শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩২
সুরভী আক্তার
ঘুম ভার চোখ দুটো তুললো শ্যামা । নিভু দৃষ্টি ওর । চোখ খুলে রাখা যাচ্ছে না ঘুমের তোপে । হাই উঠছে বারবার । সংগ্রামের বিমোহিত দৃষ্টি । ঘোরে আছে সে । শ্যামা হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ওর মূ্র্ত নেত্রের পানে । বালার কথা মনে পড়লো ।
সংগ্রাম ওকে বউ রুপে দেখেছে , সেই জন্যই হয়তো সাধ জেগেছে শ্যামা কেও দেখার । নরম হাসলো মেয়েটা । এই লোকটা অদ্ভুত । অথচ তার সাথে এই অদ্ভুত আচরণ গুলো একেবারেই মানায় না । সে তো সংগ্রাম জোয়ার্দার , সে কি এমনই ? আগে থেকেই ?
আগে থেকে হবে কি করে , আগে তো শ্যামা ছিল না ওর সাথে ! কার সাথে এমন করেছে ও ? শ্যামা তো ওর সব । শ্যামা নিজে কেমন সেটা এখন আর ভাবে না , এখন ভাবে সংগ্রামের কাছে ও কেমন !
শ্যামা মুচকি হাসলো । হাতে গাঢ় খয়েরী কাঁচের রিনিঝিনি চুড়ি, শাড়ির সাথে বনেছে বেশ । দুহাতেই দুটো করে চারটে মোটা মোটা কাঁচের চুড়ি । এগুলো অদ্ভুত । শ্যামা প্রথম বার দেখলো এমন চুড়ি । ওগুলোর মাঝে চিকন চুড়িও অগনিত । একটু নড়তেই ঝিনঝিন মৃদু শব্দ হলো চুড়ি গুলোর টোকায় । ফুলির দেওয়া চুড়ি গুলোর কথা মনে পড়লো । সেগুলো তো বাড়িতে , আর ফুলিও । কতদিন দেখা হয় না মেয়েটার সাথে । অথচ এক সময় কতোই না ভাব ছিলো , একদিন দেখা হলে প্রাণ বেরিয়ে যেত দুজনেরই । বাড়িতেও কতোদিন যাওয়া হয় না , আম্মার সাথেও দেখা হয় না । কেমন আছে ,না আছে কে জানে ? শ্যামা মনে মনে ভাবলো সংগ্রাম কে একবার বাড়িতে যাওয়ার কথা বলবে । অনেক দিন তো হলো, সংগ্রাম না করবে না নিশ্চয়ই । চেয়ে থেকেই মনে মনে কথা সাজালো শ্যামা ।
চোখে দীর্ঘ পলক ফেলে চুড়ি গুলোতে আঙ্গুল বোলাতে বোলাতে প্রসঙ্গ ঘেঁটে বললো…
” এগুলো তো মেলায় পাওয়া যায় , তাই না ?
” হাঁটে ও পাওয়া যায় !
” মেলাতেও পাওয়া যায় , আহাদ ভাই ফুলিকে এনে দিয়েছিল , আর ফুলি আমায় । যেদিন জঙ্গলে গেলাম , সেদিন ফুলির দেওয়া চুড়ি গুলো ছিলো আমার হাতে ।
” আজ ও আছে !
শ্যামা খানিক কপাল কুঁচকালো ।
” এগুলো সেই চুড়ি গুলো ? কিন্তু ওগুলো তো বাড়িতে । আর এতো গুলো ছিল না ।
মুচকি হাসলো সংগ্রাম । শ্যামার হাত দুটো টেনে নিলো নিজের দখলে । মোটা মোটা চুড়ি গুলোতে কয়েক টোকা মেরে চোখ তুললো শ্যামার দিকে । বললো…
” এই চুড়ি গুলো, এগুলোর মিশ্রনে তোমার ঐ দিনের ফেলে আসা ভেঙে যাওয়া চুড়ির টুকরোও আছে । জঙ্গলে ধাক্কা লেগে তোমার হাত থেকে যে চুড়ি গুলো ভেঙ্গে পড়েছিল , সেই ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো গুলো ও আছে এই চুড়ির মাঝে । এগুলো কিন্তু আমি বিশেষ ভাবে বানিয়েছি । তোমার রেখে যাওয়া ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো গুলো জানি না কেনো কুড়িয়ে এনেছিলাম সেদিন । পরে ঐ টুকরো গুলো দিয়ে এই চুড়ি গুলো বানিয়েছি । কেমন হয়েছে বলো..? আমার বেগমের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি এগুলো…
শ্যামার ঘুম কাতুরে অক্ষি যুগল বৃহৎ হলো । বিস্মিত হলো সে । কি বলে এই লোক ! শ্যামার হাত থেকে সেদিন জঙ্গলের মাটিতে কয়েকটা চুড়ি ভেঙে পড়েছিল । আর সেই চুড়ি এই লোক কুড়িয়ে এনেছিল । তাও আবার এখন সেই টুকরো গুলোর সমন্বয়ে এতো সুন্দর করে চুড়ি বানিয়েছে । শ্যামার জন্য ? শ্যামা এতোটা বিশেষ !
শ্যামা কে অবাক লোচনে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিঃশব্দে হাসলো সংগ্রাম । এই মেয়ে টা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারে নি সংগ্রাম কে । সময় লাগবে বুঝতে । তবে সংগ্রামের তো সময় লাগে নি । সে তো খুব সহজেই একেবারে মুখস্থ করে ফেলেছে এই মেয়ে টাকে । আর তার এই অবুঝ বেগম , তাকে বোঝেই না । নির্বোধ সে বড্ড ।
সংগ্রাম দীর্ঘ শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো । শ্যামা কে একটানে নিজের বুকে জড়ালো । চোখ বুজে বললো…
” এভাবে তাকিও না । নয়তো ভালো না । ঘুম পেয়েছে তো , ঘুমাও ।
শ্যামার ঘুম ছুটেছে মনে হয় । সংগ্রামের বুকে সেপ্টে গেলো ও । লাজুক হেসে চোখ বুজে ডাকলো…
” ছোট জমিদার সাহেব ?
” বলো বেগম !
” মেলা হবে না আমাদের গ্রামে ?
” হলো তো এবার । আবার পরের বছর হবে ।
” আপনারা মেলা উদ্বোধন করেন ?
” হুম ।
” পরের বছর আমাকে নিয়ে যাবেন মেলায় ? আমি না কখনো মেলায় যাই নি । আব্বা ময়না কে নিয়ে যেতো । আমি তো যাই নি । নিয়ে যাবেন আমায় পরের বার ?
চোখ খুললো সংগ্রাম । একটু মাথা তুলে শ্যামার পানে তাকিয়ে বললো….
” মেলায় যাবে ?
শ্যামাও মাথা তুললো । এক হলো দুজনের দৃষ্টি । ছোট্ট করে উত্তর করলো শ্যামা..
” হুম ।
সংগ্রাম ওষ্ঠ বাড়িয়ে শ্যামার নাকের ডগায় চুমু খেলো আলতো । ফের ওকে জড়িয়ে চোখ বুজে বললো…
” আচ্ছা নিয়ে যাবো । ঘুমাও এখন….
এক গাল হাসলো মেয়েটা । চোখ বুজলো তৃপ্ততায় ।
আবারো বাড়ির কথা মনে পড়তেই ঝট করে চোখ খুললো । গলা ভিজিয়ে আবার ডাকলো..
” ছোট জমিদার সাহেব…
” হুম !!
” বাড়ি যাবো । অনেক দিন হলো যাওয়া হয় না । আম্মার কথা মনে পড়ছে !
চোখ খুললো সংগ্রাম । ঠোঁট কামড়ে ফিচেল স্বরে বলল…
” এক্ষুনি তো ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিলে । এখন ঘুম আসছে না ? কেটে গেলো ঘুমের ঘোর ? অন্য কিছু করবো আমি ?
ভড়কালো মেয়েটা । তৎক্ষণাৎ চোখ খিচে বন্ধ করলো । এই লোক উল্টো বোঝে । সুযোগ খোঁজে সবসময় । শ্যামা জোরপূর্বক হাই তুলে বললো ঘুমের বাহানা ধরে বললো …
” ঘুম পাচ্ছে , ঘুমালাম ।
ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো সংগ্রাম । হাসতে ইচ্ছে হলো শব্দ করে । কিন্তু হাসি চাপলো । শ্যামার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে শ্বাস ফেললো । বুজলো দুচোখ ।
সকালের মৃদু তৃপ্ত হাওয়া । অলকা উঠোন ঝাড় দিচ্ছেন । ময়না বারান্দায় বসে । গায়ের চাদরে হাত পা ঢেকে রেখেছে একদম । ওষ্ঠ জোড়া নিজে নিজে কাঁপাচ্ছে । বাড়িতে এসেছে থেকে অলকার কাছে একদম হাতে তোলা হয়ে গেছে ও । সকালের রান্না বসাতে হবে । ঝাড় দিয়ে রান্নার কাজে লেগে পড়লেন তিনি । আজকাল শ্যামার জায়গায় চুলার পাড়ে ময়না গুটিসুটি মেরে বসে থাকে তার পাশে । অলকা মেয়েকে কিছু করতে দেন না । আগেই দিতেন না । এখন তো দূর । ময়না এখন আগের মতো হয়ে গেছে । সেটা উপর উপর । ভেতর ভেতর কি চলে তা দেহ মনের মালিক ব্যাতিত আর কে জানবে ?
আজ অর্ধ মাস পেরিয়ে কতদিন হলো ময়না টা ফিরেছে সেখান থেকে ।
অলকা আগের তুলনায় ওর দিকে বেশি তৎপর হয়েছেন । শুকিয়ে যাওয়া চেহারা খানা এই কদিনেই বেড়েছে একটু । বেহাল অবস্থার হাল ফিরেছে । ও বাড়িতে তো খেতে দিতো না ওকে । মার খেয়েই পেট ভরাতো মেয়েটা । কত কি সহ্য করেছে ও জানে । অলকা প্রসঙ্গ তুলে আমতা আমতা করে মেয়েকে বেশ কয়েক বার জিজ্ঞেস করে ছিলেন এই বিষয়ে । কিন্তু ময়না উত্তর করে নি । চুপ থেকেছে বরাবর । মেয়ের উহ্য কষ্ট বুঝে অলকা আর এই নিয়ে ঘাটেন নি । সময় দিয়েছেন ময়না কে । সময়ে সময়ে সব ঢেকে যায় । ময়নার জীবনে ঘটে যাওয়া অভিশাপ টুকুও কেটে যাবে ঠিক ।
রান্না শেষ হয় নি এখনো । উঠোনে কারোর পায়ের শব্দে চকিতে ফিরে তাকালেন অলকা । মায়ের আচমকা ফিরে তাকানোতে ময়নাও চাইলো । অলকা অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন…
” আপনি ?
সকালের নাস্তায় বসেছে অংকুর । শায়লা সামনের চেয়ারে । তার পাশের চেয়ারে বালা । একজন মাঝবয়সী মহিলা আছেন রান্না বান্না আর শায়লার দেখা শুনার জন্য । তার নাম জাহানারা । তিনিই নাস্তা তৈরি করে দিয়েছেন । শায়লার পাশে দাঁড়িয়ে বারবার আড়চোখে দেখছেন বালা কে । মেয়েটা ইতস্ততায় গুটিয়ে আছে । মুখে এক টুকরো রুটি তুলে কোনো রকমে চিবুচ্ছে । অংকুর অবশ্য একবারও তাকায় নি ওর দিকে । ও মাথা নুইয়ে নিজের মর্জি মতো আনমনে গিলে যাচ্ছে । এতক্ষণে জাহানারা কে হাজার বার বালার কথা বলে ফেলেছেন শায়লা । একদিনেই কি চিনলো মেয়েটাকে কে জানে । আন্দাজে কত গুনগান গাচ্ছেন বউমার । এমনিতেও তিনি চুপ থাকতে পারেন না ।
কথা বলতে বলতে বালার দিকে তাকিয়ে আরো একটা রুটি তুলে দিলেন ওর পাতে । তৎক্ষণাৎ বৃহৎ নয়নে চাইলো মেয়েটা ।
” আমি এতো রুটি খেতে পারি না , মা ! খাবো না আর…
শায়লা ভ্রু গুটালেন…
” খাবি না মানে ? চেহারার কি অবস্থা তোর ? এভাবে খেলে হবে ? বেশি বেশি করে খেতে হবে এখন থেকে বুঝলি ?
বালা মুখের খাবার টুকু গিললো কোনো রকমে । এতক্ষণে বাঁকা চোখে তাকালো অংকুর । ওর তো খেয়ালই ছিল না এদিকে । নিজের উপর বিরক্ত হলো সে । সুরবালার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো । এক পলকে চোখ সরিয়ে ওর পাত থেকে তুলে নিলো রুটি দুটো ।
” খেতে হবে না ।
মেয়েটা ঝট করে চাইলো । শায়লা চোখ খিচলেন । কিছু বলার আগেই অংকুর আদেশ করলো জাহানারার উদ্দেশ্যে…
” ও শুকনো খাবার-রুটি খেতে পারে না । পরোটা পছন্দ ওর । ওর জন্য পরোটা বানিয়ে নিয়ে আসুন ।
কুঁচকানো চোখ দুটো শিথিল হলো শায়লার । বালা অবাক লোচনে তাকিয়ে । এই লোক কি করে জানলো ও রুটি খেতে পারে না ? অংকুর চোখ নামিয়ে ফের খাওয়ায় মনযোগ দিয়েছে । শায়লা আফসোসের সুরে বিচলিত হয়ে বললেন…
” তুই রুটি খাস না , আগে বলবি তো । না বললে জানবো কি করে ? বেকার বেকার জোর করে খাচ্ছিলি এতক্ষণ ।
আর এই যে গোমড়া মুখো কেশবতী , তুই যখন জানতিস আমার বউমা এসব খেতে পারে না, তখন আগে বললি না কেনো ? মেয়েটা না বলে কষ্ট করে খাচ্ছিল চোখে পড়ে নি তোর ? গায়ে লাগে না….
অংকুরের খাওয়া শেষ । পেট ভরেছে , তবে প্লেট ফাঁকা হয় নি । ও উঠতে উঠতে বললো দায় সারা ভাবে…
” বউ মা তোমার হলেও বউ আমার । আমার গায়ে একটু বেশিই লাগে বুঝলে ? চোখে পড়ে নি , তাই দেখিনি , দেখলে ওকে কষ্ট করে খেতে হতো না ।
” উহহহ… দেখবি কি করে । এক হাত চুল রেখেছিস যে । কেশবতী আমার ! চুল দিয়ে লজ্জায় চোখ ঢেকে বেরায় সারাদিন । বেনী করে ঘুরতে পারিস না !
শোন বউমা , ওর চুল গুলো কেটে দিবি তো । বাদর থেকে মানুষ বানাবি ওকে । কতো বলি ,, চুল গুলো একটু ছোট ছোট করে কেটে ফেল । সুন্দর লাগবে , কিন্তু আমার কথা শুনলে তো ।
” এভাবেও তো সুন্দর লাগে !
আচমকা মুখ ফসকে বলে বসলো মেয়েটা । আরো কিছু বলার আগেই থামলো । অংকুর হাত ধুয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়েছিল । বালার আকস্মিক ছোট্ট কথা টুকুতে থমকে গেল ওর পা দুটো । তৎক্ষণাৎ চাইলো পিছু ফিরে । বালার সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ সরালো মেয়েটা । মুচকি হাসলো অংকুর । খানিক দাঁড়িয়ে থেকে ঝটপট সিঁড়ি বেয়ে উঠলো ।
জাহানারা তড়িতে পরোটা বানিয়ে এনেছেন ।
শায়লা কথার মোড় ঘোরালেন…
” জানিস বউমা , আমার অংকুর টা না একদম ওর বাবার মতই হয়েছে । নাক উঁচু, গুরুগম্ভীর একেবারে । সবসময় কাঠ হয়ে থাকে । কিন্তু ওর ভেতরটা একেবারে ঘুনে ধরা ।
ওকে একটু যত্ন করে রাখিস কেমন ! সারাজীবন তো আর আমি থাকবো না । বুঝে, শুনে, মানিয়ে নিস ওর সাথে । আমি তো ওকে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতাম । ও যে কাউকে হঠাৎ করে এভাবে বিয়ে করবে , ভাবিই নি কখনো ।
বালা নীরবে শুনলো কথা গুলো ।
এদিকে অংকুর ঘরে এসেই প্রথমে আয়নার সামনে দাঁড়ালো । নিজেকে কপাল কুঁচকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো । আয়নাতেই নিজের মাথার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । কপালে এলোমেলো হয়ে লুটিয়ে পড়া চুল গুলো একহাতে পিছনের দিকে ঠেলে গুছিয়ে নিলো । কেমন যেন দেখাচ্ছে । ও এভাবে নিজেকে দেখে অভ্যস্ত নয় । অংকুর ফের চুল গুলো এলোমেলো করে দিলো । কপালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো চুল গুলো । ও মাথা ঝাঁকিয়ে আবার আয়নার দিকে তাকালো । নিজেকে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো এবার । বুক খানা কেমন উরু উরু করছে । এ অনুভূতি প্রথম । আগে তো কখনো এমন হয় নি । কি বলা যায় এই অনুভূতির সংঙ্গায়িত রুপ কে ।
নিজেকে দেখে ফিক করে হেসে ফেললো অংকুর । এভাবে হাসেও না ও ।
হাসতে হাসতে একটু বসে নিচের ডয়ার থেকে কতগুলো মোটা মোড়ানো কাগজ বের করলো । ভিতরি পৃষ্ঠ রঙিন । আঁকি বুকি করা । যার নির্দিষ্ট একটা রুপ আছে । নির্দিষ্ট একজনের রুপকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রঙিন আঁকি বুকির মাধ্যমে । কোথায় চোখ , কোথাও পুরো মানবী , আর কোথাও হাস্যোজ্জ্বল ওষ্ঠ জোড়া । এগুলো দেখে মুচকি হাসলো ছেলেটা ।
আজ সংগ্রাম সারাদিন বাড়িতে । ঘুর ঘুর করছে ও । শ্যামা ঘরে না থাকায় এতোক্ষণ পায়চারি করছিল ঘরে । শ্যামা ঘরে আসতেই থমথমে মুখখানা আরো থমথমে করলো । নিজেকে গম্ভীর করে আবারো পায়চারি করলো । বিকেল গড়ালো , এই মেয়েটা এক মুহুর্তের জন্যেও এক দন্ড বসলো না সংগ্রামের কাছে ।
শ্যামা এগোতে এগোতে ওর থমথমে মুখ খানা দেখে শুধালো…
” কি হয়েছে ?
” কিছু না ।
” দাদি জানের কোমরে ব্যথা বেড়েছে । তেল মালিশ করে দিলাম ।
” তো আমায় বলছো কেনো ?
” কাকে বলবো ?
” দাদি জান কে গিয়ে বলো ।
মুচকি হাসলো শ্যামা । বললো অবিলম্বে…
” আচ্ছা যাচ্ছি ।
” এই মেয়ে , কোথায় যাচ্ছো আবার ।
তৎক্ষণাৎ ডাকলো সংগ্রাম । শ্যামা পিছু ফিরলো । অবুঝ ভঙ্গিতে নাকের ডগা বরাবর কপাল কুঁচকে সোজা সরল বললো…
” আপনি তো দাদি জানের কাছে যেতে বললেন । সেখানেই যাচ্ছি ।
সংগ্রাম অক্ষি যুগল তীক্ষ্ণ করলো । পেছনে গোটানো হাত জোড়া বুকে গুজলো । গম্ভীর হয়েই বললো….
” কোথাও যেতে হবে না । আমার সাথে চলো…
বলেই এগিয়ে হাত ধরলো শ্যামার । টেনে নিয়ে যেতে লাগলো । শ্যামা আহাম্মকের ন্যায় শুধালো বিচলিত হয়ে…
” আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ?
” গেলেই দেখতে পাবে ।
অন্দর পেরিয়ে সোজা বাইরে নিয়ে আসলো শ্যামা কে । মাথায় এক হাত ঘোমটা টেনে দিয়েছে বাইরে বেরোনোর আগে । আহাদ নেই । শ্যামা কে জিপে ওঠালো সংগ্রাম । নিজে ঘুরে গিয়ে বসলো চালকের জায়গায় । ঘোমটা তুলে পিটপিট করে উঁকি দিলো শ্যামা । সংগ্রাম গাড়ি চালাতেই মুখ ফাঁক করলো অবিশ্বাসে । এই লোক ওকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে ? কিন্তু কোথায় ? বাড়িতে ? কাল তো বাড়ির কথা বলেছিল শ্যামা ?
আন্দাজে বাড়ির কথা ঠেকতেই খুশিতে নেচে উঠলো শ্যামার মন । ও গদগদ হয়ে শুধালো…
” ছোট জমিদার সাহেব ,, বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ?
সংগ্রাম কপাল কুঁচকে তাকালো , তবে উত্তর করলো না ।
গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত না হলেও শতবার শ্যামা এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে সংগ্রাম কে । কিন্তু সে উত্তরে টু শব্দ ও করে নি । দূরে কোথাও গাড়ি থামলো । সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত । সামনে টা অন্যসময় বিশাল খোলা মাঠ । তবে এখন নয় । ওদিক টায় তাকালো শ্যামা । বুঝলো না কিছু । সংগ্রাম ওকে কোথায় নিয়ে আসলো কে জানে !
অনেক দোকান পাট সামনে । ঝিলিমিলি আলো জ্বলছে সন্ধ্যার আঁধারে । সংগ্রাম গাড়ি থেকে নেমে শ্যামা কে নামালো । ওর মাথার ঘোমটা খানা ভালো ভাবে টেনে দিলো । শ্যামার নাক টানলো আহ্লাদে । হাত শক্ত করে ধরে এগোলো সামনের দিকে । শ্যামা ওর পায়ের সাথে পা মেলাতে ব্যাস্ত । আড়ং বসেছে জমিদার গ্রামের শেষ মাথায় । বসেছে নয় , বসানো হয়েছে । হোই হট্টগোল হীন , জনমানবশূন্য আড়ং । লাইন ধরে কতগুলো দোকান । সব ধরনের দোকান । শ্যামা গুটি গুটি পায়ে আশপাশ অবলোকন করতে করতে এগোলো । তাজ্জব মেয়েটা । ঝিকঝিকে আলোয় আলোকিত চারদিক । সারি সারি দোকানে একেক জন মহিলা দোকান দার । মাঝ বয়সী তারা । তাদের বিমূর্ত অবাক দৃষ্টি এদিকেই । আশেপাশে তারা ব্যতীত অন্য কারোর একটা অস্তিত্ব ও নেই । সংগ্রাম থেমেছে একটু । শ্যামা ও দাঁড়ালো । সংগ্রাম মাথা ঝুকিয়ে স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে অভিবাদন জানালো তার বেগম কে….
” আমার বেগম কে স্বাগত জানাই এই মেলায় ।
তার ছোট্ট ইচ্ছা পূরনের জন্য তার এই ছোট জমিদার সাহেব ছোট্ট একটা আয়োজন করেছে শুধু । তার কি পছন্দ হয়েছে তার ছোট জমিদার সাহেবের আয়োজিত এই মেহফিল..?
শ্যামা তাজ্জব । বাক রুদ্ধ । চোখ কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । গোল গোল নেত্রে তাকিয়ে ও । সংগ্রাম ওকে মেলায় নিয়ে এসেছে ? কাল তো ও এমনি এমনি কথার মাঝে বলেছিল ওর ইচ্ছের কথা । ও তো কখনো যায় নি মেলায় ।
নিজের ইচ্ছের কথা প্রকাশ করেছিল শুধু । কিন্তু সংগ্রাম ওকে এভাবে এক রাতের ব্যবধানে এমন করে চমকে দেবে,এটা ওর অলিক কল্পনাতেও ছিল না । অবশ্য সংগ্রামের কোনো কার্যকলাপ কখনোই ওর কল্পনায় থাকে না ।
এই লোকটা অদ্ভুত । একেবারেই অদ্ভুত । শ্যামা অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে মুখ খুললো…
” মেলায় নিয়ে এসেছেন আমায় ?
” এটা তো মেলাই মনে হচ্ছে !
সংগ্রাম খানিক নাটকীয় ভাবুক ভঙ্গিতে উত্তর করলো ।
” সত্যি এটা মেলা ?
” হুম ! মেলাই তো !
” এ বছর তো মেলা শেষ হয়ে গেছে ।
” আপনার জন্য শুরু হয়েছে আবার !
” আমার জন্য ?
” আমার বেগমের জন্য !
” কবে শুরু হলো ?
” আজ সকাল থেকে !
” এতো তাড়াতাড়ি ?
” হুম , আপনার ইচ্ছের প্রাধান্যয় একটু বেশি তাড়াতাড়িই শুরু হয়ে গেলো ।
শ্যামা চুপ । কথা হারালো ও । খানিক বাদ চাপা কম্পিত স্বরে বলল…
” আমার ইচ্ছেতে মেলার আয়োজন করেছেন আপনি ?
সংগ্রাম উত্তর করলো না । তবে ওর উত্তর ওর দৃষ্টিতে বুঝে নিলো মেয়েটা । প্রশ্ন করলো আবার…
” এ আবার কেমন মেলা ? কেউ নেই কেনো ? মেলায় তো অনেকে থাকে ? কতশত মানুষের ভিড় থাকে..
” অনেকের জন্য আয়োজিত মেলায় অনেকে থাকে । এটা তো সবার জন্য আয়োজন করা নয় । এই ছোট্ট আয়োজন শুধুই আমার ডালিয়ার জন্য । তার হক আছে শুধু এই আয়োজনে । অন্যরা বরখাস্ত এই প্রদর্শনী থেকে । এটা শুধু আর একান্তই আমার বেগমের প্রাধান্যে আয়োজিত । আমার শ্যামা সুন্দরীর জন্য..
অন্যরা কেনো থাকবে এখানে ?
সজল হয়ে আসলো শ্যামা সুন্দরীর অক্ষি যুগল । এতোটা প্রাধান্য তার ? তার ইচ্ছের ? তার কপালে এতোটা সুখ লেখা ছিলো ? এতোটা প্রশন্য তার ভাগ্য !
কেঁদে ফেললো মেয়েটা । বিচলিত হয়ে পড়লো সংগ্রাম । শ্যামার নরম দু গাল নিজের দুহাতের আজলে নিয়ে নরম কন্ঠে বলে উঠলো…
” কি হলো বেগম , কাঁদছো কেনো ? কাঁদার মতো কি এমন বললাম আমি ?
দুদিকে মাথা ঝাকালো শ্যামা । সংগ্রাম মুচকি হেসে কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়াতে গেলে নাক টেনে জড়তা নিয়ে বাঁধ সাধলো শ্যামা…
” আশেপাশের সবাই দেখছে ?
এদিক ওদিক তাকালো সংগ্রাম । প্রত্যেক দোকানে বসে থাকা মাঝ বয়সী মহিলারা অধির আগ্রহ নিয়ে এদিক টায় চেয়ে । তারা বিমোহিত হয়ে চেয়ে দেখছে সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম কে । চোখ জোড়া সূক্ষ্ম করলো সংগ্রাম । অমনি থতমত খেয়ে দৃষ্টি ফেরালো সকলে । সংগ্রাম নিজের ফেলে রাখা কাজটা সারলো তড়িঘড়ি করে ।
সামনের ঝকঝকে রং বেরঙের কাঁচের চুড়ির দোকান । সেখানেই প্রথমে এগোলো ওরা । মহিলা টা শ্যামার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো । সংগ্রামের দিকে এক পলক চেয়ে চোখ ফেরালো লাজুকতায় । সংগ্রাম তাকে উদ্দেশ্য করে বলল…
” যত প্রকার আর যত রঙের কাঁচের চুড়ি আছে সব গুছিয়ে দিন আমার বেগমের জন্য ।
” এতো সব নিয়ে আমি কি করবো ?
” হাতে পড়বে !
” এসব কি সবসময় পড়ে থাকার জিনিস ?
” সবসময় না হলেও আমার সামনে পড়বে !
মহিলা টা ঠোঁট চেপে হাসলো । কারু কার্য পূর্ন সবচেয়ে সুন্দর সূক্ষ্ম কাজের এক ডজন কাঁচের চুড়ি বের করলেন তিনি ।
” আমার দোকানের এই চুড়ি গুলো সবচেয়ে বেশি মূল্যবান । আর কোথায় পাবেন না এগুলো ।
ছোট জমিদার সাহেবা , হাত বাড়িয়ে দিন । আমি পড়িয়ে দিচ্ছি ।
বাঁধ সাধলো সংগ্রাম…
” প্রয়োজন নেই , আমায় দিন আমি পড়িয়ে দিচ্ছি আমার বেগমের হাতে ।
মহিলা টা কথা বাড়ালেন না । সংগ্রাম অতি যত্নে চুড়ি পড়িয়ে দিলো তার বেগম কে । হাত ঝাঁকিয়ে রিনিঝিনি শব্দ শুনলো কয়েকবার । মুচকি হেসে বললো…
” এবার ঠিক আছে , আমার প্রয়োজনে প্রিয়জনের জন্য ছোট্ট একটা উপহার ।
পাশের দোকান গুলোতে এগোতে এগোতে শ্যামা চাপা স্বরে প্রশ্ন করলো…
” সব দোকানেই মহিলা দোকানদার কেনো ?
” কারন অন্য পুরুষ হারাম আমার বেগমের জন্য । অন্য পুরুষের দৃষ্টি হারাম আমার ডালিয়ার উপর । তোমার উপর কারোর বাঁকা দৃষ্টি ও আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয় । তুমি তো আমার , তাহলে অন্য কেউ কেনো দেখবে তোমায় ? তোমাকে দেখার অধিকার শুধু আমার..
” ও আচ্ছা , তাহলে এখন সব মহিলা গুলো যে আপনাকে দেখছে , তার বেলা ? আপনাকে দেখার অধিকার সবার বুঝি ?
” আমি তো কাউকে দেখছি না । আমি তো শুধু তোমাকেই দেখছি । যদি অন্যরা আমায় দেখে থাকে , আর এতে যদি তোমার সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে বোরখা পড়ে আসি,কি বলো ?
হেসে ফেললো শ্যামা ।
সংগ্রাম হাসি চেপে আশেপাশের দোকান গুলোকে দেখিয়ে প্রফুল্ল কন্ঠে বলল….
” কি কি প্রয়োজন সব নিয়ে নাও । এসব শুধু তোমার জন্য । সব কিনে রাখা আমার বেগমের জন্য । তুমি চোখ তুলে যেটার দিকেই তাকাবে , সেটাই তোমার হবে বেগম । তোমার দৃষ্টি যেটাতেই পড়বে সেটাই লেখা হবে তোমার নামে ।
শ্যামা শুনলো । এবার দৃষ্টি স্থির করলো সংগ্রামের পানে । পলক হীন এক দৃষ্টি । ডাগর অক্ষি যুগল স্বাভাবিক । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি । সংগ্রাম ওর দিকে চোখ ফেরাতেই ওর দৃষ্টির সম্মুখীন হলো । দুজনের চোখাচোখির মাঝেই আচমকা বলে বসলো শ্যামা….
” যদি তেমনই হয় , তাহলে তো আমি সহস্র বছর নিষ্পলক আপনার দিকেই চেয়ে থাকবো ছোট জমিদার সাহেব । আপনি শুধু আমার হয়ে থাকুন । এই জগৎ সংসারে আর কিচ্ছু লাগবে না আমার !
” আমি তো তোমারই !
” আমারই থাকুন । আমি তো আর কিচ্ছু চাই না । শুধু আপনাকেই চাই ।
” আমার সুফিয়ানা কেও চাও না ?
ডান ভ্রু উঁচিয়ে ঠোঁট চেপে ছোট করে প্রশ্ন করলো সংগ্রাম..
মেয়েটা তৎক্ষণাৎ চোখ নামালো ।
” তাকে তো আমার চেয়ে আপনি বেশিই চান ।
” তো তাকে দিয়ে দাও না আমায় ।
এশার আজান পড়তেই বাড়ি ফিরেছে আফতাব । গায়ে একটা ভারী কাপড়ও নেই । ঠান্ডায় হাত-পা জমে গেছে । কাঁপতে কাঁপতে সোজা ঘরে ঢুকলো সে । ফতুয়া আর লুঙ্গি নিয়ে ফের বেরোলো ঘর থেকে । হাত মুখ ধুয়ে ঘরে আসলো আবার । এতক্ষণে মাথা তুললো । টেবিলের উপর থেকে সরিষার তেলের বোতল টা হাতে তুলে নিয়ে খাটের উপর বসতে বসতে এক পা খাটে তুললো । চোখ তুলতেই আচমকা সামনে কাউকে দেখে কপাল কুঁচকে আসলো ওর । দৃষ্টি সরালো মুহূর্তেই । চোখ বুজলো মাথা কাত করে । আজকাল যে কি হয়েছে কে জানে । যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই একজন ধরা পড়ে চোখে । ধ্যানে ঘুরতে থাকে সবসময় । আফতাব তো ভাবে না তার কথা । তাহলে কল্পনায় আসে কি করে কে জানে ?
আফতাব আর চোখ তুললো না । দুহাতে তেল ঘঁষে দাঁত চেপে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করলো মুখে মুখে । নিজের উপর ভীষণ বিরক্ত সে !
হাতে পায়ে তেল মালিশ করে আবারো চোখ তুললো সামনে । আবারো একই দৃশ্য , একই ছায়া মানবী । মাথা নুইয়ে কোন রকমে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানবী । আফতাব চোখ সরালো না এবার । বরং চোখ সরু করে মনের ধারনায় ছায়া মানবীর উদ্দেশ্যে ঝাড়ি মারলো…
” একটা থাপ্পর মারবো । যাবে এখান থেকে ..?
চমকে উঠলো ভীত মানবী । পিছিয়ে গেল চোখ মুখ নামিয়ে । আফতাব এবার ভ্রু কুঁচকালো অধীক । আগা গোড়া পরখ করলো সামনের মেয়েটাকে । ধ্যানেই বাতাসে প্রশ্ন ছুঁড়ল…
” কি চাই এখানে ? কেনো আসো বারবার আমার সামনে ? মাথায় চড়ে বসে আছো কেনো এভাবে ?
মেয়েটা ঢোক গিললো । আফতাবের উঁচু কন্ঠ বাইরেও পৌঁছেছে । ওর বাবা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন । গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন চাপা স্বরে….
” মাইয়াটারে ধমকাইতাছো ক্যান ?
” আরে দেখো না ,, মাথায় গেঁথে বসে আছে একদম । নামছেই না…
বলতে বলতে থেমে গেল আফতাব । নিজের বাবার দিকে তাকালো, অন্য পলক ময়নার দিকে । এটা সত্যি ! ভ্রম নয় !
আফতাব ভড়কালো, বিস্মিত হলো ।
সামনে ময়না দাঁড়িয়ে ।
ঢোক গিললো আফতাব । নিজের বাবার দিকে ফিরে নিজেকে স্বাভাবিক করে অবিশ্বাস কাটিয়ে কন্ঠ ভার করলো….
” ও এখানে কি করছে ?
” আমি আনছি , আমার লগে আইছে ।
” আপনি এনেছেন মানে ? কেনো এনেছেন ওকে ? আর আমার ঘরে কি করছে ও !
” ও তোমার বউ , ভুইলা গেছো ?
আফতাব চেহারার ভঙ্গিমা শক্ত করলো । চোখ বুজতেই সেদিনের কথা মনে পড়লো ।
সেদিন বিকেল হতেই মানিকের প্ররোচনায় গ্রাম বাসির যৌথ চাপের মুখে পড়ে ময়না কে বিয়ে করতে হয়েছিল আফতাব কে । জোর পূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছিল দুজনের । মানিকের দেওয়া বিশ্রী অপবাদের সম্মুখীন হয়েছিল ময়না । যে অপবাদ আফতাব কে ঘিরে । ময়না কে অপদস্থ করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল সবার মাঝে ।
যার কোনঠাসায় পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল আফতাব । বিয়ের পর পরই বাড়ি থেকে রাগারাগী করে বেরিয়ে গেছিলো সে । পরে অলকাদের আগমন । তাদের এই বিয়ে সম্পর্কে কিছু না জানিয়ে ময়না কে পাঠিয়ে দিয়েছে আফতাব । আফতাবের বাবা এই নিয়ে মুখ খোলেননি । তিনি সময় দিয়েছিলেন ছেলে কে ।
আজ সকাল সকাল মাধবপুরে গেছিলেন তিনি । অলকা কে জানানো হয়েছে আজই । ময়না কে নিয়ে এসেছেন তিনি । ময়না আসতে চায় নি । তবুও এসেছে , কোন তাগিদে কে জানে !
আফতাব আজ সারাদিন বাড়িতে ছিল না । সবে ফিরলো । ফিরেই মুখোমুখি হলো এসবের । ও তো ভেবেছিল রোজকার মতো আজও ঘোরে আছে । আজকাল আবার ময়না একটু বেশিই ঘোরের মাঝে দেখা দেয় ওর । তবে আজ ঘোরে নয় , বাস্তবে ।
আফতাব দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকলো । শক্ত কন্ঠে বলল…
” কেনো এনেছেন ওকে ?
” বিয়ে হইছে তো ! বাপের বাড়ি কয়দিন থাকবো আমার বউমা ?
” বাপের বাড়ি পাঠিয়ে ছিলাম ফিরিয়ে আনার জন্য নয় ! বিয়ে হয়েছে , সম্পর্ক তৈরি হয় নি ।
” যদি সম্পর্ক তৈরি না করতে চাও , তাইলে মুক্তি দেও হেরে ! বাইন্ধা রাখছো ক্যান নিজের সাথে বিবাহ বন্ধনে ? তুমি মানলেও বিয়া হইছে , না মানলেও বিয়া হইছে ! এখন বাদ বাকি তোমার হাতে…
আফতাব ফুসলো । হাতের মুঠো শক্ত করলো । ভীষণ রাগ উঠছে নিজের প্রতি । মন মস্তিষ্ক দুটো ভিন্ন ভিন্ন দিকে ।
খালেদা এসে দাঁড়িয়েছে । মুখখানা মলিন তার । ময়না একপাশে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে । আফতাবের বাবা ময়নার পানে তাকিয়ে আবার বললেন…
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩১
” মাইয়া টার তো দোষ নাই । মানিকের মতো পাষন্ড হইবা না জানি । ওরে আনছি আমার দায়িত্বে । আমার মুখ যেন ছোট না হয় ।
বলেই বেরিয়ে গেলেন তিনি । আফতাব উঠতে উঠতে চড়া গলায় আদেশ ছুঁড়ল….
” আম্মা,খুদা লাগছে । খেতে দাও….
