Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ৮

রুহ এ ইশক পর্ব ৮

রুহ এ ইশক পর্ব ৮
আনান রোজ

এই পয়ত্রিশ বছরে এসে এখন এই পিচ্চি বউটার বাচ্চামো সামালাতে হবে। উফরে বউ! এইটুকুনি বকাতে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়, সে আবার বলে ভালবাসি….উযাইন মনে মনে ভাবছে, সে বুঝতে পারলো বিষয় টা। ইনশিরা বাবার বুকে মাথা রেখে কোনোমতে তার কান্না চেপে বলল—
—”না আব্বু, কিছু হয়নি। এমনি ভালো লাগছে না…”
কিছুক্ষন পর ঘরের দরজায় একটা শব্দ হলো। জাহির আর ইনশিরা দুজনেই তাকিয়ে দেখল, উযাইন হাতে একটা ভাতের প্লেট নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে! উযাইনকে ওভাবে প্লেট হাতে ঢুকতে দেখে ইনশিরা একেবারে হচকচিয়ে সোজা হয়ে বসল। তার বুকের ভেতর আবার ঢিপঢিপানি শুরু হলো। লোক টা হয়তো আবার বকবে।
উযাইন জাহিরের দিকে তাকিয়ে, প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে খুব স্বাভাবিক গলায়—

—”জাহির, তোর মেয়েকে বল খাবারটা খেয়ে নিতে। না খেয়ে এভাবে শুয়ে থাকা ঠিক না। না হয় পানিশমেন্ট পাবে”
জাহির উযাইনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। বন্ধুর এই দায়িত্ববোধ দেখে তার খুব ভালো লাগল।
জাহির প্লেটটা হাতে নিয়ে—
—”হ্যাঁ উযাইন, তুই ঠিক বলেছিস। নে আম্মু, তোর উযাইন আঙ্কেল নিজে তোর জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নে।”
জাহির নিজ হাতে ইনশিরাকে লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে লাগলেন। ইনশিরা মুখ নিচু করে বাবার হাত থেকে খাচ্ছিল, উযাইন চলে যাওয়ার সময় দরজার কোণ থেকে উযাইন আড়চোখে ইনশিরার সেই চিবানোর ভঙ্গি দেখছিল। ইনশিরার চোখের কোণের জল আর বাবার প্রতি তার এই আদুরে রূপ দেখে উযাইনের বুকের ভেতর আবার এক অদ্ভুত মায়ার টান অনুভূত হলো, যা সে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারল না।

পরদিন সকাল।
গতকাল উযাইন কড়া গলায় বলেছিল আজ সকালে রেডি থাকতে, কারণ ওরা ল ফার্মে গিয়ে ডিভোর্স ফাইল করবে। কিন্তু ইনশিরা উযাইনের চেয়েও এক কাঠি ওপরে। সে উযাইন ঘুম থেকে ওঠার আগেই, ফজরের নামাজ আদায় করে, বেগ খাতা গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে, রেডি হয়ে ভোর ৭টার দিকেই বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজের কলেজ এবং প্রাইভেটের উদ্দেশ্যে চলে গেল। সারাটা দিন সে বাড়ির বাইরেই কাটাল যেন উযাইন তাকে ডিভোর্স পেপারে সাইন করানোর কোনো সুযোগই না পায়।
সে যখন বাড়ি ফিরল, তখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে গেছে।
রাত প্রায় সাড়ে ১০ টা।
রাতের ডিনার শেষ করে ইনশিরা পা টিপে টিপে উমাইরের ঘরের দিকে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই স্টাডি রুমের দিক থেকে পরিচিত দুটো কণ্ঠস্বর তার কানে এল। দরজাটা সামান্য ফাঁক করা ছিল। ইনশিরা উঁকি দিয়ে দেখল, ভেতরে তার জাহির আর উযাইন বসে কথা বলছে। ইনশিরা কৌতূহলী হয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আড়ি পাতল।
জাহির উযাইনের কাঁধে হাত রেখে, খুব ক্যাজুয়াল গলায়—

—”কিরে উযাইন… তোর ওই বিজনেস ম্যারেজটা তো টিকল না। সেরিন যা করেছে….ও রাজি ছিল না, তা আগেই বলতে পারত।
—”কি আর করা তকদিরে ছিল… সে বিয়েটা ডিল হিসেবেই রেখেছিল। আর সে তার উগ্র মাতাল লাইফস্টাইলেই ছিল।”
—”মেয়ে টা তো আগে থেকেই এমন ছিল। বিয়ের সময় শুধু ফরমালিটি মেন্টেইন করেছে।”
—”ওসব বাদ দে, আমি খুব শীগ্রই লন্ডনে ব্যাক করব। ”
—”এখনই? কেন? আচ্ছা এখন কি আর বিয়ে-শাদি করার কোনো প্ল্যান আছে? নাকি এভাবেই একা কাটাবি?
উযাইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মুখে খুব স্বাভাবিক থাকার ভনিতা করে—
—”আপাতত না রে জাহির। আমরা এভাবেই ভালো আছি। তাই এখন এসব নিয়ে একদম ভাবছি না।
মুখে এ কথা বললেও উযাইনের মনের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে উঠল। সে মনে মনে বলল,—
তোর মেয়েকেই তো নিজের বউ করে বসে আছি, জাহির! কিন্তু তোকে মুখ ফুটে সেই সত্যিটা বলার মতো সাহস বা মুখ আমার নেই…’
ওইদিকে ইনশিরা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবছে—

— উফফ এই আব্বু টাও না! উনি হয়তো দুনিয়ার প্রথম শ্বশুর যে কি না নিজের মেয়ের জামাইকে অন্য বিয়ের কথা বলছে।
কিন্তু সে চমকে গেল,এটা শুনে যে উযাইন লন্ডনে ফিরে যাবে। তারপর সে আবার আরি পাতলো বাকি টা শুনার জন্য। আর জাহির উযাইনের নীরবতা দেখে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিল। তার মুখভঙ্গি কিছুটা গম্ভীর এবং সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল।
—”আচ্ছা উযাইন… আমাইরার খবর কী বল তো? আঙ্কেল আর আন্টি কি শেষ পর্যন্ত ওকে আর ওর হাজবেন্ডকে মাফ করে দিয়েছেন? উনারা কি এখন উমায়রাকে মেনে নিয়েছেন?”

‘আমাইরা’ নামটা শোনামাত্রই উযাইন যেন পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে চারপাশের আলো ম্লান হয়ে এল। অতীতের এক ভয়ানক কালবৈশাখী ঝড় তার পুরো মগজকে তোলপাড় করে দিল। সে কোনো জবাব দিতে পারল না, শুধু তার অবচেতন মনে ভেসে উঠল এক অভিশপ্ত রাতের স্মৃতি…
সেদিন রাতে আকাশ ভেঙে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছিল। চারপাশটা এতটাই অন্ধকার আর ঝাপসা ছিল যে সামনের রাস্তা কিচ্ছু দেখা যাচ্ছিল না। উমায়রা দ্রুত ড্রাইভ করছিল ওর হাজবেন্ড নিক, ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। ওরা বিয়ের প্রায় দের বছর পর বাড়ি এসেছিল। ভেবে ছিল এবার হয়তো একসেপ্ট করে নিবে ওদের। কিন্তু এরকম কিছুই হলো না। উল্টো তার মা বাবা আরও রেগে গিয়েছিলেন। সেই কষ্টেই আমাইরা বেসামাল ভাবে ড্রাইভ করছিল। পিছনে উযাইন ওদের ফলো করছে, সেও দ্রুতই ড্রাইভ করছে ওদের গাড়ি টা ওভারটেক করার জন্য। হুট করে… এক সেকেন্ডের মধ্যে হেডলাইটের তীব্র আলো চোখের সামনে ফ্ল্যাশ করল! একটা বিশাল লরি এসে আমাইরাদের কার-টাকে ধাক্কা দিল। এক বিকট শব্দে কার-টা দুমড়ে-মুচড়ে একদম শেষ হয়ে গেল! আমাইরা আর ওর জামাই স্পট ডেড…
অতীতের এই তীব্র ট্র্যাজেডি আর কষ্টের ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে উযাইনের শ্বাস আটকে আসতে লাগল। এর মাঝেই হটাৎ, উমায়েরের কথা মনে হলো সে আর এক মুহূর্তও স্টাডি রুমে বসার শক্তি পেল না।উযাইন খুব দ্রুত বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, কাঁপানো গলায়—

—”জাহির, আমি একটু আসছি…”
বলেই উযাইন প্রায় টালমাটাল পায়ে স্টাডি রুম থেকে বের হয়ে নিজের ঘরের দিকে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ইনশিরা উযাইনের এই আকস্মিক পরিবর্তন খুব ভালো করেই খেয়াল করল। সে দেখল উযাইনের চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে এবং সে কাঁপছে। ইনশিরার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। উযাইনের পেছন পেছন সে-ও উযাইনের অন্ধকার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
উযাইনের অন্ধকার ঘরে তখন পিনপতন নীরবতা। সে বারান্দার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। । তার চোখের কোণ বেয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। সে কোনো শব্দ ছাড়াই কাঁদছে। তার সেই আদরের ছোট্ট বোন উমায়রা আর এই পৃথিবীতে নেই, অথচ বোনের শেষ ইচ্ছে রাখতে গিয়ে আজ সবাইকে মিথ্যা বলতে হচ্ছে যে সে বেঁচে আছে। এই বিশাল কষ্টের পাহাড় সে একা বুকে চেপে রেখেছে।
ঠিক তখনই ইনশিরা খুব আলতো পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। অন্ধকারে উযাইনের সেই ভেঙে পড়া শরীরটা দেখে ইনশিরার মনটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে উযাইনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
ইনশিরা খুব নরম ও ব্যাকুল গলায়—

—”কী হয়েছে আপনার? আপনি ওভাবে কাঁদছেন কেন? প্লিজ বলুন আমাকে…”
উযাইন চমকে উঠে চট করে চোখ দুটো মুছে নিল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। সে ইনশিরার দিকে ঘুরে দাঁড়াল আর বলে—
—”কিছু হয়নি ইনশিরা। Just leave me alone… প্লিজ এখন, এখান থেকে চলে যাও।”
ইনশিরা উযাইনের হাতটা ধরতে গিয়েও নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে—
—”না, আমি যাব না। প্লিজ বলুন কীসের এত কষ্ট আপনাকে এভাবে শেষ করে দিচ্ছে?”
উযাইনের ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব…. এসব তার আর সইছে না দেয়াল ঘেষে ফ্লোরে বসে পড়তে পড়তে বলে উযাইন তীব্র আকুতি ও ভাঙা গলায়—
—”ইনশিরা… প্লিজ চলে যাও আমার লাইফ থেকে! এই জেদটা এবার ছেড়ে দাও। My life is already messed up! তুমি আমার সাথে সুখী হবে না। Please, just give me divorce…”
ফ্লোরে বসে থাকা উযাইনের ঠিক সামনে ইনশিরা নিজেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
অন্ধকার বারান্দায় তারা এখন একে অপরের খুব কাছে। এত কাছে যে একজনের তপ্ত নিশ্বাস অন্যজনের মুখের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে।
ইনশিরা চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু গলায় একগুঁয়ে জেদ—

—”কেন বারবার ডিভোর্সের কথা বলেন? আমি আপনাকে ভালোবাসি! আমি আপনাকে আপনার সব অতীত, সব কষ্টসহ কবুল করেছি। আমি আপনাকে কোনোদিন ছাড়ব না।”
—”উফ ইনশিরা… জেদ করা ভালো না। তুমি বুঝছ না… সবাই তোমাকেই দোষারোপ করবে, কেউ মেনে নিবে না ”
—”জেদ না, উযাইন আমি সত্যিই আপনাকেই চাই জীবনের প্রত্যেক টা মুহূর্তে। আপনার জন্য সব সহ্য করব, সব! যে যা বলুক।”

রুহ এ ইশক পর্ব ৭

ইনশিরার চোখের সেই নিঃশর্ত ভালোবাসা উযাইনের মগজে একটা তীব্র মাদকের মতো কাজ করল। তার হাল্কা নীলচে চোখ জোড়া, নেশালো হয়ে উঠল।এক দৃষ্টিতে ইনশিরার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরের সব সামাজিক দেয়াল, প্রফেসরের গাম্ভীর্য আর অপরাধবোধ এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
উযাইন নিজের ওপর সব নিয়ন্ত্রণ হারালো, আর হঠাৎ ই কিছু টা এগিয়ে ইনশিরার মায়াবী ঠোঁট জোড়া নিজের ঠোঁটের মাঝে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল…..

রুহ এ ইশক পর্ব ৯