এই দাগটা লুকাতে আমার কতটা প্রব্লেম ফেস করতে হয়েছে?”
ইনশিরা কেবিনের দরজা লক দেখে শুরুতে একটু থতমত খেয়েছিল, কিন্তু উযাইনের এই রাগী চেহারা দেখে তার ভেতরের একগুঁয়েমি আবার চাড়া দিয়ে উঠল। সে ভয় পাওয়ার বদলে উযাইনের কাছে প্রফেশনাল টেবিলটার ওপর নিজের দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে এল। তার চোখ জোড়া উযাইনের খুব কাছাকাছি।
ইনশিরা একটু ঘাড় ত্যাড়া করে, দুষ্টুমি ভরা মায়াবী গলায়—
—”নিজের বউ কামড়েছে, তাতে প্রফেসরের এত রাগ কেন, শুনি? আর আপনি যে আমাকে তিন বছর আগে বারান্দায় চুমু খাচ্ছিলেন আমি তো শ্বাস নিতেও পারছিলাম না…
উযাইন চুপ করে গেল, ভাবল মেয়ে টা ভুলেনি ওই রাত টা? সেও তো ভুলতে পারেনি তার তো এখনও মনে হয় ইনশিরার ঠোঁটের স্পর্শ তার ঠোঁটে লেগে আছে, পয়ত্রিশ বছরের জীবনে ওই দিনই প্রথম কোনো নারী গভীর সংস্পর্শে এসেছিল সে।

—”ইনশিরা তুমি…..”
—”আর আমি তো কোনো গেম খেলছি না উযাইন সাহেব, আমি তো স্রেফ আমার অধিকার আদায় করতে এসেছি।”
ইনশিরার এত কাছ থেকে আসা নিশ্বাস এবং তার সেই চেনা বুনো ফুলের সুবাস কেবিনের এসি-র ঠান্ডা বাতাসকেও এক মুহূর্তে তপ্ত করে তুলল। উযাইনের পুরুষালি কন্ট্রোল আবার ভাঙতে চাইল, তার হাত দুটো নিশপিশ করছিল ইনশিরার কোমরটা আবার কাল রাতের মতো শক্ত করে খামচে ধরতে। সে নিজেকে শক্ত করার জন্য টেবিলটা একহাতে চেপে ধরল। সে দ্রুত নজর সরিয়ে—
—”ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিটস ইনশিরা,ভুলে যেওনা আমি কে। নাউ ইউ ক্যান গো”
—”ওকে প্রফেসর থক্কু হাজবেন্ড!!”
বলে ইনশিরা বেড়িয়ে গেল। এদিকে উযাইন হা হয়ে তাকিয়ে আছে, এই মেয়ে কি তাকে মেরে ফেলার জন্য এমন করছে? সে কি বুঝতে পারে না যে তার এমন করাতে উযাইন বেসামাল হয়ে যায়?

সেদিন পরন্ত বিকালবেলায়।
ইনশিরা নিজে হাতে একটা চকোলেট কেক বানিয়ে পাশের বাড়ি অর্থাৎ উযাইনদের বাসায় হাজির হলো। সে আজ একটা আরামদায়ক লুজ ওভার সাইজড শার্ট আর ক্যাজুয়াল ব্যাগি জিন্স পরে এসেছিল। দরজা খুলতেই সামনে এলো উমায়ের, সে ইনশিরাকে দেখে প্রথমে মুখ কুচকে নিল, কিন্তু ইনশিরা একগাল হেসে, হাঁটু গেড়ে বসে—
—”হ্যালো লিটল বয়! দেখো, তোমার জন্য কী এনেছি? তোমার প্রিয় চকোলেট কেক!”
—”Wow! Chocolate cake? You are the best! চলো চলো, ভেতরে এসো!”
উমায়ের চকোলেট কেক দেখে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল, পরে ওরা বাসার ভেতর যায় । ওরা যখন লিভিং রুমের কার্পেটে বসে হাসিগল্প করতে করতে কেক কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই উযাইন শাওয়ার নিয়ে একটা কালো ট্রাউজার পরে, খালি গায়ে লিভিং রুমে এসে ঢুকল। সুগঠিত শরীর আর এক হাত জুড়ে বেয়ে উঠা কাধ আর গলা পর্যন্ত সেই বুনো ট্যাটুটা দেখে ইনশিরা সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে হা করে তাকিয়ে রইল। আগে কখনো উযাইন কে এভাবে দেখেনি সে যার ফলে সম্পুর্ন ট্যাটুটাও দেখেনি।
উযাইনের এই পুরুষালি বন্য রূপ দেখে ইনশিরার নিজের ভেতরের হৃৎস্পন্দন যেন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেল।
উযাইন ইনশিরাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে চরম অস্বস্তিতে পড়ল।সে ভ্রু কুঁচকে, কড়া গলায়—

—”তুমি এখানে কী করছ ইনশিরা? ইউনিতে বারণ করার পরও আবার, এখানে এসেছ কেন?”
—”পাপা! দেখ, ইনশিরা আমার জন্য কেক এনেছে! বকবে না একদম, চলো কেক কাটি!”
উমায়ের বাবার দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠল আর বলল। উযাইন উমাইরের সামনে আর কোনো সিন ক্রিয়েট করতে চাইল না। সে রাগী চোখে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে দ্রুত নিজের বেডরুমে গিয়ে একটা কালো রঙের টিশার্ট পরে ফিরে এলো।
এরপর তিনজনে মিলে কেক কাটল। ইনশিরা নিজ হাতে উমায়েরকে কেক খাইয়ে দিল, আর উমায়েরও খুব তৃপ্তি করে খেয়ে বলল
— “It’s so yummy!”
ইনশিরা উযাইনের দিকেও কেকের প্লেট বাড়িয়ে দিল। উযাইন মুখে কিছু না বললেও এক টুকরো মুখে নিয়ে মনে মনে ইনশিরার রান্নার প্রশংসা না করে পারল না।
কেক খাওয়ার পর শুরু হলো আসল পাগলামি। উমায়ের বায়না ধরল সে ইনশিরার সাথে হাইড-অ্যান্ড-সিক খেলবে। ৩ বছর আগের সেই ‘আম্মু’র চেনা মায়ার জাদুতে সে খুব দ্রুত ইনশিরার সাথে মিশে গেল। পুরো বাড়ি জুড়ে শুরু হলো লাফালাফি, বালিশ ছোঁরাছুঁরি আর চিৎকারের রোল।
ইনশিরা সোফার আড়ালে লুকিয়ে উমায়েরকে ডেকে

—”উমায়ের! আমি এখানে! ধরতে পারলে আইসক্রিম দেব!”
—”আই উইল ক্যাচ ইউ! পাপা, তুমি ইনশিরাকে ওপাশ থেকে আটকাও!”
উমায়ের চিৎকার করে দৌড়াতে দৌড়াতে উযাইন কে বলে। উযাইনও একপর্যায়ে যেন নিজের বয়স ভুলে ওদের এই খেলায় মেতে উঠল। সোফার আড়ালে, পর্দার পেছনে লুকানোর এই পাগলামির মাঝেই শুরু হলো আসল মনস্তাত্ত্বিক ঝড়। খেলার ছলে তারা বেশ কয়েকবার একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এলো।
একবার উমায়ের একটা বড় সোফা বালিশ ছুড়ে মারতেই ইনশিরা হাসতে হাসতে চিৎকার করে উঠল
— “ওরে বাবা! বাঁচাও!”
সে ভারসাম্য হারিয়ে পেছনের দিকে পড়ে যেতে নিলেই উযাইন—
—’ইনশিরা!’
বলে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে ওকে খপ করে জড়িয়ে ধরে ফেলল। উযাইনের হাত দুটো ইনশিরার শার্টের ওপর দিয়ে তার শরীরের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় গিয়ে চেপে বসল।
পাতলা কাপড়ের নিচ থেকে ইনশিরার শরীরের সেই তীব্র, অনাবৃত উষ্ণতা উযাইনের হাতের তালুতে সরাসরি এসে বিঁধল। উযাইন এক সেকেন্ডে আবিষ্কার করল—ইনশিরা ভেতরে কোনো ইনার পরেনি!
সে চরম অপ্রস্তুত ও লজ্জিত হয়ে এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিল। তার নিজের কানের দুপাশ দিয়ে তখন যেন লাভা ছুটছে।
কিন্তু ইনশিরা খেলায় এতটাই মগ্ন আর অবুজ ছিল যে সে এই ছোঁয়াটার গভীরতা বা উযাইনের হাত সরিয়ে নেওয়াটার পেছনের কারণটা একদমই খেয়াল করল না! সে আবার উমায়েরের সাথে মেতে উঠে। উমায়ের আবার হেসে উঠে বলল

রুহ এ ইশক পর্ব ১১

— “পাপা, তুমি চিটিং করে আমাকে আটকে দিলে কেন? ইনশিরা তো আমাকে ছুঁয়ে ফেলল!”
ওদের খেলা আবার শুরু হলো। কিন্তু উযাইনের মন তখন সম্পূর্ণ বেসামাল। পরবর্তী কয়েক মিনিটে আরও দু-একবার লুকানো আর ছুটাছুটির তাড়াহুড়োয় উযাইনের হাত বা শরীর ইনশিরার ওই ইনারলেস অংশে এসে ধাক্কা খেল। প্রতিবারই উযাইনের শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র নিষিদ্ধ বৈদ্যুতিক শকের মতো শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল, তার পুরো শরীর অবশ হয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু প্রতিবারই ইনশিরা একদম অবুঝের মতো হাসতে হাসতে চিৎকার করে উমায়েরের দিকে দৌড়ে পালাচ্ছিল, সে বিন্দুমাত্র টের পাচ্ছিল না যে তার এই লুজ শার্টের কাহিনিটা এই পুরুষটিকে কতটা উন্মাদের মতো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে…

রুহ এ ইশক পর্ব ১৩