Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩২
অনামিকা তাহসিন রোজা

ধারা ঘরে বসে বসে নখ কাঁমড়াচ্ছে। চোখের মণি তো মোটেই স্থির নেই। সে যদিও এখনো বোঝেনি যে কেনো তার শ্বশুড় আর শ্রাবণ এভাবে বিষম খেয়েছিল। আরে বাবা, সে তো বললই যে করেনি কাজটা। তবে এমন প্রতিক্রিয়া দিল কেনো? ধারা ভীষণ চিন্তিত। সে এবার নখ কাঁমড়ানো বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলো। সেই সময় শ্রাবণ চোখের ইশারায় তাকে ঘরে আসতে বলেছিল। তাই বেচারি ধারা কোনো কিছু না ভেবে ছুট লাগিয়েছিল ঘরে। আর এখন বসে বসে হিসেব মিলাচ্ছে। তবে মেলাতে প্রতিবারের মত অক্ষম!
একটু পরেই অসহায় মুখ নিয়ে ঘরে ঢুকলো শ্রাবণ। ধারা সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আর চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁট কাঁমড়াতে থাকলো। কারন সে ভয় পেয়েছে। শ্রাবণ কিছুক্ষণ সরু চোখে তাকিয়েই রইলো ধারার দিকে। এই মেয়ে কি আদৌও বড় হবে? বুদ্ধি সুদ্ধি কি সব গতরাতে গিলে খেয়েছে? শ্রাবণ অনেকটা সময় ধরে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে গেলো ধারার দিকে। ধারা আরো তটস্থ হলো। শ্রাবণ এবার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোঁমড়ে দুহাত রেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

—” তুমি কি গাধা? ”
ধারা শোনেনি ভালো করে। খুবই অসস্থিতে পা কাঁপছে যে। তাই নিশ্চিত হতে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,
—” হুম? না না, আমি ধারা।’
শ্রাবণ ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলল। কপালে দু আঙুল রেখে ভাবল কিছু একটা। এরপর ধারার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
—” তুমি একটা গাধা, বলদ। রামবলদ চেনো? তুমি হচ্ছে সেই ডিপার্টমেন্টের বলদ! তোমার মত…
বাকিটা শেষ করতে দিল না ধারা। তার আগেই শ্রাবণের গমগমে কন্ঠের এমন কথা শুনে ফোঁস করে কেঁদে দিল। ঠোঁট উল্টে চোখ বন্ধ করে হাউমাউ করে কান্না শুরু করল বেচারি। শ্রাবণ চমকে গেছে। এই মেয়ে কি কান্নার ডিগ্রি নিয়ে এসেছে? কথায় কথায় এত কাঁদে কীভাবে? ধারার চোখে পাইপ লাগিয়ে সব পানি বের করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করবে বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল শ্রাবণ। কারন এত পানি তো চোখে রাখা যাবে না। মেয়েটা বোধহয় ছোটবেলায় বেশি ডাবের পানি খেয়েছে। এই কারনে কথায় কথায় চোখ দিয়ে ননস্টপ পানি ঝরতে থাকে, যা শ্রাবণ সহ্য করতেও পারেনা, কিছু বলতেও পারে না।
শ্রাবণ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ধারার চোখ দিয়ে ননস্টপ কান্নার বন্যা বয়ে যাচ্ছে দেখে প্রথমে রাগ কমে গেল, তারপর একটু মজা লাগল। কিন্তু তবুও সে হাসি চেপে গম্ভীর থাকার চেষ্টা করল। দু’হাত কোমড়ে রেখেই মৃদু স্বরে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” দয়া করিয়া আপনি নিজের চোখের পানির ট্যাংকি টা বন্ধ রাখুন ম্যাডাম। অতি প্রয়োজনীয় সময় ছাড়া কান্নার সুইচ অন না করার বিশেষ অনুরোধ করছি। কারন এসব চোখের পানি রাত-বেরাতে ভীষন কাজে দেবে। ”
শ্রাবণের দুষ্টুমি করে বলা কথাগুলো ধারা বুঝলো না। বুঝলে বোধহয় মাটির নিচে ঢুকে পড়তো। উল্টো মেয়েটা চোখ পিটপিট করে তাকাল। তবে কান্না থামলো না। শব্দহীন চোখের পানি ফেলেই বোঝার চেষ্টা করল স্বামীর অভিব্যক্তি।
শ্রাবণের বেশ হাসি পেলো আজ। মেয়েটা ভীষণ বোকা। একটু থেমে শ্রাবণ আবারো গুরুতর ভঙ্গি করে বলল,
—” এছাড়াও, আপনার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, আপনার চোখের পানি শ্রাবণ শেখের কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়। তাই দয়া করিয়া তাহাকে এই পদ্ধতিতে খুন করিয়া কারাগারে বন্দিনী হওয়ার দুঃসাহস করিবেন না। বিষয়টা আপনার জন্য অতি ভয়ানক!”

ধারা মনে করলো শ্রাবণ আসলেই প্রচন্ড রেগে গেছে। তাই এতক্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এবার সে শব্দ করে মুখে হাত রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। অঝোরে শুরু করা এই কান্না দেখে বেচারা শ্রাবণ এবার অস্থির হলো। এগিয়ে গিয়ে দুহাত নেড়ে বোঝানোর মত করে বলল,
—” আরে আরে, কান্না শুরু করো না প্লিজ! হয়েছে তো। আহহা! এ কি জ্বালা! দেখো, আমি রাগ করে বলেছিলাম। তুমি যে বোকা নও, সেটা আমি জানি। তবে মাঝে মাঝে এমন কাজ করো যে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়! আরে বাবা, আচ্ছা, রাগ করিনি তো! হয়েছে। আমার দোষ৷ ওকে? থামো!”
ধারা ঠোঁট উল্টে নাক মুছল আঁচলের কোণে। চোখের ভেজা পলক মেলে শ্রাবণের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠটা হালকা কেঁপে উঠল,

—” আপনি তো আমার সাথে সবসময় এমনই করেন। রাগ দেখান, বকা দেন। আমি কি ইচ্ছে করে বলেছি নাকি? আমি তো সবকিছু বলিনি। আমি কি একবারো বলেছি যে ওসব দাগ আমি দিয়েছি। একবারো বলেছি আপনিও আমাকে কাঁমড় দিয়েছেন। বলিনি তো, অস্বীকারই তো করলাম!”
শ্রাবণ এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। হো হো হেসে ফেলল। সামনে এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে ধারার গাল দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। আঙুলের পাতায় মুছে দিল চোখের ভেজা চিহ্ন। নরম স্বরে বলল,
—” আচ্ছা আচ্ছা, আমার ভুল হয়েছে। বুঝেছি। তুমি তো কিছু ভুল করোনি। তবে এত স্পেশাল বিষয় বাপ-মার সামনে বলে দেবে, এটা আমি কল্পনাও করিনি। বাবা তো অবসরপ্রাপ্ত হয়েও পালিয়ে যেতে চাইল। যাকগে, হয়েছে আর কেঁদো না!”

ধারার মুখে লাজুক হাসি ফুটল অশ্রুর মাঝেই। শ্রাবণ মুচকি হেসে তার কপালে আলতো চুমু খেলো। ঠোঁটের কোণে খুনসুটি মাখা স্বর ভাসাল,
—” ঠিক আছে, এবার থেকে যেকোনো কথা বলার আগে একবার আমার দিকে তাকাবে। বুঝেছো? এই ছোট্ট গাধা-ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার তুমি! আমি ইশারা করলে তবেই বলবে। তবে সব ক্ষেত্রে না!”
ধারা হালকা হেসে মাথা নেড়ে সায় দিল। এমনিতেও সে কথা বলতে চায় না। হুটহাট অসস্তির তোপে উল্টোবাল্টা বলে ফেলে। শ্রাবণ ধারার চুলে হাত বুলিয়ে গুছিয়ে দিলো। ধারা লজ্জা পেলো। ঘরজুড়ে বাতাসে মিশে গেল সেই অদ্ভুত উষ্ণতা। শ্রাবণ আরেকটু কাছে টেনে নিয়ে বলল,
—” চলো, এবার নাশতা করি। তোমার কথায় আমারো গলা দিয়ে খাবার নামেনি। ”
ধারাও এবার সত্যিই হাসল। তার চোখে ভয়ের ছায়াটা মিলিয়ে গিয়ে জায়গা নিল প্রশান্তি আর স্নেহের ঝিলিক। শ্রাবণ এবার হুট করে কিছু একটা মনে পড়তেই বলে উঠলো,
—” ভালো কথা, আজ যে আমাদের ঘুরতে যাওয়ার কথা। তুমি তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া করে তৈরী হয়ে নাও। আমরা সকাল এগারোটার পরেই বেরিয়ে যাব, ওকে?”
ধারা মাথা নেড়ে মিষ্টি হেসে বলল,

—” ওকে।”
শ্রাবণের দৃষ্টি এবার আরো একটু গুরুতর হলো। সে সিরিয়াস মুডে বলে উঠলো,
—” তুমি এত বড় উদ্ভট ব্লাউজ পড়েছো কেনো? একদম গলা পর্যন্ত ঢেকে গেছে। গরম লাগছে না?
ধারা এবারে সুযোগ পেলো। নাক মুখ ফুলিয়ে ছিটকে সরে এলো শ্রাবণের কাছ থেকেই। ভীষন রাগান্বিত স্বরে তর্জনী উঁচু করে বলে উঠলো,
—” আপনি তো গলা দেখার মত অবস্থায় রেখেছেন, তাই না? এই কারনে খুশিতে গলা ঢেকে রেখেছি। এখন সুন্দর লাগছে না আমায়?”

শ্রাবণ ঠোঁট কাঁমড়ে হাসলো। আসলেই সে দেখার মত অবস্থায় রাখেনি। তারই বা কী দোষ। গলার ওই লাল তিলটা যে নেশাদ্রব্যের মত টানে তাকে। কোনোমতেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই তো গতরাতে সুযোগ টা পেয়ে তিলটায় হামলা চালিয়েছে সে। এফোঁড়ওফোঁড় করেছে জায়গাটা। ধারার কথা শুনে শ্রাবণের বেশ হাসি পেলো এবার। পেছনে একবার তাকিয়ে খোলা দরজাটা দেখে নিল। তারপর ঠোঁট চেপে দুষ্টু হেসে বলল,
—” দরজা টা খোলা আছে। নইলে বলতাম যে সুন্দর লাগছে কিনা। আসলে না দেখে তো কিছু বলা যায় না। তাই আগে খুব মনোযোগ দিয়ে তোমায় দেখতে হবে, তারপর মন্তব্য করতে পারব।”

শ্রাবণের কথার রেশ এবার বেচারি সরল ধারাও লজ্জায় গা ঢাকার জায়গা খুঁজলো। কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। ছিঃ! লোকটা দিনদিন ভীষণ অশভ্য হয়ে যাচ্ছে। গত রাতে অবশ্য বহুত প্রমাণ হাতেনাতে পেয়েছে।
ধারা কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু তার আগেই সালমা বেগমের উঁচু গলা শোনা গেলো,
—” এই ধারা, খেতে আয় মা। শ্রাবণকে নিয়ে টেবিলে বোস। আমি ছাদের গাছগুলোয় পানি দিয়ে আসছি!”
ধারা স্বভাবসুলভ ভাবে জোর গলায় ঘর থেকেই জবাব দিয়ে বলল,

—” আচ্ছা মা।”
তবে শ্রাবণ গভীর চিন্তায় ডুবলো। কিছু একটা গভীর ভাবে ভাবলো। হিসেব কষলো মনে মনে। এরপর স্বাভাবিক ভাবেই ধারাকে জিজ্ঞেস করলো,
—” তোমার শাড়িটা কোথায়? ”
ধারা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” কোন শাড়ি?’
শ্রাবণ গলা খাঁকারি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—” যেটা গতরাতে আমায় খুন করার অস্ত্র হিসেবে ইউজ করেছিলে আই মিন যেই শাড়ি গতরাতে পড়েছিলে। ”
ধারা শুকনো ঢোক গিলল। মস্তিষ্কে হানা দিল গতরাতের ছাদের মুহুর্তগুলো। লজ্জায় মাথা নামালেও ভাবলো কিছু একটা। তারপর শাড়ির কথা মনে পড়তেই কান গরম হয়ে উঠলো। মিনমিন করে বলল,
—” শাড়ি তো ছাদে বোধহয়।”
চোখ বড় করে তাকালো শ্রাবণ। আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করল,
—” আর আমার শার্ট?”
—” সেটাও তো ছাদে।”
ধারার কথায় হা হয়ে তাকালো শ্রাবণ। হতবিহ্বল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” ওগুলো ওভাবেই ছাদে পড়ে আছে? তুমি ওসব আনো নি?”
রাগের মাথায় ধারা হুঁশ হারালো। ভীষন মেজাজ খারাপ হলে গড়গড় করে বলে দিল,

—” আপনি সুযোগ দিয়েছিলেন অধৈর্য লোক? আমার শাড়ি কে খুলেছিল হ্যাঁ? নিজের শার্টটাও ছুুঁড়ে ফেলেছেন! ছিঃ কিসব অভদ্র কাজকর্ম! ভাগ্যিস ব্লাউজ প্যাডিকোট ঠিক ছিল। ওভাবেই কোনো কথাবার্তা ছাড়া ঝট কোলে তুলে ঘরে এনেছেন! নাউজুবিল্লাহ! আহারে! বেচারা আমার সুন্দর শাড়িটা! সারারাত ছাদে বৃষ্টিতে ভিজেছে।”
শ্রাবণের এবার মন চাইলো পানিতে ডুবে মরে যেতে অথবা হারপিকের বোতলটা চিবিয়ে খেয়ে নিতে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে টাই হারিয়ে ফেলল। এসব কাকে কী বলছে সে? শ্রাবণ কপাল চাপড়ালো। ধারার দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলল,

—” নাউজুবিল্লাহ। আস্তাগফিরুল্লাহ! ওরে বলদ বেডি! বলদের হাড্ডি! শাড়ি আর শার্ট ওভাবে…মাই গড! মা ছাদে গিয়ে কাপড়গুলো ওভাবে পড়ে থাকতে দেখলে কী ভাববে বুঝতে পারছো? হায় আল্লাহ! আমার বউয়ের মাথায় বুদ্ধি নেই কেনো? এত সরল কেনো? মান সম্মানের ফালুদা অলরেডি হয়েই গেছে। এবারে মরা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমি কচু গাছে ফাঁসি দিতে যাচ্ছি। ইউ ক্যারি অন ইওর বলদামি!”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বিষয়টা বুঝলো। শ্রাবণ বোধহয় আসলেই কঁচু গাছে ফাঁসি দিতে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে। তা দেখে ধারা ফট করে শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরে সরল মনেই কাতর চোখে তাকিয়ে বলল,
—” কোথায় যাচ্ছেন? আমার ছেড়ে যাবেন না প্লিজ। আপনি কঁচু গাছে ফাঁসি দিলে আমাকে তো বেল গাছে ফাঁসি দিতে হবে। ওসব চিন্তা বাদ দিন। বলুন, এখন কী হবে? উপায়? মা যদি দেখে ফেলে?”
শ্রাবণ ধারার মাথায় গাট্টা মারল। জোর গলায় চেঁচিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,

—” আমি একটা রামছাগল, তুমি একটা রামবলদ! পারফেক্ট কম্বিনেশন! ওরে গাধী, ওরে বলদ, কথা না বলে তাড়াতাড়ি দৌঁড় দাও। তুমি মা কে আটকাও। কথায় ব্যস্ত রাখো। আমি পেছনের সিঁড়ি দিয়ে রকেটের গতিতে গিয়ে আলোর গতিতে কাপড়গুলো নিয়ে আসছি। ওকে? ডিল? ”
শ্রাবণ ধারার সাথে হ্যান্ডশেক করে দৌঁড় দিল। ধারা দুই সেকেন্ড আগে থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বিষয়টা মাথায় বসালো ঠিক করে। এরপর পরিণতি উপলব্ধি করতে পেরে চেঁচিয়ে উঠলো প্রায়। চিতাবাঘের মত দৌঁড়ে যাওয়া শ্রাবণকে অনুসরন করে সেও খরগোশের মত দৌঁড়ে সামনের সিঁড়ির দিকে ছুটলো। যে করেই হোক, সালমা বেগমের ছাদে যাওয়া আটকাতে হবে। নইলে ছিঁটেফোঁটা যেটুকু সম্মান অবশিষ্ট আছে, সেটাও আর বাকি থাকবে না। ধারা এক নিমিষে বুঝে গেল, এই বিপদ থেকে বাঁচতে হলে সালমা বেগমকে আড্ডায় বেঁধে ফেলতে হবে। হাঁপাতে হাঁপাতে দৌঁড়ে সামনের সিঁড়ি ধরে ছাদের দিকে এগিয়ে যাওয়া সালমা বেগমের পথ আটকাল সে। চোখ মুখ গরম, শ্বাস প্রায় ছুটছে,তবু কণ্ঠটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখল।
সালমা বেগম আর কয়েক সিঁড়ি এগোলেই ছাদের দরজায় পা ফেলতেন। ধারা অস্থির হয়ে ভদ্রমহিলার হাত ধরে টেনে থামালো, দুএক সিঁড়ি নামিয়েও আনলো।

—”মা! মা, শুনছেন?”
সালমা বেগম একটু অবাক হয়ে ভ্রু তুললেন,
— “কী হলো রে? ছুটছিস কেনো? ছাদে যাবি?”
হাঁপাতে হাঁপাতে ধারাা বলল,
—” না না। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
সালমা বেগম বললেন,
—” ছাদে গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, পানি দিতে যাচ্ছি।”
ধারা গলা খাঁকারি দিয়ে সালমা বেগমের হাত টেনে একেবারে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল, যেন কোনো গভীর চিন্তায় আছে। হঠাৎ বলে উঠল,
—” মা, জানেন তো, আজকালকার আবহাওয়া একেবারে অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছে। গতকাল বিকেলে যে বৃষ্টি হলো, তাতে কিন্তু আমার মনে হলো আমাদের নারকেল গাছের পাতা নড়ে উঠছিল অদ্ভুতভাবে। যেন কাওকে কিছু বলতে চাইছে! ভুতুড়ে ব্যপার! ”

সালমা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন। ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলেন।
— “কী সব উল্টাপাল্টা বলছিস রে? নারকেল গাছ আবার কথা বলে নাকি!”
ধারা নাক মুখ কুঁচকে এমন ভঙ্গি করল যেন ব্যাপারটা খুবই গুরুতর। আসলে সেও জানেনা যে কী কথা বলছে। কিন্তু বলতে হবে, তাই আরো বলল,
—” বলে তো। মা শুনুন, বিজ্ঞানীরা বলে প্রকৃতি অনেক সময় মানুষের ভাগ্যের সাথে খেলা করে। কে জানে, হয়তো গাছগুলো আমাদের ভাগ্যের খবর দিতে চাইছে। আপনিই তো বলতেন, ফুল ফুটলে ভালো কিছু ঘটে!”
সালমা বেগম এবার থমকে দাঁড়ালেন, কৌতূহল নিয়ে শুনতে লাগলেন। মনে মনে ভাবলেন মেয়েটার জ্বর এসেছে কিনা। জ্বরের ঘোরে এসব কথা বলাটা স্বাভাবিক। ধারা এবার নিজের মনেই একগাদা অদ্ভুত যুক্তি জুড়ে দিল,

—” আরেকটা কথা.. আমি ভাবছি, আমাদের আমগাছের ডালে পাখি বাসা বাঁধছে না কেন? ওসব পাখিরাও বুঝি বৃষ্টির সিগন্যাল পেয়ে লুকিয়ে গেছে। মা, আপনি এসব কখনো খেয়াল করেছেন?”
সালমা বেগম এবার পুরো মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, হাতের পানি দেওয়ার পাত্রটাও নামিয়ে ফেললেন। ধারা মোটেই উল্টোবাল্টা কথা বলার মেয়ে না। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বলছে তা ভেবে সালমা বেগম এখনো চেষ্টা করলেন বোঝার। তবে পারলেন না। মেয়েটা কি সকালে ডাইনিং টেবিলে হওয়া ঘটনাটার কারনে পাগল হয়ে গেলো।

এদিকে পেছনের সিঁড়ি বেয়ে শ্রাবণ ছাদের দিকে উঠেই এক মুহূর্ত থামল। বাতাসে এখনো হালকা বৃষ্টির গন্ধ, ভিজে মেঝে, আর তার শার্ট আর ধারার শাড়ি দুই কোণায় গুটিয়ে পড়ে আছে। সে লাফিয়ে গিয়ে তড়িঘড়ি দুটো তুলে নিল। শাড়িটা ভিজে ভারী হয়ে আছে, শার্টটাও কাদায় লেপ্টে গেছে। এসব দেখে এখন শ্রাবণের লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। পেলোও বটে। তবে এখন পালানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সে শুধু মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করল,
—”হায় আল্লাহ, এদের ধুয়ে শুকাতে হলে পুরো বংশকুল ডেকে আনতে হবে।”
সালমা বেগমের কথা মনে পড়তেই শ্রাবণ আর দেরি করল না। নিজের বউকে মুরগির বাচ্চা উপাধি দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে ধুপধাপ করে নিচে ছুট দিল। আজ ধারাকে রফাদফা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল মনে মনে। মেয়েটার বুদ্ধিসুদ্ধি বাড়ানো প্রয়োজন আর এর মূল ঔষধ হলো আঁছাড় মেরে কোঁমড়ের হাড্ডি-গুড্ডি গুড়ো করে পাউডার বানানো। এরপর কয়েক বোতল হরলিক্স আর কমপ্ল্যান খাইয়ে দিতে হবে।
ধারা তখনও নির্লজ্জ অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে,

—”মা, আমি ভাবছি, কাল যে গাছের পাতায় লাল লাল পিঁপড়ে উঠেছিল, এটা কিন্তু বৃষ্টির সিগন্যাল ছিল। প্রকৃতিই আমাদের ভাগ্যকে একটু একটু করে সাজিয়ে দেয়, তাই না?”
সালমা বেগম অর্ধেক হাসলেন, অর্ধেক বিরক্ত হলেন। মেয়েটা পুরোই গেছে। তিনি এবার পানির পাত্র টা হাতে নিয়ে আবারো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। মুখে বললেন,
—” সকালে না খেয়ে তোর মাথা টাই গেছে। পাগলি একটা! একেবারে পন্ডিত হয়েছিস হুম? আয়, আমার সাথে ছাদে আয়। গোলাপ ফোটার কথা আজ! কয়েকটা ফুল নিয়ে যা!”
ধারা সালমা বেগমের সাথে পিছু পিছু তাল মিলিয়ে চলছিল। সালমা বেগমের কথা শুনে ফট করে তার হাত থেকে পানির পাত্রটা নিয়ে মিথ্যে হেসে বলল,

—” না মা, আপনি আজকে বসুন, আমি পানি দিয়ে আসছি। আপনি তো সারাদিন পরিশ্রম করেন। একটু বিশ্রাম নিন না! আমি যাচ্ছি তো।”
ভদ্রমহিলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারা তাকে থামিয়ে নিচের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। আর তখনই পেছনের দরজা দিয়ে শ্রাবণ নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল, হাতে শার্ট-শাড়ির গাদাটাকে আড়াল করে রাখলো। মুখে এমন ভঙ্গিমা যেন কিছুই হয়নি। তার চোখে-মুখে সেই স্বস্তির আভা। ভাগ্য আর ধারা, দু’জনেই শেষ মুহূর্তে তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

সকালের সূর্য গভীর হয়ে গেছে। বেলা তো সেই কখনই গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোচ্ছে। অথচ এখনো ঘর থেকে বের হলো না কনিকা। জরিনা খাতুন মুখে একদলা পান নিয়ে তাকিয়ে রইলেন খুপড়ির মত ঘরটির দিকে। সাদিকের সাথে থাকার জন্যই কনিকাকে এই ঘরটা দিয়েছেন জরিনা খাতুন। তবে সাদিক চলে যাবার পরে তিনি বারবার করে বলেছেন কনিকা কে যাতে তার সাথে এই ঘরে এসে ঘুমায়। একা একা ঘুমোবে! ছোট একটা মেয়ে! তা তিনি চাননি। কিন্তু নাছোড়বান্দা কনিকা একা একাই ওই ঘরটাতে থাকছে।

জরিনা খাতুন কাপড় ধোয়ার জন্য বড় বড় দুটো বালতি হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু কনিকাকে এখনো ঘর থেকে বের হতে না দেখে তিনি চিন্তিত হলেন। মেয়েটা তো ঘুম থেকে উঠতে এত দেরি করে না। এখনো বের হচ্ছে না কেন? একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে শেষে আঁচল কোঁমড়ে গুঁজে জরিনা বেগম সেই ঘরটার দিকে এগোলেন। ধীর পায়ে খুপড়ির ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বৃষ্টির পরের হাওয়ায় কাঠের দরজাটা ভিজে গিয়ে ভারী হয়ে উঠেছে। এক হাত দিয়ে তিনি আঁচলটা বুকের কাছে গুঁজে নিলেন, অন্য হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে কাঁপতে কপাট ঠেলে দিলেন। দরজার গোড়ায় কড়িকাঠ হালকা কঁকিয়ে উঠল।এক অচেনা সিঁদুরে শীতল শব্দে মুখরিত হলো।

কপাট খানিকটা সরতেই ভেতর থেকে এক অদ্ভুত গুমোট বাতাস বাইরে বেরিয়ে এলো। দেখে মনে হলো ঘরটার বুকেই শ্বাস আটকে ছিল এতক্ষণ। জরিনা খাতুন অবাক হলেন। তিনি ভ্রু কুঁচকে রেখেই এক পা ভেতরে বাড়ালেন, কিন্তু ভেতরে ঢোকা মাত্রই চোখ থেমে গেল সেখানেই। চোখের আকার বড় হয়ে গেলো। মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ঠোঁট কাঁপল, মুখের পান মুখ থেকে পড়তে গড়িয়ে গেল মাটিতে। শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য আটকে গিয়ে গলার ভেতর গর্জন তুলল। ভদ্রমহিলা ঘরের ভেতরের দৃশ্য টা দেখতেই চিৎকার ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো তার গলা থেকে। দরজার কপাটগুলো ভয়ে আবার খানিকটা কেঁপে উঠল, চারপাশের নীরবতা মুহূর্তেই ছিঁড়ে গেল সেই চিৎকারে। হঠাৎ মনে হলো, বাতাস পর্যন্ত থমকে দাঁড়িয়েছে। বোঝা গেলো না ঘরের ভেতরে ঠিক কী আছে, কিন্তু স্পষ্ট টের পাওয়া গেল, যা-ই হোক, তা জরিনা খাতুনের বুকের ভেতর ভয় আর আতঙ্কের ঝড় তুলে দিয়েছে। তিনি এটা আশা করেন নি! মোটেই এমন দৃশ্য তিনি দেখতে চান নি। খোদার এ কি বিচার!

সালমা বেগমকে ছাদে যাওয়া থেকে আটকানোর জন্য ধারাকে একটা চকলেট দিয়েছে শ্রাবণ। গিফট হিসেবে দিয়েছে বললেও এর পেছনের সবচেয়ে বড় কারন হলো এখন ধারাকে আরেকটা কাজের জন্য পটানো দরকার। তাই শ্রাবণ বুদ্ধি করে চকলেটই দিয়েছে। বেচারি ধারা কে আগে কেও কখনো চকলেট খেতে দেয়নি। তাই খুশি মনে অনেক আনন্দ নিয়ে সে শ্রাবণের দেয়া চকলেটটা খেয়ে নিয়েছে। লোকটাকে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেনি। তবে ধন্যবাদ শুনেই ফেটে যাওয়া বেলুনের মত চুপশে যাওয়া মুখ নিয়ে তাকিয়েছিল শ্রাবণ। মাঝে মাঝে মঙ্গলগ্রহে বাসা বাঁধতে মন চায় তার। এত সহজ সরল বউ নিয়ে পৃথিবীতে থাকা বহুত কষ্টকর বলে মনে করে সে।

এখন ধারা গোসল করে এসে তৈরী হচ্ছে। একটু পরেই তারা ঘুরতে বের হবে। আজ সকালে যে কান্ড হলো! বাপরে! মরতে মরতে বেঁচে গেছে দুজনে। ধারা আজ তেমন সাজলো না। চুল দুপাশে নিয়ে আঁচড়ে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। অবাধ্য চুলগুলোকে বাঁধতে মন চায় না তার। শুধু গরম লাগে বলেই খোপা করে রাখে। তবে এখন খোলাই থাক।
গত রাতের পর থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছে ধারা। না চাইতেও তার অবাধ্য বেপরোয়া মন কেনো যেন শ্রাবণের সামনে নিজেকে সুন্দর করে উপস্থাপন করার জন্য পাগলামো করছে। তার ইচ্ছে করছে শ্রাবণের সামনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে রাখতে। এইযে আগে হলে সে কোনোমতে সালোয়ার কামিজ পড়ে নিয়ে চলে যেত শ্রাবণের সাথে। তবে আজ তার ইচ্ছে করছে একটুখানি সেজে যেতে। এটা কি প্রকৃতির দেয়া নাকি সে-ই একটু বাড়াবাড়ি করছে? লজ্জা পেলো ধারা। এর মধ্যে সাজগোজও হয়ে গেলো। মিষ্টি গোলাপি রঙের একটা গাউন পড়েছে সে। ঠোঁটে খুব হালকা করে লিপগ্লস দিয়েছে। এই জিনিসটা আগে কখনো দেয়নি ধারা। সালমা বেগমের দেয়া জিনিসগুলোর মধ্যেই পেলো সে। রঙটা মিষ্টি বলে ঠোঁটে লাগিয়ে নিল। অবশ্য ঠোঁটে দেয়ার পর থেকে ধারা একটা স্ট্রবেরি ফ্লেভারের ঘ্রাণ পাচ্ছে। পরে বুঝতে পারল ঘ্রানটা লিপগ্লসের। বিষয়টা ভালো লাগলো ধারার। মিষ্টি হেসে লিপগ্লসটা নাকের কাছে এনে ঘ্রানটা টেনে নিল। ইশ! কত মিষ্টি ঘ্রাণ! স্ট্রবেরি ফ্লেভারের!

একটু পরে শ্রাবণের ডাকে ধারা তড়িঘড়ি করে হাতে একটা ব্রেসলেট পড়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো। ছোটার তালে চুলগুলোও ছড়িয়ে গেলো কাঁধের চারপাশে। শ্রাবণ কোঁমড়ে হাত রেখে ঘড়ি দেখছিল। ধপধপ করে কারো ছুটে আসার শব্দে চোখ তুলে তাকালো শ্রাবণ। সে তো ভেবেছিল তার বোকাসোকা বউকে এত দেরি করে আসার জন্য রামধমক মারবে। এমনকি ভেবেছিল বরাবরের মত ধারা সাদামাটা ভাবেই আসবে। কিন্তু রমণীর এমন নতুন রূপে স্নিগ্ধতা দেখে শ্রাবণের বুকের স্পন্দন গতি বেড়ে গেলো। থমকে গেলো শ্বাস! আটকে গেলো চারপাশের সবকিছু। চোখের মণি স্তব্ধ হয়ে রইলো। সিঁড়ির ধাপগুলোতে হালকা কড়মড় শব্দ তুলতে তুলতে ধারা ছুটে নামছে। গোলাপি গাউনের নীচের প্রান্তটা তার ছুটন্ত পায়ের তালু ছুঁয়ে উড়ে উঠছে বারবার। কাঁধের চারপাশে ঝরে পড়া খোলা চুলগুলো ছুটতে ছুটতে বাতাসে উড়ছে। দেখে মনে হয় যেন ভোরের হাওয়ায় নেচে ওঠা নরম তুলোর মেঘ। রোদ্দুরের একটুকরো রেখা সিঁড়ির বাঁকে এসে তার চুলের মাঝে আটকে পড়ল, এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সূর্যের আলোই বোধহয় তার সাজের অংশ হয়ে গেছে।

শ্রাবণ বিরক্ত মুখে বকাঝকার জন্য যেভাবে প্রস্তুত হয়েছিল, সেই মুখের রেখাগুলো এক নিমেষেই নরম হয়ে গেল। ধারা সামনে এসে দাঁড়াতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখ ধীর গতিতে ধারার গাউন থেকে শুরু করে ঠোঁটের হালকা লিপগ্লস পর্যন্ত ভ্রমণ করল।।মিষ্টি গোলাপি আভা, গালে লাজুক লালিমা, আর স্ট্রবেরির হালকা ঘ্রাণ যেন চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রাবণের চোখ একবার স্থির হলো ধারার মুখে। মিষ্টি গোলাপি ঠোঁটগুলো যেন অচেনা এক আবেশ ছড়াচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য সে শ্বাস নিতে ভুলে গেল। তার চোখের দৃষ্টি এত গভীর আর মনোযোগী যে ধারার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। লজ্জা পেয়ে ধারা আস্তে আস্তে মাথা নামিয়ে নিল, পায়ের আঙুলের ডগা দিয়ে মেঝেটা আঁকতে লাগল যেন অচেনা কোনো রেখা। শ্রাবণ ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। এই চুপচাপ লাজুক মেয়েটার মাঝে যে কত রঙের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তা প্রতি মুহূর্তে নতুন করে আবিষ্কার করছে সে। ঘরের বাতাসটা যেন মুহূর্তেই উষ্ণ হয়ে উঠল শ্রাবণের নিঃশব্দ মুগ্ধতায়।
অনেকটা সময় পেরোতেই শ্রাবণের হুঁশ ফিরলো। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ফিক করে হাসলো। এরপর তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো ধারার দিকে। নিজের থুতনিতে আঙুল বুলিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,

—” কার জন্য সেজেছো এত?”
ধারা অপ্রস্তুত হলো। অসস্তি ঢাকার জন্যে মাথা নামিয়ে চুল গুঁজলো কানের পেছনে। যথাসম্ভব কঠিন কন্ঠে জানালো,
—” কারো জন্যে না। আর আপনার জন্যে মোটেই না!”
শ্রাবণ মাথা নামিয়ে মুখোমুখি হলো ধারার। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” আচ্ছা তাই?”
সজোরে মাথা ঝাঁকালো ধারা,
—” হুম। আর আমি মোটেই তেমন সাজিনি হুহ!”
হাসলো শ্রাবণ। মেনে নিল স্ত্রীর কথা। মাথা নেড়ে বলে উঠলো,
—” ঠিক আছে। যাকগে, সুন্দর লাগছে তোমায়।”
ধারা কুন্ঠিত হলো। লাজুক লালিমায় আভা ছড়িয়ে দিল চারপাশে। তারপর মিনমিন করে বাচ্চাদের মত জিজ্ঞেস করল,

—’ আপনার পছন্দ হয়েছে?”
শ্রাবণ ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
—” হুম, ভীষন। তবে,.”
—” তবে?”
ধারার আকুলতা দেখে মুগ্ধ হয় শ্রাবণ। নিষ্পাপ চেহারাটা থেকে চোখ সরিয়ে দৃষ্টি ফেলে ধারার গলার সেই কাঙ্খিত লাল তিলে। আবারো নেশায় ডুবন্ত চোখ নিয়ে তাকিয়ে আকুল গলায় বলে উঠে,
—” তোমার গলার লাল তিল টা আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ। অনেকদিনের তীব্র লোভ সেখানটায়।”
শ্রাবণের কথা কানে পৌঁছাতেই ছিটকে যাওয়ার মত নিজেকে গুটিয়ে নিল ধারা। অজান্তেই নিজের গলায় হাত বুলিয়ে মাথা নিচু করে শুকনো ঢোক গিলল। মিনমিন করে বলল,

—” ধ..ধন্যবাদ! ”
ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। ভীষন সিরিয়াস কন্ঠে বলল,
—” আশ্চর্য! তুমি বড় হবে কবে? শোনো মেয়ে, ধন্যবাদ নিজের কাছে রেখে দাও! এসব আমায় কখনো দেবে না।”
ধারা এবার সন্দিহান মুখে নিষ্পাপ অভিব্যক্তি নিয়ে বলল,
—” কেনো? ধন্যবাদ দেব না কেনো?”
শ্রাবণ বাঁকা হাসলো। একটু এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ল ধারার মুখ বরাবর। ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি ঝুলিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে ফিসফিস করে আবদার করল,

—” ধন্যবাদ না দিয়ে গলার ওই চকচকে লাল তিলটায় একটু চুমু খেতে দাও। জাস্ট একটা চুমু, প্রমিজ কাঁমড় দেব না।”
মুখ কুঁচকে চোখ সরু করে তাকালো ধারা। ছিটকে মুখ ঘুরিয়ে ভীষন গুরুতর ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” ছিঃ অভদ্র কথাবার্তা। কখনোই না। আপনাকে বিশ্বাস করবোই না। এবারে এমন কিছু করলে আমি মা কে বলে দেব হুহ!”
ঠোঁটের হাসিটা ধপ করে নিভিয়ে দিল শ্রাবণ। চোখ সরু করে তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল,

—” কী বলবে?”
—” বলব যে আপনি অনেক অভদ্র!”
শ্রাবণ আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হলো। কাওকে না দেখে ফট করে ধারার কোঁমড় টেনে নিজের দিকে নিল সে। ধারা অপ্রস্তুত থাকায় ছিটকে এগিয়ে আসলো। ধপ করে পড়ল শ্রাবণের বুকে। হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেলো। চোখ বড় করে লোকটার দিকে তাকালো ধারা। শ্রাবণ এবার ধারার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩১

—” লক্ষ্মী বউ আমার। দয়া করিয়া নিজের মুখটা বন্ধ রাখিবেন। আপনি যেভাবে আমার সম্মানের রফাদফা করতে উঠে পড়ে লেগেছেন, এমন চলতে থাকলে আমি মুখ লুকোনোর জায়গা পাব না। আপনার আঁচলের তলায় মুখ লুকিয়েও মান আর আর থাকবেনা। বুঝলেন?”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে সজোরে মাথা ঝাঁকালো। হ্যাঁ সে বুঝেছে। শ্রাবণ এবারো হাসলো। মিষ্টি হেসে ধারার হাত টা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে বেরিয়ে গেলো তাদের উদ্দেশ্যে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৩৩