শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩১
সুরভী আক্তার
সকাল হয়েছে । ভোরের আলো সবে ছড়াচ্ছে ধরনীতে । পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত চারপাশ । ফজরের আজানের পর আর ঘুমানোর চেষ্টা করে নি সংগ্রাম । শ্যামা নিচে নেমেছে ওর জন্য চা বানাতে । হাই তুলতে তুলতে বারান্দায় দাঁড়ালো সংগ্রাম । ঘুম হয়নি সারারাত । এদিক ওদিক পাশ ফিরে কাটিয়েছে । মাথায় হাজারো চিন্তা নিয়ে ঘুমাবেই বা কি করে ? তার উপর শ্যামা ছিলো না পাশে । ও ছিল বালার কাছে ওর ঘরে । এই ক দিনেই শ্যামা কে জড়িয়ে ঘুমানো অভ্যেস হয়ে গেছে সংগ্রামের । বুকের বা পাশে শ্যামা কে না জড়ালে ঘুম আসে না , শান্তি আসে না প্রাণে । বুকের উপর শ্যামার ভার না পেলে অন্তর প্রসন্ন হয় না , হালকা হয় না হৃদয় ।
ফজরের আগে শ্যামা নিজেই ও ঘর ছেড়ে এই ঘরে এসেছে । বালা ঘুমিয়ে । শ্যামার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিল কাল । শান্তিতে ঘুমিয়েছিল বোধহয় শ্যামার কোলে । শ্যামা একটুও নড়ে নি সারারাত । ও নিজেও ঘুমায় নি । ফজরের পর বালার মাথাটা কোল থেকে বালিশে রেখে ঘরে এসেছে ও । এসে দেখে সংগ্রাম খাটে নেই । সংগ্রামের একটা শিকারী বন্দুক আছে । দেয়ালে ঝোলানো থাকে সবসময় । সংগ্রাম সেটা নেড়ে চেরে দেখছে সোফায় বসে । বন্দুকের নল পরিষ্কার করে দেখছে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে । এটা নিয়ে আগে শিকারে যেত ও । শ্যামা ওর জীবনে এসেছে থেকে একটা বারের জন্যেও শিকারে যেতে দেখে নি ওকে । শুধু শুনেছে, রোজ রাতে শিকারে বেরোতো সংগ্রাম জোয়ার্দার । সকালেও যেতো । শ্যামা তো নিজেই দেখেছিলো ওকে ।
সংগ্রামের নির্ঘুম মলিন মুখখানা দেখে দৃষ্টি আহত করলো শ্যামা । ওর উপস্থিতির আভাস পেয়ে চকিতে চাইলো সংগ্রাম । শ্যামা কে দেখে মুচকি হাসলো । বললো…
” এসেছো বেগম ? কাছে এসো !!
শ্যামা এগোলো । শুকনো মুখে বসলো সংগ্রামের পাশে । সংগ্রাম সময় পার করলো না , বন্দুক টা হাতে ধরেই ঝট করে শ্যামার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো । চোখ বুজলো তৃপ্ততায় । বললো নরম স্বরে…
” মাথায় হাত বুলিয়ে দাও বেগম….
শ্যামা কে বলতে হতো না । ও নিজেই আগে উদ্যত হয়েছিল মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য । সংগ্রামের চুলের ভাঁজে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো শ্যামা । সংগ্রামের মনের অবস্থা বুঝে প্রসঙ্গ টেনে কথা তুললো…
ডাকলো প্রথমেই…
” ছোট জমিদার সাহেব..?
বরাবরের ন্যায় সংগ্রামের হিম শীতল জবাব…
” বলুন সাহেবা..!
” এটা আপনার শিকারি বন্দুক , তাই না ?
” হুম !
” আজকাল তো আপনি শিকারে যানই না , কেনো যান না ?
সংগ্রাম সোজা হয়ে দৃষ্টি রাখলো শ্যামার চোখে । পাল্টা প্রশ্ন করলো..
” শিকারে মানুষ কেনো যায় ?
” শিকার করতে !
” আমি তো আমার শিকার কে নিজের ঘরে, নিজের বন্দিনী করে সারাজীবনের জন্য পেয়ে গেছি , আর শিকারে যাওয়ার প্রয়োজন কি আমার ?
” মানে ?
” আমার অবুঝ বেগম…
অন্যরা শিকার হিসেবে ফাঁদে বন্য প্রাণী,জন্তু জানোয়ার পেয়ে থাকে , আর আমি পেয়েছি আস্ত একটা শ্যামা সুন্দরী কে । আমার বেগম কে ।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আর উৎকৃষ্ট শিকার তো আপনি ।
আপনাকে তো পেয়েই গেছি , আর কিন্তু মুক্তি দিচ্ছি না । আপনাকে পেয়ে আর বারতি কোনো শিকারের কোনো প্রয়োজন নেই আমার ।
” আমি আপনার শিকার ?
” একমাত্র সংগ্রাম জোয়ার্দারের শিকার আপনি । এই শিকারির ব্যাক্তিগত শিকারিনী আপনি ! সেইদিন তো ঐ খরগোশ টার গায়ে ভুল করে তীর বেঁধেছিল , আর আপনি সঠিক ভাবেই বেঁধেছিলেন আমার বন্ধনে । আমার বেগম হিসেবে…
আপনার তো শিকারি সংগ্রাম জোয়ার্দার কে সেদিন পছন্দ হয় নি তাই না ?
” কে বললো পছন্দ হয় নি ?
” সেদিন যেভাবে কথা শোনালেন আমায় , সাহস আছে কিন্তু আপনার !
” একটু তো আছেই !
” তাই , তা কতো সাহস আছে শুনি আমার বেগমের ?
শ্যামা খানিক ভঙ্গিমা পাল্টালো । গলা ভারী করে বললো…
” কি করতে হবে সাহসিকতার প্রমাণ দিতে ?
” সাহসিকতার প্রমাণ আমায় দিতে হবে না । অন্যদের কাছে দেবেন । নিজেকে ভীত বানিয়ে গুটিয়ে রাখবেন না কারোর সামনে । আমার বেগমের সাহসী সত্ত্বা যেন সবার সামনে উজ্জিবিত হয় । বুঝলেন ?
★বর্তমান_
বারান্দায় দাঁড়াতেই ঠান্ডা হাওয়া ছুঁয়ে দিলো সংগ্রামের শরীর । আলো পুরোপুরি ফুটলে বেরোতে হবে বাইরে । সংগ্রাম এদিক ওদিক পায়চারি করে বারান্দার কর্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো । ফটকের সামনের রাস্তায় দৃষ্টি পড়তেই ছলকে উঠলো ও । গাছ গাছালির আড়ালে কিছু একটা দৃশ্যমান । তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সংগ্রাম । কেউ আসছে জমিদার বাড়ির ফটকের দিকে । দুচাকা মোটরসাইকেল বোধহয় বাহন হিসেবে ।
সংগ্রাম বুঝে উঠতেই দৃষ্টি বৃহৎ করলো । বারান্দা ছেড়ে দ্রুত পায়ে ছুটলো বাইরের দিকে । হাতে চায়ের কাপ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে সবে উঠছিল শ্যামা । সংগ্রাম কে তড়িঘড়ি করে ছুটে নামতে দেখে সেখানেই দাঁড়ালো ও । শ্যামার দিকে এক পলক তাকিয়েই ওকে পাশ কাটিয়ে হন্তদন্ত হয়ে অন্দরের বাইরে ছুটলো সংগ্রাম । আকস্মিক বিমূর্ত বনে পরমুহূর্তে শ্যামা নিজেও চায়ের কাপ কোনো রকমে টেবিলের উপর রেখে ছুটলো ওর পিছু পিছু ।
বাইরে গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা হচ্ছে । কজন পুরুষ কর্মী সেখানে পরিষ্কারের কাজে রত । সংগ্রাম এক মুহুর্ত থেমে পিছু ফিরে আদেশ করলো…
” বেগম ,, অন্দরে যাও । আমি আসছি এক্ষুনি…
বলেই ফের একই ভাবে ছুটলো । প্রধান ফটক খোলা হয় নি এখনো । সংগ্রাম কে দেখে দারোয়ান তালা খুললেন তড়িঘড়ি করে । বেরোলো সংগ্রাম । সামনে দাঁড়িয়ে মোটরসাইকেল সমেত আরোহী । থমকালো সংগ্রাম ।
অন্দরের ভিতরে সবার উপস্থিতি । গুমোট হয়ে আছে পরিস্থিতি । লতিফ জোয়ার্দার তার জমিদারি আসনে পা তুলে বসে । পাশের সোফায় সংগ্রাম আর অংকুর পাশাপাশি । লতিফা মুখ বাঁকিয়ে কুঁচকানো দৃষ্টিতে পরখ করছেন অংকুর কে । সালেহা , শবনম , শ্যামা , আতিয়া বেগম তারা ব্যাস্ত অংকুরের অবস্থা ঠাহরে । ছেলেটার শ্যামলা চেহারা তামাটে । ঠান্ডায় ওষ্ঠ জোড়া কালচে । কপালে , গালে , হাতের কব্জিতে মোটা মোটা ব্যান্ডেজ । কপালের ব্যান্ডেজ ভেদে লাল টকটকে রক্ত দৃশ্যমান । হাতের উল্টো পিঠে ক্যানুলার সূচ । এই অবস্থাতেও কেমন ব্যাথা হীন ভঙ্গিতে স্বাভাবিক ভাবে বসে আছে । সেই শহর থেকে এসেছে এই অবস্থায় । ঠান্ডায় গায়ে একটা পাতলা কাপড়ের ঢিলে ঢালা পুরো হাতা গেঞ্জি ছাড়া কোন ভারী কাপড় নেই ।
লতিফ জোয়ার্দার নীরবতা ভাঙলেন…
” এমন অবস্থা হলো কি করে তোমার ?
খানিক চুপ থেকে উত্তর করলো অংকুর..
” ছোট খাটো একটা দুর্ঘটনা থেকে ।
” ছোট খাটো দুর্ঘটনা থেকে এতো বড় ঘটনা ? তোমায় দেখে মনে হচ্ছে না ছোট খাটো কিছু ঘটেছে বলে !
” আমায় দেখে বড় কিছু মনে হলে নিশ্চয়ই বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে । তাইতো আসতে পারি নি কাল ।
” অংকুর,, সোজাসাপ্টা উত্তর দাও । কি হয়েছিল সেটা বলো ?
শক্ত কন্ঠ সংগ্রামের । অংকুর নিজ অবস্থানে থেকে একই স্বরে উত্তর করলো..
” কাল এক্সিডেন্ট হয়েছিল আমাদের গাড়ির । কবে, কখন, কোথায় কি ঘটলো কিচ্ছু মনে নেই । অর্ধ রাতে যখন জ্ঞান ফিরলো , দেখলাম হাসপাতালের বেডে শুয়ে । তার পর আর কি ,, চলে এসেছি । ফেলে রাখা দায়িত্ব পালন করতে এসেছি আমি ।
সালেহা ছেলেটার টানটান কথা গুলো শুনলো । কাল থেকে এই ছেলেটার উপর মাত্রাতিরিক্ত রাগ ছিল । আজ কেনো যেনো মিলিয়ে গেছে সেই রাগ । ছেলেটা এখনো নতজানু । তাকায় নি কারোর দিকে । কথা বার্তায় আলাদা গাম্ভীর্যতা । সংগ্রামের অনুরূপ একদম ।
সালেহা নরম কন্ঠে বললেন….
” কাল সবাই অপেক্ষায় ছিলাম তোমার । বালাও ছিলো ।
অংকুর এবার তাকালো সোজাসুজি । সবার মাঝেই আচমকা বলে বসলো…..
” বউ সেজেছিল ও ?
সালেহা খানিক অস্বস্তিতে পড়লেন । তবুও উত্তর করলেন…
” হুম !
” এখন তো এসেছি , নিয়ে আসুন ওকে । কালকের বিয়ে আজ হবে , আর এক্ষুনি ।
” তোমার মা , তার তো আসার কথা ছিল , তিনি আসেন নি ?
লতিফ জোয়ার্দারের প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর করলো অংকুর..
” মা হাসপাতালে ।
” কি অবস্থা তার ?
” আমার থেকে ভালো !
” তোমার এই অবস্থার কথা একবার জানালেই হতো , আজ আসার প্রয়োজন ছিলো না । অবস্থা দেখেছো নিজের ?
” আমার এই অবস্থায় কি নিজেদের মেয়েকে কি আমার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না ? ক্ষতি তো হয় নি তেমন , পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে একটু , আপাতত হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে । তবে সেরে যাবে কদিনে !
সংগ্রাম নিঃশব্দে হাসলো একটু । সবাই অবাক হয়ে চেয়ে আছে অংকুরের পানে । সংগ্রাম গলা খাঁকারি দিয়ে ধীর কন্ঠে শুধালো…
” বালা কোথায় ?
” ঘুমিয়ে ,, ওঠে নি এখনো !
তৎক্ষণাৎ উত্তর শ্যামার ।
” ডাকো ওকে ! তৈরি করিয়ে নিচে নিয়ে এসো ।
শ্যামা, শবনম হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে উপরে উঠলো । বালার শান্তির ঘুম থেকে জাগানো হলো ওকে । মেয়েটা কাল থেকে একই পোশাকে । শাড়ি পাল্টায় নি । ওভাবেই ঘুমিয়ে গেছিলো । আগেই ওকে বলা হলো না কিছু । হাত মুখ ধুয়ে শাড়ি পাল্টাতে গেলে বাঁধা দেয়া হলো । বিস্মিত হয়ে তাকালো বালা । শ্যামা মুচকি হেসে বললো…
” শাড়ি পাল্টাতে হবে না । যে অছিলায় শাড়ি পড়েছো , সেটা আগে সম্পন্ন হতে দাও ।
” মানে ?
” নিচে চলো । ডাকছে তোমায় । সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য ..
বালা বিস্মিত । ভার মস্তিষ্কে একটু কিছুও বোঝার চেষ্টা করলো না । যা আছে ভাগ্যে তা তো হবেই । আগে থেকে আর ভবিতব্য নিয়ে একটুও ধারনা করতে চায় না সে ।
পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থির অনুভূতিহীন ও । চুলগুলো ভালো করে গুছিয়ে নিচে নামানো হলো ওকে । নতজানু মেয়েটা চোখ তুলেও তাকালো না । একবার চোখ তুলতেই দৃষ্টি পড়লো অনীহায় দৃষ্টি সরানো নিজের মায়ের দিকে । এক পলকেই চোখ নামালো মেয়েটা । সংগ্রাম বালা সম্বোধনে ডাকতেই চোখ তুললো আবার…
সংগ্রামের পাশে দৃষ্টি পড়তেই ছলকে উঠলো । পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো বৃহৎ অবিশ্বাস্য নয়নে । সামনের জন আগে থেকেই তাকিয়ে । তীক্ষ্ণ চোখা তার চাহনি । চেহারার হাল বেহাল । মুখখানা শুকনো । গায়ে একটা চাদর জড়ানো । এটা তো সংগ্রাম জোয়ার্দারের ।
অংকুর এক দৃষ্টে তাকিয়ে । পলকহীন দৃষ্টি তার । ওর সূচালো মরুর ন্যায় নেত্রের দিকে তাকিয়ে কাঁপল বালা , বক্ষ স্থল ছ্যাঁত করে উঠলো । এই লোক এসেছে !
বালা কেঁপে কেঁপে দৃষ্টি নামালো । কাজি , মৌলভী মুহুর্তেই হাজির । বিয়ের কাজ ও শুরু হলো । প্রথমেই বালার সম্মতি । বিয়েতে এসে এবার সম্মতির প্রয়োজন হলো ওর । সালেহা ওর পাশে বসলেন । বালার হাত দুটো ধরে সজল চোখে সাহস জোগালেন ওকে । বাঁকা চোখে এক পলক তাকে দেখলো বালা । যার নাম, অস্তিত্ব এখনো মন গহীনে লুকিয়ে আছে , খোদাই হয়ে আছে নীরবে নিভৃতে দগ্ধ হয়ে । বাঁকা দৃষ্টি সরালো মেয়েটা । আর লাভ কি ? চোখ বুজে শ্বাস বন্ধ করে শেষ বারের মতো স্মৃতি চারণ করলো মেয়েটা । বন্ধ চোখ ছাপিয়ে টপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো কোলের উপর । যে নোনা জল গড়ানোর মূল হেতু বুঝলো না কেউ । বাইরেটা সবাই দেখলো ভেতরটা আর দেখলো কোই । বুঝলো কোই ?
‘কবুল’ এই সামান্য শব্দটা উচ্চারণ করা ভীষণ কঠিন লাগলো বালার কাছে । জিভ ভার হয়ে আছে । ছোট্ট ভাষা ধ্বনিত হচ্ছে না । মনে হচ্ছে , কন্ঠনালিতে কেউ লোহার শিকল পেঁচিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে । আর এই তালার চাবি কোথায় সেটা অজানা নয় ।
মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসলো বালা । আওড়ালো মনে মনেই….
” মন থেকে এখনো বেরোলেন না আপনি সংগ্রাম ভাই ! মুক্তি দিলেন না আমায় !
দুঃখ…পেলাম না আপনাকে । আমার প্রাপ্তির শেষ পৃষ্ঠা টা ফাঁকাই রইলো । আপনাকে পেলাম না পূর্ণতায় । যেখানে পুরো প্রাপ্তিতে আপনাকে বুনে এসেছি , সেখানে উপসংহারে এসে দেখি আপনিই নেই । সূচনা থেকে উপসংহার, সবখানেই আপনাকে পেলো অন্যকেউ । আর আমি পেলাম স্মৃতিতে । আপনি রইলেন আমার অবাধ্য হৃদয়ে । পাগল আমি এখনো আশায় রইলাম । আশাহত তো আগেই করেছেন ।
কি করবো আমি , এই মন তো মানতে চায় না । আপনি আমায় বুঝলেন না সংগ্রাম ভাই । হৃদয়ে গেঁথে থেকে অন্য কাউকে চাপিয়ে দিলেন জীবনে । মুক্তি নিয়ে নিলেন আমার থেকে । আজ থেকে আপনি মুক্ত সংগ্রাম ভাই..! আর আমায় দেখতে হবে না আপনাকে । দেখবেন না আর আমায় । আর আসবো না আমি ।
আল্লাহ… সে বুঝলো না আমায়,, আল্লাহ , বুঝলো না…আর সে দেখবে না আমায় , আর কোনো দিন আসবো আমি …
মনের কথা গুমড়ে গুমড়ে মনেই রইলো । ফিকড়ে ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা । সালেহা ওকে তৎক্ষণাৎ আঁকড়ে ধরলেন !
” কাঁদছিস কেনো মা ? শুভ লগ্নে চোখের পানি ফেলতে নেই ।
সংগ্রামের ভারী আদেশ….
” আমরা অপেক্ষায় আছি বালা । সময় নষ্ট করিস না ।
বালা শ্বাস টানলো । অস্ফুটে অবশেষে উচ্চারণ করলো তিন অক্ষরের শব্দটা । একে একে থেমে থেমে তিন বার । অংকুর স্বস্তিতে চোখ বুজলো । ওর বলার পালাতে ও সময় নষ্ট করলো না একটুও । হলো বিয়ে । দু’জনে আবদ্ধ হলো পবিত্র বন্ধনে ।
সকাল থেকে দুপুর গড়াতে সময় লাগলো না । অংকুর ফিরবে । বালা কে সাথে নিয়ে । লতিফ জোয়ার্দার একবার কথা পাড়লেন..
দুদিন পর ছোট্ট পরিসরে ঘরোয়া ভাবে না হয় আয়োজন করে বালা কে পাঠাবেন তারা । অংকুর ওর মাকে নিয়ে এসে না হয় বালা কে নিয়ে যাবে তখন ।
তবে অংকুর শুনলো না । সটান ভাবে বললো..
‘ মা, তার বউ মাকে নিয়ে যেতে বলেছে । কোনো আয়জন করে সে বালা কে নিয়ে যেতে চায় না । এক কাপড়েই ঘরে তুলতে চায় তার স্ত্রী কে ।
সংগ্রাম ও একবার বাঁধ সাধলো অংকুরের কথায়…সেও বললো বালা কে যেন দুদিন পর নিয়ে যায় । তবে কারোর কথাই সায় পেলো না । বালা বিয়ের বেনারসী পাল্টে নতুন একটা শাড়ি পড়লো । বোরখা পড়ানো হলো উপরে । চোখ দুটো খোলা রেখে হিজাব, নিকাব পড়লো ।
অংকুরের পড়নে এখন সংগ্রামের পাঞ্জাবি , পাজামা আর শাল । বেশ অন্যরকম লাগছে ছেলে টাকে ।
অন্দরের বাইরে পুরো জমিদার বাড়ির লোক । চোখ ছাপানো জল লুকাতে ব্যাস্ত সবাই । সালেহা শাড়ির আঁচলে মুখ গুজে নিঃশব্দে ফোপাচ্ছেন । নিকাবের আড়ালে বালার ভাবগতিক দুর্বোধ্য । তবে খোলা দৃশ্যমান চোখ দুটো শান্ত । একদম স্থির । ও পিটপিট করে দেখছে সবাই কে । ওর জন্য আজ কাঁদছে সবাই ? ওকে বিদায় দিতে ? কিন্তু ওর কান্না পাচ্ছে না আর ? কেনো যেনো কাঁদতে ইচ্ছে করছে না । বুক ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু চোখ ফেটে জল গড়াচ্ছে না । বালা সবাই কে এক পলক করে দেখলো , এখানে তো ওর আম্মা ভাইজান কেউ নেই । ওরা বুঝি আসবে না বালা কে বিদায় দিতে ? কাঁদবে না বালার জন্য ?
সালেহা বালা কে বুকের মধ্যে জড়িয়ে কেঁদে উঠলেন ডুকরে । মেয়েদের বিদায়ের সময়টা বুঝি এমনই হয় ? বালা তো ওনার নিজের মেয়ে না হয়েও মেয়ে । মেয়ের থেকেও অনেক কিছু ! তার যে আজ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বালা কে বিদায় দিতে । তিনি তো চান এই দিনটা কখনো আসুক । কিন্তু কি হলো , ভাগ্যের পরিহাসে আসলো এই দিনটা । আজ বিদায় দিতে হচ্ছে বালা কে । সালেহা উপর উপর যতটা শক্ত , ভিতর ভিতর ঠিক ততটাই নরম । বলা চলে তার থেকে অধিক । ভীষণ মন পাতলা তার ।
তিনি সইতে পারছেন না বালার বিদায় । সালেহা কে কাঁদতে দেখে বালা মুচকি হাসলো । বললো শান্ত স্বরে…
” কেঁদো না মামি ! শুভ লগ্নে কাঁদতে নেই…
সালেহার কথা সালেহা কেই ফিরিয়ে দিলো ও । ঠোঁট কামড়ে কান্না চাপলো সালেহা । বালার মুখখানাতে হাত বুলিয়ে দিয়ে ধরা গলায় বলল…
” আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস ?
” উঁহু ,, মনে করিয়ে দিলাম তোমায় !
” তিন দিন পর আসবি তো ?
বালা মাথা নাড়ালো । মনে মনে বিড়বিড় করলো অন্য কিছু । লতিফ জোয়ার্দার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো হাসলেন । শবনম জড়িয়ে ধরলো ওকে । শ্যামাও তাই । সজল চোখে একে একে সবাই বিদায় দিলো বালা কে । বালা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে সবার সামনে দাঁড়ালেও সংগ্রামের কাছে ঘেঁষলো না । অংকুর দাঁড়িয়ে পেছনে । ও সংগ্রাম কে এড়িয়ে অংকুরের পাশে দাঁড়ালো । কপাল কুঁচকালো সংগ্রাম । একটু এগোলো ও , হেসে বালার দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলে তৎক্ষণাৎ মাথা নুইয়ে পেছালো বালা । হাসি টুকু আটকে গেলো সংগ্রামের । বাড়ানো হাত নামালো ধীরে ধীরে । বালার নতজানু চিত্তের পানে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । পর মূহুর্তে তপ্ত শ্বাস ফেলে অংকুরের দিকে তাকালো । স্বাভাবিক হেসে বলল…
” আজ থেকে আমার রাজকন্যা তোমার ঘরের রাজারানি । ঘরোনি তোমার , তোমার সম্পদ ও । ওকে কিন্তু সুখে রেখো…
বালা চোখ তুললো না । খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে মটরসাইকেলে উঠে বসলো অংকুর । বালা কে বলতে হলো না উঠতে । এক কদম পিছু ফিরে , আরো একবার ঘুরে তাকালো সবার দিকে । অন্দরের দরজার দিকে তাকিয়ে দুচোখে খুঁজলো নিজের জননী কে । এখনো আসলো না সে । বালা’ই বা কি , এখনো আশায় বুক পেতেছে তার আসার ।
অংকুরের পিছনে মাঝে দুরত্ব রেখে বসলো বালা । কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে চালু হলো মটর সাইকেল । জমিদার ফটক পেরোলো ধোঁয়া তুলে । চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত সকলেই চেয়ে রইলো ওদের দিকে ।
বিকেলের ঠান্ডা মিঠে হাওয়ায় অংকুরের ঝাঁকড়া চুল গুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে । বালা নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারছে না । মোটরসাইকেলে এর আগে কখনো ওঠে নি ও । উঠবেই বা কি করে ।
গ্রামের এঁকে বেঁকে রাস্তায় দুলে দুলে চলছে দুচাকা গাড়ি খানা । বালা দম খিচে চড়া গলায় বললো…
” ধীরে চালান , এসবে ওঠার অভ্যেস আমার নেই ।
” তুমি ধরে বসো…
তৎক্ষণাৎ অংকুরের পাল্টা কথা । পিছনের দিকে মুখ ফেরালো বালা । খানিক বাদ বালার কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে নিজে থেকেই গাড়ির গতি কমালো অংকুর । ফেরানো মুখ ঘোরালো বালা । অংকুর সামনের উত্তল দর্পণে বাঁকা দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো ওর নিরেট অভিমানী অক্ষি যুগল । অদ্ভুত লাগলো , মেয়েটা আজ কাঁদছে না ?
জমিদার গ্রাম পেরোতে বেশি সময় লাগলো না । গ্রামের শেষে রাস্তার বাঁকে বিরাট এই সাইন বোর্ডে লতিফ জোয়ার্দারের নাম লেখা । পরের বছর এখানে লেখা হবে সংগ্রাম জোয়ার্দারের নাম । সে তো জমিদার আগামীর । পরের বছর হবে হয়তো । লতিফ জোয়ার্দার জমিদারি দাখিল করবেন ওর হাতে ।
সংগ্রামের কথা মনে আসতেই নিকাবের আড়ালে আলতো হাসলো বালা । শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । শহরের রাস্তায় উঠতেই ধীরে ধীরে অংকুরের থেকে দূরত্ব ঘুচলো মেয়েটা । খেয়ালের বশে নিজে থেকেই ।
আপনা আপনি এক হাতে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো অংকুর কে । মুহুর্তেই মাথাটাও রাখলো অংকুরের প্রসস্থ কাঁধে । বালার আকস্মিক স্পর্শে ধক্ করে উঠলো অংকুরের সত্ত্বা । খানিক শিহরিত হলো সে । বালা ওকে জড়িয়ে ধরলো , তাও নিজে থেকে ! গলা শুকিয়ে আসছে অংকুরের । শিরশিরে ঠান্ডায় মাথার কাঁটা জায়গায় তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছিল এতক্ষণ , চোখ মুখ খিচে সহ্য করছিল অংকুর । এখন মনে হলো নিমিষেই সব যন্ত্রণা গায়েব । জড়ানো গলায় ঢোক গিললো সে । ডাকলো শীতল কন্ঠে…
” সুরবালা ?
” হুম !
বন্ধ চোখে উত্তর করলো মেয়েটা । চোখের কর্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা ব্যাথাতুর অশ্রু কণা গড়িয়ে পড়লো অংকুরের কাঁধের উপর ।
” ঠান্ডা লাগছে ?
” নাহ !
শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা । প্রথমেই হাসপাতালে এসেছে ওরা । অংকুর হাঁটছে কোনো রকমে । ওর পিছু পিছু চুপচাপ গুটি গুটি পায়ে সুরবালা । চোখ ঘুরিয়ে তাজ্জব চোখে দেখছে এদিক ওদিক । কি বিশাল হাসপাতাল । নতুন তৈরি করা হয়েছে বোধহয় , একদম নতুন চকচকে দেয়াল ।
দোতলার কেবিনে ঢুকে শান্ত কন্ঠে ডাকলো অংকুর…
” মা…
চকিতে ফিরলেন ‘শায়লা’ জমাদার । আধশোয়া হয়ে অপেক্ষমান ছিলেন তিনি । কখন তার ছেলে আসবে তার বৌমা কে নিয়ে । ধৈর্য প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলেন । তর সইছিলো না আর । অবশেষে তার ছেলে আসলো । মুখ খানাতে উজ্জ্বল হাসি ফুটলো তার । বাচ্চাদের ন্যায় এক ঝটকায় উঠে বসলেন তিনি । হন্তদন্ত হয়ে শুধালেন…
” এসেছিস ? কোথায় আমার বৌমা ? এনেছিস ওকে ?
অংকুর বোধহয় হাসলো নিঃশব্দে । পিছনে ফিরে ইশারা করলো সুরবালা কে । বালার বুক খানা কাঁপছে , ঢিপঢিপ অনুভূতি চড়াও হচ্ছে ।
ধীরে সুস্থে কেবিনে ঢুকলো ও । মুখে এখনো নিকাব । শায়লা হুড়মুড়িয়ে নামলেন ।
” মা ,, তোমাকে নামতে হবে না । ও যাচ্ছে তো তোমার কাছে ।
” তুই চুপ কর । একদম কথা বলবি না । একেই কতটা দেরি করে এসেছিস । আমি কতো অপেক্ষায় ছিলাম জানিস ? ওর চাঁদ মুখ খানা দেখা না অবধি শান্তি হবে না আমার ।
বালার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন তিনি । ফের পা উঠিয়ে বসে হাত বাড়িয়ে এক টানে নিকাব খুললেন বালার । আচমকা চমকালো মেয়েটা । শায়লার বিস্মিত দৃষ্টি । চোখ ভরে দেখছেন তিনি । বিস্মিত হয়েই হাত বাড়িয়ে বালার মুখ খানায় তৃপ্ত হাত ছোঁয়ালেন । চুমু খেলেন নিজের হাতে ।
বললেন মূক বনে…
” মাশাআল্লাহ , এটা আমার বৌমা ? এতো সুন্দর ! এই অংকুর , সত্যিই এটা তোর বউ তো ? তোর মতো গোমড়া মুখোর এতো মিষ্টি বউ ?
এরপর অংকুর কে আগাগোড়া পরখ করলেন তিনি । এতক্ষণে পুরোপুরি দৃষ্টিতে দেখলেন । চোখ কপালে তুলে বললেন…
” বাহ রে অংকুর , তোর ভোল পাল্টে তোকে এমন সুল্লু মুন্সী কে সাজালো রে ? আমার বউ মা ?
কপাল কুঁচকালো অংকুর । তার মা এমনই । বালা বোধহয় মজা পেলো । হাসলো ফিক করে । অংকুর বাঁকা চোখে দেখলো তা । শায়লা ওর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন …
” তোর নাম তো সুরবালা , তাই না ? !
জানিস কতক্ষন অপেক্ষায় ছিলাম তোর ! কাল যদি এক্সিডেন্ট না হতো , তাহলে কালকেই তোকে ঘরে তুলতে পারতাম । কিন্তু বিপত্তি ঘটে বিলম্ব হয়ে গেলো । আজ তোকে ঘরে তুলবো । পূর্ণ হবে আমার ঘর । অতো বড় বাড়িতে একটা স্থায়ী সঙ্গী পাবো আমি । আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে !
তোকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে আমার । মা হিসেবে আমায় কেমন লাগলো তোর….
বালার অস্ফুট স্বর…
” মা ?
” হুম । শোন তুই কিন্তু আমার মেয়ে ! আর আমি তোর মা ! আমাকে কিন্তু মা ভাববি । শাশুড়ি মা কেমন পর পর হয়ে যায় , মা তো আপন । আর আমি তোর পর হতে চাই না , আপন হতে চাই ।
শায়লার তেমন কোন ক্ষতি হয় নি কাল । তবুও অংকুর ওকে নিয়ে যায় নি নিজের সাথে ।
হাসপাতাল থেকে ওরা ফিরেছে কয়েক দন্ড আগে । বিশাল ‘শায়লা’ ভিলা । নামটা শায়লার নামে । জমিদার বাড়ির থেকে কোন অংশে কম নয় । বরং জাঁকজমকতা একটু বেশি । শহুরে আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে । আশেপাশেও বিশাল বিশাল দালান কোঠা । শহুরে ভাবটা অদ্ভুত । বালা এতোটা কল্পনাও করে নি । অংকুর কে দেখে মনে হয় নি এতোটা ধনী ওরা । আসার আগে জমিদারের দেওয়া সকল গয়না রেখে এসেছে সে । কিছুই সাথে আনে নি । আনতে দেয় নি অংকুর । সকলের সামনে সব গহনা নাকচ করে দিয়েছিল । শুধু নিয়ে এসেছে সালেহার দেওয়া বালা জোড়া । কাল থেকে এগুলো হাতে । বালার ফর্সা হাতে লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ হয়েছে এগুলোর ঘষায় ।
শায়লা বৌমা কে বাড়িতে এনেই নতুন গয়নায় মুড়িয়ে ফেলেছেন । খালি গা পূর্ণ করে দিয়েছেন ওর । গয়নায় মুড়িয়ে নিজের বৌমা কে চোখ ভরে দেখছেন । কতশত গল্প করলেন এর মাঝেই । বালা চুপচাপ শুনলো শুধু । উত্তর করলো টুকটাক । যা বুঝলো , শায়লা অংকুরের বিপরীত । মা ছেলে দুই মেরুর । শায়লা যতটা স্বতঃস্ফূর্ত, অংকুর ততটাই গম্ভীর, চুপচাপ । গয়নার সাজে বালা কে চোখ ভরে দেখে বালার অস্বস্তি বুঝে ভারী ভারী গহনা গুলো খুলে রাখলেন তিনি ।
শায়লা বালার নাক ফুল টাও পাল্টে দিয়েছেন । অংকুরের নামে নতুন করে নাক ফুল পড়িয়েছেন ওকে । গলায়, হাতে চিকন চিকন স্বর্নের চেইন আর চুড়ি । যা জ্বল জ্বল করছে ফর্সা চামড়ায় । নতুন লাগছে মেয়েটাকে । একদম অপরুপা । বিয়ের পর সৌন্দর্য বেড়েছে বই কমেনি ।
রাত আটটা নাগাদ ঘুমানোর অভ্যাস শায়লার । ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবনে ঘুমানো তার রোজকার রুটিন । আজ আটটা পেরোলো । ঘুমানোর নাম নেই । ঔষধ ও খাননি আজ । মোক্ষম ঔষধ পেয়েছেন , নিজের বউ মাকে । অবশেষে তার ভারমুখো ছেলের মতী ফিরলো । বিয়েও করলো এতো জলদি । ওর বন্ধুরা তো জানেই না ।
বালাও শায়লার সঙ্গে । এসেছে থেকে তার ঘরেই । অংকুর কে খাওয়ার সময় দেখেছে । সে নিজের ঘরে । রাত পেরোতে দেখে অংকুর নিজে থেকে আসলো মায়ের দোর গোড়ায় । আলতো টোকা দিয়ে গলা ঝেড়ে ঘরে ঢুকলো । ঢুকেই গম্ভীর আদেশ….
” এখনো ঘুমাও নি তুমি ? কটা বাজে খেয়াল আছে ? ঔষধ খাও নি কেনো ?
শায়লা মুখ ফেরালেন । বিড়বিড় করলেন মনে মনে ।
হুকো মুখো টা এসেছে জ্বালাতে !
সরবালা নুইয়ে গেলো । শায়লার কথায় আনমনে টুকটাক হাসছিল । গায়েব হলো হাসি টুকু । এক পলকেই চোখ নামালো ও ।
বরাবরের ন্যায় আড় চোখ অংকুরের । সেভাবেই দেখলো মেয়েটা কে । শায়লা বললেন…
” যা যা , জ্বালাতে আসবি না একদম । ঘুমাচ্ছি আমি । বয়ান শুরু করিস না এখন , কানের পোকা নড়ে যাবে তোর বয়ান শুনলে…
” তাড়াতাড়ি ঘুমাও । শরীরের দিকে খেয়াল নেই আর আমি বললেই দোষ…
বলতে বলতে পিছু ফিরলো । দরজা পর্যন্ত যেতেই শায়লার কন্ঠ…
” বউ কে নিয়ে যাবি না তোর ?
অংকুর একটু থামলে । ছলকে উঠলো বালা । অংকুর আর কিছু না বলে গটগটিয়ে বেরিয়ে গেল । বিড়বিড় করলো শায়লা…
” গোমড়া মুখো কেশবতী আমার , মুখে কিছু বলবি না আর আমি বললেই দোষ ।
বলেই স্মিথ হাসলেন । সুরবালার দিকে ফিরে নরম কন্ঠে বললেন…
” ঘরে যা মা ,, রাত হয়েছে অনেক ।
সুরবালা আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হুট করে শায়লার কোলে মাথা রাখলো । চোখ বুজে অদ্ভুত স্বরে বলল…
” আমি তোমার কাছে ঘুমাবো মা । আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে ? ভীষণ ঘুম পাচ্ছে….
শায়লা নরম হাসলেন । নিমিষেই হাত রাখলেন সুরবালার মাথায় । হাত বুলিয়ে শুধালেন…
” তোর মা তোর মাথায় এভাবে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো তোকে, তাই না ? অভ্যাস হয়ে গেছে মায়ের গন্ধে মেখে এভাবে ঘুমানো ?
সুরবালা বন্ধ চোখ দুটো খুললো । না চাইতেও আলতো শব্দ উচ্চারণ করলো…
” হুম !
দশটা পেরোলো । ঘুমে টলছে শ্যামা । হাই তুলছে বারবার । বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই তলিয়ে যাবে ঘুমের সাগরে । কিন্তু ওকে ঘুমের সাগরে তলিয়ে যেতে দিলে তো । সংগ্রাম ও ওকে ভাসাচ্ছে ওর পাগলামোর সাগরে । রাত বিরেতে শ্যামা কে গাঢ় খয়েরী রঙের বেনারসী পড়িয়ে হালকা সাজিয়ে বসিয়ে রেখেছে নিজের সামনে । গালে হাত ঠেকিয়ে মূর্ত বনে ও চেয়ে আছে শ্যামার পানে । শ্যামা খানিক বাদ বাদ ওর মূক বনে থাকা চেহারার পানে তাকাচ্ছে । এই লোকটা এভাবে কি দেখছে কে জানে ? ঘুমের রেশে কিছুই মনে ধরছে না শ্যামার । ও কাতর কন্ঠে একটু বিরক্তি নিয়ে বললো…
“ছোট জমিদার সাহেব ,, ঘুম পেয়েছে আমার !
” ইশশ্ , আমার বেগম কি সুন্দর !!
সংগ্রামের উল্টো কথা । চোখ সরু করে তাকালো শ্যামা । তাকালো নিজের দিকে । সংগ্রাম নিজে ওকে সাজিয়েছে । একবার ও নিজেকে দেখে নি ও । নিজেকে কেমন লাগছে তা জানতে বাকি নেই । তবে সংগ্রামের চোখে কেমন লাগছে তা জানতে ইচ্ছে করছে ।
” আমি ঘুমাবো !
” তোমায় দেখা শেষ হয় নি এখনো । আমার বেগম কে এভাবে নিজ হাতে সজ্জিত করে বউ রুপে দেখিনি আমি , দেখেছিলাম আমাদের বিয়ের দিন , পুরো রাত , প্রথম কোনো মেয়ের দিকে অতটা সময় চেয়ে ছিলাম আমি । কিন্তু সেই মেয়েটা তো আমাকে পাত্তাই দেয় নি । ঘুমিয়েছিল বিভোর হয়ে ।
তবে আজ তার পাত্তা পেয়েই ছাড়বো আমি । দেখি আজ সে আমায় উপেক্ষা করে ঘুমায় কিভাবে ?
শ্যামা ঘুমের ঘোরে ডুবলো । কি শুনলো কে জানে । হাঁটুতে মাথা কাত করে চোখ বুজে আনমনে প্রশ্ন করলো…
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩০
” আচ্ছা । কেমন লাগছে আমায় ?
” আমার চোখে তাকিয়ে দেখে নাও নিজেকে কেমন লাগছে । আমার চোখে যতটা মোহ দেখতে পাবে , ততটাই মোহময়ী লাগছে তোমায় ।
