Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৭

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৭
সুরভী আক্তার

শ্যামা রান্না ঘরে মহা ব্যস্ত । আজকাল সংগ্রাম কে পাত্তাই দেয় না । অবশ্য শ্যামা কে অধীকক্ষন কাছে না পেলে এটাই মনে হয় সংগ্রামের । বাড়িতে এতো এতো কাজের লোক , তবুও এই মেয়েকে রান্না ঘরে রান্নার কাজে হাত লাগাতে হবে কেনো ?
সংগ্রাম সেই কখন থেকে ঘরে অপেক্ষা করছে । ঘর থেকে বেরিয়ে উপর থেকেই গলা উঁচিয়ে তিন-তিন বার ডেকেছে শ্যামা কে । শ্যামা বরাবরই , এই যাচ্ছি বলে কাজ চালিয়েছে । থামিয়ে রেখেছে সংগ্রাম কে । সংগ্রাম ধৈর্য হারা । বেগমের অতিব বিরহ সহ্য হয় না জমিদারের ।
ধৈর্য কুলাতে না পেরে এবার ঘর ছাড়লো সংগ্রাম । সোজা নিচে নামলো । হেঁশেলে ঢুকলো দ্বিধা হীন । হেঁশেলে বেশ কজন রান্নার লোক । শ্যামা চুলার সম্মুখে খুন্তি নাড়ছে । কষা মশলার ঝাঁজালো গন্ধ ধক্ করে নাকে বিধলো সংগ্রামের । শ্যামা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছে , আর একজন মহিলা এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছেন শ্যামা কে । বাকিরা সবটা হাতের নাগালে প্রস্তুত করে দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জমিদার গিন্নির রান্না দেখছেন । সংগ্রাম কে ভেতরে ঢুকতে দেখা মাত্রই চকিতে তাকিয়ে মাথা নিচু করলেন সকলে । মশলার ঝাঁজালো গন্ধের দরুন শ্যামা সংগ্রামের উপস্থিতি টের পায় নি । সংগ্রাম ইশারা দিতেই একে একে রান্না ঘরের সবাই মাথা নামিয়ে জায়গা ত্যাগ করলেন শ্যামা কে একা রেখে । বাইরে বেরিয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে মিটমিট করে হাসলেন ।
শ্যামা মশলা কষাতে কষাতে পিছনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো…

” জিরে গুঁড়োর বয়াম টা দিন তো এখন ।
সংগ্রাম বুকে হাত গুটিয়ে শ্বাস ফেললো । বসলো হাঁটু মুড়ে । এখানে অনেক গুলো বয়াম । এর মধ্যে জিরে গুঁড়ো কোনটা ? কপাল কুঁচকে সবগুলো বয়াম নেড়েচেড়ে দেখলো সংগ্রাম । ওদিকে শ্যামা পিছনে না তাকিয়ে আবার চাইলো..
” কি হলো ,‌দিন !
সংগ্রাম না জেনে , না দেখে একটা বয়াম এগিয়ে দিলো । শ্যামা সেটা হাতে নিয়ে ঢাকনা খুলেই হতবাক হলো । এটা তো হলুদের গুঁড়ো । শ্যামা ঢাকনা লাগিয়ে , বয়াম টা পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে বললো আবার….
” কি দিয়েছেন , এটা তো হলুদের গুঁড়ো । আমি জিরে গুঁড়ো চেয়েছি । ওটা দিন ।
সংগ্রাম আবার একটা বয়াম ধরিয়ে দিলো শ্যামার হাতে । এটার ঢাকনা খুলেও নিরাশ হলো শ্যামা । এটাও জিরে গুঁড়ো নয় । এতো নুনের বয়াম । খুন্তি ছাড়লো শ্যামা । ঢাকনা লাগিয়ে বলতে বলতে পিছু ফিরলো..
” কি চাইছি আর আপনি কি দিচ্ছেন ? আমি জিরে গুঁড়ো…
বলতে বলতে সংগ্রাম কে দেখে থমকে গেলো । মুখের কথা মুখেই আটকালো । ঠোঁট গোল করে স্তব্ধ হয়ে গেলো শ্যামা । সংগ্রাম কঠোর ভঙ্গিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে । সেভাবেই ভ্রু নাচালো সংগ্রাম । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো শ্যামা । ছোট জমিদার সাহেব এখানে ?
তড়িতে এদিক ওদিক তাকালো শ্যামা । রান্না ঘরে আর কেউ নেই । শ্যামা মুখ খুললো সংগ্রামের তীক্ষ্ণ চোখে চোখ রেখে….

” ছোট জমিদার সাহেব ! আপনি এখানে ? কিছু প্রয়োজন ?
” হুম ।
” কি প্রয়োজন , আমাকে বললেই পারতেন । আপনি হেঁশেলে আসতে গেলেন কেনো ? কি দরকার , বলুন ?
” তোমাকে প্রয়োজন !
সংগ্রামের শীতল কন্ঠে তব্দা খায় শ্যামা । পরমুহূর্তে ভ্রু গুটিয়ে নেয় । বলে….
” এই মুহূর্তে জমিদারের প্রয়োজন শুনলে হাসবে সবাই । ঘরে যান , রান্না করছি আমি ।
” তোমাকে নিয়েই ঘরে যাবো ।
” আপনি যান , আমি যাচ্ছি !
” যাচ্ছি যাচ্ছি করছো সেই এক ঘন্টা থেকে । আমাকে কতক্ষন ধরে বসিয়ে অপেক্ষায় রেখেছো খেয়াল আছে ? বেরোবো তো আমি । নাকি বউয়ের আঁচল ধরে ঝুলে থাকবো ?
” আমার আঁচল ধরে ঝুলে থাকতে বলেছি আমি ? আপনি আসতে গেলেন কেনো এখানে ? বেরোবেন তো বেরোন ! আমি তো বেঁধে রাখিনি আপনাকে !

” রাখোনি মানে ? আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছো তুমি । সব বাঁধন কি আর চোখে দেখা যায় । কিছু কিছু বাঁধন উহ্য থাকে । , বুঝলে ?
” হয়েছে , এখন যান এখান থেকে । আমি রান্না করছি তো । আপনি যান ।
” ঘরে চলো একবার ।
শ্যামা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো….
” কেনো ?
” না বলে ব্যাবহারিক ভাবে দেখাই, চলো !
শ্যামা চোখ সরু করে দুদিকে মাথা নাড়ালো । পুড়ে যাওয়ার গন্ধ নাকে আসতেই তড়াত করে পিছু ফিরলো । কষানো মসলা পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে ইতোমধ্যে । শ্যামা তড়িঘড়ি করে চুলার জ্বাল কমালো । খুন্তি নাড়লো পানি ঢেলে । কাজ হলো না । পুড়ে গেছে অনেকটা । এখন এভাবে রান্না করলে তেতো হয়ে যাবে খাবার । কপালে হাত ঠেকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শ্যামা । চোখ সরু করে সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বললো হাত নাড়িয়ে….

” দেখুন তো কি করলেন । আপনার জন্য সবটা পুড়ে গেলো ।
ওর হাতটা তৎক্ষণাৎ নিজের দিকে টেনে ধরলো সংগ্রাম । ফিসফিসিয়ে বললো….
” এদিকে যে আমার মন পুড়ছে , সেটা দেখতে পারছো না ? মন পোড়ার গন্ধ আসছে না দেখে গুরুত্ব দিচ্ছো না !
” ছাড়ুন তো । আমি কত সখ করে রান্নার জন্য মশলা কষালাম ‌। আপনার প্রিয় খাবার রান্না করতাম আমি ‌। আর আপনি এসে সবটা ঘেঁটে দিলেন ।
সংগ্রাম গুরুত্বর হলো এবার । স্বাভাবিক হয়ে বললো…
” কি রাঁধবে ?
” কবুতরের মাংস !
দাদি জান বললো আপনি নাকি পছন্দ করেন খেতে ।
” তাই ! তো আবার রান্না শুরু করো । চলো , আমি সাহায্য করছি আমার বেগম কে ।
” আপনি কি করবেন ?
” তুমি রান্না করো , আমি সবটা এগিয়ে দেই তোমাকে । তাহলে সহজ হয়ে যাবে ।
” আপনি না বেরোবেন এখন ?
” পরে বেরোবো । আগে রান্না করি তারপর । তুমি তো ঘরে যাবে না । আমি না হয় তোমার কাছে এখানেই থাকলাম ।

শ্যামা হাঁফ ছেড়ে মাথা নাড়ায় শুধু । এই লোকটা আসলেই পাগল । বউ পাগল । ভেবেই হাসি আসে শ্যামার । ভালো লাগে , ভীষণ ভালোলাগা কাজ করে মনে ।
শ্যামা পুনরায় রান্নার আয়োজন নিলো । সংগ্রাম এগিয়ে দিচ্ছে সবটা । আর শ্যামা মিটিমিটি হেসে রান্না করছে । বারংবার আড়চোখে দেখছে সংগ্রাম কে । সংগ্রাম আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ওর রান্না । হয়তো মনে মনে ভাবছে ,, এভাবে রান্না করে বুঝি ?
শ্যামা খুন্তি নাড়তে নাড়তে বললো…..
” জমিদার হয়ে হেঁশেলে বউকে রান্নায় সাহায্য করছেন , এ কথা পাঁচকান হলে কি হবে , ভেবে দেখেছেন ?
সংগ্রাম দায় সারা জবাব করলো….
” কি আর হবে ?
তোমার ভাষ্যমতে সবাই ভাববে , তাদের জমিদার একটু বেশিই বউ পাগল । তবে আমার ভাষ্যমতে , আমি একটু বেশি প্রেমিক হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন । কি করবো বলো , তোমার সৌন্দর্য যে দিন দিন বেড়েই চলেছে । আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তোমার প্রতি আমার প্রেম । প্রেম প্রেম পাগলামি করছি আমি ।

দুপুরে অংকুর বেরিয়েছে ।
গোসলের পর ঘরে একা একা বসে থাকে নি সুরবালা । ছাদেও যায় নি আজ । সেই থেকে অংকুরের রংয়ের ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে সে । কোথায় কি আছে , না আছে সব দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে । অংকুর এলোমেলো করে রেখেছে পুরো ঘর । এখানে ওখানে যা খুশি পড়ে আছে ।
সুরবালা ধীরে ধীরে সব গোছালো । পরিপাটি করে পরিষ্কার করলো । ঘরটায় বড় বড় কাঠের আলমারি অনেক গুলো । টেবিল সারি সারি ।
সুরবালা আলমারি গুলো খুলে খুলে দেখলো । ভেতরে কত কত পুরনো রং করা ছবি । অংকুরের সখ এটা । যখন যা আঁকে, প্রয়োজনের বাইরে সেগুলো ফেলে রাখে এখানে ওখানে ।
মোটে চারটে আলমারি ঘরে । তিনটের দরজা খোলা । ও তিনটে রংচটা । পুরনো ধাঁচের । বাকি একটা নতুন । সেটা উঁচুতে বিরাট । ওটাতে বোধহয় তালা দেওয়া । হয়তো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস গুলো এখানে রাখে । সেই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস গুলো কি , সেটা দেখার আগ্রহ জাগে সুরবালার । চাবি কোথায় থাকতে পারে ?

সুরবালা টেবিলের ড্রয়ার গুলো খুলে দেখার মাঝেই একটা চাবির গোছা খুঁজে পেলো । হতে পারে আলমারির চাবিও এখানে আছে । একটা একটা করে চাবি ঘুরিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করলো সুরবালা । সফলও হলো এক পর্যায়ে । তালা খুলে আলমারির দরজা খুলল ও । লম্বা লম্বি চারটে তাক আলমারির ভেতর । উপরে আরো একটা তাক । সেই অবধি চোখ পৌঁছালো না সুরবালার । বাকি চারটে তাক চোখের নাগালে । মোটামুটি ফাঁকা আলমারিটা । গোছানো । অন্যগুলো এলোমেলো , মোটা কাগজে ছড়াছড়ি । কিন্তু এটা পরিপাটি ‌। অনেকগুলো ছবি এটার ভেতরেও । দেখতে দেখতে একটা মোটা এ্যালবাম খুঁজে পেলো সুরবালা । সেটা উল্টে উল্টে দেখলো । ভেতরে পুরনো কালের অনেক ছবি । শায়লা, অংকুর আর একজন পুরুষের । হয়তো ইনি অংকুরের বাবা । পুরনো কৃত্রিম ছবি হওয়ায় অনেকটা ঘেঁটে নষ্ট হয়ে গেছে ছবিগুলো । ঠিক মতো কারোরই মুখ বোঝা যাচ্ছে না । ছবিতে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অংকুরের বাবা কে দেখলো সুরবালা । অংকুর কে দেখলো বাচ্চা কালের , সেই ছোট্ট অংকুর । দেখতে দেখতেই ফিক করে হাসলো কখনো ।

এ্যালবাম রেখে আলমারি টা পুরোটা ঘাটলো । উপরের তাকে কি আছে ? উপর অবধি তো চোখ যাচ্ছে না । পাশ থেকে একটা উঁচু তুল নিয়ে সেটার উপর উঠে দাঁড়ালো বালা ।
তাঁকের উপর দৃষ্টি পড়তেই এক মুহুর্ত থমকালো । এখানেও অংকুরের অঙ্কন করা বেশ কয়েকটা ছবি ফ্রেম বন্দি করে গুছিয়ে রাখা ‌। হয়তো লুকিয়ে রাখা ।
সুরবালা মূর্ত বনে অবিশ্বাসে চেয়ে রইলো । দৃশ্যমান প্রথম ছবিটাই ওর নিজের । মুখ ফাঁক হয়ে আসলো বালার । সেভাবে তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে ছবিটা হাতে নিলো , বেশ বড় আকারের ফ্রেম । ফ্রেমে বন্দী ও নিজেই ।
নিজেকে চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ‌। একেক টা‌ ফ্রেম নামাতে গিয়ে একেক রকমের চমক খেলো মেয়েটা । সবগুলো ওর নিজেরই ছবি । একেকটা একেক ধরনের । একেক শৈলির । নিজেকে ছবির মাধ্যমে নতুন করে আবিষ্কার করলো ও । সব অংকুরের নিজস্ব শৈলির বর্ননায় নিজ হাতে আঁকা । নিজ হাতে সুরবালা কে ফুটিয়ে তুলেছে অংকুর ‌। কবে আঁকা এগুলো ?
সুরবালা একে একে সবগুলো হাতে ধরে দেখলো । নেড়েচেড়ে দেখলো । এর‌মধ্যেই ভরাট কন্ঠের ডাকে সম্বিত ফিরল ওর । কাটলো ধ্যান…

” সুরবালা ?
চমকালো সুরবালা । পা ঘুরিয়ে চকিতে তাকালো । অংকুর কে দেখে ছ্যাঁত করে উঠলো । হাতের ছবি সমৃদ্ধ মাঝারি আকারের ফ্রেম টা হাত ফসকে পড়তে নিলেই সহসা সেটা মেঝেতে পড়া থেকে বাঁচিয়ে নিলো অংকুর । সুরবালা তুলের উপর দাঁড়িয়ে মুর্তির মতো চেয়ে রইল শুধু । ঝাঁকড়া চুলের আড়ালে অংকুরের গোটানো কপাল । চোখ সূক্ষ্ম । হাতের ছবিটা এক পলক দেখলো , পরের পলক সুরবালার দিকে তাক করলো । মেয়েটার মূর্ত ভাবমূর্তি দেখে নিঃশব্দে শ্বাস ফেললো । ছবিটা রেখে শেষ কদম এগোলো । দুহাতে মেয়েটার পাতলা কোমর জড়িয়ে তুলের উপর থেকে নামালো ওকে । মেঝেতে দাঁড় করালো । হা বনে হতবাক হয়ে চেয়ে সুরবালা । অংকুরের স্পর্শে পরিবর্তন আসলো না কোনো । অংকুর ওর নির্বোধ দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে ভ্রু নাচালো । অমনি টনক নড়লো সুরবালার । পিছিয়ে গেলো ঝট করে ।
ঢোক গিললো , ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো জিভে ।
অংকুর বুকে হাত গুটিয়ে প্রশ্ন করলো….

” এখানে কি করছো ?
মিনমিন করলো সুরবালা…
” না , মানে । দেখছিলাম আর কি….
” কি দেখছিলে ?
মুখ ঝাইঝাই করে চাইলো সুরবালা । বললো কটকটে জবানে…
” আপনি মেয়েদের ছবি এঁকে লুকিয়ে রাখেন ? আপনাকে ভালো ভেবেছিলাম !
” মেয়েদের ছবি আঁকি না আমি !
” দেখলামই তো ।
” অন্য মেয়েদের ছবি আঁকি না , বউয়ের ছবি এঁকেছি ।
সুরবালা মুখ ভোঁতা করে ফেললো । চোরা চোখে এদিক ওদিক তাকালো । অংকুরের সোজাসুজি চাহনি । মাঝে মাঝে এই চাহনির সম্মুখে জড়তায় পড়ে যায় সুরবালা ।‌কেমন অস্বস্তি লাগে ।
অংকুর ছবি গুলো গুছিয়ে রাখলো আগের ন্যায় । বললো…

” এগুলো ঘাঁটছিলে কেনো ?
” এ..এমনি ? ঘাঁটতে পারি না বুঝি ?
” পারো ।
” আপনি বলেছিলেন , আমাকে আঁকিবুঁকি শেখাবেন !
” শেখো । সব হাতের নাগালেই আছে । যা খুশি আঁকো । আমাকে কি হাতে ধরে শেখাতে হবে ?
” এখন আঁকি ?
” কি আঁকবে ?
” আপনাকে ! আপনি আমার ছবি এঁকেছেন , আর আমি আঁকবো আপনার ছবি । শোধ বোধ ,, চলুন…
অংকুর কে টেনে এগোতে ধরলো সুরবালা । অংকুর থামালো….
” আমি সবে বাইরে থেকে আসলাম , হাত মুখ ধুয়ে একটু পর আসছি । তুমি বসো….
” হাত মুখ ধুয়ে চকচকে হয়ে আসতে হবে না । আপনি এমনিতেই সুন্দর । চলুন তো….
ওকে টেনে এনে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো সুরবালা । অংকুর আর দ্বিরুক্তি করতে পারলো না । সুরবালা ওকে সামনে বসিয়ে অন্য একটা চেয়ার টেনে বসলো ।

আগে থেকেই তৈরি সব । বোর্ডে পেপার টানানো । সুরবালা রংতুলি দিয়ে আঁকতে আড়ম্ভ করলো । অংকুর ঠিক সোজাসুজি সামনে বসে । স্থির দৃষ্টিতে পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থির হয়ে বসে । চোখে শীতলতা । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি । মাদকীয় দৃষ্টি একস্থির হয়ে আটকে রয়েছে রমনীর পানে । সুরবালা পলকে পলকে অংকুরের দিকে তাকাচ্ছে আর হাত চালাচ্ছে । এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে রংতুলি পাশে রাখলো । অংকুরের ন্যায় কাজে লাগালো হাতের আঙ্গুল ।
প্রায় ঘন্টা দুয়েক পেরোতে চললো । সুরবালার হাত চলছে একই ভাবে একই গতিতে । অংকুর এখনো নীরব । বিরক্তির রেশ মাত্র নেই মুখে । সেও পেয়েছে দারুন সুযোগ , সুরবালা কে দৃষ্টি ভরে দেখার সুযোগ । এতক্ষণে যতবার নড়েছে , সুরবালা ততবার ধমকেছে ওকে । বলেছে নড়চড় হীনা স্থির হয়ে বসে থাকতে । অংকুর ও মুখ বুজে তাই করেছে ।
এতক্ষণে একটু থামলো সুরবালা । হাত সরিয়ে চোখ সরু করে একবার অংকুরের দিকে তাকালো অন্যবার নিজের আঁকা ছবিটার দিকে । ফিক করে হেসে বললো….

” একদম নিখুঁত বাবড়ি ওয়ালা ।
উঠুন বাবড়ি ওয়ালা , আমার কাজ শেষ । এসে দেখুন তো ঠিকঠাক আঁকতে পেরেছি কি না ? প্রথম বার এঁকেছি তো ,‌একটু কমতি থাকতে পারে । আপনার মতো হয়তো আঁকতে পারি নি । কিন্তু দেখুন , তবুও খুব সুন্দর এঁকেছি । আসুন, আসুন , দেখে যান ।
অংকুর এতক্ষণে ছাড়া পেলো । বসে থাকতে থাকতে কোমর লেগে গেছে । উঠে দাঁড়ালো ও । পা বাড়ানোর আগে সুরবালা সতর্ক করলো….
” ছোঁবেন না কিন্তু , এখনো রং পুরোপুরি শুকায় নি । শুকিয়ে গেলে ফ্রেমে টাঙ্গিয়ে ঘরে রাখবো , কেমন ?
এগিয়ে এসে বোর্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করা মাত্রই চোখ কপালে উঠলো অংকুরের । চোয়াল ঝুলে পড়ে দৃষ্টি বৃহৎ হলো । ফ্যাল ফ্যাল করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল ও । সুরবালা মুখে বাম হাত চেপে ফিক করে হাসলো । ওর হাসির ঝংকারে সহসা অংকুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি পাত করলো ওর দিকে । তৎক্ষণাৎ হাসি থামালো সুরবালা । গলা ঝেড়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ভ্রু নাচালো….

” কেমন হয়েছে বলুন ? খুব সুন্দর, তাই না ? থাক , বাহবা দিতে হবে না । আমি এমন ছোটখাটো আঁকিবুঁকি করতে দক্ষ , বুঝলেন ? আপনার চেয়েও ভালো আঁকি আমি । আপনার যে এতো সুন্দর একটা ছবি এঁকে দিলাম , এরজন্য আমার কিছু প্রাপ্য আছে নিশ্চয়ই ?
অংকুর ফুঁসলো । এতক্ষণ ধরে ওকে বসিয়ে রাখার ফল‌ এটা ? এই ছবি ? এটা এতক্ষণ ধরে তীব্র মনযোগ দিয়ে এঁকেছে এই বাউড়ি !
অংকুর তেড়ে গেলো….
” তবে রে বাউড়ি , তোমাকে তো আমি..
সুরবালা ভড়কে পিছিয়ে গেলো ।
” এইইই খবরদার , আমি কিন্তু অনেক সুন্দর একটা ছবি এঁকেছি । পুরোটাই আপনার মতো এঁকেছি । কি করবেন আমাকে ? মা..
শায়লা কে ডেকেই ছুটলো সুরবালা । বাবড়ি ওয়ালা ক্ষেপে গেছে । কয়েক কদম এগোতেই শাড়ির লম্বা আঁচলে হেঁচকা টান পড়লো । অমনি আপনাআপনি থেমে গেলো সুরবালার দুরন্ত পায়ের কদম । ঘন পলক ফেলে পিছু ফিরলো ও । অংকুরের দূর্বোধ্য মুখো ভঙ্গিমা দেখে পিটপিট করে চেয়ে ঢোক গিলে বললো….

” দেখুন বাবড়ি ওয়ালা , আমি কিন্তু মাকে ডাকবো ।
” তো ?? তোমার মাকে ভয় পাই আমি ?
” ক…কি করবেন আমাকে ? ছবিটা সুন্দর হয়েছে দেখুন…
শাড়ির আঁচলটা নিজের হাতে পেঁচালো অংকুর । পেঁচাতে পেঁচাতে এগোলে । পুরোপুরি দূরত্ব ঘুচিয়ে সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বললো….
” কি এঁকেছো ? কাকে এঁকেছো ?
” আপনাকে !
” ওটা আমি ?
এতো সুন্দর করে আমাকে আঁকলে , এর বিনিময়ে তোমাকে কিছু তো দিতে হয় !
” ক.. কি ‌?
অংকুর কথা বললো না । সামনে ঝুঁকতেই পেছনের দিকে হেলে পড়লো সুরবালা । অংকুর তড়িতে আলতো করে ওর কোমরে হাত রাখলো । ঝাঁকুনি দিয়ে নড়েচড়ে উঠলো সুরবালা ।
” কি করছেন ?
” চোখ বন্ধ করো !
” কেনো ?
” করো আগে ।

সুরবালার গলা শুকিয়ে আসে । অংকুরের চোখে অদ্ভুত ঘোর । সুরবালা ঠেলতে চায় ওকে । কিন্তু পারে না । ওর হাতের রঙে মাখামাখি হয়ে যায় অংকুরের টিশার্ট । অংকুর আকস্মিক ওর গালে হাত রাখতেই বিদ্যুতের ন্যায় চমকে ওঠে সুরবালা । আরো বেশি ঝুঁকে পড়তেই দম আটকে চোখ খিচে বুজে নেয় । কাঁপে নারী দেহ । অংকুর ওর অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসে । সম্পুর্ন গাল নিজের হাতের স্পর্শে রাঙিয়ে দেয় । আঁকিবুঁকি করার ন্যায় নরম আবেশে হাত চালায় । অন্য কপোলেও হাতের স্পর্শ চালায় । রংয়ের আবরনে ঢেকে দেয় সুরবালার দুই গালের লালিত লাল আভা ‌।
অতঃপর তর্জনী তাক করে সিঁথি বরাবর । সিঁথির নিচে ঠেকায় তর্জনীর ডগা । ধীরে ধীরে আলতো স্পর্শ এঁকে কপাল বেয়ে নাক বরাবর নিচে নামিয়ে নেয় আঙ্গুল । সোজাসুজি নাকের ডগা পেরিয়ে ওষ্ঠ স্পর্শিত করে সেই আঙ্গুল । আঙুলের সাথে সাথে ঠিক সেখানটাতেই থমকায় দৃষ্টি । ওষ্ঠ জোড়ার তিরতির কম্পনে ছলকে ওঠে দৃষ্টি যুগল । অংকুরের স্পর্শের সাথে সাথে মুখের উপর আছড়ে পড়া উষ্ণ নিঃশ্বাসে সুরবালার সর্বাঙ্গ প্রকম্পিত হচ্ছে ‌। শিউরে উঠছে লোমকূপ ।
অংকুর স্পর্শ করে না ওকে । আজ যখন করলো , তখন মাত্রা ছাড়ালো ।
কম্পিত ওষ্ঠ জোড়ার দিকে ক্ষিয় কাল তাকিয়ে থেকে নিজের দৃষ্টি সংযত করে অংকুর । চোখ নামিয়ে নিয়ে শুল্ক ঢোক গেলে ।

ওর এটুকু স্পর্শেই নাজেহাল সুরবালা । অংকুর চোখ তুলে তাকিয়ে মৃদু হাসলো । এবার হাত নামালো ফর্সা গ্রীবায় । কান গলিয়ে গলায় নামালো হাত ‌। পাঁচ আঙুলে রংয়ের দাগ ফেলে ছুঁইয়ে দিলো উন্মুক্ত ফর্সা গ্রীবা । এঁকে বেঁকে ঢেউয়ের মতো আঁকলো স্পর্শ । সুরবালা আর পারে না । দম হারিয়ে যায় ওর । অবাধ্য শিহরিত বিচরনে ঝিমিয়ে যায় শরীর ।
গলার কাছে অংকুরের স্পর্শ গাঢ় হতেই ঝট করে চোখ মেলে চায় সুরবালা ‌। চোখ নিভু । হাত তুলে অংকুরের অবাধ্য হাতকে রুখতে চায় সে । গভীর শ্বাস টানে । অংকুরের দৃষ্টি তখনও ওর গলার নিকট নিবদ্ধ । সুরবালা ওকে থামাতেই অংকুর তাকালো ওর চোখের দিকে । দু জোড়া খাদ যুক্ত আঁখির মিলন ঘটলো তৎক্ষণাৎ ।
সুরবালার চোখে অনুনয় । বাঁধা প্রদান করে দুদিকে না বোধক মাথা নাড়িয়ে ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো শুধু….
” বাবড়ি ওয়ালা ,,,
তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিলো অংকুর । তড়াক গতিতে পিছিয়ে যায় সুরবালা । চোখ নামিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিঃশব্দে । অংকুর মিটিমিটি হাসছে । ঘেমেছে সুরবালা । শিরদাঁড়া বেয়ে উষ্ণ গরম ঘাম গড়িয়ে পড়ছে । সুরবালা বাম হাত উঠিয়ে কপালের ঘাম মুছলো । চোরা চোখ তুলে চাইলো অংকুরের দিকে । অংকুরের ফিচেল চাহনির বিপরীত অর্থ বুঝে ফের তড়িতে চোখ নামিয়ে নিলো ।
হাতের উল্টো পিঠে চ্যাট চ্যাটে আঠালো কিছু অনুভব হতেই হাতের দিকে তাকালো কপাল গুটিয়ে । হাতের পিঠে রং আসলো কি করে ? ও তো বাম হাতে রং স্পর্শ করে নি । সুরবালা হাত উঁচিয়ে মুখ মুছলো আবার । এবার রং লাগলো আরো বেশি । ভিন্ন রংয়ের মিশ্রন । ওর মুখে কি রং ? সুরবালা মুখ সরু করলো । একে একে গালে, গলায়,নাকে হাত ছোঁয়ালো । একই রং পুরো মুখে । পিছু ফিরতেই দেয়ালে টাঙ্গানো কাঁচের ফ্রেমে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলো । অমনি হা বনে গেলো ও । তাজ্জব বনে এক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে কিড়কিড় করে চোখ পাকিয়ে তাকালো অংকুরের । অমনি ঘাড় উঁচিয়ে খানিক শব্দ করে হেসে উঠলো অংকুর । দাঁত খিচে কটমট করে বললো সুরবালা….

” বাবড়ি ওয়ালা…
” বলো বাউড়ি !
নিষ্পাপ মুখে নরম জবাব অংকুরের । সুরবালা তেঁতে উঠলো ।
” কি করেছেন এসব ?
” কি করলাম ?
” এবার তো আমি আপনাকে ছাড়বো না ।
বলতে বলতে এক থাবা বসালো রংয়ের ডিবায় । অংকুর সরে যাওয়ার আগেই পা উঁচিয়ে দুহাত ভর্তি রং মাখিয়ে দিলো অংকুরের মুখে । অংকুর সরলো না , সরার চেষ্টাও করলো না । সুরবালা ইচ্ছে মতো ওর মুখ রঙে মাখামাখি করলো । পড়নের ঢিলে টিশার্ট আগে থেকেই মাখামাখি । চোখ মুখ রঙে চুবিয়ে থামলো সুরবালা ।
অংকুর মৃদু স্বরে শুধালো….
” এবার খুশি ?
মুখ বাঁকায়‌ সুরবালা । এর মধ্যেই ঘরের দরজা থেকে শায়লার চিৎকার….

” এ‌ কি ! একি অবস্থা করেছিস নিজেদের ?
অংকুর , সুরবালা , কি করেছিস তোরা ?
চকিতে দু’জনে দরজার দিকে তাকালো ।
শায়লা এগিয়ে এসেছেন । কপাল চাপড়ে আবার বললেন…
” হায় আল্লাহ , তোরা দুটতে কি করেছিস এসব ?
থতমত খেলো সুরবালা ।
নিজের দিকে আর অংকুরের দিকে তাকালো । দুজনের শরীরেই রং মাখামাখি । ও প্রসঙ্গ কাটাতে তৎক্ষণাৎ পিছনের বোর্ডে টাঙানো ছবিটা দেখিয়ে বললো…
” আমাদের কথা বাদ দাও মা । তুমি দেখো, আমি ছবি এঁকেছি । দেখো তো এটা কেমন হয়েছে ? আর বলতো এটা কে , কার ছবি এঁকেছি ?
শায়লা ছবিটার দিকে তাকান । এক মুহুর্ত কপাল কুঁচকে থাকেন । ছবিতে ইয়া বড় বড় কোকড়া চুলর গোছা ব্যাতীত আর কিছুই নেই । শায়লা প্রথমে বুঝতে পারেন না । পরমুহূর্তে স্বাভাবিক হয়ে অংকুরের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ওঠেন , বলেন..

” কেশবতী আমার ? তাই তো ?
” মা , তুমিও ?
অংকুরের কথায় এবার হো হো হেসে উঠলো সুরবালা । ওর পাশ থেকে সরে শায়লার পাশে দাঁড়ালো । হাসি থামিয়ে বললো….
” দেখেছেন বাবড়ি ওয়ালা ‌, আমি আপনাকেই এঁকেছি । তাইতো মা চিনতে পেরেছে । তাই না মা ? এই‌ দেখো তোমার ছেলের কত সুন্দর একটা ছবি এঁকে দিয়েছি । কিন্তু এর বিনিময়ে তোমার ছেলে আমার কি অবস্থা করেছে দেখো । কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না তোমার গোমড়া মুখো ছেলে ।
আচ্ছা, এবার তোমার একটা ছবি এঁকে দেই ?
শায়লা তৎক্ষণাৎ বাঁধ সাধলেন…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৬

” না না , আমার ওসব ছবি আঁকার কোনো প্রয়োজন নেই । তোরা নিজেদের ছবিই আঁক । আমি যাই , বিকেলের ঔষধ বাকি আছে । তোরাও যা , নিজেদের যা অবস্থা করেছিস ।
শায়লা বেরিয়ে গেলেন ।
সুরবালা মুখ টিপে হাসলো অংকুরের ছবি দেখে ‌। অতঃপর আঁচল উড়িয়ে ঘর হতে বেরোতে বেরোতে বিড়বিড় করলো…..
” হুহহ , আমিও পারি রং মিস্ত্রী গিরি করতে , ছবি আঁকতে ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৮