Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ২০

শেহেজাদার আদর পর্ব ২০

শেহেজাদার আদর পর্ব ২০
সুমাইয়া ইসলাম নূর

দুপুর গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই…
চৌধুরী বাড়ির চারপাশে এখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আর অপেক্ষা করছে ইউভি আর রেদোয়ান এর
রিমঝিমের বিয়ে পড়ানোর সময় হয়ে গেছে—
কিন্তু বাড়ির সবার চোখ দরজার দিকেই…
কারণ একটাই—
ইউভি আর রেদোয়ান এখনো আসে নি।
রিমঝিম একদম জেদ ধরে বসে আছে—
ওরা না আসলে আমি বিয়ে করবো না!
বরযাত্রীদের খাওয়াদাওয়া শেষ হয়েছে আরো অনেক আগে কাজী সাহেব প্রস্তুত হয়ে বিয়ে পড়াতে শুরু করলো
প্রথমে রাশেদ মির্জার বিয়ে পড়ানো হলো।
সব ঠিকঠাক শেষ হতেই।এবার রিমঝিমের পালা।
কাজী সাহেব কোমল গলায় বললেন মা, বলো—কবুল

রিমঝিম চুপ করে থাকলো
তারপর হঠাৎ—
রিমঝিম চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
ইউভি
ঠিক তখনই ইউ ভি আর রেদওয়ান বারিতে প্রবেশ করে লিখুন চৌধুরী তো বম হয়ে আছে দুই ছেলের উপর। মনে মনে বলছে আজ বাড়ি থেকে আত্মীয়-স্বজন গেলে এদের একটা ব্যবস্থা করতে হবে এই বাড়ির ছেলে হয়ে ও এতো অনিয়ম ভাবা যায়
রিমঝিম দৌড়ে গিয়ে ইউভিকে জড়িয়ে ধরল ইউভি কে কোই ছিলি তোরা আমার কিছু ভালো লাগছে না রেদওয়ান
আজকের দিনটা অন্যরকম হতে পারতো
আমার একটা ভুলের জন্য সব শেষ হয়ে গেল
কাজী সাহেব আবার বললেন দেরি হয়ে যাচ্ছে

মা, বলো—কবুল
ইউভি নরম গলায় বলল—
পি কবুল বলো
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী—
এক এক করে সবাই বলল কবুল বল।রিমঝিম
কিন্তু রিমঝিমের মুখ দিয়ে শব্দই বের হচ্ছে না…
ঠিক তখনই—
একটা খুব পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
রিমু কবুল বল পুরো ঘরর মানুষ মনে হচ্ছে জমে গেল।
সবাই একসাথে পেছনে তাকাল—
কেউ যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না রাইহান চৌধুরী রিমঝিম দৌড়ে গেল ভাইয়া! তুমি আসছো বলো ভাইয়া… তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিছো… বলো
রাইহান চৌধুরী মমতা ভরা হাতে রিমঝিম এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল—
আমি তোকে কখনো ভুল বুঝিনি রিমু তোর ওপর আমার কোনো অভিযোগ ছিল না…
ছিল শুধু একটু অভিমান রিমঝিম কাঁপা গলায় বললো বিশ্বাস করো ভাইয়া, আমি কিছু কথা শেষ করার আগেই রাইহান চৌধুরি হাত তুলে থামিয়ে দিল—

আজকে এই শুভ দিনে ওইসব থাক…
তুই কবুল বল। রিমঝিমের এক পাশে—
রাইহান চৌধুরী, রবিউল চৌধুরী…
আরেক পাশে—
লিখন চৌধুরী, রাতিব চৌধুরী…
চার ভাইকে পাশে নিয়ে—
শেষমেশ রিমঝিম বলল—
কবুল বললো
তিনবার কবুল বলার সাথে সাথে—
বিয়ে সম্পন্ন হলো চারপাশে একসাথে ধ্বনি উঠল—
আলহামদুলিল্লাহ মাশাআল্লাহ… কী সুন্দর জুটি!
কারে নজর না লাগুক এরপর—
রাইহান চৌধুরী বাড়ির বড় ছোট সবার সাথে পরিচিত হতে লাগলেন।
ইউভি আর রেদোয়ান—
তাদের তো তিনি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন…
কিন্তু বাকিদের শুধু ফোনেই দেখেছেন—
সেটাও ইউভির জোরাজুরিতে।

লিখন চৌধুরী ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন আমাদের কথা ভেবে হলেও তুই দেশে আসতিস কিন্তু তুই তো তোর ইগো নিয়েই থাকবি।
আমরা অনেক খুশি হয়েছি তুই এসেছিস
রাতিব চৌধুরী আর রবিউল চৌধুরী ও কুশল বিনিময় করল।
রেশমা চৌধুরী এসে কানে মোল দিয়ে বললেন—
এত জেদ কেন তোমার?
আসলে কেন? আবার চলে যাও!
বাড়ির ছোট সদস্যরাও একে একে পরিচিত হলো তাদের ছোট চাচার সাথে।
ঠিক তখনই রাইহান চৌধুরী বললেন—
আমার একটা কথা বলার আছে…”
রিমঝিম বলল বলো ভাইয়া…
রাইহান একটু থেমে বললেন পরিচয় করিয়ে দেই আমার মেয়ে তিয়া চৌধুরী।আমার একমাত্র মেয়ে।”
সবাই যেন দ্বিতীয়বার আবার অবাক হলো

তিয়া… এই বাড়ির মেয়ে
কথাটা শোনার সাথে সাথে—
ইনায়া আর পিয়াসা একে অপরের দিকে তাকাল—
তারা যেন নিজেদের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না!
রেশমা চৌধুরী ছুটে গিয়ে তিয়াকে জড়িয়ে ধরলেন
কাঁদতে কাঁদতে বললেন—
মেয়েটাকে কতদিন পরে দেখছি চিনতেই পারিনি!
তারপর ইউভির দিকে তাকিয়ে বললো
তুই এতদিন বলিসনি কেন? ইউভি শান্ত গলায় বলল চাচ্চুর মানা ছিল তাই বলিনি
লন্ডনের একটা বিজনেস ইউনিভার্সিটিতে আমাদের ৫০% শেয়ার আছে চাচ্চু সেটা সামলায়…
আমি আর রেদোয়ান ওখানেই থাকি।
লিখন চৌধুরী বললেন—

ঠিক আছে… এসব পরে হবে—
এখন বিয়ের বাকি নিয়মগুলো শেষ করো।
হঠাৎ ইউভির মনে পড়ল ইনায়ার কথা
সে তাড়াতাড়ি করে ইনায়া কে খুঁজতে লাগল।
গার্ডেনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল—
পিয়াসা, ইনায়া, তুবা, রাজ্যো আর রেসোব মিলে গল্পে মেতে আছে।
ইউভির চোখ গিয়ে থামল ইনায়ার ওপর।
কিছুক্ষণ যেন স্থির হয়ে রইল সে…
মনে মনে বলল এতো সুন্দর কেন রে তুই…?
না আর না।আর দেরি করবো না
আমার তোকে এখনই চাই…
আজই বিয়ে করব… না না—আজ বাসর, কাল বিয়ে…
তোকে আমার খুব দরকার…”
ইনায়া সাদা লাল পাড়ের বেনারসি পরে আছে।
চুলগুলো হালকা কোঁকড়ানো স্টাইলে করা
মাথায় বেলি ফুলের মালা
হাতে ইউভির দেওয়া সেই কাশ্মিরি চুড়ি…
এই মুহূর্তে ইনায়াকে দেখে ইউভির মাথা যেন কাজ করছে না।
ইউভি মনে মনে বললো

এই ভুলের শাস্তি ওকে পেতেই হবে
তোর একটাই ভুল তোকে এতো সুন্দর করে কে সাজতে বলছে।
কিন্তু এত সুন্দর করে কে সাজতে বলেছে ওকে?
আমি তো বোলি নি।
সালি একদম শেষ করে দিচ্ছে আমাকে…
উফ ইউভি, তুই তো আজকে মরে গেছিস!”
চৌধুরী বাড়ির ছাদে কিছু নিয়মের জন্য আলাদা আয়োজন করা হয়েছে।
ঠিক তখনই—
ইনায়ার চোখ গিয়ে পড়ল ইউভির দিকে।
চোখাচোখি হতেই ইউভি ইশারায় ফোন দেখতে বলল।
ইনায়া ফোন অন করে দেখল—একটা মেসেজ—
এক মিনিট এই দিকে আয়, কথা আছে।”
ইনায়া ধীরে ধীরে ইউভির দিকে এগিয়ে এলো।
আর ইউভিকে মন দিয়ে দেখতে লাগল—

সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামায়
ইউভির ফর্সা শরীরটা যেন আরও উজ্জ্বল লাগছে।
মুখটা হালকা লাল হয়ে আছে।
ইনায়ার মনে হলো—
আবার নতুন করে আমার শেহেজাদার ওপর ক্রাশ খাচ্ছি আমার শাহজাদা এত সুন্দর কেন…?
ইশ একদম ললিপপের মতো…
কত কিউট লাগছে মন চাচ্ছে খেয়েই ফেলি!
নিজেকে সামলাতে না পেরে—
ইনায়া এগিয়ে গিয়ে ইউভির ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল আমার শাহজাদা ললিপপের থেকেও মিষ্টি…
আপনি বড়ই নিরামিষ, ইউভি ভাইয়া…
ইউভি যেন আর নিজেকে সামলাতে পারছে না।
এমনিতেই শাড়িতে ইনায়াকে দেখে সে পাগল হয়ে যাচ্ছে—
তার ওপর এই হঠাৎ চুমু!

সে ইনায়ার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
“তোকে আজ আমি এমনিতেও ছাড়তাম না…
আর এখন তো প্রশ্নই আসে না…
আমি যতক্ষণ না বলব এই শাড়ি তুই খুলবি না
পড়েছিস নিজের ইচ্ছায় খুলবি আমার ইচ্ছায়…
ইনায়া লজ্জায় এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না।
দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে চলে গেল।
ইউভি পেছন থেকে চিৎকার করে বলল—
দাঁড়া! এখনও কথা আর কাজ কিছুই শেষ হয়নি! দাঁড়া বলছি বলেই সে-ও ইনায়ার পিছু নিল।
ঠিক তখনই ছাদে গান বেজে উঠল—
রিমঝিম চৌধুরী আর রাশেদ মির্জা একে অপরকে মালা পরিয়ে দিচ্ছে।দুজন কাপল নাচ শুরু করল।
ইনায়া এই সুন্দর মুহূর্ত দেখে থমকে গেল।
কিছু সময়ের জন্য সে ভুলেই গেল—
ইউভি তার পেছনে আসছে।
ইউভি যখনই তার কাছে পৌঁছাতে গেল—
ইনায়া দৌড়ে পিয়াসা, তুবা, রানি, সাম্মিদের কাছে চলে গেল।
রেদোয়ান এসে ইউভিকে টেনে নিয়ে গেল নাচতে।
ইউভি আবার রাশেদ মির্জাকেও টেনে নিল—
তিনজন মিলে নাচ শুরু করল।ইনায়া দূরে দাঁড়িয়ে—
লিখন চৌধুরী আর রেশমা চৌধুরীর মাঝখানে—
ইউভির নাচ দেখছে।

এরপর এলো রিমঝিম আর রাশেদের মির্জার সেই সুন্দর আয়না দেখার মুহূর্ত—
দুজনকে আয়না দেখানো হলো।
তারপর বাড়ির মেয়েরাও নাচ শুরু করল।
এই সুযোগে ইউভি তার নানুর কাছ থেকে একটা আংটি এনে পকেটে রাখল।
সে ইনায়ার কানের কাছে এসে বলল—
“চল না আদর… আজই বিয়ে করে ফেলি…
আমার তোকে খুব প্রয়োজন ইনায়া হেসে বলল—
আগে একটু প্রেম করি তারপর বিয়ে তার আগে না এই বলে সে চলে গেল।
এরপর রাইহান চৌধুরী এসে ইউভিকে নিয়ে নাচ শুরু করলেন।
ইউভি তার চাচ্চুকে জড়িয়ে ধরে বলল—
থ্যাংকস চাচ্চু আমার কথা রাখার জন্য…
তোমার জন্য আজ চৌধুরী পরিবারটা সম্পূর্ণ লাগছে
এরপর আবার নাচ শুরু হলো—
বাড়ির সবাই একসাথে নাচছে—
লিখন চৌধুরী, রাইহান চৌধুরী, ইউভি, রেদোয়ান, রাতিব চৌধুরী এমনকি বাড়ির মহিলারাও।
এই সুযোগে ইউভি চুপিচুপি ইনায়ার হাতে তার নানুর দেওয়া সেই হীরার আংটিটা পরিয়ে দিল।
রিমঝিম চৌধুরী বিষয়টা দেখে সবাইকে ইশারায় জানাল।

চারপাশে হাততালি পড়ে গেল—
সবাই ভীষণ খুশি।তবে সবাই ন।-দুজন ছাড়া।
তিয়া চৌধুরী কখনোই চায় না—
তার ইউভি অন্য কারো হয়ে যাক।
ছোটবেলা থেকেই সে স্বপ্ন দেখে এসেছে—
সে-ই হবে ইউভির স্ত্রী।
ব্যবসার কারণে ইউভি যখন লন্ডনে যেত,
সে তার ছোট চাচ্চুর বাসায় থাকত।
সেই সময় থেকেই তিয়া মনে-প্রাণে ইউভিকে ভালোবাসে।
নানা অজুহাতে সে ইউভির কাছে থাকার চেষ্টা করত।
আইভিএ ব্রেনের ৩০% শেয়ার ছিল রাইহান চৌধুরীর—
সেটা তিনি মেয়ের নামে করে দিয়েছেন।
এখন সেই ৩০% তিয়ার।
আর বাকি ৭০%—

ইউভির
রাইহান চৌধুরী মেয়ের মনের অবস্থার কথা জানে কিন্তু।
ইউভি যে ইনায়ার জন্য বাড়ি ছারা হয়েছিল এই টাও সে জানে এইজন্য সে ইউভি কে কিছু বলার সাহস পাই নি।
আবার মেয়ের কথা ভেবেও খারাপ লাগছে।
ঠিক তখনই রাশেদ মির্জা এগিয়ে এসে বলল—
অনেক দেরি হয়ে গেছে ভাইয়া… যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমরা রওনা হবো।
লিখন চৌধুরী যেন হঠাৎ চমকে উঠলেন।
এতো আনন্দের মাঝে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন—
আজ তার বোনের বিদায়ের দিন…
রিমঝিম যখন লিখন চৌধুরীর দিকে তাকালো,
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই—
রিমঝিম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
ভাইয়া বলে জড়িয়ে ধরল তাকে।
লিখন চৌধুরী আদুরে স্বরে বললেন—
তুই কাঁদছিস কেন পাগলি?
তোকে তো এই বাড়িতেই রেখে দিবো…
রাশেদ তো এক বছরের জন্য আমেরিকা যাবে—
তুই আমাদের কাছেই থাকবি

এরপর তিনি রিমঝিমের হাতটা আলতো করে রাশেদ মির্জার হাতে তুলে দিলেন—
আমাদের বোনটা খুব আদুরে খেয়াল রেখো।
একটু জেদি, কিন্তু খুব বুঝদার
বুঝিয়ে বললে সব বুঝে যাবে।”
এক এক করে বাকি তিন ভাইও বোনকে জড়িয়ে ধরল,
আদর করল, বুঝিয়ে দিল।
রবিউল চৌধুরী একটু হাসতে হাসতে বলল—
রাশেদ, আজ থেকে তোমার সুখের দিন শেষ!
ভালো করে হেসে নাও! চারপাশে হালকা হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল।ইউভি এগিয়ে এসে রাশেদ মির্জাকে জড়িয়ে ধরে বলল—

আমার পিকে কখনো কষ্ট দিও না, ফুপা
রাশেদ মির্জা শান্ত গলায় বলল—
তোমার পিমনি আমার আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত…
অনেক কষ্টে তাকে পেয়েছি…
কখনো তাকে অসম্মান করব না।”
এরপর পিয়াসা, রেদোয়ান, ইনায়া—
সবাই রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরে বলল—
তুমি তো এখানেই থাকবা…
একদম কাঁদবে না মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে!”
এই কথা শুনে রিমঝিম হেসে ফেলল।
সবাই চায় রিমঝিম হাসিমুখেই বিদায় নিক।
এরপর ইউভি ড রিমঝিমের হাত ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেল।
এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠল।
রেদোয়ান আর ইউভিও বাইক নিয়ে বের হলো—
ওরা কিছুটা দূর এগিয়ে দিয়ে আসবে।
রিমঝিমদের গাড়িগুলো ধীরে ধীরে চৌধুরী বাড়ি ছাড়ল।পিছনে রেখে গেল কিছু মানুষের ভাঙা মন।
যতই শক্ত থাকার চেষ্টা করুক—

ভেতরে ভেতরে সবাই কষ্ট পাচ্ছে।
রেদোয়ান বাইকের ইঞ্জিন চালু করল,
কিন্তু ইউভি তখন ফোনে ব্যস্ত।
রেদোয়ান বলল এই ভাইয়া, কী হলো? যাবা না?
ঠিক তখনই রাজ্যো আর রেসোবও বাইক নিয়ে হাজির ওরাও যাবে।
ইউভি ফোনটা রেখে বলল—
হয়ে গেছে চল চারজনই বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল।
এদিকে ইনায়ার ফোনে একটা মেসেজ এলো।
ইনায়া দেখল মনে আছে তো আমার কথা?
শাড়ি খুলবি না আমি না আসা পর্যন্ত।
আর হ্যাঁ, চুলগুলো ডান পাশে ভালো করে দিয়ে রাখ
যেটা সামলাতে পারিস না, ওটা পরার দরকার নেই।
এমনিতেও তোকে এসব পরতে হয় না—আগে সামলাতে শিখ।
Sweetheart…
আর শাড়ি খুলবি না কিন্তু…”
মেসেজটা পড়ে ইনায়া ডান কাঁধে হাত দিয়ে চমকে উঠল।মনে মনে বলল সালার শকুনের চোখ!
কাছে না এসেও এত কিছু খেয়াল করলো কীভাবে?
লুচ্চা কোথাকার! শুধু চিপাই-চাপাই নজর…
বালের শাহজাদা একটা!”
এক এক করে সবাই ঘরের ভেতরে চলে গেল।
দূরের আত্মীয়রা আজ চলে যাবে—
শুধু থাকবে তুবা, সাম্মি, রানি, রাজ্যো, রেসোব আর ইউভির নানু।
বাড়িটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে

গভীর রাত…
চৌধুরী বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই নিরব হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি, গান আর কোলাহলে ভরে ছিল—
এখন সেখানে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা।
দূরে কোথাও কুকুরের ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে
মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছে গাছের ডাল।
আকাশ ভরা চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাড়ির আঙিনায়—
কিন্তু সেই আলোও আজ যেন কেমন ফ্যাকাশে লাগছে।
বাড়ির ভেতরে সবাই ক্লান্ত…
এক এক করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ছাদের এক কোনে বসে ভাবছে
ইনায়া…
শাড়িটা এখনো খোলা হয়নি।

ইউভির কথাগুলো বারবার কানে বাজছে—
আমি না আসা পর্যন্ত শাড়ি খুলবি না
হালকা করে চুলগুলো ডান পাশে সরিয়ে দিল ইনায়া
যেভাবে ইউভি বলেছিল।
নিজের এই অবস্থা দেখে নিজেই বিরক্ত হয়ে গেল—
উফ! আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি
তুবা, ইনায়া, পিয়াসা আর রানি—চারজন মিলে ছাদে বসে গল্প করছে।
হালকা রাতের বাতাস, চারপাশে শান্ত পরিবেশ…
হঠাৎই রাজ্যো আর রেসোব ছাদে এসে হাজির হলো।
ইনায়া দ্রুত উঠে গিয়ে রাজ্যোর কাছে জিজ্ঞেস করল—
রাজ্যো ভাইয়া আমার ভাইয়া আসেনি?
রাজ্যো হালকা স্বাভাবিক গলায় বলল এসেছে নিচে আছে।
ওরা একটু কথা বলছে তিয়ার সাথে।

তিয়া
নামটা শুনতেই ইনায়ার বুকটা কেমন করে উঠল।
মনে মনে বলল—
আমাকে অপেক্ষা করিয়ে সে তিয়ার সাথে গল্প করছে…? রাজ্যো হঠাৎ পিয়াসার মাথায় হালকা একটা গাঁট্টা মেরে বলল—
কিরে! তোরা এখনো শাড়ি খুলিস নাই?
যা, চেঞ্জ করে আয়—
আজ আমরা সবাই ছাদে বসে আড্ডা দিবো!”
পিয়াসা হেসে বলল—
হুম, যাবো ভাইয়া আরেকটু পরে।
রাজ্যো এবার তুবার দিকে তাকিয়ে বলল—
মিস, কাল তো আপনি চলে যাবেন, তাই না?
তুবা একটু ভাব নিয়ে উত্তর দিল তাহলে কী করবো?
এটা তো শ্বশুরবাড়ি না যে সারাজীন থেকে যাবো!”
রাজ্যো হালকা হেসে বলললাগবে নাকি তোমার শ্বশুরবাড়ি?
তুবা ভ্রু তুলে বলল—

কেন? আপনি নিয়ে যাবেন নাকি?
আপনি জানেন বুঝি কে আমার শ্বশুর?”
রাজ্যো মুচকি হেসে বলল—
হুম… জানি তো।
সময় হলে নিয়ে যাবো…
তুমি এখনো ছোটআর একটু বড় হও।
তুবা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
আমি অনেক বড় হয়ে গেছি! রাজ্যো হেসে বলল তাহলে কী বলছো?
তোমার বিয়ের বয়স হয়ে গেছে?”
তুবা একটু লজ্জা পেয়ে বলল—
“না… তবে প্রেম করার বয়স তো হয়ে গেছে!
ভাবছি মন্টুর দোকান থেকে একটা প্রেমিক পুরুষ কিনে
আনবো নিজেকে খুব এতিম এতিম লাগে…
সবাই হেসে উঠল। রাজ্যো বলল আর কয়টা দিন সিঙ্গেল থাকো তারপর দেখা যাবে ওইসব!
ঠিক তখনই ছাদে তিয়া এসে হাজির হলো।

তার পরনে সুন্দর পার্পল জর্জেটের শাড়ি—
হালকা সাজে তাকে বেশ আলাদা লাগছে।
তিয়া এগিয়ে এসে পিয়াসা আর ইনায়াকে বলল—
আমি তোমাদের বড় বোন হই, জানো তো?
এই চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ে আমি।
পিয়াসা দৌড়ে গিয়ে তিয়াকে জড়িয়ে ধরল—
আজকেই জানলাম আপু তুমি আমাদের বড় আপু!
ইনায়াও হাসিমুখে বলল—
আগে কেন পরিচয় দাওনি, আপু?
তিয়া পিয়াসাকে ছেড়ে ইনায়ার কাছে এসে নরম গলায় বলল—
ফ্যামিলি প্রবলেমের জন্য বলতে পারিনি…
এইবার তোমাদের সাথে ভালো করে মিশতেও পারিনি…
নেক্সট টাইম এসে অনেক মজা করবো।”
তারপর হালকা হেসে যোগ করল—

ইউভি তো তোমাদের কথা অনেক বলে…
পিয়াসা চোখ টিপে দুষ্টুমি করে বলল
।ভাইয়া তোমার সাথে আনেক ফ্রি তাই না সবকিছু শেয়ার করে।
তিয়া হালকা হেসে পিয়াসার প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করল—
ইউভি ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা…
সবাইকে যতটা দেখায়, ভেতরে সে তার থেকেও অনেক বেশি গভীর।
লন্ডনে যখন ছিল…
আমরা অনেক সময় একসাথে কাটিয়েছি…
আমি না বললেও—ও আমার সব কথা বুঝে ফেলত।”
তিয়ার চোখে তখন একরকম নরম অনুভূতি…
কিন্তু সেই নরমতার আড়ালে যেন অন্য কিছু লুকানো।
সে আবার বলল আমার খেয়াল রাখা, আমাকে বুঝানো ওর সাথে আমার একটা আলাদা বন্ডিং আছে…”
এই কথাগুলো শুনে—

ইনায়ার ভেতরটা ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে।
মনে মনে বলল সাধে কি বলি!
বালের শাহজাদা… এক নাম্বারের অসভ্য
ধুর! ভালো লাগে না…
ইনায়ার মুখে হাসি থাকলেও—
ভেতরে ভেতরে সে রাগে ফুঁসছে।
এরপর সবাই চেঞ্জ করার জন্য নিচে নামতে লাগল।
তুবা জিজ্ঞেস করল—
তুই যাবি না? ইনায়া বলল
আমি পরে যাবো, বেবি তোরা যা।
সবাই নিচে চলে গেলে—
ইনায়া একা একা ছাদের একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।হালকা বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে…
চাঁদের আলোয় মুখটা কেমন ফ্যাকাশে লাগছে।
সে নিচু গলায় বিড়বিড় করে বলল—
আপনি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন, ইউভি ভাইয়া ? আর যদি ভালোবাসেন তাহলে কেন
আমার কেন বিশ্বাস হয় না…?

আপনি আমাকে ভালোবাসেন কেন…?
চোখে অজান্তেই পানি চলে আসছে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
ইউভি সে ধীরে ধীরে ইনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিল।
শাড়ির ভাঁজের নিচে আলতো করে ইনায়ার মেদহীন পেটে স্পর্শ করলো ইউভি
ইনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে
হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন—

শেহেজাদার আদর পর্ব ১৯

মানুষ পৃথিবীতে আসার আগে রুহু এর জগতে ছিলো সেখানে যারা একজনের সামনে আরেকজন ছিল তারাই পৃথিবীতে এসে একজন আরেকজনের প্রেমে পরে
(এই কথাটি জনপ্রিয় একটি ধারণা, সহিহ হাদিস হিসেবে নিশ্চিত নয়)
ইনায়ার শ্বাস আটকে গেল।
ইউভি আরও ধীরে বলল—
তুই আমার সেই মানুষটি , আদর
যাকে আমি খুঁজে পেয়েছি…
ইনায়া চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে বুকের ভেতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে

শেহেজাদার আদর পর্ব ২১