সুইটহার্ট পর্ব ১৮
মোনালিসা মেহরোজ
রাত ঠিক ন’টা।
দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ির বহর এসে থামলো শহরের বাইরে পাহাড় আর লেকঘেরা পাঁচ তারকা রিসোর্ট ‘এমেরাল্ড ক্রেস্ট রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’-এর বিশাল প্রবেশদ্বারের সামনে।
সোনালি আলোয় ঝলমল করছে রিসোর্টের পুরো এড়িয়া। প্রবেশপথজুড়ে সাদা অর্কিড, লিলি আর গোলাপের ফুল দিয়ে তৈরি বিশাল আর্চ বসানো রয়েছে। দুই পাশে সারিবদ্ধ খেজুরগাছের কাণ্ডে জড়িয়ে রাখা হয়েছে উষ্ণ হলুদ ফেয়ারি লাইট। যা থেকে চুইয়ে চুইয়ে পরছে নরম হলুদাভ আলোর মৃদু রেখা। দূরে বিশাল কৃত্রিম লেকের পানিতে আলো প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে স্বপ্নিল এক আবহ।
গাড়ি থামতেই প্রথমে নেমে এলেন মনোয়ার শেখ আর সুফিয়া বেগম। তারপর একে একে নেমে এলো মেহরিন, শাওন, শিফা এবং শেখ পরিবারের অন্য সদস্যরা।অন্যদিকে ঠিক তাদের পেছনের গাড়ি থেকে নেমে এলো তালুকদার পরিবার। অভ্র দরজা খুলে নেমেই চারপাশে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে মৃদু হাসলো। মনে পরলো কিছু বছর আগের স্মৃতি, যা এই রিসোর্টিকে ঘিরে। আজ আবার পুনরায় সেই জায়গায় ফেরা। বাহ্। অভ্র বাঁকা হেঁসে মাথার চুলে হাত বোলালো। ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—মন্দ না।
তার কথায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমা তালুকদার হেঁসে বললেন—-
—চৌধুরীরা আয়োজন করেছে, খারাপ হবে নাকি?
মায়ের কথায় অভ্র শুধু হেসে মাথা নেড়ে লাগেজের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে মেহরিন গাড়ি থেকে নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বড় বড় চোখে চারপাশ দেখছে রমণী। সামনের বিশাল ফোয়ারা থেকে নীলচে আলো ছিটকে পড়ছে যেনো। দূরে কাঁচে মোড়ানো মূল ভবনটা রাতের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রাজপ্রাসাদ ন্যায় দেখতে লাগছে।মেহরিনের চোখে একরাশ মুগ্ধতার উদয় হলো। রমণী আপন মনে দেখতে দেখতে আস্তে করে ফিসফিস করলো—
—আল্লাহ… এতো সুন্দর জায়গায় মানুষ থাকে?
শাওন পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনে ফেললো কথাটা। ঠোঁট বাকালো যুবক।
—না, ভূতেরা থাকে।
—চুপ!
মেহরিন কনুই মেরে দিলো তাকে। শিফা হেসে বললো—
—তুই বরং চারপাশ দেখে হাঁট, মেহু। পরে আবার ফোয়ারায় পড়ে যাস না।
মেহরিন মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিলো—
—আমি কি এতোই গাধা যে পরে যাবো?
শাওন গম্ভীর মুখে বললো—-
—উত্তরটা আমরা তিনজনই জানি। তুই গাঁধা নোস, তুই গাঁধি।
—আর তুই একটা আস্ত জা*উড়া!
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করলো মেহরিন। অতঃপর বড়বড় পা ফেলে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলো।
অন্যদিকে শাওন আড়চোখে শিফার পানে একপলক তাকালো। তাদের মধ্যে একটু-আধটু কথা হচ্ছে, তবে সেদিনের সেই বিষয় নিয়ে মুখ খোলোনি শিফা। শাওন ঠিক করেছে, মেহরিনের বিয়ের মাঝেই শিফার থেকে উত্তরটা আদায় করে ছাড়বে। কথাখানা ভেবেই মনে মনে হাসে সে। চুলের ভাজে হাত চালিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।
রিসোর্টের ভেতরে ঢুকতেই সবাইকে স্বাগত জানালো রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ। এক এক করে ল্যাগেজ নিয়ে গেল কিছু স্টাফরা। রিসেপশনের বিশাল ঝাড়বাতির আলোয় পুরো লবি ঝলমল করছে। সাদা ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝে, চারদিকে সুগন্ধি ফুলের সাজসজ্জার দিকে সকলে হা করে তাকিয়ে রইলো।
খানিকবাদেই রুমের চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হলো সবাইকে। শেখ পরিবারের জন্য একই ফ্লোরে কয়েকটি পাশাপাশি রুম বরাদ্দ করা হয়েছে। মেহরিন নিজের লাগেজ হাতে নিয়ে লিফটে উঠলো। আজ সারাদিনের ভ্রমণে শরীরটা একেবারে ভেঙে গেছে তার। ভিষন ক্লান্ত লাগছে। একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে চারিদিকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আরো আনন্দদায়ক লাগবে।
মেহরিন রুমের দরজা খুলতেই আবারো একবার অবাক হয়ে গেল। বিশাল কিং-সাইজ বেড, একপাশজুড়ে কাঁচের দেয়াল, নরম আলোয় সাজানো আধুনিক ইন্টেরিয়র, ছোট্ট বসার জায়গা আর সামনে প্রশস্ত বারান্দা—সবকিছুই এতোটা মনোমুগ্ধকর যে মেহরিনের চোখ জুড়িয়ে এলো। মেহরিন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে ব্যাগটা বিছানার পাশে রাখলো।
—ওয়াও…
অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে।
কয়েক সেকেন্ড রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখলো রমণী।
তারপর ক্লান্ত শরীরটা আর টানতে না পেরে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে, আরামদায়ক একটা হালকা রঙের থ্রি-পিস পরে বেরিয়ে এলো সে।ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।
কাঁচের দরজাটা সরিয়ে বাইরে পা রাখতেই একঝলক শীতল বাতাস এসে আলতো করে ছুঁয়ে গেল তার সুশ্রী মুখশ্রী। মুহূর্তেই সারাদিনের ক্লান্তি যেন খানিকটা মিলিয়ে গেল। দূরে অন্ধকার লেকের বুকে এক ফালি চাঁদের আলো চিকচিক করছে। লনের প্রতিটি গাছে ঝুলছে অসংখ্য ফেয়ারি লাইট।
নিচে রিসোর্টের কর্মীরা আগামী দিনের গায়ে হলুদের সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে মালা। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। রেলিংয়ে দুই হাত রেখে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললো মেহরিন। এরমধ্যেই অজান্তেই মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগে পাওয়া সেই মেসেজটা, আর হুট করেই হাস্যোজ্জল মুখটায় কেমন বিষন্নতা আর অদ্ভুত এক অস্থিরতার উদয় হলো রমণীর। মেহরিন ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না আদ্রিয়ান আসলে কিসের অধ্যায়ের কথা বলছে! যেই অধ্যায় মেহরিনের সাথে শুরু হবে!
আচ্ছা! এমন কি কোন অধ্যায় আছে যেই অধ্যায়ে শুধু আদ্রিয়ান আর মেহরিন নামটা থাকবে?
হুট করেই মেহরিনের খুব জানতে ইচ্ছে হলো কথাটা। পুরুষটির কথা মনে হতেই কেনো যেনো বুকটা ভিষন জ্বালা করছে৷ অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগছে রমণী। যুবকটি যে কি এমন যাদু করলো কে জানে! কেনো বারবার অদ্ভুত ভাবে আদ্রিয়ান নামক রহস্যময় মানবটির মুখাবয়ব তার মানসপটে ভেসে উঠছে? কেনো চাইলেও তা মুছে ফেলতে পারছে না?
মেহরিন রেলিং চেপে আকাশের দিকে তাকালো। আচানক চোখের কোণে পানি জমলো তার। অদ্ভুত অনুভূতিতে সিক্ত হতে থাকলো হৃদয়। কাল তার গায়ে হলুদ, আর সাথে আদ্রিয়ান আর সারারও। মেহরিন চোখ বন্ধ করে নেয়। অজানা কারণে কয়েকটা রাত তার নির্ঘুম কেটেছে। সকলের সামনে নিজেকে ঠিক রাখলেও আড়ালে ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। কয়েকটা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ভেবেছে দিন-দুনিয়া। অথচ তার নিদিষ্ট কোন কারণ খুঁজে পায়নি রমণী।
—স্যার, ল্যাগেজগুলো আমাদের দিন আমরা নিয়ে যাচ্ছি।
হুট করেই নিচ থেকে শোরগোলের আওয়াজে ধ্যান ভগ্ন হয় মেহরিনের। চমকে তাকায় নিচের দিকে। সর্ব প্রথম নজরে পরে চৌধুরী পরিবারের সাহেলা চৌধুরীকে। হাসিমুখেই স্বামীর পাশে এগিয়ে আসছেন তিনি।পাশেই কিছু স্টাফ নিয়ে আসছে ল্যাগেজ। এরমধ্যেই মেহরিনের চোখ আঁটকে যায় পিছনের গাড়িতে। যেখান হতে সদ্য নামলো স্বয়ং আদ্রিয়ান চৌধুরী। অতন্ত্য গম্ভীর ও দাম্ভিক ভঙ্গিতে কোট খানা ঠিক করে সামনের দিকে ফিরতেই হুট করেই পাশ থেকে সারা নামক মেয়েটা যুবকের এক বাহু অত্যন্ত আহ্লাদী ভঙ্গিতে জরিয়ে ধরলো। যা অবলোকন করা মাত্রই বুকের ভেতরটা অজানা কারণে কেঁপে উঠল বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অষ্টাদশীর। বুকের ভেতরটায় অদ্ভুত বিষাক্ত এক অনুভূতির জোড়ায় খেলতে লাগলো। তার স্থির দৃষ্টি আবদ্ধ হয়ে রইলো সারার হাত, আর আদ্রিয়ানের পুরুষালী বাহুর মাঝখানের স্পর্শটাতে।
মেহরিনের চোখের কোণ ভরে উঠলো। যা রমণী নিজেই অনুধাবন করতে পারলো না। অন্যদিকে হুট করে এভাবে হাত ধরায় আদ্রিয়ান ভ্রু গোটালো, বললো না কিছুই। বরং গম্ভীর মুখে মুখ ফিরিয়ে গটগট পায়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো। এরমধ্যেই একদম হুট করেই আদ্রিয়ান মাথা তুলে উপরের দিকে চাইলো৷ সরাসরি নজর মিলিত হলো অশ্রুসিক্ত একজোড়া টলমলে চোখের সাথে। মেহরিন ভরকায়, তবে নজর ফেরায় না। আদ্রিয়ানের চোখ ক্ষনিকের জন্য হেঁসে উঠলো মেহরিনের আত্মবিশ্বাস দেখে। অতঃপর মাথা নামিয়ে গটগট পায়ে ভেতরের দিকে প্রবেশ করে যুবক। আর মেহরিন তখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়।
পরেরদিন সকাল সকাল নাস্তা শেষে লেকের ধারে হাঁটতে বের হলো মেহরিন-শিফা ও শাওন। মনোয়ার শেখসহ সুফিয়া বেগম ও তালুকদার পরিবারসহ চৌধুরী বাড়ির বড়রা নিজেদের মতো করে ব্যাস্ত। আর ছোট্টরা আলাদা করে সময় বেছে নিয়েছে। আজ সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ, পুরো রিসোর্টের আনাচকানাচে আপাতত তার’ই আমেজে ভরে উঠেছে। ডেকোরেশন শেষের পথে।
মেহরিন বিষন্ন মুখে লেকের ধারে হাঁটছে, কাল রাতের পর থেকে মুখটা শুকিয়ে গেছে আরো। ঘরের বাহিরে বের হতে মন না চাইলেও শিফার জোড়াজুড়িতে আর না করেনি। নইলে মেয়েটা একশো একটা প্রশ্ন করছে। যার উত্তর নেই মেহরিনের কাছেও। সবকিছু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরিন। নিজেকে হালকা করতে লম্বা শ্বাস টানে প্রকৃতির বুকে। দমকা হাওয়া এসে ছুঁয়ে দেয় গাত্র। মেহরিন হাসে কেবল।
—মেহু, দেখ। সারা নামক মেয়েটা আদ্রিয়ান স্যারকে কিভাবে জ্বালাতন করছে।
চমকে ডাগর ডাগর আঁখিপল্লব মেলে ধরে রমণী। শিফার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী লেকের ডান দিকে তাকাতেই নজরে পরে সারা আর আদ্রিয়ানকে। আদ্রিয়ান ফোনে কারো সাথে কথা বলছে, আর সারা তার বাহু ধরে বারবার ঝাঁকিয়ে নজর কাড়তে চাইছে ছবি তুলে দেওয়া জন্য।
—বেবি, চলো না কয়েকটা ফটো তুলে দাও আমায়। একসাথে কয়েকটা সেলফিও তুলি! এটা আমাদের স্মৃতি হিসেবে থাকবে।
সারার ন্যাকামি মিশ্রিত গলায় মেহরিনের ভ্রু কুঁচকে যায়। সারার কান্ডে আদ্রিয়ান বিরক্ত হচ্ছে নিশ্চিত, তবে কিছু বলছে না কেনো? না-কি হবু বউ বলে ভালোবাসা উতলে পরছে যে তার কোন কিছুই চোখে পরছে না?
হুট করেই সবকিছু কেমন আদিখ্যেতা মনে হলো মেহরিনের। নিজের অজান্তেই বড্ড বিরক্ত অনুভব করলো সে। আড়চোখে আরো একবার তাকালো, তখনো সারা যুবকের বাহু জড়িয়ে অতন্ত্য আহ্লাদী ভঙ্গিতে বারবার ঝাঁকাচ্ছে। আর আদ্রিয়ান কোনপ্রকার বাঁধা না দিয়ে ফোনে কথা বলে যাচ্ছে।মেহরিন চোখ ফিরিয়ে শিফার পানে তাকিয়ে খেয়াল করলো সে এখনো সেদিকে তাকিয়ে।
—কে বিরক্ত হচ্ছে না হচ্ছে তা তো তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ন্যাকা মেয়েরা গায়ে পরলে বিরক্ত লাগে না-কি! ওসব তো আরো এনজয় করতে মন চায় কিছু পুরুষদের। মনে হয় আরো চিপকে যাই মেয়েদের সাথে।
উচ্চস্বরে দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে চট করে শিফার হাত ধরে ফেললো মেহরিন। অন্যদিকে তার এহেন কথায় আশেপাশের অনেকেই তার পানে কপাল কুঁচকে তাকালো। সারাও অবাক নয়নে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। আদ্রিয়ানের কানেও কথাগুলো গেছে বৈকি! যুবক কেমন ফোন কান হতে সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে মেহরিনের পানে তাকিয়ে। আশেপাশে একপলক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো কথাগুলো আসলে কাকে বললো৷
অন্যদিকে মেহরিন গরম চোখে ফের আদ্রিয়ানের পানে নজর দিয়ে শিফা-শাওনকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে উচ্চস্বরে আওড়ালো—-
—চলে আয়। ওসব আদিখ্যেতা দেখার সময় আমার নেই। কে কার গায়ের উপর পরছে পরুক, তাতে আমার কি? যত্তসব ন্যাকামো!
হতভম্ব শিফা-শাওন একে অপরের পানে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মেহরিন কি করছে তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না দু’জনে। আদ্রিয়ানকে এসব বলছে সে? ততক্ষণে মেহরিন তাদের দু’জনকে পাকড়াও করে সামনের দিকে পা বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে ততক্ষণে সারার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে অপমানে। মেহরিন যে তাকেই ন্যাকা বললো তা বুঝতে আর বাকি রইলো না। সারা ঘাড় ঘুড়িয়ে আদ্রিয়ানের পানে চাইলো, নজরে পরলো যুবকের ঠোঁটের কোণায় ক্রুর হাসির রেশ। কপাল কুঁচকে গেলো রমণীর। আদ্রিয়ানকে ছেড়ে গটগট পায়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো। অন্যদিকে আদ্রিয়ান তখনো মেহরিনের যাওয়ার পানে তাকিয়ে। ঠোঁট কামড়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসলো পুরুষটি। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া খানিক সরু করে তাকিয়ে রইলো৷ মাথার তুলে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো—–
—ডু ইউ ফিল জেলাস, সুইটহার্ট? উহুম, কোথায় যেনো পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।
বলতে বলতে গালে হাত দিয়ে বেশ ভাবুক হয়ে পরলো যুবক। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই বাঁকা হেঁসে ফের আওড়ালো—-
—এটা কি অভ্রের বিয়ের পোড়া বিরিয়ানির গন্ধ? না-কি ওর পোড়া ভাগ্যের?
শিফা-শাওনকে রেখে নিজের ঘরে প্রবেশ করতেই মেহরিনের পা জোড়া হটাৎ থমকে গেলো। জানালার কার্নিশে বাহিরের দিকে ফিরে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। দু’হাত পকেটে ঠোকানো। গায়ে আঁট-সাঁট করে পড়া সাদা শার্ট। কাচের জানালা ভেদ করে আসা মৃদু হাওয়ায় সিল্কি চুলগুলো দুলছে ভিষন। সূর্যের রশ্মিতে চিকচিক করছে পুরুষটির মুখমণ্ডল। মেহরিনের উপস্থিতি টের পেলেও যুবকটি নড়লো না। বরং ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো নিজের জায়গায়।
অন্যদিকে আচানক নিজের ঘরে অভ্রকে আবিষ্কার করে ভিষন অবাক রমণী। কপালে পরলো কয়েকটা ভাজ। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না অভ্র এসময় এখানে কেনো?
—অ….আপনি এখানে?
নিরবতা ভেদ করে হুট করেই মেহরিনের কাঁপা কন্ঠানালী হতে বেড়িয়ে এলো কয়েকটা ভাঙা শব্দ। এবেলায় যুবক খানিক নড়েচড়ে সামনের দিকে ফিরলো। তার তীর্যক দৃষ্টি স্থির হলো মেহরিনের কায়ায়। রমণী খানিক ভরকে গেলো আচমকা এহেন দৃষ্টিতে। মাথা নুইয়ে নিলো খুব সন্তপর্ণে।
—আসা কি বারণ?
অভ্রের এরূপ কাঠকাঠ গলায় মেহরিন খানিক থতমত খেলো। কথাগুলো কেমন ভেঙে যেতো লাগলো ভেতরে।
—ন…না, তা বলি নি। আসলে…..।
মেহরিনের কথার মাঝখানেই হুট করে, একদম হুট করেই অভ্র বড়বড় পদক্ষেপে এসে থামলো তার অভিমুখে। আচমকা পুরুষটির এরূপ আগমনে তড়িৎ কয়েকপা পিছিয়ে গেলো মেহরিন। বুকের ভেতরের ধুকপুকানি ক্রমশ বৃদ্ধি পেলো অভ্রের এরূপ আচরণে। হুট করে অভ্রের এহেন ব্যাবহারের কারণ সে ঠিক খুঁজে পেলো না। অবাক নেত্রে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো মাত্র।
এরমধ্যেই রমণী অনুভব করলো অভ্রের শীতল হাত তার ডান গালে এসে ঠেকেছে। আলতো করে বুলিয়ে যাচ্ছে সেথা। আচানক অভ্রের এহেন স্পর্শে থমকে গেলো সে। মস্তিষ্ক পুরোপুরি অচল হয়ে গেলো রমণীর। অভ্র মেহরিনের থমকে যাওয়া মুখমণ্ডলের পানে চেয়ে অদ্ভুত হাসলো। আরো খানিকটা ঝুঁকে এসে তপ্ত শ্বাস আছড়ে ফেললো মেহরিনের মুখে। মেহরিন শক্ত হয়ে থাকলো। নড়লো না বিন্দুমাত্র।
সুইটহার্ট পর্ব ১৭
—লিসেন মেহরিন। তুমি মিসেস অভ্র তালুকদার হতে যাচ্ছো, আমার স্ত্রী। তাই নিজেকে সংযত রাখো, আমার জিনিস অন্য কারো প্রতি ইন্টারেস্ট ফিল করবে এটা আমি কোনমতেই মেনে নিবো না, নো ওয়ে।
মেহরিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। অভ্র মেহরিনের চুলের ভাজে হাত বুলিয়ে আলতো করে ফুঁ দিলো মুখে। ফের ফিসফিস করে আওড়ালো—-
—অ্যাম আই ক্লিয়ার?
