শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৫
অনামিকা তাহসিন রোজা
সালমা বেগম গ্রামের মেয়ে ছিলেন। পড়াশোনা করতে ঢাকায় এসে দেখা হয়েছিল সামিউল শেখের সাথে। বিয়েটা প্রেমের না হলেও সামিউল শেখ মনে মনে সালমা বেগমকে পছন্দ করে একদম বিয়ের প্রস্তাবই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরে অনেক ঝুট ঝামেলা পেরিয়ে তাদের সংসার শুরু হয়েছিল। নতুন করে আলাদা এক জীবন শুরু করতে অনেক কষ্ট হয়েছিল সালমা বেগমের। কিন্তু দিন শেষে যখন স্বামী নামক মানুষটার দিকে চোখ তুলে এক পলক তাকাতো, তখনই সব দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যেত।
এই মুহুর্তে সালমা বেগমের কাছে নিজের ছেলে আর বউমাকে, তাদেরই প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছে। তিনি রান্নাঘর থেকে গম্ভীর হয়ে ম্যাগাজিন পড়তে থাকা শ্রাবণ, আর অপলক দৃষ্টিতে সরল চিত্তে তাকিয়ে থাকা ধারাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর যাই হোক না কেনো, একটা মেয়ের দৃষ্টি বোঝেন তিনি। ধারা হয়তো শ্রাবণ কে ভয় পায়, তবে সম্মানও করে। হয়তো শ্রাবণ একটু নরম হলেই ধারা নিজেকে আর গুটিয়ে রাখবেনা। সম্ভব হবেনা! একটা মেয়ের তো আশ্রয় প্রয়োজন! বাবা-মা কে একদম হারালে একটা মেয়ের শেষ আশ্রয় তার স্বামীই হয়, এরপরই হয় সন্তান! আর শ্রাবণের সাথে যে একটা মিষ্টি সংসারে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব, ধারাকে দেখেই বুঝেছেন সালমা। না জানি তার ছেলেটার মন কবে একটু গলবে!
সামিউল শেখ ম্যাগাজিন টেবিলে রেখে চোখের চশমা ঠেলে একটু হাঁক ছুঁড়লেন,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—” কই গো গিন্নি? তোমার হাতের স্পেশাল নুডলস টা আনো তাড়াতাড়ি। বৌমা তো এসে গেছে।”
বাবার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। বৌমা এসেছে মানে? কেনো? শুধু ও এসেছে? সে আসেনি? মুখে বিরক্তির রেখা টেনে শ্রাবণ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—” বাবা, আমিও এসেছি।”
সামিউল শেখ দু সেকেন্ড চোখের পাতা পিটপিট করলেন। কপালে ভাঁজ ফেলে বুঝতে চাইলেন নিজের একমাত্র গুনধর ছেলের অভিব্যক্তি। ছেলে টা কি ইর্ষা করছে! এরপর আরেকটু জোরে বললেন,
—” ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার সোনায় বাঁধানো যক্ষের ধন ছেলেও এসেছে গিন্নি। আমি তো ধন্য হয়ে গেলাম তোমার একমাত্র আদুরে ছেলেকে এখানে দেখে। তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো।”
সালমা বেগম হেসে বাটি গোছাতে গোছাতে বললেন,
—” আসছি, আসছি! ”
এদিকে শ্রাবণ রাগে ফুঁসতে থাকলো। খুবই বাজে একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। বাড়ির সবাই কোনো কারন ছাড়া পিচ্চি মেয়েটাকে নিয়ে লাফালাফি করছে, আর তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বেশি আদর-সোহাগ করছে। এসবের মানে টা কী? তার আদর্শ বাবা সামিউল শেখ যে ইচ্ছে করে ধারাকে এত আদর করছে, তা খুব ভালোই জানে শ্রাবণ। এ বাড়িতে এখন কেও পাত্তাও দিচ্ছেনা তাকে, তার কোনো দামই নেই। সবাই পিচ্চি একটা মেয়েকে নিয়ে পাগল হয়ে আছে।
বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে সামিউল শেখের পাশে বসা তথাকথিত পিচ্চি মেয়েটার দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো শ্রাবণ। কিন্তু সহজ সরল গোলগাল চেহারার ধারার মুখ টা দেখে ভ্রু শিথিল হলো তার। মেয়েটা একদম অসহায় মুখ করে মাথা নিচু করে রেখেছে। হাতের আঙুলগুলো কঁচলে শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। আশ্চর্য! এত কিসের সংকোচ ওর? একটু আগেই তো শ্রাবণের সাথে কত উৎফুল্লতার সাথে কথা বলল? তবে কি ভুল করে ওমন ভাবে কথা বলেছে?
শ্রাবণের এক মুহুর্তের জন্য ধারাকে দেখে মায়া লাগলো। কত-ই বা বয়স হবে মেয়েটার! ষোলো কি সতেরো! এমনই হবে। এই বয়সে এসেও এতটা সংকোচ, দ্বিধা, ভয়, অসহায়ত্ব কেনো? ছোট থেকে চাচির অত্যাচার সহ্য করেই বোধহয় নিজের দৃঢ় চিত্ত বাজে ভাবে হারিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। কিন্তু তার-ই বা কি করার! এখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া শ্রাবণ মেয়েটার জন্য কিছু করতে পারবেনা। স্ত্রী হিসেবে তো মানতেই পারবে না! তবে দায়িত্ব গুলো মানার চেষ্টা করবে।
সালমা বেগম খানিক সময় পরই রান্নাঘর থেকে ট্রে হাতে বেরিয়ে এলেন। ট্রের ওপর কয়েকটা সাদা সিরামিক বাটি, তার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা নুডলস, সাথে দুটো ছোট পাত্রে সস আর কাঁচা মরিচ ভিনেগারে ভেজানো। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে-মুখে একরকম আগ্রহ, এই একসাথে খাওয়ার মুহূর্তটাই তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সময় যে।
টেবিলের এক প্রান্তে ট্রে টা নামিয়ে রেখে বড় শ্বাস নিলেন সালমা বেগম, বললেন,
—” এই নুডলস কিন্তু আজকে একটু স্পেশাল, ধারা খাবে বলেই বানালাম। ভেজিটেবল কেটে কেটে হাত ব্যথা হয়ে গেল, তবে ওর মুখে হাসি দেখলেই ঠিক হয়ে যাবে!”
এই কথা বলেই একবার চোরা চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন তিনি। শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, ঠোঁট চেপে বসে আছে সে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মনে মনে গজগজ করছে। সালমা বেগমও ঠোঁট টিপে হাসলেন। আশ্চর্য! তার ছেলেটা কবে থেকে এমন হিংসুটে হয়ে গেলো। এদিকে ধারা একটু চমকে উঠল। তার মুখে লজ্জা আর বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। সে ভদ্রভাবে বলল,
—” মা, আমি বেশি খাবনা। অল্প একটু খাই?”
সালমা বেগম চোখ পাঁকিয়ে হেসে বললেন,
—”একটু না, ঠিকঠাক করে খাবি। খেয়ে না ফেললে কিন্তু আমি রাগ করব। আর, খেয়ে বল কেমন হয়েছে।”
তারপর ধারা সামনে এক বাটি এগিয়ে দিলেন।
সামিউল শেখ তখন নুডলস বাটির গন্ধ নিয়ে বললেন,
—”ওফ, গিন্নি! তুমি যদি এখন রেস্টুরেন্টে কাজ করতে তাহলে সে রেস্টুরেন্টে আমি রিটায়ারড জীবন কাটিয়ে দিতাম!”
সালমা হেসে বললেন,
—”তাহলে এখন থেকেই রোজের মেন্যু ঠিক করে ফেলুন, মিস্টার শেখ! আর কেবল ঘ্রাণ নিয়েই প্রশংসা করা বাদ দিন, আগে খেয়ে দেখুন।”
শ্রাবণের রসকষহীন মুখ দেখে এবার সালমা হাসি আটকাতে পারলেন না, জোর করেই একটা বাটি তার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
—” এমন করে মুখ ঝুলিয়ে রেখেছিস কেনো বাপু? তুই কি দিনদিন ছোট বাচ্চা হয়ে যাচ্ছিস? তোর জন্যও তো রেঁধেছি। আজ আর বিরক্ত হবি না। খেয়ে দেখ, সত্যি দারুণ হয়েছে!”
শ্রাবণ মুখে কিছু না বললেও চামচ হাতে নিলো। আড়চোখে ধারাকে দেখলো। মেয়েটা কি যেন ভাবছে। কেনো ওভাবে বাটির দিকে তাকিয়ে আছে? শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েই রইলো। খানিক চুপ থেকে হুট করেই ধারা মিনমিন করে বলে উঠলো,
—” এটা… এটা খুব গরম।”
শ্রাবণ নিজের বাটিতে চামচ চালাতে চালাতেই আরেকটু ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সালমা বেগম এবার বললেন,
—” কিছুক্ষণ নাড়তে থাকো মা, ঠান্ডা হয়ে যাবে। আর একটু গরম হলেই খেতে ভালো লাগে।”
ধারা বাধ্য মেয়ের মত মাথা নামালো। আর বাটিটাও কোলের কাছে রেখে অপলক তাকিয়ে রইলো। শ্রাবণ বিরক্ত হচ্ছে, এভাবে কোলের উপর বাটি ধরে রাখলে কি ঠান্ডা হবে? সালমা বেগম এবার হুট করেই কিছু একটা মনে করে পাশের বাসার কোনো এক ভাবির মেয়েকে নিয়ে আলোচনা করা জুড়ে দিলেন স্বামীর সাথে। বেচারা সামিউল শেখও কোনো উপায় না পেয়ে স্ত্রীর পাড়ার কাহিনী শুনতে থাকলেন।
অনেকক্ষণ নিজের বাটিতে চামচ চালিয়ে, ফু দিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নুডলস টাকে আনলো শ্রাবণ। এরপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো বাবা, মায়ের দিকে। আপাতত সালমা বেগম বকবক করতেই ব্যস্ত, আর সামিউল শেখও ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে স্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে মেকি হেসে কথা শুনছেন।
সুযোগ পেলো শ্রাবণ। আড়চোখে ধারাকে এক পলক দেখে নিয়ে ফট করে ওর কোলের বাটিটা নিজে নিয়ে, নিজের হাতের বাটিটা ধারার কোলে একই জায়গায় দিয়ে দিল। বিষয়টা এত দ্রুত হলো যে কেওই টের পেলো না। কিন্তু আকস্মিক ঘটনায় ধারা হতবিহ্বল হয়ে নির্বাক ভঙ্গিতে চেয়ে থাকলো শ্রাবণের দিকে। কারন সেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটার হাতে থাকা বাটিটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বাটি ধরিয়ে দিয়েছে শ্রাবণ শেখ।
শ্রাবণ এবার ধারার বাটিটা আবারো নিজের বাটির মত করে চামচ দিয়ে নেড়ে ফট করে খেতে শুরু করল। এক চামচ খেয়েই ধারার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো। ধারার দৃষ্টি দেখেই বুঝলো মেয়েটা অবাক হয়েছে। তবে অবাক হওয়ার মত কারন খুঁজে পেল না শ্রাবণ। ধারা গরম নুডলস খেতে পারছে না বলেই তো সে নিজের টার সাথে এক্সচেঞ্জ করল, এতে অবাক হয়ে হা হয়ে থাকার মানে কী? শ্রাবণ আবারো আলোচনায় ব্যস্ত নিজের বাবা-মা’র দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে ধারাকে বলল,
—” হা করে তাকিয়ে আছো কেনো? আমাকে দেখে কি নায়ক মনে হচ্ছে?”
ধারা অজান্তেই যন্ত্রের মত উপর নিচ মাথা নাড়ালো, যার অর্থ হ্যাঁ। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকাতেই ধারা ফটাফট ডানে বায়ে মাথা নাড়ালো, যার অর্থ জোরালোভাবে না। কোনোভাবেই না। এ হতেই পারেনা। শ্রাবণ কিছুটা থতমত খেয়ে আরেকটু সতর্ক কন্ঠে বলল,
—” হা করে না থেকে চুপচাপ খাও। নুডলস ঠান্ডা করেই দিয়েছি। ”
ধারা এরপর এক চামচ নুডলস মুখে নিল। আসলেই কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে নুডলসটা। খেতেও ভালো লাগছে৷ শ্রাবণও আড়চোখে খেয়াল করল এবার মেয়েটা খেতে পারছে কিনা। কোনো কথা নেই কারো মুখে, নীরবতা নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের জন্য।
এদিকে সালমা বেগম নিজের আলোচনার ইতি টেনে বললেন,
—” পাশের বাসার ভাবি এমন নাটক করছে যেন তার মেয়ে খুব ভালো বর পেয়েছে! ছেলেটাকে তো দেখলাম আমি। এক নাম্বারের ছ্যাঁচড়া, দেখেই টিকটকার মনে হচ্ছে। না আছে গুন, না আছে আচার আচরণ। এমন ছেলেকে কেও কীভাবে পছন্দ করে বিয়ে করে, ভেবে পাইনা বাপু! রিলেশন করে বিয়ে করে বোধহয় উদ্ধার করেছে!”
সামিউল শেখ টেনে টেনে বললেন,
—” তোমার নিজের ছেলে বোধহয় খুব ভালো?’
সালমা বেগম হতবাক হয়ে চোখ বড় করে বললেন,
—” অবশ্যই। আমার ছেলে তো হীরের টুকরো। ওই ছ্যাঁচড়ার সাথে তুমি কোন সাহসে আমার ছেলের তুলনা করো হ্যাঁ? আকাশ পাতাল তফাত! আমার ছেলের মত ছেলে হয়না হুহ!”
সামিউল শেখ স্ত্রীর যুক্তিতে হার মানলেন। তারপর হঠাৎ ধারাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—”আচ্ছা বৌমা, বলো তো তোমার এই শ্বাশুড়ির ছেলে কেমন? মানে বাহ্যিক ভাবে এই গরুকে দেখে তোমার কেমন মনে হয়?”
ধারা চোখ বড় করে শ্রাবণের দিকে তাকাল, শ্রাবণ তখন নিচু গলায় কাশল, বোঝা যাচ্ছিল, এবার রেগে উঠবে। শেষমেশ তার বাপ এই মেয়েটার সামনেও তাকে গরু বলল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধারা হেসে ফেলল। এরপর নিজেকে ধাতস্থ করে নরম গলায় বলল,
—” না মানে..আমি কীভাবে বলি? আমি তো..!”
সামিউল শেখ মাঝ পথে থামিয়ে মুখ কুঁচকে বললেন,
—” আহহা! বলোই না। এক পলকে দেখে তোমার কেমন মনে হয়? শুধু বলো -ভালো, নাকি খারাপ? এক শব্দেই জবাব চাই!”
সালমা বেগমও দৃঢ় চিত্তে মাথা নাড়ালেন। তারও জানা চাই। ধারার মনে হলো কেও তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন টা ছুঁড়ে দিয়েছে। চামচ ধরা হাত টাও কাঁপছে এবার। সে ভীত নয়নে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ মুখ নামিয়ে রেখেছে বাটির দিকে, চামচ ধরা হাতটাও অকারনে নুডলসে চালাচ্ছে। সেও আড়চোখে একবার ধারার দিকে তাকালো। মেয়েটা কি তাকে খারাপ বলবে? যদি ভুল করেও খারাপ বলে, তাহলে নুডলস ঠান্ডা করে দেয়া বাটিটা ফিরিয়ে নেবে বলে সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ!
সালমা বেগম ভাবলেন ধারা হয়তো খারাপই কিছু বলবে। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধারা মিনমিন করে বলল,
—” ভালো! উনি ভালো!”
ঘরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা! সালমা বেগম আর সামিউল শেখ চোখাচোখি করে হাসলেন। সালমা তো গর্বের সাথে চোখ পাকালেন নিজের স্বামীকে। শ্রাবণ থামলো, চামচ মাঝপথে স্থির। কেনো সে জানেনা, তবে তার মধ্যে ভালো লাগা কাজ করেছে। সস্থির শ্বাস ফেলেছে অজান্তে। ধারার মুখে হালকা একটা সরল হাসি, একটা নির্ভেজাল প্রশংসা যেন, কোনো প্রত্যাশা নেই, কেবল যা দেখেছে তাই বলেছে। শ্রাবণের সাথে এবার চোখে চোখ পড়ল ধারার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই অপলক দৃষ্টির ভেতর যেন কিছু একটা নড়ে উঠলো তার ভেতরে। তারপর সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু তার গলায় এবার কোনো বিরক্তি ছিল না। শুধু একটুকরো নরম দীর্ঘশ্বাস!
সালমা বেগম এবার হুট করে ধারার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
—” আরেহ মাশা-আল্লাহ। আমি তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। ধারাকে কত সুন্দর লাগছে। হ্যাঁ রে শ্রাবণ, তুই এসব ড্রেস আরো কয়েকটা এনে দিস তো! তোর পছন্দ আছে বলতে হবে।”
নুডলস খেতে থাকা ধারা এবার কেশে উঠলো। শুধু তার-ই নয়, বেচারা শ্রাবণেরও বিষম লেগে বাজে অবস্থা, শোচনীয় পরিস্থিতি! আজব কারবার! আজ কি সবার বিষম লাগার রোগ হলো নাকি! একসাথে দুজনকে বিষম লেগে কাশতে দেখে কোনোমতে হাসি আটকে রাখলেন সামিউল শেখ। শ্রাবণও অবাক হয়েছে ধারাকেও কাশতে দেখে, সে কোনোমতে বুকে হাত দিয়ে পানি খেলো। ধারাও শ্রাবণের দেখাদেখি পানি খেলো। তবে অবাক হয়েছে মেয়েটা, কারন সে আসলেই জানত না যে, শ্রাবণ তার জন্য জামাগুলো কিনে এনেছে। লোকটা তার জন্য জামা কিনেছে! বিষয়টা হুট করে শুনে বুঝে নিতে পারেনি ধারা। কারন ড্রেসগুলো আসলেই খুব সুন্দর!
অবস্থা স্বাভাবিক করতে সামিউল শেখ কিছু একটা মনে করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
—” ওহ ভালো কথা, শ্রাবণ শোন, আগামী সাতদিন তোর আর অফিসে যেতে হবেনা।”
কয়েকদিন আগে এই কথা শুনলে শ্রাবণ খুশিতে লুঙ্গি ডান্স দিত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, এখন বাইরে না গিয়ে বাড়িতে থাকা মানে পিচ্চি মেয়েটার আশেপাশে থাকা। মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখলেই অসস্তি হচ্ছে শ্রাবণের। তাই ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কিন্তু কেনো? আমি মোটেই বাড়িতে বসে থাকব না বাবা!”
সামিউল শেখ এক গ্লাস পানি খেয়ে বললেন,
—” কথা টা শেষ করতে দাও। আমি বলেছি অফিসে যাবেনা, কিন্তু বাড়িতে বসে থাকবে তা তো বলিনি বাপ!”
ধারাও এবার উৎসুক হয়ে নুডলস চিবোতে চিবোতে তাকালো সবার দিকে৷ ব্যাপার টা সেও বুঝতে আগ্রহী। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
—” তাহলে?”
সামিউল শেখ এবার সালমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” ধারার চাচা করিম সাহেব কল করেছিল। গ্রামে নাকি রীতিনীতি আছে যে বিয়ের পর জামাই গিয়ে সাতদিন শ্বশুর বাড়িতে বউ সহ থেকে আসে৷ তো, তাই কালকে শ্রাবণকে আর বউমাকে মোহনপুর পাঠিয়ে দেব। ধারার ফুফুও নাকি এসেছে। তাই দেখা করে আসুক!”
মাথায় বজ্রপাত পড়ল শ্রাবণের। পাগল নাকি? সে গিয়ে গ্রামে সাতদিন থাকবে? তাও আবার এই মেয়েটার সাথে? কখনোই না? অসম্ভব! শ্রাবণের ভ্যাবাচেকা খাওয়া দৃষ্টি দেখেই সামিউল শেখ যা বুঝার বুঝলেন, তাই কঠোর ভাবে বললেন,
—” শোনো শ্রাবণ, সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। বিয়ে যেহেতু হয়েছে, এখন না গেলে মানুষজন খারাপ বলবে। গ্রামের সবাই জামাই-বউকে দেখতে আসবে। এমনিতেও তোমাদের বউভাতের অনুষ্ঠান হয়নি, আর তাছাড়া ধারাও একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসুক, আবার কবে যে যেতে পারে তা তো জানা নেই। ”
শ্রাবণ এবার রেগে গিয়ে সজোরে বলল,
—” কিন্তু বাবা, আমি যেতে পারবনা। শুধু ওকেই পাঠিয়ে দাও। আমাকেই কেনো যেতে হবে? ওসব ঝামেলা নিতে পারবনা আমি। আর তাছাড়া গ্রামে থাকতে আমার অসুবিধা হয়, ওমন অজপাড়াগাঁয়ে আমি সাতদিন থাকতে পারবনা!”
ধারা হাতের বাটিটা আবারো কোলে নামিয়ে রাখলো। সামিউল শেখ এবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। চশমা খুলে ধীরে ধীরে টেবিলে রাখলেন। চোখের দৃষ্টিটা একেবারে স্থির, ছেলের চোখে চোখ রেখে বললেন,
—”শ্রাবণ, তোমাকে আমি কোনোদিন জোর করিনি। তোমাকে নিজের মত বড় হতে দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিতে দিয়েছি। কিন্তু একটা বয়সে এসে মানুষকে কিছু দায়িত্ব নিতেই হয়। তোমার মা-বাবা জীবিত আছে, তোমার জন্য সব করে, তুমি চাইলে ঘাড় ঘুরিয়ে চলে যেতে পারো। কিন্তু ধারা? ওর তো আর কেউ নেই! আমরা ছাড়া ওর দুনিয়ায় এখন আর কেউ নেই। ওর চাচার বাড়িটাই এখন ওর বাপের বাড়ি হলেও ওখানে আর কখনো থাকবেনা!”
একটু থেমে ধরা গলায় বললেন তিনি,
—”আর তুই তোর বউয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি যেতে পারিস না? সাতদিন? কিসের এত আপত্তি বল তো? সারাজীবন তো থাকতে বলছি না!”
শ্রাবণ জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
—”বাবা তুমি জানোই না, ওখানে গেলে মানুষজন কত প্রশ্ন করবে! ওর সাথে স্ত্রীর মত আচরণ করতে হবে, আমি নিজেই মানতে পারিনা… একঘেয়েমি লাগে সব! আমি কোথাও আটকে থাকতে পারব না!”
সালমা বেগম এবার হালকা রাগের গলায় বললেন,
—”তুই আটকে থাকবি না বলেই কি মেয়েটা সারাজীবন গুটিয়ে থাকবে? একদিন হলো বিয়ে হয়েছে, একটা মেয়ের স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগে না? শুধু নিজের কথা ভেবে কথা বলিস না শ্রাবণ। ”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো,
—”আমি ওসব বুঝি না মা! আমি পরিষ্কার বলছি, আমি এই নাটকগুলোতে নেই! যদি যেতে হয়, ও যাক। আমি যাব না।”
এবার সামিউল শেখ ধৈর্য হারিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন,
—”তুই যাবি। কারণ তোর যাওয়া দরকার। এটা শুধু একটা রীতি না, মানুষের মুখ বন্ধ রাখার জন্য না, এই মেয়েটা তোকে নিজের স্বামী বলে মানুক আর না-ই মানুক, সম্মান করছে। তুই তার পাশে দাঁড়াবি না, তাহলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না। আর গ্রামে যারা আছে, তারা তোকে দেখে ধারার মর্যাদা বুঝবে।”
তিনি এবার নিচু গলায় বললেন,
—”মা-মরা একটা মেয়ে। ওর জীবনটা তোকে দিয়েই নতুন করে শুরু হয়েছে। আর তুই সাতদিনের জন্য ওর পাশে দাঁড়াতে পারবি না?”
এই কথা শুনে শ্রাবণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। মনে মনে অযুহাত খুঁজলো, তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—”বাবা, আমি তো অফিসের কাজ… মানে…মিটিং..!
সালমা বেগম চোখ পাকিয়ে বললেন,
—”অফিসে তো যাচ্ছো না! অফিসই তো বলেছে রেস্ট নাও, তুমি এখন আবার অফিসের অজুহাত দিচ্ছো? তোমার মতো ছেলে কী এমন কাজ করে যে অফিস না গেলে কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে? তোমার ছোট আব্বু আছে তো!”
শ্রাবণ এবার গলা চড়িয়ে বলল,
—”আচ্ছা! তো ধরো আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি? তখন কী হবে? ওই গাঁয়ের মধ্যে গেলে সর্দি-জ্বর লেগে যায় আমার!”
সামিউল শেখ ঠাণ্ডা গলায় হেসে বললেন,
—”তা হলে তো একদম যেতেই হবে। ওখানে পাকা ঘর, ফ্যান আছে, খাবার আছে। এখনকার গ্রাম আগের মত না। আর তুই যদি জ্বরেও পড়িস, ধারা তোকে দেখে রাখবে। নতুন বউয়ের একটু অভিজ্ঞতা হোক!”
ধারা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। মাথা নিচু করে কথাগুলো শুনছিল। মন খারাপ লাগছে ওর! শুধু শুধু তার জন্য একটা মানুষকে এত বিরক্ত হতে হচ্ছে। বিষয়টা খুবই কষ্ট দিচ্ছে ওকে। অজান্তেই কান্না পেলো তার। এ জীবনে সে সারাজীবনই কারো না কারো বোঝা হয়ে থেকেছে। আজও বোঝা হয়ে থাকতে হচ্ছে। তবে এটাও ঠিক, ধারার বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছে। ও বাড়িতে তার ছোট ছোট দুটো চাচাতো ভাই-বোন আছে। ছোটবেলার খেলার সাথী একমাত্র বান্ধবী জান্নাতি আছে। তাদেরকেও দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে ধারার। কিন্তু এই মানুষটাকে বিরক্ত করতে মন চাইলো না।
এবার হঠাৎ করেই ধারা মাথা তুলে একটু দ্বিধাভরা গলায় মিনমিন বলল,
—” আ..বাবা, আমি একাই যেতে পারব। আপনাদের কোনো সমস্যা হলে…শুধু আমায় গাড়িতে উঠিয়ে দিলেই হবে।”
সালমা শেখ শুকনো ঢোক গিললেন। মেয়েটার চোখে স্পষ্ট পানি দেখতে পাচ্ছেন তিনি। নিশ্চয়ই শ্রাবণের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছে। সামিউল শেখ সঙ্গে সঙ্গে গলা চড়িয়ে বললেন,
—”না বউমা, তুমি একা যাবে না। জামাই ছাড়া কেউ মেয়েকে একা পাঠায় না। আর ও শুধু জামাই না, ও তো তোমার স্বামী, অভিভাবক।”
ধারা মাথা নামালো। শ্রাবণ দাঁড়িয়ে থেকে এবার আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। অজুহাত ফুরিয়েছে। মুখে বিরক্তি থাকলেও সে বুঝেছে, এইবার আর না বলার সুযোগ নেই। সে একটানা তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ সবার দিকে। তারপর মুখের কোণে ঠোঁট কামড়ে ধীরে গলায় বলল,
—”ঠিক আছে, যাবো…কিন্তু আগে বলে রাখছি, আমি কোনো নাটক করতে পারব না! কথা কম বলবো, কারো সাথে মিশব না!”
সামিউল শেখ হেসে বললেন,
—”তাই-ই করেই এসো। তোর মুখ দেখে কেউ আসবে না। সবাই তো আসবে তোর বউকে দেখতে!”
শ্রাবণ এবার থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। ধারার আর ভালো লাগছে না। সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে মানুষটাকে বিরক্ত করতেও মন চাইছে না। মনে মনে চিন্তায় পড়ে গেলো ধারা। চাচি কি লোকটার সাথে ভালো ব্যবহার করবে, ঠিকঠাক আপ্যায়ন করবে তো? ধারার চিন্তা যেন থামতেই চায় না। শ্রাবণের মুখের প্রতিটি ভাঁজ, তার বিরক্ত গলা, চোখ সরিয়ে নেয়া, সবকিছু এত তীক্ষ্ণভাবে গেঁথে গেছে ওর মনে যে, হঠাৎ হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে উঠছে। এমন নয় যে সে কিছু আশা করে, একটুও না! বরং এতোটা অপ্রত্যাশা আর অবহেলা দেখে, সেই পুরোনো অনুভূতিগুলো আবার জেগে উঠছে। সবসময়ই তো আমি অপ্রয়োজনীয়, আজও ব্যতিক্রম কী!— ভেতরে একটা কষ্টের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে ধারার।
সালমা বেগম সবই বুঝলেন, একটু পর তিনি ওর পাশেই এসে বসে ওর মাথায় হাত রাখলেন। শান্ত কণ্ঠে কানের কাছে গিয়ে বললেন,
—”মন খারাপ করিস না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। শ্রাবণ রাগী স্বভাবের ছেলে, কিন্তু খারাপ না…সময় লাগবে শুধু। আর তুই তো তোর চাচাতো ভাই-বোনদের দেখতে পাবি, জান্নাতি তোকে দেখে কত খুশি হবে রে! তোকে দেখে ওর মুখে হাসি ফুটবে। একটু আনন্দ করে আসবি!”
ধারা কেবল মাথা ঝাঁকিয়ে “হুম” বলল। গলা দিয়ে কোনো শব্দ এলো না। তখন সামিউল শেখ আবার বললেন,
—”আর তোর সেই চাচিকে নিয়েও চিন্তা করিস না। আমি নিজে কথা বলেছি করিম ভাইয়ের সাথে। ওর মুখ যেন তিতা না হয়, সেটার খেয়াল রাখবে সবাই। আর তুই চিন্তা করিস না, আমি প্রতিদিন ফোন করে তোর খোঁজ নেব।”
ধারা একটু কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। যদিও মনে মনে ভীষন চিন্তায় পড়েছে সে। সালমা বেগম আবার বললেন,
—”আর শোন, তোরা যাওয়ার আগে আমি ধারার জন্য একটা শাড়ি আর একটা হালকা লাল বা গোলাপি কামিজ কিনে আনব। বউমা তো একটু আধটু সেজেগুজে থাকলে গ্রামে সবাই খুশি হবে।”
শ্রাবণ এবার হঠাৎ বলে উঠল,
—”মা, ওই বাড়ি এখনো কি সেই খুপরি ঘরেই? মাটির ঘর? বিদ্যুৎ তো আসে?”
সামিউল শেখ একহাতে চশমা তুলতে তুলতে বললেন,
—”সাত বছর আগের গ্রাম আর এখনকার গ্রাম এক না শ্রাবণ। ঘর পাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ আছে। একটা মোটামুটি বাথরুমও বানানো হয়েছে। কষ্ট হবে না। আর তোর সেই ছোটবেলার বন্ধু, সাদিক, ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে!”
শ্রাবণ মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকালো। ধরা পড়ে গেছে, তার যুক্তিগুলো একে একে ভেঙে পড়ছে। সব অজুহাত ফুরিয়ে গেছে। সে আর কিছু বলল না। এদিকে ধারা আবার একটু গুটিয়ে গেল নিজের ভেতরে। তাহলে কালই যেতে হবে! চোখ বুজে জান্নাতির মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। সেই ছোটবেলার কোলাহল, পুকুর পাড়ে বসে গল্প করা, তালগাছের নিচে পাতা বিছিয়ে খাবার খাওয়া, সব স্মৃতি হঠাৎ খুব কাছের হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবল,
শুধু একটাই অনুরোধ আল্লাহর কাছে, কেউ যেন ওনাকে আবার অপমান করতে না পারে। উনাকে আমি কষ্ট দিতে চাই না। তারপর খুব ধীরে নুডলসের শেষ চামচটা মুখে তুলল।
রাত জাগার অভ্যেস নেই শ্রাবণের। খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে খুব ভোরে উঠতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে। তবে কোনো একটা বিশেষ কারনে আজ শ্রাবণ রাত জেগেই ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আগামীকাল কে মেয়েটাকে নিয়ে গ্রামে যেতে হবে, ভাবতেই বিরক্ত লাগছে। আবার গ্রামে সাদিক আছে, শ্রাবণের ছোট বেলার বন্ধু। ধারাকে নিয়ে তার সামনেও দাঁড়াতে হবে! এসবের ভাবনাতেই আজ অনেক রাত হলেও চোখের পাতা এক করতে পারেনি শ্রাবণ। একটু পর হঠাৎ করেই শ্রাবণের বদ্ধ দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। এত রাতে সালমা বেগম ছাড়া শ্রাবণের ঘরে কেও আসেনা, এটা জানে শ্রাবণ। তাই কোনোকিছু না ভেবেই হাতে ফাইল নিয়ে দেখতে দেখতেই দরজা খুলে দিল। কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়ানো ধারাকে দেখে চমক খেলো। হাতে থাকা ফাইলটা ফঁসকে যাচ্ছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” তুমি?”
ঠোঁট কাঁমড়ে মাথা নিচু করল ধারা। হাতদুটো পেটের কাছে রেখে কচলাতে কচলাতে বলল,
—” একটা কথা ছিল আপনার সাথে!”
চোখ সরু করে তাকালো শ্রাবণ। ধারার চোখে মুখে ভয়, দ্বিধা, আতঙ্ক সবই দেখতে পাচ্ছে ও। আশ্চর্য! এত ভয় পেলে সামনে আসারই দরকার টা কী? আর এত রাতে এখানে আসলোই বা কেনো? ধারাকে দেখে সত্যিই অবাক হয়েছে শ্রাবণ, কিন্তু নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” ঘরের ভেতরে আসবে?”
নিতান্তই না বললে নয়, বলেই বলেছে শ্রাবণ। ঘরের দরজায় কেও দাঁড়িয়ে থাকলে ভেতরে ঢুকতে বলাটাও একটা সৌজন্যের মধ্যে পড়ে। তবে ধারা দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—” এখানে দাঁড়িয়েই বলি?’
শ্রাবণ হাতে থাকা ফাইলটা বিছানার দিকে ছুঁড়ে মেরে দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে বলল,
—” বলো! ”
ধারা হুট করেই শ্রাবণের চোখের দিকে তাকালো। ঢোক গিলল শ্রাবণ। মেয়েটা এমন দৃষ্টি দিচ্ছে কেনো? কিছু বোঝাতে চাচ্ছে কি? শ্রাবণ এক মুহুর্তের জন্য আবিষ্কারও করে ফেলল মেয়েটার চোখ দুটো মারাত্মক সুন্দর। যেন আগুনের আঁচ আসছে, এতটাই তীক্ষ্ণ। তাহলে একটু কাজল দিলে মনে হয় আকর্ষনের তোপে আর তাকানোই যাবেনা! শ্রাবণ নিজের ভাবনাতে কেশে উঠলো। ধারা এবার মিষ্টি হেসে বলতে শুরু করল,
—” আমি জানি আপনি গ্রামে যেতে বিরক্ত হচ্ছেন। আমি এটাও জানি আপনি ওখানে গিয়ে থাকতে পারবেন না, কষ্ট হবে আপনার। তাই ভাবছি, আপনি শুধু আমায় গ্রামে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসলেও পারেন। তারপর আমি সাতদিন পর একা একাই ফিরে আসতে পারব। তাহলে আপনাকে রাতও থাকতে হবেনা, নিয়মও রক্ষা হবে।”
শ্রাবণ স্তব্ধ হয়ে গেল। ধারার এমন সংবেদনশীল প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। তার ধারণা ছিল, মেয়েটা নিশ্চয়ই কোনো বায়না নিয়ে এসেছে, হয়তো গ্রামে যাওয়ার সময় নিয়ে কিছু বলবে, কিংবা সালমা বেগমের কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো আবেগী কিছু বলবে। কিন্তু না, ধারা তার ঠিক উল্টোটা করল। মেয়েটা আবারো নিজেকে সরিয়ে রাখল। আবারো নিজের অসুবিধাকে গিলে ফেলে শ্রাবণের স্বস্তিটাকেই বড় করে দেখল।
এক মুহূর্তের জন্য শ্রাবণ তার চোখ সরাতে পারল না ধারার মুখ থেকে। একটা মেয়ের চোখে এতটা নরম, কিন্তু এতটা মাটি হয়ে যাওয়ার মত উদারতা, কিছুটা লজ্জা হলো ওর নিজের ব্যবহারের কথা ভেবে। কিন্তু সে তো নিজের প্রতিজ্ঞায় বাঁধা। এই সম্পর্ক সে মানেনি, মানতে চায়ও না, নিজের মনে এর ব্যত্যয় সে এখনই ঘটতে দিতে চায় না। তবুও এবার কণ্ঠটা আর আগের মতো রুক্ষ হলো না। গলায় একধরনের ক্লান্তি, আর একটুখানি সহানুভূতি মিশিয়ে বলল,
—” তুমি এভাবে বারবার নিজেকে হীন করে দিচ্ছো কেনো? আমি কি তোমায় এ বিষয়ে কিছু বলেছি? তোমারও তো কিছু চাওয়ার থাকতে পারে, কিছু বলার… একটা মানুষ যদি চুপচাপ সব সহ্য করে, তাহলে মানুষ ধরে নেয় তার অনুভবই নেই।”
ধারা চমকে তাকালো শ্রাবণের মুখের দিকে। এই প্রথমবার হয়তো সে শ্রাবণের গলায় কোনো অদ্ভুত উষ্ণতা টের পেল। শ্রাবণ এবার চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
—” তুমি গ্রামে যাবে, ইটস ওকে, আমি নিয়ে যাচ্ছি। সাত দিন থাকব। যা নিয়ম, তাই হবে। তোমার জন্য না, আমার পরিবারের জন্য, আমার বাবার জন্য। আর তুমি… এইসব প্রস্তাব আর দিও না। নিজের জায়গাটাকে ছোট করো না। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি বাবাকে কথা দিয়েছি। মানিয়ে থাকতে পারব! তোমায় রেখে এলে তুমি তো একা ফিরে আসতেও পারবেনা!”
ধারা প্রথম কথা গুলো শুনলেও শেষ কথাটায় উৎফুল্লিত স্বরে বলে উঠলো,
—” না না, আমি পারব!”
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ,
—” কী পারবে?”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” একা একা ফিরে আসতে পারব।”
শ্রাবণ কপালে ভাঁজ ফেলে জোরালে কন্ঠে বলল,
—” এখান থেকে মোহনপুর গ্রাম প্রায় একশ কিলোমিটার রাস্তা। বাসে করে এত লম্বা জার্নি একা করতে পারবে, কে বলেছে? জীবনে করেছো?”
ধারা মাথা দু’দিকে নেড়ে না বোঝালো। শ্রাবণ ঠোঁট গোল করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—” পিচ্চি মানুষ, পিচ্চির মত থাকো। এসব বিষয়ে কথা বলতে হবেনা। আমি যাব, আমি থাকবোও। তুমি কি আমায় এতটা অপদার্থ মনে করো নাকি? আই ক্যান ডু ইট। গিয়ে ব্যাগ গোছাও! সকালের দিকে বের হবো!”
ধারার ঠোঁটে আস্তে আস্তে ফোটে উঠলো একটা অবাক, ধন্য, লাজুক হাসি। সে আস্তে করে বলল,
—” ধন্যবাদ… আমি শুধু এতটুকুই বলার জন্যই এসেছিলাম। আর হ্যাঁ, আপনি কাজ করুন। আমি যাচ্ছি।”
শ্রাবণ এবার ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” এতটুকু? এত রাতে এসেছিলে, আর এতটুকুই বলবে?”
ধারা একটু ইতস্তত করে, তারপর নিচু গলায় বলল,
—” এক কাপ চা বানিয়েছিলাম। আপনি তো রাত জেগে আছেন… তাই ভাবলাম…
শ্রাবণের চোখ এবার একটুখানি বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এইসব কি নিজে থেকে করেছে, নাকি কেও বুদ্ধি দিয়েছে ভেবে পেলো না শ্রাবণ। সে কিছু না বলে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তারপর ধীরে গলায় বলল,
—” চা এনেছো?”
ধারা ঠোঁট চেপে মাথা নেড়ে বলল,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪
—” বাইরে রাখা আছে। চাইলে নিয়ে আসি?”
শ্রাবণ এবার আস্তে করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর বলল—
—” না, থাক। আমি নিজেই আসছি বাইরে।”
শ্রাবণ মোটেই চা খায়না। কফি খেয়ে অভ্যস্ত সে। চা দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে। তবে কেনো যে ধারা চা বানিয়েছে শুনে খেতে চাইলো কে জানে? সে তো চাইলেই বলতে পারত, আমি চা খাইনা। তবুও বলল না। কেনো? এই কেনো-র উত্তর শ্রাবণও খুঁজে পেলো না। তবে বলতে ইচ্ছে করছিল না।
