Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪
অনামিকা তাহসিন রোজা

দুপুরের মধ্যেই ধারার অবস্থান পুরোপুরি বদলে দিলেন সালমা বেগম। সব জিনিসপত্র শ্রাবনের ঘর থেকে সরিয়ে পাশের ঘরে এনে দিলেন। তাদের বাড়িতে কাজ করা বাবু ভাইকে দিয়ে ঘরও পরিষ্কার করে নিলেন। ঘরে ঢুকে অবাক না হয়ে পারল না ধারা। এত সুন্দর করে সাজানো গোছানো দেখে একটু হতবাক হলো বটে। তবে মনে মনে একটু খুশি হলো। আজ সে তাহলে বিছানায় ঘুমোতে পারবে। সালমা বেগম ধারার হাত ধরে টেনে বারান্দার দিকে নিয়ে আসলেন, মুখে বললেন,

—” দেখো বউমা, এই যে বারান্দা। তুমি চাইলে এখানে এসেও সময় কাটাতে পারো। এ বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর বারান্দা এটা।”
কথা মিথ্যে নয়। আসলেই খুব সুন্দর! ধারা অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো। বারান্দার বাঁ দিকে ঝুলছে রঙবেরঙের হ্যাংগিং পট, যেগুলোর প্রতিটাতে ফুটে আছে বাহারি ফুল, বেগুনী পেটুনিয়া, লাল গোলাপ, জিনিয়া, হলুদ রঙের নাম না জানা ফুল। নিচে সাজানো টবগুলোর ভেতরেও নানান জাতের গাছ, কিছুতে ছোট ছোট লেবু ধরেছে, কিছুতে পুদিনা আর তুলসি। পাশে রাখা ছোট্ট টেবিলে সাদা টেবিলক্লথ, যার ওপর রাখা রয়েছে একটি চায়ের কাপ আর একটি বই।
ধারা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেই সবুজে মোড়া কোণার দিকে। মুখে যেন নিজের অজান্তেই একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। এত শান্ত, এত আপন পরিবেশ সে অনেকদিন পর দেখছে। সালমা বেগম ওর দিকে তাকিয়ে আবার বললেন কোমল গলায়,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—”দেখো মা, এখানে বসে বিকেলে চা খাও, বই পড়ো, অথবা চুপচাপ থেকো। কেও তোমায় বিরক্ত করবে না। তুমি এই বাড়ির মানুষ, নিজের বাড়ির মতোই মনে করে থেকো।”
ধারা চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকলেও, মনটা ভরে উঠলো মায়ায়। অনেক না বলা অনুভব যেন চোখের কোণে এসে ভিড় করলো। সে ধীরে মাথা নাড়ল, তারপর হালকা গলায় বলল,
—”ধন্যবাদ, মা। এতটা ভাববেন ভাবিনি..আচ্ছা ফুলগাছ গুলো কি আপনার হাতের? ”
সালমা বেগম হেসে বললেন,
—” হ্যাঁ ওই আর কি। মাঝে মাঝে শখ করে করতাম। আজকাল আর এসব করা হয়না। সপ্তাহে দুদিন যত্ন নিতে পারি।”
ধারা এবার হুট করেই উৎফুল্লিত হয়ে বলল,

—” মা, আমারও না বাগান করার খুব শখ। গ্রামে কখনো চাচি এসব করতে দেয়নি। আপনি অনুমতি দিলে এই বাগানটা আমি নিজের মত করে সাজাই? একটুও নষ্ট করব না। যত্ন করব!”
বাচ্চাদের মত করে করা আবদার টা শুনে সালমা হেসে কাঁধে হাত রাখলেন,
—” অবশ্যই। এ ঘরটা তোমাকেই তো দিলাম, বারান্দাও তোমার। এসব করার তো সময় নেই আমার। তুমি নিজের মত করেই সাজাও, গোছাও। তোমারই তো সংসার!”

” সংসার!” শব্দটা শুনে বুক ধ্বক করে উঠলো ধারার। সংসার! তার সংসার! কার সাথে? ওই লোকটার সাথে! কিন্তু এটাকে কি সংসার বলে? কি জানি! এর মধ্যেই হুট করে ধারা লক্ষ্য করল শ্রাবণের ঘর টা ঠিক পাশে হওয়ায় এই বারান্দা থেকে শ্রাবণের ঘরের বারান্দা টা ঠিক দূরে নয়। অনেকটা কাছে, এতটাই কাছে যে হাতে হাতে কিছু দেয়া-নেয়াও করা যাবে। বিষয়টা খুব অসাধারণ হলেও ধারার ভয় হলো। লোকটা যদি বারান্দায় আসে, তাহলে তো অবশ্যই তাকে দেখতে পাবে। একদম সামনাসামনি দেখা যাবে। ধারার দৃষ্টি অনুসরণ করে সালমা বেগমও তাকালেন। শ্রাবণের সাদামাটা বারান্দা টা দেখে তিনি হেসে বললেন,

—” আমার ছেলে বারান্দায় কখনো আসেনা বউমা। দেখো, কতটা শূন্য হয়ে পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কতটা অযত্ন করে। ও তুমি ভেবো না। ও বারান্দাতে এমনিতেও আসেনা, তাই তোমায় দেখতেও পাবেনা। কিছু বলবেও না!”
ধারা মৃদু হাসল, তবু যেন তার চোখে এক অজানা দ্বিধা রয়ে গেল। এই বাড়ির বারান্দায় তার নিজের জন্য জায়গা হলেও, পাশের ঘরের বারান্দা টা, জানালাটা যেন একটা অদৃশ্য দেয়ালের মতো মনে হচ্ছে ওর কাছে। ভেতরে হঠাৎ একটা চুপচাপ শূন্যতা জমে উঠল, সেটা ভয় না লজ্জা, ধারা নিজেও ঠিক বোঝে না। সে চোখ নামিয়ে ধীরে বলল,

—”তবু আমি খুব জোরে কথা বলবো না, মা। যদি অসুবিধা হয় ওনার… মানে, বিরক্ত হন!”
সালমা বেগম এবার মুখের মধ্যে একটা দুষ্টু হাসি এনে বললেন,
—”আহা! এত ভাবার কিছু নেই! ও কিছুই বলবে না। বরং যদি কখনো বলে, তবে আমি আছি না? তখন আমি বুঝে নেব। তুমি নির্ভয়ে তোমার বাগান করো মা, মন খারাপ হলে এখানেই বসে থেকো।”
ধারার মুখে এবার সত্যিকারের একটা হাসি ফুটে উঠল। গলায় এক ফোঁটা কৃতজ্ঞতা লেগে রইল। তার শৈশবের সমস্ত রুক্ষতা যেন একটু একটু করে ঝরে যাচ্ছে সময়ের এই নতুন অধ্যায়ে। তবে নিজের মনেই তখন এক চাপা ভাবনা ঢুকে পড়ে—”এই সংসারে জায়গা পেয়ে গেছি হয়তো, কিন্তু শ্রাবণ নামের মানুষটার সাথে আমার কখনো জায়গা হবে?” সে প্রশ্নের উত্তর তখনো ঝাপসা, কিন্তু বারান্দার ফুলগাছগুলো ঠিকই রোদে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। আর ধারা বুঝে যায়,কোনো সম্পর্কের শিকড় গজানোর আগে প্রয়োজন হয় যত্ন, সময়, আর একটুখানি জায়গা। সেটা সে পেয়েছে। এখন হয়তো শুরুটা এখান থেকেই।

দুপুরে খেতে এসেছিল শ্রাবণ। ধারা তখন গোসল করছিল, নাহলে দেখত একটা লোক তার রান্না খেয়ে কতটা অভিভূত হয়েছে। না চাইতেও মাছের তরকারিটা খেয়ে মনে মনে বেশ প্রশংসা করেছে শ্রাবণ। এতটুকু মেয়ে হয়ে এত সুন্দর করে কীভাবে রান্না করল ভেবে পেল না শ্রাবণ। তবে সবার আড়ালে সে আরো দু চামচ তরকারি বেশি খেয়েছে। দুপুরে খাওয়ার পর অফিসে ফিরে গেছে সে। তাই ধারার সাথেও আর দেখা হয়নি। এদিকে সালমা বেগম ধারার প্রথম রান্নায় খুশি হয়ে এক জোড়া সোনার চুড়ি উপহার দিয়েছে, যা নিতে নারাজ ছিল ধারা। মোটামুটি জোরজবরদস্তি করেই তাকে দিতে হয়েছে।

রাত আটটায় বাড়ি ফেরার কথা শ্রাবণের। কিন্তু আজ কোনো এক কারনে সে বিকাল চারটার পরেই আবারো বাড়িতে ফিরে এসেছে। বিষয়টা চশমার আড়াল থেকে লক্ষ্য করলেন সামিউল শেখ, তারপর নিজের স্ত্রীর দিকে ইশারা করে কিছু একটা বোঝালেন। যা বোঝার বুঝলেন সালমা বেগম। জগ থেকে ঠান্ডা পানি ঢাললেন তিনি।
শ্রাবণ সোফায় বসে ল্যাপটপের ব্যাগ রাখলো, গায়ের কোটটা খুলে সোফাতে মেলে দিল। ক্লান্তিতে বড় করে শ্বাস নিতেই চোখের সামনে ঠান্ডা পানির গ্লাস দেখতে পেলো। সালমা বেগম চোখ দিয়ে গ্লাসটা নিতে ইশারা করলে শ্রাবণ ঢকঢক করে পানি খেয়ে ফেলে। মুখে “থ্যাংক ইউ মা” বলে। এ পর্যায়ে সালমা সন্দিহান হয়ে জিনিস করেন,
—” ব্যাপার কী শ্রাবণ? তোর তো এখন বাড়িতে ফেরার কথা না। রাত আটটায় ফেরার কথা। এত তাড়াতাড়ি চলে এলি কেনো?”
একটুও অপ্রস্তুত হলো না শ্রাবণ। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

—” কাজ হয়ে গেছে তাই ফিরেছি। আর ওই অফিসে যে ছোট আব্বু আমাকে কোনো কাজ করতেই দেয়না সেটা খুব ভালো করে তোমরাও জানো। শুধু শুধু থেকে সময় কেনো নষ্ট করব?”
তীক্ষ্ণভাবে ছেলের কথাগুলো শুনলেন সালমা বেগম। তিনি জানেন শ্রাবণ কখনো খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু যা বলে তা ভেবে-চিন্তেই বলে। এবারও তার কথায় যেন একটা চাপা অভিমান লুকানো। পাশে বসে থাকা সামিউল শেখ তখন মুখ গম্ভীর করে বললেন,

—”শুধু চাচার কথা বললি, নিজের দায়িত্বটা বলিস না কেনো? ওটা তো এখন তোকে বুঝতেই হবে।”
শ্রাবণ এবার একটু বিরক্ত গলায় বলল,
—”দায়িত্ব মানে? দায়িত্ব যদি শুধু ছোট আব্বুর কথামতো চুপচাপ বসে থাকা হয়, তাহলে আমি সে দায়িত্ব রাখতে পারব না। আমি অফিসে গিয়ে বসে থাকি, যেন আমি কোনো নিরীহ প্রাণী! কাগজপত্র তো আমাকেই পড়তে হয়, তবুও সিদ্ধান্ত আসে ছোট আব্বুর মুখ থেকে! তাহলে সেখানে আমার থাকার মানে কী? আর তাছাড়া কঠিন কাজগুলো ছোট আব্বু আমাকে করতে দেয়না!”
চুপচাপ বসে থাকা সালমা বেগম এবার একটু নরম স্বরে বললেন,

—”ছোট আব্বুর সঙ্গে কাজ করাটাই তো আসলে শেখা, বাবারে। তুই তাড়াহুড়ো করছিস কেনো? তুই এরপর থেকে পুরো অফিস সামলাবি বলেই এখন শুধু তোকে দেখতে বলছে হয়তো। শিখে রাখ শুধু!”
শ্রাবণ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,
—”আমি কাজ শিখতে চাই মা। কিন্তু এমনভাবে নয়, যেখানে আমাকে শুধু নামেই রাখা হয়। আজকে একটা কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম, উনি বললেন, ‘তুমি এখনো বুঝবে না শ্রাবণ’। এই ‘বুঝবে না’ কথাটা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। আমি তো কোনো স্কুলের ছাত্র না যে উনি আমাকে বোঝাতে থাকবেন আমি ছোট।”
সামিউল শেখ এবার চোখ সরু করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
—”তুই কি আলাদা কিছু ভেবে রাখছিস শ্রাবণ?”
শ্রাবণের চোখে এবার একটা স্থির আলো দেখা গেল। সে মাথা হেঁট করে বলল,

—”ভেবেছি, আব্বু। কাল থেকে অফিসে যাব। তবে আমি কাজও করব। তুমি ছোট আব্বুকে বলে দেবে যাতে আমার প্রতি অত ভালোবাসা না দেখায়। একটু কাজ করলে আমি শুকিয়ে যাচ্ছিনা। ছোট আব্বু অনেক ভালোবাসে আমায়, তাই তোমাকে দেখাতেই শুধু অফিসে থাকতে বলে। আর নিজের মতো কিছু করার ইচ্ছে আছে আমার। কাজের মর্যাদা চাই। সম্মানের সাথে শিখতে চাই, ছোট করে রাখার মধ্যে শেখা হয় না।”
সালমা বেগম হঠাৎ হো হো করে হেসে ফেললেন,
—”আল্লাহ! আমি তো ভাবছিলাম তুই বুঝি চাকরি ছেড়ে দিবি! এই ছেলে আবার এত হঠাৎ কবে বড় হলো, ভাবলাম হয়তো নিজের ব্যবসা-ট্যবসা নিয়ে কিছু ভাবছিস!”
সামিউল শেখও হেসে ফেললেন এবার। একটু যেন হালকা হলেন। কণ্ঠে প্রশ্রয় মেশানো সুরে বললেন,

—”তুই যদি এসব ভাবিসও, তাতেই বা দোষ কী? আমরা কি তোর শত্রু যে তোকে ছোট রাখতে চাইবো? কিন্তু যে গাছকে বড় করতে হয়, তার আগা ছেঁটে দিতে হয় মাঝে মাঝে। বুঝলি? তোর ছোট আব্বুর অভিজ্ঞতা অনেক, সময় নিয়ে চিন্তা কর।”
শ্রাবণ মাথা নিচু করে শুনছিল। এবার ধীরে মাথা তুলে বলল,
—”আমি বুঝি আব্বু, কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কেমন লাগে জানো? মনে হয় আমি যেন শুধু একটা ছায়া, যার কাজ বসে থাকা আর হাসি দেওয়া। অথচ আমি চাই আমারও কিছু হোক, এমন কিছু যেটা আমি নিজে বানিয়েছি, নিজে বুঝি, নিজে কাঁদি বা হই আনন্দিত।”
এই কথা শুনে সালমা বেগম এবার গম্ভীর হলেন। ছেলের দিকেই তাকিয়ে বললেন,

—”তুই যা বললি, সবই ঠিক। কিন্তু একদিন তোর এই ছায়ার ভেতর থেকেও আলো ফুটে উঠবে, মা’র কথা মনে রাখিস। তোর সময় আসবে। কষ্ট কর, তুই পারবি।”
শ্রাবণ হালকা মাথা নাড়ল। মুখে স্পষ্ট গাম্ভীর্য, কিন্তু চোখে ছিলো একটা গভীর আত্মবিশ্বাসের রেখা। শ্রাবণ এবার ব্যাগট্যাগ নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে শুরু করল। সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই কিছু একটা মনে পড়ল তার। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে ডাকলো সালমা বেগম কে,

—” মা, একটু এদিকে এসো তো!”
সালমা এলেন। শ্রাবণ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। সালমা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। হঠাৎ শ্রাবণের এমন অসস্তির কারন বুঝলেন না, নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলেন,
—” কী রে? কী হয়েছে?”
শ্রাবণ এবার নিজের ব্যাগ থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করল। এরপর সালমা বেগমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

—” আআ..আসলে, সকালে দেখলাম ও পুরোনো সালোয়ার কামিজ পড়েছে। আর শাড়ি তো সামলাতে পারেনা। তাই এগুলো..নতুন সালোয়ার কামিজ, আর একটা গাউন নিয়ে এলাম। ওকে দিও।”
বলেই বাম হাতে ঘাড় ডললো শ্রাবণ। ভীষণ অপ্রস্তুত সে। ঘেমে গেছে এটুকু কথা বলতে। সামিউল শেখ দূর থেকে মা ছেলের কথা বুঝলেন না। কিন্তু ছেলেকে আমতা আমতা করতে দেখে অবাক হয়ে চশমা ঠেললেন। বাপরে! তার কাঠখোট্টা, নিরামিষ ছেলে আবার লজ্জাও পায়?
সালমা বেগম চোখ সরু করে হাতের শপিং ব্যাগ টা নেড়েচেড়ে দেখলেন। কার জন্য এনেছে, এটা খুব ভালো করে জানার পরেও সরল মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন,

—” কার জন্য এনেছিস?’
বিরক্ত হলো শ্রাবণ। তবে বুঝলো না নিজের মায়ের এমন চালাকি। ঠোঁট ভিজিয়ে মিথ্যে রেগে গিয়ে জোর গলায় বলল,
—” মা, তোমার কি দিনদিন বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। তোমার জন্য এসব সালোয়ার কামিজ আনব নাকি? ওর জন্য এনেছি!”
সালমা বেগম মুখ কুঁচকে না বোঝার ভঙ্গিতে বললেন,

—” ও টা কে? ও বলতে কাকে বোঝাচ্ছিস!”
এ পর্যায়ে কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হলো শ্রাবণের। সালমা বেগমের চোখের দিকে অসহায় মুখে তাকালো। এক মুহুর্তেই বুঝলো যে, তার মা ইচ্ছে করে এমনটা করছে৷ বিষয়টা বুঝতে পেরে আরো অপ্রস্তুত হলো শ্রাবণ। অথচ গাম্ভীর্য ধরে রাখতে বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে বলল,
—” পাশের বাড়ির আন্টির ছোট মেয়েটার জন্য এনেছি। হয়েছে? যাও দিয়ে এসো পাশের বাড়িতে! যতসব নাটক! পুরো পরিবার আমার নাটক করা শিখেছে! ”
বলেই একটুও সময় নষ্ট করল না শ্রাবণ। নিজের অসস্থি লুকোতে হনহন করে উপরে উঠে পড়ল। নিজের ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লাগালো৷ ছেলের এহেন কান্ডে ফিক করে হাসলেন সালমা বেগম। হাসতে হাসতেই সামিউল শেখের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললেন,

—” তোমার ছেলে ভাঙবে তবু, মঁচকাবেনা। দেখেছো, ধারার যে ভালো জামাকাপড় নেই, সেটা ঠিকই খেয়াল করেছে। আসলেই,! ওকে তো সব নতুন শাড়ি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বেচারি তো শাড়ি সামলাতে পারেনা।”
সামিউল শেখও অবাক হলেন ছেলের এমন দায়িত্ব দেখে। হাতের পেপারটা উল্টে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
—” বাহবা! অবাক করার মত বিষয়! বুদ্ধিসুদ্ধি আছে তাহলে? আমি তো ভেবেছিলাম এখনও ছাগলই রয়ে গেছে। নাহ, তোমার ছেলে এখন ছাগল থেকে গরুতে পরিণত হচ্ছে। উন্নতি হয়েছে বটে। ”

ঠাস করে ঘরের দরজা বন্ধ করে হাতের ব্যাগ ল্যাপটপ সব বিছানায় ছুঁড়ে মারল শ্রাবণ। ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল বিছানায়। তার আসলেই বেশ অসস্তি হচ্ছে। সে কি ইচ্ছে করে এ কাজ করেছে নাকি? সকালে যখন ধারাকে দেখল, তখনই দেখলো মেয়েটার পরনের জামাটা বেশ পুরোনো। আর শাড়ি তো পড়তে পারছেনা। গত রাতেও তো বলল, কিছুই আনেনি গ্রাম থেকে। এই জন্যই তো শ্রাবণ প্রথমবারের মত মা ব্যতিত অন্য কোনো মেয়ের জন্য জামাকাপড় কিনে এনেছে। এতে এত অবাক হওয়ার কি আছে? সত্যি বলতে মায়া হচ্ছিল শ্রাবণের, তাই ও এ কাজ করেছে। তাই বলে যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে তা তো না। নিজেকে বুঝ দিল শ্রাবণ। প্রতিবারের মত ভাবল তার মা সালমা বেগম দুই লাইন বেশি বুঝে। সবসময় উল্টোপাল্টা চিন্তা ভাবনা!

চোখ বন্ধ করে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ছাড়তেই এতক্ষণ পর শ্রাবণ লক্ষ্য করল তার ঘরটা আগের মত হয়ে গেছে। আলমারির সামনে গত রাতে থাকা নীল রঙের ব্যাগটাও নেই। আশেপাশে ওই মেয়েটার চিহ্নও নেই। তার মানে মেয়েটা ইতোমধ্যেই তার ঘর থেকে চলে গেছে। মনে মনে খুশি হলো শ্রাবণ। যাক, এবার একটু শান্তিতে থাকা যাবে। চারপাশ টা ঠিকঠাক দেখে নিয়ে গোসল করার প্রস্তুতি নিল সে।
শ্রাবণ ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেও, ঘরের চারপাশের নিঃশব্দতা ঠিক যেন কিছু বলছিল। সেই নীরবতার ফাঁকেই বারান্দা দিয়ে এক ফালি হাওয়া ঢুকে জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। ওর ঘরের ঠিক পাশের বারান্দায় খোলা চুলে দাঁড়িয়ে ছিল ধারা। ছিমছাম, একদম সাদামাটা পোশাকে।

গোসলের জন্য তোয়ালে আর পায়জামা নিয়ে বাথরুমে ঢুকতেই শ্রাবণ হালকা ভ্রু কুঁচকাল। ফ্লোরে পানি জমে আছে খানিকটা, কিন্তু তার মাঝেই একটা অদ্ভুত কিছু চিকচিক করছে। চোখ আটকালো জিনিসটায়। গা থেকে শার্ট খুলে সজোরে একবার ঝাঁকিয়ে পাশের হুকে ঝুলিয়ে রাখল সে। তারপর পানির ধারায় পা ভেজানোর আগেই তার চোখ আটকে গেল সেই ঝিলমিল জিনিসটার উপর। সে নিচু হয়ে দেখল, একটা সোনার চেইন পড়ে আছে বাথরুমের টাইলসে। খুব পাতলা না, আবার খুব ভারীও নয়। চেনটা একপাশে সামান্য ঘষা লেগে আছে, অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছে তাহলে। শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে তুলল চেইনটা, কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। সকালে তো ধারা গোসল করেছে এখানে। আর এই বাথরুমে শ্রাবণ ছাড়া এমনিতেই কেও আসেনা। তাহলে চেইন টা ওই মেয়েটারই হবে। হঠাৎই যেন অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল শ্রাবণের। এক হাতে চেনটা ধরে দাঁড়িয়ে ভাবল, এখন যদি এটা সালমা বেগমের হাতে দিয়ে ধারাকে ফিরিয়ে দিতে বলে, তাহলে আবারো উল্টোবাল্টা বুঝবে তার আদর্শ মা। তাই নিজ হাতেই ধারাকে এটা ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ।

গোসল সেড়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দিতেই শ্রাবণের এক মুহূর্তে মনে পড়ে গেল, ওই ব্যাগটায় সেই সালোয়ার কামিজ আর গাউন, ওসব কি মেয়েটাকে দিয়েছে? হুট করে কেমন যেন ধুক করে উঠল তার বুকটা। কী ভাববে মেয়েটা? মা যে এখনই দিয়ে দেবে ওকে, সেটা তো নিশ্চিত। এখন যদি বলে যে আমি এনেছি? তাহলে তো…দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাাবণ। যা ভাবে ভাবুক গিয়ে! সে তো এনেছে মায়া হয়েছে তাই।
টি শার্ট গায়ে জড়াতেই শ্রাবণের ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
—”শ্রাবণ, দরজা খোল তো। গোসল হয়েছে? ”
সালমা বেগমের কণ্ঠ। শ্রাবণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খুলে দাঁড়াল। সালমা বেগমের হাতে এখনও শপিং ব্যাগ টা দেখে ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। সালমক হাতের কাপড়ের ব্যাগটা বাড়িয়ে দিলেন,

—”যা, দিয়ে আয়, একবারে নিজেই দিয়ে আয়। ঘরেই আছে ধারা!”
শ্রাবণ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
—”এত নাটক না করলেও চলতো মা। তুমি দিলে কী সমস্যা? আমি কেনো দিতে যাব?”
সালমা হেসে বললেন,
—”তুই নিজের হাতে দে, ও বুঝুক এটা কে দিয়েছে। আমি দিলে তো বলবেই ‘মা দিয়েছে’। আর তুই দিয়ে দিলে একটুখানি লজ্জা পাবে… বুঝলি? খুশি হবে মেয়েটা! যা!”
শ্রাবণ কপাল চুলকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—”তুমি আসলেই ছায়া কাকিমা থেকে নাট্যকার হয়ে গেছো, জানো? এসব হচ্ছে টা কী মা? আমার কিন্তু আসলেই ভালো লাগছেনা। জোর করে কোনো কিছু হয়না। মেয়েটাকে অসহ্য লাগছে আমার। তুমি ইচ্ছে করে এমন করে কী ভাবছো? আমি মোটেই বউ ভেবে ওর জন্য এসব আনিনি। একটা মানুষ ভেবে মায়া হয়েছে, তাই এনেছি। এটাকে অত বড় করে অতিরিক্ত কিছু ভাবার মানে নেই।”
সালমা বেগম হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—” শ্রাবণ, তুই এমন করিস না…আমার কথাটা..
শ্রাবণ সালমা বেগমের কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলো,
—” তোমার যদি মন চায়, তবে নিজে গিয়ে দিয়ে এসো মা। নইলে দেয়ার দরকার নেই, ফেলে দাও। আমি তবুও এসব আহ্লাদ করতে পারবনা!”
সালমা বেগম চুপচাপ হয়ে গেলেন। ছেলের মুখে এই কড়া সুরে কথা শুনে একটু সময় নিলেন নিজেকে সামলাতে। এক হাতে শপিং ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরলেন, অন্য হাত দিয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করলেন। শ্রাবণের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর গলায় খুব নরম একটা দাগ টেনে বললেন,
—”মা হয়ে তোকে কখনো কোনো কিছুতে জোর করিনি শ্রাবণ, আজও করছিনা। শুধু চেয়েছিলাম, তোর একটু সহানুভূতি, একটু নিজের থেকে ভাবা দেখে মেয়েটার মুখে হাসিটা ফুটুক। ও তো কিছু চায়নি আমাদের কাছে। তোর ঘরে এক রাতই থেকেছে, তাও মুখ নামিয়ে। মেয়েটা ভেতরে ভেতরে কতটা চাপে আছে জানিস?”
শ্রাবণ এবার আর চোখে চোখ রাখতে পারল না। মুখ নামিয়ে নীরব হয়ে গেল। তবে বিরক্ত হলো। সালমা ব্যাগটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। ধীরে ধীরে বললেন,

—”তুই যদি না দিতে চাস, আমি দেব। তবে জানিস, কিছু কিছু জিনিস নিজের হাতে না দিলে, তার মূল্য বোঝা যায় না। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুই সেটা বুঝিস। ঠিক আছে, থাক। তুই শান্তিতে থাক। আমি দিয়ে আসছি।”
বলেই সালমা বেগম ধীরে ধীরে চলে গেলেন পাশের ঘরের দিকে। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে রইল দরজার ফ্রেমে। তার গলা শুকিয়ে গেল যেন। একটা ভারী অস্বস্তি জমে বসলো বুকের মধ্যে। কিছু একটা বলার ছিল তার, কিন্তু কথাগুলো আটকে গেল গলায়। সে জানে, তার মা তাকে দোষ দিচ্ছে না। কিন্তু কেন জানি আজকের কথাগুলো কেমন বিঁধে গেল তার ভেতরে। সত্যিই তো,জোর করে কেউ কিছু বলেনি। শুধু একটু সদিচ্ছার কথা ছিল। এতটা কঠিন হয়ে গেল কেন তার জন্য? একটু ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করল শ্রাবণ। ফিরে এসে বিছানার ধারে বসে পড়ল। বুকের ভেতরটা হালকা ধকধক করছে। হঠাৎই মনে হলো, যদি ধারা জানে, এসব তার জন্য সে কিছুই করতে চায় না? যদি ভাবে, শ্রাবণ তাকে ঘৃণা করে? শ্রাবণ মোটেই ঘৃণা করেনা মেয়েটাকে। শুধু ভালো লাগছেনা। চোখ বন্ধ করে শ্রাবণ মাথা নিচু করল। কিছু জিনিস আসলেই বলে না বুঝিয়ে দিতে হয়। সে হয়তো ভুল করেছে, হয়তো একটু কঠিন হয়ে গেছে।
শ্রাবণ চোখ খুলল। ঠোঁটে হালকা হাসি এলো। মাথা তুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে একটু দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। হয়তো এখনই কিছু বলার সময় না। তবে সময় আসছে। আর সেদিন, এই চুপচাপ শ্রাবণ, হয়তো একটু জোরে বলবে, নিজের হাতে দিয়েই বলবে তোমার জন্যই এনেছি।

শেখ বাড়িতে মাঝে মাঝেই একটু হুলস্থুল লেগে থাকে। তবে প্রতিদিন বিকালে সবাই একসাথে ড্রয়িং রুমে সময় কাটায়। প্রতিদিনের মত আজও বিকালে বাবু নামের সার্ভেন্টটা এসে শ্রাবণকে ডেকে বলল,
—” ছোট সাহেব, বড় সাহেব আপনাকে নিচে ডাকছেন। সবাই একসাথে একটু নাস্তা করবেন। বড় ম্যাডাম সবার জন্য নুডলস বানিয়েছে।! ”
শ্রাবণ প্রথমে মনে মনে যেতে চাইলো না, কিন্তু পরক্ষনে কিছু একটা ভেবে বুদ্ধি করে বলল,
—” সবাই তো আছে-ই। আমি না গেলেও হবে। খাব না আমি!”
শ্রাবণের বুদ্ধি কাজে লেগেছে। সাথে সাথে বাবু মাথা নেড়ে বলল,

—” না না সাহেব, সবাই নিচে নেই। শুধু বড় সাহেব আর ম্যাডাম আছে৷ নতুন ম্যাডাম কে তো এখনও ডাকিনি। আপনাকে আগে ডাকতে আসলাম। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন, আমি নতুন ম্যাডাম কেও ডেকে নিয়ে আসি!”
বলেই পাশের ঘরে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লো বাবু। এদিকে শ্রাবণ এটাই চাইছিল। কৌশলে জেনে নিল ধারা ঘরেই আছে কিনা। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা সোনার চেইন টা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। নিজের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলো, অপেক্ষা করল ধারার বের হওয়ার। একটু পরেই খট করে শব্দ হলো ধারার ঘর থেকে।

সোজা হয়ে দাঁড়ালো শ্রাবণ। দেখতে পেলো, আকাশীরঙা ওয়ান পিস পড়ে মাথায় সাদা রঙের একটা ওড়না জড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে ধারা। এক মুহুর্তের জন্য থমকালো শ্রাবণ। সে ইচ্ছে করেই আকাশীরঙা এই ওয়ান পিস টা এনেছিল, তার মনেই হয়েছিল ধারার ফর্সা গায়ে এটা সুন্দর লাগবে। কিন্তু তাই বলে এতটা মানানসই হবে, এতটা সুন্দর লাগবে তা ভাবেনি। কতটা স্নিগ্ধ লাগছে মেয়েটাকে! একদম পরীর মত! শ্রাবণের এবার আফসোস হলো, সে কেনো ওই টকটকে লাল রঙের জামাটা নিয়ে এলো না!
ধারা দেখতে পায়নি ডান পাশের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রাবণ কে। সে নিজের মত করে এগিয়ে যেতে চাইলে শ্রাবণ ফট করে ডেকে উঠে পেছন থেকে,

—” এই শোনো! ”
খানিক পরিচিত পুরুষালি কন্ঠটা কানে যেতেই থমকে দাঁড়ালো ধারা। তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে তাকালে মাথায় থাকা ওড়নাটা সরে যায়, আলগা চুলগুলো গালে এসে পড়ে। এই দৃশ্যটাই একটা পুরুষকে ঘায়েল করার জন্য যথেষ্ট। ধারা পিছনে পুরোপুরি ফিরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এক হাতে ওড়না ঠিক করল। জানেনা কেনো যেন, লোকটাকে তার একটু একটু ভয়ই লাগে।
শ্রাবণ নিজে থেকেই এগিয়ে এলো। ধারা সংকুচিত হলো, ভাবল বোধহয় কঠিন কোনো কথা শুনতে হবে। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে শ্রাবণ তার হাতে থাকা চেইনটা মুখের সামনে তুলে ধরে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—” এটা কি তোমার?”
ধারা চোখ তুলে তাকাতেই জ্বলজ্বল করে উঠলো তার মুখটা। চোখ বড় করে তাকিয়ে ফট করে শ্রাবনের হাত থেকে চেইনটা নিয়ে অনেক বেশি উৎসুক হয়ে তড়িঘড়ি করে বলতে থাকলো ,

—” হ্যাঁ, হ্যাঁ, জ্বি এটা আমার। জানেন আমি সকাল থেকে পাগলের মত খুঁজছি এটা। আমার মায়ের শেষ স্মৃতি এই চেইন টা। ভেবেছিলাম হারিয়ে ফেলেছি। অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আল্লাহর কাছে হাজারো সুকরিয়া! সুকরিয়া মাবুদ! ফিরে পেলাম!”
শ্রাবণের মুখটা একটু নরম হয়ে গেল ধারার কথাগুলো শুনে। তার মুখের উত্তেজনা, চোখের ভিজে ভিজে ছলছলে চাহনি, সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আবেগ খেলে গেল ভেতরে। চেইনটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ? ওর মায়ের শেষ স্মৃতি! এইটুকুন সময়েই মেয়েটা ওর সামনে এতটা মন খোলামেলা হয়ে পড়লো, এতটা স্বাভাবিক! শ্রাবণ একটু চুপ করে রইল। ভালো লাগলো তার! চেইনটা হাতে নিয়ে যেভাবে ধরা দিয়েছিল, যেন কোনো দামি গয়না নয়, বরং সে নিজে কোনো জরুরি দায়িত্ব শেষ করছে, আর সেই দায়িত্ব এখন সম্পন্ন হয়েছে।
ধারার মুখের দিকে না তাকিয়ে হালকা গলায় শ্রাবণ বলল,

—” বোধহয় সকালে গোসল করার সময় খুলে পড়ে গেছে। আমি বাথরুমের ফ্লোরে পেলাম। এখন থেকে ঠিকঠাক করে রেখো, দেখো আবার হারিয়ে ফেলো না। এসব ছোটখাটো জিনিস হারালে খুঁজে পাওয়া মুশকিল!”
ধারা এক মুহূর্ত থেমে হেসে ফেলল। তার হাসিটা ছিলো নিঃশব্দ, একদম চোখ দিয়ে ফুটে উঠল। সে মাথা নিচু করে বলল,
—”জানি না কী করে খসে পড়েছিল..এখন থেকে খেয়াল রাখব। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি না পেলে… আমার হয়তো আর ফিরে পাওয়া হতো না।”
শ্রাবণ একটু নড়েচড়ে নিল নিজের ভেতরের অস্বস্তি সামলাতে। ধারা এর মধ্যেই চেইনটা আবার গলায় পড়ার চেষ্টা করল। শ্রাবনও দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো। দু-তিনবার চেষ্টা করার পরেও চেইনের হুকটা লাগাতে পারছেনা ধারা। বিরক্তিতে কষ্টে মুখ কুঁচকে রেখেছে সে। কি আশ্চর্য! চেইনের হুক লাগছেনা যে!
ধারাকে বারবার চেইন পড়তে ব্যর্থ হতে দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে হাত পেতে দিয়ে শ্রাবণ বলল,

—” আমায় দাও!”
ধারা চোখ তুলে তাকালো। বাধ্যের মত এক বাক্যেই শ্রাবণের হাতে দিল চেইনটা। শ্রাবণ এবার চেইনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে তৎক্ষনাৎ আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—” ওদিকে ফিরে তাকাও।”।
প্রথমে বুঝলোনা ধারা, নিশ্চিত হতে শুধালো,
—” হু? ”
শ্রাবণ ঢোক গিলে তাকালো মেয়েটার দিকে। এক মুহুর্তের জন্য চোখে চোখ পড়ল। তবে দ্রুত চোখ সরালো শ্রাবণ, আগের থেকেও গম্ভীর গলায় বলল,
—” পেছনে ঘুরতে বলেছি।”

ধারা মাথা নেড়ে পিছনে ঘুরল। শ্রাবণ এবার এক পা এগিয়ে এলো। ধারার মাথা থেকে ওড়না নামিয়ে দিল। সাথে সাথে দৃশ্যমান হলো খোপা করে রাখা চুলের আড়ালে ফর্সা ঘাড়টা। এক মুহুর্তের জন্য থমকে গিয়ে নিজের উপরেই বিরক্ত হলো শ্রাবণ। মেয়েটা কতটা ছোট, কিন্তু তবুও তাকে এভাবে টানছে কেনো? কীসের এত টান? কখনো তো আগে এমন হয়নি। বিদেশে গিয়ে হাজারো মেয়ে দেখেছে সে! কই! তবুও তো এমন অনুভূতি টের পায়নি। শ্রাবণ নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করল। কিন্তু তার নিঃশ্বাস একটু অগোছালো হয়ে উঠেছে।
ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ফর্সা ঘাড়, আড়ালে থাকা নরম চুলের গন্ধ, বিকালের হালকা আলো, সব মিলিয়ে যেন একটা নীরব অস্বস্তির ঘূর্ণি তৈরী হয়েছে ভেতরে। ধারার হাত থেকে নেয়া চেইনটা সে সাবধানে মেয়েটার গলায় পরিয়ে দিল। হুকটা লাগাতে একটু সময় লাগলো। আঙুল কাঁপল না ঠিকই, কিন্তু মনটা কাঁপছিল। খুব সাবধানে এমন ভাবে পড়ালো যাতে আঙুলের স্পর্শও মেয়েটার শরীরে না লাগে।

ধারাও নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, একটুও না নড়ে। তার মনে হচ্ছিল যেন বাতাসও থেমে গেছে, কিংবা সময় থেমে আছে ঠিক এই মুহূর্তের জন্য। তবে কেনো যেন মন থেকে খুব ভরসা করছিল লোকটাকে। শ্রাবণ শেষবার হাত সরাতে গিয়েও এক মুহূর্ত থেমে গেল। চোখ পড়ল মেয়েটার ঘাড়ে, সেই নরম লাইনটায়, যেটার কোনো নাম হয় না, শুধু অনুভব করা যায়।
সঙ্গে সঙ্গেই নিজের প্রতি বিরক্তিতে দাঁত চেপে হাত সরিয়ে নিল সে। চেইনটা লাগিয়ে নরম গলায় বলল,
—”হয়ে গেছে।”
ধারা ধীরে পেছনে ফিরল। নিচু স্বরে বলল,
—”ধন্যবাদ।”

শ্রাবণ তাকালো এক পলক। ফর্সা গলায় চিকন সোনার চেইনটা কি সুন্দর চিকচিক করছে। এবার পরিপূর্ন হচ্ছে মেয়েটাকে। শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিল, যেন সামান্য দেরি করলেই ধরা পড়ে যাবে তার মনের ভাব। ঠোঁট কাঁমড়ে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—”এসো, নিচে যাই। সবাই বসে আছে।”
ধারা মাথা নেড়ে সাড়া দিল। দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ির বাঁকে এসে দুজনেই একসাথে একটু থমকাল। নিচ থেকে ভেসে এলো সালমা বেগমের হাসির শব্দ আর রান্নাঘরের ভাজাভাজা গন্ধ। শ্রাবণ নিশ্চিত দুজনকে একসাথে নামতে দেখে সালমা বেগম একটু হলেও পচাবে শ্রাবণকে। কীভাবে যেন ওর মনের কথাটা ধরে ফেলে ধারা। নিচে তাকিয়ে বলল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩

—”আপনি আগে যান। আমি একটু পরেই আসছি।”
শ্রাবণ একবার তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে নেমে গেল নিচে। সস্থি পেলো। ধারা দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, গলায় হাত বুলিয়ে অনুভব করল সেই চেনটা, যেটা একসময় হারিয়ে গিয়েছিল, আবার কেউ খুঁজে এনে দিয়েছে। শুধু চেইন নয়… ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া অনুভবগুলোও কেউ যেন খুঁজে আনছে আবার… নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে। শ্রাবণ গিয়ে সোফায় ধপ করে বসতেই পা চালালো ধারা। তারা যে একসাথে আসেনি সেটা বোঝানোর ক্ষুদ্র প্রয়াস!

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫