Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ১

রুহ এ ইশক পর্ব ১

রুহ এ ইশক পর্ব ১
আনান রোজ

“দেখো ইনশিরা, তোমাকে বারবার বলছি, এটা সম্ভব না! আমি তোমার বাবার বন্ধু হই সমাজ এই সম্পর্ক কোনোদিন মেনে নেবে না,তুমি কেন বুঝতে পারছ না? আজ ১৫ দিন হয়ে গেল। আর আজ যেটাকে তুমি ভালোবাসা বলছ, সেটা হয়তো তোমার ক্ষণিকের মোহ। বয়স বাড়লে এই আবেগ কেটে যাবে…”
উযাইন কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব শক্ত করে, যেন নিজের মনকেই বোঝাচ্ছে…
গোধূলির আলো পড়ে আসছে। বাগানের এক কোণে ইনশিরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে একটা সাধারণ কামিজ, কিন্তু ১৬ বছর বয়সের তারুণ্য আর চোখের ভেতরের জেদ তাকে অন্যরকম এক মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে। তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে উযাইন, উযাইন আবরার—লম্বা, চওড়া কাঁধ, এবং মুখে এক ধরণের কঠোর গাম্ভীর্য, যা আসলে তার ভেতরের দুর্বলতাকে আড়াল করার একটা ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

—”কিচ্ছু হবে না। সমাজ কী বলল তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমার শুধু আপনি হলেই চলবে, উযাইন সাহ…”
ইনশিরা ধীরে ধীরে মাথা তোলে, তার ডাগর চোখ দুটো অশ্রুতে ছলছল করছে, কিন্তু সেখানে কোনো দ্বিধা নেই। সে সরাসরি উযাইনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
ইনশিরার এই সরল কিন্তু ধারালো স্বীকারোক্তি উযাইনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। ইনশিরার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে উযাইনের মনে হলো তার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। নিজের অজান্তেই তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। তার তীব্র ইচ্ছে করছিল এই মুহূর্তে সব সামাজিক বাধা ভুলে ইনশিরাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে,

—’আমিও কোনো কিছুর পরোয়া করি না, ইনশিরা!’
কিন্তু তার ভেতরের অপরাধবোধ, নিজের অতীত
এবং বন্ধুর প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে এক পা-ও এগোতে দিল না। সে নিজের ওপর নিজেই লজ্জিত বোধ করল।
ঠিক তখনই বাগানের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল একটা কান্নার আওয়াজ। উমায়েরকে কোলে নিয়ে বাগানের দিকে হেঁটে আসছেন ইনশিরার দাদি। উমায়ের চোখ ডলতে ডলতে কাঁদছে।
দাদির গলার আওয়াজ পেতেই উযাইন ও ইনশিরা দুজনেই ঝটপট নিজেদের সামলে নিল। ইনশিরা ওড়নার কোণা দিয়ে দ্রুত চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
উমায়ের চোখ ডলতে ডলতে কাঁদছিল, কিন্তু দাদির কোল থেকে ইনশিরা যখনই ওকে নিজের কোলে তুলে নিল, উমায়েরের কান্না যেন ম্যাজিকের মতো থেমে গেল। সে ইনশিরার কাঁধে মাথা রেখে ছোট ছোট দুটো হাত দিয়ে ইনশিরার গলা জড়িয়ে ধরল। গত ৫-৬ মাসে, উমায়ের এই বাড়িতে এসে ইনশিরার ওপর এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, ইনশিরার কোল মানেই তার কাছে পরম শান্তির জায়গা।
দাদি উযাইনের দিকে তাকিয়ে

—”আরে উযাইন, তুমি এখানে? জাহির তোমাকে ড্রয়িংরুমে খুঁজছে। কী যেন জরুরি দরকার। যাও, ওর কাছে যাও।”
—”আচ্ছা আন্টি, আমি যাচ্ছি।”
উযাইন মাথা নেড়ে বলে। সে একবার আড়চোখে ইনশিরার দিকে তাকাল। ইনশিরা উমায়েরকে কোলে নিয়ে বাগানের অন্য পথ দিয়ে চলে গেল। উযাইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে জাহির আর উযাইন একসাথে বসে পুরোনো দিনের গল্প আর ব্যবসার কাজে মেতে উঠল। কিন্তু উযাইনের মন পড়ে রইল বাগানের সেই কান্নভেজা দুটি চোখে।
দুপুরের খাওয়ার সময় পুরো পরিবার একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। ইনশিরার বাবা জাহির, মা ইরা, চাচা-চাচি এবং সবার ছোট ফুফু রাইমা।
গত ১৫ দিন ধরে ইনশিরার মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। সে নিজ দায়িত্বে রান্নাবান্না তদারকি করছে, টেবিল সাজাচ্ছে। তার হাঁটাচলা,ঘর গোছানোর মধ্যে একটা নিখুঁত ‘বউ বউ ভাব’ ফুটে উঠেছে। পরিবারের বাকিরা এটাকে বড় হয়ে ওঠার লক্ষণ ভাবলেও, উযাইনের তীক্ষ্ণ চোখ ঠিকই এর পেছনের আসল কারণটা ধরতে পারছে।

এই ছোট মেয়েটি যে মনেপ্রাণে নিজেকে উযাইনের স্ত্রী মেনে নিয়েছে, তা ভেবে উযাইনের ভেতরে এক তীব্র মাদকতা আর ভয় একসাথে কাজ করতে লাগল।
ইনশিরা টেবিলে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল। উযাইনের প্লেটের সামনে আসতেই তার হাত দুটি আলতো করে কাঁপল। সে অত্যন্ত স্বযত্নে, উযাইনের পছন্দের পদগুলো বেছে বেছে তার প্লেটে তুলে দিল। উযাইন মুখে কিছু না বললেও ইনশিরার এই যত্ন তার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিল। সবাইকে দেওয়া শেষ করে ইনশিরা নিজেও এক কোণে খেতে বসল।
টেবিলে তখন হাসিগল্পের রোল উঠেছে। হঠাৎ দাদি এক গাল হেসে পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিলেন।

—”তোমাদের মনে আছে? আমরা যখন লন্ডনে একসাথে থাকতাম, এই ইনশিরা তখন উযাইনের জন্য একেবারে পাগল ছিল! সারাদিন উযাইনের পেছনে পেছনে ঘুরত। তখন তো ঠিকমতো কথাও ফুটেনি, আধো আধো গলায় সবাইকে বলত—’উযাইন আমার বর!”
দাদির এই কথা শুনে তরকারি মুখে তুলতে যাওয়া উযাইন এমন চমকে উঠল যে তার গলায় মারাত্মকভাবে খাবার আটকে গেল। সে জোরে জোরে কাশতে শুরু করল !
রাইমা তাড়াতাড়ি উযাইনের দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে, একটু হেসে
—”আরে উযাইন ভাই, আস্তে! মা তো পুরোনো মজার কথা বলছে। তা অবশ্য ইনশিরার পছন্দ কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বেশ জহুরি ছিল বলতে হবে!”
বাকি সবাই রাইমা আর দাদির কথার সাথে তাল মিলিয়ে হেসে উঠল। পুরো টেবিলে যখন হাসাহাসি চলছে, ইনশিরার ফর্সা মুখটা তখন লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। সে লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল, কিন্তু তার চোখ দুটো আর তর সইলো না। সে আড়চোখে বারবার উযাইনের দিকে তাকাতে লাগল—দেখার জন্য যে তার “বর” এই কথা শুনে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। উযাইন পানি খেয়ে নিজেকে সামলে নিলেও ইনশিরার সেই চোর-চাউনি দেখে তার বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
উযাইনের কাশির রেশ কাটতে না কাটতেই দাদির কথার পিঠে ইনশিরার চাচা একগাল হেসে তাল মেলালেন।
ইনশিরার চাচা উযাইনের পিঠ চাপড়ে বলে,

—”আরে হ্যাঁ মা, আমারও একদম পরিষ্কার মনে আছে! ইনশিরা তখন এতটুকু। উযাইন উইনি থেকে ফিরলেই ও বায়না ধরত ওর বর এসেছে। ও নাকি বড় হয়ে এই উযাইনকেই বিয়ে করবে! উযাইন ছাড়া আর কাউকে ও চেনে না। এমনকি একদিন তো ও…”
চাচার কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ টেবিলের পরিবেশ কিছুটা থমকে গেল। রাইমা চামচটা প্লেটে হাল্কা জোরেই নামিয়ে রাখল। তার মুখভঙ্গি বিরক্তিতে কুঁচকে গেছে।বেশ কড়া গলায়
—”উফ, ওসব ছোটবেলার ফালতু কথা এখন বাদ দাও তো! গত ৫-৬ মাস ধরে উযাইন ভাই এ দেশে আসার পর থেকে তোমরা সবাই এই একই কথা শুরু করেছ। তখন ইনশিরা ছোট ছিল, অবুঝ ছিল। এখন ও বড় হয়েছে। ছোটবেলার এসব আদিখ্যেতা করতে হয়?
রাইমার গলার এই তীব্র বিরক্তি আর ঝাঁঝালো কথা শুনে টেবিলের বাকিরা এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। ইনশিরার বাবা জাহির আর চাচা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটু হাসলেন। তারা ভালো করেই জানেন—রাইমা উযাইনকে মনে মনে কতটা পছন্দ করে। তাই উযাইনের সাথে ইনশিরার ছোটবেলার এই নিষ্পাপ গল্প শুনলেই রাইমার ভেতরের হিংসা আর জ্বালা চাড়া দিয়ে ওঠে। ভাইয়েরা বোনের এই গোপন জেলাসি খুব ভালো করেই ধরতে পারল।
এদিকে রাইমা ফুফুর কথা শুনে ইনশিরার মনে হলো তার সারা শরীরে যেন আগুন ধরে গেছে! সে মনে মনে একেবারে ফেটে পড়ল ফুফুর ওপর।
ইনশিরা মনে মনে, ফুফুর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে

—”উফ! এই ফুফুটা সবসময় আমার আর উযাইনের মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়! নিজে উযাইনের দিকে সারাক্ষণ চোরের মতো চেয়ে থাকে, সেটা আমি বুঝি না ভেবেছ? আমি কি উযাইনের কেউ না? আমি তো ওনার বিব…”
ইনশিরা নিজের মনের কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারল না। গত ১৫ দিন আগের গোপন সত্যটা তার গলায় এসে আটকে গেল। রাগে আর অপমানে তার চোখ দুটো আবার ছলছল করে উঠল। সে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাতের লোকমাটা হাত দিয়ে চটকানো শুরু করল।
উযাইন পুরোটা সময় চুপ করে ছিল। সে যেমন রাইমার হিংসাটা ধরতে পেরেছে, তেমনি ইনশিরার ফর্সা ফেসটা রাগে কীভাবে লাল হয়ে উঠছে তাও খেয়াল করল। এই মেয়েটির তার প্রতি অধিকারবোধ উযাইনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মিষ্টি দোলা দিল, কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করল।

দুপুরের খাবারের পর বাড়ির সবাই যার যার ঘরে বিশ্রাম নিতে গেছে। উযাইন ড্রয়িংরুমের পাশের করিডোরে দাঁড়িয়ে উমায়েরের কাছে যাচ্ছিল । ঠিক তখনই চারপাশটা ভালো করে দেখে নিয়ে ইনশিরা হনহন করে এসে উযাইনের সামনে দাঁড়াল। তার ফর্সা মুখটা রাগে এখনো থমথম করছে।
—”আপনার সমস্যাটা কী বলুন তো? টেবিলে রাইমা ফুফু আমার নামে অতসব আজেবাজে কথা বলল, আর আপনি একটাও প্রতিবাদ করলেন না? চুপচাপ শুনছিলেন?”
ইনশিরা উযাইনের একদম কাছে এসে, গলার স্বর নিচু কিন্তু তীব্র ক্ষোভ নিয়ে বলল কথা গুলো। উযাইন কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। ওর এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি একদম খাঁটি বাঙালি স্ত্রীদের মতো।
উযাইন আমতা আমতা করে, ঠিক যেন একজন অপরাধী স্বামীর মতই বলে,
—”আরে ইনশিরা… আমি কীভাবে সবার সামনে প্রতিবাদ করতাম? রাইমা তো তোমার ফুফু হয়। আর তাছাড়া ছোটবেলার কথা নিয়েই তো হাসাহাসি হচ্ছিল…”

—”ফুফু হয় তো আমার হয়, আপনার তো কিছু না! আমি আপনাকে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, ফুফুর থেকে একদম দূরে থাকবেন। ফুফু যখন আপনার দিকে চোরের মতো তাকিয়ে থাকে, আমার একদম ভালো লাগে না। আপনি কিন্তু এখন বিবাহিত, এটা মাথায় রাখবেন!”
ইনশিরা চোখ রাঙিয়ে, বলল ওর মুখের ‘বিবাহিত’ শব্দটা উযাইনের কানে লাগতেই হঠাৎ যেন তার মোহভঙ্গ হলো! তার মনের ঘোর নিমেষেই কেটে গেল। নিজের মনে এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল সে
—ছিঃ! ও এসব কী করছে? ও নিজেকে ইনশিরার স্বামী ভাবছে? ১৬ বছরের একটা বাচ্চার কথায় ও অপরাধী মতো জবাব দিচ্ছে? ইনশিরা ওর কেউ না!
মুহূর্তের মধ্যে উযাইনের চোখের নরম ভাবটা কেটে গিয়ে এক পাথুরে গাম্ভীর্য নেমে এল। সে চশমাটা ঠিক করে এক পা এগিয়ে ইনশিরার দিকে কঠোর চোখে তাকাল।উযাইন খুব কড়া এবং শীতল গলায়
—”অনেক হয়েছে ইনশিরা! নিজের সীমা লঙ্ঘন কোরো না। তুমি কাকে ধমকাচ্ছ? আমি তোমার বাবার বন্ধু হই।

আর ওই তথাকথিত বিয়ের কথা বলছ? ওটা কোনো বিয়েই না, একটা ভুল পরিস্থিতি ছিল মাত্র। আমি তোমাকে কোনোদিন স্ত্রী হিসেবে মেনে নিইনি, আর নেবও না। নিজের বয়সটার দিকে তাকাও, আর বাচ্চাদের মতো অধিকার ফলাতে এসো না আমার ওপর!”
উযাইনের এই আচমকা রুক্ষ ও কড়া কথাগুলো ইনশিরার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তার ডাগর চোখ দুটো মুহূর্তেই জলে ছলছল করে উঠল। উযাইনের বুকের ভেতরটা এই চাউনি দেখে আবার তোলপাড় হতে লাগল, এক তীব্র অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল—তার হাত দুটো নিশপিশ করছিল ইনশিরার চোখের জল মুছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে রাখল।
ইনশিরা ওড়নার কোণা দিয়ে জোরে জোরে চোখ দুটো মুছল। বুক চিরে একটা কান্না আসতে চাইলেও সে জেদ ধরে তা চেপে রাখল।ইনশিরা উযাইনের দিকে তাকিয়ে কান্নাভেজা কিন্তু একগুঁয়ে গলায়

—”ঠিক আছে, দেখে নেব! আরেকবার যদি ফুফুর কাছাকাছি দেখি, তখন পরে বুঝিয়ে দেব আমি কী করতে পারি!”
বলেই ইনশিরা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ধপধপ পা ফেলে করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যেতে যেতে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বকতে লাগল
—”শয়তান লোক কোথাকার! একদম পাষাণ পুরুষ একটা! একটুও দয়ামায়া নেই বুকে…”
ইনশিরার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল উযাইন। তার রাগ তখন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। মেয়েটির এই রাগ, অভিমান আর বিড়বিড় করে গালি দেওয়ার মিষ্টি ভঙ্গি দেখে ৩৫ বছরের গম্ভীর প্রফেসরের ঠোঁটের কোণে নিজের অজান্তেই এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল
—”এই মেয়ের জেদের কাছে সে কতদিন নিজেকে আটকে রাখতে পারবে??”

এরই মধ্যে কেটে গেছে আরও কিছুদিন। উযাইন নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে ব্যস্ত। মূলত পারিবারিক ব্যবসার তদারকি করতেই সে বাংলাদেশে এসেছে, তবে একই সাথে লন্ডনের ইউনিভার্সিটির অনলাইন ক্লাসগুলোও তাকে নিয়মিত নিতে হচ্ছে। আজকেও সে একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নিচ্ছিল।
উমায়ের তখন বেডের এক কোণে বসে একা একা খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছিল।
ঠিক তখনই কোনো রকম নক না করেই ইনশিরা ঘরে ঢুকল। পরনে তার হালকা নীল রঙের একটা থ্রি-পিস, মাথায় ওরনা পেচানো, যোহরের নামাজ পড়েই এখানে এসেছে । সে উযাইনের দিকে একপলকও না তাকিয়ে সরাসরি বেডের কাছে গেল এবং উমায়েরকে কোলে তুলে নিয়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল।
উযাইন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে ল্যাপটপের মাইক্রোফোনটা মিউট করল।
—”এই যে,? অনুমতি ছাড়া ঘরে ঢুকে ওকে না বলে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?”
উযাইন ভ্রু কুঁচকে,চাপা গলায় বলে। ইনশিরা দরজার কাছে গিয়ে থামল। তারপর উযাইনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘাড় ত্যাড়া করে এক গাল হেসে বলল

—”ও শুধু আপনার একার না, উমায়ের এখন আমারও!”
বলেই সে উযাইনকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উমায়েরকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। উযাইন ল্যাপটপের সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ১৬ বছরের একটা মেয়ের এই রাজকীয় ভাব আর আত্মবিশ্বাস দেখে সে পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল। তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা ওলটপালট হয়ে গেল। উযাইন আনমনেই ল্যাপটপে ক্লাস মিউট রেখে গুনগন করতে লাগলো,
তোমার চোখে আকাশ আমার
চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা
ভেতর থেকে বলছে হৃদয়

“তুমি আমার প্রিয়তমা”
তোমার চোখে আকাশ আমার
চাঁদ উজাড় পূর্ণিমা
ভেতর থেকে বলছে হৃদয়
“তুমি আমার প্রিয়তমা”

রুহ এ ইশক পর্ব ২