শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৮
সুরভী আক্তার
মাঝে পরপর কাটলো বেশ কয়েকটা দিন ।
সংগ্রাম ব্যাস্ত ভীষণ । এই জমিদারিতে এতো কিসের ব্যাস্ততা বুঝে পায় না শ্যামা । কি করতে হয় সংগ্রাম কে ? সে আদেশ করা মাত্রই তামিল হয় সবকিছু । তবুও সংগ্রামের এতো ব্যস্ততার কারন খুজে পায় না শ্যামা । এই আজকেই সকাল থেকে বাড়িতে নেই সংগ্রাম । রোজ দুপুরে ফেরে , আজ ফিরলো না । কোথায় আছে , নেই , খেয়েছে কি খায় নি , খবর ও পাঠালো না । শ্যামার কি চিন্তা হয় না ? সেই বিকেল থেকেই বারান্দায় ঠায় বসে ছিল শ্যামা । কখন সংগ্রাম আসবে এই অপেক্ষায় । সন্ধ্যা গড়িয়েছে । নামাজ সেরে আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো ও । সংগ্রামের দেখা নেই ।
এরকম সে করে না । আজ কোথায় আছে , নিশ্চয়ই কোনো গুরুত্বর কিছুতে আটকে পড়েছে । আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না শ্যামা । সোজা নিচে নামলো । গরম পড়েছে বেশ । শাড়ির আঁচলটা ফেলে রাখা মাথা থেকে । লতিফ জোয়ার্দার বেরিয়েছেন বিকেলের পর , জুনাইদ ও বাড়িতে নেই । দেখে নি শ্যামা ।
শ্যামা নিচে নেমে আতিয়া বেগম কে পেলো । চিন্তিত স্বরে তার পাশে বসে বললো….
” দাদি জান , ছোট জমিদার সাহেব আজ সকাল থেকে বাড়িতে ফেরে নি , সেই সকালে বেরিয়েছে । কোথায় গেছে বলতে পারো ?
” তোর সোয়ামির খবর তুই জানোস না , আমি জানমু ক্যামনে ?
” আমাকে তো বলে যায় নি ।
” দাদু ভাই কাউরে কইয়া যায় না হেয় কনে যায় না যায় । জরুরি কাম পড়ছে হয়তো , এই লাইগা ফেরে নাই এহনো । চিন্তা করোস না , ফিইরা আইবো ।
সালেহা নিচে নামতে শুনলেন । তিনি জানেন সবটা । সংগ্রাম , লতিফ জোয়ার্দার , জুনাইদ , এরা তিন জন আজ এক জায়গায় গেছে ।
মুকুন্দপুর থেকে দুপুরে খবর এসেছিল , দৌলত গাজির মৃত্যুর খবর । বাড়িতে কেউ জানে না । লতিফ জোয়ার্দার বেরোনোর আগে সালেহা কে খবর টা দিয়ে বেরিয়েছেন । বাড়ির আর কেউ জানে না এই খবর । আতিয়া বেগম ও না । শ্যামার চিন্তিত মুখ পানে তাকিয়ে তিরস্কার করে এক পাশে বসলেন সালেহা । রাশভারী কন্ঠে বললেন….
” সংগ্রামের ফিরতে ফিরতে আরো রাত হবে ।
ও কোথায় গেছে জানা আছে আমার । চিন্তা করো না আম্মা ।
আতিয়া বেগম কে সম্বোধন করে শ্যামাকে কথাটা শোনালেন সালেহা । শ্যামা তড়িতে চাইলো । বিচলিত হয়ে বললো….
” ছোট জমিদার সাহেব কোথায় গেছেন আম্মা ? আপনি জানেন ? বলুন না কোথায় গেছে ?
” মুকুন্দপুরে ।
শ্যামার কপালে ভাঁজ পড়ে । আতিয়া বেগম শুধোয়…
” মুকুন্দপুরে ক্যান ?
” ওখানকার মাতব্বর দৌলত গাজি মারা গেছেন , তোমাদের কাউকে খবরটা দেওয়া হয় নি । সংগ্রাম দুপুর থেকে ওখানেই । ওর বাবা আর জুনাইদ, ওরাও ওখানে । জানাজা ,কবর হয়েছে ইতোমধ্যে । হয়তো বাড়িটা সামলে আসতে সময় লাগছে ।
শ্যামা বিরাট চমকায় । দৌলত গাজি মারা গেছেন ? এইতো সেদিন ওরা দেখে আসলো ওনাকে । মানুষটা অসুস্থ ছিলেন তখন । মারা গেছেন আজ , অথচ শ্যামা জানলো না ? এ বাড়ির আর কেউ জানলো না ?
আতিয়া বেগম গাঢ় স্বরে বললেন….
” মইরা গেছে , এই খবর আগে কইবা না আমগোরে ? মানুষটার শেষ বিদায়ে হেরে দেখতে যাওন লাগতো না ?
” সংগ্রাম যেতে দিলে তবেই তো যেতেন ! ও বাড়িতে যাওয়া সংগ্রাম পছন্দ করে না জানেনই তো । তাই আগে বলেও লাভ হতো ।
শ্যামা মুখ ফাঁক করে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অদৃশ্যের পানে । চোখের সামনে ভেসে উঠলো দৌলত গাজির সেই জীর্ণ অসুস্থ মুখাবয়ব ।
সালেহা আতিয়া বেগম কে চোখের ইশারায় কিছু বোঝালেন । অমনি স্বাভাবিক হলেন আতিয়া বেগম । গলা ভিজিয়ে বললেন…
” নাত বৌ , কি চিন্তা করস ?
ঘরে যা , দাদু ভাই আইয়া পড়বো । মানুষ মরছে, বুঝোসই তো ঝামেলার ব্যাপার । ও বাড়ির পরিস্থিতি সামলাইয়া সময় মতো আইয়া পড়বো দাদু ভাই । তুই ঘরে যা ।
রাত নয়টার কাছাকাছি ।
হারিকেনের আলোয় পড়ছে ময়না । চোখে রাজ্যের ঘুম চেপে ধরেছে । কিন্তু ঘুমালে তো চলবে না । আগামী কাল থেকে ওর মেট্রিক পরীক্ষা শুরু । এতো দিন সবকিছু পড়লেও আজ গুলিয়ে যাচ্ছে সবটা । কিছুই মনে থাকছে না । সবটা কেমন জট পাকিয়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । আফতাব পাহারা দিচ্ছে ওকে । আজ আর বিকেলের পর থেকে বাইরে বেরোয় নি । ময়নাকে টেবিলে বসিয়েছে সেই বিকেলে । মাঝে একবার রাতের খাবারের সময় ছুটি দিয়েছিলো । এখন রাত গাঢ় হতেই ঘুমে টলছে ময়না । ওর তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস । তার উপর আগের রাত গুলোতে জেগে জেগে পড়েছে । সব ঘুম আজকেই চেপে ধরেছে চোখে ।
আফতাব রাতের খাবার দেরি করে খায় । ময়না কে পড়তে বসিয়ে ও খেয়ে নিলো । ঘুমে টুপছে ময়না । আফতাব সেটাও লক্ষ্য করলো । খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাত মুছতে মুছতে ভরাট কন্ঠে বললো আফতাব….
” আর পড়তে হবে না , ঘুমাও এখন । ফজরের আগে উঠে আবার পড়তে বসবে । আর সকাল সকাল তৈরি হবে । প্রথম দিন , তাড়াতাড়ি যেতে হবে ভুলে যেও না ।
ময়না মুখ মলিন করে কাঁচুমাচু হয়ে অসহায় চোখে তাকালো । আফতাব নিচে বিছানা মেলছে । চোখ ডলে নিভু নিভু স্বরে বলল ময়না….
” আমি যদি ফেইল করি , তাইলে ?
” আবার ফেইল করার চিন্তা মাথায় আনছো ?
” মাথায় আইতাছে তো আপনা আপনি । ভয় লাগতাছে যদি ফেইল করি ?
” করবে না । এ কদিনে অনেক পড়েছো । ফেইল করবে না ।
” সত্যিই ?
” হুম ।
” তাইলে পাশ করলে আমারে উপহার দিবেন কইছেন !
আফতাব মেঝেতে বালিশ রেখে ময়নার দিকে তাকালো সূক্ষ্ম নেত্রে । হাসি লুকিয়ে বললো…
” উপহারের কথাও মনে আছে তোমার ?
” হ ,, আছে তো । এই লাইগা তো এতো এতো পড়ছি আমি । এবার কন কি উপহার দিবেন ?
” সেটা তো পরীক্ষার ফলাফলের পর জানতে পারবে । এখনো পরীক্ষা দাও নি , ফলাফল পাও নি । এর আগে এতো অধৈর্য হচ্ছো কেনো ? আমি তো বলেছি দেবো , তার মানে দেবোই । এসব উপহারের চিন্তা বাদ দিয়ে পাশ করার চিন্তা করো । ফেইল করার চিন্তা করে যদি ভুল করেও তেমন কিছু করেছো , তাহলে উপহার ফসকাবে হাত থেকে, এটা মাথায় রেখো ।
ময়না ঝট পট বই পত্র বন্ধ করলো । তড়িঘড়ি করে বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে নিলো । বললো চঞ্চল হয়ে….
” ফজরে উইঠা পড়তে বসমু । টের না পাইলে আপনি ডাইকা দিবেন আমারে । আর একবারও ফেইল করার চিন্তা মাথায় আনমু না । আমি পাশ করমু ।
” খালি পাশ নয় , ভালো ফলাফল নিয়ে পাশ করার চিন্তা করো ।
ময়না চোখ খিচে ঘুমের দিকে মনোনিবেশ করে বললো…
” আইচ্ছা , ভালো ফলাফল লইয়া পাশ করমু । এহন ঘুমাই । সকালে ডাইকা দিবেন ।
আফতাব ওর দিকে তাকিয়ে খানিক হেসে দুদিকে মাথা নাড়ালো । হারিকেনের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো নিজেও । কাল সকালে এই চঞ্চলা রমনীর পরীক্ষা , কি করবে কে জানে !
শ্যামা আজ অনেক রাত অবধি জেগে বসে আছে । ঘুমায় নি ঘুম আসলেও । সংগ্রামের চিন্তায় ব্যাকুল সে । লতিফ জোয়ার্দার আর জুনাইদ সেই কখন ফিরেছেন । তাদের থেকেও সংগ্রামের খোঁজ নিয়েছে শ্যামা । সংগ্রাম তাদের সাথে ফিরলেও তো পারতো । কিন্তু ফিরলো না ।
ঠিক বারোটা নাগাদ বাড়িতে ফিরলো সংগ্রাম । পড়নে একটা সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা । হাতে কালো শাল পেঁচানো । নিস্তেজ পায়ে ঘরে ঢুকলো সংগ্রাম । ভেবেছে শ্যামা ঘুমিয়েছে । কিন্তু না , দরজা খোলার শব্দ পেয়েই তড়িঘড়ি করে আধশোয়া থেকে উঠে বসলো শ্যামা । সংগ্রাম কে দেখে হাঁফ ছাড়ল । বিছানা ছেড়ে তড়িতে উঠে আসলো । কপাল গুটালো সংগ্রাম । বললো শুকনো কন্ঠে….
” বেগম , এখনো ঘুমাও নি কেনো ?
” আপনি এতো দেরি করলেন কেনো আসতে ? কতটা রাত হয়েছে দেখেছেন ? এতো দেরি হলো কেনো ?
শ্যামার পাল্টা প্রশ্ন । এতক্ষণে শ্যামা দৌলত গাজির মৃত্যুর বিষয়ে জেনে গেছে , তা বুঝতে বাকি নেই সংগ্রামের । সংগ্রাম কথা পেঁচালো না । সোজাসুজি বললো….
” বুঝতেই পারছো , সবটা সামলে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেলো ।
শ্যামা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সংগ্রামের মলিন চেহারা খানা দেখে বললো….
” কিছু খেয়েছেন আদৌ , সকাল থেকে ফেরেন নি । আপনি জানেন কতটা চিন্তায় ছিলাম আমি । দৌলত গাজির মৃত্যুর খবর তো পরে জানলাম । আগে জানালে কি হতো , মানুষ টাকে সেদিন দেখে আসলাম । এবার না হয় শেষ দেখাটা দেখতে যেতাম ।
সংগ্রাম প্রথম কথাটার উত্তর করলো শুধু….
” খেয়েছি আমি । এখন গোসল সেরে ঘুমাবো , ক্লান্ত লাগছে ভীষণ ।
” কোথায় খেয়েছেন সারাদিনে ?
” সন্ধ্যার পর ও বাড়িতে খেয়েছি । চিন্তা করো না ।
কাপড় বের করে দাও ।
বলেই হাতের শাল রেখে গোসল খানার দিকে এগোলো সংগ্রাম । শ্যামা কাপড় বের করে খাটের উপর গুছিয়ে রাখলো । সংগ্রাম আর খাবে না বোঝা হয়ে গেছে । নয়তো এক্ষুনি নিচে যেতো খাবার গরম করতে ।
গোসল সেরে এসে কাপড় বদলে নিলো সংগ্রাম । ভেজা শরীর ঠিকঠাক মুছলো না । চুল গুলোও মুছলো না । টুপটাপ পানি ঝড়ছে এখনো । বিছানায় গা এলিয়ে দিলো ও । আর একটা কথাও বললো না । শ্যামা তাজ্জব বনে গেলো । সংগ্রামের মাথার কাছে গিয়ে বসলো শ্যামা । অমনি মাথা তুলে শ্যামার কোলে মাথা রাখলো সংগ্রাম । দৌলত গাজি সংগ্রামের খুব কাছের মানুষ ছিলেন । তার এমন আকস্মিক মৃত্যুর ধাক্কা সামলে উঠেছে সংগ্রাম । শ্যামা সংগ্রামের অবস্থা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে ।
সংগ্রামের মাথাটা নিজের কোলে নিয়েই শাড়ির আঁচলে ওর ভেজা মাথাটা মুছিয়ে দিলো শ্যামা । চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো পর মুহূর্তে ।
পরদিন দুপুর গড়িয়েছে ।
ময়নার প্রথম পরীক্ষা শেষ । আফতাব দের গ্রাম ছেড়ে অনেকটা দূরে ময়নার পরীক্ষার হল পড়েছে । আফতাব সেই সকাল সকাল ওকে নিয়ে বেরিয়েছিল । এখন শেষ পরীক্ষা । ময়না বেজায় খুশি । প্রথম দিনেই প্রথম পরীক্ষা একেবারে ঝাক্কাস হয়েছে । জলের মতো সোজা হয়েছে প্রশ্ন । আফতাব যা যা পড়িয়েছে , সবটা থেকেই উত্তর করতে পেরেছে ময়না ।
পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েই সেকি খুশী মেয়েটা । ওর আনন্দ ধরছে না । আফতাব আশ্বস্ত হলো । যাক , প্রথম দিনেই অন্তত ভালো কিছু করেছে মেয়েটা ।
আফতাব ময়নাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে গ্রামের মোড়ে একটা আইসক্রিমের ভ্যান চোখে পড়েছে । অমনি ময়না বায়না ধরেছে সে আইসক্রিম খাবে । কতদিন এভাবে আইসক্রিম খাওয়া হয় না । আগে অলকা কে লুকিয়ে চাল চুরি করে সেই চাল দিয়ে আইসক্রিম খেতো ময়না ।
আফতাব দ্বিমত না করে ময়নাকে একটা আইসক্রিম কিনে দিয়েছে । গ্রামের মোড় থেকে হেঁটেই ফিরছে দু’জনে । কাঁচা রাস্তা , অন্য গাড়ি চলবে না । হেঁটেই পেরোতে হবে বাড়ির পথ । ময়না বোরখা পড়ে বেরিয়েছিল । নিকাব তুলে আইসক্রিম খেতে খেতে আফতাবের বড় বড় ধাপের সাথে পা মেলাতে ব্যাস্ত ও । কি তাড়াতাড়ি হাঁটে এই লোক । ময়না পায়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে দৌড়াচ্ছে এক প্রকার ।
সামনে একটা দোকান । দোকানে কয়টা ছেলে । আফতাব ময়নাকে নিয়ে দোকান পাশ কাটানোর সময় একটা কথা কানে আসলো ওর….
একটা ছেলে ওদের দিকে তাকিয়েই বললো ময়না কে উদ্দেশ্য করে….
” এইটা মানিকের বউ না ?
আফতাবের দৃঢ় পায়ের গতি থেমে যায় । ছেলেটার প্রশ্নের উত্তরে অন্য একটা বললো…
” হ, মানিকের পরিত্যক্ত বউ ।
” কস কি ? পরিত্যক্ত আবার কবে হইলো ?
” জানোস না ? ক’মাস আগে কান্ড হইছিলো । মানিকের বউয়ের তো লটর পটর আছিলো আফতাবের লগে । স্বামী ছাইড়া দেওরের লগে রাইত কাটাইতে গিয়া ধরা খাইছে , এই লাইগা এই নষ্টা বউরে তালাক দিছে মানিক । এরপর গাঁয়ের লোক বিয়া দিছে ওগো ।
আফতাব তড়িতে চোয়াল খিচে পিছু ফিরে দোকানের দিকে তাকালো । ময়না থমকালো এতক্ষণে । পায়ের দিক থেকে দৃষ্টি তুলে খাওয়া রেখে আফতাবের দিকে তাকালো পিটপিট করে । আফতাবের চোয়াল নিরেট । ক্ষুব্ধ চাহনি দোকানের ছেলেগুলোর দিকে ।
ছেলে গুলো খ্যাট খ্যাট করে হাসলো মজা উড়িয়ে । আবার বললো আফতাব কে শুনিয়ে….
” তাইলে মানিকের ছাড়া মাল লইয়া এহন আফতাব সংসার করতাছে ? বাহ্ বাহ্ , মালটারে দেখছিলাম একবার । দেখতে ভারী খাসা । আইজ তো দেখতাছি আরো সুন্দর হইছে । এই লাইগা গইলা গেছে আফতাব ? কি রে আফতাব , ভাইয়ের বউ লইয়া ভালোই সুখে আছোস দেখতাছি ।
আফতাব ময়নার দিকে তাকাতেই তড়িতে চোখ নুইয়ে নিকাব নামিয়ে ফেললো ময়না । আফতাব একহাতে লুঙ্গির কোচা উঁচিয়ে অন্যহাতে শক্ত করে ময়নার হাত চেপে ধরলো । ক্ষুব্ধতা সংযত করে উপেক্ষা করে এগোতে গেলে একটা ছেলে গলা উঁচিয়ে আবারো ভেঙ্গিয়ে বললো…..
” বাহরে আফতাব , বউ লইয়া ভাইগা যাইতাছোস আমগোর সামনে দিয়া ? এহন কি নাকে লাজ লাগতাছে নাকি ? মাইয়া তো পিচ্চি , কিন্তু ঝাঁজ কম না । দেখতেই কড়াক টাইপ । এই দেইখা ফাইসা গেছোস ? জামাই থাকতে রুপ যৌবন দেখাইয়া তোরে বগলদাবা করছে ?
আফতাবের উদ্যত কদম থেমে যায় আবার । মস্তিষ্ক দপ করে জ্বলে ওঠে । কপালের পাশের শিরা ফুলে ওঠে । শক্ত করে খিচে ধরে ময়নার হাত । দাঁত পিষে ধীরে পিছু ফেরে । ছেলে গুলো গা দুলিয়ে হাসে । আবার বলে….
” মাইয়ার ঝাঁজ কি একটু বেশিই আফতাব ? কি গো ভাবি , মুখ ঢাকলেন ক্যান । মুখ খানা দেখান এট্টু দেহি । আমরা না হয় না ছুঁইয়া ,খালি দেইখাই আঁশ মিটামু ।
আফতাবের সহ্য ক্ষমতা ছাড়িয়ে যায় এবার । ময়নার হাত ছাড়ে ও । বজ্র স্বরে ধমক দেয়…..
” জানোয়ার , জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো আর একটা বাজে কথা বললে ।
” আমাগো জিভ ছিইড়া কি হইবো ? জিভ তো তোর ছেড়া দরকার । ভাইয়ের বউয়ের সাথে আকাম কইরা এহন কোন মুখে ধমকাস আমগোরে ? নেহাতই মানিক নিজ ইচ্ছায় এই নষ্টা বউরে ছাড়ছে , এতে তো তোরই সুবিধা হইছে । ঘরে রাইখা নষ্টামি করতে পারবি এহন । আমি হইলে তো এরে মাটিতে পুঁইতে দিতাম ।
ময়নার সিটিয়ে যায় । হাতের আইসক্রিম গলে পড়ে হাত থেকে ।
আফতাব হিসহিসিয়ে ওঠে । ফুঁসে উঠে তেড়ে যেতে নেয় দোকানের দিকে । অমনি ওর হাত খপ করে টেনে ধরে ময়না । দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করে….
” এইহান থাইকা চলেন দয়া কইরা ।
আফতাব দমে যায় । শ্বাস টেনে নেয় । ময়নার হাত টা শক্ত করে ধরে বড় বড় ধাপে হাঁটা লাগায় উল্টো ফিরে বাড়ির পথে ।
মাঝে কেটেছে আরো কটা দিন ।
সময় আপন গতিতে চলছে । শ্যামা আর সংগ্রামের প্রথম বিয়ের অনেক গুলো দিন পেরোলো । দিন গড়িয়ে মাসের পর মাস পেরোলো কতগুলো । শ্যামার মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে । আগের তুলনায় স্বাস্থ্য বেড়েছে শ্যামার । চেহারায় উজ্জ্বলতা এসেছে । জৌলুস দ্বিগুণ হয়েছে ।
সংগ্রাম তাকালে চোখ ফেরাতে পারে না আজকাল । বরাবর ভাবে , কি আছে এই মেয়ের মাঝে ? মেয়েটা দিনকে দিন আরো বেশি গেঁথে যাচ্ছে সংগ্রামের মাঝে ।
শ্যামা সারাটা দিন এই বাড়ির চার দেয়ালে বন্দী হয়ে কাঁটায় । বাইরে বেরোনোর অবকাশ মেলে না । সংগ্রাম নিয়ে যায় না ওকে । মাঝে মাঝে ঘাটে যাওয়ার আবদার জুড়ে বসে শ্যামা । তখন একটু ঘাটের দিকটায় নিয়ে যায় সংগ্রাম । তাও আবার রাতে , যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় তখন । রাতের নিস্তব্ধতায় কারোর চোখে পড়ার ভয় থাকে না । শ্যামা কে লুকানোর প্রয়োজন হয় না কারোর দৃষ্টি থেকে । তাই ঐ নিস্তব্ধ সময়টাই বেছে নেয় সংগ্রাম ।
বাড়িতেও যাওয়া হয় না কতদিন । আম্মাকে দেখা হয় না । সেই যে বিয়েতে কয়েক ঝলক দেখলো , আর তো দেখা হলো না তারপর । শ্যামা মাধবপুরে যেতে চাইলে সংগ্রাম বাচ্চা বোঝানোর ন্যায় থামিয়ে রাখে ওকে ।
আজ সংগ্রাম দুপুরে বাড়ি ফিরে বেরোয় নি আর । সেই দুপুর থেকেই ঘরে । এখন বিকেল গড়াচ্ছে । সংগ্রাম ঘরে বসে বসে কাগজ পত্র ঘাটছে সেই তখন থেকেই । পুরো টেবিল জুড়ে কাগজ পত্র ছড়ানো ছেটানো । সংগ্রাম ভীষণ মনযোগ সহকারে প্রত্যেকটা কাগজ চোখ বুলিয়ে দেখছে আর গুছিয়ে পাশে রাখছে । পূর্ণ মনযোগ নিজের কাজে । শ্যামা এক কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো । টেবিলের উপর চায়ের কাপ রেখে শাড়ির আঁচলে হাত মুছলো । শ্যামার দিকে এক পলক তাকিয়ে মুচকি হাসলো সংগ্রাম ।
এক হাতে কাপ তুলে চুমুক বসালো । বললো অতঃপর….
” খুব খাটছো আজকাল !
” কই খাটছি ?
” রান্না বান্না কে করতে বলে তোমায় ?
” করি না তো , শুধু সাহায্য করি ।
” সাহায্যের জন্য বাড়িতে কাজের লোকের অভাব নেই । তোমাকে ওসব করতে হবে না । আজ থেকে যেনো রান্না ঘরের আশেপাশে না দেখি তোমায় । আমার বেগম কোনো গৃহস্থালি কাজে হাত লাগাবে না ।
” তো কি করবে ?
” শুধু আমার সামনে ঘুর ঘুর করে আমাকে ভালোবাসলেই চলবে ।
শ্যামা দুদিকে মাথা নাড়ালো । চেয়ারের উপর থেকে সংগ্রামের শাল তুলে গুছিয়ে ভাঁজ করতে করতে বললো…
” সময় কাটানোর জন্য একটু কাজ করি , সেটুকু না করলে সময় কাটবে না আমার । আপনি তো সব সময় বাড়িতে থাকেন না , যে সবসময় আপনার সামনে ঘুর ঘুর করবো আমি । আর এমনিতেও অনেক দিন ধরে ভীষণ একা একা লাগছে । একবার মাধবপুরে নিয়ে যাবেন ? কতদিন যাই না…
সংগ্রাম চায়ের কাপে তৃতীয় চুমুক বসিয়ে কপাল গুটিয়ে বললো….
” সেখানে গিয়ে কাজ কি ?
” আম্মার সাথে দেখা হয় না কতদিন ।
” তোমার আম্মা কে নিয়ে আসবো তাহলে !
” আম্মা কে আনতে হবে না , আমি যাবো ।
” তোমার যাওয়া হবে না ।
” কেনো ?
” কারন তুমি আমার স্ত্রী , আর এটাই তোমার বাড়ি । ও বাড়িতে কেউ নেই তোমার । বেকার বেকার অন্যের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোমাকে কিছুক্ষণের জন্যেও দূরে সরিয়ে রাখতে পারবো না ।
” অন্যের বাড়ি ? ওটা আমার বাপের বাড়ি ।
” বাপ ?
সংগ্রামের কন্ঠে খানিক তিরষ্কার । আনমনে বলে ফেলেছে কথার পরিপ্রেক্ষিতে । শ্যামার গায়ে লাগলো । মুখ মলিন করে নিলো ও । শালটা আলমারিতে ঢোকালো । সংগ্রামের টনক নড়লো খানিক বাদ । কি বলে ফেলেছে এটা বোধগম্য হতেই হাতের কাগজ আর চায়ের কাপ দুটোই রাখলো ও । এগুলোর জন্যই সম্পুর্ন ধ্যানে কথা বলা হচ্ছে না শ্যামার সাথে । সংগ্রাম অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মতো কাগজ গুলো ফেলে শ্যামার দিকে এগোলো ।
হীম শীতল কন্ঠে ডাকলো….
” বেগম ?
” বলুন !
” বাপের বাড়ি যাওয়ার সখ হয়েছে ?
” ……
” আঘাত পেয়েছো আমার কথায় ?
“…….
শ্যামা নিঃশব্দ । সংগ্রাম জিভে অধর ভেজায় । গা ঘেঁষে দাঁড়ায় । মুখ কালো করে সরে যায় শ্যামা । সংগ্রাম আবার ওর কাছে যায় । এবার শ্যামা সরে যেতে নিলে সংগ্রাম টেনে ধরলো ওকে । কোমর পেঁচিয়ে ধরলো আলগোছে । জড়িয়ে নিয়ে বললো…
” আচ্ছা বাপের বাড়িতে নিয়ে যাবো । তবুও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে থেকো না ।
” …….
” ওওও ডালিয়া…
একটু তো কথা বলো , হাসো একটু । বললাম তো নিয়ে যাবো ।
” ….
” কি হলো বেগম , বললাম তো নিয়ে যাবো তোমাকে । একটু তো কথা বলো । আচ্ছা তোমার বাপ , কি যেনো নাম — মোখলেছ । উনি তোমার বাপ , মানে আমার শশুর । যদিও জোচ্চর শশুর , তবুও সেই শশুর বাড়িতেই নিয়ে যাবো তোমায় । একটু হাসো এবার….
শ্যামা প্রতিক্রিয়া হীন নির্বিকার । মনে মনে হাসি আসছে , ও লুকিয়ে রেখেছে সংগ্রামের গুরুত্ব পাওয়ার জন্য । সংগ্রাম যখন ওর পিছু পিছু ঘোরে , ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দেয় , জড়িয়ে ধরে , গুরুভার ভঙ্গি পরিবর্তন করে ভালোবেসে মধুর মধুর কথা বলে , তখন ভীষণ ভালো লাগে শ্যামার । মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান নারী টাই ও নিজে । যে একজন সুদর্শন জমিদারের খুব প্রিয়জন । যে জমিদার তাকে কাছ ছাড়া করতে চায় না মোটেও ।
সকাল সকাল মেজাজ দেখিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দপদপিয়ে উঠে ঘরে ঢুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো সুরবালা । অংকুর নিচ থেকে দরজার শব্দে চোখ বুজে খানিক হাসলো ওষ্ঠ পিষে । শায়লা বারবার এক কথা আওড়াচ্ছেন……
” যাচ্ছিস যা , কিন্তু ওকে নিয়ে যা । ওখানে তো আর বাইরের কেউ যাচ্ছিস না । তোরা নিজেরাই তো । ওকে নিয়ে গেলে কি হবে ? ওর মতামত না শুনেই মুখের উপর বলে দিলি ওকে নিয়ে যাবি না ! যদি ওর যাওয়ার ইচ্ছে থেকে থাকে ? মেয়েটা তো একলাই থাকবে , তোর সাথে গেলে নতুন জায়গায় ভালো লাগবে একটু । আর , তোরা তো বিয়ের পর তেমন কোথাও ঘুরতে যাস নি । এখন যেহেতু যাচ্ছিস ওকে নিয়েই যা ।
অংকুর আবার আগের মতো একাই মতো উত্তর করলো কাঠ স্বরে….
” ও যাবে না মা । আর আমাদের সাথে ও গিয়েই বা কি করবে ? তুমি আগামী তিন দিন একলা থাকবে , তোমার সাথে একজন থাকা প্রয়োজন । ও থাকবে তোমার সাথে । আর আমরা তো ফিরছি তিন দিন পর ।
” আমি এতো দিন একলাই ছিলাম । এই যে মাসে মাসে এখানে ওখানে টইটই করে ঘুরে বেড়াস , বেড়িয়ে এসেছিস এতো দিন , তখনও একলাই ছিলাম আমি । এবার একটু ঘোরাঘুরির অভ্যাস টা কমিয়ে ফেল । এখন বিয়ে করেছিস , একলা নোস তুই । যখন ইচ্ছে কথা উঠতেই যেখানে সেখানে চলে যাবি বাউন্ডুলের মতো , তা আর হবে না । এবার একটু পরিবর্তন আনা নিজের মাঝে । এমনিতেও অনেক পরিবর্তনই এসেছে ।
আর , আরশ আর রিক্তা যখন একসাথে যেতে পারছে , তখন সুরবালা কে নিয়ে গেলে ক্ষতি কিসে ?
” তোমার সুরবালাকে বললেও যাবে না ।
আমি যাই এখন , প্যাকিং বাকি আছে । বিকেলে রওনা দিতে হবে । আর চিন্তা করো না , তিন দিনেরই ব্যাপার শুধু । দেখতে দেখতেই কেটে যাবে ।
বলেই সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠলো অংকুর । দরজার বাইরে খানিক থমকালো । ঠোঁটের কোণে ভিড় জমানো ফিচেল হাসি টুকু ঠেলে মুখ শক্ত করলো । গাম্ভীর্য ভাব টেনে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো । সুরবালা মুখ কালো করে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে কোমরে আঁচল গুঁজে । অংকুর কে দেখেই চোখ মুখ বিভৎস কুঁচকে ফেললো ও । এই লোক ঘুরতে যাবে বন্ধুদের সাথে । আজই যাচ্ছে , অথচ সুরবালা কে আগে থেকে একবারও জানানোর প্রয়োজন বোধ করলো না । শায়লা যখন বললো সুরবালা কে নিয়ে যেতে , তখন অংকুর ভার গলায় মুখের উপর বলে দিলো..
‘ ও যাবে না । আমাদের মাঝে ওকে নিয়ে গিয়ে কি করবো ?
সুরবালা কে কি একবারও জিজ্ঞেস করা হয়েছে ও যাবে কি না ? আর বন্ধুরা সবাই যাচ্ছে , এর মানে ঐ জবা ফুলও যাবে ! নিশ্চয়ই যাবে । ওকে আবার ছেড়ে যাবে নাকি ?
সুরবালা ফুঁসছে ভেতর ভেতর । কিড়মিড় করে ঝাঁট দিচ্ছে । অংকুর ওকে দেখেও দেখলো না । আলমারির দিকে এগোলো । আলমারির উপর থেকে ব্যাগ নামালো । সেটা এনে রাখলো সোফার উপর । অতঃপর আবার আলমারির দিকে এগোলো । দু-একটা কাপড় বের করে পিছু ফিরতেই সোফার উপর ব্যাগটা খুঁজে পাওয়া গেলো না । ডানে তাকাতেই দেখা গেলো মেঝের উপর ব্যাগটা উল্টে পড়ে আছে । সুরবালা ছুড়ে ফেলেছে ওটাকে । অংকুর তবুও ভাবাবেগ দেখালো না । ব্যাগটা আবার তুললো , কাপড় গুলো ঢোকালো ব্যাগের ভেতর । টুকটাক প্রয়োজনীয় সবটা সাজিয়ে নিয়ে গোসল খানার দিকে এগোলো গোসলের জন্য ।
সুরবালা কেবলই কটমটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো ওকে ।
খানিক ক্ষনের মধ্যেই গোসল সেরে বেরিয়েছে অংকুর । ঝাঁকড়া চুল মুছতে মুছতে বেরিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো ও । প্রতিবিম্বে পিছনের দৃশ্য চোখে পড়তেই ঝট করে পিছু ফিরলো । ব্যাগের মধ্যকার গোছানো কাপড় গুলো সব এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মেঝেতে । সুরবালা ঘরে নেই । ওর করা কান্ড দেখে আনমনে ফিক করে হেসে ফেললো অংকুর । দুদিকে আলগোছে মাথা ঝাঁকালো । ছড়ানো কাপড় গুলো ফের গুছিয়ে ব্যাগে ভরলো । এর মধ্যেই সুরবালা হাজির । অংকুর আভাস পেলো নুপুরের নিক্বনে ।
মুখের অবাঞ্ছিত ভঙ্গিমা পাল্টালো আবার । আলমারি থেকে কাপড় বের করে গায়ে জড়ালো । বেরোবে সেই বিকেলে । এবার ঘুরতে যাবে অন্যকোথাও । আর এই লোক এখনই পরিপাটি হয়ে তৈরি হয়ে গেছেন । ক্ষিপ্ততার মাত্রা বাড়লো সুরবালার । ভীষণ রাগ উঠছে । কেনো জানা নেই । তবে এই লোকটাকে দেখলেই রাগের মাত্রা তড়তড় করে বাড়ছে ।
তেড়ে আসলো সুরবালা । খ্যাক খ্যাক করে উঠলো অংকুরের নির্বিকার ভঙ্গিমা দেখে….
” কোথায় যাবেন আপনি ?
” সফরে যাচ্ছি । বললাম তো একটু আগে…
আয়নার দিকে দৃষ্টি রেখে ভেজা চুল গুলো পিছনের দিকে ঠেলে দিয়ে দায়সারা উত্তর করলো অংকুর । সুরবালার নাক ফুলে ওঠে । এবার রাগে নয় , অভিমানে । কন্ঠ নুইয়ে আসে….
” আর আমি ?
” তুমি আবার কি ? তুমি থাকবে বাড়িতে । শান্তিতে থাকতে পারবে তিন দিন । আমি থাকবো না । আমাকে দেখতে হবে না । ঝগড়া করা হবে না আমার সাথে । আমাকে সহ্য করতেও হবে না । তোমার তো খুশি হওয়ার কথা । তিন দিন দূরে থাকছি আমি ….
” কে কে যাচ্ছে আপনার সাথে ?
” আমরা সবাই !
” ঐ জবা ফুল ও ?
” হুম ।
এবার রুষ্ট হলো সুরবালা । মুখ খিচে চিবিয়ে বলল….
” তাহলে এই জন্যই আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন না ? ওখানে তো প্রেমিকা আছে , আমাকে নিয়ে গেলে তো বিপত্তিতে পড়বেন । তাই এড়িয়ে যাচ্ছেন আমাকে ?
অংকুর শীতল চোখ তুলে তাকালো । স্বাভাবিকের ন্যায় বললো….
” প্রেমিকা আবার কে ?
আর তুমি তো যাবে না আমি জানি । বেকার বেকার তোমাকে জোর করতে চাই না । তুমি বরং এই দুটো দিন শান্তিতে কাটাও আমাকে ছাড়া । ঝগড়ার প্রসঙ্গ গুছিয়ে রাখো , ফিরে আসলে আবার শুরু করে দিও ।
” আমি কি শুধু ঝগড়া করি আপনার সাথে ?
” আর তো কিছু করো না ।
গাল ফোলায় সুরবালা । কেমন ছটফট লাগে ।
অংকুর আর কথা বাড়ালো না । ঘর ছেড়ে নিচে নামলো । খেয়ে নেবে এখন ।
সে নিজে সুরবালা কে নিয়ে যেতে চায় না । অন্যথায় , রিক্তা বারবার বলেছে সুরবালা কে সাথে নিতে । মূলত সুরবালার জন্যই এবারের এই সফরের আয়োজন । অংকুর দূরে সরে গিয়ে তর্পাতে চায় সুরবালা । অংকুরের দূরত্ব , অনুপস্থিতির কদর অনুধাবন করাতে চায় সুরবালা কে । সে দেখতে চায় সুরবালার অবস্থা ।
বিকেলের আগে ব্যাগ গুছিয়ে নিচে নেমেছে অংকুর । ঘরে সুরবালা নেই । নিচেও নেই । ও বেরোবে এখন । ছাদে আছে নিশ্চিত । অংকুর ধীর পায়ে ছাদে উঠলো । কার্নিশ ঘেঁষে চুপটি করে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুরবালা । অংকুর পিছু থেকে মৃদু স্বরে ডাকলো….
” বাউড়ি ।
সাঁড়া শব্দ নেই । অংকুর খানিক চুপ থেকে বললো….
” আমি যাচ্ছি ।
” তো যান আমাকে বলতে এসেছেন কেনো ?
” নিচে চলো । মা একা আছে ।
” আমাকে রেখে যাচ্ছেন তো মায়ের কাছে । একলা হলো কি করে ? যান আপনি ।
না তাকিয়ে চড়া গলায় বলল সুরবালা । অংকুর এগোলো ওর দিকে । বললো মোলায়েম কন্ঠে….
” রেগে আছো ?
” রাগবো কেনো ? আমি কে রাগ করার মতো ? আপনি চলে যান । বন্ধু বান্ধবীরা অপেক্ষা করছে আপনার জন্য । জবা ফুল ও অধীরে অপেক্ষা করছে !
” ফুল তো তুমি । আমার অলকানন্দা । তুমি ব্যাতীত অন্য ফুলের সুবাস পছন্দ নয় আমার । তুমি ব্যাতিত তোমার সুবাস সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি । তোমাকে না ছুঁয়ে সেই সুবাসে অনুভব করবো তোমায় । আর এমনিতেও,আমি থোরিইই না তোমাকে ছুঁই । না ছুঁয়ে অনুভব করার অনুভুতি আলাদা । আর ভিন্ন অনুভুতির স্বাদ আমার ভীষণ প্রিয় । তুমিও আমার অনুপস্থিতিতে একটু ভিন্ন অনুভুতির স্বাদ অনুভব করো আপাতত । আমি যাই , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
” হ্যাঁ , যান যান । কে থাকতে বলছে আপনাকে ? চলে যান । শুধু তিন দিন কেনো , তিন মাস থেকে আসুন গিয়ে । আমার কি ?
অংকুর নিঃশব্দে মৃদু হাসে । সুরবালা মুখ ফিরিয়ে রেখেছে । যাওয়ার আগে এই বাউড়ির অভিমানী আদল খানা না দেখলে মন উতলা হয়ে উঠছে বাবড়ি ওয়ালার । ব্যাকুল উদগ্রীব হৃদয়ের সাথে চোখের প্রশান্তির প্রয়োজন । অংকুর সুরবালার আঁচলের এক কোণা উঁচিয়ে আস্তে করে টানলো । টান পেয়ে তড়িতে কুঁচকানো মুখখানা পিছু ফেরালো সুরবালা । আঁচলের থেকে চোখ সরিয়ে অংকুরের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের । ঝটকা মেরে আঁচল ছাড়িয়ে নিলো সুরবালা । রগরগে গলায় বলল মুখ ফিরিয়ে….
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫৭
” কেউ একজন বলেছিলো , ঐ জবা ফুলের থেকে সে শত ফুট দূরত্বে থাকবে । সে যেনো নিজের বলা কথা মনে রাখে । অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যেনো ! যদি খেলাপ হয় ,তাহলে কিন্তু ভালো হবে না বলে রাখলাম ।
বলেই বড় বড় ধাপ ফেলে ছাদ ত্যাগের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো । পিছন থেকে বললো অংকুর…
” শত নয় ,, হাজার ফুট দূরত্বে থাকবো ।
এবার তো একটু হাসি মুখে বিদায় দাও আমায় ।
