Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ৩

রুহ এ ইশক পর্ব ৩

রুহ এ ইশক পর্ব ৩
আনান রোজ

শেষমেশ কি না পয়ত্রিশ বছর বয়সে এসে, ষোলো বছরে পা দেওয়া একটা কিশোরী মেয়ের জন্য উযাইন বেসামাল হয়ে যাবে, তা হয়তো এই প্রফেসর সাহেব নিজেও কখনোই কল্পনা করেননি, কেন এমন হয় তার? আজ যখন ইনশিরা কে শাড়িতে দেখল, কেন তার বুকের ভেতর সব উলটপালট হয়ে গেল? কেন মনে হচ্ছিল যে দম আটকে এখনি হয়তো মরন ঘটবে তার?
উযাইন নিজের বেসামাল নিয়ে মনে ডুবে গেল মন আর মস্তিষ্কের দ্বিধাদন্দে নিজেকে নিজেই বুঝাতে লাগলো, কিন্তু তার স্নায়ুকোষ যেন অবশ হয়ে উঠছে সে যেন নিজের মনের কাছেই হেরে যাচ্ছে—

—”What am I doing? কেন ও সামনে এলে আমি নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি? এই মেয়েটা তো এখন ইসলামিকভাবে, আইনত আমার জন্য সম্পূর্ণ বৈধ… তবুও কেন আমাদের মাঝে সমাজ, আমি চাইলেও ওকে নিজের করে বুকে টেনে নিতে পারি না? আমার প্রিয়তমা…তুমি আমার হয়েও আমার না!
কথা গুলো বলেই সে বাড়ান্দায় গেল। উযাইনের চোখ দুটো আবেগে আর আক্ষেপে বুজে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে, অতীতের কথা ভাবতে শুরু করলো…..
হ্যাঁ ইনশিরা তো আগেও এমনই করত যখন তার বয়স পাচ বছর ছিল আজ থেকে প্রায় ১০/১১ বছর আগের কথা…..লন্ডনের এক কনকনে শীতের বিকেল। বাইরে তখন একদম হালকা তুষার পড়ছে।
ইনশিরা তার বাবার হাত ধরে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিল। পরনে তার একটা ছোট্ট গোলাপি পশমি কোট আর পায়ে কিউট বুট জুতো। ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশ থেকে উযাইন পড়নে একটা ওভারকোট কালো রঙের, তার বয়স তখন পঁচিশ হবে। একদম হ্যান্ডসাম লুকে ওদের দিকেই হেঁটে আসছিল। সে অফিস যাবে বলে বেরিয়ে ছিল, কিন্তু ওদের দেখে এদিকেই চলে আসে।
দূর থেকে উযাইনকে দেখামাত্রই ইনশিরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে জাহিরের হাত এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। সে উযাইনের দিকে লক্ষ্য করে—

—”উদাইন…!”
বলে ছোট ছোট পায়ে তীব্র গতিতে ছুটে যেতে লাগল। কিন্তু বরফে ঢাকা পিচ্ছিল ফুটপাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুট করেই ইনশিরা রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেল! রাস্তায় শক্ত ঘষার কারণে ওর ছোট্ট দুই হাতের তালু আর হাঁটু ছিলে গিয়ে চামড়া উঠে যায়।
জাহির আর উযাইন দুজনেই আতঙ্কে—
—”ইনশিরা!”
বলে চিৎকার করে ওর দিকে ছুটে এলো। জাহির মেয়েকে তোলার জন্য হাত বাড়ায়, কিন্তু ইনশিরা নিজের বাবাকে পাত্তাই দিল না। সে দুই হাত বাড়িয়ে সরাসরি উযাইনের দিকে তাকাল এবং এক লাফে উযাইনের কোলের উপর উঠে গেল। উযাইন ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই ইনশিরা তার ডাগর চোখ দুটো জলে টলমল করে, ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে কান্না শুরু করে দিল।
জাহির মেয়ের এই কাণ্ড দেখে নিজের কপালে হাত দিয়ে মুচকি হেসে উঠে উযাইনের দিকে তাকিয়ে, ঠাট্টা করে বলে—

—”বাহ! কাণ্ডটা দেখ উযাইন! মেয়ে তো আমার, নিজের বাবাকে এক সেকেন্ডেই ভুলে গেল ‘বর’-কে পেয়ে! আমার হাতের দিকে তো ফিরেও তাকাল না!”
উযাইন জাহিরের রসিকতার কোনো জবাব দিল না। সে খুব আলতো করে ইনশিরার গাল বেয়ে পড়া চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। তার চোখে তখন এক আকাশ মায়া। উযাইন ইনশিরার চুলে হাত বুলিয়ে, খুব আদুরে গলায় বলল—
—”কাঁদে না আমার ‘লিটল বার্ড’! একদম কাঁদতে নেই। তুমি এভাবে দৌড় দিতে গেলে কেন বলো তো? চোট লাগল তো এখন!”
ইনশিরা উযাইনের শার্টের কলারটা খামচে ধরে, আধো-আধো ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল—
—”উ… উদাইন… আমাল… আমাল খুব ব্যাত্যা কচ্ছে! উমমম…”
উযাইন ইনশিরার চোখ জোড়া আবার মুছে এবং ওর ছিলে যাওয়া হাতের তালুতে পরম মমতায় ফুঁ দিতে দিতে—

—”ফুউউ…! এই তো দেখো, ফুঁ দিয়ে দিয়েছি। এখন সব ব্যথা ম্যাজিকের মতো কমে যাবে সোনা। আর কাঁদে না।”
উযাইনের এই মিষ্টি আদর পেয়ে ইনশিরা কান্না হাল্কা কিছুটা থামিয়ে এক ঝটকায় উযাইনের গলা জড়িয়ে ধরল এবং ওর ঘাড়ের কাছে নিজের ছোট মুখটা গুঁজে দিয়ে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
—”দু ইউ লাম মি?”
—”ইয়েসসস”
ইনশিরার চুলে চুমু দিয়ে, বলে উযাইন। প্রতি দিন ছয় সাত বার করে একই প্রশ্ন করে ইনশিরা তার বর কে। মেয়ের এই পাগলামি দেখে জাহির আবার হেসে উঠল। আর উযাইনের উদ্দেশ্য বলে উঠে—
—”উযাইন রে… এমন জামাই তো কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না! জামাইয়ের আদর পেয়েই মেয়ের কান্না অর্ধেক গায়েব!”
উযাইন জাহিরের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে, চাপা গলায় বলল—

—”তুই একদম চুপ কর তো জাহির! বেহায়ার মতো হাসছিস কেন? দেখছিস না আমার লিটল বার্ড’টা কতটা কষ্ট পেয়েছে!”
উযাইন আলতো করে ইনশিরার ছোট্ট মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল—
—”এখন লক্ষ্মী মেয়ের মতো বাবার সাথে বাসায় যাও। আমি কাজ শেষ করে, একটু পরেই তোমাকে দেখতে আসব। কেমন?”
কিন্তু ইনশিরা মানল না, সে উযাইনের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, জেদি গলায় বলে—
—”না! আমালে… আমালে তুমাল তাতে নিয়ে যাও!”
উযাইন বেশ অবাক হয়ে, হেসে ফেলে জাহিরের দিকে একবার তাকিয়ে বলে—
—”ওমা! তা কী করে হয় সোনা? তুমি আমার সাথে গেলে তো রাতে আম্মু-আব্বুকে ছাড়া একা একা খুব কান্না করবে!”
—”না! আমি এত্তুও কান্না কব্বো না। আমি তুমাল তাতেই যাব!”

ইনশিরা মাথা নেড়ে, অনড় জেদ নিয়ে বলল।জাহির মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে, একটু কড়া গলায়—
—”একদম জেদ করো না আম্মু! উযাইনের অনেক কাজ আছে।পরে আসবে তো বলল।”
ইনশিরা এবার নিজের বাবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কোমরে ছোট হাত রেখে, এক চরম লজিক্যাল আর নিষ্পাপ যুক্তি দিয়ে বসল—
—”কেন কাজ থাব্বে? তুমি আর আম্মু তো সবসময় এক তাতেই বাতায় থাকো, তো উদাইন কেন আমাল তাতে থাকে না? ও তো আমাল বর হয়?!”
৫ বছরের বাচ্চার মুখে এই মারাত্মক আর অকাট্য যুক্তি শোনামাত্রই উযাইন আবরারের মুখের কথা এক সেকেন্ডে হাওয়া হয়ে গেল! সে চরম থতমত খেয়ে লজ্জায় আর অপ্রস্তুত হয়ে হা করে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে রইল। ওদিকে জাহির মেয়ের এই অকাট্য দলিল শুনে রাস্তায় দাঁড়িয়েই হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো।

ইনশিরার সেই জেদ আর কান্নার কাছে হার মেনে উযাইন বাধ্য হলো ওকে কোলে নিয়েই ওদের বাসার দিকে রওনা হতে। যেহেতু উযাইন আর ইনশিরাদের বাসা একদম পাশাপাশি, মাঝে শুধু একটা বাউন্ডারি। তাই উযাইন যখন ইনশিরাকে কোলে নিয়ে গেটের কাছে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই উযাইনের বাবা ওদের গেট থেকে ডেকে উঠে কাছে আসে। উযাইনের কোল ঘেঁষে থাকা ইনশিরার দিকে একবার তাকিয়ে, গম্ভীর গলায়—
—”উযাইন! ভালোই হলো তুমি এখনই চলে এলে। ভেতরে এসো, সেরিনএবং তার ফ্যামিলি এসেছে।
এসব শোনামাত্রই উযাইনের ফর্সা মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে সরাসরি নিজের অনীহা প্রকাশ করল।উযাইন খুব দৃঢ় ও ঠান্ডা গলায় বলে উঠে—
—”Please, Dad! I am not interested! আমি এখন এসব বিজনেস মেরিজ করব না।”

কিন্তু উযাইনের বাবা বিজনেস ও পারিবারিক জেদের কারণে ছেলের এই ‘না’ একদমই মানলেন না। তিনি উযাইনকে কড়া চোখে তাকিয়ে ভেতরে আসার ইশারা দিয়ে উনি চলে গেলেন। উযাইন নিরুপায় হয়ে এক বুক বিরক্তি নিয়ে ইনশিরাকে কোলেই রেখে নিজের বাসায় প্রবেশ করল। ইনশিরা উযাইনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ওর বুকের সাথে লেপ্টে রইল।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই দেখা গেল সোফায় বসে আছে অত্যন্ত মডার্ন আর সুন্দরী এক তরুণী—সেরিন। উযাইনকে হ্যান্ডসাম লুকে ঘরে ঢুকতে দেখেই সেরিন একগাল হেসে সোফা থেকে প্রায় ছুটে ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
—”হেলো উযাইন! কতদিন পর দেখা! তা কোলের এই কিউট পুতুলটা কে?”
সেরিন মুচকি হেসে উযাইনের কোলে থাকা ৫ বছরের ইনশিরার দিকে তাকাল এবং ওর গালে আলতো হাত দিতে দিয়ে বলল—

—”হেলো কিউটি বেবি! তোমার নাম কী?”
পিচ্চি ইনশিরার, সেরিনের এই উযাইনের কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়ানো আর অতিরিক্ত ভাব কেন জানি সহ্য হচ্ছে না, তাই শুরু থেকেই মনে মনে কটমট করছিল। ইনশিরা সেরিনের হাতটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নিজের জেদি গলায় আধো-আধো চেঁচিয়ে উঠল—
—”আমি ইনসিলা! আর ও হত্তে উদাইন… আমাল বর! ও শুধু আমাল!”
পিচ্চি বাচ্চার মুখে এই ভয়ংকর অধিকারবোধের ঘোষণা শুনে সেরিন এবং ড্রয়িংরুমে থাকা বাকি বড়রা সবাই খিলখিল করে হেসে উঠলেন। সেরিন মজা পেয়ে ইনশিরাকে উযাইনের কোল থেকে জোর করে নিজের কোলে তুলে নিয়ে,ইনশিরার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকে, হেসে বলল—

রুহ এ ইশক পর্ব ২

—”তাই নাকি? উযাইন তোমার বর? কিন্তু উযাইনকে তো এখন আমি নিয়ে নিব! পরে সে আমার বর হবে, বুঝেছ?”
সেরিনের মুখ থেকে উযাইনকে “আমার বর হবে” ইনশিরার ফর্সা মুখটা রাগে এক সেকেন্ডে লাল টমেটো হয়ে উঠল! তার তারুণ্যের বাঘিনী রূপটা এই পিচ্চি বয়সেই জেগে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে এক ঝটকায় নিজের ছোট ছোট দুটো হাত বাড়িয়ে সরাসরি সেরিনের সুন্দর করে সেট করা চুলগুলো শক্ত করে খামচে ধরল ইনশিরা।
সেরিনের চুল শক্ত করে ধরে গায়ের জোরে টানতে টানতে চিৎকার করে উঠে…….

রুহ এ ইশক পর্ব ৪